বুধবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৪

সম্পাদকীয় - ৩য় বর্ষ ৯ম সংখ্যা

সম্পাদকীয়





বছরের প্রথম মাস। একই সাথে লেপের নীচে লুকানো আর কাঁচতোলা গাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার মরসুম। ঠান্ডা হাওয়া আর কেক-মাখানো বড়দিন ফেলে আসা; ক্যামেরায় এখনো লেগে আছে পিকনিকের ছবিগুলো। কিছু ভুলে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা,কিছু মনে রাখার ইচ্ছে আর অনেক নতুন প্রতিজ্ঞা নিয়ে প্রতিবারই ফিরে আসে সময়টা। একদিন মনে হতো,কেন বছরের শুরু জানুয়ারিতেই হবে? কেন এপ্রিল,জুলাই বা সেপ্টেম্বর নয়? আজ আর এসব নিয়ে তোলপাড় হয় না মন। এই শীতের মধ্যে নতুন বছরের অজুহাতে বন্ধুর বুক থেকে যদি একটু উষ্ণতা চুরি করাই যায়,ক্ষতি কি!


আমরা ক্ষ্যাপার দল। দস্তানা আঁটা হাতেও কলম নিয়ে বসি,নিদেনপক্ষে কি-বোর্ড তো আছেই! প্রতিটা লেখা লিখেই মনে হয় একটা নতুন দিন শুরু করলাম,হয়তো বা নতুন বছরও! কে জানে এটাই আমার জন্মদিন কিনা! আমরা দেখতে ভালোবাসি,বেড়াতে ভালোবাসি,কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা বোধহয় ঢেলে দিয়েছি লেখার মধ্যেই। মাঝেমধ্যে দুঃখ হয় প্রেমিকার জন্য।


আর কথা বাড়িয়ে কাজ নেই। ব্রেনের ইনপুট কম্যান্ড চোখদুটো ঠিকঠাক নিতে পারে কিনা তার পরীক্ষা হয়েই যাক না এবার! পুষ্টি তো সবাই-ই চায়!

শুভ নববর্ষ। ভালো থাকবেন।




ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে
-তন্ময় ভট্টাচার্য

উত্তর সম্পাদকীয় - চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

চলে গেল এক ক্ষেপচুরিয়াস বছর
চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য



একটা ক্ষেপচুরিয়াস বছর বুঝি শেষ হল।

বাপ রে বাপ, সেই শুরু থেকেই কেমন যেন ক্ষ্যাপা ষাড়ের মত মানুষকে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছিল ২০১৩ বছরটা! অসুস্থ হয়ে বাড়িতে বসে আছি, হঠাৎ হাজির সন্দিহানবাবু। আসল নাম সন্দীপন, কিন্তু সব কিছুতেই তাঁর নিজস্ব ভাবটা বজায় রাখতে হলে সন্দিহান-টাই ঠিক। এসেই বললেন, “বলেছিলাম না, এতা খুব খারাপ বছর যাবে!”

বললাম, বলেছিলেন বুঝি? কেনো বলেছিলেন, তা যে মনে নেই!

জবাব পেলাম, “মশাই দেখছেন না, শেষ সংখ্যাদুটি ১৩, মানেই আনলাকি। এক বছরে দুটু মাসের ১৩ তারিখ আবার শুক্রবার পড়েছে, মানে ব্ল্যাক ফ্রাইডে”।

বুঝুন অবস্থা! এই বছরেই যে ব্লু মুন নাইটও হয়েছে, সেতা বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছেন। আমার তো এই বছরটা বেশ লাগল। সমস্ত মানুষকে একদম তুড়িয় ক্ষেপচুরিয়াস মেজাজে এনে দিয়ে গেছে। সেই যে আন্না হাজারের অনশনের পর থেকে দিল্লির যুবকেরা ক্ষেপে ছিল, নির্ভয়া কেসে না যেন জ্বলে ঊঠল। বছরের শুরুটাই হল এক্কেবারে ক্ষেপচুরিয়াস। তড়িঘড়ি নতুন আইন বানানো হল, নেতা-মন্ত্রীরা চড়-থাপ্পড়ও খেলেন।

আর তার রেশ এসে পড়ল কলকাতার পথেঘাটে। বারাসাত, গাইঘাটা তো ছিলই; এসে গেল কামদুনি, খড়জুনা, গেদে…। ব্যস, আপার ক্ষেপার পালা। রাজ্যের মানুষ ক্ষেপে পথে পথে কত কিছুই না করল। মিছিল-টিছিল হল আর শেষ হাসিটা হাসল ক্ষমতার জোর। কামদুনির অপরাজিতার পরিবার চাপের কাছে তাকাকেই বাপ ডাকতে বাধ্য হল। গ্রামবাসী তো তা মেনে নেবে না, তাঁরা প্রতিবাদীওই রইলেন। নিহত মেয়েটির পরিবার গ্রাম ছেরে কোথায় যে কপ্পুরের ময় ভ্যানিশ হল, কে জানে!

এ সবের মধ্যেই দার্জিলিং-এর পাহাড়ে খানিক ক্ষেপচুরিয়াস কারবার হহে গেল। জিটিএ নামের খুড়োর কল থেকে পদত্যাগ করে ফেললেন বিমল গুরুং। তাঁর দল তো সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের শাসকদের জানিয়ে দিল ‘সমর্থন তুলে নিলাম’। দরকারের তাঁতে কিছুই যায় আসে না। রাতারাতি বস্তাবন্দী সব মামলা মাটি খুঁড়ে কঙ্কাল উদ্ধারের মত বার করে এনে শুরু হল গুরুংপন্থীদের জেলে পাঠানো। ধন্য গণতন্ত্র, ধন্য তাঁর ক্ষেপচুরিয়াস চেহারা। কয়েক মাসেই বিদ্রোহ ঠাণ্ডা, শীত আসছে যে। শীতের পর ভোট এলে বোঝা যাবে “কোন দিকে কার পাল্লা ভারি”।

ভেবেছিলাম, একটু বুঝি রেস্ট পাব। হায় হায়! আলুর দাম গেল চন্দ্রাভিযানে। সরকার সৎ দাম বাঁধে, দাম ততই বাড়ে। বন্ধ হল অন্য রাজ্যে আলু রফতানি, শুরু হল মামলা। এই সুযোগে “বেগুন গেল বাকিংহামে/ ঢ্যারস চলে ত্রিনিদাদ/ মুসুর গেল কোপেনহেগেন/ পটল গেল পেট্রোগ্রাড।” – না না, এটা আমার না, উত্তরপাড়ার পল্টু চ্যাটার্জিরা ট্রেনের কামরা মাতিয়ে এই গান গাইতে গাইতে হাওড়া যেতেন সেই দিনগুলিতে। ওদিকে দিল্লির ঘোষণায় বোঝা গেল, দাম বাড়ছে সব জিনিষের আরে সর্বত্র। কলকাতায় একটু বেশী। তাঁর জেরে মুদ্রাস্ফীতির হার ‘ডাবল ডিজিটে’ গিয়ে অর্থমন্ত্রী আর রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গভর্নরের নাকে মাছি হয়ে বসে রইল।

শোনা গেল, ঠাণ্ডা পড়লেই দাম কমবে। অতএব নো চিন্তা, ডু ফুর্তি’। সরকারের ঘোষণায় সন্দিগ্ধ সন্দিহানবাবু বললেন, “আরে বাবা, শীত পড়লে যে সব ফসল অঢেল চলে আসবে, নতুন আলুও আসবে – এটা কে না জানে?” মাস দুয়েক ঘাসপাতা আর সাবু-বার্লি খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারলেই সস্তা সবজি – এই তত্ত্বও বাজারে এল। ততদিনে শীতের সবজি হাজির।

কিন্তু তাতেও কি সব সমস্যা মিটল? চারপাশেই তো ক্ষেপচুরিয়াস হাল। দিল্লির ভোটে বোঝা গেল মানুষ কতটা ক্ষেপেছিল সব দল আর তাঁর নেতাদের উপর। আম আদমি পার্টি জিতে গেল, কিন্তু দু-নম্বরে। তিন নম্বর এবার এক নম্বরকে রুখতে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে আম আদমি পার্টিকেই সেই রাজ্যের ক্ষমতায় নিয়ে এল। রাজস্থানের লোকারেও ক্ষমতার বদল ঘটালো। দেশের মাথা হওয়ার রোগে কাবু নামোজির লোকেরা বলে বসল, নামোর ম্যাজিকে না কি এসব হল। হল বুঝি? বুঝি না তো। সন্দিহানবাবুর সঙ্গে থেকে থেকে দেখছি আমারও চরিত্রের দোষ হয়ে যাচ্ছে। আগে এতগুলি রাজ্যে ভোটের প্রচারে নামো গেলেন আর হেরে এলেন কেন? উত্তরপ্রদেশেও তো হারতে হয়েছে। দক্ষিণ ভারতে পা রাখার জায়গাই নেই, পূবে আসাম ছাড়া এক গণ্ডা আসনে জেতার ক্ষমতা নেই, বিহারে ক্ষমতায় থেকেও হারর মুখে – নামো ম্যাজিক ফ্লপ না করে।

চোখ অন্যদিকে ঘোরাতেই দেখি বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর হাল ভোট করাবেই, সরকার ক্ষেপচুরিয়াস। ক্ষেপচুরিয়াস বিরোঢী নেত্রী গোলাপী বিবি ওরফে বেগল জিয়া। ভোট রুখতেই হবে, তাই সারা সপ্তাহ ধরে কেবল হরতাল আর আবরোধ দাও, ট্রাক-বাস পোড়াও, মানুষ মারো-কাটো। জামাতীদের হাল খারাপ করে ছেড়েছে আদালত। অসত্য ভাষণ, মিত্যা তথ্য ইত্যাদিনানা কারণে তাঁদের দলের রেজিস্ট্রেশনই বাতিল। তাঁরা এখন ভোল বদলে সব বিএনপি। বাংলাদেশের লোক আড়ালে তাঁদের বলে ‘তলোয়ার পার্টি’। শেষ পর্যন্ত কি হয় জানতে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ কেটে যাবে।

যাক, যাক। তারপর নতুন কথা বলে যাবে। আগামী বছরটা কতটা ক্ষেপচুরিয়ান হবে, সেটা জানতে সন্দিহানবাবুকে পয়লা জানুয়ারি ডাকব ভাবছি। আপনারা কি বলেন?

সাক্ষাৎকার – সুবিমল বসাক

মুখোমুখি সুবিমল বসাক
প্রশ্নে তন্ময় ভট্টাচার্য



স্থান – বেলঘরিয়া, 04.11.13. সন্ধ্যা।



প্রশ্ন – আপনাদের হাংরি আন্দোলন যে হয়েছিলো,সেটা তো প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার, মানে সচরাচর যা হয়ে আসছে তার বিরুদ্ধে যাওয়ার। কিন্তু এখনকার দিনে যে রাজনীতিক,কবি নিজেদের ‘আলাদা’ বলছে, বা হাংরি জেনারেশানের যে নতুন কিছু করার চিন্তা, সেটাও কি একটা নতুন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাঁধা পড়ে যাওয়া নয়?

উত্তর – আসলে সেই ষাট দশকের ব্যাপারটা ছিলো অন্য। তখন প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আমরা লেখার মাধ্যমে করতাম। প্রতিষ্ঠান বলতে তো তখন আনন্দবাজার ছিলো, বড়ো কাগজ ছিলো,ওরই এগেইন্সটে; যারা পুরো সাহিত্যের ব্যাপারটাকে হাতের মুঠোয় রেখেছিলো,তার এগেইন্সটে। পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি যে রাজনীতিকও একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এই প্রতিষ্ঠান আরো সাংঘাতিক। তারা তো নিজেদের দলভুক্ত লোক ছাড়া কারোর কথাই শোনে না,তারাই সব,তারাই শেষ। তারা সবকিছু বোঝে বেশি করে,সব দেখে ফেলে। অথচ তাদের যে এত ছিদ্র হয়েছে সেটাও ওদের ধরিয়ে দিলে ওরা...মানে তুমি যে বললে না ‘ক্ষেপচুরিয়াস’, ওই ক্ষেপচুরিয়াস হয়ে যায়।



প্রশ্ন – আচ্ছা,এই প্রতিষ্ঠান বিরোধীদের বাংলা সাহিত্যে অবদান কী? এটা কি একরকম স্ট্যান্টবাজি নয়?

উত্তর – প্রতিষ্ঠান বিরোধী যারা, তাদের তো বাংলা সাহিত্য ইতিহাস তো কোনো কাজেই লাগছে না। তারা তো নিজের মতো লিখছে। আর আমি দেখেছি ,যারা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে,তাদের মোটামুটি একটা তৈরি ফর্ম রয়েছে – এইরকম হবে,ওইরকম হবে – কাহিনী এইরকম,গল্প এইরকম – নিজেদের একটা প্যাটার্নে বেঁধে ফেলেছে। প্রতিষ্ঠান বিরোধীরা তো এগুলোর কিছুই মানে না,কাজেই তাদের আর কি এসে যায়!



প্রশ্ন – আচ্ছা,আজকাল অনেকে বলে,সাফল্য একপ্রকার ফুক্কুরি হয়ে গেছে,মানে আসবে যাবে এরকম।

উত্তর – সাফল্যটা কি ব্যাপারে?

প্রশ্ন – ধরুন সাহিত্যের ক্ষেত্রে বা রাজনীতির ক্ষেত্রেই... যারা প্রতিষ্ঠান বিরোধী বা প্রতিষ্ঠানমুখী,উভয়েই কি সাফল্য কামনা করে না নিজের নিজের ক্ষেত্রে?

উত্তর – না সেরকম কোনো মানে নেই। আমরা যেমন সাফল্য কামনা করি না। আমাদের তো লেখা ছাপাও হয় না। যদিও আমি একটা পুরস্কার পেয়েছি অনুবাদে,সে অনুবাদ তো নিজের ইয়ে নয়,খালি ভাষা দিয়ে তরজমা করে দেয়া। আর সাফল্য কোনো ব্যাপার না। কেউ এলো,কেউ গেলো,তাতে কিছু এসে যায় না। সাফল্য যাদের আসে, তাদের সাহিত্যে সাথে অর্থ আগমন হয় আর কি! তাদের টাকা-পয়সা আসবে,তাদের কয়েকটা বই বেরুবে,এই ধরণের ব্যাপারগুলো সাফল্য। আমাদের সেরকম কোনো ইচ্ছেও নেই,উদ্দেশ্যও নেই,ভাবিও না এই ব্যাপার নিয়ে।



প্রশ্ন – তাহলে আপনারা যখন হাংরি-তে সেই ষাটের দশকে এসেছিলেন,তখন আপনারা নতুন একধরণের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেছিলেন, যে লালিত্য চলছে,সেটাকে বদলে নিজের মতো করে বদলে রূঢ় বাস্তব কে প্রকাশ করা...

উত্তর – যে যা লিখছে সে সেইরকমই লিখে যাচ্ছে,আর সেটাকেই তার সাহিত্য বলে মনে করা হয়।

প্রশ্ন – কিন্তু আপনাদের নিজস্ব চিন্তায় কি প্রতিষ্ঠা বা সাফল্যের কামনা জাগেনি সেইসময়? যে আমাদের চিন্তাটাও প্রতিষ্ঠিত হোক?

উত্তর – সেটা অন্য ব্যাপার। আমরা লিখছি কী জন্যে? লেখাটা ছড়িয়ে যাওয়ার জন্যেই তো? সকলে যাতে পড়ে,বুঝুক যে একটা অন্য ধরণের লেখা। বা আমরা একটা অন্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে লিখছি। বা আমাদের সাহিত্যসৃষ্টি একটু অন্য ধরণের। সকলে,এর আগে যারা লিখে গেছে,সেরকম নয়। দ্যাখো, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বলতে,ছাপানোটা খুব বড়ো ব্যাপার নয়। সতীনাথ ভাদুড়ী কিন্তু প্রতিষ্ঠান বিরোধী। ছেপেছে বড়ো কাগজই; দেশ-এই ধরণের পত্রিকায়। আবার দ্যাখো, প্রতিষ্ঠান বিরোধী বলে কেউ সহজে তাদের গ্রহণও করছে না। তুমি বলতে পারো, উনি তো বড়ো বড়ো পুরস্কার পেয়েছেন,সবই ঠিক আছে। সেইরকমই,যদি মনে করো,আমাদের লেখাটাও প্রাতিষ্ঠানিক, হলে হবে! সে তো আমাদের জীবদ্দশায় হবে না, তাও কমার্শিয়াল ভ্যালু-তে কেউ যদি করে! কারণ আমার মনে আছে,আমরা যখন হাংরি লিফলেট-টা বার করি,পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়। আমার কাছে অনেক ছিলো,ফেলে দিয়ে এলাম একজনার বাড়িতে। পরে ওই বইগুলো বিক্রি হয়েছে; যারা ব্যবসা করে,তারা অনেকগুণ দাম দিয়ে বিক্রি করেছে। এটাকে তুমি কী বলবে? আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপার? তা নয়।



প্রশ্ন – আচ্ছা,নেটে দেখলাম,হাংরি আন্দোলনের লিফলেটের অষ্টম সংখ্যায় আপনার লেখা প্রথম বেরিয়েছিলো,আর সেটাই অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলো। সেটাই কি প্রথম হাংরি লেখা আপনার?

