শুক্রবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ১ম সংখ্যা ২য় বর্ষ




সম্পাদকীয়


বইমেলা। এখন চারিদিকে রৈ রৈ হৈ হৈ মেলা মেলা বই বই... এসবের মধ্যেও ক্ষেপচুরিয়ানরা চলেছে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে! নির্দিষ্ট লক্ষ্যে; কবিতার লক্ষ্যে। অজস্র নতুন নতুন কবিতা ভাবনা, কবিতার নির্মাণ আবার তা নিয়ে বিশদে আলোচনার নিরন্তর প্রবাহ প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে “ক্ষেপচুরিয়াস”এর শিরায় শিরায় (শাখাগ্রুপগুলিতেও)। আর এভাবেই যেন কবিতা পাচ্ছে পূর্ণতা। কবিতা পাচ্ছে নবকলেবর। প্রকাশিত হচ্ছে কবিতার বই। কবিতা-বিষয়ক বই। প্রকাশ পাচ্ছে গ্রুপের প্রিন্টেড ম্যাগাজিনও। সব মিলিয়ে মেলাপ্রাঙ্গণের লিট্‌ল ম্যাগের পাভিলিয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকাশনার স্টলে স্টলে সর্বত্রই ক্ষেপচুরিয়ানদের সহজ, সাবলীল ও অবাধ বিচরণ লক্ষ্যণীয়। গ্রুপের সদস্যেরা আজ আর শুধু আন্তর্জালেই আটকে নেই বরং তাঁরা ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়ছে মিলনমেলা, আকাদেমি চত্বর কিংবা বইপাড়ার অন্ধি-সন্ধিগুলোতে। ছড়িয়ে পড়েছে ওপার বাংলাতেও। বাংলাদেশের কবিবন্ধুদের মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, আজ একথায় জোরের সাথেই বলা যায় যে, পৃথিবীর যেখানেই বাংলাভাষী আছেন সেখানেই আছে এই “ক্ষেপচুরিয়াস” । সুতরাং, ভারত-বাংলার কাঁটাতারই নয় বিশ্বের কোনো কাঁটাতারের বেড়াই মানে না ক্ষেপচুরিয়ানরা। আর তাই আমাদের প্রাথমিক প্রচেষ্টা এই ব্লগজিন এগিয়ে চলেছে তার স্বচ্ছ্বন্দ গতিতেই।


আশা রাখি, আপনাদের সকলের পূর্ণ সহযোগিতায় আগামীদিনে এই “ক্ষেপচুরিয়াস” শুধু কবিতা নয়, শুধু সাহিত্য নয়, বাংলাভাষার জন্য আরো বিরাট কর্মযজ্ঞের কাণ্ডারী হবে! আসুন বন্ধুরা, আমরা সকলে মিলে সাহিত্যনির্মাণের মাধুর্যে প্রতিবাদী বাংলাভাষার স্নিগ্ধসৌষ্ঠব বজায় রাখি।


“ক্ষেপচুরিয়াস”এর পক্ষে বাণীব্রত কুণ্ডু।

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডাইরি

খামচানো কালপৃষ্ঠা
উজবুকের আছাড়
মলয় রায়চৌধুরী

রেড লাইট এলাকা কেমন হয় তা জানার ইচ্ছা থাকলেও, অনেকর পক্ষে, বিশেষ করে মহিলাদের, সেই এলাকাটি দেখার সুযোগ হয় না । নেদারল্যান্ডসের অ্যামস্টারডাম শহরে সেই অনুসন্ধিৎসা মেটাবার ব্যবস্হা ওই এলাকারই বাসিন্দারা করে দিয়েছেন । সে-উদ্দেশ্যে ১৯৯৪ সালে সংস্হাটি যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর নাম মারিসকা মাজুর, একদা এই এলাকারই যুবতী । পর্যটকেরা যাতে গাইডের সঙ্গে এলাকাটি ঘুরে-বেড়িয়ে দেখতে পারেন, যৎসামান্য ইউরোর বিনিময়ে, ডাচ-সরকার অনুমোদিত তেমন ভ্রমণবিলাস গড়ে উঠেছে ওই শহরের সুশোভিত অঞ্চলে । রেড লাইট এরিয়া শুনলেই যে নোংরা ঘিঞ্জি কুৎসিত ভয়াবহ ছবি ভেসে ওঠে ভারতীয়দের মনে, ওই অঞ্চলটি তেমন নয় । অঞ্চলটির অনুমোদন করেছিলেন নেপোলিয়ান, ফরাসি সৈনিকদের রাত কাটাবার জন্য । সেই সময় থেকেই এলাকাটি জুড়ে খুদে-খুদে ঘরের উদ্ভব । সুশোভিত হলেও ঘরগুলোর অধিকাংশ নারীর গল্প নিশ্চয়ই ভয়ংকর, কেননা পূর্ব ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকা থেকে তাদের ফুসলিয়ে বা উপড়েআনা হয়েছে । ঘরগুলো কেমনভাবে সাজানো তা জানার জন্য মারিসকা মাজুরের দপ্তর-সংলগ্ন একটি ঘর আছে, পর্যটকদের আগ্রহ মেটাবার জন্য ।



