মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ক্ষেপচুরিয়ানস্ - ১লা সেপ্টেম্বর সংখ্যা


ধারাবাহিক - সৌমিত্র চক্রবর্তী

বহুগামিতায় থাক হে ঈশ্বরদশ


সৌমিত্র চক্রবর্তী


রম্ভগোল চিৎকারটা হাওয়ার দিকে ছুঁড়ে দিয়েই লাফিয়ে উঠল আদিম আর্য পতপত করে সঙ্গত করলো অনিয়মিত দাড়ির জঙ্গল এই ফাঁকা প্রান্তরে তার নিজস্ব ডিকশনারির এই শব্দের ইনটারপ্রিট করার মতো কোনো হুলো নেই

কংক্রিটানগর থেকে কতদিন হল পালিয়েছে সে? ৬ ৯ ০ ৪ সংখ্যাগুলো কেমন যেন তাল্গোল পাকিয়ে যায় এখন অথচ অংকে সে নাকি বেশ ভালোই ছিল এসব আর মনে রাখতে পারেনা সে হোকগে, ওসব মনে রেখে অন্তত তার যে কিছুই হবার নয় এটুকু বোঝে সে কিছুই মনে রাখতে পারেনা সাম্প্রতিক কোনো ঘটনাই ভুরু দুটো কুঁচকে যায় কি যেন নাম মেয়েটার? ভীষণ সুখী সুখী মুখ করে চিরিয়াখানায় দেখা বর নাকি পালিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে কদিন পরেই চিতপাত এক মোটেলের বিছানায় ফাঁকতালে ক্যামেরা,মোবাইল অনেক কিছুই গলে গেছে আঙুলের ফাঁকে মেয়েটার স্বর্গদরজার কাছে একটা আঁচিল ছিল কি? লাল রঙের আঁচিলটা বড় হতে হতে আকাশে দপদপ করতে থাকে হা হা করে অনর্থক হেসে ওঠে জঙ্গুলে কয়েকটা কুবো পাখী লাল কালো ডানা বার করে উড়ে যায় উড়োজাহাজ উড়োজাহাজ লোকটা সেই ফেলে আসা শৈশব ফিরে পায় সে দৌড়ায়, মাঠ দৌড়ায়, চারপাশ দৌড়াতে থাকে

শাল্লাহ! সেই কাফেটোরিয়া কোত্থেকে টুপ করে খসে পড়লো। বাঞ্চোত, আড়াইশো টাকা পার কাপ ধক দিয়ে কুচ্ছিত কফি। ওয়াক থুঃ! বছরখানেক কফি দেখলেই ঘেন্না ধরে যেত। সেই টানা একঘেয়ে সকাল থেকে রাত্রি, আর রাত্রি ফুস করেই ফের সকাল। বারো ঘন্টা, চোদ্দো ঘন্টা কম্পিউটারে মুখ গুঁজে রগড়াও শালা যত ট্যাঁস কোম্পানীর রদ্দিমার্কা দস্তাবেজের গর্ভশ্রাব। রাতে ঘুমের মধ্যেও বিড়বিড়। সন্ধের পরেই রোজ মাথার মধ্যে দশটনের ডাম্পারের দাপাদাপি। কড়া ভোদকার গ্লাস নিয়ে অশোকার জঘন্য ভীড় গিলে বাড়ী ফিরতে এগারো। ধুস শালা তোর চাকরির পোঁদে দু লাথ। লাথি মেরে একটা মোরামের খন্ডকে তিরিশ ফুট দূরে পাঠালো সে। রম্ভগোওওওওল!

প্রথম ভয় ভয় চোখে এঁদো গাঁয়ের ছেলেটা ইউনিভার্সিটির গেট পেরিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল, পাশে আরেক গ্রাম্য ঠিক একই বেকায়দায় পড়ে বিকট গম্ভীর ভবনের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় পড়ে স্ট্যাচু হয়ে গেছিল। কখন যে তারা পরস্পরের হাত ধরলো, মনেই নেই আর। ঝাঁ চকচকে বাড়ী, সিগন্যালে গাড়ীর লাট খাওয়া ভীড়, পেল্লায় সব রাস্তা, নোংরা গলি আর কাতারে কাতারে মাথা, ধাক্কা মেরে চলে যাওয়া ধড় দেখে দুজনেরই খুব মন খারাপ হয়ে গেছিল। ওদের গ্রাম সেই কোন বাবরের যুগে পড়ে আছে। হি হি করে ক্লাসমেট সংহিতা একদিন বল্লো, নতুন গেঁয়ো শহরে এলে এরকমই হয়। সেদিন না বুঝেই বোকার মত হেসেছিল। গাবদা গোবদা সংহিতাকে অনেক পরে ব্যান্ডেল চার্চ দেখতে গিয়ে জাপটে ধরে যখন চুমু খাচ্ছিল, আলটাগরার হরমোন সুরুৎ করে টেনে নেবার মাহেন্দ্রক্ষণে হঠাৎ মনে পড়ে গেছিল। দুহাতে জোরে ঠেলে দিয়ে সংহিতা টকটকে মুখে বলে উঠেছিল, উফ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে যে, ছাড়!

প্রচুর পোকামাকড় উড়ে বেড়াচ্ছে চারপাশে অদ্ভুত দেখতে এই পোকাগুলো আগে কখনো দেখেনি লোকটা উড়ছে-উড়ছে-চারদিকে-চারপাশে গোল বৃত্ত তৈরী করে ফেলছে খুব শক্ত ক্যালকুলাসের অঙ্কের ধাঁধায় বেঁধে ফেলতে চাইছে যেন ঘুরছে-উড়ছে, সংখ্যা-অতীত বর্তমান হাওয়া সে কি অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে? এই আছে এই নেই থেকে অতীত টাইম মেশিনে ফিরে ফিরে আসে জাঁকিয়ে বসে মৌরসিপাট্টা গেড়ে মাথার মধ্যে একটা সাইরেন বেজে ওঠে ভোঁওওওওওও

