বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১২

সম্পাদকীয় - ৯ম সংখ্যা, ১ম বর্ষ



শৈশব যখন


'কাগজফুলের গাছটা তো এতটা ঝাড়ালো ছিল না, আমার ছটফটে শিমি, সে কোথায় গেল - তাকে তো উঁকি মারতে দেখছি না।' 
- বিড়িবড় করে বলে উঠলো চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠা রিক্তযৌবনা বিলকিস।


এইতো ক'দিন আগেকার কথা, রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যেতে হয়েছিল তাকে এই আপন ঘর, গাছ আর শৈশব ছেড়ে অজানার পথে। সে ছিল মায়ের জেষ্ঠ কন্যা। বাপ মরা অভাবের সংসারে পাঁচ ভাই-বোনের বড় হবার সুবাদে তাকেই কাঁধে তুলে নিতে হতেছিল সংসারের জোয়াল। একব্যাগ বই-খাতা নিয়ে যে সময়ে তার সমবয়সী ছেলেমেয়েরা সকাল বেলায় ঠেলাঠেলি করতে করতে স্কুলে যেত, সেই সময় উনুনের ছাই নিয়ে বাসন মাজতে হতো তাকে। ছয়-ছয়টা বাড়িতে বাসন মাজা, কাপড় কাচা আর কুটনো কাটা করে বেলা একটা বেজে যেত বাড়ি ফিরতে। তারপর ঘরের কাজ, রান্নায় মা-কে সাহায্য, খেতে-খেতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেত। তাতেও নিস্তার নেই, আবার তো বেরোতে হবে - এবেলার কাজগুলো সারতে হবে তো, ছ’ছয়টা বাড়ির কাজ বলে কথা। সব মেনে নিয়েছিল সে, চলছিল বেশ, বাদ সাধল তার নকুল মামার কথায়। একটা নাকি ভালো পাত্র পাওয়া গেছে। পাঁচ-হাজার টাকা দেবে বলেছে বিয়ে দিলে। মায়ের কথার কী আর দাম তখন, মামার কথায় রাজী হতেই হলো। একবার সে উঁকি মেরে শুনেছিল, তার নাকি একবার বিয়ে হয়েছিল, বয়স অবিশ্যি একটু বেশি - সাতচল্লিশ, তাতে কি, শহরে বাড়ি, শুনেছি নাকি চাকর-বাকরও আছে। তবু তার তের বছরের কিশোরী মন মেনে নিতে পারেনি। আজ বাবা বেঁচে থাকলেও যে ওইরকম বয়েস হতো। তাই রাতের অন্ধকারে ধানক্ষেত ধরে ছুট, শহরের প্রান্তরে ভোররাতের ট্রেন ধরে অজানার পথে।

তারপর, সে অনেক কথা, হায়না-নেকড়ের হাত থেকে ন-ন'টা বছর বাঁচিয়ে সদ্য ফিরে এসেছে নিজের গ্রামে, নিজের বাড়িতে।

গ্রামে এখন 'খিচুরি-স্কুল'। দুপুরের খাবার খেতেও অনেকে স্কুল যায় না। কী করে যাবে, মিনতি, সামিনা ওদেরও তো একই দশা, কাজ না করলে ওরা খাবে কী ! তাই বিলকিস সবাইকে নিয়ে সন্ধে স্কুলে যায়, শেখায় জীবনের মানে, বেঁচে থাকার অন্য মানে। বেঁচে থাকা মানে দু'বেলা ফ্যান-ভাত খাওয়া নয়, বেঁচে থাকা মানে তের বছরে বিয়ে করে সন্তান উৎপাদন নয়। বেঁচে থাকা মানে নিজেকে জানা, চেনা, নিজেকে উজাড় করে দেওয়া।







আজ শিশুদিবস। আজ যখন আমাদের মনে পড়ে যায় সেই ড্রয়িং খাতায় পেন্সিলে আঁকা শৈশবের কথা, দিদার কোলে শোয়া রুপকথা, মেঘের ডাকে সোঁদা গন্ধভরা আম কুড়ানোর গল্প, মাঝবয়সেও ভারাক্তান্ত হয়ে যায় মন। শৈশব মানুষের কতো রকমেরই না হয়, কখনো রঙ্গিন, কখনো সাদাকালো, কখনো হাসিমাখা, কখনো অশ্রুভরা - বিচিত্রতায় ভরা শৈশবগুলো খুব তাড়াতাড়ি পথ হেঁটে যায়, বড্ড তাড়াতাড়ি। চাইলেই আর ফিরতে পারি না সেই দিনগুলোতে।

আর আজ, খবরের কাগজ খুললেই দেখি ধর্ষিত শিশুর খবর, কিশোর-কিশোরীর শ্রমে গড়ে ওঠা পর্যটন শিল্পের কাহিনি, ভীষণ চঞ্চল হয়ে ওঠে মন। মনে পড়ে যায় সেই উদ্দাম দুরন্ত দিনগুলোর কথা, কোনোরকম ভাবনা-চিন্তা না করেই যখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারতাম। তবু সান্ত্বনা, এখনও বেঁচে আছে আজকের বিলকিস-রা, নিজের নীলরঙা শৈশব আঁচলের কোঁচরে লুকিয়ে রেখে তুলোর ভেলায় তারা এনে দিতে চায় নতুন জীবনের স্বাদ আজকের কচি-কাঁচাদের জন্য, তাদের নিজেদের চাওয়া পাওয়ার ইচ্ছাপুরণ করতে চায় আজকের মিনু-গোপালের শৈশব গড়ে তুলে, নিজের অজান্তেই শপথ নেয় –


“এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
- নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার”।


আসুন আজ আমরা সকলে এসে দাঁড়াই আজকের এই বিলকিসদের পাশে, আজকের দিনটা হয়ে উঠুক ওদের আনন্দের দিন, আমরা আমাদের চাওয়া-পাওয়াটুকু ভাগ করে নিই ওদের সাথে। উৎসর্গ করি আমাদের ক্ষেপচুরিয়াসের এই সংখ্যাটি এই বিলকিসদের।

শুভ হোক সকলের। যে সমস্ত লেখক/লেখিকা তাঁদের অমূল্য সৃষ্টি এ সংখ্যায় দিয়েছেন তাঁদের অশেষ ধন্যবাদ জানাই। বিশেষ করে অন্যবারের মতো এবারের সংখ্যাটিকেও অলংকরণ করে দেবার জন্য আমার অসংখ্য ধন্যবাদ কবি কৌশিক বিশ্বাস ও কবি মেঘ অদিতিকে ।


ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে -
সুমিত রঞ্জন দাস।




মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডাইরি

খামচানো কালপৃষ্ঠা

ঘৃণিতের আহ্লাদ
মলয় রায়চৌধুরী


যখন লেখালিখি আরম্ভ করেছিলুম, তখন বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও লিখতুম । কিন্তু ইংরেজিতে লেখাগুলো কলম দিয়ে লেখার দরুণ ফেরত আসতো, এই সম্পাদকীয় বার্তা নিয়ে যে "দয়া করে আপনার রচনাটি টাইপ করে পাঠান ; টাইপ করার সময়ে খেয়াল রাখবেন দুই লাইনের মাঝে যেন স্পেস থাকে এবং বাঁদিকে এক-চতুর্থাংশ মার্জিন থাকে । " অনেক খুঁজে পেতে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড টাইপরাইটার কিনেছিলুম । টাইপ করাটা প্রথানুগতভাবে টাইপিংস্কুলে গিয়ে শিখিনি । এক আঙুল দিয়েই টাইপ করতুম । ১৯৬১ সালে যখন হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হলো তখন প্রথম দিকের বুলেটিনগুলো ইংরেজিতে বেরিয়েছিল । ওই টাইপরাইটারে এক আঙুল দিয়ে টাইপ করে প্রেসে ম্যাটার দিতুম । কলকাতা পুলিশ যখন আমায় গ্রেপ্তার করতে এসেছিল তখন তাদের সম্ভবতনির্দেশ দেয়া ছিল যে লেখালিখির সঙ্গে জড়িত যা হাতের কাছে পাবে সবই বাজেয়াপ্ত করে কলকাতায় নিয়ে আসবে । ইন্সপেক্টার মশায়, যিনি সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করছিলেন, তিনি বললেন, "এ শালা চোরের টানা মাল মনে হচ্ছে", এবং সেটিও, আরও কুড়িটি জিনিসের সঙ্গে নিয়ে নিলেন । প্রথম টাইপরাইটারটা গেল ।

দ্বিতীয় টাইপরাইটারটা আমেরিকা থেকে পাঠিয়েছিলেন 'সলটেড ফেদার্স' পত্রিকার সম্পাদক ডিক বাকেন । ওনাকে মামলার কাগজপত্র পাঠিয়েছিলুম আর তা থেকে উনি জেনেছিলেন যে আমার টাইপরাইটারটা গেছে । তাছাড়া ওনাদের লেখা পাঠাতে হচ্ছিল হাতে লিখে । মামলার পর বেশ কিছুকাল লেখালিখি করিনি । ডিক বাকেনের দেয়া টাইপরাইটারটা ব্যবহার না করার ফলে অকেজো হয়ে পড়েছিল । তারপর যখন পাটনা থেকে লখনউ চলে গেলুম তখন পাটনায় আমার জিনিসপত্র সব নয়ছয় হয়ে যায় । পাটনায় আর ফিরিনি । লখনউতে মা মারা যাবার পর যখন আবার লেখালিখি শুরু করলুম একটা পোর্টেবল রেমিংটন টাইপরাইটার কিনলুম । বাংলা লেখায় একাগ্র হবার কারণে এই টাইপরাইটারটিও পড়েপড়ে অকেজো হয়ে গিয়েছিল ।

লখনউ থেকে গেলুম মুম্বাই । সঙ্গে অকেজো টাইপরাইটারটিও । হঠাৎ একদিন একটা চিঠি পেলুম বাউলিং গ্রিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাওয়ার্ড ম্যাককর্ডের কাছ থেকে । উনি জানিয়েছেন যে আমেরিকার টমসন প্রেস ওদের আত্মজীবনী সিরিজে আমার আত্মজীবনী প্রকাশ করতে চায় ; এই আত্মজীবনীগুলো রাইটার্স ওয়র্কশপের ছাত্রদের পড়ানো হয় সেখানে । আবার টাইপরাইটারের প্রয়োজন দেখা দিলো । নাড়ানাড়ি করে দেখলুম যে জ্যাম হয়ে গেছে । তখন থাকতুম সান্টাক্রুজে । খোঁজ নিয়ে কোনো টাইপরাইটার মেকানিক পেলুম না । জুহু রোডে একটা কমপিউটার শেখার স্কুল ছিল ; সেসময়ে কমপিউটারে টাইপ করার জন্য অনেকে টাইপ করা অভ্যাস করতেন । সেই স্কুলে ঢুঁ মেরে জানতে পারলুম যে জুহুর সমুদ্রের ধারে গোয়ানিজ কলোনিতে একজন টাইপরাইটার মেকানিক থাকেন, তাঁর নাম ন্যাজারেথ ।

লখনউতে যখন পাটনা থেকে গিয়েছিলুম তখন সেখানের অকটোবরের শীত সামাল দিতে ফিকে সবুজ রঙের পাঠানি স্যুট বা আফগানি স্যুট করিয়েছিলুম । পাটনা অফিস যে কটা ফেয়ারওয়েল দিয়েছিল তাতে ওই স্যুট পিসটাও পেয়েছিলুম । আমার জামাকাপড়ের কোনোনিজস্ব স্টাইল নেই । বুশ শার্ট বা টি শার্টের সঙ্গে ফুলপ্যান্ট পরি । মুম্বাইতে যেটুকু ঠান্ডা পড়ে, গরম জামাকাপড় দরকার হয় না । তবে আমি শীতকাতুরে বলে জানুয়ারি মাসে আফগানি স্যুটটা পরতুম । লখনউতে দাড়ি রাখা আরম্ভ করেছিলুম । একগাল দাড়ি আর আফগানি স্যুটে লখনউতে বেশ নওয়াবি চালে হাঁটা-চলা করা যেত । অনেকেই আফগানি স্যুট পরতেন সেসময়ে । বাবরি মসজিদ কাণ্ড ঘটেনি তখন । মুম্বাইতেও পরা যেত আফগানি স্যুট, শিবসেনার সেনাবাহিনীর হাতে প্যাঁদানি খাবার ভয় ছিল না । অবশ্য অনেকে আফগানি স্যুট পরে কপালে একটা লাল টিকা এঁকে ঘুরে বেড়িয়েছে দাঙ্গার পরেও ।

ন্যাজারেথকে খুঁজে বের করতে গিয়েছিলুম আফগানি স্যুটটাপরেই । জুহু সেসময়ে এখনকার মতোন বৈভবশালীদের এলাকা হয়ে উঠেনি, এত নামিদামি হোটেল-রেস্তরাঁ আর হাইরাইজ হয়নি । সেসময়ে কিছু-কিছু বস্তিও ছিল । কয়েকটা বস্তিতে জিগ্যেস করে শেষে পৌঁছোলুম গোয়ানিজ বস্তিতে । তারপর সরু ঘিঞ্জি নোংরা গলির পাকে সেঁদিয়ে জিগ্যেস করে করে পাওয়া গেল ন্যাজারেথের চালাঘরটা । নামে গোয়ানিজ বস্তি হলেও পাড়াটায় যে নানা প্রদেশের আর ভাষার লোক থাকে তা বাসিন্দাদের দেখে টের পাচ্ছিলুম । ন্যাজারেথের চালাতে ঢুকেই বুঝতে পারলুম ঠিক জায়গাতেই এসেছি । ঘরের দেয়ালে কাঠের তাকের ওপর রাখা ছিল নানা কিসিমের টাইপরাইটার । ফ্রকপরা একজন মোটা কালচে গোয়ানিজ প্রৌঢ়া বেরিয়ে এলেন । ওনাকে আমার টাইপরাইটার সারাবার কথা বলতে, উনি জানালেন যে ন্যাজারেথ তো বেরিয়েছে, আমাকে অন্তত ঘন্টাখানেক বসতে হবে । ভাবলুম যে ন্যাজারেথ আসুন, সঙ্গেনিয়ে যাবো । তাড়াতাড়ি সারিয়ে টাইপ করে অন্তত প্রথম খসড়াটা পাঠিয়ে দিতে হবে ।

বসে-বসে হাই তুলছিলুম, কী-ই বা করি । সামনে বসে আছেন প্রৌঢ়াটি । ছোটোবেলায় ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছিলুম বলে ক্যাথলিকদের ঘর সাজানো দেখলেই খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তাঁদের আনুগত্য টের পাওয়া যায় । পর্তুগালের ক্যাথলিসিজমের ছাপ ঘরের দেয়াল জুড়ে । হঠাৎ সামনের বাড়িতে তারস্বরে গিটার আর ড্রাম বাজাবার আওয়াজ আসতে লাগল । মন্দ নয়, টাইমপাসের জন্যে ভালোই । বোকা চেহারা নিয়ে চুপচাপ এই প্রৌঢ়ার সামনে বসে থাকার চেয়ে বরং পাশ্চাত্য বাজনা শুনে সময় কাটাই । শুনছিলুম সেই দিকে তাকিয়ে ।

আচমকা প্রৌঢ়া বলে উঠলেন, "শুনছেন তো জগঝম্প ? কান ঝালাপালা করে দিলো এই প্রটেস্ট্যান্টগুলো ; এরা হিন্দুদের চেয়েও নোংরা, চিৎকার চেঁচামেচি হইচই ঝগড়াঝাঁটি ছাড়া থাকতে পারে না । "