অ্যামস্টারডাম শহরের মাঝখানে পুরানো চার্চের কাছে বেশ কয়েকটি মনোরম খালে ঘেরা এই অঞ্চলটির নাম দ্য য়ালেঁ । নৌকোয় চেপে সারাদিন ঘুরে-ঘুরে শহরটাকে দেখা যায় । নেমে ভ্যান গঘ মিউজিয়াম বা রাইস মিউজিয়ামে রেঁমব্রাঁর বিখ্যাত 'নাইট ওয়াচ' বা অ্যানি ফ্র্যাংক যে ঘরে লুকিয়ে ডায়েরি লিখেছিলেন তা দেখতে যাওয়া যায় । যৌনতা সম্পর্কিত সবই আছে দ্য য়ালেঁ পাড়ায় । যৌনতার মিউজিয়াম, মিথুনরঙ্গের নাটক, যৌনতার উঁকি শো, মিথুনকর্মের ডিভিডি, যৌনসুখের ও যাতনার যাবতীয় জিনিসপত্র, এমনকী চাবুক-হাতকড়া-চেস্টিটি বেল্ট ইত্যাদি । আর আছে কফি শপ, যেখানে বসে গাঁজা ফোঁকা যায়, হরেক রকম গাঁজা । গাঁজাপাতারও মিউজিয়াম আছে ; এত রকমের যে গাঁজা হয় তা জানতুম না । যাঁরা র‍্যাঁবো পড়ে আবসাঁথ চেখে দেখতে চান তাঁদের জন্যআছে হালকা বা কড়া নানা নেশার সবুজ আবসাঁথ ।



খালপাড়ের রাস্তার ধারের ঘরগুলোয় সন্ধ্যা থেকে কাচের বিশাল শোকেসের অপরদিকে সেজে গুজে লাল আলো জ্বালিয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকেন প্রায় নগ্ন যুবতীরা । গাইড বলেছিলেন, বেশিরভাগ যুবতীকে তাদের প্রেমিকরা ফুসলিয়ে এনে মাফিয়াদের বেচে দিয়েছে । সমকামীদের আশ মেটাতে যুবকরাও আছেন এই বাজারে ; তাদের ঘরে জ্বলে নীলাভ আলো। যৌনসেবার সময়, আঙ্গিক ও দরদাম নির্ধারিত। কোনো-কোনো জানলায় অবশ্য আঙ্গিক-আদেখলা দরদস্তুরকারীদেরও দেখা মেলে । এলাকার বা কোনো জানালার ফোটো তোলা নিষেধ ; ফোটো তোলার চেষ্টা করলেই রক্ষীরা ক্যামেরা কেড়ে ফেলে দেবে খালের ঝিলিমিলি জলে, সাঁতার কাটতে-থাকা রাজহাঁসেদের মাঝে । সিসিটিভি লাগানো আছে লক্ষ্য রাখার জন্য । সন্ধ্যাবেলায় দর্শনার্থী পর্যটকদের ভিড়ই বেশি । যারা সেবা কিনতে আসে তারা একটু রাত হলে দেখা দেয় । ফল কেনার আগে যেন পুরো বাজারটা দেখে নিচ্ছে একবার, কার কাছে আপেল ভালো, কার কাছে তরমুজ ভালো, কার কাছে কমলালেবু !



আমাদের দলের সামনেই ওপরে তাকাতে-তাকাতে এক মধ্যবয়সী লোক পড়ল, প্রায় মুখ থুবড়ে বলা চলে । আমাদের গাইড তাকে টেনে তুলে পথের ওপর পাতা একটা ব্রোঞ্জ রিলিফের দিকে নির্দেশ করলেন । দেখলুম সেটা একটা ভাস্কর্য । নারীর স্তনের কাছে স্পর্শসুখের উদ্দেশ্যে এগোনো হাত । গাইড বললেন, রিলিফটির ভাস্কর এটা লুকিয়ে বসিয়ে গিয়েছিলেন, যাতে বিপথগামীরা হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়ে ; সম্প্রতি জানা গেছে তাঁর নাম রব হজসন ।

ধারাবাহিক - রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

অবভাস
রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়



Only this piece of sheet will introduce me…



... দীর্ঘ মাস্তুল আর্ত ডাকে না কেউ কিনারায় পড়্‌ / মিথ্‌ ও মিথ্যে দ্বীপবন্দর থেকে বিপন্ন শিকার ভেসে আসে...


ময়না দ্বীপ থেকে তাঁবু গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে, ফেরানো হচ্ছে ক্যামেরা, নষ্ট করে দেওয়া (Burn) হচ্ছে সমস্ত সেলুলয়েড । ময়না দ্বীপে বহিরাগত নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়েছে । তবে, হোসেন মিঞার গোরস্থানটি বড় সুরম্য । প্রাণিত সবুজ সব চারপাশ । আশ্চর্য, দ্বীপপুরাণে এর কোনো উল্লেখ নেই । হাইব্রিডিটির যে মনোজগৎ, তার বিপরীতে এখানে ভূমিপুত্রদের পুনর্জন্মলাভ হয় । ক্রমিক বিরতিতে এই দ্বীপ তলিয়ে যায় মৃত অমৃত সব নিয়ে, আবার ভার্জিন উঠে আসে । চাঁদের কাল ও কলা ক্ষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হয় মাত্র । এখানে কিছু গাণিতিক নির্মমতা প্রয়োগ উল্লেখ্য হয়ে ওঠে ।