স্কুলে যেতে চাইতো না ছেলেটা অদ্ভুত এক আতঙ্ক গলার কাছে চেপে বসতো সকাল সাড়ে নটা বাজলেই স্কুল ইউনিফর্ম পরার সময় হতো ভাতের থালার সামনে চুপ করে বসে থাকতো ছেলেটা বাবার কানমলা, মায়ের বকুনি, সারসার ছেলেমেয়ের দলবেঁধে হইহই করতে করতে স্কুলে যাওয়া, কিছুই তার মনে ছাপ ফেলত না এক অজানা ভয় অন্ধকার করে বিচ্ছিন্ন করে দিত আশেপাশের মানুষগুলোকে ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করত কেউ ভালোবাসে না তাকে কেউ বোঝেনা স্কুলের ক্লাসের কোনে তার জন্যে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর বিকট এক হুতুমথুম সেকেন্ড মাস্টার ক্লাসে ঢুকলেই শিরশির করে উঠত সারা শরীর হাত পা ঝিনঝিন করত কেউ বুঝতেই চাইত না

একবার গুলতি দিয়ে একটা পায়রা মেরে ফেলেছিল সে আসলে মারবে বলে গুলতি ছোঁড়েনি ছোড়দার সম্পত্তি গুলতিটা হঠাৎই হাতে এসে গেছিল লুপ্ত গুপ্তধনের মত কাঠটা ময়লা হয়ে গেছিল ধুলো বসে কিন্তু রাবারগুলো ছিল ঠিকঠাক টেনে ছেড়ে দিলেই ব্যাং শব্দ করে একটা অদ্ভুত ভালোলাগার আওয়াজ বেরোচ্ছিল ছুটির দিনের অখন্ড অবসরে সেটা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল যা দেখছিল তাকেই ব্যাং রাস্তার ইট, পাথরে বোঝাই দুটো পকেট কিন্তু একটাও লক্ষভেদ না করতে পেরে অনেকক্ষণ পরে ফিরে এসেছিল বাড়ীতে সেখানেই বকবকম বকবকম উঠোনে চরে বেড়াচ্ছিল কাকার বড় সাধের পায়রাগুলো সাদা,ধুসর,ময়ূরী কত রঙ তাদের পায়রাগুলো ভয় পায়নি তাকে কতদিন খুঁটে খুঁটে তার হাত থেকে খাবার খেয়েছে তারা ঘুরেছে নির্ভয়ে কি মনে হতেই, পকেট থেকে একটা ইটের টুকরো হাতে চলে এল দুই রাবারের সংযোগে বসে ব্যাং আর আশ্চর্য! এতক্ষণ যে একটা লক্ষ্যেও লাগাতে পারেনি নিশানা, সেটাই কি করে যে নির্ভুল ভাবে গিয়ে লাগলো একটা ছাইরঙার পেটে ডানা ঝাপটিয়ে ধপ করে ছিটকে পড়ল সেটা খোলা দুচোখে সাত সমুদ্র বিস্ময় ব্রুটাসের নাম শোনেনি পায়রাটা কিন্তু যখন বুঝলো আর একচিলতে সময় পেলোনা বাঁচবার সে চোখে ধিক্কার ছিলনা ঘেন্না ছিলনা রাগ ছিলনা ছিল শুধু অপার বিস্ময় অজান্তেই মাথার চুল মুঠোয় চলে আসে লোকটার পটপট করে ছিঁড়ে ফেলে কয়েকটা কিন্তু ব্যাথার কোনো অনুভব স্পর্শ করেনা তাকে পায়রার খোলা চোখ বড় হতে হতে ছেয়ে ফেলে সারা আকাশ গুমগুম শব্দ করে নেমে আসে বাজ শুরু হয় শ্রাবণের অঝোর ধারা ভিজতে থাকে চালচুলোহীন মাটি ভেজে, গাছ ভেজে ভিজে পাতাল সোঁদা গন্ধ ছাড়ে অনর্গল সিজোফ্রেনিয়ার ফেড হয়ে যাওয়া রঙ চেপে বসে ফুটো ওজোনস্তরের কালো গহ্বরে

মুখের মধ্যে মুখ মাথার মধ্যে অন্য মাথা বলা ভালো দুটো মাথা কাজ করে পালা করে এই এ, এই সে কোনো কোনো সময় ভুতগ্রস্ততা অপছন্দের মুখ সামনে এলে মনে হয় খুন করে ফেলবে কে যে আসল, আর কে যে নকল সেটা আজো ঠিক করে উঠতে পারলো না সে সারি সারি মুখোশের আড়ালে চাপা পড়ে যায় মুখ হাঁটা সুঁড়ি পথের ধারে গড়াগড়ি খায় কাটামুন্ডু উত্তর আর দক্ষিণ  মেরুদুটো ক্রমাগত বিশৃঙ্খলতায় কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করেই পালটি মারতে থাকে ডক্টর জেকিল আর মিস্টার হাইডে মারপিট লেগে যায় ধুন্ধুমার

সেইসব নারী কিম্বা সেইসব নারীদের মুখ যাদের সে ছুঁয়েছে কিম্বা ছোঁয়নি কালবেলার অজুহাতে। যাদের উত্তুঙ্গ দুই স্তনের বোঁটায় শিরশিরে বিদ্যুৎ চমকে টাইফুন আছড়ে পড়েছে নিঃশ্বাসের স্পিড ফর্মুলা ওয়ানের রেসিং এর লাস্ট পাকে আছড়ে পড়ে পুরুষত্বের গর্ব পাতে আর তখনি ঘাম ভরা তৃপ্তিতে মাখামাখি মুখ থেকে উঠে আসে সেই অমোঘ প্রশ্ন ভালোবাসো আমাকে?