উত্তর – না। আমার যেটায় বেরিয়েছিলো,তাতে সকলেরই ওইরকম লেখা ছিলো।

প্রশ্ন – আচ্ছা আপনি তো বোধহয় কবিতার থেকে গদ্য বেশি লিখেছেন?

উত্তর – গদ্যই লিখি। কবিতা মাঝেমাঝে। কিন্তু আমি গদ্যকার আর কি। আমরা তিনজন গদ্যকার ছিলাম। একজন হলো বাসুদেব দাশগুপ্ত। খুব শক্তিশালী। ওকে কেউ পাত্তা দেয়নি এখানে, ও-ও অবশ্য পাত্তা দেয়নি কাউকে। তারপর সুভাষ ঘোষ। বাসুদেবের লেখা পেলে পড়ো।

প্রশ্ন – হাংরি রচনা সংকলনে পাবো কি?

উত্তর – হ্যাঁ হ্যাঁ। ওটা বোধহয় শৈলেশ্বর ঘোষ করেছে। আমাদের হাংরি আন্দোলন যখন শেষ হয়ে যায়,ওরা আলাদাভাবে ‘ক্ষুধার্ত’ বের করে।



প্রশ্ন – পঁয়ষট্টি সালে যখন মলয়বাবু জেল থেকে মুক্তি পেলেন,আপনারা নির্দোষ প্রমাণিত হলেন,তারপরেও কি সবার সাথে যোগাযোগ ছিলো?

উত্তর – বোধহয় ছেষট্টি কি সাতষট্টি সালে মলয় বলল যে ‘আমি হাংরি জেনারেশানে শেষ’, ও তখন লেখালিখি ছেড়ে দিলো। আর আমরা তখন একেবারে অদ্ভূত অবস্থার মধ্যে কাটালাম। এদিকে সুভাষ,শৈলেশ্বর এরা সব আলাদা ‘ক্ষুধার্ত’ শুরু করলো।

প্রশ্ন – ইতিহাস যা বলে,উনারাই তো মুচলেকা দিয়েছিলেন রাজসাক্ষীর?

উত্তর – অনেককিছুই করেছিলো। শৈলেশ্বর ঘোষ তো শঙ্খ ঘোষের কথানুসারে কাজ-টাজ করতেন। তা আমরা ওকে বলতাম শঙ্খ ঘোষের ইয়ে আর কি! শঙ্খ ঘোষও ওদের অনেকই... শঙ্খ ঘোষের দৌলতে উনার বই-টই বেরিয়েছে, ক্ষুধার্ত সংকলন বেরিয়েছে। ওই পাবলিশার কিন্তু কখনো আমাদের জিজ্ঞেস করেনি। এইভাবে ওরা ওদের দিকে গেলো, আমরা আমাদের দিকে। এরপর মলয় যখন এলো, তখন আর হাংরি জেনারেশান নেই।



প্রশ্ন – আপনাদের আবার মনে হয়নি,পুরানো-রা যারা হাংরি আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলো,তাদের দিয়ে যদি আবার শুরু করা যায় নতুন করে?

উত্তর – চেষ্টা করেছিলো মলয়। পঁচাশি সালে এসে দেখাসাক্ষাৎ-ও করেছিলো,কেউ তেমন উৎসাহ দেখায়নি। তারপর মলয় পোস্টমডার্ন আন্দোলন শুরু করলো।

প্রশ্ন – তাতে কি সঙ্গী যথেষ্ট পেয়েছিলেন মলয়বাবু? কারণ এই আন্দোলন হাংরি-র মতো অতোটা নাম কাড়েনি।

উত্তর – না এটার কারণ আছে। পোস্টমডার্ন আন্দোলন তো বাইরের আন্দোলন। বিদেশীদের। সেই আন্দোলন ইন্ডিয়াতে করার ফলেই হোক বা যে কারণেই,ওটা হয় নি। কিন্তু গল্পের প্যাটার্ন পাল্টে দিয়েছিলো পোস্টমডার্নে মলয়। সকলেই নিজস্ব একটা শৈলী তৈরি করে ফেলেছিল। মলয়ের গদ্যের একটা আলাদা স্টাইল আছে। কবিতার তো আছেই। তবে আমি বোধহয় প্রতিটা গল্পে বা প্রতিটা গদ্যে পাল্টাতে থাকি। নতুন বিষয়,নতুন আঙ্গিক এমনকি নতুন ভাষায়ও। যেমন ‘ছাতামাথা’-টা হচ্ছে পূর্ববঙ্গের ভাষা। আবার ধরো ‘গেরিলা আক্রোশ’ – এইটা আবার পশ্চিমবঙ্গের ভাষায়। ‘প্রত্নবীজ’-টা বিহারের বাঙালিদের ভাষায়... যারা অনেকদিন হিন্দিভাষী অঞ্চলে রয়েছে,তাদের। তাছাড়া আরেকটা আছে,যারা এখানকার বিহারি, এখানে এসে থেকে গেছে,তাদের একটা অন্যরকম ভাষা।



প্রশ্ন – আচ্ছা,পড়েছিলাম,বিনয় মজুমদার একসময় হাংরি তে ছিলেন। আপনি কি উনাকে পেয়েছিলেন? না উনি আগেই ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন?

উত্তর – সে একেবারে প্রথম দিকে।

প্রশ্ন – উনার যতগুলো লেখা পড়েছি,হাংরির লেখা যেমন পড়লে চেনা যায়,সেরকম তো কোনো লেখা পাইনি।

উত্তর – আসলে সকলে ভাবে যে সেক্স নিয়ে লিখলেই বোধহয় হাংরি হয়। পড়েইনি হয়তো,বলে বসবে – ‘ও হাংরি! তাহলেই সেক্স নিয়ে লেখা।‘ সে অদ্ভূত ব্যাপার। বিনয়ের একটা বই আছে, নামটা সম্ভবত ‘বাল্মীকির কবিতা’, ওটায় ‘ভুট্টা সিরিজ’ আছে। ‘ফিরে এসো চাকা’র অনেক পরে। তারপরে ওই ‘বাল্মীকির কবিতা’ বইটা বিশ্ববাণী বের করে। হইচই হয়,অনেকে বারণ করে,বাধা দেয়,তাই পরে ও ওটাকে বাদ দিয়ে বের করে বইটা।



প্রশ্ন – মলয় রায়চৌধুরী-কে তো আন্দোলনের পুরোধা বলা হয়। উনি প্রতিষ্ঠান বিরোধীও। তাহলে এখন উনাকে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন কাগজের কাটিং জমান,বিভিন্ন তথ্য ফাইল আপ করেন, ব্লগেও মলয়বাবুর আপডেট দেখা যায় হাংরি জেনারেশান সংক্রান্ত। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

উত্তর – সেটা মলয়ের ব্যাপার,মলয়ই জানে। আমি বলতে পারবো না।

প্রশ্ন – এখন হাংরি-র কে কে বেঁচে আছেন?

উত্তর – মলয় আছে,ত্রিদিব,প্রদীপ চৌধুরী...সুবো আছে। মলয় ছাড়া কারোর সঙ্গেই যোগাযোগ নেই তেমন । প্রদীপ মাঝেমধ্যে টেলিফোন করে।

প্রশ্ন – সমীর রায়চৌধুরী?

উত্তর – উনি তো হাংরি নন। সমীর রায়চৌধুরীর ব্যাপারটা হলো,হাংরি আন্দোলনের সময় উনি ছিলেন না। দেবী রায়,শক্তি চট্টোপাধ্যায়,মলয় – তিনজনে শুরু করেছিলো। সমীরের বন্ধু হলো শক্তি ও সুনীল। একটা কি দুটো সংখ্যায় বোধহয় ছাপা হয়েছিলো সমীরের লেখা। তারপর হাংরির যে সংখ্যা-টা নিয়ে গোলমাল,সেটায় উনার নাম পাবলিশার হিসেবে ছাপা ছিলো। তাকে অ্যারেস্ট করা হয়,অফিসে সাসপেন্ড হন।

প্রশ্ন – শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রথম দিকে ছিলেন,পরে সরে গেছিলেন কেন? আপনি পেয়েছিলেন উনাকে?

উত্তর – না না সেইসময় সরেনি। পরে। কফি হাউসের নীচে অনেক... আসলে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটা চাকরির দরকার ছিলো। এই শুনি আর কি! এখন সমীর রায়চৌধুরীর ব্যাপারটা এমন যে উনিই বুঝি হাংরি শুরু করেছেন। ১৯৬৭ সাল থেকে মলয় অফ,আবার ফিরে আসে ১৯৮৫তে,এই সময়টায় আমি কিন্তু ধরে রেখেছিলাম সমস্ত ডকুমেন্ট। ফাইলও ছিলো আমার বাড়িতে। সুভাষ ঘোষ ওটা মেরে নেয়। আর সমীর রায়চৌধুরী আগাগোড়া কেরিয়ার তৈরি করে অফিসার হয়ে এদিক-ওদিক অনেক যায়।ওর বন্ধু মূলত ছিলো সুনীল,শক্তি,সমরেন্দ্র... ফলে ওর লেখার মধ্যে ওদের ব্যাপারটাই বেশি থাকে। এই তো সেদিন হাংরি জেনারেশান সম্পর্কে একটা সংকলন বেরিয়েছে দেখলাম ‘ চন্দ্রগ্রহণ’ নামে... দেখলাম পুলিশি নথি - কোর্টে যে সমস্ত সাক্ষী-টাক্ষী হয়েছিলো... সে লেখাগুলো ছিলো আমার। কিন্তু উনি ওটায় লিখেছেন ‘সৌজন্য – হাওয়া’। তা হাওয়া থেকে যে বেরিয়েছে সেটা তো বলবে কোত্থেকে পেয়েছে! তা বলেনি! এটা অদ্ভূত! খ্যাতির বিড়ম্বনা।

প্রশ্ন – অনেক প্রচ্ছদে দেখেছি আপনার আঁকা...

উত্তর – অনেক এঁকেছি,অনেক হারিয়ে গেছে...কিন্তু আমার কয়েকটা বইটই-য়ে আমার আঁকা আছে।

প্রশ্ন – ধরুন,আপনি হাংরি তে ছিলেন,পরে অন্য লেখালিখি শুরু করেন যখন, বাধা পাননি? যে হাংরির লোক এভাবে লেখা চালিয়ে যাচ্ছে...

উত্তর – আমি খুব বেশি তো লিখিনি। অনুবাদ করেছি অন্য পত্রিকায়,কিন্তু দু-তিনটে সিলেক্টেড ছিলো। কবিতীর্থে লিখতাম,কৌরবে লিখতাম। কে কি বললো,তাতে কিছু এসে যায়? যে লেখার,সে ঠিক লিখবে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে তো অনেকে অনেককিছু বলে,তাতে কী এসে যায় তার?



প্রশ্ন – ওই আদালতের ঘটনার পরে মলয়বাবু কি নিজেই জোর করে চলে গিয়েছিলেন সাতষট্টি-তে? সব সংযোগ ছিন্ন করে চলে যাওয়া?

উত্তর – হ্যাঁ... তারপর মলয় কিছু কাজ করেছিল,কিছু আজেবাজে কাজও করেছিল,যার ফলে ও আর থাকলো না,ভাবলো ওর যাতায়াতে হাংরি জেনারেশান-টা শেষ হয়ে গেছে,কিন্তু শৈলেশ্বর-রা আবার শুরু করলো। তবে শৈলেশ্বর-দের পেছনে অনেক হাত ছিলো,সহায়ক হাত বলা চলে।

প্রশ্ন – ‘ক্ষুধার্ত’-তে আপনারা লিখেছেন?

উত্তর – না। আমি কখনো লিখিনি। তবে শৈলেশ্বর,সুভাষ,বাসুদেব দাশগুপ্ত,প্রদীপ চৌধুরী – ওরা লিখেছে তো!

প্রশ্ন – হাংরি তে সুনীল শঙ্খ শক্তি এদের মানসিক সহযোগিতা ছিলো?

উত্তর – মানসিক ভাবে অনেকেই ছিলো। শঙ্খ ঘোষ কোনোকালেই ছিলেন না। উনার সঙ্গে প্রথম দিকে আমার দু-একবার যাতায়াত হয়েছিলো,সেটা সতীনাথ ভাদুড়ির সংকলন যখন আমি তৈরি করি,সেই সময়। তারপর কোনো একটা কারণে যোগাযোগ নেই,আর আমিও যাইনি। আমার এখানে সিনিয়ার-দের সঙ্গে খুব বেশি আলাপ নেই। একমাত্র আলাপ ছিলো বা পছন্দ করতাম শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়-কে। তার লেখার জন্যে। তার রাজনীতিবোধ অন্যরকম ছিলো। সুনীল দা’র সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিলো সেইসময় কয়েকবার...তারপর আর...



প্রশ্ন - আচ্ছা তখনকার দিনে যে বড়ো বড়ো পত্রিকা ছিলো,তারা হাংরি-র লেখা নিতো না কেন? জাস্ট সাহিত্য হয়নি বলে,না অশ্লীল বলে?

উত্তর – নিতো না তো তুমি কি গিয়ে জিজ্ঞেস করবে ‘কেন নেননি মশাই আমার গল্প?’ তা তো হয় না! অমনোনীত,ব্যাস! আর সবচেয়ে বড়ো কথা,পাঠাইও নি। জানতাম এটা ছাপবে না... পুরোনো সংখ্যা দেখে-টেখে... তবে হাংরির বাইরে প্রথম লেখাটা বোধহয় আমি ‘গল্প কবি’-তে দিয়েছিলুম। পরে সেই পত্রিকায় সুভাষ লেখে,বাসুদেবও লেখে। পাঠাইনি কোথাও। তখন নিজেরও আমার বিয়ে,বাড়ি,অফিস – নানা ঝামেলা চলছিলো।

প্রশ্ন –আন্দোলন চলাকালীন অফিস ছিলো? কোথায় কাজ করতেন আপনি?

উত্তর – হ্যাঁ। ইনকাম ট্যাক্স অফিসে।



প্রশ্ন – আচ্ছা,আপনার কি মনে হয়,লেখক-দের সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায় থাকা উচিৎ ?

উত্তর – সমাজ বা প্রতিষ্ঠান কি আমাদের প্রতি দায় রাখে? এই যে এত লেখা পড়ে রয়েছে,ওরা যদি আমাদের প্রতি দায়বদ্ধ,তাহলে তো ওরা আমার লেখা খোঁজ-টোজ করে ছাপতো। কেন দায়বদ্ধ হতে যাবো আমি?