একজন যাজককে এই ধারণার সম্যক বশবর্তী হতে হয় যে মাস্তুলই এখানে একমাত্র পূজ্য দেবতা এবং জ্যোস্না মুণ্ডিতমস্তক মহিলাদের বুক দিয়ে ধোঁয়া মৃত আঁশের আশনাই মাত্র । এরপর জল থেকে পুরা প্রাণীরা শুধু ধ্বনি সংবিদের কারণে ডাঙায় উঠে আসতে থাকে । যারা ময়না দ্বীপ নিয়ে ডক্যুমেন্টরি বানাতে আগ্রহী ছিল, তারা আপাতত, একটা খোঁড়া বেলুনওয়ালার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে; দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগেও যাকে প্রতিদিন গড়ে দশ দশটা লাল বেলুন চ্যারিটি করতে দেখা গেছে ।




মানুষের ইতিহাস তার স্মৃতির দাসত্ব থেকেও বেশি কিছু, দেশ ও দৈশিকতা বিরোধী এই শিক্ষা ধর্মযাজকদের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট । মৃত মানুষের অক্ষিদানের পর অন্ধত্ব নিয়ে যে বিশেষ কিছুই বলা যায় না, সেটাও ক্ষয়িষ্ণু ইতিহাসের শিক্ষা । এতএব, এই কুরঙ্গশালা তার যাদুছাদ খুলে দিচ্ছে । বামনাকার কুশী-লব, যাদের পাসপোর্টে গিনি ও মদের সুযোগ কিছু বেশি ছিল, তারা, চাঁদ নয়, চাঁদের প্রচ্ছায়া ছুঁতে চাইছে মাত্র । এসবই গীতিকবিতার পুনরুত্থান, যা সূত্রধরকে শিখণ্ডি রাখে, যাতে অধুনা-পুরাণ বর্ণিত একজাতি-একরাষ্ট্রের ধারণাগত অনুপ্রবেশ ধীরে ধীরে সংক্রামিত হয় এবং সেই ব্যাধির কোনো প্রতিব্যাধিশেধক কখনই আবিষ্কৃত হয় না । ফলতঃ, লেখাটি বাতিল তালিকাভুক্ত বলে কোনো একদিন ঘোষিত হয় ।


উল্লাস ।


( ক্রমশ: )

ভালোবাসি বাংলা - বঙ্গজীবনে চরিত্রবদল - শ্রী শুভ্র

বঙ্গজীবনে চরিত্রবদল
শ্রী শুভ্র


কোনো একটি জাতিগোষ্ঠির চরিত্র কালের প্রবাহে; সেই জাতিগোষ্ঠির মাতৃভূমির ভৌগলিক অবস্থানের নিরিখে এবং বিশ্বের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির সাথে মেলামেশার প্রবাহে কালে কালে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে! সেটাই স্বাভাবিক! চরিত্রের সেই বিকাশের পর্ব থেকে পর্বান্তরে অনেক ভাঙ্গা গড়ার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে জাতিসত্তা! সেই জাতিসত্তার চরিত্রের বদল কিন্তু দুদিনেই হঠাৎ হয় না! প্রায় দুইহাজার বছরের ইতিহাস ব্যাপী এই যে বঙ্গজীবন এর পরতে পরতে কালের পালে এসে লাগা হাওয়ায় ঘটে গেছে পরিবর্তনের পর পরিবর্তন! কিন্তু সেই পরিবর্তনের ফলে যে বাঙালির চরিত্রের বদল ঘটবেই তা নয়! আবার ঘটলেও তাকে বাস্তব বলে মেনে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত! কাম্য না হলেও!

এক কালে কালাপানি পেরোলে বাঙালির জাত যেত! পুরুত ডাকিয়ে গোবর খেয়ে রীতিমত যাগযোজ্ঞ করে তবেই তার প্রায়শ্চিত্য হতো সম্পূর্ণ! তারপর বাঙালি যখন ইংরেজের বৈভবে দিশাহারা হল, তখন অবস্থা গেল বদলে, সমাজে বিলেত ফেরতের কদর গেল বেড়ে! বিলেত ফেরত না হলে, নামের পাশে বিলাতী ডিগ্রী না ঝুললে পণ্ডিত বলে আর মান্যিগন্যি পাওয়া যায় না সমাজে! কি আশ্চর্যম!ঘরজামাইয়ের যুগ নেই আর! একদিন মান্যিগন্যি ব্যক্তিরা ঘরজামাই রেখে সমাজে ছড়ি ঘোরাতে পারতেন! এযুগে এন আর আই জামাই দেখিয়ে শ্বশুর শ্বাশুরীর গর্বে মাটিতে পা পড়ে না!সংস্কৃত পণ্ডিতদের দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল এককালে! আজ তারা থাকলে করুণার পাত্র!গৃহশিক্ষকের কাজও জোটে না! এও বদল!

রামমোহনের যুগে বঙ্গ সমাজে সহমরণ প্রথার বড়োই মহিমা ছিল! মৃত স্বামীর সাথে জ্যান্ত বৌ পুড়িয়ে ধর্মরক্ষা করা হতো! যুগ পাল্টিয়েছে তবু বৌ পোড়ানো বন্ধ হয়নি! বদলে গেছে ধরণ! সে যুগে মৃতের সম্পত্তি থেকে তার বৌকে বঞ্চিত করার দায় ছিল! এখন বৌকে চাপ দিয়ে তার বাপের বাড়ির সম্পত্তি সম্পদ হাতিয়ে নেবার প্রচলন হয়েছে সমাজের সর্বচ্চো স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্য্যন্ত সর্বত্র! চাহিদা পুরণ না হলেই ভর্তুকির কেরোসিন গায়ে ঢেলে দেশলাই জ্বালিয়ে দিলেই হলো! তাই বলে বৌকে লাই দেওয়া কদাপি নয়! সেযুগে স্বামীর পরিজন বাড়ির বধুকে জ্যান্ত দেহে চিতায় ওঠাতো! এযুগে স্বামী নিজেই মূল উদ্যোগতা হয়ে দেশলাই কেরোসিনের ব্যায় বহনের দায়িত্ব নেন!