ভালোবাসা! তাবৎ সাহিত্যিক, শিল্পী, বিজ্ঞানী এর পেছনে দৌড়ে বেড়িয়েছেন আজীবন আবছায়ে কিছু রেখার সমষ্টিকে ধরতে পেরেছে মুষ্টিমেয় কিছু ভাগ্যবান ভালো কি সত্যিই বেসেছে কেউ তাকে? শরীরে শরীর মিশিয়ে শেষমুহুর্তে কনডোম নাকি আইপিলের ভাবনায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখগুলো কি ভালোবাসা? মুখ আর মুখোশের লড়ায়ে মুখোশই জিতে যায় বরাবর নিউরো ট্রান্সমিটার সেরাটোনিন কমতে কমতে শূন্যে এসে ঠেকে চেতন-অবচেতন-অচেতন একাকার হয়ে যায় শূন্য থেকে নেমে আসে এক অদৃশ্য দড়ি প্রত্যেক পাকে রক্তের দাগ চেপে বসে গলায়, বুকে, পুরুষযন্ত্রে টাইট, আরো টাইট হতে হতে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে অন্ধকার পড়ে ঝুপঝুপ করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে লোকটা হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে কখন যেন সে নিজের অজান্তেই চুরি করে বসেছে নিজেরই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত

ভারশূন্য নীরবতায় দুলতে থাকে লোকটা চেঙ্গিসের তরোয়ালের ধারে বাস করা সময় আবার ফিরে এসেছে কোনো শমন জারী না করেই বিড়বিড় করে কে যেন কি সব বলে যায় একটানা, অনর্গল  কানের লতির পাশে গরম নিঃশ্বাস পাগল করে আরো একবার হি হি করে হাসে ভূত ভূতানি শেষ শ্রাবণের মেঘ কালো হয়ে জমতে জমতে উলম্ব অবস্থানে এসে ভেঙে পড়ে নির্জন রুক্ষ অনাবাদী টাড়ে আর্যসভ্যতার সর্বশেষ বংশধরের চোখের জল আর মেঘের জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়

রহস্যগল্প - রৌপ্য রায়


সোনার পেণ্ডুলাম

রৌপ্য রায়



১ ।

হোয়াট ইজ দিজ ? রৌপ্য দা এটা কী হচ্ছে মিল্কি বলল । মিল্কি চোখ তখন ও খবরে কাগজে । " আবার চার চারটে কুকুর খুন " মানে গত কয়েক দিনে মধ্য কারো পরোলোক যাত্রা বাঁধা । আমি তার কথা সম্মতি জানালাম । বললাম – বর্তমান শহরের গতি ভালো ঠেকছেনা মিল্কি । গত মাস খানেকের মধ্যে অনবরত কুকুর খুন তার সাথে সাথে একজন করে মানুষ । কী সাংঘাতীক খুন ।শ্বাসনলি ছেদ রক্তাক্ত দেহ । ঠেক যেমন পেশাদারী খুনির মত । কুকুর খুন হচ্ছে ঠিক একই কায়দায় একই জায়গায় । মানুষ খুনের পরিকল্পনাটাও একই শ্বাসনালি । কিন্তু কী দিয়ে মারছে মিল্কি এতো সাধারনত ছুরির কাজ নয় । মিল্কি ভালো করে মাথাটাকে ঝাঁকুনি দিল । পিঠ সোজা করে বলল - রৌপ্য দা বড়ো মাথা ধরেছে এক কাপ চা মিশ্রিত কফি হবে । আমি সোফা ছেড়ে উঠলুম । হুম হবে বলে ফ্লাক্স থেকে চা মিশ্রিত কফি ঢাললুম । ইদানিং মিল্কি কী হয়েছে কে জানে চা আর কফি এক সাথে মিশ্রিয়ে সেবন করছে । তবে মিশ্রত পানিয় ফসল সেবন মন্দ লাগছে না । আমি মিল্কি দিকে কাপ বাড়িয়ে দিলুম । সিড়ি থেকে নামার একদু পায়েরআওয়াজ কানে এল । মিল্কি কোন দিকে না তাকিয়ে সেবন কাপ হাতে নিয়ে বলল - আসুন আসুন লাট বাহাদুর সবে ঘুম ভাঙল । মিল্কি ব্যঙ্গকথায় আমার দারুন হাসিপেল । মিল্কি সাধারন ক্যাপ্টেন কে এমন কথা বলেন না । ক্যাপ্টেন কোন উত্তর দিল না । সিড়ি থেকে নেমে সোফায় এসে বসল । আমি ফ্লাক্স থেকে এক কাপ সেবন ঢেলে এগিয়ে দিলুম । ক্যাপ্টেন হাত বাড়িয়ে সেবন কাপ নিল । সেবন কাপে চুমুক দিল । মিল্কি চোখ এখন ও খবরের কাগজে । এবার ক্যাপ্টেন মুখ খুলল । আচ্ছা সিংহ আঙ্কেল তুমি বেশ কী বলছিলে । মিল্কি খবরের কাগজ থেকে চোখ না তুলে বলল । ও তেমন কিছু না এই এত দেরি করে উঠলে তাই বলছিলুম আর কী । ক্যাপ্টেন বলল ও তাই বুঝি । আচ্ছা তোমার এখন ও পেপার পড়া হয় নি কেন নিশ্চয় দেরি করে উঠেছ । মিল্কি বলল না ক্যাপ্টেন ঠিক সময়ে উঠেছি তবে সকালের পায়চারি করে ফিরতে লেট হয়েছে এই আর কি । ক্যাপ্টেন ও বলে আর কিছু বলল না । আমার হাতে কোন কাজ নেই তাই টেবিলের পেপার ওয়েড টা নিয়ে ঘোরাছি । মিল্কির পেপার পড়া শেষ । মিল্কি পেপার ভাঁজ করল । এগিয়ে দিল ক্যাপ্টেনের দিকে । ক্যাপ্টেন আড় চোখে মিল্কি দিকে একবার দেখে বলল - আমার পেপার পড়া হয়ে গেছে । ক্যাপ্টেনের কথা শুনে মিল্কি কোন প্রতিক্রিয়া নেই তবে আমার চোখ ও ঠেকলো কপালে । মিল্কি পায়চারির শেষে পেপার নিয়ে বাড়ি ফেরে । তবে ক্যাপ্টেন পেপার পড়ল কী ভাবে । পেপার পেল বা কোথায় । আমি ক্যাপ্টেন কে জিঞ্জাসা করলুম - ও তাই তাহলে প্রথম পেজে কী হেডিং আছে
বলো দেখি । ক্যাপ্টেন বলল- " আবার চার চারটে কুকুর খুন " , " মন্দার বাজারে দাম কমলো ভারতীয় মুদ্রার " , "প্রবল বির্তকের ঝড় পার্লামেন্টে " ।
রৌপ্য আঙ্কেল আর কিছু বলতে হবে । আমি চুপ করলাম । এবার ক্যাপ্টেনকে জিঞ্জাসা করলুম হুম ক্যাপ্টেন তুমি তো সব ঠিক বলছো তা পেপার পেলে কোথায় ।
ক্যাপ্টেনের উত্তরের আগে মিল্কি উত্তর দিল ইন্টারনেট থেকে । কথা টা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লুম । আমি ইন্টারনেট বেপারটা অল্প হলেও জানতুম তবে ইন্টারনেটের পেপারের ব্যাপারটা জানতুম না । জানা আগ্রহ থাকলেও এই বিষয় নিয়ে আর তেমন কথা তুললুম না ।
ক্যাপ্টেন সেবন কাপে শেষ চুমুক দিয়ে টেবিলে কাপ রেখে বলল - আচ্ছা সিংহ আঙ্কেল তুমি এই কুকুর খুনে ব্যাপারটা কী বুঝতে পারছ ।
- হুম ক্যাপ্টেন ।
- কি বুঝলে আঙ্কেল মানুষটা কি পাগোল ।
- না খুনী মোটে ও পাগোল না । খুনী খুব বুদ্ধমান ও চালাক । পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করে খুন করছে ।
-মানুষ খুনের আগে খুনি
কুকুর খুন করছে কেন , এর মানে কী ? আমি বললুম নিশ্চয় পুলিশকে চ্যালেঞ্জ ছোঁড়ার জন্য ।
-হুম ঠিক ধরেছো রৌপ্য দা । তোমরা একটা বিষয় খেয়াল করেছো যে ব্যাক্তি খুন হচ্ছে তার বাড়ির মেঝে তে কিংবা উঠানে দেড়শ বছরের পুরানো বিদেশি নামি এক কম্পানীর পেণ্ডুলাম ঘড়ি ভাঙা পাওয়া যাচ্ছে । অথচ পেণ্ডুলাম নেই ।আমরা দুজনে একসাথে বলে উঠলাম - হ্যাঁ এটা যেন অদ্ভুদ ব্যাপার ।