প্রশ্ন – এখন তো ম্যাক্সিমাম লোক হাংরি আন্দোলন বলতে মলয়বাবুর নামই জানেন, যেহেতু উনি এখনও ফেসবুকে,ব্লগে চূড়ান্ত অ্যাক্টিভ। সেদিক দিয়ে আপনি... একটা লেখায় পড়ছিলাম,মলয় রায়চৌধুরী যখন কেন্দ্রে ছিলেন,সুবিমল বসাক প্রান্তে।*

উত্তর – ও ছিল বাইরে,আমি ছিলাম এখানে। ১৯৬৭ থেকে ও একেবারে আউট অফ বেঙ্গল। এলো পঁচাশি-তে। এই সময়টুকু আমি। মলয় কি করে হয়ে গেল? এটা বলা যায়,হাংরি জেনারেশানের তত্ত্ব মলয় সৃষ্টি করে গেছে।

-সমাপ্ত-



*“কেন্দ্রে যখন মলয় রায়চৌধুরী সগৌরবে বিরাজিত ছিলেন,তখন প্রান্তে ছিলেন সুবিমল বসাক।“ –কলিম খান ঃ সুবিমল বসাক,এক সুন্দর মানুষের কথা ( ছিটেফোঁটা – বইমেলা ২০১০, সুবিমল বসাক সংবর্ধনা সংখ্যা)

প্রবন্ধ – সুমন গুণ

শহিদদিবসের কবিতা
সুমন গুণ



বাংলা কবিতায় মণিভূষণ ভট্টাচার্যের একটি সম্ভ্রান্ত অবস্থান আছে। আমাদের ভাষায় যাঁরা শুধু স্বাভাবিকভাবে কবিতা লিখে নিজের কণ্ঠস্বর মুদ্রিত করতে পেরেছেন, গল্প-উপন্যাস নয়, কবিসম্মেলন নয়, রাইটার্স নয়, টেলিভিশন নয়, টরন্টো নয়, এমনকি সেভাবে গদ্যও নয়, শুধু কবিতা লিখে যা বলার বলে যেতে পেরেছেন, মণিভূষণ ভট্টাচার্য সেই গুটিকয় বিস্ময়ের একজন।

আমি যখন সবে লেখালেখি শুরু করছি, আশির শেষ আর নব্বইয়ের শুরুর দিকটায়, তখন মণিভূষণের আসল বইগুলো সব বেরিয়ে গেছে। বেরিয়ে গেছে ‘গান্ধিনগরে রাত্রি’র মতো দাপুটে কিন্তু মসৃণ, শাণিত আর তীব্র, প্রবল অথচ সংহত একটি বই। যত দিন যাচ্ছে, বইটির আঁচ তত বেশি করে টের পাচ্ছি আমরা। সময়ের নানা ক্ষত আর ক্ষতি নিয়ে লেখা কবিতা তো আমরা খুব কম পড়িনি বাংলায়, কিন্তু সত্তর দশকের বাংলার দহন আর বিপন্নতাকে যে-দক্ষতায় ধরেছেন মণিভূষণ ভট্টাচার্য তাঁর কবিতায়, তার মন্দ্রতার সঙ্গে তুলনীয় লেখা আমি অন্তত খুব বেশি পড়িনি। ‘গান্ধিনগরে একরাত্রি’র মতো সেই মিতবাক কবিতাটির কথা মনে করুন! কবিতাটির নামের মধ্যেই বিপুল ধিক্কার আর ব্যঙ্গ ঐতিহাসিক ব্যঞ্জনাসহ গনগন করছে। আর কবিতাটি তো হয়ে উঠেছে সেই সময়ের একটি অবধারিত প্রচ্ছদ। এত ছোটো কবিতায় যে কী করে এত বড়ো একটা প্রসঙ্গকে ছুঁয়ে দিলেন তিনি! মাত্র চারজনের একলাইন করে মন্তব্য দিয়ে একটা উদ্দাম আন্দোলন সম্পর্কে গোটা সমাজের চাহনি একনজরে দেখিয়ে দিলেন তিনি :
অধ্যাপক বলেছিল , দ্যাট্‌স্‌ র-ঙ্‌, আইন কেন তুলে নেবে হাতে?
মাস্টারের কাশি ওঠে কোথায় বিপ্লব, শুধু মরে গেল অসংখ্য হাভাতে!
উকিল সতর্ক হয়, ‘বিস্কুট নিইনি, শুধু চায়ের দামটা রাখো লিখে’।
চটকলের ছকুমিঞা ‘এবার প্যাঁদাবো শালা হারামি ও. সি-কে’
আমার মোটেই কবিতার লাইন মনে থাকে না, কিন্তু আশ্চর্য, এই চারটি লাইন আমি পুরো স্মৃতি থেকে লিখলাম। লিখতে পারলাম, তার কারণ তখন এইসব উচ্চারণ বারবার পড়তাম। তখনো সোভিয়েত-পূর্ব ইওরোপ ভাঙেনি, আদর্শ বলে একটা শব্দ তখন খুব আক্রমণ করত আমাদের, বামপন্থা নামে একটা ধারণা আমাদের সবসময় আগলে রাখত। মণিভূষণ তাই টানত আমাদের। না চাইতেই কণ্ঠস্থ হয়ে যেত এইসব লাইন:
খরায় উজাড় গ্রাম--- প্লাটফর্মে পড়ে থাকে হাজারে হাজারে
না খেয়ে মানুষ মরে---‘অপুষ্টিজনিত মৃত্যু’ লেখা হয় আনন্দবাজারে

কিংবা

কাল যে বিপ্লবী ছিল আজ সে-ই মন্ত্রী হয়, মন্ত্রীত্ব খোয়ালে হয় বহুরূপী নেতা
কাল যে ঘাতক ছিল আজ সে-ই প্রকল্প-প্রণেতা

একই কবিতায় :
ছোটো ভাই মাঝরাতে মাঝে মাঝে আসে, খেয়ে যায়--
চটকলের লোকজন গভীর উদ্বেগ নিয়ে জেনে নেয় ভাইয়ের খবর,
কেবল বেড়ার ফাঁকে হঠাৎ বুটের শব্দে মায়ের বুকের রক্ত হিম
ধুপকাঠি তৈরি করে আমাদের পাড়ার মহিম
অথবা, স্বাধীনতা দিবসের উত্তোলিত পতাকার দিকে তাকিয়ে নিরন্ন ভারতবাসীর ‘এতখানি রঙিন কাপড়’ নষ্ট হয়ে গেল বলে সেই অসহনীয় খেদোক্তি ।

ব্যঙ্গ আর কৌতুকের পরিবহন ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়ে অসাধ্য সাধন করেছেন মণিভূষণ বহু কবিতায়। রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত অসততার বিরুদ্ধে, ভন্ডামির বিরুদ্ধে, নস্টামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্রোধ অনেক সময় সরাসরি উচ্চারিত না হয়ে ব্যঙ্গ বা ধারালো কৌতুকের আশ্রয় নিয়েছে। এর ফলে তার ধার বেড়ে গেছে আরও। আর যখন সেই ক্রোধ সরাসরি উচ্ছ্রিত হয়েছে, তার উত্তাপ হয়েছে অলঙ্ঘ্য। ক্রোধ কত পবিত্র হতে পারে, বাংলা কবিতায় সুকান্ত আর মণিভূষণ ভট্টাচার্য তা বারবার চিনিয়ে দিয়েছেন। ‘দক্ষিণ সমুদ্রের গান’ বইয়ের ‘দধীচি’ কবিতায় জনৈক সরকারি আমলার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যেভাবে গর্জে উঠেছিলেন এক আমূল বিপ্লবী, তা পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয় :
কলম ছুঁড়ে দিয়ে ফর্‌ম্‌টা ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো ক’রে সেক্রেটারির
মুখে উড়িয়ে দিয়ে চিৎকার ক’রে উঠলেন ---
‘স্কাউন্ড্রেল্‌স্‌, আমাকে এভাবে ইন্‌সালট করার মানে কী?
আমি প্রাক্তন বিপ্লবী নই , এখনো বিপ্লবী’
এই কবিতাটিতে নাটকীয়তার যে-গড়ন রয়েছে, মণিভূষণের কবিতার সেটা একটা প্রখর বৈশিষ্ট্য। তাঁর তরুণ বয়সের অনেক বন্ধুই ছিলেন আদ্যোপান্ত নাটকের লোক, এটা আমি বিশেষ সূত্রে জানি। আর ষাট-সত্তর দশকে বিপ্লবী নাটকের সঙ্গে একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল বিবেকী শিল্পীদের। নাটক আর কবিতার সখ্য তাই স্বাভাবিক ছিল তখন। মণিভূষণের কবিতাকে এই নাটকীয়তা আরো পরাক্রান্ত করেছে। ‘কোনো কবিসম্মেলনে’ নামে পুরো নাটকীয় ভঙ্গিতে লেখা একটা দীর্ঘ কবিতা আছে মণিভূষণের, গোটা কবিতাটি একটুও টোল না খেয়ে বিস্ময়করভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। নাটকীয়তার দমকে মাঝে মাঝেই তৈরি হয়েছে এক-একটা বাঁক। প্রতিটি বাঁকের আঘাতে পাঠক নতুন করে সচকিত হয়ে ওঠেন। এটা ঠিক দুটো-তিনটে লাইন তুলে বোঝানো যাবে না, গোটা কবিতাটি এক নিরবচ্ছিন্ন দমকে লেখা। তবু একটা অংশ তুলছি, যেখানে এই নাটকীয়তার সর্বোচ্চ বৈচিত্র্য টের পাওয়া যাবে :
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ঔরসজাত লাবণ্যের ঘনঘটা আপনাদের চামড়ায় –
মার্কিনী মাধুর্যে বিগলিত হাড়ে-বজ্জাত ঠগচাচা এবং ঠগচাচির দল,
না হলে আপনাদের চোখের সামনে আসানসোল মেদিনীপুর দমদম প্রেসিডেন্সিতে
কেবল রক্তের দাগ, অকাতর তরুণ রক্তে কেন ভেসে যায় জেলের উঠোন---
বিশ্বাস করুন, আমি আপনাদের পটাতে চাইছি না, কোনো রকম
বিবেকের ফুসলানির মধ্যে আপনাদের মতো সরেস মালদের টানতে
চাইছিনা আমি--- কারণ ইতিহাস আপনাদের জন্য ভয়াবহ অ্যাপ্রোচ পেপার
তৈরি করেছে, সুতরাং সমস্ত লাম্পট্য বাঁটোয়ারা করে নেওয়া যাক –-
(হিস্‌সার জন্য নিজেদের মধ্যে লড়িস না গুরু, মেজোবাবু প্যাঁদাবে)।
এই নাটকীয়তার গমকে লেখা আর একটি স্মরণীয় কবিতা ‘ডানকানের মৃত্যু’। এখানেও বলার ভঙ্গির ভাঁজ পালটে পালটে এগিয়ে গেছে কবিতাটি। রূপকের অনায়াস আর তির্যক ব্যবহারে মণিভূষণের দক্ষতার সেরা নজির এই কবিতা। পেশল, রুক্ষ আর নৈর্বক্তিক ধরনটি গোটা কবিতায় সফলভাবে রক্ষা করেছেন তিনি। ‘কোনো কবিসম্মেলনে’র চেয়েও অনেক সংহতভাবে। এই কবিতাটিও এত অবিচ্ছিন্ন আর টানটান যে কোনো একটা অংশ তুলে এর জোর বোঝানো অসম্ভব। তবু কয়েকটা লাইন তুলে এই ধরনের লেখায় মণিভূষণের তুখোর দাপট টের পাওয়া যেতে পারে :
খিদেয় নেতিয়ে-পড়া কনিষ্ঠ কঙ্কালগুলো দলা পাকিয়ে
ঘুমিয়ে পড়েছে। বিরক্ত বয়স্করা ঝিমুচ্ছে। মধ্যরাত্রির এই পচনশীল
নৈঃশব্দ্যের দিকে, নিবন্ত উনুনের পাশে গরমমশলার সুদূর গন্ধের মধ্যে
হে অন্ধ অধিরাজ, আপনাকে বসিয়ে রাখবো; মনে রাখবেন, পরিবেশনের
ভার আপনাদের উপর; জানি, অসমবন্টনে আপনার কতো শ্রান্তি! তবু,
মেটের টুকরোগুলো বাচ্চারাই যেন পায়।
গন্ধের ‘সুদূর’ বিশেষণটির বহুতল সম্ভাবনা খেয়াল না করে পার পাওয়া যাবে না। শেষ লাইনটিতে এসে কথার গমক যেভাবে হঠাৎ বেঁকে গেল, তাও আমাদের মুহূর্তে সচকিত করে তোলে।

আসলে, প্রত্যক্ষভাবে সমাজপ্রবণ যে ধারা আছে বাংলা কবিতার,ভেবে দেখেছি, তার কিছু সাধারণ লক্ষণ আছে। ব্যঙ্গ বা কৌতুকের বহুগামী ঝোঁক, নানা সূত্রে ব্যবহৃত বাক্য বা মন্তব্যের প্ররোচনাময় উদ্ধৃতি, একধরণের উদ্দেশ্যমূলক নাটকীয়তা সহ আরো কয়েকটি প্রবণতা এই ধারার কবিতায় সহজেই নজরে পড়বে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় থেকে শঙ্খ ঘোষ, জয়দেব বসু পর্যন্ত সবার কথা মনে করলেই এই কথার মানে ধরা যাবে। উচ্চারণে ঘন ও স্তরবহুল নাটকীয়তার দীর্ঘ বিন্যাস মণিভূষণের মতো জয়দেবেরও বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘ কবিতার উদারতায় ইচ্ছেমতো ভাঁজ ও বক্রতা রচনা করা যায়। কথার চুড়ো বেঁধে আবার খুলে মেলে দেবার আহ্লাদ টের পাওয়া যায়।

মণিভূষণের ‘একটি শ্লোগানের জন্ম’ কবিতাটি পড়তে পড়তে আমার শঙ্খ ঘোষের ‘স্লোগান’ আর জয়দেব বসুর "মায়াকোভস্কির শেষ সাতদিন" কবিতাদুটির কথা মনে পড়ে যায়। মণিভূষণ লিখেছিলেন :
যখন পড়ি, ‘কমরেড কানু সান্যালকে জেল ভেঙে ছিনিয়ে আনুন’ ---
তখন ভাবি এরা অন্যের উপর দায়িত্ব দিয়ে
চলে গেলেন কেন? কিংবা আলকাতরা এবং ব্রাশের নৈশসংঘর্ষে
যখন দেয়ালে ফুটে ওঠে, ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’ তখন
ক্ষমতার আগে ‘রাজনৈতিক’ শব্দটা নেই বলে আমি আঁতকে উঠি এবং
খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ি...
এর পাশাপাশি শঙ্খ ঘোষের ‘শ্লোগান’ কবিতাটি মনে করুন :
এমনিভাবে থাকতে গেলে শেষ নেই শঙ্কার
মারের জবাব মার

বুকের ভিতর অন্ধকারে চমকে ওঠে হাড়
মারের জবাব মার

বাপের চোখে ঘুম ছিল না ঘুম ছিল না মার
মারের জবাব মার

কিন্তু তারও ভিতরে দাও ছন্দের ঝংকার
মারের জবাব মার
লক্ষণীয়, দুটি দেয়াললিখন প্রসঙ্গেই কবির সপ্রশ্ন অস্বস্তি রয়েছে। শঙ্খ ঘোষের কবিতাটিতে এই অস্বস্তি রূপ নিয়েছে সব্যঙ্গ অথচ নিঃশব্দ প্রত্যাখ্যানের। শ্রেণি-ঘৃণার দুটি স্লোগানই (‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’, ‘মারের জবাব মার’) একসময় বাংলাপ্লাবিত ছিল। এই প্লাবন এবং তার জোয়ারে ভেসে-যাওয়া সময়ের নানা চিহ্ন ‘স্লোগান’ কবিতাতেও ধরা পড়েছে। সেন্ট্রাল জেল কিংবা কার্জন পার্কে ঝরে যাওয়া সোনার ছেলেদের স্মৃতিকণা ঝলক দেয় ‘বুকের ভিতর অন্ধকারে চমকে ওঠে হাড়’-এর কথায়। স্মৃতির লালন আর নির্মম মৃত্যুকে একই সঙ্গে ধরে রেখেছে ‘হাড়’ শব্দটি। আর তারপরেই ‘মারের জবাব মার’ অসহায় বৈপরীত্যে চলকে ওঠে।
জয়দেবের ভাষ্য ছিল এইরকম :

'কে জানে কতদিন আমি বাস করছি
বিছানাভর্তি ছারপোকার সঙ্গে,আর
স্বপ্নে দেখছি হতাশাব্যাঞ্জক,ভীতিপ্রদ কয়েকটা শব্দ;
দেখছি - 'পার্টিলাইন' কথাটা কেটে দিয়ে লেখা হচ্ছে
'জমায়েত' আর 'মহামিছিল'।
'গণতন্ত্র' কেটে দিয়ে 'প্যানেল এবং পাল্টা প্যানেল',
'যোগ্যতা' কেটে দিয়ে - 'কালেকশান',
আর,'বিপ্লব' শব্দটা কতদিন দেখিনা...কতদিন?'
শব্দের এই বিপন্ন সংশোধনের সান্নিধ্য লক্ষ করার মতো।