সে এক যুগ ছিল, সমাজে শিক্ষককূলের একটা আলাদা সম্মান ছিল! শিক্ষকের গৃহে দারিদ্র ছিল কিন্তু আদর্শের অভাব ছিল না! কালের প্রবাহে শিক্ষককূলের ঘরে আর অভাব নেই! তবে তার সাথে আদর্শও ফাঁকা হয়ে গিয়েছে অলক্ষ্যে! আগে ছাত্রদের মধ্যেই স্কুল ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা ছিল সীমাবদ্ধ! আজ শিক্ষককূলও স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাঁধা মাহিনার সাথে বাড়িতে ছাত্র পড়িয়ে উই টি আই এর নানান স্কীম থেকে শেয়ার বাজারেও ফাটকা খেলছেন নিশ্চিন্তে! মানুষ গড়ার কারিগররা এখন জয়েণ্ট পাশ করাচ্ছেন! বিষয় বস্তুতে ছাত্রদের বিদ্যাদানের বদলে নোটদান করছেন! কোশ্চেন লিকের নতুন নামকরণ হয়েছে শিওর সাজেশানস! সেই দেখেই শিক্ষকের গৃহে অভিভাবকের লম্বা লাইন!

এক সময় শিক্ষকের সম্মান ছিল ছাত্র সমাজে! আজ শিক্ষকের প্রয়োজন পরীক্ষার খাতায় নম্বর বাড়াতে! আগে ছাত্ররা শিক্ষকের ভয়ে সভ্য হয়ে থাকত সুবোধ হয়ে! পরিবর্তনের হাত ধরে সেসব বদলে গেছে ধীরে ধীরে! ছাত্র আন্দোলনের সূত্রে শিক্ষকরা হতে থাকলেন ঘেরাওয়ের শিকার! আর আজ ছাত্রদের হাতে উত্তম মধ্যম জোটে শিক্ষকের ভাগ্যেও! আগে শিক্ষকের কথায় ছাত্ররা ওঠবোস করতো! এখন ছাত্র ইউনিয়ন পরিচালনা করে শিক্ষকদের! আগে অভিভাবকদের স্বপ্ন ছিল সন্তান মানুষ হবে! এখন অভিভাবকরা সন্তানের জন্য ডিগ্রী কিনতে ঘটিবাটি বেচতেও রাজী! আগে অভিভাবকরা শিক্ষা দিতেন সততার! আজ তারা শিক্ষা দেন চতুরতার! শিক্ষার লক্ষ্য এখন লাক্সারি ফ্ল্যাট গাড়ী, বিদেশ যাত্রা!

আগেকার কালে বাল্যবিবাহ বহুবিবাহর প্রচলন ছিল ঘরে ঘরে! আইন করে সেসব কুপ্রথা রদ হয়েছে ঠিক! তবে এখন বাল্য প্রেমের পরিণতি বিবাহ থেকে মুখে এসিড ছুঁড়ে মারা পর্য্যন্ত গড়িয়েছে! বহুবিবাহ আইনত বন্ধ বলে পরকীয়া পল্লবিত হয়েছে নানা রঙে! বাঙালির প্রেম আড়াল থেকে এখন সর্বসমক্ষে উত্তীর্ণ! বিবাহ বিচ্ছেদ এখন আর বিরল ঘটনা নয়! বরং অধিকাংশ প্রেমের পরিণতি বিবাহ না বিচ্ছেদ সেটাও গবেষণা সাপেক্ষ! বিধবা বিবাহ এখন আর সামাজিক নিন্দার নয়! ফলে বাঙালির সামাজ জীবনের নানান পরিবর্তনের সাথে চরিত্রবদল ঘটে গেছে ব্যক্তি বাঙালির বহিরাঙ্গে! কিন্তু প্রশ্ন হল সেই বদল বাঙালির ব্যক্তি চরিত্রের অন্তরাঙ্গে কতটা হয়েছে বা আদৌ হয়েছে কি?

বহুযুগ ধরেই বাংলার মানুষের মধ্যে কোনো অভিন্ন জাতিসত্তা গড়ে ওঠেনি! ক্রমাগত বিদেশী শাসনে অভ্যস্ত হয়ে শাসকের অনুগ্রহ অর্জনেই সে ব্যস্ত থেকেছে সবচেয়ে বেশি! ফলে বাঙালির ব্যক্তি চরিত্রের মধ্যে গড়ে ওঠেনি আত্মপ্রত্যয়! বরং প্রশাসকেরসেবার মধ্যেই সে আত্মমর্যাদা লাভে হয়েছে স্বচেষ্ট! ঠিক এই কারণেই বাঙালির চরিত্রের সাথে স্তাবকতার সুসম্পর্ক বহুদিনের! এই ভাবেই সে আখের গোছাতে মনোনিবেশ করেছে বংশ পরম্পরায়! এর অবশ্যাম্ভাবি ফলসরূপ লুব্ধচিত্তে সে ঐশ্বর্য্যশালী পরাক্রমী জাতির করুণা অর্জনে কাঙাল হয়েছে! আর অবজ্ঞা করেছে নিজ জাতির দরিদ্র জনসাধারণকে! বঞ্চিত করেছে তাদেরকে তাদের প্রাপ্য থেকে! এই চরিত্রের বদল হয়েছে কোথায়?