- বুঝলে হাঁদা রাম রহস্যের গন্ধটা খুব গাঢ় । আমি বললুম তাহলে সত্য উত্ঘাটনে নেমে পড়বে নাকি ।
- না নেমে আর উপায় আছে না হলে যেখুনীর জ্বালায় শহরের নেড়ি কুত্তা গুলো যে আর থাকবে না । তবে ক্যাপ্টেনরেডি হয়ে নাও । রৌপ্য দা গাড়ি বার করো এখন একটু বার হবো ।

২.

দরোজা বন্ধ করে ক্যাপ্টেন গাড়িতে উঠতে আমি গাড়ি স্ট্যাট দিলাম । আমাদের গন্তব্যস্থল বেশি দূর নয় শহরে পাঁচ ছয়েক অতি প্রাচীন ঘড়ি দোকানে । গাড়ি চলাকালীন মিল্কিকে আমি একটা প্রশ্ন করে বসলুম - আচ্ছা মিল্কি তোমার কী মনে খুনী ছুরি দিয়ে খুন করছে ।
- ঠিক ছুরি দিয়ে নয় তবে ছুরির মত কিছু দিয়ে ।
- ছুরির মত কিছু দিয়ে বলতে ।
- আচ্ছা রৌপ্য দা কোন দিন উঠ জোবাই করা দেখেছ ।
- না , তবে দেখবার ইচ্ছা আছে ।
- ঠিক আছে এবছর ঈদে আমাকে মনে করিয়ে দিও তোমার দেখার ইচ্ছা আমি পূর্ণ করর দেব । ক্যাপ্টেন এতক্ষন চুপচাপ সব শুনছিল ।এবার বলল - আচ্ছা সিংহ আঙ্কেল তুমি ট্রপিক চেঞ্জ করছো কেন ।
- কোথায় ট্রপিক চেঞ্জ করলাম ।
- ছুরি মত কিছু বলতে বুঝলাম না ।
- খঞ্জন দিয়ে ।
- খঞ্জন ! খঞ্জন কী ?
আমি বললুম - উঠ জোবাই করার সরু অতি ধারালোময় অস্ত্র। মিল্কি আমার কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল-- রৌপ্য দা গাড়ি থামাও । রাস্তাটা খুব সুবিধার নয় । কোথাও কোথাও বেশ বড়ো সড়ো গাড্ডা ও আছে । আমি একটু ভালো মত প্রজিসান দেখে গাড়ি থামালুম । দড়াম করে গাড়ি দরজা খুলল মিল্কি । মিল্কি নামল ।



পেছনে পেছনে ক্যাপ্টেন ও নামল । মিল্কি সশব্দে দরজা বন্ধ করে বলল –রৌপ্য দা তুমি একটু বসো আমরা এখুনি আসছি । আমি অঞ্জতা ঠুঁটো জগনাথের মত বসে রইলুম । আমি গাড়ি ভিতর থেকে যে টুকু দেখা পাচ্ছি কেবল সে টুকুর বর্ননাদিচ্ছি । মিল্কি আর ক্যাপ্টেন গাড়ি থেকে নেমে হন হন করে একটু উত্তরে গেল। ডান দিকে ঘুরতে যে দোকান টি পড়ল সেটি একটি চা দোকান । চা দোকানের ঠিক দোতলা একটি অতি প্রাচীন ঘড়ি দোকান । যত সম্ভব এটিই শহরে সবচেয়ে প্রাচীন দোকান । তবে কাঁচের মত পরিপাটি করে সাজানো । সিড়ি দিয়ে দু-এক জন ব্যক্তি নেমে আসছে । মিল্কি আর ক্যাপ্টেন বড়ো বড়ো পা ফেলে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল । কয়েক মিনিট কথাবাতার হল । এর পর মিল্কি আর ক্যাপ্টেন সিড়ি বেয়ে নেমে এল । দরজা খুলে গাড়িতে উঠে মিল্কি বলল - রৌপ্য দা গাড়ি একটু আগিয়ে দাঁড় করাও ।
আমি গাড়ি স্ট্যাট দিয়ে একটু আগিয়ে গিয়ে একটা মার্কেট এর সামনে দাড় করালূম । এবার মিল্কি আর আমি গাড়ি থেকে নামলুম । একটু হেঁটে মার্কেটে ঢুকলুম । বিশাল মাকেট । চারিদিকে সারি সারি দোকান । লোক জন ও নেহাত কম নয় । দু-একটা দোকান ক্রস করে আমরা সরু গোছের একটা ঘড়ি দোকানে ঢুকলুম । মার্কেটের দোকান গুলো অবশ্য এমন সরু গোছের ই হয় । আমরা সরাসরি ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম । ম্যানেজার বেশ অল্পক্ষন খাতা চেক করে বলল - না স্যার আমাদের দোকানে ১৯৯৫ এর The King's Royal কম্পানীর কোন ঘড়ি আসেনি । মিল্কি চট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে বলল - ও আচ্ছা । নমস্কার এখন চলি দারকার হলে আবার আসবো ।