মৃণালকান্তি দাশের ছড়া

রঙিন পালক
মৃণালকান্তি দাশ


বুম বুম চাকা চাকা
আমি নই বাবা কাকা
নেহাত বালক -
রোজ যাই ইস্কুল
কিন্তু হয় না ভুল,
সঙ্গে নালক ।
নেই কোনো হাওয়াগাড়ি,
মেঘে-মেঘে দেবো পাড়ি,
আমিই চালক-
আমার সাহস আছে,
পেয়েছি হাতের কাছে
রঙিন পালক ।

মৃণাল বসুচৌধুরীর কবিতা

প্রেমের কবিতা
মৃণাল বসুচৌধুরী



নদীগর্ভ থেকে আজ বসন্তের হাওয়া ছুটে আসে
তুমি কি উঠোন ছু৺য়ে উড়ে গেলে উত্তর আকাশে


তোমার জ্যোৎস্না নিয়ে মধ্যরাতে খুব কাড়াকাড়ি
শীতলপাটির মোহে বসে আছি তিনটি আনাড়ি


নাভিমূলে ঝঝড় ওঠে জ্বলে ওঠে রাবণের চিতা
তার্কিক কলম ছেড়ে তুমি লেখো প্রেমের কবিতা


শব্দ মমায়াজাল ছি৺ড়ে ফিরে আসে পোষমানা পাখি
সে জানে প্র্রেমের ঘেরে কোনখানে কতটা চালাকি


শীতের কুয়াশা জানে যাবতীয় ঘুম-জাগরণ
কখন যে জ্বলে নেভে শরীরের লুকোনো লণ্ঠন

ধারাবাহিক ঘনা’দার কলম

পাস্তুরের দস্তুর
ঘনা দা (রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য)


সন্ধে সাতটা । মোটামুটিভাবে চন্দন ডাক্তারের রোগী দেখা শেষ । খানিক পরেই চেম্বারে, সান্ধ্য আড্ডা শুরু হবে । রথী মহারথীরা এখনও এসে পৌঁছননি । এই অবসরে, সত্য কম্পাউন্ডার জোরে জোরে খবরের কাগজ পড়ছেন । তাঁর বদ্ধমূল ধারণা, জোরে না পড়লে, নিজের কানে ঢোকে না, ফলে যা লেখা আছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় । নোয়াখালিতে স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তার এই অভ্যেস ।

ইংরেজি ভাষার ওপর তার দুর্বলতা ভয়ঙ্কর । চান্স পেলেই ইংরেজি বলেন আর সেই ইংরেজি শুনে অনেকেই থরথর করে কাঁপে বলে, তার আর এক নাম সত্য কম্পু ।

খবরের কাগজটা অবশ্য তিনি বাংলাতেই পড়েন । মাতৃভাষার প্রতি টান ভয়ঙ্কর । তার মতে, মাতৃভাষা হচ্ছে মাতৃদুগ্ধ পান করার মতো । বাংলা ভাষা, তাই তিনি কখনো ছাড়বেন না ।

নাটু লাহিড়ী অবশ্য অন্য কথা বলেন । তিনি নাকি স্বচক্ষে দেখেছেন, সত্য কম্পু ইংরেজি খবরের কাগজের ওপর জল ছিটিয়ে পড়ার চেষ্টা করছেন । নাটু লাহিড়ীর কাছে ধরা পড়া গিয়ে বলেছিলেন, আজকালকার ইংরেজি তিনি বুঝতে পারেন না বলে জলে ভিজিয়ে নরম করছিলেন।

ক্ষেতু বাগচী ঢুকেই বললেন :-

- বন্ধ কর হে, সত্য !

- হোয়াট ?

- তোমার অই জোরে জোরে খবরের কাগজ পড়া । তাও আবার ওই বিশাল রাজনৈতিক হানাহানির খবর ।

- আই ফ্রম নুয়াখালি ! আমি ডোন্ট কেয়ার কাউকে । হু কী ডু আমাকে ? ডোন্ট কেয়ার আই ।

- আরে না ! তোমার বাংলাটা বড়ই দুর্বল ।

- আফনে হোয়াট স্ফীক ?

- তখন থেকে ত্রুটিকে ক্রুটি উরুশ্চারণ করছো তো ! তাই আর কী !

তরজাটা হয়তো আরও এগোতো, তবে এর মধ্যে এক বিশালবপু মহিলা দুলকি চালে হেঁটে ঢুকে পড়েছেন চেম্বারে !

- ডাইকতারবাবু আছেন ? মহিলার বিনম্র জিজ্ঞাসা।

- হঃ ! ডাক্তারবাবু ফেজেন ! সত্য কম্পুর উত্তর ।

- কোই আচেন ?

- আসতাচেন । আফনে সিট ।

- কী কোইলেন?

- কোইলাম, বয়েন ।

- হঃ ! তয়, অনার কি দেরি হইবো ?

- নো নো ! আইবেন নাউ !

- আপনে কী ভাষায় যে কথা কন ? বুজতে পারতাম না !

- ওই ভাষা আপনি বুজবেন না – ক্ষেতু বাগচী বললেন ।

- হঃ ! আমার নামটা লিখ্খা লন !

- কী নাম আপনার ?

- কৃষ্ণ বিনা প্রাণ বাঁচে না দাসী ।

- ক্ষী !!! সত্য কম্পু প্রায় পড়ে যান আর কী, চেয়ার থেকে ।

- হেই দ্যাহেন ! আমরাগো সব বষ্টুম ! আমার হ্যায়ের নাম হুনলে অজ্ঞান হইবেন, মনে লাগে ।

- ও ! ওইজন্য আপনি দুলে দুলে ঢুকলেন ! এত বড় নামের চাপ ! মনে হলো রাধার দোলায় আগমন । ক্ষেতুদা উবাচ ।

- হ্যাঁ ! এবার গজগজ করবেন যেতে যেতে, তাই রাধার গজে গমন হবে । চন্দন ডাক্তার চেম্বারে ঢুকতে ঢুকতে বলল ।

- আফনারা কী যে কন ! কইতে নাই, তয় কইয়া ফ্যালাই ! আমার হ্যায়ের নাম হইলো গিয়া গোপীজন বল্লভো পদরেণু দাস । বমু এহানে ?

- বসুন বসুন ! চন্দন বলল । আ্যতো বড় বড় সব নামের বাহার, না বসলে খুব মুশকিল !

মহিলা একটা চেয়ারে ওই বিশাল চেহারা নিয়ে বসতেই চেয়ারটা মড়াৎ করে ভেঙ্গে গেল । মহিলা পড়ে গিয়ে এক বিশাল চিৎকার করলেন ।

- ওহো ! আফনে দেখতাসি হেলেন অফ ডেস্ট্রয় ! সত্য কম্পু মহিলাকে হাত ধরে তুলতে তুলতে বললেন ।

- হুম ! একই অঙ্গে দুটো রূপ ! হেলেন আর রাধা ! ক্ষেতু বাগচী উবাচ ।

উঃ ! আঃ ! করতে করতে একটা কাঠের চেয়ারে বসলেন মহিলা, সত্য কম্পুর সাহায্যে । দেখা গেল তেমন কিছু হয়নি । খালি, কনুইয়ের কাছটা একটু ছড়ে গিয়েছে । ডেটল দিয়ে ওয়াশ করে, একটা ব্যান্ড এড লাগিয়ে দিলেন সত্য কম্পু ।

মহিলা ধাতস্থ হয়ে বললেন – আমারে একটু দ্যাহেন ডাইকতার বাবু ।

- কী হয়েছে আপনার ?

- কী আর কমু, ডাইকতার বাবু ! ফরশু দিন আমাগো বাড়ি আইসিলো আর এক বষ্টুম । আমাগো বাড়িত্ কলাগাছে বড় বড় পুরুষ্টু কলা হইসে । কলা দেইখ্যা কয়- জয় রাধে ! কয়েকটা কলা দিবা ? সেবা করতাম ।

রাইগ্যা কইলাম, মুই বোষ্টুম, হ্যায় বষ্টুম, বষ্টুম মোর পোলা/ তিন বষ্টুম ঘরে থাইকতে, পরে খাইবো কলা ? কী করসে, কে জানে, তারপর থিকা শরীর তাজ্জিম – মাজ্জিম করত্যাসে ।

- এ যে দয়াল বাবা, কলা খাবা কেস ! চন্দন বলল ।

- একে একটা টেট ভ্যাক পুশ করে দাও আর “পাস্তুর” নামটা দশবার মাথার ওপর জপে দাও হে চন্দন ! ক্ষেতু বাগচীর পরামর্শ ।

- টেট ভ্যাকটা না হয় বুঝলাম, পড়ে গিয়ে কনুই ছড়ে গিয়েছে, কিন্তু “পাস্তুর” নামটা দশবার মাথার ওপর জপ করে দেবো কেন? বড্ড আনসায়েন্টিফিক কতা- বার্তা বলছেন আজকাল ক্ষেতুদা ! তাছাড়া, ওনাকে তো কুকুরে কামড়ায়নি ।

মহিলাও মওকা পেয়ে বললেন-

- হ ! হ ! দাদুয়ে ঠিক কথা কইসেন । আমাগো তো ঝাঁড়ফুকেরি দস্তুর ! অই যে কী কইলেন – পাতুরী না কি, ওইটা জইপ্যা দ্যান । নিরামিষ অইলেই অইল ।

- বুঝলে হে চন্দন ! কেন যে বললাম কথাটা তার একটা ব্যাখ্যা দেবো তোমায় । তবে, হঠাৎ এই মহিলা পাতুরী আর নিরামিষের কথা বললেন কেন ? বৈষ্ণবরা তো নিরামিষই খায় ।

- হঃ! হগ্গলই নিরামিষ । আমাগো গুরুদেবও কইতেন, মাচ খাবা তয় কাঁচকলা দিয়া রাইন্ধা । মাচ নিরামিষ হইয়া যাইবো গিয়া । আমরা মাচ খাই, তয় কাঁচকলা দেই মাচের ঝুলে । পুরা নিরামিষ । আঁশ পুরা বারণ আমাগো ।

- এটা আপনি ঠিক বলেছেন । শাস্ত্রেই আছে :- ইল্লিশ, খল্লিস, ভেটকি, মদগুর এব চ / রোহিত রাজেন্দ্র, পঞ্চমৎসানিরামিষাঃ । ক্ষেতু বাগচী একটানা শ্লোক বলে দমনিলেন । মহিলা, কি বুঝলেন কে জানে ? হাত জোড় করে- জয় রাধে বলে চেঁচিয়ে উঠলেন ।

- মিনিংটা কন ! সত্য কম্পুর ক্ষেতুদাকে জিজ্ঞাসা ।

- শাস্ত্রে বলছে- ইলিশ, খলসে, ভেটকি, মাগুর আর রুই মাছ, এই পাঁচরকম মাছই নিরামিষ ।

- আফনে বাউন ? মহিলার জিজ্ঞাসা ।

- খাস আই এস আই মার্কা বারিন্দির বাউন আমি। ক্ষেতুদার বুক চিতিয়ে উত্তর । তারক মোত্তির এর মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন । বললেন,

- পাকিস্তান সরকার কি আপনাকে কি এই সার্টিফিকেট দিয়েছে নাকি, ক্ষেতুদা ?

- বড্ড প্যাঁচ হে তোমার মনে ! ক্ষেতুদা বিরক্ত । এটা পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স নয় । ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট !

- বারিন্দিরের মনে প্যাঁচ থাকবে না ? কী যে বলেন ! তালে, আর বারিন্দিরদের কী বৈশিষ্ট্য রইল ? তারক মোত্তির কান খোঁচাতে খোঁচাতে উত্তর দিলেন । মহিলা,মনে হলো একটু চাঙ্গা হয়েছেন । বললেন,

- তাইলে ঠাকুরমশাই, অই মাচগুলা রান্না করলে আর কাঁচকলা লাগবো না কইত্যাচেন ?

- আলবাৎ ! মৎস্যপুরাণের শ্লোক বলে কথা ।

- বাঁচাইলেন ! আফনেই কন, কাঁচাকলা দিয়া ইলশা খাইতে ভালো লাগে ? মরিচপোড়া ঝুল আর সরিষা বাটা দিয়ে অয়নে খামু ! আঃ ! আচ্ছা, ঠাকুর মশাই, ইচা মাচ খাইতে পারুম ?

- শ্বেত সর্ষপ সহযোগে চিংড়ি অতি উপাদেয় । কোনো দোষ নাই ।

- কী কইলেন ?

- বলছি, সাদা সরষে বাটা দিয়ে ডাব চিংড়ি মানে ইচা মাছ খান, কোনো দোষ নাই । ডাব থাকলে চিংড়িওনিরামিষ ।

- বাঁচাইলেন ! হ্যায়রে গিয়া কমু অনে ! আমার শরীলটা অয়নে একটু ভাল্ লাগত্যাসে । ঠিক জায়গাত্ আসছি । কত্ত নাম ডাইক্তারবাবুর !

- কিন্তু, ক্ষেতুদা ! চন্দন ভুরু কুঁচকালো ।

- বল হে !

- হঠাৎ, পাস্তুরের নামটা জপ করতে কেন বললেন ?

- সে অনেক কথা ! দাঁড়াও ! একটা সিগারেট ধরিয়ে নিই ! বল- হরিকে বল চা দিতে !

- আমারটা ভাঁড়ে দিতে কইয়েন, মহিলা যোগ দিলেন । হরি হরি বলে একটু জপও করলেন বোধহয় ।

- চিকেন রোল খাবেন, ক্ষেতুদা ?

- আনাবে ? আনাও ! কি দিদি, আপনিও খাবেন নাকি ?

- কি খামু ?

- ওই যে চিকেন রোল ! মানে, মুরগীর মাংস ঝাল ঝাল করে কষে, পরোটা দিয়ে জড়ানো !

- কাঁচকলা থাকবো তো !

- না না ! কাঁচকলা থাকলে টেস্ট খুলবে না !