শত শত শতাব্দী ব্যাপী বাঙালি একের পর এক বিদেশী জাতির শাসনের অধীনে থেকে নিজস্ব জাতীয়তায় কোনোদিনই দীক্ষিত হয়ে ওঠেনি! আজ বিভক্ত বাঙালির একপক্ষ দিল্লীর কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে থেকে নিজেকে যতটা ভারতীয় নাগরিক বলে বিশ্বাস করে, বাঙালি বলে ততটা অনুভব করতে চায় না নিজেকে! সর্বদা তার লক্ষ্য কতটা ভারতীয় হয়ে ওঠা যায়! আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইংরেজী আর রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে হিন্দী ভাষার প্রতি তার সাধনা যত; নিজের মাতৃভাষার প্রতি তার সাধনা ও ভালোবাসা তার ভগ্নাংশ মাত্র! ফলে স্বদেশী বাঙালির প্রতি ব্যক্তি বাঙালির সংবেদনশীলতা খুব বেশি নয়! যে কারণে বাংলার প্রতি তার স্বদেশ প্রেমও আজও দানা বাঁধল না!

মোঘোল সম্রাট বাবর তাঁর আত্মচরিতে বাঙালি সম্বন্ধে লিখেছিলেন; "বাঙালিরা পদকেই শ্রদ্ধা করে, তারা বলে আমরা তখতের প্রতি বিশ্বস্ত! যিনি সিংহাসন অধিকার করেন আমরা তাঁরই আনুগত্য স্বীকার করি!" যার ফলসরূপ বাঙালির চরিত্রের মধ্যে তোষামোদ, চাটুকারিতা, পরনিন্দা পরচর্চা, সুযোগসন্ধানী সুবিধেবাদী মানসিকতা,তদ্বির প্রবণতা প্রভৃতি প্রকৃতিগুলি ভীষণ ভাবেই প্রবল! ভোগলিপ্সা তার মজ্জাগত কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ফাঁকিবাজিতে সে ওস্তাদ! কোনো যৌথ প্রয়াসে বাঙালির সাফল্য যে বিশেষ দেখা যায় না, তার জন্যে এই কারণগুলির সাথে ঈর্ষাপরায়ণতাও দায়ী! মূলত স্বাজাত্যবোধ না জাগলে প্রকৃতিগত এই ত্রুটিগুলি কোনো জাতির পক্ষেই কাটিয়ে ওঠা যায় না!

আত্মপ্রত্যয়হীনতায় ভুগে বিদেশী প্রশাসকের ভাষা সংস্কৃতিতে দক্ষতা অর্জনকেই বাঙালি তার সমৃদ্ধি বলে মনে করেছে! ফলে অন্ধ অনুকরণ প্রবণতা তাকে মৌলিকতা অর্জনে কোনো কালেই উদ্বুদ্ধ করে নি জাতিগত ভাবে! বাঙালির চরিত্রের এই মৌলিক প্রকৃতির কোনোই বদল তো হয়নিই, বরঞ্চ তা সমাজদেহের সর্বত্র ছড়িয়েছে! এবং এই আবিশ্ব বিশ্বায়নের গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে বর্তমানে বাঙালি বাঙালিত্ব বর্জন করে অতি দ্রুত আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার মত্ততায় ছুটেছে নেশাগ্রস্তের মতো! ফলে স্বাধীনতার পূর্বে ও পরেও বাঙালি রয়ে গেছে বাঙালিতেই! পৃথিবীর অন্যান্য জাতি যখন স্বাজাত্ববোধে দীক্ষিত হয়ে আপন জাতিসত্বায় গর্বিত! বাঙালী তখন ভারতীয়তায় আত্মবিসর্জনে মগ্ন!

ভালোবাসি বাংলা - বাঙালির চরিত্রবদল - ফেরদৌস আলম


বাঙ্গালির চরিত্রবদল
ফেরদৌস আলম



গত তিন দশকে বাঙালির চরিত্রে ঘটে গেছে অসামান্য বদল । স্বভাব বাঙালি যুগান্তরের বন্দেমাতরম ও চট্টগ্রাম অভ্যুথান পরীক্ষায় সিদ্ধ করেছিল নিজের বিপ্লবী সত্তা । সব্যসাচী ছিল তার আদর্শ, চোখে ছিল তরুণের স্বপ্ন । নেতাজির আন্তর্জাতিক রোম্যান্টিকতা যাদের চোখে স্বপ্ন ভরে রাখতো , রাসবিহারী বোসের INA যাদের দিন রাতের ঘুম কেড়ে নিতো , সেই বাঙালির চোখের সামনে একে একে ডুবে গেলো সমস্ত জাহাজ ...নৌ- বিদ্রোহ সফল হবার পর ক্রমশ রাতের নৈঃশব্দে স্বাধীনতার পদচারণা । মধ্যরাতে পতাকা বদল । নোয়াখালী , বেলেঘাটা , রাজাবাজার , পার্কসার্কাস ... মৃচ্ছকটিকের ঢাকা-শিয়ালদহ ট্রেন ...অনশনরত বৃদ্ধ , ফকির । গান্ধীর কৌপীন ধরে বাঙালি গান্ধীবাদী হোলো ।