আমরা দোকান ছেড়ে সিড়ি বেয়ে নেমে এসে গাড়ি উঠলাম । এমন ভাবে আমরা আরো দু তিনটে দোকান ঘোরার পর অবশেষ হদিশ মিলল । এই ঘড়ি দোকানটি সম্পুন শহরের কেন্দ্রে । দোকানটা অল্প বছরের হলেও কী হবে বেশ গোছালো । তবে পশ্চিমমুখী দোকানের বাম দিকের কিছু অংশে মেরামতের কাজ চলছে । আমরা দোকানে ঢুকে ম্যানেজারের খোঁজ নিতে এক অল্প বয়সি ছোকরা ম্যানেজারে রুম দেখিয়ে দিল । আমরা দরজা ঠেলে ঢুকলাম । দুটো খানদানি চেয়ার টেনে বসলুম । মিল্কি ম্যানেজারের উদ্দেশ্য করে বলল -আমি একলব্য সিংহ রায়, পেশার জটিল সমস্যার সমাধান কারি অর্থাত্‍ গোয়েন্দা ।

ম্যানেজার স্বঅভ্যর্থনায় বলল - থাক আর কিছু বলতে হবে না । আপনারা কী খাবেন বলুন ।
মিল্কি বলল - কিছু না ।
ম্যানেজার বিশেষ ভাবে অনুরোধ করতে মিল্কি বলল - কোলডিন্স । ম্যানেজার বেল বাজিয়ে ওয়েটার ডেকে কোলডিন্স আডার দিল । ওয়েটার চলে গেল । ম্যানেজার বলল - আমার নাম শুভায়ু । আপনারা কেন এসেছেন আমি জানি । এই নিন আপনার ডিটেল্স ফাইল ।



মিল্কি ফাইলটা হাতে নিল । তবে বেশ পুরানো দেখে বোঝা যাচ্ছে । ইতি মধ্যে ছোকরা বেয়ারা কোলডিক্স এসে হাজির । মিল্কি কোলডিক্স খেতে খেতে ফাইলটা দেখল । এমন কী দু একটা তথ্য খাতায় নোটও করল । তথ্য টা আর অন্য কিছু নয় ১৯৯৩ তে The King's Royal কম্পানি কয়েকটি পেণ্ডুলাম ঘড়ি ক্রেতাদের নাম ও এড্যাস । আমাদের কোলডিক্স শেষ হওয়ার আগে মিল্কির কাজ শেষ । মিল্কি এবার টেবিল ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে বলল - আচ্ছা শুভায়ুবাবু আমারা এখন আসি পরে দরকার হলে আবার
দেখা হবে ।



৩ ।

আমরা যখন বাড়ি পৌচ্ছালাম তখন সদ্য বৈকাল । আমরা এক এর পর এক বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে এসে লান্চ এ বসলাম । আমাদের অবর্তমানে ভীম দা রান্না করে রাখে । লাঞ্চ চলাকালীন সাধারণত আমরা টুকিটাকি কথা বলি । খাবারের গুনগান কিংবা অন্য কোন যুক্তি সম্মত বিষয় বস্তু নিয়ে । কিন্তু আজ তা হল না । সেই সকাল থেকে শহর কলকাতায় ঘুরে ঘুরে সবাই যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি । লাঞ্চের একেবারে শেষ কালীন মিল্কি কেবল দু-একটা কথা বলল । রৌপ্য দা এই ক্যাশের রিপোর্ট এর সমস্ত পেপার চাই । তুমি মনে করে একটু পরে আমার বৈঠকখানায়সমস্ত পেপার পৌচ্ছে দেবে আর ক্যাপ্টেন তুমি কোথাও যাবে না আমার সাথে থাকবে । আমি আর ক্যাপ্টেন বললাম - আচ্ছা ঠিক আছে । মিল্কি আমাকে ডাকে নি কেন সে আমি ভালো করেই জানি ।তবে ডাকলে ও আমি জেতাম ই না । হিসেবের ব্যাপার বুঝতেই পারছ । আর আমি তো গোলানে পার্টি । সব কিছু পণ্ড করেই বসব । যাইহোক আমাদের খাওয়া শেষ করতে প্রায় মধ্য বিকাল হল । সবাই একটু রেস্ট নিতে ব্যস্ত । সন্ধের মুখে আমি তখন টেবিল থেকে খুঁজে খুঁজে এক এর পর এক এ মাসের কুকুর খুনের ও মানুষ খুনের পেপার গুলো বার করলাম ।পেপারগুলি প্রথম থেকে সাজিয়ে মিল্কির বৈঠকখানায় দিয়ে এলাম । মিল্কি তখন বৈঠকখানায় ছিল ।আসার পথে মিল্কি বলল - রৌপ্য দা তুমি দরজা বন্ধ করে ক্যাপ্টেনকে একটু ডেকে দাও । আমি দরজা বন্ধ করলাম । দুয়েক পা হেঁটে ক্যাপ্টেনকে ডেকে দিলাম । ক্যাপ্টেন যাচ্ছি বলে বৈঠকখানায় চলে গেল । এবার রুমে আমি একা মাত্র । কী করি কী করি ভাবতে ভাবতে টিভি খুলে বসলাম। দুয়েকটা চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে দেখলাম সিনেমা হচ্ছে । বর্ডার সিনেমা । দেশার্থ বোধক সিনেমা । দেশার্থ বোধক সিনেমা কিংবা গল্প আমার খুব প্রিয় । বর্ডার সিনেমাটা এক এক বার নয় ১৯ বার দেখেছি তার শর্তে ও আবার দেখতে লাগলাম ।এভাবে ঘন্টা দুয়েক কেটে গেল । সিনেমা প্রায় শেষের মুখে । বৈঠকখানার দরজা খোলের শব্দ পেলাম । আমি দরজা বন্ধ করিনি । ক্যাপ্টেন হালকা দৌড়ে আমার রুমে এসে বলল - রৌপ্য আঙ্কেল , সিংহ আঙ্কেল তোমায় এখুনি ডাকছে ।