- তাইলে বাদই দ্যান । হরি, হরি ! জিভের জলটা বোধহয় পড়ল শাড়িতে ।

বল হরি চা দিয়ে গেল । শব্দ করে চুমুক দিলেন ক্ষেতু বাগচী । মহিলাও, শাড়ির আঁচল দিয়ে চায়ের গ্লাসকে ধরে চায়ে ফুঁ দিয়ে একটা চুমুক দিলেন । সিগারেট ধরিয়ে ক্ষেতু বাগচীর কথকতা আরম্ভ হলো -

- গত বছরের শীতকাল ! প্রচণ্ড ঠান্ডা । বোয়েচ ? একটা জরুরী কাজ সেরে ফিরতে রাত বারোটা হয়ে গেছে । ট্যাক্সিটা বড় রাস্তায় ছেড়ে দিতে হয়েছে ড্রাইভার গলিতে আসবে না বলে। হেঁটে পাড়ায় ফিরছি । ঠিক, গলির মোড়ের একটু আগে আমাকে চারধার দিয়ে ঘিরে ধরল, গোটা কয়েক নেড়ি । আমাকে দেখে গোঁ গোঁ করে মাটি আঁচড়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে । চারদিক দরজা জানলা বন্ধ । দৌড়ে গিয়ে যে কারও বাড়িতে উঠবো, তারও উপায় নেই । চট করে, মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল । নেড়ীদের অনেক কমন নাম থাকে । কালু, ভুলু, লালু,হেগো- এরকম আর কি ! আমি জোরে জোরে ওইসব নামগুলো বলে তু-তু করতে লাগলাম । তিনটে নেড়ি দেখি গোঁ গোঁ ছেড়ে, ল্যাজ নাড়তে লাগল । বাকিদেরও গোঁসা দেখলাম কমের দিকে । এই অবসরে আমি গলিতে ঢুকে পড়লাম । পাড়ার নেড়িগুলো আমায় চেনে । ওই নেড়িগুলোকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে তাড়িয়ে নিয়ে গেল ।

- এর সঙ্গে, পাস্তুরের সম্পর্ক কী? তারক মোত্তির বললেন ।

- সেটাই তো বলছি । এইসব নেড়িদের চিৎকার শুনে একটা ফ্ল্যাট বাড়ির পোষা অ্যালসেশিয়ান জলদ গম্ভীর স্বরে বকতে লাগল । নামটা জানতাম । বললাম- টাইগার, পাস্তুর ! বকাটা থেমে গেল । শিক্ষিত কিনা ! নেড়ি হলে বুঝতে পারতো না ।

মহিলা মন দিয়ে শুনছিলেন । তার প্রতিক্রিয়া

- তাইলে ডাইকতার বাবু, আফনে আমার মাথার উফরে লালু নামটাই জইপ্যা দ্যান । ওই বোষ্টুমের লগে একটা নেড়ি আইসিল । তারে, লালু কইরা ডাকতাছিল অই মিনষা । পাতুরীতে কাম নাই ! বাড়ি গিয়া ইলশা মাছের পাতুরী খামু অনে ।

চন্দন বলল- আচ্ছা দিদি আমি সাধু নই ! ডাক্তার ! আপনি বরং ওই ঠাকুরমশাইয়ের কাছ থেকে মাথায় জপ করিয়েনিন । সেরে গেলে, ভালো হয়ে যাবেন । তারক মোত্তিরও সায় দিলেন ।

ক্ষেতু বাগচী রেগে বললেন- এইজন্যই আমি আড্ডায় আসি না ! যত্তসব ফাতরা কথা ! বলে তীর বেগে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন ।

মৌ মধুবন্তী - শিশু ও অবিচার বিক্রি হয় না

শিশু ও অবিচার বিক্রি হয় না
মৌ মধুবন্তী


বয়েস মাত্র ৮ এবং ৯। ব্যস্ততম উন্নত দেশের সর্ববৃহৎ আলোকোজ্জ্বল নগরী নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের উল্টো দিকেই রমারমা ব্যবসা। খদ্দের-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনটে কচিলতা মুখ। নির্ভীক উচ্চারণ, একজন নিলে ২০ ডলার ৩ জন নিলে ১০ ডলার কম। আমরা তিনজনই বান্ধবি। টেক অল থ্রি অফ আস।

এই প্রেজেন্টেশান শেষ করে ঘরে ফিরে নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে রেখেছি সারা রাত। কোনটা শিশুশ্রম?

একি শিশুশ্রম নাকি আর কিছু? সময়ের বিবর্তন কি এইভাবে টোল বসায় জীবন নগরের উপর? কি গ্রাম, কি শহর, কি উন্নত দেশ আর অনুন্নত দেশ চিত্রের ভেদ ন্যুনতম।

আজকের উন্নত বিশ্বে প্রায় ৮০ ভাগ ছাত্রছাত্রী ছাত্রাবস্থায় কাজ শুরু করে। বয়েস একেক প্রভিন্সে একেক রকম হলেও ন্যুনতম বয়েস ১৪ থেকে ১৬ বছর। এরা প্রতি ঘণ্টায় পায় বড়োদের যা মিনিমাম বেতন তার চেয়ে অন্তত এক ডলার কম। তবে অনেকেই বেআইনিভাবে ও কাজ করে যাদের বয়েস উল্লেখ করতে গেলে আত্মা কেপে ওঠে। ৮ বছর থেকেই শুরু করে দুর্বার কঠিন সংগ্রাম। দুইরকম জীবনের গন্ধে এদের শ্বাস রোধ হয়ে আসে। এক নিম্ন বেতন। আরেক বেআইনিভাবে কাজের অভিজ্ঞতা । ক্রমশই আইনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে এদেরকে। কারন এরা বিচার পায়না প্রকৃত অর্থে কার ও কাছেই। না ঘরে, না কাজের জায়গায়। এদের মৃত্যুতে কেউ শোক গাথা গায় না। কেন এদের জীবনের শুরু হয় এমন অন্ধকারে?

অনিশ্চয়তা, অভাব ও অন্ধত্বই শিশুদেরকে অবেলায় কাজে যেতে বাধ্য করেছে। জানা নেই সেই সব বাবা মায়ের যে শিশুর বেড়ে উঠতে একটা নির্দিষ্ট বয়েস সীমা লাগে। চারিদিকে হাহাকার। সবাইকেই কাজে নামতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশান নেমে আসে পৃথিবীর বুকে, ঘরের কাজগুলো চলে গেছে ফ্যাক্টিরিতে। বাবা মা বোঝেনি যে একদিন যে শিশু ঘরের আঙ্গিনায় ফলমুল লাগাতে সাহায্য করত, আজকে তাকে ও কারাখানায় কত কঠিন পরিশ্রম করতে হচ্ছে। শুরুটা ঘরের চাহিদা মেটাতে এমনই বলা যায়। তারপর ক্রমশঃ ক্যাপিটালিস্ট সমাজ সুযোগ নিতে থাকে এই শিশুদের শ্রমের উপর। গতর ছোট, হাত ছোট, উৎপাদন কম( আসলেই কি কম ছিল?) তাই বেতন ও কম।

“Injustice doesn’t sell”- এই সব শিশুশ্রম নিয়ে বিশ্বে জাগরূক কিছু লোক কাজে মেতেছে। এতে বড়োদের পেটে ভাত জুটাবার আরেকটা উপায় বেরিয়েছে। কিন্তু শিশুদের অবস্থার কতটা উন্নতি হয়েছে তা কেবল সময়ের কাছে প্রশ্ন রেখে থমকে যাচ্ছে বিবেক।

বিশ্বের যাবতীয় শিশুকে দেখবার সময় একসাথে কারোই হবে না, হয় না। সম্ভব না। যেদিন আমি ডান্ডার্ণ ক্যাসেল, হ্যামিল্টন, অন্টারিওতে ঘুরে ঘুরে দেখছি আর ইতিহাস শুনছি, সেই ১৮৩০ সালের তৈরি ক্যাসেলের উন্নত সভ্য ডিসরুমে ঢুকে বাহারি সব ডিসের নমুনা দেখছি। তখন জানতে পেলাম সেই সময়ে ১০ বছর বয়েসের একটি মেয়ে মাসে মাত্র ১ ডলার বেতনে সারাদিন ঐ ব্যাসম্যান্টের কক্ষে ডিস ধোয়ার কাজে রত থাকতো। কোন ডিস ভাঙলে এক বেলা খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হতো। সেই কক্ষেই তার জীবনের এক বৃহৎ অংশ কেটে গেছে, বাবা মা আত্মীয় প্রিয়জনহীন। তার কেউ ছিল না। তবে কি সে না খেয়ে মরে যেত? কাজ তো কেউ দেবেই। সেদিন কি তার কাছে কোন উপায় ছিল? তার উপর মেয়ে বাচ্চা। নিরাপত্তা কোথায়? ধর্ষিত হতে মেয়ে হলেই তো হয়। বয়েস লাগে না। একটা গুহার দিকে ইঁদুরটা হা করে থাকে ।শুধু সুযোগটা এলেই হয়। ভালো কথা, একটা পরিচয় ও ইতিহাস এখানে সংযুক্ত আছে। স্যার এলান নেপিয়ার ম্যাকনাব, তৎকালীন রেলের একজন ম্যাগনেট ছিলেন। আর ছিলেন পেশায় ল’ইয়ার। পরবর্তিতে তিনি ইউনাইটেড কানাডা (১৮৫৪-১৮৫৬) এর প্রথম প্রিমিয়ার ছিলেন। তার পরিবার সহ তিনি উপরের কক্ষে আয়েশে বসবাস করতেন আর মাটির নীচের ব্যাসম্যান্টের কক্ষে থাকত চাকর-বাকর যারা তার বিলাসী জীবনের রসদ যোগান দিয়ে জীবিকা অর্জন করত। ইউনাটেড কানাডায় এই ছিল ইউনিটি।

ছোট একটি ঘটনার বহুল হৃদয় বিদারক কাহিনীটা বলি। যে কাহিনী পত্রিকায় আসেনি। কিন্তু আমার কাজের ক্ষেত্র থেকে আমি জানতে পারি। ২২ বছর বয়েসের একটি বিবাহিতা মহিলা তার একমাত্র মেয়ে যার বয়েস তখন ৫ বছর, কোন এক উপায়ে এসে হাজর হয়েছে কানাডায়। স্বামী ব্যবস্থা করেই পাঠিয়েছে, একদিন সেও কানাডায় আসবে এই আশা নিয়ে। কাজের অনুমতি নেই বলে যে কোন কাজেই যেতে বাধ্য এই মা। কিন্তু মেয়েকে কোথায় রাখবে? কাজ নিয়েছে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির বাসায়। ঘর দোর পরিষ্কার থেকে শুরু করে রান্নায় সাহায্য করা সবই তার কাজ। দু’জনের থাকার জায়গা হয়েছে বেশ। আনন্দে মন ভরে উঠেছে। যে পরিচিত লোক তাকে কাজ দিয়েছে, সে কোন চুক্তিতে কাজ দিয়েছে সে তো জানতো না? মাসের শেষে যে কয় টাকা বেতন পেত সব তার হাতে যেত। বাসার বাসিন্দা মাত্র চারজন। স্বামী স্ত্রী আর দুই ছেলেমেয়ে। কথা হলো নেয়েটি তাদের বাচ্চাদের সাথেই স্কুলে যাবে। যায়। ভাষার যে দেয়াল ছিল তা ক্রমশ সরতে থাকে। মেয়ে মাকে দু একটা করে ইংরেজি শেখায়। একদিন মেয়ে দেখে ফেলে মালিকের কাছ থেকে সেই আংকেল টাকা নিচ্ছে এবং যেহেতু সে ইংরেজি বোঝে তার বুঝতে বাকী রইলো না যে তার মায়ের ও তার কাজের পয়সা তাদের ঠকিয়ে আংকেল নিয়ে যায়। আংকেল ও বুঝতে পেরেছে মেয়ে জেনে গেছে। সেই সন্ধ্যায় আংকেল অনেক কৌশল করে মেয়েকে কিছু কাপড় কিনে দেবে বলে পাশের শপিং মলে নিয়ে গেল। মায়ের আপত্তি করার কিছু নেই। এই লোক প্রথন দিন থেকেই তাকে সাহায্য করছে। সেই যে মেয়ে গেল আর কোনদিন মা জানতে পারেনি তার মেয়ে কোথায় কেমন আছে। সেদিন থেকে আংকেল কে আর কোঠাও খুঁজে পাওয়া যায় নাই। সেই মায়ের করুণ আর্তি আমি বর্ণনা করতে অক্ষম । আজকাল এই ধরনের ঘটনা থেকে ছেলে বাচ্চারাও রেহাই পাচ্ছে না।

আজকের বিশ্বের দিকে তাকালে যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তার একটা ছোট্ট চিত্র তুলে ধরছি, গড়ে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়েসের শিশুরা প্রতি ৬ জনে একজন কাজে নিয়োজিত। এই বয়েসের শিশুদের শতকরা ১৬ ভাগ কাজে রত- এ হোলও ডেভেলপিং দেশের চিত্র। তার চেয়েও নিম্মানের দেশগুলোতে শতকরা ৩০ ভাগ শিশুরা শিশুশ্রমে নিয়োজিত। সারা বিশ্বে ১২৬ মিলিয়ন শিশু কাজ করে খুবই হ্যাজাডাস পরিবেশে। প্রায়শ তারা মারধরের, গালাগাল থেকে শুরু করে যৌন নির্যাতনের পর্যন্ত শিকার ।প্রায় ১।২ মিলিয়ন শিশু ( বালক ও বালিকা) প্রতিবছর পাচারের শিকার হয়। অতপর এদের ঠাই হয় কখনো কখনো কৃষি কাজে,খনিতে , কারাখানায়, অস্ত্র কারাখানা সহ কমার্শিয়াল যৌন বিক্রি কারাখানায়। যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি কি করে নিউ ইয়র্কের উজ্জ্বল আলোর চারিদকে তাদেরকে দিয়ে ব্যবসা করানো হয়। এই ট্রাফিকিং এর শিকার হয় বিশেষ করে মেয়েরা, সর্বনিম্ন ১৮ মাস থেকে উর্ধে ৭৯ বছর পর্যন্ত। নিরাপত্তা কোথায় মেয়েদের জন্য? নো সেফ হোম। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী শিশু শিশুশ্রমের সাথে জড়িত সাব-সাহারা, আফ্রিকাতে।

এর সাথে অবশ্যই জড়িত আছে দেশে আর্থসামাজিক অবস্থা এবং শ্রেণিভেদ। এই শ্রেণিভেদের শিকার হয় গরীব শ্রেণি ও মধ্যবিত্ত সমাজ। এখানে এসে প্রশ্নের মুখোমুখি হই। জম্নেই যে শিশু দুধ পায়না খেতে তাকে কে পাঠালও দুনিয়াতে? যদি সে ঈশ্বর, তবে ঈহস্বরের ঘরে কেন তার জায়গা হয় নাই? কোন দোষে তাকে বিনা আহারের ব্যবস্থায় এই পৃথিবীর ধ্বংসযজ্ঞে নেমে আস্তে বাধ্য করেছে? কেন তার জন্য বাসস্থান তৈরি হবার আগেই সে এসে পড়েছে জন্মলাভের টিকেট কেটে এই ধরায় অধরা হয়ে থাকতে? কে তুমি ঈশ্বর। তোমার কাছে জিজ্ঞাসা বিচার কি কিনলে পাওয়া যায়? কে তবে বিক্রি করে? তুমি? তোমার অনুচর সাগরেদ? আমি এর বিচার চাই। কোথায় তোমার দোকান বলো, আমি কিনে নেব আমার অসহায় শিশুদেরকে এই অসহায় পৃথিবীর আবর্জনা থেকে। শিশুদের জন্য গড়ে তোলও এক মুক্ত পৃথিবী ভেদাভেদ হীন একটি মঞ্চ শিশু মঞ্চ।

টরন্টো, কানাডা

বাঙালির শিশুসাহিত্য - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

বাঙালির সৃষ্টি ভুবনে শিশু মানস
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়


লীলা মজুমদার আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন যে সুকুমার রায় ভুল সময়ে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন । তাঁর মনে হয়েছিল ‘ঐ সময়ে সুকুমারের জন্য দেশটা প্রস্তুত ছিলনা’ । ছোটদের জন্য যে সাহিত্য রচনা বিগত দেড়শ’ বছর ধরে হয়ে আসছে তাকে আমাদের সাহিত্য আলোচকরা কেন সাহিত্যের মর্যাদা দিতে কুন্ঠা বোধ করেন সে এক রহস্য । বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের পাঠ্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শিশু সাহিত্যের কোনো উল্লেখ নেই । সেই পাঠ্য ইতিহাস তন্ন তন্ন করে খুজলেও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার , কিংবা সুকুমার রায় সম্পর্কে একটা অক্ষরও খুজে পাওয়া যাবে না । অথচ ঠাকুরমার ঝুলি, টুনটুনির গল্প , আবোল তাবোল পড়ে বড় হইনি এমন বাঙালি খুঁজে পাবো না ।


লীলা মজুমদার এই আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন তাঁর জেঠতুতো দাদা সুকুমার রায়ের জন্ম শতবর্ষের স্মৃতি চারণে । তারপর ২৫টা বছর কেটে গেছে । আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বিন্যাশ বদলে গেছে – বদলে যাচ্ছে এবং সেই বদলের প্রক্রিয়াতেই চুরি হয়ে গেছে আমাদের সন্তানের শৈশব । এখন আর ‘বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ’ ওঠে না , ‘শোলক বলা কাজলা দিদি’রাও আর নেই । সে আর ঘুমাতে যায় না ‘ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসির’ গল্প শুনে । শৈশব নেই , সুতরাং শিশুসাহিত্যও নেই ।