পটনার প্রবাসী ডাক্তারের সুদীর্ঘ প্রশাসনকালে বাঙালিকে শেখালো উদ্যমী হতে ... শিল্পজীবি হোতে ... মহলানবীশি অর্থনীতির হাত ধরে চাষি বাঙালি শিল্পের শ্রমিক বনলো । বাঙালির চরিত্রে চা - পাট - ব্রিটিশের শিল্পেরা ছিলই , ছিল কেরানীবৃত্তি , বাবু-কালচার ... পঞ্চাশের বাঙালির মুকুটে জুড়লো আধুনিক শিল্পের পালক । হাওড়া-শেফিল্ড এবং গঙ্গাপারের শিল্পাঞ্চল পেরিয়ে রাঢ় বঙ্গের ইস্পাত তর্জমা ... । এরপর ক্রমিক বিকাশে মহলানবীশি ইস্পাতভারত ... ডিভিসির কল্যাণে কয়লা ও লোহার গড়ভূমিতে তিন তিনটে ইস্পাতপ্রকল্প ।

বাঙালির চরিত্র বদলের কথা বলতে গেলে অপ্রাসঙ্গিক হবে না তার আনুগত্যবদলের চিত্রণ । বাঙালির নিজস্ব ইতিহাস শশাঙ্ক ও পরবর্তী মাৎস্যন্যায় থেকে শুরু , যার পর প্রথম গণতান্ত্রিক রাজবংশ পালদের আগমন ... এরপর কনৌজী সেনবংশের হাতে বাঙালির স্বাধীনতার বলি । তারপর হুসেনশাহী অত্যাচারের গৌড়বঙ্গ এবং মুর্শিদকুলী সিরাজদের শেষ স্বাধীন নবাবী শাসন ...বাঙালি এরপর থেকেই কোম্পানি এবং ব্রিটিশের দাস এবং ভারতবর্ষে রেনেসাঁর প্রথম ধারক ।

ইতিহাসের পাতায় বাঙালির দ্বৈত চরিত্র বড়ো বেশি পরিস্ফুট । বৃহত্তর গোষ্ঠী যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল সেখানেও মুষ্টিমেয় প্রগতিশীল বাঙালির হাত ধরে বাংলায় রেনেসাঁর মানবিক বিকাশ । রামকৃষ্ণ , রামমোহন , বিদ্যাসাগর এবং কেশব সেনের নববিধান এবং রামকৃষ্ণ মিশনের আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গোষ্ঠীদ্বন্দের বিশ্বজনীন চেহারা । পাণ্ডববর্জিত বাঙালি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে নেমে বুঝতে পারে ... রোমান্স আর গণসমর্থন ভিন্নগামী , বুঝতে পারে প্রতিক্রিয়াশীল মোসাহেবী সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে জিততে চাই নিজস্ব সেনাবাহিনী । বাঙালির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নায়ক পৃথিবীর অন্যতম সেনাবাহিনীর প্রধান হাফিজ হয়ে যান ... মোসাহেবীদের চক্রান্তে বাঙালির সামনে ফেরবার এই স্বপ্ন নিয়ে উদয় হন আরেক তরুণ শেখ মুজিবর । ভাষার ভিত্তিতে পৃথিবীর প্রথম দেশ গঠন বাঙালির একুশের ক্ষতে অল্প মলম লাগায় ।

সেই বাঙালি পূবেতে ঘাত অভিঘাতে আর পশ্চিমে নিরর্থক আন্দোলন আর শিল্পনাশা আর কর্মনাশা তিন দশকের প্রতিঘাতে ন্যুব্জ হয়ে যায় । তার HDI , তার HQ হ্রাস পায় দ্রুতগতিতে ।তার মনীষার তারকাখচিত অতীত আকাশ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবির মৃত্যুর পর , কল্লোল গোষ্ঠীর তারাপাতের পর , আকাশের সাতটি তারার জনকের ধারাপাতের পর এমন এক ধারাপাতের মুখে পড়ে যার কোনো ইতিহাস নেই । একদিকে প্রতিষ্ঠান সর্বস্ব কিছু মনীষা অতীত বামপন্থার কালিমা ভুলে বাণিজ্যিক বিপ্লবে বলীয়ান , অন্যদিকে দলে উপদলে বিভক্ত অপ্রতিষ্ঠানিক ... তার কৌলীন্যে অলঙ্কৃত শ্রেষ্ঠ মনীষার কলরব । নাট্যদিগন্তেও একই নাটককে ভিন্ন আস্বাদে চিনে নেওয়া ... যাত্রাপালার ক্রমিক শীর্ষমন্তাজ এবং পতন । স্মৃতির আড়ালে তলিয়ে যাওয়া নাট্যনক্ষত্রের দিগন্তবলয় । ব্রেখট , গোর্কি , গিরীশ , এবং সোফোক্লেস এবং মৌলিক বিভিন্নভাষী অধুনা নাটকের অ্যাকাডেমি পরিক্রমা । , দুঃসময়ের স্রষ্টার হাত ধরে সিঙ্গুর , নন্দীগ্রাম ... মোমমিছিল ... তারকা সমাবেশে বিভাস শাঁওলী থেকে সমীর শুভাপ্রসন্ন মহাশ্বেতা ... যখন বাঙালির দৃষ্টি নিবদ্ধ হতো সত্যজিত , মৃণাল ঋত্বিকের ক্যামেরায় বাঙালি ৭১ এর গণহত্যার প্রতিবাদ করেনি । তাই বাঙালি সসম্মানে শিরোধার্য করেছে রুনু - সিদ্ধার্থ , সোমেন , লক্ষ্মী আর প্রিয় , সুব্রতকে । আজো বাঙালি নিরাপদ দূরত্ব থেকে শূন্য অঙ্ক কষে কালবেলায় , কালপুরুষে । বাঙালি কি বদলেছে ?