-আচ্ছা তুই টিভি টা বন্ধ করে আয় --- বলে আমি তাড়াতাড়ি সিড়ি থেকে নেমে বেঠকখানায় ঢুকলাম । মিল্কি কলম হাতে নিয়ে একটা কাগজের দিকে তাকিয়ে আছে । আমি মিল্কিকে এমন অবস্থায় দেখে কোন কথা না বলে সোফায় বসতে যাব অমনি মিল্কি বলল - আর বসে কাজ নেই । এখুনি লালবাজারে ফোন করে । ওখানে ও সি সৌমিক সাহা আছে তাকে অবশ্যই আমার সাথে সন্ধ্যা ৮ টার মধ্যে দেখা করতে বলো । লালবাজারে ও সি সৌমিক সাহা মিল্কির খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু । যখন প্রয়োজন হয় একটা ফোন করলে সোজা মিল্কির বৈঠকখানায় এসে হাজির হয় । এর একটাই কারণ পিড়িতের বন্ধু । এককালীন মিল্কি ও সৌমিক এক সাথে একই স্কুল কলেজে পড়েছে । কলেজের পড়াশুনা চলাকালীন সৌমিক পুলিশের চাকুরি পায় আর সবার্থ পড়াশুনা শেষ করে তার সুক্ষ বিচার বুদ্ধি আর তীক্ষ্ন দৃষ্টি কে কাজে লাগিয়ে সমাজ সেবা করেছে । আমি আর বসলাম না । কয়েক পা হেঁটে টেবিলের কাছে গিয়ে রিসিভার
কানে তুলে সৌমিক কে ফোন করলাম । সৌমিক ফোন রিসিভ করতে আমি আমার পরিচয় দিয়ে আমাদের গৃহের করনবশত পদধূলি রাখার আমন্ত্রণ জানালাম । রিসিভার নামাতে মিল্কি বলল - সৌমিক কখন আসবে বলো ।
- সৌমিক বলল কাছাকাছি আছে মিনিট দেশক লাগবে । মিনিট পাঁচেক দুজনে কেউ কথা বললাম না । বাড়ি কাছে গাড়ির শব্দে নিস্তব্দতা ভাঙল । সিড়ি থেকে নামার শব্দ পাওয়া গেল । আমি আর সোফা ছেড়ে উঠলাম না । ক্যাপ্টেন রবি দরজা খুলে স্বসম্মানে সৌমিককে বৈঠকখানায় নিয়ে এল । সৌমিক সোফায় বসতে মিল্কি বলল --এই কুকুর খুন রহস্যের নিস্পতির কোন উপায় খুঁজে পেলে ।

সৌমিক বলল - না । এই রহস্যের তেমন কোন কারণ আমরা পাছি না ।
- পরবর্তী খুন কবে জানো ।
- না । সেটা তো কেবল খুনীর জানার কথা ।
- তা অবশ্য ঠিক তবে আমি জানি পরবর্তী খুন কবে ।
সৌমিক বিস্ময় ভরা চোখে মিল্কির দিকে তাকাল - কবে ?
- আজ ১২ টার মধ্যে একশ সাতান্ন নম্বর বাড়িতে । তাই তোমাকে আজ রাত ৯ থেকে ১টা পর্যন্ত আমার সাথে থাকতে হবে । হ্যাঁ আর তিনজন সাহসি ও বিশ্বাসী লোক লাগবে ।
- ঠিক আছে । তাহলে এখন উঠলাম ।
- সৌমিক মনে করে তিন জন ছেলেকে নিয়ে গলি দিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে আসবে ।
- ঠিক আছে তোমার যা হুকুম ।
- রৌপ্য দা তুমি পিছনের দরজা দিয়ে সৌমিকে ছেড়ে দাও । সৌমিক গাড়ি ওখানে থাক । তুমি একটু কষ্ট করে পিছনের গলি দিয়ে হেঁটে যাও । ব্যপারটা বুঝতেই তো পারছো । সৌমিক এতে আপত্তি করলো না কেবল বলল - না না ঠিক আছে । আজ না হয় একটু হাঁটলাম ।