আধুনিক কবিযশ প্রার্থী – আমরা, শিশুমনের চিরন্তন খোরাক এই সব ছেলেভোলানো ছড়াকে সাহিত্য পদবাচ্য বলে মেনে নিতে কুন্ঠিত হই, কিন্ত ভাষাচার্য সুকুমার সেন যুগ যুগান্তের ধারাবিকতায় প্রবহমান ছড়া – গান- রূপকথার গল্পকে চিহ্নিত করেছেন ‘শিশু-বেদ’ বলে । মুণি ঋষিদের মুখে মুখে সৃষ্ট চার খন্ডের বেদ যেমন কোনো এক মানব গোষ্ঠীকে আদি-অনন্তকাল থেকে নিয়ন্ত্রিত করছে , সে ধ্রুব সত্য বলে মেনেছে , তেমনই রচয়িতার নাম না জানা অথচ সময়ের আদীমতম কালখন্ড থেকে মানুষের মুখে মুখে সৃষ্ট প্রবহমান শিশুতোষ ছড়া-গান-গল্প তো আরো এক বেদ – শিশু-বেদ । সমস্ত মানব গোষ্ঠিরই এই ‘শিশুবেদ’ আছে, এমনকি যে মানব-গোষ্ঠীর কোনো স্থায়ী সাহিত্য নেই তাদেরও । সর্বদেশে সর্বকালে এই ছেলেমি ছড়া শুনে শুনেই আমরা বড় হয়েছি, জীবনকে জেনেছি, চিনেছি, আমাদের সাহিত্যেরও বীজ হয়ে গেছে এইসব অজস্র লৌকিক ছড়া, রূপকথার গল্প, গান । আর তাই-তো শিশুসাহিত্যের চিরকালিন উপাদান লোক পরম্পরায় প্রচলিত ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’র আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “ভালো করিয়া দেখিতে গেলে শিশুর মতো পুরাতন আর কিছুই নাই । দেশ-কাল-শিক্ষা-প্রথা অনুসারে বয়স্ক মানবের কত নতুন পরিবর্তন হইয়াছে, কিন্তু শিশু শত সহস্র বৎসর পূর্বে যেমন ছিল আজও তেমনি আছে; সেই অপরিবর্তনীয় পুরাতন বারম্বার মানবের ঘরে শিশুমূর্তি ধরিয়া জন্মগ্রহণ করিতেছে – অথচ সর্বপ্রথম দিন সে যেমন নবীন, যেমন সুকুমার, যেমন মূঢ়, যেমন মধুর ছিল আজও ঠিক তেমনই আছে । এই নবীন চিরত্বের কারণ এই যে শিশু প্রকৃতির সৃজন” ।

বয়ঃক্রম ও মানসিক বিকাশের স্তর অনুযায়ী শৈশব, বাল্য কৈশোর ইত্যাদি ভাগ করে থাকি । যোগীন্দ্রনাথ সরকার, দক্ষিনারঞ্জন মিত্রমজুমদার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী , সুকুমার রায় প্রমুখের রচনা শিশুমনের খোরাক যোগায় । ঠিক একশ’ বছর আগে উপেন্দ্র কিশোর শিশু মনের পত্রিকা ‘সন্দেশ’ শুরু করেছিলেন ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের কথা মনে । সুকুমার রায়ের যা কিছু সৃষ্টি তা এই সন্দেশ পত্রিকাতেই । বাংলা শিশু সাহিত্যের নিজস্ব কোন চরিত্র তখনো গড়ে ওঠেনি । বলা যায় উপেন্দ্র কিশোরের হাত ধরেই বাংলা শিশু সাহিত্যের একটা স্পষ্ট অবয়ব গড়ে ঊঠেছিল, হয়েছিল বাংলা শিশু সাহিত্যের প্রাণ প্রতিষ্ঠা ।

শিশু সাহিত্য বলতে আজও আমরা যাদের কাছে ফিরে যাই তারা হলেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্রকিশোর, দক্ষিনারঞ্জন মিত্র মজুমদার , সুকুমার রায় এবং সেই এক ও অদ্বিতীয় রায় পরিবার- সুখলতা, পুন্যলতা, লীলা মজুমদার । তারও আগে, অবশ্যই বাঙালির শেষ আশ্রয় রবীন্দ্র নাথ’এ । শিশু মনকে রবীন্দ্রনাথের মত কেইবা বুঝেছেন তাঁর আগে ? বস্তুত, শিশু সাহিত্য কেমন হবে , তার কল্পনার জগৎটা কেমন, তার নির্দেশ রবীন্দ্রনাথই দিয়েছেন । রবীন্দ্রনাথের শৈশব কেটেছে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে – ভৃত্য পরিবৃত হয়ে । শিশুমনের শৈশব হারানোর বেদনা তিনি বুঝেছিলেন । রবীন্দ্রনাথের গল্প-কবিতা- নাটকে তাই দেখি অনেক অসামান্য শিশু চরিত্র , তার মনোজগত, কল্পনা জগতের বিশ্বস্ত ছবি । পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের ‘ছেলেটা’ কবিতায় তিনি নির্দেশ করেছেন যে শিশুর নিজের জগতটাকে তার চোখে, তার মত করে না দেখলে তাদের ভালোলাগার কবিতা –গল্প হতে পারেনা । লিখেছেন –

“থাকতো ওর নিজের জগতের কবি
তাহলে গুবরে পোকা এতো সুস্পষ্ট হ’ত তর ছন্দে
ও ছাড়তে পারতোনা
কোনদিন ব্যাঙের খাঁটি কথা কি পেরেছি লিখতে ?
আর সেই নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি !”

শিশু তার নিজের জগতের কথাকার পেয়েছিল – দক্ষিনারঞ্জন মিত্রমজুমদার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়ের মধ্যে । স্বাধীনতা উত্তর কালে প্রেমেন্দ্র মিত্র , শিবরাম চক্রবর্তী , নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বা সত্যজিৎ রায় প্রমুখের রচনাগুলি কিশোর সাহিত্য, কিশোর বয়ঃক্রমের চাহিদা অনুযায়ী লেখা, সেগুলি এ নিবন্ধের আলোচ্য নয় । স্বাধীনতা উত্তর কালে শৈলেন সরকার প্রমুখ শিশু মনের গল্প-কবিতা লিখেছেন সত্য, কিন্তু চিরন্তন শিশু সাহিত্যের সন্ধান করতে আজও আমাদের যেতে হয় উপেন্দ্র কিশোর –দক্ষিনা রঞ্জন – সুকুমার- এই ত্রয়ীর কাছে ।

উপেন্দ্রকিশোর মূলত গদ্যই লিখতেন । শিশু মনের গল্প আর সেইসঙ্গে ইতিহাস, পুরান, বিজ্জান ও প্রাণীতত্ব প্রভৃতি জটিল বিষয়গুলির রমনীয় ভঙ্গিতে শুনিয়েছেন শিশুদের – তারা সেই প্রথম সাহিত্যের স্বাদ পেতে শিখেছিল উপেন্দ্রকিশোরের কাছ থেকেই । শুধুমাত্র ছোটদের জন্য যে পত্রিকা ‘সন্দেশ’ পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন, তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল তাঁর জীবদ্দশার ও পরবর্তী সময়ে, শিশু সাহিত্যের এক লেখক গোষ্ঠী - শিশু সাহিত্যের আশ্চর্য লেখক পরিবার - উপেন্দ্র কিশোর – সুকুমার-সুখলতা- পূণ্যলতা-কুলদা রঞ্জন-প্রমদা রঞ্জন – লীলা – সত্যজিৎ ।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার শিশু সাহিত্যের এই প্রাণ প্রতিষ্ঠা, শিশু মনে রূপকথার কল্প-জগতকে উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং শিশু মানসে এক উদ্ভট কল্প-জগতের সৃষ্টি করে শিশু সাহিত্যের যে অপরূপ বৈভ্‌ তাতে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ ও সাহচর্য ছিল । বস্তুত ঠাকুর পরিবারের সাহিত্য- সঙ্গীত- শিল্প চর্চাই উপেন্দ্রকিশোরকে অনুপ্রাণীত করেছিল ঠাকুর বাড়ি থেকে তখন প্রকাশিত হ’ত ‘বালক’, পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত ‘মুকুল’ প্রভৃতি ছোটদের পত্রিকা । ঠাকুর বাড়ির এই সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিবেশই তাঁকে উদবুদ্ধ করেছিল, আর বাঙালি পেয়ে যায় শিশুমনের প্রাণের মানুষ অদ্বিতীয় শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোরকে । এমনকি উপেন্দ্রকিশোরের প্রথম গ্রন্থ ‘ছেলেদের রামায়ণ’এর পান্ডুলিপি ও প্রুফ সংশোধন করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ । পুস্তকটির ভূমিকা থেকে আমরা একথা জানতে পারি।

উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সুহৃদ । তাঁর চেয়ে ষোল বছরের কনিষ্ঠ দক্ষিণারঞ্জনের ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথের আশির্বাদ ছিল । উপেন্দ্র কিশোর সরস ভাষায় পশু-পাখী, বাঘ-ভাল্লুকের গল্প শোনালেন আর দক্ষিণারঞ্জন শিশুমনকে রূপকথার কল্প-জগৎ’এ নিয়ে গেলেন আর সুকুমার রায় সৃষ্টি করলেন শিশুমনের অজানা এক উদ্ভট জগৎ । দক্ষিণারঞ্জন বাঙ্গালির চিরায়ত শিশু সাহিত্য ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ লিখেছিলেন আজ থেকে ১০৫ বছর আগে । আমার কাছে বইটির যে সংস্করণ আছে সেটি ২৯তম সংস্করণ, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮০তে । তখন পর্যন্ত ঠাকুরমার ঝুলির বিক্রয় সংখ্যা ছিল এক লক্ষ চল্লিশ হাজার । তথ্যটি দেওয়া এইজন্য যে এ থেকে বোঝা যায় কি বিপুল জনপ্রিয় বাঙ্গালির শিশু সাহিত্যের এই সোনার খনিটি । দক্ষিণারঞ্জন কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন নীলকমল-লালকমল , বুদ্ধু-ভুতুম , কাঞ্চনমালাদের কথা ? তাঁর নিজের কথায় “মা’র আঁচলখানির উপর শুইয়া রূপকথা শুনিতেছিলাম...মা’র মুখের অমৃত-কথার শুধু রেশগুলি মনে ভাসিতঃ পরে কয়েকটি পল্লীগ্রামের বৃদ্ধার ময়ূখে আবার যাহা শুনিতে শুনিতে শিশুর মতো হইতে হইয়াছিল ...”। উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে , আর বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ । যেখানে তিনি লিখেছিলেন “...ইহার উৎস বাংলা দেশের মাতৃস্নেহের মধ্যে । যে স্নেহ দেশের রাজ্যেশ্বর রাজা হইতে দীনতম কৃষককে পর্যন্ত বুকে করিয়া মানুষ করিয়াছে, সকলকেই শুক্ল সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ দেখাইয়া ভুলাইয়াছে এবং ঘুমপাড়ানি গানে শান্ত করিয়াছে। নিখিল বঙ্গের সেই চির পুরাতন গভীরতম স্নেহ হইতে এই রূপকথা উৎসারিত । অতয়েব বাঙালির ছেলে যখন রূপকথা শোনে – তখন কেবল যে গল্প শুনিয়া সুখী হয়, তাহা নহে – সমস্ত বাংলা দেশের চিরন্তন স্নেহের সুরটি তাহার তরুণ চিত্তের মধ্যে প্রবেশ করিয়া তাহাকে যেন বাংলার রসে রসাইয়া তোলে”। রবীন্দ্রনাথের এই নির্দেশ থেকেই আমি বুঝতে চেয়েছি বাঙ্গালির চিরায়ত শিশু সাহিত্যের স্বরূপ ও তার লোকপ্রিয়তার সূত্রটি ।

মৃত্যুর ২বছর পূর্বে উপেন্দ্রিকিশোর শুরু করেছিলেন ‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রকাশনা । ঐ বছরই পুত্র সুকুমার লন্ডন থেকে মুদ্রণ প্রযুক্তিতে উচ্চতর শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে , এদেশের প্রথম ‘ফেলো অফ রয়াল ফোটোগ্রাফিক সোসাইটি’ শিরোপা নিয়ে দেশে ফেরেন ও ‘সন্দেশ’এ লেখা, ছবি আঁকা ও অন্যান্য কাজে নিবিড় ভাবে জড়িত হয়ে পড়েন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত । পিতার মৃত্যুর পর তিনিই ‘সন্দেশ’এর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন । এই নয় বছরে (শেষ আড়াই বছরের শয্যাশায়ী অবস্থা সহ), সুকুমার লিখেছিলেন ১০৩টি কবিতা, ৮৮টি নানা ধরণের ছোট গল্প, ১২২টি প্রবন্ধ, ৮টি নাটক ও ২টি বড় গল্প আর এঁকেছিলেন পত্রিকার সমস্ত ছবি । সুকুমার রায়ের কনিষ্ঠ খুড়তুতো ভগ্নী শিশু সাহিত্যের দিকপাল, প্রয়াতা লীলা মজুমদার আক্ষেপ করেছিলেন “এখন মনে হয়, ঐ সময়ে সুকুমারের জন্য এ দেশটা প্রস্তুত ছিল না” । তাঁর আক্ষেপের কারণ আছে, এবং আমাদেরও । সুকুমার রায়ের সমকালীন আলোচক বৃন্দ তাঁকে ‘ছোটদের জন্য হাসির কবিতা লেখেন’ এর বেশি মর্যাদা তাঁকে দেননি । লীলা মজুমদারের জিজ্ঞাসা ছিল “ কোনো বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শিশু সাহিত্যিকদের উল্লেখযোগ্য বলে মনে করা হতনা, সেটাই কি কারণ”? এই আক্ষেপ আমাদেরও । আজও আমরা তাকে ‘ননসেন্স লিটারেচর’এর আশ্চর্য শ্রষ্টার বেশি জানিনা । জানিনা যে তিনি হাফটোন মুদ্রণ পদ্ধতির অন্যতম পুরোধা, একাধিক বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা করেছেন । জন্মের একশ’পঁচিশ বছর পরেও বাংলা শিশু সাহিত্যে সুকুমার রায়ের অবদান অমলিন হয়ে আছে – নিশ্চিতভাবেই থাকবে আরও বহুদিন ।

একটা মূলত কবিতার পত্রিকা যখন সুকুমার রায়কে ১২৫তম জন্মবর্ষের শ্রদ্ধা নিবেদন করে তখন আশা জাগে, প্রত্যাশা করতে ইচ্ছা হয় – হয়তো বা বাংলার শিশু সাহিত্যের অতীত গৌরবকে স্মরণে রেখে বাংলার শিশু সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস পাবো । আগামী বছরের প্রথমার্ধেই আমাদের শিশু সাহিত্যের প্রাণপুরুষ উপেন্দ্র কিশোরের সার্ধ-শতবর্ষ পূর্তি , এ বছর সুকুমার রায়ের একশ’পঁচিশতম জন্মদিন পেরিয়ে এলাম ,আগামী বছরের প্রথমার্ধে উপেন্দ্রকিশোরের সার্ধ-শতবর্ষ পূর্তি আর ছোটদের প্রাচীনতম পত্রিকা ‘সন্দেশ’এর শতবর্ষ পূর্তি । নিশ্চিত ভাবেই বাঙ্গালির শিশুসাহিত্য সম্পর্কে কিছু আলোচনা হবে । সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন “যে শিশু ভুমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে....../এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি --/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার” । এই প্রজন্মের আমরা ছড়া - গল্প-কবিতা – গানে শিশুমনের কাছে পৌছাতে পারলে সেই অঙ্গীকার পালনে কিছুটা অংশভাগী হতে পারি ।

শিশুসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ- পৃথা রায়চৌধুরী

শিশুসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ – শিক্ষাতত্ত্ব - আনন্দের মোড়কে
পৃথা রায়চৌধুরী


ঠিক কি পড়ে শিশুরা? কিংবা, প্রশ্নটা এভাবেই মনে আসে, ছোটোদের ঠিক কি পড়তে দেয় বড়োরা? ছোটোদের জন্য লেখা ছোটোরা লেখেও না, বাছেও না। তাই ‘শিশুসাহিত্য’ রচনা করতে হলে লেখকের এক চোখ রাখতে হয় শিশু-পাঠকদের ওপর, আর অন্য চোখ রাখতে হয় তার অভিভাবকদের দিকে। কথাটি খুব সত্য। ছোটোদের জন্য কিছু লিখতে হলে একাধারে অভিভাবক এবং শিশু পাঠকদের মনোরঞ্জন করা দরকার। অর্থাৎ, সে লেখার মধ্যে শিক্ষা অ আনন্দ, উভয়ের সমাবেশ প্রয়োজন; এবং যিনি সত্যিকার শিশুসাহিত্যিক হবেন, তাঁকেও হতে হবে একাধারে শিক্ষক ও লেখক।

সৌভাগ্যক্রমে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এই দুইয়েরই সমন্বয় ঘটেছিল। তাঁর জ্ঞানের শিখা স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছে শিশুর মনস্তত্ত্বের স্তরে স্তরে। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাতত্ত্বের মূল কথা ছিলো, স্বাধীনতা ও সংযম। আপাতদৃষ্টিতে এ দুটিকে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও, রবীন্দ্রনাথ সংযম বলতে শুধুমাত্র শৃংখলা বোঝেননা, বরং তা যেন এক ধরনের আত্মপ্রতিষ্ঠা। শিশু ও বালকের দেহেমনে যে উদ্দাম আনন্দবেগ ক্ষণে ক্ষণে সৃষ্ট হয়, তাকে কবি উচ্ছৃঙ্খলতা বলতে রাজী নন। এই সহজ উচ্ছৃঙ্খলতাকে তিনি কোনোদিন কঠোর শাসন করতেও চাননি। কবির লক্ষ ছিলো শিশু ও বালকদের শিক্ষাদর্শে সংযম, আনন্দের মধ্যে সংযম, জীবনের প্রতি কর্মে, ভাবনায় সংযমের প্রবেশ ঘটানো। তাই শিশু মনিবের দাবি মেটানোর জন্য কবি লিখলেন ‘শিশু’, ‘শিশু ভোলানাথ’, ‘ছড়া’, ‘ছড়ার ছবি’ প্রভৃতি কাব্য ও ছড়া আর ‘সহজপাঠ’ ইত্যাদি পাঠ্যপুস্তক।

রবীন্দ্রনাথ কাজ ও খেলার মধ্যে পার্থক্য টানতে চাননি। ‘খেলার জগতে শিশু হয়ে জন্মেছেন—এই ঘটনাটির মধ্যেই মানবজীবনের মূল সত্যটি আমাদের জীবনের ভুমিকারূপে লিখিত হয়েছে’ বলে কবির ধারণা। কবির ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থ তাঁর এই মনোভাবের পরিচায়ক।

‘শিশু’ কাব্য গ্রন্থের ‘বিচিত্র সাধ’ কবিতায় কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো ফুলবাগানের মালী, আবার কখনো বা রাতের পাহারাওয়ালা হবার সাধ কবির শিশু মনে জেগে উঠেছে, আর এই সাধ তো কেবলমাত্র রবীকবির নয়- এ সাধ যেন চিরন্তন শিশুমনের।

‘বিজ্ঞ’ কবিতাটিতে কবি যেন ছোট্টো বোনের অতিবিজ্ঞ, পরিণত বয়স্ক—সে তার মাকে বলে ওঠে--

“তোমার খুকি চাঁদ ধরতে চায়
গণেশকে ও বলে যে মা গানুশ।
তোমার খুকি কিচ্ছু বোঝেনা মা
তোমার খুকি ভারি ছেলেমানুষ।“

কবির বিখ্যাত ‘বীরপুরুষ” কবিতাটিতে শিশু কবি যেন মস্ত এক বীরপুরুষ—যার তলোয়ারের আঘাতে ডাকাতদল পালকী ছেড়ে পলায়ন করে—আর ‘মা’ যেন তাঁর চিরন্তন আকাঙ্খার প্রতিধ্বনি করে ওঠেন—“ভাগ্যে খোকা ছিল মায়ের কাছে”। মায়ের রক্ষাকর্তা হিসাবে শিশুমন নিজেকে কল্পনা করেছে।

‘মাঝি’ কবিতায় কবি শিশুমনের কল্পনায় মাঝি রূপে খেয়া পারাপার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ‘লুকোচুরি’ কবিতায়—“চাঁপা গাছে চাঁপা হয়ে ফুটি”—কবির শিশুমন যেন মায়ের সঙ্গে চাঁপাফুল হয়ে লুকোচুরি খেলতে চায়।

শিশুমনের এই যে সমস্ত লাগামছাড়া ইচ্ছার বৈচিত্র্য—এসবের প্রকাশ কবির কবিতাগুলিতে সহজেই ঘটেছে—কারণ কবি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একটি চিরন্তন শিশুসত্ত্বা সুপ্ত ছিলো এবং যার দাবী তাঁর কাছে ছিলো অগ্রগণ্য।

‘শিশু’র পরে তাঁর রচিত ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যপর্যায়ের ‘রবিবার’, ‘অন্য মা’ এবং ‘রাজমিস্ত্রী’ কবিতাগুলি শিশুপাঠ্য অনবদ্য কবিতা।

‘রবিবার’ কবিতায় কবির মস্ত আক্ষেপ—

“সোম মঙ্গল বুধ এরা সব
আসে তাড়াতাড়ি
এদের ঘরে আছে বুঝি
মস্ত হাওয়া গাড়ি?
রবিবার সে কেন মাগো,
এমন দেরি করে?
ধীরে ধীরে পৌঁছয় সে
সকল বারের পরে।”

সপ্তাহান্তের ছুটির দিন রবিবারটির অপেক্ষায় শিশুমনের এমনই জিজ্ঞাসা বুঝি!

‘অন্য মা’ কবিতায় কবির শিশুমন কল্পনায় বিভোর—তার মা যদি অন্য কারও ‘মা’ হয়ে যায় কোনক্রমে—তবে কি ‘সেই অন্য মা’ তার এই পুত্রকে চিনবেনা? কবি কিন্তু নানা ভাবে তার মাকে বুঝিয়ে দেবে, যে সে তারই ছেলে—আদি এবং অকৃত্রিম।

কখনো বা কবির শিশুমন ‘রাজমিস্ত্রী’ কবিতায় ‘নোটো’ রাজমিস্ত্রী হতে চেয়েছে—ইঁটের পরে ইঁট গেঁথে বিশাল অট্টালিকা গড়ার স্বপ্ন দেখেছে।

কবি রবীন্দ্রনাথ শিশুমনের বিচিত্র কল্পনার জগতে অনায়াসে বিচরণ করেন। কবিতাগুলি পাঠ করলে আমাদের দায়িত্বশীল বয়স্ক মনও যেন সহসা বাল্যকালের অনাবিল আনন্দের জগতে ডুব দিতে চায়—শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও যেন কিছুক্ষণের জন্যে সমস্ত বিচক্ষণতা, সংযমের কঠিন বেড়া ভেঙ্গে শৈশবে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করি।

এগুলি ছাড়া কবি ‘খাপছাড়া’ কাব্যপর্য্যায়ে কিছু সংক্ষিপ্ত ছড়া রচনা করেছেন—যেগুলির অর্থোদ্ধার সমস্ত বুদ্ধির উর্দ্ধে, অথচ অপূর্ব শিশুপাঠ্য। একটির উল্লেখ করা যায়—

“ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির
পাঁচ বোন থাকে কালনায়,
শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায়
হাঁড়িগুলো রাখে আলনায় ।”

অথবা

“পাড়াতে এসেছে এক
নাড়ীটেপা ডাক্তার,
দূর থেকে দেখা যায়
অতি উঁচু নাক তার ।”

শিশুসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের শেষ দান পাঠ্যপুস্তক রচনা। পাঠ্যপুস্তক বলতে শিশু ও বালক-বালিকাদের মনে বিভীষিকার ভাব উদয় হয়। কবিরচিত ‘সহজপাঠ’ তেমন ভীতিপ্রদ গ্রন্থ নয়।

এ বিষয়ে শ্রদ্ধেয় প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের মন্তব্য উল্লেখ করা যায়—“ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এককালে বাঙ্গালী ছেলেকে ভাষার রাজ্যে প্রবেশাধিকার দেন, আমাদের যুগে রবীন্দ্রনাথ ভাবের রাজ্যে, ছন্দে আনন্দলোকে শিশুর মনকে মুক্ত করিলেন।“

শিশুদের বিজ্ঞান শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয়তাও কবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টির গোচরে ছিলো। তাই তিনি শিশুদের ‘বিশ্বপরিচয়’ নূতনভাবে লেখার জন্য বহু গ্রন্থ পাঠ করলেন। তাঁর প্রচেষ্টা ছিলো বিশ্বতত্ত্বের আধুনিকতম মতাদি সহজসরল ভাবে লেখা—যা শিশুমনকে আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর কাজটিও করবে।

কবির শিশুমনটির গভীরে ডুব দিয়ে মণিমাণিক্যাদির আহরণের কাজটি আজও সম্পূর্ণ হয়েছে বলে মনে হয়না—কারণ তাঁর রচিত শিশুসাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক আলোচনা এখনো পর্য্যন্ত হয়নি।

বর্তমান যুগের কঠিন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ মানসিক বিকাশের দিকটির কথা মনে রেখে রবীন্দ্রনাথ রচিত শিশু সাহিত্যের সামগ্রিক আলোচনা এক্ষণে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি।

কম্পিউটার বনাম খেলনাবাটি - ব্রততী চক্রবর্তী

কম্পিউটার বনাম খেলনাবাটি 


দৃশ্য ১


সামনের বিশাল কাঁচের দেওয়ালের দিকে চেয়ে আছে সৌরভ। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে । একটা ছোট্ট কফি ব্রেক নিয়েছে ও । এগার তলা থেকে ওপারের ছবিগুলো বেশ ঝাপসা । দূরের মাঠটিতে কয়েকটি ছেলে ছুটোছুটি করে ফুটবল খেলছে । কোন শব্দ না শুনে ও ওই হইচই, চেঁচামেচির প্রতিটি বর্ণ, অক্ষর, কমা, দাঁড়ি বুঝে যায় সৌরভ। নিজের ফেলে আসা সময়কে ছুঁতে চোখ বন্ধ করতে হয়না। অদ্ভুত এক গন্ধে জানান দেয়। হেসে ফেলে অজান্তেই । আচ্ছা তুকুন কি কখনো এই গন্ধ পাবে ? তুকুন ওর নয় বছরের ছেলে । সৌরভ ভীষণ চায় এই গন্ধটা তুকুনের সাথে শেয়ার করতে । কিন্তু তুকুন খেলতে ভালবাসেনা । ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি ওর ভীষণ আগ্রহ। স্কুলে যেতে শুরু করার আগেই ও বাবার ল্যাপটপ খুলতে আর বন্ধ করতে শিখে গিয়েছিল । এ জন্য অবশ্য সৌরভের গর্বের শেষ নেই। সবাই বলে বাপ কা বেটা । গত জন্মদিনে ওকে একটা ডেক্সটপ গিফট করেছে । সৌরভ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল - ক্লাসে ফার্স্ট হলে ওকে একটা কম্পিউটার কিনে দিতে হবে। এখন সমস্ত অবসর সময় ওই কম্পিউটার নিয়েই কাটে ছেলের। নতুন নতুন গেমস, নতুন নতুন অ্যাচিভমেন্ট - বাড়ি ফিরতেই কলকল স্বরে গল্প শোনায় তুকুন । ভালই লাগে সৌরভের - তুকুনের উত্তেজনা, শীলার অপত্য- মুগ্ধতা । তবু মাঝে মাঝে একটা কষ্ট গলার কাছে আটকায় - তুকুন কি ওই গন্ধটা কখনই পাবে না ? নাকি ওর কাছে ও একটা গন্ধ আছে, যা ওর নিজের মতো - সৌরভের গন্ধের থেকে এক্কেবারে আলাদা !

দৃশ্য ২


হঠাৎ তন্দ্রা কেটে যায় মৃদুলার - শেষ দুপুরে একটু ঝিমুনি মতো এসেছিল । মিঠির আলতো ঝাঁকিতে জেগে ওঠেন । 'ঠাম্মি আমার বারবির চুলটা একটু আঁচড়ে দেবে?' ধড়মড় করে উঠে বসেন মৃদুলা, কোলের কাছে টেনে নেন বছর পাঁচেকের নাতনিকে । ' গল্প বোলো ' - আবার আবদার , 'তোমার পুতুলের বিয়ের গল্প' , মৃদু হেসে গল্প শুরু করেন তিনি । পাশের বাড়ির গৌরীর সাথে কি বন্ধুত্বই না ছিল । রান্না বাটি, পুতুলের বিয়ে, আড়ি-ভাব -- বলতে বলতে হৃদয় জুড়ে ডানা ঝাপটায় একজোড়া সাদা পায়রা । এমন সময় থমথমে মুখে ঘরে ঢোকে রমিতা - ওনার পুত্রবধূ । ' মা, এইভাবে ওকে রোজ রোজ রান্না বাটি আর পুতুলের বিয়ের গল্প শোনাবেন না । রান্নাঘর আর সংসার সামলানো ছাড়াও যে মেয়েদের একটা অস্ত্বিত্ব আছে সেটা মিঠিকে বুঝতে হবে । আপনার ছেলে জানতে পারলে কিন্তু খুব আপসেট হবে । যাও মিঠি, ও ঘরে যাও , তোমাকে যে নতুন গেমটা বাপি এনে দিয়েছে সেটা নিয়ে খেলো সোনা , আমি এখুনি আসছি। ' খুব বিব্রত বোধ করেন মৃদুলা । গোধূলির রাঙ্গা আলোয় চাপা পড়ে যায় কুন্ঠারুন মুখ । তিনি কিছুতেই বুঝতে পারেন না তার ভুলটা কোথায় ।

বলাবাহুল্য যে উপরে বর্ণিত চরিত্ররা কাল্পনিক, তবে ঘটনার নির্যাসটুকু কিন্তু ঘন বাস্তব । আমাদের আশেপাশে এই পরিবর্তিত শৈশবের অনুভুতি বেশ কড়া আর এই অনুভতির গায়ে লেগে আছে দুশ্চিন্তার আঁশটে গন্ধ । ইতি উতি উঁকি দেয় কিছু আশঙ্কা - এই সময়ের শৈশব কি হারাচ্ছে সেই স্বর্গীয় সারল্য ? কাঁচা মনের নির্ভেজাল সরলতা যাকে জগতের পবিত্রতম রূপে স্বীকার করে আমাদের হৃদয়, সেই দিব্য সরলতায় মিশছে কি খাদ ? কেন এই ছন্দপতন ? কারন অনুসন্ধান করতে গিয়ে মুখোমুখি হই এক ' যান্ত্রিক ' ইন্দ্রজালের - নাম তার কম্পিউটার গেমস ! গত দশক থেকেই হইহই করে ভারতীয় শৈশব ও কৈশোরে ঢুকে পড়েছে কম্পিউটার গেমস । ধুলো কাদা মাখা বাল্যাবস্থা থেকে ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত টিন এজ । কম্পিউটার গেমসের কল্যানে শিশুরা এখন অনেক বেশি ঘরমুখী । নাগরিক শৈশব তথা কৈশোর এখন অনেক বেশি স্মার্ট, তুখোড় - বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছায়ায় অনেক বেশি পরিনত । তবে এই পরিবর্তনে আমাদের ভুমিকাও ছোট নয় । 'দুধে - ভাতে ' নয়, মা - বাবার নব্য অভিলাষ এখন সন্তানের কম্পিউটারে দক্ষতা যেন হয় বিল গেটসের মতো, মা - বাবার নাপসন্দ বন্ধুদের থেকে যেন সর্বদা বজায় থাকে দূরত্ব ! আর যদিও বা ইচ্ছে হয় হাত-পা ছোঁড়ার, কংক্রিটের এই জঙ্গলে মাঠ কোথায় ? তাই সমাধানের ঠিকানা কম্পিউটার গেমস ! পাঁচ থেকে পঞ্চাশের সমান প্রিয় !