বাঙালি বদলেছে । আগে মনীষার ঘর ছিল তিনটি । যুগান্তর , আনন্দবাজার আর গণশক্তি । কংগ্রেসি যুগান্তরের যায়গায় এসেছে তৃনমূলী প্রতিদিন । জরুরী অবস্থায় বাঙালি আজ গর্জায় , সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের ঘটনায় যেমন তেমনি কার্টুনকাণ্ডের প্রতিবাদে , এবং একনায়িকার খেয়ালিপনার বিরুদ্ধে ... বাঙালি রাজনীতি ভোলে না । বাঙালি তসলিমাকে ফেরাবার সাহস ধরে না । ছুঁৎমার্গে ভুলে ব্যান করে নিরীহ বই আবার শারুখ অমিতাভকে সাথে নিয়ে বানায় বৃহত্তম ফিল্মসিটি । কলকাতা চলচিত্র উৎসবকে বিমুক্ত করে নন্দন থেকে নেতাজী ইনডোরে । সমান ভিড় ভাঙে রবীন্দ্রজয়ন্তী আর সুনীলের তিরোধানে ।

ভবিষ্যৎ উত্তর দেবে বাঙালি প্রগতির রথে চড়বে কিনা ... যেমন সে দাপাচ্ছে বাঙ্গালুরু , সাইবেরাবাদ , গুরগাঁও , নয়দা , মুম্বাই , লন্ডন রাইন প্যারিস দুবাই ... সেকি পারবে প্রগতির রথটার রশি পাকড়ে নিজের মাটিতে ফের স্থাপন করতে ? বাঙালি কি বুঝতে পারছে শুধু কেন্দ্রের অসহযোগিতার বুলি কপচে আর চলবে না ? লালগড় , গোর্খাল্যান্ড ... সব্বাইকে সাথে নিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দীপ হাতে বাঙালি কি সূচনা করবে নতুন ক্যানভাসের ?

ভালোবাসি বাংলা - প্রবাসে বাঙালির জীবন - ইন্দ্রাণী সরকার

প্রবাসে (আমেরিকায়) বাঙালির জীবন
ইন্দ্রাণী সরকার


আমেরিকায় বাঙালির জীবন নিয়ে লিখতে বসে অনেক কিছু কথাই মনে পড়ছে | এখানে ছাত্র অবস্থাতেই বেশির ভাগ লোকেরা দেশ থেকে আসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য | লেখাপড়ার যে পদ্ধতি তা দেশ থেকে অনেকটাই আলাদা | ছাত্রছাত্রীরা কলেজের ডর্মে (হোস্টেল) থেকে পড়াশুনা করে | কলেজের (ব্যাচেলর) মেয়াদ চার বছরের হয় | স্নাতক (ব্যাচেলর) ডিগ্রী লাভ করা যায় ক্রেডিট হিসেবে | প্রতি বছরে যে কোর্স নেওয়া হয়, তার উপর পরীক্ষার ভিত্তিতে গ্রেডিং হয় | ছাত্রছাত্রীদের অনেক স্বাধীনতা দেওয়া হয় কোর্স পছন্দ করার ব্যাপারে |

স্নাতকোত্তর ডিগ্রী দুই বছরের | এখানেও ক্রেডিট হিসেবে ডিগ্রী প্রাপ্তি হয় | পড়ার চাপ স্নাতক বা বি. এস. ডিগ্রী থেকে অনেক কম হয় | এরপর পি. এইচ. ডি. আর তারপর পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রী তো আছেই |

আপাত পড়াশুনা শেষ করার পর চাকরির খোঁজ, বিভিন্ন জায়গায় রেসুমে পাঠিয়ে চাকরির অ্যাপ্লাই করা সে সব তো আছেই যা প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই |

সংসারী লোকেরা প্রথমেই সুবিশাল অট্টালিকায় বাস করতে পারে না | জীবন শুরু হয় ভাড়া এপার্টমেন্ট (ফ্ল্যাট) থেকে, তারপর ধীরে ধীরে কন্ডমিনিয়াম বা টাউনহাউস এবং তারপর নিজস্ব বাড়ি | এর মধ্যে থাকে কত পরিশ্রম আর প্ল্যানিং| বাড়ি তো সাধারনত কাঠের হয় কিন্তু তার দাম তো অনেক | কিস্তিতে বাড়ি কেনা হয় | ব্যাঙ্কের থেকে ধার নিতে হয় যা প্রতি মাসে একটু একটু করে শোধ হয় | শহর ছাড়া যে কোন শহরতলিতে গাড়ি ছাড়া জীবন চলবে না | বাজার, অফিস, বেড়ানো সবেতেই গাড়ির নিতান্তই প্রয়োজন হয় | বাড়ির মত গাড়িও ধারে কেনা যায় যা প্রতি মাসে অল্প অল্প করে শোধ দিতে হয় | এখানে এটাই একটা সুবিধা যে প্রায় সব কিছুই ধারে কেনা যায় |

এই দেশে মানুষের পরিশ্রমের অনেক দাম, খাবারের দামের থেকেও বেশি | যে কোন জিনিস সারাতে যদি অন্য লোকের সাহায্য প্রয়োজন হয় তা খুবই খরচ সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায় | এই কারণে অনেকেই ছোটখাট সারানোর কাজ শিখে নেয় পয়সার কিছু সুরাহা করতে |