‘গান্ধীনগরে রাত্রি’ বইয়ের খরতায় যে-মসৃণতা ছিল, ‘মানুষের অধিকার’ বা ‘দক্ষিণ সমুদ্রের গান’-এ তা ঈষৎ কমে এলেও কোনো কোনো কবিতায় তা আরো দ্রুত আর সাবলীল হয়ে ওঠে। ‘মানুষের অধিকার’-এর ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যকে খোলা চিঠি’ পড়লে তা বোঝা যায়। বোঝা যায় ‘দক্ষিণ সমুদ্রের গান’-এর ‘ফেরা’, ‘দধীচি’ কবিতাগুলি পড়লে। এই দাপুটে সাবলীলতার শীর্ষ ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যকে খোলা চিঠি’ পড়লে টের পাওয়া যায়। পণ্যপ্রবণ এই সময়কে আমাদের ভাষার অনেক ক্ষমতাবান কবি তাঁদের মতো করে কবিতায় বিদ্ধ করেছেন। তাঁদের নিজস্ব স্বর ও ব্যঞ্জনায় সেই সব উচ্চারণ আলাদা হয়ে উঠেছে। নিওন আলোয় আমাদের যা কিছু ব্যক্তিগত সব পণ্য হয়ে ওঠে , আমাদের মুখ ঢেকে যায় নির্মম বিজ্ঞাপনে, একথা তো আজ প্রবাদের মতো উচ্চারণ করি আমরা। মণিভূষণও লেখেন একই তথ্য, তাঁর স্বাধীন আর ভরাট ভঙ্গীতে :
এই কোটি কোটি পিছু-মোড়া-হাত-পা-বাঁধা ক্রীতদাসের বাজারে
সব কিছুই পণ্য---
এই মৌসুমী অঞ্চলে ফুল ও ফল,
ঐ বাতাসা হাতে ছুটন্ত শিশুটির চিবুকের তিল,
এই জবরদস্তি জীবনের সমস্ত লবঙ্গ ও এলাচ
ঐ রোদে পোড়া ফুটপাতে ডান হাতের আঙুলকাটা আসন্নপ্রসবা
ভিখিরি মেয়েটির চিত্রকল্প,
নিঃস্বের ন্যাকড়া কিংবা পণ্ডিতের মগজ,
এমনকী তোমার জন্মদিনও
পণ্য।
মৌসুমী ফুল, শিশুটির চিবুকের তিল, জীবনের গোপন সুগন্ধের কথা বলেই মণিভূষণ থামতে পারেন না। তাঁর মনে পড়ে যায় ভিখিরি মেয়ের কথা, আসন্নপ্রসবা কথাটি মণিভূষণ অকারণে লেখেননি। সময়ের যে-সুডৌল ভবিষ্যতের দিকে তাঁর নজর, তার ইশারা দিতে তিনি সবসময় তৎপর। এটা একটা আলাদা আলোচনার বিষয় হতে পারে যে কীভাবে মণিভূষণ সমতাময় আসন্ন সমাজের দিকে শব্দের তর্জনী তুলে ধরেন। সদ্যোজাত, লাল ডাকবাক্স, বাঁ হাত, সিন্ধুসারসের গান, বড়ো শহর, দক্ষিণ সমুদ্র, সন্ন্যাসী এবং এইরকম অনেক শব্দ মণিভূষণের কবিতায় একটি নির্দিষ্ট তাৎপর্যে লেখা হয়।

কিন্তু, আমার মনে হয়, ‘দক্ষিণ সমুদ্রের গান’-এর পরের বইগুলোতে মণিভূষণের এই তেজ, এই তারুণ্য আস্তে আস্তে শমিত হয়ে আসে। এটা তো ঠিকই যে একজন কবি সারাজীবন একই গমকে কথা বলেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, ভাবনাবদলের টানে, সচেতনতার হেরফেরে নানা বাঁকবদল ঘটে যায় লেখায়, এক পর্বের কবিতার সঙ্গে অন্য পর্যায়ের রচনার তফাৎ লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। এটা কখনো কখনো, কোনো কোনো কবির বেলায় সচেতন উদ্যোগের পরিণাম হতে পারে, কিন্তু মণিভূষণের লেখা ঠিক সেরকম কোনো উদ্যত চেষ্টার টানে পালটে গেল বলে আমার মনে হয়না। যে-কোনো কারণেই হোক, ক্রমশ, ‘প্রাচ্যের সন্ন্যাসী’ বইটি থেকেই মণিভূষণ তাঁর মোক্ষম ভঙ্গিটিকে নাছোড়ভাবে ধরে থাকলেও সেই আঁচ আর ভেতর থেকে জাগ্রত রাখতে পারলেন না। কথা এক রইল, ধরনটিও অক্ষত, শুধু শব্দ দিয়ে সেই কাজ আর করানো গেল না যা তিনি অবলীলায় করেছেন এতদিন। আর সেইজন্যেই, দেখা গেল, ব্যঙ্গ আর কৌতুকের পরিবহনও উধাও হয়ে গেল তাঁর রচনা থেকে। শব্দবিন্যাসের সক্ষম দাপট তিনি তারপরেও রক্ষা করেছেন, ভাষার কুশলী মোচড় তাঁর প্রতিটি কবিতাকেই অটুট রাখে। তারপরেও তিনি লিখেছেন এমন মহার্ঘ সব লাইন :
বড় এক গ্লাস চায়ে দু চুমুকে তৃপ্তি পায়
গুলজার একুশ শতক,
ক্রমশ তলানিটুকু শেষ করে
গিয়ারে বাঁ হাত রেখে
ডানহাতে ধরে স্টিয়ারিং,
সামনে হাজার মাইল অসহিষ্ণু দিন আর রাত্রি পড়ে আছে
চলন্ত প্রবাসে।
এখানেও বাঁ আর ডান হাতের শোচনীয় সহাবস্থান কত স্বাভাবিকভাবে সামনে আনা হল। লক্ষণীয় দিন আর রাত্রির উচ্চারিত ব্যবধানটুকুও। মণিভূষণের কবিতায় দিন আর রাতের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণভাবে আলাদা। দিন হয়ত ঘটমান বর্তমানের স্মারক, কিন্তু রাত রহস্যময় জটিলতা আর সম্ভাবনার সমাধানহীন অন্ধকারে ঢাকা।

কিন্তু এই ঘরানার কবিতার শীর্ষ তো আমরা ছুঁয়ে এসেছি ‘গান্ধিনগরে রাত্রি’ পর্বেই। তার পরের কবিতাগুলো সেই অনতিক্রমণীয় ধরনেরই সম্প্রসারণ। আমি এখনো অপেক্ষায় আছি, মণিভূষণ আবার আমাদের সেই মৌসুমী উত্তাপে ধীরে ধীরে পেকে-ওঠা লঙ্কার মতো লাল কবিতার আগ্নেয় ভূখণ্ডের দিকে নিয়ে যাবেন।

ছোটগল্প – বিবেক ভট্টাচার্য

অসমাপ্তি
বিবেক ভট্টাচার্য



(১)

আবার বাজছে ফোনটা । এই এক জ্বালাতন হয়েছে সায়ন্তনীর । বি.এ. কমপ্লিট করার সাথে সাথেই যে বাবা ওর বিয়ে নিয়ে এরকম আদাজল খেয়ে লেগে যাবে ভাবতেই পারেনি । বলা নেই কওয়া নেই একদম কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দিয়েছে পাত্র-পাত্রী বিভাগে ।

স্লিম, ফর্সা, গৃহকর্ম নিপুণা, ব্রাহ্মণ পাত্রীর জন্য সঃ চাঃ / বে সঃ চাঃ ব্রাহ্মণ পাত্র কাম্য ।

আর তারপর থেকেই সারাদিন ল্যান্ডফোনটা বেজে চলেছে । হাড়-হাভাতের দল একেবারে উঠে পড়ে লেগেছে ওকে বিয়ে করার জন্য ।

রাগে গা জ্বলে উঠেছিল সায়ন্তনীর । এত কিছু করা হয়ে গেল অথচ কেউ ওর সাথে আলোচনা পর্যন্ত করলো না । বিয়ে কি ছেলেখেলা নাকি যে রেশন দোকানে গিয়ে কার্ড সাবমিট করলাম আর পাত্র পকেটস্থ করে বাড়ি ফিরে এলাম? আর কিছু না হোক ওর নিজের পছন্দ বলেও তো কিছু একটা থাকতে পারে । বাবাকে এসব বোঝাতে যাওয়াও দায় । বোঝানোর চেষ্টা যে ও করে নি তাও না । এই তো গতকাল বাবাকে বলতেই বলল ‘ তোমাদের জেট গতির যুগের রীতিনীতি আমি বুঝিনা আর বুঝতেও চাইনা । যে যুগের আদর্শ বলে কোন বস্তু নেই তার মধ্যে বাহাদুরিও কিছু নেই । নিজের পছন্দের কিছু আমার জীবদ্দশায় করা যাবে না । তোমাকে বড় করেছি আমি বিয়েটাও আমিই দিয়ে যাবো । তারপর তোমার যা খুশি করতে পার ’।

এরপর তো আর কথা বলা যায় না । একছুটে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিয়েছিল । খায়ও নি কিছু সারাদিন, কিন্তু তাতে সুপ্রকাশ ব্যানার্জীর যে কিছু যায় আসে না তা ও ভালো করেই জানে । দিদির বিয়ের সময় দেখেছে কীভাবে ভালবাসাকে চাবকে সোজা করেছিল ওই লোকটা । কিন্তু এত সহজে হারও মানবে না ও । লাগাক চাবুক, সুনির্মলকে ছেড়ে থাকা ওর পক্ষে জাস্ট অসম্ভব ।

সেই কলেজে প্রথম আলাপ হয়েছিল সুনির্মলের সাথে । আজও সেই দিনটা মনে আছে । প্রথম কলেজ যাওয়ার সময় কত জপিয়েছিল ওই লোকটা । কলেজ যাচ্ছ পড়তে । যাবে, পড়বে বাড়ি আসবে । মাঝপথে কোন আড্ডা দেবে না আর ছেলে বন্ধুর সংখ্যা যেন হাতে গোনা যায় । বাবার মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েও নিজেকে সুনির্মলের সামনে আটকাতে পারেনি । ঝোড়ো হাওয়ার মত এসেছিল আর ওকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছিল গহন থেকে গহনে । বাবাকে নিয়ে ভয় ছিল, কিন্তু তাও একটা ঝরা পাতার মত ওর ভালোবাসায় উড়েছিল ও । বাবার কথা মেনেই চলত সবসময় । পারতপক্ষে কারুর সাথে কথা বলতো না । সুনির্মলই এগিয়ে এসে আলাপ জমিয়েছিল-

‘ এই নে ’ একটা ক্যাডবেরি এগিয়ে দিয়ে বলেছিল ‘ আজ আমার জন্মদিন, তুই তো কারুর সাথে কথা বলিস না তাই তোকেই আগে দিলাম । এই ফাঁকে বন্ধুত্বটাও হয়ে যেতে পারে’ ।

এত স্বচ্ছন্দ কথার সামনে পড়ে দিশেহারা লেগেছিল সায়ন্তনীর । খুব ভালো কবিতা লিখত ছেলেটা । ফ্রেশার্স ওয়েলকাম এর দিন একটা ছোট্ট কবিতা পড়ে শুনিয়েছিল । স্বচ্ছন্দ লেখা ও বলার কায়দায় বিভোর হয়ে শুনেছিলো সায়ন্তনী । সেই বোধহয় ভালোলাগার শুরু । তারপর নোট নেওয়া হোক বা এক্সামের সাজেশান সবেতেই সুনির্মল । ব্যাপার জানাজানি হতেও সময় লাগেনি । ক্লাসমেট থেকে টিচার সবাই জেনে গেছিল ওদের ব্যাপারে ।

সায়ন্তনীর জন্মদিনে ওকে নিয়ে লেখা একটা কবিতা গিফট করেছিল, সেটা বইয়ের তাকে গুছিয়ে রাখা আছে । মন খারাপ হলেই পড়ে । একবার-দুবার-তিনবার পড়ার পরেও আজ আর মন ভালো হল না । কীভাবে বোঝাবে ও সুনির্মলকে । আর বোঝাবেই বা কি ? নাকি এবার নিজেকেই বোঝানো দরকার । না না, ওর দিদির মত ও পারবে না সব ছেড়ে অদৃষ্টের হাতে নিজেকে ঠেলে দিতে । কিন্তু করবেই বা কি ?

(২)

-‘ দাঁড়া বাবা ঘরটা একটু ঝাড় দিয়ে দিই । বাসি ঘরে বেরোতে নেই রে, অমঙ্গল হয় ’।

-‘ উফ মা, ছাড়ো তো । এমনিই দেরি হয়ে গেছে । লেট করে গেলে আজ আর ক্লাসে ঢুকতে পারবো না, আর তোমার শরীরের অবস্থাটা দেখেছ । একটা কাজের লোক রাখতে বলছি কবে থেকে... ’ বলতে বলতে বেরিয়ে গেল সুনির্মল । ও অবশ্য জানে কাজের লোক রাখাটা ওদের মত ফ্যামিলিতে একটা বিলাসিতা, তাও আজকাল লিখে নিজের হাতখরচের টাকা উঠে আসায় প্রায়ই মাকে বলে ওই কথা ।

আজ গরমও পড়েছে, তার ওপর বাসে এত ভিড় যে দাঁড়ানোর জন্যেও যুদ্ধ করতে হচ্ছে । কোনমতে হাতটা তুলে বারবার ঘড়ি দেখছে সুনির্মল । নাহ আজ কপালে ঝাড় নির্ঘাত । সায়ন্তনীকে পাক্কা এগারোটায় টাইম দেওয়া আছে আর এখনই প্রায় পৌনে এগারোটা বাজে । তার ওপর কলকাতার বাস! শালা প্রত্যেকটা সিগন্যালে না দাঁড়ালে এর পেটের ভাত হজম হবে না । দুটো কবিতা নিয়ে এসেছে সায়ন্তনীকে দেবে বলে । যেকোনো ফাইন কমাতে ওগুলোই ওকে বরাবর হেল্প করে ।

বাস থেকে যখন হেদুয়ার মোড়ে নামলো তখন অলরেডি সাড়ে এগারোটা বাজে । নিজের সেলফোনটা থেকে নাম্বার ডায়াল করে কানে চেপে ধরতেই ‘ দ্য নাম্বার ইউ আর ডায়ালিং ইজ কারেন্টলি সুইচড অফ, প্লিস ট্রাই আফটার সামটাইম ’। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে আবার ডায়াল করতেই আবার সেই এক কথা । ব্যাপার কি ! ও তো কখনো ফোন অফ রাখে না । আরও দু-তিন বার ফোন করেছিল কিন্তু লাইন পায়নি । মনের ভেতর হাজার রকম চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো । সারাটা রাস্তা ফোন করতে করতে এসেছে । বাড়ি ফিরে মুখে দুটো গুঁজেই নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল । যে মেয়ে কখনই ফোন বন্ধ করে না তার ফোন আজ এতক্ষণ বন্ধ ! বলা নেই কওয়া নেই, দেখা করার কথা ছিল তাও এলো না, ব্যাপার কি । যেভাবেই হোক যোগাযোগ করতেই হবে । কিন্তু কীভাবে করবে কিছুতেই ভেবে পেল না । ওরা একসাথে পড়ে না, সাবজেক্টও আলাদা, ও আর্কিওলজি নিয়ে পড়ছে আর সায়ন্তনী বাংলা নিয়ে । নাহলে হয়ত নোটের ব্যাপারে বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসা যেত । মাঝে এক বছর শুধু একসাথে বাংলা অনার্স নিয়ে পড়েছিল, তাও একবছরের বেশি মন টেকেনি বলে ছেড়ে দিয়েছে । লাভের মধ্যে শুধু সম্পর্কটা তৈরি হয়ে গেছিল । ওদের সম্পর্ক ওর বন্ধুদের ভালো লাগেনি । ওরা সবসময় বলতো ‘ কেন বাপু বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে যাচ্ছিস ? ওরা কত বড়লোক তোর মত ভ্যাগাবন্ডকে পাত্তাই দেবে না দেখিস । বেকার হেদিয়ে মরবি আর দারু খেয়ে দেবদাস হবি ’। তারপরও আশা হারায় নি, মনের কথা গোপন করার থেকে বলে ফেলা অনেক ভালো । মনটা অনেক হালকা থাকে ।

সায়ন্তনী ওর বাবাকে নিয়ে খুব ভয় পেত । বলতো খুব সাবধানে যোগাযোগ রাখতে, সারাদিন এসএমএস করতে না। বাবা জানতে পারলে খুব প্রবলেম হবে । ওর দিদিকে নাকি জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল লোকটা । বিয়ে করতে

রাজী করানোর জন্য নিজের মেয়েকে চাবুক দিয়ে মেরেছিল । ওর দিদির কথা ভেবে খুব খারাপ লাগত সুনির্মলের, আরও খারাপ লাগত সবসময় যোগাযোগ রাখতে পারবে না ভেবে । তাও কিছু করার ছিল না, নিজের পায়ে না দাঁড়ানো অবধি সাবধানে থাকাই ভালো । আর ওর জন্য সায়ন্তনী গায়ে আঘাত লাগলে ও নিজেকে ক্ষমা করতে পারত না কোনোদিন । তাহলে কি ওর বাবাই...... নাহ্‌, যেভাবেই হোক খোজ একটা নিতেই হবে ।

(৩)

শুধু ফোনে যে ঝামেলা মেটার নয় সেটা আগেই বুঝলেও এত তাড়াতাড়ি পরের আঘাত আসবে ভাবেনি ও । বুঝলো যেদিন সকালে মা বলল তাড়াতাড়ি উঠে রেডি হয়ে নে । তোকে দেখতে ছেলের বাড়ির থেকে লোক আসবে । মাথা ঝিমঝিম করে উঠেছিল সায়ন্তনীর । ছেলের বাড়ির লোক মানে ? কোন ছেলে ? কিসের লোক ? আজ কিছুতেই বাড়িতে থাকা সম্ভব না, আজ যে ওর সুনির্মলের সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা আছে ।

- ‘ এগুলো কি ঠিক হচ্ছে মা ?’