কম্পিউটার গেমসের সুলুক সন্ধান


বিগত সাত- আট বছরে কম্পিউটার গেমসের জনপ্রিয়তা আমাদের দেশে হু হু করে বেড়েছে । পশ্চিমের দেশগুলিতে প্রায় পঞ্চাশ বছরের ও বেশি সময় ধরে কম্পিউটার গেমস তথা ভিডিও গেমস রাজত্ব করছে । ভারতের মতো তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশে ও এই ইলেক্ট্রনিক খেলাটির জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া । এটি মূলত একটি সফটওয়্যার যাকে মনিটর , মাউস ও কী-বোর্ডের মাধ্যমে অপারেট করা যায় ।

১৯৫৮ সালে মার্কিন পদার্থবিদ উইলিয়াম হিগিনবোথাম তার কর্মক্ষেত্র বিশেষত ল্যাবরেটরিতে আগত দর্শনার্থীদের মনোরঞ্জনের জন্য 'টেনিস ফর টু' নামে একটি ইলেক্ট্রনিক গেম উদ্ভাবন করেন। তৎকালীন সময়ে এই ভাবনাটি ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ । এটি বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম ভিডিও গেম রূপে স্বীকৃত । তবে 'স্পেসওয়ার' বানিজ্যিক ভাবে সফল প্রথম কম্পিউটার গেমস। এই গেমটি ১৯৬২ সালে রিলিজ হয় এবং প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করে । প্রথম পর্যায়ে এই গেমস গুলিতে অত্যন্ত সাধারন মানের গ্রাফিক্স ব্যবহৃত হত। তাই প্রাথমিক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও ১৯৮১-৮২ নাগাদ কম্পিউটার গেমসের বাজার পড়ে যায়। প্রধানত বেশি দাম অথচ ডিউরেবিলিটির অভাবই এর অন্যতম কারন । তবে ১৯৮৭ সালে কম্পিউটারে মাউসের ব্যবহার শুরু হলে কম্পিউটার গেমসের গ্রাফিকাল ইন্টারফেস যথেষ্ট উন্নত হয় এবং এর জনপ্রিয়তাও ফিরে আসে । ১৯৯৩ সালে বাজারে আসে থ্রিডি গেম ডুম । প্রথম আবির্ভাবেই তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে ডুম । এরপর থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি । বহু কম্পিউটার গেমস বাজারে এসেছে এবং আসছে । এখনো পর্যন্ত এই গেমসগুলির জনপ্রিয়তায় ভাঁটার টান পড়েনি।

কম্পিউটার গেমস মূলত চার প্রকারের - প্রথম হল ' স্ট্র্যাটেজিক ', এই ধরনের খেলায় প্রয়োজন ধৈর্য আর একাগ্রতা । দ্বিতীয় প্রকারের নাম হল ' ফার্স্ট পার্সন শুটার ' । এ ক্ষেত্রে এমন একটা আবহ তৈরি হয় যেন যে খেলছে সে নিজেকে ওই গেমটির সক্রিয় অংশ হিসেবে ভাবতে পারে । এই ধরনের গেমস গুলি ভীষণ জনপ্রিয় । তবে সব থেকে বেশি চাহিদা 'থার্ড পার্সন ভিউ' - এর । এই জাতীয় গেমের ভ্যারাইটি প্রচুর । এখানে প্লেয়ার বাইরে থেকে গেমটিকে নিয়ন্ত্রন করে । বিভিন্ন স্পোর্টস গেম যেমন ফুটবল, ক্রিকেট বা ফাইটিং গেমগুলি এই জাতীয় গেমের শ্রেনীভুক্ত । চতুর্থ তথা শেষ প্রকার হল 'রেসিং' গেম । ভীষণ ইন্টারেস্টিং এই গেমের চরিত্র। এখানে প্লেয়ার ইচ্ছে মতো গেমটিকে ফার্স্ট পার্সন বা থার্ড পার্সন মোডে চালাতে পারে । তবে কম্পিউটার গেমসের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ভায়লেন্সের বাড়াবাড়ি ।

বিশেষজ্ঞেরা কি বলছেন ?

পশ্চিমের দেশগুলিতে কিশোর মনে কম্পিউটার গেমসের প্রভাব রীতিমতো সিরিয়াস আলোচনার বিষয় । কম্পিউটার গেমসের ইতিবাচক ও নেতিবাচক ভূমিকা নিয়ে প্রচুর প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লেখা হয়েছে । জে কর্ণওয়েল, এম গ্রিফিথের মতো সমাজবিদেরা পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ধরনের গেমসের তীব্র ঋণাত্মক প্রভাবকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁদের মতে এই ধরনের ইলেকট্রনিক খেলার বহুল চর্চা তরুন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পরশ্রীকাতরতা , অ্যাগ্রেসন, মানসিক ভঙ্গুরতা প্রভৃতি বিভিন্ন কুপ্রভাবের জন্ম দেয় । যেন তেন প্রকারেন জিত হাসিল করাতেই এদের অভীষ্ট পূরণ । পরাজয়ের মোকাবিলা করার ক্ষমতা ক্রমশ কমতে থাকে । সর্বোপরি এদের মধ্যে আক্রমনাত্মক ও হিংসাত্মক প্রবনতা তৈরি হতে পারে বলে তাঁদের ধারনা । তবে বিশিষ্ট প্রোফেসর হেনরি জেনকিন্স কম্পিউটার গেমসের পক্ষে সওয়াল করেছেন । তাঁর মতে কম্পিউটার গেমসকে শিখণ্ডীর মতো ব্যবহার করা হচ্ছে । বস্তুত পরিবর্তিত সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপটই বাচ্চাদের মধ্যে অসহিস্নুতা ও আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি করছে । এক্ষেত্রে অভিভাবকদের উপর ও সমান দায় বর্তায় । সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে কম্পিউটার গেমসের ব্যবহার কিশোর প্রজন্মের মধ্যে মানসিক দক্ষতা, একমুখীনতা, সাফল্যের খিদের মতো পজিটিভ গুণের বিকাশ ও ঘটাতে পারে ।

খেলনাবাটির অচিনপুর

খেলনাবাটি শব্দটি উচ্চারিত হলেই নক্ষত্রের নরম আলোয় ডুবে যায় যেন স্মৃতির উঠোন । শব্দটি আসলে রূপক মাত্র । এর আড়ালে আছে এক মায়াময় আশ্চর্য রূপকথার জগত । ছেলেবেলার নিশ্চিন্ত দিন প্রতিদিন । জীবনের সূর্য যখন মধ্য গগনে তখন ও এই মনকে ভেজায় ওই কিশলয় সময়ের সবুজ সুর । রোজ বিকেলের ফুটবল, ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন অথবা অসময়ে লুকিয়ে ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো বা দুপুরের রোদকে ভেংচি কেটে বন্ধুদের সাথে সাইকেল নিয়ে সাঁই সাঁই করে ছুটে যাওয়া ! কখনো মাটি খুঁড়ে সুড়ঙ্গ বানানো আর অকারন কাদা জলে মাখামাখি এই সুযোগে । কানা মাছি ভোঁ ভোঁ যাকে পাবি তাকে ছোঁ ! হাওয়ায় ওড়ে কাগজের এরোপ্লেন, বর্ষার জমা জলে ভাসে অংক খাতার পাতা ছিঁড়ে বানানো নৌকা । কখনো আবার পড়ন্ত বিকেলের চড়ুইভাতি কিংবা পুতুলের বিয়ে । এই টুকরো সময়গুলো ক্রমশ উধাও হয়ে যাচ্ছে চারপাশ থেকে । আমরা কিছুই করতে পারছিনা ।

উপক্রমণিকা


কম্পিউটার গেমস যে অতি আকর্ষণীয় টাইম পাস তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই । কচিকাঁচারা প্রান ভরে উপভোগ করুক । ভয় যদিও একটাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রযুক্তির হাতের পুতুল না হয়ে যায়, প্রকৃতির স্নিগ্ধতা থেকে দূরে কৃত্রিমতার আঁধারে ডুবে না যায় । সৃজনশীলতা, অনুভুতির গভীরতা যেন অটুট থাকে। এই খেলায় দর্শন ও শ্রবন যন্ত্রের যৌথ উত্তেজনা এক তীব্র আসক্তি তৈরি করে । এর জন্য বারবার এই খেলা খেলতে ইচ্ছে করে । হেরে গেলে জিততে ইচ্ছে করে, জিতলে আরও ভালো করে জিততে ইচ্ছে করে । আর এই ইচ্ছের উপর রাশ টানাই অভিভাবকদের দায়িত্ব । কালের প্রবাহ কিছু নতুনত্ব বয়ে আনবেই । তাকে সঠিক ভাবে গ্রহনের উপযুক্ত হয়ে ওঠা দরকার শুধু ।



বাণীব্রত কুন্ডু - সুকুমার রায় ১২৫

তবু কবি কুমার চিরকাল! – সুকুমার রায় ১২৫

“শুনেছ কি বলে গেল সীতানাথ বন্দ্যো?
আকাশের গায়ে নাকি টকটক গন্ধ?”

সে কোন ছেলেবেলায় যে বাবুরামের হাত ধরে সুকুমারকে জানতে শিখেছি তা আজ আর ঠিকঠাক মনে পড়ে না! তবে মনে আছে আজো, সেই কোনো এক শীতের সকালে চওড়া উঠোনে মাদুরি বিছিয়ে পড়তে বসতাম রোদের দিকে পিঠ পেতে। গায়েতে থাকতো মায়ের হাতে বোনা লাল-হলুদ-সবুজ রঙের শোয়েটার আর মাথায় মায়ের হাতের মতো নরম আর আঁচলের মতো প্রশস্ত মাফলার। আমার ছোটো সাইজের মাথা প্রায় পুরোটাই ঢেকে যেত। মনে হতো আমি হারিয়ে যাচ্ছি! তবু যেন কোথাও একটা পরম নিশ্চিন্তের আশ্রয়েই আমার বসবাস। ঘুমিয়ে উঠে আবার ঘুম চলে আসতো। প্রথমভাগ, দ্বিতীয়ভাগ সব যেন ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করতো! দু-একটা ডিগবাজি খেতে খেতে অবশেষে মায়ের বকুনিতে খানিক স্থির হতাম। তারপর আমারই অত্যাচারে ন্যাতা হয়ে যাওয়া বইগুলোকে কাছে টেনে নিতাম সযত্নে। পড়া শুরু করতাম...



“বাবুরাম সাপুড়ে,
কোথা যাস্‌ বাপু রে?
আয় বাবা দেখে যা,
দুটো সাপ রেখে যা!
যে সাপের চোখ নেই,
শিং নেই নোখ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না,
কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস ফাঁস,
মারে নাকো ঢুঁশ্‌ঢাঁশ,
নেই কোনো উত্পাত,
খায় শুধু দুধভাত –
সেই সাপ জ্যান্ত
গোটা দুই আনত?
তেড়ে মেরে ডাণ্ডা
ক’রে দিই ঠান্ডা।”

এমনিভাবেই হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে কখন যে শিশুশ্রেণীর দিনগুলি, উঠনের রোদে পিঠ করে বসে থাকার দিনগুলি ক্রমশ পিছনে পড়ে গেছে সে খেয়ালও করিনি কখনো। তবুও আজ লিখতে বসে মনে পড়ছে শিশুকাল থেকে যৌবনে উত্তীর্ন হবার প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল সুকুমারের সহজ অস্তিত্ব। স্কুলপাঠ্যেই ছিল কিনা সঠিক মনে নেই যদিও, সেই সময়ে পড়েছিলাম ‘সত্পাত্র’, ‘ছায়াবাজি’, ‘রামগরুড়ের ছানা’, ‘নোটবই’, ‘আবোল তাবোল’ ‘কুমড়ো পটাশ’, ‘গোঁফচুরি’, ‘খুড়োর কল’, ‘পালোয়ান’, ‘বোম্বাগড়ের রাজা’, ‘গন্ধ বিচার’, ‘ভয় পেয়ো না’ ইত্যাদি বহুপ্রিয় কবিতাসমূহ। হইহুল্লোড়মাখা স্কুলজীবনের দিনগুলিতে আমাদের সবরকম হাসি-ঠাট্টা, আনন্দ-ফুর্তি, মনখারাপের অনুভূতিগুলো আবর্তিত হতো সুকুমারকে ঘিরেই। খানিকটা না জেনেই। এমনকি কলেজজীবনেও সুকুমার ছিলেন ভীষণ ভীষণভাবে জড়িয়ে। হোস্টেলের তিনটি বছরের প্রায় গোটা একটি বছর কেটে গিয়েছিল ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ নিয়ে। নাটক নির্বাচন-চরিত্র নির্ধারণ-পাঠ বিভাজন-পাঠ মুখস্ত করা... আর রাত্রে খাওয়ার পর অনুশীলন। স্বপ্নের মধ্যে ডায়ালগ আওড়াত কেউ কেউ। রিহার্স্যালকালীন সময়গুলো ছিল হাসি-খুশির স্বর্ণযুগ। যাঁর রেশ রয়ে আছে এখনো। হনুমানের জবানিতে জনান্তিকে বলা সেই উক্তি, - হ্যাঁরে! কে আমার লেজে পা দিয়ে দিলি? – কৌতুক মিশ্রিত ক্লেশানুভূতির অভিনয় আজও অমলিন হয়ে আছে। আজও। এখনো দেখা হলেই বন্ধুদের সঙ্গে শুরু হয়ে যায় একে অপরকে রাগানো। আর এখনো... কর্মজীবনেও...। সুকুমার অম্লান।

সে যাইহোক! যে কথা বলার- এই লেখাটি লেখার জন্য সুকুমারের বইগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে মনে মধ্যে ছোটো ছোটো জিজ্ঞাসাচিহ্নের আনাগোনা সংশয়ের সৃষ্টি করে। আমরা আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই সুকুমারের কবিতায়, নাটকে যে কৌতুকরস উপভোগ করি তা কি নেহাতই হাল্কা মেজাজে বন্ধু-স্বজনের মধ্যে হাল্কা হাসি-ঠাট্টা, খোশ-গল্প, ইয়ার্কির উপজীব্য! আমার তো তা মনে হয় না। কবির প্রখর বাস্তবতাবোধই রক্ষণশীল সমাজকে ব্যঙ্গরসে বিদ্ধ করেছে সত্যের সন্ধানে। আমরা যারা সমাজে প্রচলিত চিরাচরিত রীতিনীতিকে সংস্কার করার পরিবর্তে সেটাকেই আগলে ধরে রাখতে চাই পদস্খলনের ভয়ে কবিকলম তাদেরকেই হেনেছে বিদ্রূপবাণ। ভাববিলাসী ‘বাবুসম্প্রদায়’কে উচিত শিক্ষা দিইয়েছেন তিনি সমাজের নিচুতলার অভাবী মানুষের মাধ্যমে। ‘জীবনের হিসাব’ কবিতায় একথা পরিস্কার।

“বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই চড়ি সখের বোটে
মাঝিরে কন, “বলতে পারিস্‌ সূর্যি কেন ওঠে?
চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? জোয়ার কেন আসে?”
বৃদ্ধ মাঝি অবাক হয়ে ফ্যাল্‌ফেলিয়ে হাসে।
বাবু বলেন, “সারা জনম মরলি রে তুই খাটি,
জ্ঞান বিনা তোর জীবনটা যে চারি আনাই মাটি!”