৪ ।

মিনিট চল্লিশ পর পিছনে দরজায় কড়া নড়ল । ক্যাপ্টেন দরজা খুলল । দরজা খুলতে ঘরে প্রবেশ করল ও সি সৌমিক সাহা সঙ্গে সুপুরুষ চারটে ছেলে । যেমন লম্বা তেমন সুন্দর দেহের গঠন । ও সি সৌমিক ছেলে চারটে কে নিয়ে বৈঠকখানার দিকে রওনা হলো । ক্যাপ্টেন দরজা বন্ধ করে সৌমিকে পিছন পিছন সোফায় এসে বসল । মিল্কি সৌমিকে দেখে হাসতে হাসতে বলল - সত্যি সৌমিক তোমার জবাব নেই । যেমন কথা তেমন কাজ । যাই হোক তোমাদের নাম কি ? চার জনে একে একে নিজের নাম বলল । মিল্কি লক্ষ্মণ সুরেশ তৈমুর আর রায়ান কে উদ্দেশ্য করে বলল – তোমাদের কাজ তেমন কিছু না । আমরা চার জন এখন বের হবো ফিরতে একটু রাত হবে । তাই তোমরা চারজনে আমাদের ভুমিকায় দোতালার রুমে আস্তে আস্তে কথা বার্তা চলাফেরা করবে । অবশ্যই জানালা খোলা রেখো তবে কেউ নেশা ভান করো না । সবাই মনযোগ দিয়ে মিল্কি কথা শুনলাম । যার যা প্রশ্ন ছিল তা বলল । মিল্কি আর ও সি মিলে ওদের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দিল । পৌনে নটায় আমরা সবাই ডিনার সারলাম । নটার সময় ওদের দোতালার রুমে তুলে দিয়ে আমারা পিছনে দরজা দিয়ে রাস্তায় নামলাম । কিছুটা হেঁটে গলি পারা হয়ে আমরা ট্যাক্সি ধরলাম । মিনিট দেশেক যেওয়ার পর ট্যাক্সি থামল । ট্যাক্সির ভাড়া চুকিয়ে আমার আবার হাঁটতে লাগলাম । এ গলি ও গলি পার হয়ে এসে দাড়ালাম একটা তিনতলা বাড়ি পশ্চিম দিকে । মিল্কি পকেট থেকে মোবাইল বার করে ফোন করল । মিনিট কয়েক পরে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি জানালা খুলল । আস্তে আস্তে জানালার গ্লিড খুলে নিচে নামাল ।এরপর আমরা একে একে জানালা বেয়ে ঘরে ঢুকলাম । বৃদ্ধ ব্যক্তিটি আর অন্য কেউ নন সাহিত্যিক লতিফ ইসলাম । আমরা একে একে ওনার সাথে পরিচয় করলাম । এখন ঘড়িতে পৌনে দশটা । মিল্কি কোন কথা না বলে ধীর গতিতে তার কাজ গোছাচ্ছে । গির্জার ঘড়িতে সশব্দে দশ ঘন্টা পড়ল । রাস্তার ল্যাম্প পোষ্টে দুএকটা বাতি জ্বলছে এছাড়া রাস্তার চার পাশ বেশ অন্ধকার । আকাশে চাঁদ নেই কেবল কয়েকটা তারা জ্বলছে । কয়েক দিন আগে যে অমবস্যা গেছে তা ভালোই বোঝা যাচ্ছে । মিল্কির কাজ শেষ । দু এক মিনিট পর গির্জায় আবার সাড়েদশটার ঘন্টা বাজল । মিল্কি আর দেরি না করে মৃদু কন্ঠে বলল - এবার সবাই নিজের পজিসান দেখে নাও । মিল্কি কথা মত আমি আর ক্যাপ্টেন খাটের তলায় ঢুকলাম । ও সি আর লতিফ স্যার গেলেন দরজার পাশে আর মিল্কি গেল টেবিলের তলায় । অবশ্য টেবিলের সামনে টুকু র্পদা দিয়ে ঢাকা সহজে কারোর চোখে পড়বে না । ধিরে ধিরে রাত বাড়ছে । গির্জার ঘড়িতে এগারোটার ঘন্টা পড়লো । টেবিলে কেবল একটা হালকা লাইট জ্বলছে । আমরা নিশুতির পেচাঁর মতো ইদুঁর শিকারে জন্য বসে আছি কিন্তু ইদুঁর কই । ক্রমে সময় বাড়ছে । এমন সময় বাহিরের দরজার মৃদু চাপা আওয়াজ হল । আমরা সবাই মুখে লাগাম এটে র্স্টাচুর মত হয়ে দাড়িয়ে রইলাম । আস্তে আস্তে দরজা খুলে এক ছায়া মূর্তি ঘরে প্রবেশ করল । ছায়া মূর্তি এঘর ওঘর ঘুরে শেষে লতিফ বাবু বৈঠকখানায় এলো । আস্তে করে দরজা খুলল । ব্যাগ থেকে সরু তরোয়াল গোছের খঞ্জন বার করে নিঃশব্দে আস্তে আস্তে পা বাড়িয়ে চেয়ারের দিকে এগিয়ে গেল । পিছন থেকে সজোরে খঞ্জন চালালো টেবিলে বসে থাকা মানুষটির গলায়। একটা ঝনঝন করে শব্দ হলো সঙ্গে সঙ্গে লাইটে আলো ঝলসে উঠল সারা ঘর । লোকটা পিছন ফিরে সৌমিককে আক্রমন করার আগে মিল্কি টেবিলের তলা থেকে হায়নার মতো লাফিয়ে আক্রমনের থাপড় বসাল তার গলে । মেঝেতে আছড়ে পড়তে আমি ছুটে খঞ্জনটা কেড়ে নিলাম । ও সি সৌমিক গম্ভির গলায় বলল - ছিঃ ছিঃমিস্টার বসাক আপনি শেষ পযন্ত মাটির কলসির গলায় ছুরি বসালেন । বসাক মাথা নত অবস্থায় দাড়িয়ে রইল । মিল্কি মৃদু হেসে ব্যঙ্গ ছলে বলল – বেচারা রাখালের আর কি দোষ বলো ও জানতো না যে ওটা আমার তৈরি মাটির কলসির মূর্তি । তবে হ্যাঁ বেচারা রাখাল বসাক কখন ভাবতে পারেনি যে তার শেষ অঙ্কে সে এভাবে ফাঁসবে । ও সি সৌমিক আর কথা বাড়ালো না রাখাল বসাকের হাতে হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইল বার করে থানায় ফোন করে পুলিশ ভ্যানে ব্যবস্থা করল ।



৫ ।

সাহিত্যিক লতিফ ইসলামের সাথে কথা বলতে বলতে প্রায় রাত একটা বেজে গেছিল । লতিফ বাবু আমাদের সস্নেহে থাকতে অনুরোধ করলেও আমরা নিরুপায় ভাবে ওনাকে বুঝিয়ে বাড়ি ফিরলাম ঘড়িতে কখন পৌনে দুটো । মিল্কি দোতালার ফোনে ফোন করতে রায়ান এসে দরজা খুলে দিল । আমরা ফ্রেস হতে হতে বাহিরে মোটরসাইকেল আসার শব্দ হল । দরজায় নক করার আগে রায়ান দরজা খুলে দিল । ও সি সৌমিক হাসতে হাসতে বৈঠক খানায় ঢুকল । মিল্কি সৌমিকের হাসি দেখে বলল - কি ব্যাপার সৌমিক এত হাসছো কেন ? সৌমিক কোন রকমে হাসি থামিয়ে বলল - তুমি বেচারা রাখালকে এমন চড় মাড়লে তার মুখে পাঁচটা আঙুলের কালসিটে দাগ পড়ে গেছে ।