- ‘ আমি কি জানি । আমায় কেন বলছিস । যা বলার তোর বাবাকে গিয়ে বল ’।

- ‘ হ্যাঁ, বলবই তো । আর শুধু বাবাকে কেন থানাতেও বলব । একটা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে এভাবে বিয়ে দেওয়া যায় না এটা সুপ্রকাশ ব্যানার্জীর জানা দরকার ’।

তার আগে দরকার সুনির্মলকে ব্যাপারটা জানানো । আজকে যে দেখা করা যাবে না সেটা জানাতে হবে । সবেমাত্র ফোনটা করতে যাচ্ছিল এমন সময় ওর বাবা ঘরে ঢুকে হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল । বাবার হাতে সেদিনের চাবুকটা উঁকি দিচ্ছিল ।

- ‘ তোমাকে যেটুকু করতে বলা হয়েছে তার একচুলও যেন এদিক ওদিক না হয় । বেয়াদবি করলে মেরে তোমার চামড়া ছাড়িয়ে নেব মনে রেখো । যাও রেডি হয়ে নাও লাখ কথা না হলে বিয়ে হয় না, এরা তো শুধু দেখতে আসছে । আপত্তিটা কোথায় তোমার ?’

- ‘ তুমি তো জানো আমি একজনকে......’

- ‘ ও দ্যাট ব্লাডি রাস্কেল, আমার কথামত না চললে ওটাকে মেরে পুঁতে দেব কেউ ট্রেস করতেও পারবে না । ওর ভালো চাও তো ডু ইট আর্লি ’ বলেই বেড়িয়ে গেছিল লোকটা ।

ওই লোকটাকে বাবা ভাবতে ঘেন্না লাগছিলো এবার । কিছুতেই ও বসবে না ওখানে । দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল । কীভাবে এই মৃত্যুপুরী থেকে বেরবে ? জানে না ও, কেউ জানে না । পালাতে হবে ওকে, যেভাবে হোক পালাতেই হবে । যেভাবেই হোক । আর কিছু না হোক একটা ব্লেড ঠিক খুজে পাবে ঘরে । তারপর উচিৎ শিক্ষা হবে লোকটার ।

কাজটা খুব সাবধানে করতে হবে । হাতে লেখা সুনির্মলের ‘ এস ’ টায় যেন আঁচড় না লাগে । এইসময় অন্তত ওকে ব্যাথা দিয়ে যাবে না সায়ন্তনী, কিছুতেই না ।

গল্প – শুভেন্দু ধাড়া

কালপুরুষ
শুভেন্দু ধাড়া



( ১ )

গত তিন বছরে এই শহর কিছুই বদলায়নি তেমন । শুধু একটা বদলের হাওয়া দলা পাকাচ্ছে সারা শহর জুড়ে । আলিপুর থেকে তেঘরিয়া পর্যন্ত বাসে ফিরতে ফিরতে কত জায়গায় এই সেই বদলের স্লোগান দিয়েছে প্রতিটা মোড় তা ঠিক মনে পড়ল না । কিন্তু আদৌ হবে কিনা তা জানা নেই জয়দীপের । পঁচাত্তরে জন্ম হয়েছিল বলেই কি কমরেড হওয়ার সাধ জেগেছিল কলেজে? সেই আগুনের আঁচ কি তার রক্তে ঢুকিয়ে দিয়েছিল সময়? না কি সেও কিছু বদলের স্বপ্ন দেখেছিল আজকের বাতাসের মত ? না হলে কেন মিছি মিছি কলেজ লাইফে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া? মাঝে মাঝে ভাবত নিজে নিজেই কিন্তু সদুত্তর পায়নি কোনও দিন।

আর তাছাড়া আজ সে কোনও বদলের স্বপ্ন দেখে না । লোহার বেড়া ধরে স্বপ্ন দেখা বেমানান ছিল যে ! কমরেডের পোশাকটা তার দল কেড়ে নিয়েছে আগেই। মাঝে তিনটা বছর ! অনেকটা সময় । কিভাবে কেটেছে তা সে নিজে ছাড়া কেউ জানে না । জানার কথাও নয়। আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যায়, এটা যে শুধু জানে আর যার আগুনে হাত পুড়ে , দুজনের জানার কিংবা বোঝার মাঝে কিছু ফারাক থাকেই যদিও এখন সেটা অতীত ।

আজকেই সে সেই অতীতকে ছেড়ে পুনরায় ফিরছে ঘরে । কিন্তু কেন যে পরমা তাকে আনতে আসেনি সেটা কিছুটা হলেও ভাবাল । ভাবার কারণ ও আছে। গত চার মাস হল পরমার কোনও খবর নেই, কোনও দেখা সাক্ষাত নেই । অথচ মাসে এক দুইবার দেখা করতে আসত । বৃদ্ধ মা আসতে না পারলেও পরমা আসত খোঁজ নিতে ।

অনেকটা ভাঙ্গন বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জয়দীপের জীবনে পরমার মুখটাই ছিল শেষ দীপ। ফলে কিছু দুশ্চিন্তা আগে থেকেই ছিল না এমন নয়, তবু গেট থেকে বেরিয়ে অন্তত পরমাকে দেখতে চেয়েছিল তার চোখ । বিয়ের পাঁচ মাসের মাথায় ঘটনাটা ঘটলেও জয়দীপের আগের মতই আজও প্রেম পরমার প্রতি । ব্যস্ত শহরবাসীর ভিড় কাটিয়ে সামনের রাস্তায় দুরন্ত বেগে ছুটে চলছিল সারি সারি ছোট গাড়ি । অনেক মুখ হেঁটে যাচ্ছিল ফুটপাত বরাবর আপন আপন গন্তব্যে কিন্তু পরমাকে দেখা যায়নি ।

বাস থেকে নামল লোকনাথ মন্দিরের সামনে । ডান দিকের গলিতে ঢুকতেই রামের চায়ের দোকান । এই এলাকায় তাকে সবাই রাম দা বলেই চেনে এবং তার দোকানের চা বেশ ফেমাস । তাই ভর দুপুরেও বেশ ভিড় হয় । এখানে আগে সন্ধ্যায় সকালে চা আর সিগারেট চলত। এতক্ষণে একটা পরিচিত মুখ দেখে মনে একটা অদ্ভুত ভালোলাগা খেলে গেল তার । অনেক দিনের খিদে ! কম নয় । সামনের বেঞ্চটায় বসে ঠিক আগের মতই হাঁক দিয়ে বলল – রাম দা , চা দাও তো এক খানি ।

আগে হলে রামকে এক হাঁকেই পাওয়া যেত। মাঝে একটা লম্বা গ্যাপ, ফলে কিন্তু আজ তার আওয়াজ রামের কান ঘেঁসে বেরিয়ে গেল । রাম অন্য ভিড় সামলাতে ব্যস্ত ছিল। ফলে আবার হাঁক দিল – রাম দা, একটা চা ।

এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল রাম । কিছুটা অবাক হল, আবার কিছুটা আনন্দিতও হল জয়দীপকে দেখে । আসলে এই ছেলেটার সাথে তার একটা অজানা সখ্যতা ছিল। সেই অনেক বছর আগে থেকে, যেটা কিন্তু কোনও মতেই রাজনৈতিক নয়, মনের ভেতর থেকে। রামের খেটে খাওয়া দিন গুজরানে কোন দলের তেমন কোনও ভূমিকা নেই। আসলে রাখেনি সে সচেতন ভাবেই, আর এই জয়দীপ যখন চা খেতে খেতে নানা রাজনৈতিক কথা বার্তা বলত, তখন রাম শুনত । বোধ হয় ছোট বেলায় পড়তে না পারার বা কাল মার্ক্সকে না পড়ার খিদেটা মিটিয়ে নিত এর কাছ থেকেই । জয়দীপ এলাকার যুব নেতা , তবে মাথা বিকিয়ে দেওয়া নেতা নয়। মানুষের বিপদে আপদে পাওয়া যেত খুব সহজে তাই ভালো ছেলে বলেই পরিচিত ছিল সে । কিন্তু চক্রে ফেঁসে গেলে পরিচয় মুঝে যেতে বেশি সময় লাগে না । তবুও রামে’র মনে জয়দীপ আছে আগের মতই। কেননা অন্যান্য অনেকের মতই সেও জানে ছেলেটাকে ফাঁসানো হয়েছিল । সে কিছুটা চমকে ওঠে বলল

- আরে ! জয়... কবে ছাড়া পেলি?

- এইতো আজই । এখুনি বাস থেকে নামলাম । তুমি ভালো আছো তো ?

- আমার কথা থাক । তুই বল ? তুই কেমন আছিস?

কথাটা বলেই কিছুটা একটু থমকাল রাম । জেলে কেউ কি ভালো থাকে? থাকতে পারে? তাই চায়ের কাপটা জয়দীপের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে কথা ঘুরিয়ে বলল – ছাড় এই সব । তুই চা নে । আমি দোকান বন্ধ করব এবার । তোর বৌদিকে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে ।

- কেন? কি হয়েছে বৌদির ।

- সে বলব ক্ষণ- দাঁড়া। দোকান বন্ধ করি । তারপর যেতে যেতে কথা হবে ।

রাম অন্যান্য চার পাঁচজন ক্রেতাদের চা দিয়ে দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করার আগেই জয়দীপ চা শেষ করল। তারপর দুজনে হাঁটতে থাকল লোকনাথ মন্দিরের পাশ দিয়েই। এই রাস্তায় কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গেলেই রামের বাড়ি, আসলে যেটা ভাড়া বাড়ি । মানুষটা মালদার লোক। গত প্রায় দশ বছর এই লোকনাথ মন্দিরের মোড়ে ব্যবসা করে এই শহরে একটা আস্ত সংসার চালাচ্ছে । ঠাকুর ভক্ত লোক, রাম আগে জয়দীপকে প্রায়ই বলত, দেবতা দয়ালু হয়। তারই দয়ায় নাকি ওর ব্যবসা চলছে এবং তাই প্রায়ই লোকনাথ মন্দিরে পূজো দেয় রাম । লোকনাথ মন্দির দেখেই কথাগুলো মনে পড়ে গেল জয়দীপের , এই মন্দিরে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ জন আসে। পূজো দেয়। সে ও কখনো সখনো পূজো দিয়েছে । কিন্তু আজ তার এর মনে প্রশ্নটা না চাইতেও উকি মারল, আজকের দিনে দেবতা কে? নেতা’রা কি নয়? নেতারা চাইলেই তোমার অনেক কিছু হবে, নইলে কিছুই নয়, উলটে যা আছে তাও চলে যাবে। নেতৃত্ব থেকে দেবত্ব কতদূর ? মনে হল তার । কিন্তু এইরকম কোনও প্রশ্ন করল না সে । পাশে হাঁটতে হাঁটতে শুধু জিগ্যেস করল -

- কি হয়েছে বৌদির ? বললে না তো !

- আরে, তেমন কিছু না। জ্বর হয়েছে কাল থেকে । একটু আগে ফোন করেছিল । মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে বলল, তাই মনে হল ডক্টর এর কাছে নিয়ে যাই, এই আর কি । তুই এসব বাদ দে , তোর কথা বল , তুই এইবার কি করবি? কিছু ভেবেছিস ? মানে কিছু প্লানিং ...।

- না, তেমন কিছু ভাবিনি , দেখি কি করি ! তবে রাজনীতি আর করব না, এটা নিশ্চিত ।

- আচ্ছা, তোকে একটা কথা জিগ্যেস করব ?

- এমন করে বলছ কেন? কতদিন পরে তোমার সাথে দেখা হল। বলো কি বলবে ।

- আর্মসগুলো আসলে কে এনেছিল বলত ? তুই যে এই সব করিস নি, তা আমি অন্তত জানি। কিন্তু তুই কি জানতিস কিছু?

- না, জানতাম না, তবে আন্দাজ করেছিলাম, যেদিন বাক্সটা নিয়ে তরুনদা আমার বাড়িতে এসেছিল, সেদিন আমি জিগ্যেস করেছিলাম, কি আছে এতে? ওর জবাব কিছু অসংলগ্ন লেগেছিল, তার উপর আমাকে ওটা লুকিয়ে রাখতে বলল এবং যতদূর মনে পড়ে তার কয়েকদিন আগেই পার্টির মিটিং এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল আর্মস আনার । বিরোধী আওয়াজ বন্ধ করতে এর চেয়ে ভালো কিছু নেই, বলেছিল সুবোধ বাবু । আমি জোর আপত্তি করেছিলাম, আর বোধ হয় তারই মূল্য চুকাতে হল আমাকেই ।

- তুই বাক্সটা খুলে দেখলি না কেন ?

- আরে! আমি খুলব কি করে ? চাবি তো ওই নিজের কাছে রেখেছিল।

- ছাড় , যা হওয়ার হয়ে গেছে । আবার নতুন করে শুরু কর। আর কি করছিস পারলে জানাস আমায়, যদি কিছু হেল্প করতে পারি করব ।

হাঁটতে হাঁটতে রাম তার ঘরের সামনের গলিটায় পৌঁছে গেলে জয়দীপকে আবার দোকানে আসার আমন্ত্রণ দিয়ে চলে গেল। জয়দীপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার পথের দিকে। আশ্চর্য লাগল তার এই পৃথিবীকে। যাদের সামর্থ্য কম তারা তবু অসময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা রাখে । আর যাদের সামর্থ্য আছে তারা চুপ থাকে কেমন তা সে আগেই দেখেছিল । কেউ তাকে বাঁচাতে আসেনি । সেই কলেজ লাইফ থেকে পার্টির সেবা করা বা মার্ক্সবাদ নিয়ে তুমুল ভাষণ এর ফল হিসেবে পার্টিই তাকে মারলে কেইবা বাঁচাতে পারত ?

আজও স্পষ্ট মনে আছে সেই দিন গুলো । পার্টির নানা ভুল ভাল কার্যকলাপে এই অঞ্চলে বিরোধিতা বাড়ছিল ফলে ঘন ঘন মিটিং ডাকা হত। কোন বারে তেমন কিছু বলেনি দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে কিন্তু যেবারে বন্দুক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল দল, রাজারহাট- নিউ টাউনের মস্তান টোটনকে অস্ত্র জোগাড় করতে বলল দলিয় নেতৃত্ব , সেবারে আর চুপ থাকতে পারল না । এমনিতেই এই সব লোকদের নিয়ে মিটিং হচ্ছে দেখে মেজাজটা বিগড়েই ছিল তার । জয়দীপ বলেছিল

- স্যার, এটা কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ।

দোর্দণ্ড প্রতাপ নেতা সুবোধ সামন্ত ভাবতে পারেননি যে, তার হাতে গড়া কর্মি তার ভুল ঠিক ধরবে। এই রাজারহাট এলাকায় এমন কেউ নেই যে তাকে কোনও প্রশ্ন করে । বছর বছর জেতা নেতা সে, প্রমোটার রাজ , আর বেনিয়মের বাড়ি যত, তার যে মূল কারিগর, সেই রাজার হাট পুরসভা, এমন কি ইদানীং জন্ম নেওয়া নতুন মস্তান টোটন, সবই চলত এনার অঙ্গুলি হেলনে । মান্য গণ্য ব্যক্তি। সেটা ভয়ে না শ্রদ্ধায় তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল জয়দীপের । সেই সুবোধ বাবু চশমাটা খুলে রুমালে মুছতে মুছতে বলেছিল -

- কোনটা ভুল কোনটা ঠিক তা বিচার করার কথা তোমার নয় জয়দীপ , সেটা দল ভাববে । তাছাড়া প্রশাসনের মত শক্তি হাতে থাকতেও যদি কাজে না লাগাই , সেটা কিন্তু রাজনীতির ইতিহাসে বোকামি হবে ।

- তাই বলে এই সব বন্দুক বাজি না করলেই নয় ?

হা হা হা করে হেসে উঠেছিল সুবোধ বাবু, অট্টহাসির সুরে বলেছিল – তুমি এখনও বাচ্চা আছো । তা তুমিই বলো , বন্দুক ছাড়া আর কি আছে শক্তিশালী? তোমাদের ভাষণ ?