খানিক বাদে কহেন বাবু “বল্‌ত দেখি ভেবে
নদীর ধারা কেম্‌নে আসে পাহাড় হতে নেবে?
বল্‌ত কেন লবণপোড়া সাগরভরা পাণি?”
মাঝি সে কয়, “আরে মশাই, অত কি আর জানি?”
বাবু বলেন, এই বয়সে জানিসনেও তাকি?
জীবনটা তোর নেহাত খেলো, অষ্ট আনাই ফাঁকি।”

* * *

খানিক বাদে ঝড় উঠেছে, ঢেউ উঠেছে ফুলে,
বাবু দেখেন নৌকাখানি ডুব্‌ল বুঝি দুলে।
মাঝিরে কন, “একি আপদ! ওরে ও ভাই মাঝি,
ডুব্‌ল নাকি নৌকো এবার? মরব নাকি আজি?”
মাঝি শুধায়, “সাঁতার জানো?” মাথা নাড়েন বাবু,
মূর্খ মাঝি বলে, “মশাই, এখন কেন কাবু?
বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব করো পিছে,
তোমার দেখি জীবনখানা ষোল আনাই মিছে।”

তো, এ ভাবেই! এভাবেই সুকুমার তাঁর অন্তরের বিদ্রোহকে প্রকাশ করতেন এক রসালাপী ভাববিভঙ্গীমায়। সরল গল্পচ্ছলেই এ কবির কথা বলা। পুরাতন যুগে বিষ্ণুশর্মা, নারায়ণশর্মা প্রমুখ পন্ডিতগণ মানুষকে নীতিশিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে যেমন অবলম্বন করেছিলেন পশুপাখিদের! তাদের মুখ দিয়ে গল্প বলানো, সু-উপদেশ দেওয়ানো! কারণ, প্রত্যক্ষ পরামর্শ গ্রহণ করতে মানুষ হীনমন্যতায় ভোগে। গগনচুম্বী আশা-আকাঙ্ক্ষা মানুষকে ভুলিয়ে দেয় তার নীতিবোধ, ভুলিয়ে দেয় উচিত-অনুচিত, যুক্তি-চেতনা। পরশ্রীকাতরতা মানুষকে অন্ধ করে তোলে। একবারের জন্যও সে ভাবে না – স্থান-কাল-পাত্রের পরিস্থিতিতে সে কতটা উপযোগী। মানবসমাজে কাকেরা আজকাল বড় বেশি ময়ূর সেজে ঘুরে বেরাচ্ছে। কিন্তু তাদের আত্মবিবেচনা নেই। যা সুকুমারের বিদ্‌ঘুটে জানোয়ারেরও আছে। তাই সে নিজেকে সাজায়, আবার নিজেকে নিজে বিশ্লেষণও করে।

“বিদ্‌ঘুটে জানোয়ার কিমাকার কিম্ভূত
* * *
এটা চাই সেটা চাই কত তার বায়না-
কি যে চায় তাও ছাই বোঝা কিছু যায় না।
কোকিলের মতো তার কন্ঠেতে সুর চাই,
* * *
আকাশেতে উড়ে যেতে পাখিদের মানা নেই-
তাই দেখে মরে কেঁদে-তার কেন ডানা নেই!
হাতিটার কী বাহার দাঁতে আর শুণ্ডে-
ওরকম জুড়ে তার দিতে হবে মুণ্ডে!
* * *
সিংহের কেশরের মতো তার তেজ কৈ?
পিছে খাসা গোসাপের খাঁজকাটা লেজ কৈ?
* * *
চুপিচুপি একলাটি ব’সে ব’সে ভাবে সে –
লাফ দিয়ে হুশ্‌ করে হাতি কভু নাচে কি?
কলাগাছ খেলে পরে কাঙ্গারুটা বাঁচে কি?
ভোঁতামুখে কুহুডাক শুনে লোকে কবে কি?
এই দেহে শুঁড়ো নাক খাপছাড়া হবে কি?
“বুড়ো হাতি ওড়ে” ব’লে কেউ যদি গালি দেয়?
কান টেনে ল্যাজ ম’লে “দুয়ো” ব’লে তালি দেয়?
কেউ যদি তেড়েমেড়ে বলে তার সামনেই –
“কোথাকার তুই কেরে, নাম নেই ধাম নেই?”
জবাব কি দেব ছাই, আছে কিছু বলবার?
কাঁচুমাচু ব’সে তাই, মনে শুধু তোলপাড় –
“নই ঘোড়া, নই হাতি, নই সাপ বিচ্ছু
মৌমাছি প্রজাপতি নই আমি কিচ্ছু।
মাছ ব্যাং গাছপাতা জলমাটি ঢেউ নই,
নই জুতা নই ছাতা, আমি তবে কেউ নই!”

কবির নিজস্ব কল্পলোক থাকবে সত্য, কিন্তু তা রচিত হয় বাস্তবের অভিজ্ঞতার নিরিখেই। তাই যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকেরা যা সৃষ্টি করেছেন তা কখনোই সমকাল বহির্ভূত নয়। বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনাই কবিকল্পনায় জারিত হয়ে সাহিত্যের রূপ লাভ করে। যেহেতু সমকালের দৃষ্টিতে কোনো সমসজই কখনোই স্বচ্ছ নয়, আর তাই বলা যায় – বর্তমানেও যেমন অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার হাতফেরি হয় অতীতেও তার অন্যথা ছিল না। হতে পারে এখনকার সময়ের তুলনায় অল্পসংখ্যক, কিন্তু ব্যাপারটা ছিল। উদাহরণ স্বরূপ, দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে যে চিরকালই কলুষতা ছিল তা “হাতুরে” কবিতা থেকে খানিক আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না।

“একবার দেখে যাও ডাক্তারি কেরামৎ-
কাটা ছেঁড়া ভাঙা চেরা চট্‌পট মেরামৎ।
কয়েছেন গুরু মোর, “শোন শোন বত্স,
কাগজের রোগী কেটে আগে কর মক্‌স”।
উত্সাহে কি না হয়? কি না হয় চেষ্টায়?
অভ্যাসে চটপট্‌ হাত পাকে শেষটায়।
খেটে খুটে জল হ’ল শরীরের রক্ত –
শিখে দেখি বিদ্যেটা নয় কিছু শক্ত।
* * *
ছেলে হও, বুড়ো হও, অন্ধ কি পঙ্গু,
মোর কাছে ভেদ নাই, কলেরা কি ডেঙ্গু –
কালাজ্বর, পালাজ্বর, পুরোনো কি টাট্‌কা,
হাতুড়ির একঘায়ে একেবারে আট্‌কা!”

আবার, রাস্তাঘাটে মানুষ রাস্তা হারালে কিছু কিছু মানুষ যে সেই সুযোগের সত্ভাবে অসৎ ব্যবহার করে তার নিদারুন উদাহরণ অনেকেরই থাকে। আমার ক্ষেত্রেও ঘটেছিল একবার। যারা এপ্রকার কান্ডটি সমাধা করে ওমনি তাদের প্রতি মন্তব্য ঠিক্‌রে আসে- “আজকালকার ছোক্‌রারা...” কিন্তু এরকম রাস্তায় ঘোরানোর রীতি চলে আসছে, চলেই আসছে। আর সেই বাস্তবতাই উঠে এসেছে “ঠিকানা”য়।

“ঠিকানা চাও? বল্‌ছি শোন; আমড়াতলার মোড়ে
তিন-মুখো তিন রাস্তা গেছে তারি একটা ধ’রে,
চলবে সিধে নাক বরাবর, ডানদিকে চোখ রেখে;
চল্‌তে চল্‌তে দেখবে শেষে রাস্তা গেছে বেঁকে।
দেখ্‌বে সেথায় ডাইনে বাঁয়ে পথ গিয়েছে কত,
তারি ভিতর ঘুর্‌বে খানিক গোলকধাঁধার মত।
তারপরেতে হঠাৎ বেঁকে ডাইনে মোচড় মেরে,
ফিরবে আবার বাঁইয়ের দিকে তিনটে গলি ছেড়ে।
তবেই আবার পড়্‌বে এসে আমড়াতলার মোড়ে –”

সমাজের চালাক-চতুর, মোড়ল কিংবা বিদ্বত্জনকেও তথা নাগরিক সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে তিনি হাসতে হাসতে চূড়ান্ত ব্যঙ্গের শিখরে দাঁড় করিয়েছেন। অগাধ সত্য বলছেন অথচ বলছেন না।

“এসব কথা শুন্‌লে তোদের লাগবে মনে ধাঁধা,
কেউ বা বুঝে পুরোপুরি, কেউ বা বোঝে আধা।

কারে বা কই কিসের কথা, কই যে দফে দফে,
গাছের ’পরে কাঁঠাল দেখে তেল মেখ না গোঁফে।

একটি একটি কথায় যেন সদ্য দাগে কামান,
মন-বসনের ময়লা ধুতে তত্ত্বকথাই সাবান।

বেশ বলেছ, ঢের বলেছ, ঐখেনে দাও দাঁড়ি,
হাটের মাঝে ভাঙবে কেন বিদ্যে বোঝাই হাঁড়ি!”

যাইহোক! কবি ‘সুকুমার রায়’কে নিয়ে বাঙালি কবি, সাহিত্যিক কিংবা গবেষক- কারোরই কোনো হেলদোল চোখে পড়ে না। অথচ যাকে নিয়ে, যাঁর কবিতা-গল্প-নাটক-প্রবন্ধ নিয়ে অনেক কিছুই করার আছে, কেন তাঁকে শুধু শিশুদের কবি বলে আড়াল করা হয়! কেন তাঁর সাহিত্যের অন্তর্নিহিতার্থ ব্যাখ্যাত হচ্ছে না! সেখানেও কি সমাজের মাথাদের কোনো কারসাজি লুকিয়ে আছে! যেহেতু আমরা সবাই তেলা মাথায় তেল দিতে পছন্দ করি। আমরা সবাই শক্তের ভক্ত। এই অল্পসময়ের স্বল্পপরিসরে কিছুই লিখে উঠতে পারলাম না। গুটিকতক কবিতার উপরই সারতে হল। বাকি পরে রইল সমস্তটাই। এখানে উল্লেখ না করা তাঁর বাকি লেখাও উঠে এসেছে কঠিন বাস্তবেরই জঠর নিঙড়ে। শুধু প্রকাশভঙ্গিমাটি অন্যরকম। হয়তো তিনি ভালোবেসে ভালো করতে চেয়েছিলেন! হয়তো বা হাসি দিয়ে জয় করতে চেয়েছিলেন! আর তাই আমার কাছে সুকুমারের কবিতার অর্থবোধ কিছুদিন আগে পাওয়া এক বন্ধুর এস.এম.এস-এর মতোই। সবারই জানা। যেটা ছিল এই রকম-

   স্যার                 – থ্রি ইডিয়ট্‌ ফিল্ম সে ক্যা শিখা?
কে.জি স্টুডেন্ট     – আত্মহত্যা কর্‌না বুড়া হ্যায়।
 স্কুল স্টুডেন্ট        – এইম্‌ খুদ্‌ নে ডিসাইড্‌ ক্যরো
 কলেজ স্টুডেন্ট    – নাক বিচ্‌ মে নাহি আতি।     

তো, সেই রকমই!! আমাদের শিশুবেলায় সুকুমার শৈশবের কবি হলেও সময়ের সাথে সাথে, আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে বহু পথ পেরিয়ে সেইসব একই কবিতার ভিতরে জ্বলে ওঠে বারুদ, ফুটে ওঠে সমাজের গভীর, গভীরতর অসুখের সন্ধান। যেদিকে আমারা তাকাতে চাই না। যদি কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে আমাদেরই কাঠগোড়ায় দাঁড়াতে হয়! অথচ দেখুন, মায়ের মতো করে স্নেহচুম্বন কপালে এঁকে দুষ্টু ছেলেকে তাঁর শোধরাতে চেয়েছেন, শিশুসুলভ ভঙ্গিমাতেই! যেন, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতের রোদে যখন পিঠ তেতে যায়; মায়ের হাতের স্নেহপরশ, মায়ের হাতের শান্তিসুধা -

“টকটক থাকে নাকো হলে পরে বৃষ্টি-
তখন দেখেছি চেটে একেবারে মিষ্টি।”

এবেলা ওবেলার শৈশব - শৌনক দত্ত তনু

এবেলা ওবেলার শৈশব
শৌনক দত্ত তনু


সময় নিরন্তর ছুটছে। তার পায়ে ধুলো উড়ে না। সময়ের খেয়ালে কখন যেন যান্ত্রিক হয়ে গেছে জীবন। পাল্টে যাওয়া সময়ে পাল্টে গেছে সব। এমন কী শৈশব সময়ও । নগরায়নের ছোঁয়া শহর পেরিয়ে এখন গ্রামে। বিলুপ্তের রুলটানা খাতায় প্রতিদিন লেখা হচ্ছে কারো নাম আমরা তার খবরও রাখি না। আমাদের এত সময় কোথায়! কতপাখি হারিয়ে যাচ্ছে রোজ,কত নদী তার পাশে বেড়ে ওঠা কাশফুল,কত মাঠ,কত দিগন্ত,আকাশ,তার নীচে বেড়ে ওঠা কোমলমতি শৈশব। আমরা তার খোঁজও রাখি না। কিংবা খোঁজ রাখি কেবল অবসর মেলে না তাদের পাশে বসবার।

শৈশব আবার হারায় কি রে? আড্ডায় কথাগুলো বলতে বলতে সিন্‌হার করা প্রশ্নে একটু থামতে হলো। শুভঙ্কর সিন্‌হা। বাবা মার এক মাত্র পুত্রসন্তান। কোচবিহার ম্যাগাজিন রোডে ওর বাসা এখন স্ত্রী পুত্র নিয়ে চাকরিসূত্রে কলকাতায়।

তুই বলতে চাইছিস এখনকার শিশুদের শৈশব চুরি যায়নি? -না। এখনকার শিশুরা অনেক কিছু পাচ্ছে জন্মের পরেই যা আমরা পাইনি।

তোর এই কথাটা তাই মানতে পারলাম না। -সব বলতে? আধুনিক এবং আধুনিকতার কথা বলছিস তুই?
-হ্যাঁ। জন্মের পর তুই কিংবা আমরা কি মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেটে হাতের মুঠোয় পৃথিবী পেয়েছি?