- ও আচ্ছা বুঝলাম । সবাই মিলে নানা বিষয় আলোচনা শুরু করলাম । লক্ষ্মণ তৈমুর রায়ান কে উদ্দেশ্য করে সৌমিক বলল - এই তোরা এনাকে চিনিস ? সবাই সবার মুখ চায়া চাই করে বলল - না স্যার ।
- এনি প্রখ্যাত গোয়েন্দা একলব্য সিংহ রায় । আজ তোদের এখানে রেখে আমরা একটা সত্য উত্‍ঘাটন করে এলাম । লক্ষ্মণ তৈমুর রায়ান এক সাথে বলল – সত্যি স্যার ! তা কি ঘটল একটু বলুন না স্যার শুনি । ঘটনাটা যত টা সংক্ষেপে বলা যা ক্যাপ্টেন রবি তা বলল । ঘর পুরো নিস্তব্দ ঘড়িতে তিনের ঘন্টা বজল । ও সি সৌমিক নিস্তব্দ ভেঙে বলল - আচ্ছা মিল্কি তুমি কি করে বুঝলে যে খুনি আজই খুন করবে সাহিত্যিক লতিফ ইসলাম কে ? মিল্কি সোফার গা এলিয়ে বলতে শুরু করল - গত বৃহস্পতি বারে পেপারটা আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল । যে দিন দিনেশ মণ্ডল খুন হন কিংবা সুকুমার সেন খুন হন ওনাদের বাড়ি থেকে এক
বিশেষ নামি কম্পানীর ঘড়ি ভাঙা পাওয়া গেছে কিন্তু মনিশ বাবুর খুনের দিনকোন ঘড়ি ভাঙা পাওয়া যায়নি । তবে কি এই খুনের পিছনে রয়েছে রহস্যময় ঘড়ি ।


আমি নেক্সট কুকুর খুনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম । শুক্রবার কুকুর খুন হল আমি আর দেরি না করেই রবিবার ই মাঠে নামলাম । তবে ভাবতে পারিনি যে খুনের তারিখ হবে আজই । খুনি মানে রাখাল বসাক খুব হিসেবী ও সাহসী মানুষ তাই তিনি পুলিশকে টক্কর দিয়ে খুন করছিলেন । আমি যখন শহর ঘুরে বাড়ি ফিরি তখন ওপর্যন্ত কিছু বুঝতে পারিনি । তবে সন্ধ্যায় হঠাৎ পেপারের কথা মনে পড়তেপেপার নিয়ে হিসেবে বসি আর কিছুক্ষনের মধ্যেই হিসাব বারাবর । এই দেখুন বলে মিল্কি একটা সাদা পেজ বাড়িয়ে দিল সৌমিক সেটা নিয়ে পড়তে লাগল । শনিবার (সাত) ন টা কুকুর খুন = ষোল । সোমবার (দুই) বাড়ি নং নয়শত ষোল তে খুন একজন। বৃহস্পতিবার (পাঁচ) সাতটা কুকুর খুন =একুত্রিরিশ । মঙ্গলবার(তিন) সাতশোএকুত্রিরিশ নং বাড়িতে খুন দুজন । রবিবার (এক) কুকুর খুন তিন =চল্লিশ । বৃহস্পতিবার (পাঁচ)=তিনশোচল্লিশ নং বাড়িতে খুন চারজন ।শুক্রবার(ছয়)কুকুর খুন মাত্র একটা = সাতান্ন । মোট খুন যোগ করে সাত দিয়ে ভাগ করে যে সংখ্যাটা বাড়তি থাকে তো সেটাই খুনের দিন । যেমন রবি বার সপ্তাহের প্রথম সমান এক
। সুতরাং পরবর্তী খুন রবিবার একশেসাতান্ন নং বাড়িতে । সৌমিক মাথা নেড়ে বলল ব্যাপার টা বুঝলাম । কিন্তু রাখাল বাবু হঠাত খুনের মতলব আটলেন কেন । মিল্কি বলল রাখাল বসাকের দুই মেয়ে এক ছেলে । বছর তিনেক আগে তার বিয়ের বয়সি বড় মেয়ে কণিকা জলাতঙ্ক রোগে মারা যায় । তার বেশ কিছুদিন পরে রাখাল বসাকে পাগলামী বেড়ে যায় । তখন থেকে কুকুরের প্রতি তার বিশাল রাগ । রাস্তার কুকুর দেখলে ঠিল ছোড়ে লাঠি নিয়ে তাড়া করে । সাম্প্রতি তিনি কীভাবে একটা তত্ব জানতে পারেন । তথ্যটা আর অন্য কিছু নয় ১৯৯৩ তে The King's Royal কম্পানি তার ১০০ বছর পূতিতে বেশ কিছু নয়া মডেলের ঘড়ি
মার্কেট এ ছিড়ে ছিল অবশ্য তার মধ্যে অন্যতম ছিল পেণ্ডুলাম ঘড়ি । শহর কলকাতা The prience of clock time নামক দোকানটি মোট ৭ টি ঘড়ি এই দোকানে আসে । আর সেই সাতটি ঘড়ি মধ্যে ৩ টি ঘড়িতে পাঁচশো গ্রাম ওজনে একটি সোনার পেণ্ডুলাম ছিল ।
যার বর্তমান বাজার মূল্য অনেক । আর তাই রাখাল বসাক সোনার পেণ্ডুলাম হাতানোর চেষ্টা করে । অবশ্য তিনি দুটি সোনার পেণ্ডুলাম পেয়েছেন দিনেশ মণ্ডল ও অধীর বসুর বাড়ি থেকে ।
- তাহলে মনীষ বাবু খুন হল কেন ? ওনার কাছে তো কোন ঘড়ি ছিল না ।
- তা ঠিক । কিন্তু উনি ঘড়ি কিনে ছিলেন আর সেই ঘড়িটা লতিফ বাবুর জন্দিনে তিনি তাকে গিফট করেন ।



সো দ্যাটস অল ।।