প্রচণ্ড কথা কাটা কাটিতে খুব উত্তপ্ত ছিল সেদিনের সভা । অয়ন, কুণাল ও আরও দুই এক জন ছিল জয়দীপের দলে , বিপক্ষ ছিল খুব ভারী । তাই ভারী গলায় শেষমেশ দলের মধ্যে কাউকে চেঁচিয়ে বলতে শুনেছিল – বের করে দে সব কটা মাদার ড্যাশ কে । শালারা যে পাতে খায়, সে পাতেই থুতু ফেলে । অবশ্য তেমন কিছুই হয়নি কেননা তার আগেই নিজ থেকেই বেরিয়ে এসেছিল সভা ছেড়ে ।



( ২ )

বাকি পথটুকু একা হাঁটতে হাঁটতে এই সব ভাবছিল সে । তার পর এক সময় ঘরে পৌঁছে গেল । পৈত্রিক বাড়ি। বাবা মারা যাওয়ার সময় বিশেষ কিছুই রেখে যায়নি। সামান্য স্কুল মাস্টার ছিলেন। কোনও মতে এই বাড়িটুকুই তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাও এই শহরে একটা বাড়ি তৈরিও কম কথা নয়। আজকাল যা জমির দাম! তাতে জমি কিনে বাড়ি করা মধ্যবিত্তদের পক্ষে দুঃসাধ্য ব্যাপার। দোতলা বাড়িটির নিচের তলায় নিজেরা থাকে, উপরটা ভাড়ায় দেওয়া আছে। সেই ভাড়াটুকুই কিন্তু জয়দীপের আয়ের একটা উৎস । পুরো তলাটা ভাড়া বাবদ মাসে বারো হাজার টাকা আসে । আর তার মায়ের পেনসন। দুই মিলে মোটামুটি তাদের চলে যেত মা ও ছেলের সংসার। কোনও অসুবিধা হত না কিন্তু বিয়ের পর কিছুটা ভাবতে বাধ্য হয়েছিল জয়দীপ , কিছু একটা করার জন্য। একটা চাকরি । ইংলিশে এম এ পাশ । ফলে কিছুটা আশা সে করতেই পারে। করেও ছিল । কিন্তু মানুষের সেবার ভুত মাথার ভেতরে , তার উপর দলের অবস্থাও বিগড়ে থাকায় তেমন কিছুই হচ্ছিল না। তবু আশা ছিল অপার ।

নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা থমকাল সে। রাস্তার ধারেই বাড়ি । সামনে গ্রিল দেওয়া গেট, তারপর কিছুটা ফাঁকা জায়গা । সেখানে বেশ ঘাস জন্মেছে দেখল সে, আর একটি অজানা বয়স্ক মেয়ে সেই ঘাস পরিষ্কার করছে । কে মেয়েটা? চিনতে চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কিছু মনে করতে পারল না, যা থেকে সে মেয়েটাকে চিনতে পারে । তবে কে মেয়েটি ? বুকের মধ্যে অজানা একটা ভয় খেলে গেল মুহূর্তে ।

আলতো করে গ্রিলের গেটটা খুলে ভেতরে এলো। তাকে ভেতরে আসতে দেখে মেয়েটি অবাক হয়ে তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর বলল – কাকে চাই?

কিছুই বুঝতে পারল না জয়দীপ । তার নিজের ঘরে তাকে অন্য কেউ প্রশ্ন করছে –কাকে চাই? রাগ হল খুব তার। কিন্তু বাইরে শান্ত ভাবে সে উত্তর করল – আমি জয়দীপ। এই বাড়ির ছেলে । আপনি কে ?

মেয়েটির চোখে মুখে অবিশ্বাসের ছায়া স্পষ্ট দেখতে পেল সে । কিন্তু কিভাবে সে বিশ্বাস দেবে ? পরমাই বা কোথায়? কিংবা ইনিই বা কে? অনেক প্রশ্ন ভিড় করল তার বুকে । ততক্ষণে মেয়েটি যেন একপ্রকার দৌড়ে ভেতরে চলে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দেখতে পেল মেয়েটি তার মাকে সাথে নিয়ে বাইরে এসেছে।

হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সে । ওদিকে অনেক দিন পর ছেলেকে দেখতে পেয়ে কেঁদে ফেলল তার মা। সাথে মেয়েটিকেও কিছুটা যেন আশ্বস্ত দেখাল ।

ভেতরে গেল সবাই। তিনটে ঘর । মায়ের, নিজের ও একটা অতিথির ঘর । মাঝে ডাইনিং । আজ যেন তার নিজের ঘরও অনেক অচেনা লাগছে । সময় কি তবে ধুলো বয়ে নিয়ে বেড়ায় ? ধীরে ধীরে জমা করে সব ছবিতে! আবছা হয় ছবি ! এই ডাইনিং এ বসেই কত মিটিং হত পার্টির । তরুন দা, কুণাল এরা আসত। এলেই নানা গল্প গুজবে আড্ডায় এই ডাইনিং হলটা গম গম করত । জয়দীপের মাকে সবাই কাকিমা বলে ডাকত, তবু কিভাবে যে তরুনদা’রা তাকে ফাঁসাল, সেটা ভাবতে গিয়েই মাথাটা আরও একবার ঝিম ঝিম করল। সেখানেই বসল জয়দীপ এবং মায়ের সাথে নানা জমানো কথা বার্তার মাঝে সে বলল -

- ইনি কে মা? মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল সে ।

- ও এক অভাগী। ওকে রেখেছি, ঘরটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগত না হলে ।

জয়দীপ বুঝতে পারল তার মা কাজের মেয়ে রেখেছে, কিন্তু কাজের মেয়ে ভাবতে কিংবা বলতে কোথাও সংকোচ বোধ করছে ।

- কোথায় বাড়ি? জানতে চাইল সে তার মায়ের কাছে ।

- উপরে যে ভাড়াটিয়া আছে, তাদের গ্রামের মেয়ে। বেশ ভাল মেয়ে। তুই দিদি বলে ডাকতে পারিস একে । জয়দীপের মা বলল।

- সে না হয় বুঝলাম মা, কিন্তু পরমা কোথায় ? তাকে দেখছি না কেন?

ছেলে ফিরে আসার খুশিতে উজ্জ্বল উনষাট বছরের মুখটা যেন থমকে গেল । যদিও তিনি জানতেন কিছুদিনের মধ্যেই এসবের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। পরমা যে তাদের সংসার ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে সেটা একদিন তাকেই যে জানাতে হবে তা বিলক্ষণ জানত । তবু সচেতন ভাবে আজকেই না বললে চলত। বলে দিলেই হত যে , সে বাপের বাড়ি ঘুরতে গেছে। কিন্তু তা করলেও যে আরও প্রশ্ন আসবে। সে যে আজ ছাড়া পেতে চলেছে, তা পরমা জানে, তবু কেন সে এলো না বাড়ি? এই প্রশ্নও আসত । তাই সে সবে না গিয়ে কিছুটা পাংশু মুখে সে বলল-

- বৌমা গত চার মাস হল, বাপের বাড়িতে । ফোন করেছিল মাঝে একবার , আর আসবে না বলেছে । বলেই চুপ হয়ে গেলেন তিনি ।

যেন আকাশ থেকে পড়ল জয়দীপ।

- কেন? কি এমন হল যে পরমা চলে গেল । কিছুটা বিস্ময়ের সুরে বলল জয়দীপ ।

- কিছুই হয়নি। ঘরে বসে বসে মন খারাপ করত, আমিই বললাম, বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে, গেল । কিন্তু আর এলো না।

এতক্ষণ সেই অজানা মেয়েটি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল তার মায়ের চেয়ারের পাশে । এবার সে কথা বলল – জয় ভাই, পরমা অন্য কাউকে পছন্দ করেছে বোধ হয়। পছন্দ করেছে কিনা জানি না, তবে পরমা আবার বিয়ে করছে এবং তোমার কাছে ডিভোর্স চেয়েছে। তুমি ফিরলেই সে সব হওয়ার কথা ছিল ।

কিছুটা অবাক হল জয়দীপ , বলল – তোমরা মজা করছ না তো? সিরিয়াস বল । কিছুটা উত্তেজিতও লাগল তাকে ।

- না, মজা করছি না ভাই । তোমার মাকে বলতে পারেনি বলে ফোনে আমাকে বলেছিল সব ।

এসব কি সত্যি শুনছে সে? না কি কোনও দুঃস্বপ্ন ! না, দুঃস্বপ্ন নয়। কিছু যে একটা ঘটেছে তা জেলে বসেই ভেবেছিল। না হলে পরমা শেষের দিকে কেন তাকে আর দেখতে গেল না ? কিছুক্ষণ থ মেরে বসে রইল জয়দীপ। তারপর মাকে বলল – মা, আমি একটু আসছি ।

- কেনরে? কোথায় যাবি এতবেলা? শোন, পাগলামো করিস না। আজকেই এলি তো। দুদিন বাদে না হয় যাস...!

- না, মা। আমাকে জানতে হবে কেন পরমা এসব করল আমার সাথে ।

মাথাটা তার বন বন করে ঘুরছে । কেন? কি দোষ সে করেছে ? এসবের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই । সন্ধ্যে প্রায় হয় হয় তবু সে উঠে গেল চেয়ার ছেড়ে , বাইরে, বাইর থেকে রাস্তায়।



আবারও এক মায়ের চোখে জল এলো । চেয়ারে চুপ মেরে বসে বসে নিজের ভাগ্যের দোষ খুঁজে বেড়াতে থাকল জয়দীপের মা। ভাগ্যই তো। নইলে কেন তার ছেলেটা অপরাধ না করেও জেলে গেল? মানুষের জন্য কি করেনি তার ছেলে? করেছে । অনেক কিছু করেছে। নিজেকে নিয়ে কখনো তেমন করে কিছু ভাবেনি যার কারণ তার মমতাময়ী মন মাঝে মাঝে ক্ষোভে ফেটে পড়লেও আবার কখনো মনে মনে খুশিও হত ।

স্বামীকে হারিয়েছে প্রায় সাত বছর হতে চলল। হার্ট এটাক, অন্যান্যর বেলায় তবু সুযোগ দেয় ভগবান, কিন্তু তার স্বামীর বেলায় কোনও সুযোগ দেয়নি। এমনকি কোনও ট্রিটমেন্টও নিতে দেয়নি মানুষটাকে । দুপুরে শরীর খারাপ লাগছে বলে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল। রাস্তায়ই পথ ফুরিয়ে গেল । তারপর নিজের একাকীত্বের এই সাত বছরের চারটা বছর একমাত্র সন্তান জয়দীপই যে তার বেঁচে থাকার সোপান, তা সে ছেলেকে বোঝাবে কি করে? কিংবা এই যে তিনটা বছর ছেলের মুখ না দেখেই তাকে কাটাতে হল তার জন্যও কি তার কপাল দায়ী নয় ? তার উপর পরমাও দূরে সরে গেল । দিনগুলো যেন শুধু তার পরীক্ষা নিচ্ছে একে একে । এর শেষ কোথায়?

চোখের কোন দিয়ে নীরবে জল বয়ে যেতে লাগল যা তার পেছনে চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্য বয়স্ক মহিলাটি দেখতেও পেল না। সে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে ছিল সদর দরজার দিকে যেখান দিয়ে এই সবে বেরিয়ে গেল জয়দীপ ।



( ৩ )

- তাহলে এটাই তোমার শেষ সিদ্ধান্ত ?

- হ্যাঁ, আমার আর বেশি কিছু করার নেই। আমি বাবার সিদ্ধান্তের বিপরীতে যেতে পারব না। বাবা , মা , ভাই , সবাই বলছে এই সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে যেতে ।

- আর তুমি? তুমি কি বলছ ?

- আমারও তাই মনে হয় । লোকে কত কথা বলে, বলে তোর স্বামী একটা দুষ্কৃতি । আরও কত কি বলে । এই সব থেকে বেরুতে হবে আমায় ।

- পরমা, তুমি তো অন্তত জানো, আমি কিছু করিনি । সবটাই রাজনৈতিক গেম ছিল ।

- তাহলে রাজনীতি করতে কেন? কতবার তোমায় বলেছিলাম, ছেড়ে দাও এসব, চাকরি খোঁজ একটা ! কতবার ?

- পরমা, রাজনীতি একটা অর্গানাইজেশন, এর উপর ডিপেন্ড করে মানুষের সামাজিক, অর্থ নৈতিক মুক্তি । এটাকে বাদ দিয়ে কিছু হয় না পরমা, কিছু হয় না । বাদ দিতে হলে সুবোধ বাবুদের মত লোকদের বাদ দিতে হয় । কিন্তু তাও সম্ভব নয় এই বিচিত্র সমাজে ।

- থাক। ওসব আমাকে শুনিও না আর , অনেক শুনেছি । আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই ওসবে, তুমি তোমার জীবন নিয়ে থাকো, আমি আমার জীবন নিয়ে ...

- এটাই তোমার শেষ কথা? ভেবে বলছ তো ?

- হ্যাঁ , অনেক ভেবেই বলছি।

- আর, যদি আমি তা না হতে দিই?

- তুমি কিছুই করতে পারবে না, তোমার কাছে এখন কিছু নেই, নিজের পার্টিও নেই, যুব নেতা তমকাও নেই। কিচ্ছু নেই। পারবে না তুমি কিছু করতে ।

করতে পারা বা না পারাটা বড় কথা নয় জয়দীপের কাছে। বড় কথা হল পরমার চাওয়া । কালকে সন্ধ্যায় যখন দেখা করতে গিয়েছিল তখন পরমার বাবা দেখা করতে দেননি। বলেছিল পরদিন সকালে আসতে । রাগে যন্ত্রণায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল । ফলে একটা রাত নিদ্রাহীন কাটিয়েই আবার সকাল বেলায় বেরিয়ে পড়েছিল জোড়া মন্দিরের উদ্দেশ্যে । ভি আই পি রোডের ঠিক ওপাশেই একটা শুরু গলি । তা দিয়ে কিছুটা সামনে এগোলেই যে শান্তি ভবন সেটাই পরমার বাড়ি । তার মায়ের নামে বাড়িটির নাম, বাড়িটির নিচের তলায় ভুসিমাল দোকান পরমাদের , আর উপরে নিজেরা থাকে ।

প্রায় সকাল দশটায় পৌঁছেছিল জয়দীপ । ছিল আধ ঘণ্টা মত । একবার জেল খাটা মানে জীবন কত খাটো হয়ে যায় সাধারণ মানুষের তা বুঝল জয়দীপ । জামাই, কিন্তু জামাই নয়। স্বামী, কিন্তু স্বামী নয় । সব কিছু কেমন মূল্যহীন হয়ে গেছে তার জন্য । কোন কদর বা কোন খাতির নেই , শুধু মানবিক কিছু সৌজন্য বোধ , অবশিষ্ট কিংবা উচ্ছিষ্ট । সেটুকু নিয়েই কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পর পরমাকে বিদায় জানিয়ে নেমে এলো পথে ।

মনে মনে স্থির করে নিল সে, পরমার পথে সে বাধা হবে না, পরমা ভালো থাকুক। সুখে থাকুক। এর বাইরে আর কিছু চাওয়ার নেই তার। আর বেশি কিছু ভাবতে পারল না সে । হেঁটে হেঁটে ভি আই পি রোড, তারপর রোড ক্রস করে অটোর জন্য অপেক্ষা করতে থাকল ।

এমন সময় কেউ তাকে পাশ থেকে ডাক দিল । - আরে! জয়দীপ না! হ্যাঁ, তাই তো। কি রে কবে ছাড়া পেলি? জয়দীপ পাশ ফিরে তাকাল , দেখল- ভোলা দা। ভোলা সমাদ্দার। ছোট খাটো প্রমোটার , ওদের একটা গ্রুপ আছে প্রমোটিং ব্যবসার। এই তেঘরিয়া এলাকায় ওরা ভালই ব্যবসা করছিল আগে, এখন কি করছে তা জানে না জয়দীপ তবু মানুষটাকে চিনতে অসুবিধা হল না তার ।

- তুমি! ভোলা দা না ? জয়দীপ বলল ।

- হ্যাঁরে, চিনতে পেরেছিস তাহলে ।

- বা ! চিনব না কেন? বলো, কেমন আছো?

- ভালোই আছি , তবে খুব ভালো নয়। এলাকার অবস্থা খুব খারাপ রে । তুই কিছু শুনিস নি ?

- না তো, আমি তো কালকেই এলাম, কিছু তো শুনিনি ! কি হয়েছে? কিছু বিস্ময়ের সুরে বলল জয় দীপ ।

- অয়ন । মনে আছে তোর ছেলেটাকে ? তের নম্বর ওয়ার্ডের ছেলে । তোদের সাথেই পলিটিক্স করত, মনে পড়ে ? সেই অয়ন গত সপ্তাহে খুন হয়েছে ।

- সে কি? কি বলছ তুমি? আরে, সেই অয়ন দাসের কথা বলছ তুমি?