ওরা পাচ্ছে। এটা শৈশব থেকেই ওদের মেধাবী তৈরি করছে। সিন্‌হার মতো অনেকেই হয়তো এমন করেই ভাবে। তবু আমার মনে হয় পথ হাঁটে না পথিক হেঁটে যায়। একসময় শৈশব হাওয়া ধরতে নদীর ওপারে যাবার স্বপ্ন দেখতো। একদিন রেলব্রিজের সন্ধেটার সাথে তার দেখা হয়ে যেত। রেললাইনের দিগন্ত গমনের পথ দেখে সে বিস্ময়ে চেয়ে থাকত আর দ্রাঘিমাংশের অসংখ্য আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন বুনতো। ভারী বইয়ের ব্যাগ কাঁধে যখন শিশুকে হাঁটতে দেখি তার চোখে আমি স্বপ্ন দেখি না। জিজ্ঞাসা খুঁজে পাই না তার অভিব্যক্তিতে। এ কি আমার দেখার ভুল? বন্ধু বান্ধবীদের সন্তানদের দেখি আর অবাক হই। তাদের শিশুকে জন্মের বছর চারেক পরেই অলরাউন্ডার বানাবার ইচ্ছায় শৈশব কেড়ে নেয়া দেখি। ঘড়ি ধরা জীবন তখন থেকেই একটু একটু করে স্বপ্ন কেড়ে নেয় তা জানতেও পারি না হয়তো।

আমাদের সময় বিকাল মানেই বাহারী খেলার জগত। গুটিগুটি পায়ে প্রথমে দুধ ভাত থাকতে হতো বয়সে বড়দের সাথে খেলায়। তারপর ধীরে ধীরে মূল খেলোয়াড় হয়ে উঠা। কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাকে পাবি তাকে ছোঁ, গোল্লাছুট, কুতকুত, জলডাঙ্গা, পুলিশ চোর, একটু বড় হয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, দায়রাবান্ধা, হাডুডু, এসব খেলা এখন আর শৈশব কে ছুঁয়ে থাকে না। মাঠ কমে গেছে কখন,কমে গেছে মাটি কাদা মেখে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা।

ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধাশ্রমের এই বেড়ে ওঠার পেছনে কোথাও কি আজকের আত্মকেন্দ্রিক বেড়ে ওঠা শৈশব দায়ী? আজকের প্রায় পরিবার যখন সময়ের দাবীতে মা বাবা আর আমি-তে বেড়ে উঠছে তখন আমি বেড়ে উঠছি দাদু দিদা আত্মীয়স্বজনহীন একটি নিয়ম জগতে। মা বাবা দুজনেই যখন চাকরির দৌড়ে ছুটছে আমি তখন গৃহপরিচালিকার সাথে বাড়ছি। পড়ালেখা, গান, আঁকা, সাঁতারের ব্যস্ত সিডিউলে আমার জগত তখন টিভি,কম্পিউটার গেমসের নিজস্বতায় সাজচ্ছে। তাহলে কি তখন থেকেই নিজেরটা বুঝে নেবার যে শিক্ষা তা শৈশবকে আত্মকেন্দ্রিকতায় গড়ে তুলছে? একাকীত্বের এই বেড়ে ওঠা শৈশবকে করছে বিপথগামী? বুদবুদের মতো প্রশ্ন বাড়ে। পোল্ট্রিফার্মের মতো সীমিত গণ্ডি আর মাপা আলোয় বাড়তে থাকে শৈশব।

এইসব শৈশব আত্মকেন্দ্রিকতায় বেড়ে উঠলেও বিষণ্ণ! বড়দের সহচার্যের অভাবে সংস্কারহীন, অপরকে শ্রদ্ধা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যর্থ এবং অধিকাংশই আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা ও মনোবলের তলানিতে বাস করে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য গত বার বছরের পরিসংখ্যান বলছে কিশোর আত্মহত্যার পরিমাণ গত যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু কেন? শৈশব থেকে শিশুদের মনে আমরা যে প্রতিযোগিতার বীজ বুনে দিচ্ছি সেই ইদুঁর দৌড়ে টিকে থাকার দৃঢ় মানসিকতা তৈরি করে দিচ্ছি কি?একটা যুদ্ধে হেরে গেলে আরেকটি যুদ্ধে জেতার দৃঢ়তা হয়তো আমরা দিতে পারিনি বা পারছি না তাই পরীক্ষায় ফেল মানেই একমাত্র সমাধান মৃত্যু এই হচ্ছে শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখা এইসব ছেলে মেয়েদের একমাত্র সমাধান। অথচ আমাদের সময় একক্লাসে দুই তিনবার ফেল করা ছাত্র ছাত্রীদের দেখেছি ফেল করেও উজ্জ্বল হাসি হেসে আদুভাই কিংবা আদুদিদি হয়ে বহিল তবিয়দে খেলে কুদে আজ সফল স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে।

গানে গানে শৈশব -কল্পনা দাস

গানে গানে শৈশব
কল্পনা দাস


তুই হেসে উঠলেই সূর্য লজ্জা পায়
আলোর মকুটখানা তোকেই পরাতে চায়...

সুমন চট্টোপাধ্যায়ের(কবীর সুমন) এই গানখানা শুনলেই মনে হয় আলো ঝলমল সুন্দর ছোটো ছোটো শিশুকে যেন দেখতে পাচ্ছি । কিন্তু আমার নিজেকে তাদের-ই একজন মনে হয়েছে, আমার নবশৈশব ফিরিয়ে দিয়েছে এই গান ।

শৈশব আমাদের কবে হারিয়ে গেছে, কিন্তু না শৈশব হারালে তো চলবে না ! এইতো পুজো এলো নিয়ম মেনে, আবার চলেও গেল। প্রত্যেক পুজোর আগে কেন জানিনা আমি এই গানটা শুনি, আর বন্ধুদেরও শোনাতে ইচ্ছা করে খুব, আমার ভালোলাগা গানের একাংশ ভাগ দিতে চাই ---- “ ও আয়রে ছুটে আয়, পুজোর গন্ধ এসেছে, ঢ্যাং কুড়া কুড়, ঢ্যাং কুড়া কুড় বাদ্যি বেজেছে, গাছে শিউলি ফুটেছে, কালো ভোমরা জুটেছে / আজ পাল্লা দিয়ে আকাশে মেঘেরা ছুটেছে’’ । অনবদ্য কথা, সুর, সলিল চৌধুরি composer । তেমনই মন মাতান গান অন্তরা শুনিয়েছে ৭০/৮০ –র দশক থেকে ।

ভীষণ ফিরে পেতে মন চায় শৈশবের দিনগুলিকে, মনে পড়ছে হারানো দিনের গানের কথা । ছোট বেলায় নাচের ছন্দে মেতে উঠতাম-‘ মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি, আজ আমাদের ছুটি রে ভাই, আজ আমাদের ছুটি, ’। আমার তো মনে হয় প্রত্যেক ছোট ছোট শিশুই কবি গুরুর এই গানের সঙ্গে নৃত্যে মেতে ওঠে ।

সুকুমার রায়ের আসধারণ অনবদ্য সৃষ্টি ‘আবোল তাবোল’। যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, এই ছড়া গুলোর সঙ্গে শৈশবে পরিচয় ছিল ঠিকই, কিন্তু সেগুলোতে সুরারোপিত করা, বাস্তবিক-ই প্রশংসার দাবী রাখে । সংগীত জগতের বহুমুখি প্রতিভা সামন্তক সিনহা (সানি), এই প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে আমার পছন্দের প্রিয় একজন । সম্প্রতি সামন্তক এবং Empty Spaces –র ‘আবোল তাবোল’ গানের এ্যালবাম শুনে মুগ্ধ হলাম, আনন্দিত হলাম । অসম্ভব প্রতিভাবান সামন্তক- ‘ বুড়ির বাড়ি’, ‘প্যাঁচা পেঁচি’, ‘বোম্বাগড়ের রাজা’,- এই গান গুলোতে এত চমক এনেছে, তা বাস্তবিকই ভালোলাগার মতন । বোম্বাগড়ের রাজা-র রাজত্বে সবটাই অদ্ভুত, বিছানা পাতা হয় শিরীষ কাগজ দিয়ে, টাকের ওপর ডাকটিকিট মারা হয় ।

হারানো দিনের গানের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, ‘লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া’, ‘হাট্টি মাটিম টিম’, গুপিবাঘার জনপ্রিয় গান তো আছেই । হই হুল্লোড়, খেলা, হাসি, আনন্দ, মজা, কৌতুক সবই যে ছেলেবেলা জুড়ে আচ্ছন্ন ছিল তা-নয় । এই প্রসঙ্গে আমার নিজের কথা ব্যক্ত করা হয়ে যাবে, বুকের মধ্যে জমে থাকা কষ্ট অনুভব করি প্রতি মুহূর্তে, বেদনায় ভরে ওঠে মন, দু নয়ন অশ্রু সজল হয়ে ওঠে যখন এই গান শুনি, ‘ও তোতা পাখি রে, শেকল খুলে উড়িয়ে দেবো, আমার মাকে যদি এনে দাও, আমার মাকে যদি এনে দাও’। জনপ্রিয় শিল্পী নির্মলা মিশ্র-র গায়কীতে, কি অসহ্য বেদনায় ফুটে উঠেছে । আমার মাকে আমি হারিয়েছি খুব ছোট বেলায় । আমিও সেই তোতা পাখিকে কাতর মিনতি করেছি আমার মাকে এনে দেবার জন্য।

জ্যোতিন্দ্র মোহন বাগচী-র লেখা কবিতা গানে গানে হৃদয়ের গভীরে রয়ে গেছে – ‘বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই’, এই গান গেয়েছেন প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় । ‘পথের পাঁচালী’ –র অপু দুর্গাকে সারাজীবনেও ভোলার নয়, তাদের কথা এই গানে যেন প্রকাশ পেয়েছে ।

আমরা যেভাবে শৈশব –কে পেয়েছি, দেখেছি । সবার মধ্যে, সবাইকে ভালোবেসে । কান্না, হাসি, দুঃখ, বেদনা এখনও কি ছোটরা একই রকমভাবে অনুভব করে? মনে হাজার প্রশ্নের ভিড় । তারা কি জানতে চায়, হট্টমেলার ওপারে কী আছে? নাকি কেবলই পড়া পড়া পড়া । পুস্তকের ভারে এতটাই ন্যুব্জ খোলা আকাশ তাদের ডাকে না । লোপামুদ্রা মিত্র তাই গেয়ে উঠলেন, ‘ডাকছে আকাশ, ডাকছে বাতাস/ ডাকছে মাঠের সবুজ ঘাস/ এই ছেলেটা খেলা ফেলে / শুধুই কেন পড়তে যাস... ডাকছে আকাশ, ডাকছে বাতাস’ ।

হারানো চিলেকোঠা ও পুতুলখেলা - রাজীব চৌধুরী

হারানো চিলেকোঠা ও পুতুলখেলা


আমি শৈশবে ফেরত যেতে চাই

হারানো শৈশবে- যাবে আমার সাথে?

আমার শৈশবে একটি চিলেকোঠা আছে- একটি পুতুল খেলার বাক্সো আছে- একটি আধুনান্তিক খেলাঘর আছে- একটি কাঠের ও মাটির তৈরি সিড়ি আছে। এবং আছে একটি প্লাস্টিক ইয়ো ইয়ো। সারা জীবন চেয়েছি এদেরকে। কিন্তু পাইনি কাছে। একবার বাবার কাছে গোঁ ধরে চেয়েছিলাম আমাকে একটা ইয়ো ইয়ো কিনে দাও। বাবা বলেছিল আগামী বছর। আমি মায়ের চোখে চিকচিকে জল দেখেছিলাম। আহ- জল। আমাকে শৈশবে নিয়ে চল। আমি সেখানে জল নদীতে সাঁতার কাটবো। আশ্রিত হবো সকালের মৃদু জলে। আমি চলে যেতে শুরু করলেই হবে। ঠিক আছে- যাওয়া যাক।

এক
দুই
তিন
ইয়ো ও ও ও

আমি ফেরত গেলাম। ঠিক আছে- না হয় ফেরত যাবার প্রক্রিয়া তোমাকেও শিখিয়ে দেবো। এখন আসো- খেলা শুরু করি। ওঠা শুরু কর মাটির সিঁড়ি বেয়ে। এই সিঁড়ি এখন ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে ইটের সিড়ি বানানো হবে বলে। এখন এটা নেই। তবুও আছে আমার কল্পনাতে। এসো আমার কল্পনাতে। এখানে কল্পনার জড়বাস্তবতা তোমাকে ও কল্পনাতাড়িত করতে পারে। সুতারাং সাবধান পড়ে যাবে সিঁড়ি ভেঙ্গে।

এইদিকে এখন একটি খাট আছে ভাঙ্গা। ছোটবেলা আমি এটাতেই ঘুমাতাম। এই খাটের তলাতেও রাখা আছে পুতুলের বাক্সো। চকচকে বাক্সোটা এখন জংধরে গেছে। এখনকার চিন্তা কোরো না। আমার চিন্তাতে এসো। একে চিন্তা করো চকচকে ধারালো বাক্সো রূপে। ছোটবেলা আমি একে বাস্কো বলতাম। এখন এঁকে বাক্স বলি। বাস্কো কখন বাক্স হয়ে যায়- জানার উপায় থাকে না।

খুলে দেখো - এখানে একটি ময়লা পুতুল আছে। মায়ের ছিঁড়ে যাওয়া শাড়ির পুরোনো পাড় দিয়ে বানিয়েছিলাম এটাকে। এখন এটাকেই চকচকে পুরোনো পুতুল মনে করো। চেয়ে দেখো আমার নরম আঙ্গুল দিয়ে এঁকে দেয়া চোখ দুটো কেমন যেন হেসে চলেছে। নাকের ফুটো আঁকতে ভুলে গেছিলাম। দেখো নীচেই একটা মুখ আছে। আমি এটাকে এঁকেছিলাম মায়ের মুখের সাথে মিলিয়ে। মায়ের মুখ এখন আর এমন নেই। বুড়ো হয়ে ঝুড়ঝুড়ে হয়েছে। মাকে এখন বড় বেশি বুড়ো মনে হয়। আমারও দাড়ি পেকেছে কয়েকটা। চুল পেকে একাকার। যাইহোক - আমার শৈশবে আবার এসো। এসো, মন দিয়ে দেখবে এখন পুতুল বে’। পুতুলের বে’ হবে ভাবতেই আমার লজ্জা পেত ছোটবেলা। ছোটবেলা- নাকি আমার আসল বয়সে। কে জানে।

ঢ্যাং কুড় কুড় ঢ্যাং কুড় কুড়
পুতুল খেলার ক্ষণ এলো রে
পুতুল খেলার ক্ষণ এলো রে।।

আহা- কী সংগীত। পুতুলের বিবাহ শেষ হল। এখন আসো আমরা ইয়ো-ইয়ো খেলব। এঁকে তর্জনীতে লাগিয়ে নিয়ে ছেড়ে দিতে হয় যেমন করে আমি একটু পরেই ছেড়ে দেবো এই ঘর- এই বাড়ি- এই পুতুল খেলার বাক্সো- সবকিছু। ছেড়ে দেবো আমার স্মৃতির অতলে। এঁকে নিয়ে খেলব ইয়ো ইয়ো।

আহা নেবে এসো- এসো বলছি
তুমি আমার মাথায় চড়ে বসেছ
তোমাকে চিলেকোঠাতে বেড়াতে নিয়েছিলাম
তুমি আমার চিলেকোঠা দখল করতে চেয়েছ
সুতারাং নেমে এসো
এক্ষুনি।

এখানে এখন এটা থাকবে না। ইঁটের ঘর উঠবে। মোজাইক টাইলস হবে। জ্বলবে পেন্সিল বাতি। ল্যাম্পের আলো জেলে এখানে কেউ তোমাকে খুঁজতে আসবে না। এখানে নেমে আসবে ইলেকট্রিক অন্ধকার। তারপর খেলা শেষ।