- হ্যাঁ, ও ইদানীং দল বদলে নিয়েছিল। ছয় সাত দিন আগে ওর লাশ টা বাগ জোলা খালে পাওয়া গেল । মাথায় বুলেটের চিহ্ন ছিল । আরও অনেক খুন খারাপি, মারপিট দাঙ্গাবাজি .. এই সব এখন নিত্যকার ঘটনা হয়ে গেছে ।

- সে কি? শুধু বিস্ময় আর বিস্ময় । জয়দীপ মুক হয়ে গেল । বুকের ভেতর একটা দমকা হাওয়া এ দেওয়াল ও দেওয়াল ধাক্কা মারছে , ভেঙ্গে ফেলতে চাইছে পাঁজর । চোখের পাতায় এসে আটকে আছে এক বুক কান্না । সব কিছু নিয়ে সে মুক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ।

- তুই ঘর যাবি তো? আয় আমি তোকে লোকনাথ মন্দিরে ছেড়ে দিচ্ছি ।

একটা বাইক দাঁড় করানো ছিল পাশেই । ওটা যে ভোলার, তা এখন জানল জয়দীপ । তাতে করেই ভোলা জয়দীপকে ছেড়ে দিয়ে এলো লোকনাথ মন্দিরের কাছে ।

ফিরতি পথে ভোলা মনে মনে একবার ভাবল , সময়টা বড় খারাপ যাচ্ছে আজকাল । যেই বিরোধিতা করছে সেই শত্রুর তালিকায় চলে যাচ্ছে । তার মন কিছু চিন্তিত হল । এই ছেলেটা যেন আবার না ভুল করে সাপের ল্যাজে পা দিতে যায় । দিলে আবার কিভাবে ছোবল খাবে কে জানে! সেদিনের চেয়েও আজকের সময়টা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। কেননা ঐ দলটার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে । তাই যা খুশি তাই করতে পারে ওরা ।

রামের চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ দাঁড়াল , মুখটা ভার ভার। যেন মাথায় কিছু ভর করে বসে আছে। কিংবা হয়ত বা বুকে । রামের দোকানে প্রচুর ভিড় , তাই বেশি কথা না বলে ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল, কিন্তু পেছন থেকে রামের ডাক একটু তাকে দাঁড়াতে বাধ্য করল।

রাম বলল – কিরে, চা না নিয়েই চলে যাচ্ছিস যে? বসবি না একটু ?

- না , রাম দা। পরে আসব, শরীরটা খারাপ লাগছে ।

- কেন রে? তোর আবার কি হোল? জ্বর টর হল না কি?

- না না, তেমন কিছু না, এমনিই । সন্ধ্যে তে আসব। বৌদি কেমন আছেন?

- ভালো আছে। তুই সন্ধ্যেতে আসিস কিন্তু ।



তারপর একটা নয়, দুটা সন্ধ্যে কেটে গেছে । জয়দীপ ঘর থেকে বিশেষ বের হয়নি । ঘরে পায়চারি করে আর মাথার মধ্যে একটা যন্ত্রণাকে সামাল দিতে দিতে সময় কেটে গেল তার । মাঝে একবার বেরিয়েছিল বিকাশে’র সাথে দেখা করতে। গতকাল বিকেলে । ছেলেটা আগে জয়দীপের নেওটা ছিল খুব। যা বলত শুনত । বিকাশ রাজার হাট পুরসভায় কাজ করে, সাথে জমি , ফ্লাট কেনা বেচার দালাল । অনেক ভেবে ভেবে শেষে বিকাশের কাছেই যাওয়া স্থির করল সে ।

জয়দীপকে প্রথমে দেখেই কি উল্লাস সেই বিকাশের। যেমন করে গুরুকে দেখে চ্যালার উল্লাস হয়, ঠিক তেমনি । ক্লাবে একদল ছেলের মধ্যে গলায় গলা মেলাতে মেলাতে বিকাশ বলল - কি ব্যাপার বশ। তুমি ফিরেছ শুনেছি, হয়ত কালকেই যেতাম তোমার বাড়ি ।

- থাক, তোকে আর ভণিতা করতে হবে না। একটু বাইরে আয়, কথা আছে তোর সাথে । বিকাশ জয়দীপের সঙ্গে ক্লাব থেকে বেরিয়ে এলো রাস্তার মোড়ে । তারপর বলল – কি বল বশ কি এমন ব্যাপার যে আমাকে না ডেকে পাঠিয়ে এখানে আসতে হল ।

- তেমন কিছু না, তবে আমার একটা ঘোড়া চাই। আর তিন টা দানা । জোগাড় করে দিতে পারবি?

কিছুটা চিন্তিত দেখাল বিকাশ কে । সেভাবেই বলল সে- দ্যাখো দাদা, জোগাড় করাটা কোনও ফ্যাক্টর না, অন্তত এখন । কিন্তু তুমি ঘোড়া নিয়ে করবে কি?

- কিছু না, এমনিই। তুই তো জানিস এই সময়টা কেমন যাচ্ছে । তার উপর আমার শত্রুও কম নয় । মনে মনে খুব ভয়ে আছি । ওটা সাথে থাকলে একটা সাহস আসবে বুকে। জানিস তো আমার বাড়িতে পুরুষ বলতে আমি একাই ।

- সে তো বুঝলাম, কিন্তু আবার যদি কিছু হয় !

- আরে না না , তোর উপর আমার বিশ্বাস আছে। তুই আর আমি ছাড়া আর কেউ জানবে না। আর তেমন হলে লুকিয়ে ফেলতেও পারবো, কেননা আমি তো জানি ওটা আমার কাছে আছে। তখন তো জানতামই না যে আমার ঘরে তালা বন্দি করে যে বাক্সটা রেখে গেল তরুণ দা, সেটাতে এই সব জিনিস আছে। জানলে পরে যেমনটা হল তেমন টা কিন্তু হত না। তাছাড়া সবটাই তো চক্রান্ত ছিল, তুই তো সব জানিস ।

উত্তর টা যথাযথ না হলেও বিকাশ বিশ্বাস করেছিল । ফলে আর সে কোন কিন্তু কিন্তু করেনি ।

আজ সারাদিন মায়ের সাথে অনেক গল্প করেছে । কাজের মেয়েটিকে দিদি বলে ডেকেছে । একটা ছোট্ট ভরপুর সংসার সে উপভোগ করেছে যথেষ্ট । গতকাল সকালেই সে দ্বিধাহীন ভাবে সই করে দিয়েছে পরমার পাঠানো ডিভোর্স ফর্মে । তারপর কথায় কথায় , হাঁসির ছলে মাকে, তার নতুন দিদিকে বলেছে , চিন্তা করিও না, একটা নতুন পরমা আনব আবার । কেউ টের পায়নি তার ভেতরের ভাঙ্গন টাকে। ফলে সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল দিন ঘণ্টা সেকেন্ড অনুযায়ী । কিন্তু আজ বিকেল গড়িয়ে যত সন্ধ্যে হতে লাগল , জয়দীপের বুকটা যেন শক্ত হতে থাকল ধীরে ধীরে , খবর পেয়েছে সে আজ বাগুইহাটি বাস স্ট্যান্ডে পার্টির সভাতে ভাষণ দেবেন সুবোধ বাবু । ঘড়িতে প্রায় ছয়টা বাজে । এবার তাকে বেরুতে হবে ।

রান্না ঘর থেকে আজ মাংস রান্নার গন্ধ পুরো ঘর ময়। আসার পর এই প্রথম তার জন্য মাংস হচ্ছে । একবার রান্না ঘরে গেল , তার নতুন দিদিটির নাম জানা হয়নি আজও , সে পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল – দিদি, তোমার নাম কি? আমি জানি না যে !

- কেন? নাম জেনে এত বেলা কি কাজ ?

- বলই না। জানতে ইচ্ছে করছে খুব । বলই না !

- আচ্ছা বাবা, কালকে বলব ক্ষণ ।

- কাল কে দেখেছে বল? তুমি দেখেছো? আমি কিন্তু দেখিনি !

- ছি! অমন করে বলতে নেই। আচ্ছা ঠিক আছে , বলছি । আমার নাম – তিথি ।

- তিথি ! বা ! সুন্দর নাম তো !

- তিথি নামটা সুন্দর? কে বলল তোমায়? তিথি মানে জানো তো? লগ্ন । লগ্ন শুভও হয় আবার অশুভও হয় ।

- জানি, তবু নামটা সুন্দর । আর তাছাড়া শুভ অশুভ তো স্বার্থের মাপ কাঠিতে মাপা হয় । তাতে ‘নাম’ টার কিছু যায় আসে না ।

- তুমি খুব ভালো কথা বলত । রাজনীতি করতে শুনেছি তোমার মায়ের কাছে । এত ভাল কথা বলতে সেটা তো শুনিনি !

জয়দীপ হা হা করে হাঁসতে হাঁসতে বেরিয়ে এলো রান্না ঘর থেকে । তারপর মায়ের ঘরে, মা তখন টিভি তে সিরিয়াল দেখছিল , কোন এক বাংলা সিরিয়াল । নাম জানে না জয়দীপ , কেননা সে কোনও দিন এইসব দেখেনি । পেছনে দাঁড়িয়ে বলল – মা, একটু মোড় থেকে আসছি ।

- এত বেলা আবার কেন মিছি মিছি বাইরে যাচ্ছিস ? সন্ধ্যে হতে চলল তো ?

- এমনিই , এখুনি ফিরে আসব ।

বলতে বলতে একটু আগের হাঁসিটা গলায় ফাঁস দিয়ে এঁটে গেল যেন । গলা কেঁপে উঠল নিয়ন্ত্রণ ভেঙ্গে হয়ত বা চোখের পাতাও যা তার মায়ের নজর এড়িয়ে গেল । ফিরে আসার রাস্তা আর নেই তার । একে একে সব ভেঙ্গে গেছে । সে এখন পরমার চোখে দুষ্কৃতি এবং সব কিছুর মূলে তার ‘পার্টি’র নেতা । সে সব কথা কেউ কি বোঝে? কেউ না। কেউ বুঝবেও না ।

চুপচাপ বেরিয়ে গেল মায়ের ঘর থেকে, তারপর নিজের ঘরে । বিকাশের দেওয়া ঘোড়াটা আলমারি থেকে বের করল । এটাই নাকি সব ক্ষমতা’র উৎস। কোনও দিনও বিশ্বাস করেনি এ কথা । কিন্তু আজকের জয়দীপ আর সেদিনের জয়দীপের মধ্যে অনেক ফারাক। সেদিনের জয়দীপ যদি সৎপুরুষ হয় , তাহলে আজকের জয়দীপ যে বিবাদী কালপুরুষ সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই তার নিজের মনেও। আজ এই ঘোড়ার প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস । বাদ দিতে হলে সুবোধ বাবুদের মত লোকদের বাদ দিতে হয়, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের জীবন নিয়ে ছেলে খেলা করে - কথাটা দু দিন আগেই পরমাকে বলেছিল । চারিদিকে এই যে বদলের হাওয়া তাতে হয়ত উড়ে যাবে সুবোধ বাবুরা । আবার নাও উড়তে পারে। কিন্তু সে যা হবে হোক গণতন্ত্রে । আজ তাকে আরও একবার কমরেডের পোশাকটা পরতে হবে, হবেই । শেষ বার ।

পকেটে ভরে নিল যন্ত্রটা , সাথে বিকাশেরই দেওয়া তিন রাউন্ড গুলি । সন্ধ্যেকে সাথে নিয়ে পা রাখল বাইরে । দূরে কোথাও কোন সভা থেকে ভেসে আসছে ব্রততি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সেই বিখ্যাত কবিতাটি – তবু আমি প্রাণ-পণে টেনে যাই শ্বাস/ আমার বিশ্বাস/ জানি- রক্ত কণিকারা / লাল ফৌজের মত জয় সুনিশ্চিত / আবার দখল নিয়ে দেবে প্রত্যাঘাত / অমর স্তালিনগ্রাদ / আবার আমারই বুকে ফিরে পাবো আমি ......

মুক্তগদ্য – তন্ময় ভট্টাচার্য

পিছুটান...সুখটান
তন্ময় ভট্টাচার্য



সেদিন লেকের ধারে ক্লিপ খোলা উৎশৃঙ্খলতায় যখন আঙুল চালিচ্ছিলি আর থেকে থেকেই জলে ঝুঁকছিলি,প্রেমে যে পড়িনি একথা হলফ করে বলা যায় না। খুব ইচ্ছে করছিল কাঁকড়া সেজে তোর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে। বারবার ইশারায় দেখাবি, ডুব দিলেই ‘এই যাহহ’ বলে আফসোস করবি – জীবনে সেই প্রথমবার জলচর না হওয়ার কষ্ট বুঝেছিলাম। ওদিকে পাঁচটার রোদ তখন তোর আমার সবার পশ্চিমে আশা জাগাচ্ছে। ভাগ্যিস ক্যামেরাটা ছিল! লেন্সের খামখেয়ালি তোকে টেক্কা দিতে না পারলেও ‘ফটোজেনিক’ কথাটার মানে বুঝিয়েছিল সেদিন। সিমেন্টের বেঞ্চে পড়ে থাকা ব্যাগদুটোও আলসে হাতে ছুঁয়ে আছে একে অপরকে। ওদিকে প্যান্ডেল বাঁধার কাজ চলছে পুরোদমে। তুই কিছুটা থমকে কিছুটা দৌড়ে কাঠের পাটাতন পার হয়েই কাদায় খেলিয়ে নিলি পা। আমি তো অনেকক্ষণ আগেই হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে নিয়েছি,ঘাস আর অসময়ের বৃষ্টিকে তোর সঙ্গে মেশাবো বলে। ঘুরপাক খাওয়া গেট আমাদেরও এভাবে ঘোরাবে জানলে কখনোই ঢুকতাম না।

কেন হেসেছিলি বলতো সেদিন ওভাবে? আমাকে অপ্রস্তুতের চূড়ান্তে তুলে নিজেই লুকিয়ে পড়লি ক্যারামঘরের কানাচে, এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়েও না পেয়ে পেয়ে যখন হোঁচট খেলাম,তখনই দেখতে হল! ‘আলতো দেখা’ নামের সেই খিলখিলানি কতোটা ভালোবাসিয়েছে জানিস? খবরদার প্রশ্ন করবি না। মেপে বলার ধাত আমার নেই। বোকার মতো তাকাতে পারি শুধু। নিজেকে তোর পোষা বিড়ালছানা মনে হয় তখন। ঘাড়ে পিঠে লেজে হাত বুলিয়ে দিবি,কই একটু চোখ বুজে আদর খাবো, তা না! করে বসলি ফুচকা খাওয়ার আবদার! খুঁজে মরো এবার!

ফেরার পথেও যদি একটু ভুলতে দিস! বাসের ভিড়ে কন্টিনিউয়াস তোর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই স্টপেজ এসে গেল। নেমেও গেলি। আমায় চিনিয়ে দিলি কয়েক স্টপেজ পরের ঠিকানা। জানলা গলে দেখলাম,তিনটে আঙুল নাড়িয়ে একটা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি মার্কা লুক দিয়ে ক্রস করে যাচ্ছিস রাস্তা। বুকে চেপে রইলাম আমার রঙচটা ব্যাগটা। শেষ পর্যন্ত তোর ব্যাগের হাত ধরে ছিল যে!

গুচ্ছ কবিতা – সর্বেন্দ্র সাহা

গুচ্ছ কবিতা
সর্বেন্দ্র সাহা



(১)

ফিরে যাও বৃষ্টিভেজা রাত,
ফিরে যাও আমিষাশী চোখ;
ফিরে যাও বিবর্ণ ছায়া,
ফিরে যাও রক্তমাখা শোক...

ফিরে যাও আপোস-উপোস,
ফিরে যাও আন্তরিক চোট;
ফিরে যাও ক্লিন্ন আফসোস,
ফিরে যাও বীর্যহীন ঠোঁট...

ফিরে যাও যতদূর পারো –
ফিরে যাও,ফিরে যাও আরও...
এইভাবে সব ফিরে গেলে
দেখি, তুমি ফেরো কি না ফেরো!


(২)

আকাশ ভরা সূর্য-তারা, আঁজলাতে বৃষ্টিধারা
চাওনি।
তোমার কাছে চেয়েছিলাম রক্ততটের আলপনা –
দাওনি।
পথ ছিলো,পথিক ছিলো,পদাতিক তুমি পথের খোঁজ
নাওনি।
বুকের মধ্যে মুখ গুঁজেও বুক ফাটার শব্দ শুনতে
পাওনি।
বৃষ্টিতট,রক্তভূমি... এসব কোনোকিছুই তুমি
চাওনি।


(৩)

গুহামানবের কাছে প্রিয়া ছিলো সেইদিন –
একযোগে তারা তাক্‌ করেছিল তীর,
তীরের ফলায় শ্বাপদের শেষ দিন -
আর ধনুকের ছিলা কামনায় শিরশির!
ছিলায়-ফলায় জীবন-মৃত্যু নাচে
কিংশুক রঙে চঞ্চল চারিধার...
জানি,ইতিহাস আজও এই পথ ধরে বাঁচে -
রমণে ও রণে মিশে যায় শৃঙ্গার! 


অনুবাদ কবিতা – সুবিমল বসাক

অনুবাদক - সুবিমল বসাক

মূল কবিতা - বিপুল সংসার
নারায়ণ জী

বিপুল সংসার


ফসল কাটা শেষ
বড়ো হয়েছে গোলায় নিয়ে যাবার জন্য

কিছু খড়কুটো কিছু খুদকুঁড়ো
এখনও ছড়ানো আছে পতিত ক্ষেত-মাঠে

শকুনেরা তীক্ষ্ণ নজর নিয়ে বসে কাটায়
নখের ডগায় ফুঁটে ধান

পায়রা উড়ে বেড়ায় ইতঃস্তত
ঠোটে তুলে নেয় খড়ের শর
বাসায় পাড়বে ডিম

ইঁদুর-মারারা কুঁড়ে হয়ে গেছে
গর্ত থেকে আর বেরোয় না ইঁদুর
ধানের শীষ ছড়িয়ে রেখেছে গর্তে

বহু প্রয়াসের পরেও,হায় –
সংগ্রহ করতে পারিনি
কিছু আকাঙ্খা –
ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়
পালনীয় ধরিত্রীর বিপুল সংসার।



অনুবাদ কবিতা – কিরীটী সেনগুপ্ত

অনুবাদক - কিরীটী সেনগুপ্ত

মূল কবিতা - গাইড
হুলিয়া উইলিয়ামজ

গাইড


কতো সহজ চোখে দেখছে

সবাই

একটি কন্যা-রত্ন

আর পুরুষটি?

বিজয়ী গর্ব

অনুবাদ কবিতা – গৌতম চট্টোপাধ্যায়

অনুবাদক - গৌতম চট্টোপাধ্যায়

মূল কবিতা - the listners
Walter de la Mare


শ্রোতা




“কেউ কি আছে এখানে?” প্রশ্ন তোলে আগন্তুক।
চাঁদের স্মিত আলো দরজায় করাঘাত করে,
নিস্তব্ধ রাতে একলা মজে ঘোড়া
জঙ্গলের মনভোলানো ঘাস ফুলেই;
হঠাৎ এক আনমনা পাখি
শূন্যতা ভেঙে উড়ে গেল
দ্বিতীয় বারও চর্চিত করাঘাত,
“কেউ কি আছে এখানে?” সে একলাই বলে চলে।

কেউ শোনে নি,কেউ শোনে না,
ভদ্রতার শিখরে অবাঞ্ছিত রূপ
কেবল ছাই মাখা চোখ দৃষ্টি কাটে
যেখানে সে তপ্ত,তবু শান্ত মনে মনে।
কেবল জনাকয়েক অচেনা শ্রোতা,
ভগ্ন বাড়ির আধিপত্য যার
জ্যোৎস্না রাতের অধীর কণ্ঠায়,
শুনছে তারা,ত্যাগের মায়ার অলঙ্কার।

তখন কেবল আবছা খেলা সিঁড়ির পারে,
অদূরে বয়ে চলে সুদীর্ঘ হলঘরে;
বাতাস রেখা কম্পমান,
আগন্তুকের শব্দের ভেলায়।
হৃদয় বুঝেছে ভিন্ন উপস্থিতি,
নিঃশব্দই কান্নার আবেগ;
কেবল তার ঘোড়ার শব্দ,
পাতায় মোড়া খোলা আকাশের নিচে।

জ্বরে আর জোড়ে ধাক্কা খায় সুদূর প্রান্তর,
গম্ভীর স্বর প্রাণবন্ত ভেসে চলে,
“ওদের বোলো,এসেছি আমি কিন্তু নিরক্ষর,
কথা দিয়ে করেছি মান্যতা।”
সেই অচেনা শ্রোতার দল
চুপিসারে শোনে মানুষের ডাক;
কথা ধাক্কা খায় শব্দের প্রাচীরে,
নিজ মনে ফিরে আসে বার বার।

হা,তারা শুনেছে জুতোর আওয়াজ ঘোড়ার কাছে,
শুনেছে লোহার ক্ষুরের শব্দ;
জানে,কিভাবে আবার সন্ধ্যে নামে,
যখন হাহাকার নেয় বিদায়।।

কবিতা – মলয় রায়চৌধুরী

পুজোসংখ্যার পাঠক
মলয় রায়চৌধুরী



ভিন্ন পথের যাত্রী নামের ভয়গুলো
উঠছে খাঁড়া বছরশেষের গলায়
লীলা কি সত্যিকারের চোলাই
যোগফলে যার ফুটকির পর জিরো
নৌকো থেকে তিনখানা ঢেউ বাদ দিয়ে
খাদের ঘাসে যেসব ম্যাকডোনাল্ড
ছিটকে গেল খই ফোটানো ধুলোয়
কয়েক স্টেশন পরে তুলোট ধড় থেকে
আলগা মজার মুণ্ডুখানা চোখ মেলে
পাঁচ আধুলির হরির লুটে পড়ে পাওয়া
কী অক্ষর রে কিই বা বলি চিড়সুখে
নাচাও ফিচেল ঘুম-বন্ধক ঠ্যাং জোড়া
প্রেমিক রসের সিঁধ কেটে যা ভাঙে
বেহেড তেমন ভিস্তিঅলার খোলছাগল
কলিংবেলে রদ্দিঅলার নামই শুধু
বাজার দরের রেটের হাওয়ায় গেঁথা...

কবিতা – বারীন ঘোষাল

বস্তুগুণ
বারীন ঘোষাল



কবি খুব ম্যাজিক জানে
লাদীনও জানতো
এক কলম দুই কলমের কলমকারি বাগানে
জীবনের কলমাকথায় গান করা
গানে কী রাগ

বনজারা কে বাগান
হাসিতে গুলি জোড়া
হাট চিড়িয়ার খোলা হার্টে
ছুরি-কাঁচির তলায় আরামে ঘুমিয়ে তারা
ভালোবাসার তলায়
দৃশ্যত দ্বিতীয় রোদের রাতে
জলবিয়োগের পশলায়
বৃষ্টি বন খাঁ খাঁ করে প্রান্তর

কবি খুব ম্যাজিক জানে
আলাদীনও জানতো
রমণীর বস্তুগুণে সে রমণ আলাদা মেশায়



কবিতা – সপ্তাশ্ব ভৌমিক

বিপ্লব চেয়ে চিতপাত
সপ্তাশ্ব ভৌমিক



আমি বোতলে পুরেছি কান্না
আমি অনাহারে খুঁজি দম্ভ
আমি চাইনি সবুজ পান্না
আমি ভেঙেছি স্মৃতির স্তম্ভ
আমি হাবভাবে নেই সন্ন্যাস
আমি আদতে বিষয়ী বুদ্ধি
আমি তুষের আগুনে উল্লাস
আমি নিরাময়-হীন শুদ্ধি
আমি সময়ের চোখে ডাস্টবিন
আমি বিবেকের কাছে উৎপাত
আমি বাকির ফাঁকির ক্যানটিন
আমি বিপ্লব চেয়ে চিতপাত

কবিতা – নির্মাল্য বন্দ্যোপাধ্যায়

অনির্বাণ…
নির্মাল্য বন্দ্যোপাধ্যায়



আমার ডাকনাম
সবাই ভুলে যাক
কিচ্ছু ক্ষতি নেই
তুমি তো জানো

উদাস উত্সবে
কিভাবে ফিরে আসে
প্রকৃত যৌবন
মনভোলানো

বুকে যে নৌকাটি
অলস ভেসে থাকে
তাকেও চিনে রাখে
নদীর চোখ

আমার আমি যদি
আমাকে ভুলে যায়
সান্ধ্য স্খলনেই
হবো অশোক

এবং তারপর
জমিন ও আশমান
রাতের বুকে পেতে
থাকবে কান

তোমার ঠোঁট থেকে
কখন ঝরে পড়ে
আমার স্মৃতিকথা
অনির্বাণ...



কবিতা – রেহান কৌশিক

দিনগুলি রাতগুলি
রেহান কৌশিক



বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি কয়েক শতাব্দী আগে – এলোমেলো হয়ে যায় সব। মৃত্যুর ভিতরেও কি দৃশ্য জন্মায়, ইচ্ছেগুলো গোল্লাছুট খেলে রাতদিন!

সিগারেট আর মদের বোতলকে নিয়ে একজন বসেছে গাছের ছায়ায়। বুকে কি বারুদ তার? জমে থাকা বিষাদের বাষ্পগুলোকে খুলে দিতে চায় প্রকাশ্য হাওয়ায়? কতদিন আমারই কাটা মুণ্ড উড়ে গিয়ে বসে থাকে তার ধড়ের আসনে!

উল্কার দুঃখীচোখ কতবার ডেকেছে আমাকে। তার ঘরভাঙা গল্পের সঙ্গে মিশে গেছে আমারও যাপন প্রবাহ! বন্ধু তো মিলেছে তবু, একান্ত কান্নার...

এই সমস্ত কতদিন চলবে আর? আর কতদিন শুধু কষ্টের অক্ষর দিয়ে গেঁথে যাবো সময়ের বাড়ি? হয় বরখাস্ত করো, নইলে ইস্তফা দেব...

একটা কিছু ঘটবে কোনওদিন...বসে আছি স্বপ্নকাঙাল। ফিরবে কি নবান্ন উৎসব এই সব অন্ধকার ফুঁড়ে? ইচ্ছেমতো খাব আর গান গাইব ঠ্যাং দুলিয়ে?

কবিতা – পার্থ বসু

শব্দকে বলি
পার্থ বসু



শব্দকে বলি ভয় পাচ্ছিস নাকি ?
আঁচড়ে মোচড়ে ব্যথা যতটুকু তুই
পাবি সামান্য , প্রসববেদনা বাকি
রয়েছে এখনো , এই বুক ছুঁই ছুঁই

শিহরণময় উদ্বেগে আশ্লেষে
ডেকে আনছিস সেই পরিণতিটিকে ।
এই তন্ময় প্রতীক্ষা একপেশে
নয় , জেনে গেছি বলেই রাখছি লিখে ।

শব্দকে বলি ক্ষয় পাচ্ছিস নাকি ?
প্রসবজনিত আপাত দুর্বলতা
স্বাবাভিক ভাবে কেটে যায় , যদি ফাঁকি
না থাকে যত্নে , বুকভরা ব্যাকুলতা

টন টন করে উঠছে দুধের ভারে ?
স্তন্যপায়ীর এ বিপুল সংসার
ঠোঁট পেতে আছে , কবিতার উৎসারে
তুই আবক্ষ তৃষ্ণা মেটাস তার ।।



কবিতা – অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

মৃত্যুঞ্জয়
অরুণাচল দত্ত চৌধুরী



মৃত্যু ঘোরাফেরা করে। অমলিন থাকি তাকে দেখে।
প্রাচীন সমুদ্রজলে ক্লান্তিহীন অ্যামিবার মত
ধ্বংসের মুখোমুখি বহুখণ্ড করেছি নিজেকে
ক্ষণপদ বাড়িয়েছি বাঁচবার অভ্যাসবশত

ধ্বংসনীল বিষ মাখা… বিনাশের অভিশপ্ত কালে
বিশল্যকরণী খুঁজি, খুঁজে নিই মৃতসঞ্জীবনী।
রণক্ষেত্রে হাত রাখি মৃত সব সাথীর কপালে।
কানে কানে মন্ত্র বলি, শোনো হাল ছেড়ো না এখনই।

আগুনে দগ্ধ হয়ে তবু শিখে গেছি প্রতিদিন
কী ভাবে আগুন জ্বলে, কী ভাবে বা আগুন নেভায়
ধ্বংসেরই শূন্য থেকে শুরু করি এক দুই তিন,
ভালোবাসা লেগে থাকে ভেঙে পড়া সেতুটির গায়।
জীবন কী ভাবে জেতে, সে' কাহিনি যেতে হবে লিখে
কবরে শোবার পরও তাই ফিরি বসতির দিকে…

কবিতা – আকাশলীনা

অভ্যেস
আকাশলীনা



পাশে বসো ।
তোমার সিগারেটের ধোঁয়া
আর শীতের কুয়াশা মিশে যাক ।
ঘ্রাণ নিই ধোঁয়া-কুয়াশার আর তোমার
তারপর চলে যাবো দুজনে মিলে
কবরের দিকে

ওই কথাই তবে থাকলো ।


কবিতা – রণদেব দাশগুপ্ত

অন্তর্ঘাত
রণদেব দাশগুপ্ত



চোখে থাকো
চোখান্তরে থাকো |
নগ্নতার জন্য আমি
আদিগন্ত বসন খুঁজেছি
কলিযুগে |
সংঘহীন
লালসার ঘুণ
ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে
হাত থেকে বুকে
বুক থেকে প্রভূত উরুতে |

এত কিছু আয়োজনে
ধ্বংসকে রচনা করি আজও |
একাও অনেক হয়ে
ভেঙে দিতে পারি ,সব
ব্যক্তিগত ত্বক ও তিমির
অনন্ত জীবাণু ডাকে
রোদমাখা কাম্য কটিতটে-

তোমাদের সব রঙে
আজ কিছু বিভূতি আসুক |
হে ঘাতক
চোখে চোখে থাকো || 


কবিতা – হিমাদ্রী মুখোপাধ্যায়

অর্ঘ্য
হিমাদ্রী মুখোপাধ্যায়



পিতৃ পুরুষ - এই নাও জাহ্নব প্রবাল,
আমার শরীর বৃক্ষ, এই সমস্ত ছায়া ডাল।

আদিম রমনী - স্তব্ধতার বাক্য হয়ে এসো।
দিনেরা যাবেই ফিরে... তবুও আকাঙ্খা হয়ে ভেসো।

শোনো মহাকাল... এই দ্বিধা আগ্রহের,
দুই চোখে সমত্ত সকাল।

তাই তো তোমার জন্যে রেখে যাচ্ছি টুকরো কথামালা-
তোমাতেই মিশে যাচ্ছি, খুলে পড়ছে মুগ্ধ ডালপালা।



কবিতা – রুদ্র গোস্বামী

দুপুরে ভোরের ফুল
রুদ্র গোস্বামী



জাফরানি দুপুরিয়া রঙ
তোমার চিবুকে এঁকেছে তার লাজ।
কি গভীর তোমার দুটো চোখ !
অনুপর্ণা ___
হৃদয়ে এতো রঙ মেখে
তুমি আর যেওনা ওদিকে।

মেহেদির লালপাতা মেয়ে
তোমার দু'হাতে রেখেছে তার যৌবন,
কি অবুজ তোমার দুটো হাত
এখনি ছুঁয়োনা আমাকে।

আমার চোখে হাঁটা নদী
দু'হাতে রেখেছে তাজা জল;

বলো'তো ? কতদিন পরে এলে তুমি ! 


কবিতা – শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়

গান্ধর্ব
শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়



আমাদের সকল ভালোবাসাগুলি আজ শরতের অনিকেত পথ হয়ে আছে।

পাশের গ্রামের এক হরবোলা সেই ভোর থেকে ডাকছে অবিরল,
নতুন মুখোশ মুখে পরে ঘুমিয়ে রয়েছে তার অন্ধ বালক

কাল রাতে খুলতে ভুলে গেছে।

এইভাবে আমরাও ভুলে যাই নিজমুখ, মেলা আর ধুলোর প্রবাহে
এত রূপ আর এত রঙ
আমাদের মাঝে অনঙ্গ প্রাচীর হয়ে থাকে

হে মানুষ, হে চরাচর, শোনো – এক বিহ্বল পিতা সেই ভোর থেকে ডাকে ...

শরতপথের ধারে কটি সবুজ আঙুল, নামহীন ফুলের অঙ্গন
গৃহস্থবাড়ি
পরিচয়হীন, তবু হঠাৎ বৃষ্টি এলে হাসিমুখে দোর খুলে দেয়

নির্জন মেঘের বিষাদ প্রদীপে প্রদীপে কত আলো – জানে শুধু
নবমীর নিশি

আমাদের সব খুনসুটি আর অভিমান আজ পাখিনাম হয়ে আকাশে ভেসে যায় ...