খাবারের দাম সত্যিই খুবই কম | এই জন্য মজা করে বলা হয় যে আমেরিকায় আর কিছু না হোক না খেয়ে কেউ মরবে না |

সাধারনত কর্মস্থলে খুব-ই কাজের চাপ থাকে | ডেডলাইন বজায় রাখতে গিয়ে যেন ডেড হয়ে যাবার যোগাড় হয় | কাজের ফাঁকে আড্ডা ইত্যাদির সুযোগ খুবই কম |

তবুও এরই মধ্যে মানুষ জীবন উপভোগ করে | শনি ও রবি এই দুটো দিন ছুটি থাকার জন্য সারা সপ্তাহের অসমাপ্ত কাজ, বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাওয়া, বন্ধুর বাড়ি পার্টি ইত্যাদি এই সব নিয়ে হৈ হৈ করতে করতে ছুটির দুটো দিন কেমন করে যেন চলে যায় এখানে বাঙালির যে সব ছেলে মেয়েরা জন্মায় স্কুলের পড়াশুনার চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা বা বাঙালিয়ানার থেকে ক্রমশ যেন দূরে সরে যায় | এতে তাদের কোন গাফিলতি থাকে না | পড়াশুনা ছাড়াও এক্সট্রাকারিকুলাম একটিভিটি ইত্যাদি এত বেশি হয়ে যে সমস্ত কিছু ধরে রাখা প্রায়ই অসম্ভব হয়ে যায় | তবুও এরই মধ্যে অনেক ছেলে মেয়েই প্রাচ্যের সংস্কৃতি বজায় রাখতে সক্ষম হয় | উচ্চশিক্ষা প্রাপ্তির সুযোগ সুবিধা খুব ভাল থাকার জন্য বাঙালির সন্তানরা অধিকাংশ সময়েই জীবনে ভালোভাবে দাঁড়াতে সক্ষম হয় |

ভালোবাসি বাংলা - মুক্ত গদ্য - বিপ্রতীব

সন্তর্পণে নিভে যাচ্ছে মাটির পিদিম
বিপ্রতীব


আশা এবং আশঙ্কার তীব্র জলস্রোতে আমি প্রতিবার এক ব্যর্থ ডুবুরি, স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছি নরকাশ্রম।

প্রচ্ছদে সন্ধ্যালন্ঠন আর পৃষ্ঠাজুড়ে রাশি রাশি কামিনী ফুল। আমি বুকভরে তার ঘ্রাণ নেই, ভুলবশত ভুলে যাই- এরপর অপেক্ষারত মেঘের আখ্যান। এইভাবে অতল অতীত খুঁড়ে হাতড়ে গতরাত- সদ্য খুঁজে পেয়েছি এক-আধটা গঙ্গাফড়িং, সবুজ ঘাসের মাঠ আর দুধারে ঘন জঙ্গল।

আটপৌরে গোধূলি। খুব একাকী একটা কিশোর ব্যাটিং বোলিং স্বপ্নে বিভোর।

আমার জংধরা পুরোনো শহর, স্মৃতিময় লৌহজং ব্রিজ। আজ বিকেলে গিয়েছিলাম। ব্রিজের ঢালে ঝাকড়া শিমুল ফুলের গাছ'টা এখন নেই। তার বিপরীতে সেখানে 'উনিশ-কুড়ি'র সুদৃশ্য বিলবোর্ড। এই দারুণ বৈপরীত্যের ঘোরে জানি অবেলায় আজ নিভে যাবে চাঁদ ভীষণ নিঃসঙ্গতায়।

বৃষ্টিবিদ্ধ ব্যাকুল নিঃশ্বাসে আগলে রাখি যার আঁচলের ঘ্রাণ, সন্তর্পণে চোখরাখি তার চোখে। তার চোখের তারার রঙ গাঢ় রাত, সেখানে ক্রুর হাসে এক নিঃসঙ্গ মৃত্যুদূত। আমি চমকে উঠি। আমার জন্মাবধি নেশান্ধ দু'হাত প্রথমবারের মতো মৃদু কেঁপে ওঠে।

মাথাভর্তি দপদপে অন্ধকার। পাঁজরে ভীষণ খরা আর শিরায় শিরায় মরা গাঙ। আমি প্রতিবার ভুলপথে হাঁটি, ভুল পদক্ষেপে, নিজস্ব রক্ত এবং ছায়ার তুমুল বিরুদ্ধতায়। ইলেকট্রিক তারে ঝুলে আছে শতসহস্র গতজন্মের দাঁড়কাক। মৃত। আমি জানি এই মাতাল নগরে কারও মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়, এমনকি ঈশ্বর! স্বেচ্ছায় সমাপ্তি ঘোষণা করে যে সমস্ত সময়ের, মুহূর্তের বিভ্রমে, আদতে তার চোখে বাঁধা স্বার্থপরতার লাল কাপড়। অতএব, এসো হে শান্ত সুবোধ, স্টেশানের শীর্ণ কুলির মতন অনিচ্ছাবশতঃ টেনে নিয়ে যেতে থাকি এই জানোয়ার জীবন প্রত্যাশিত অন্তিমের দিকে!

অন্ধকারে চোখ- মুর্হুমুহু পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্য। আলো-ছায়ার নিরন্তর দৌড় ঝাঁপ। এমন অঘ্রানরাতে – যদি আত্ম উপলদ্ধিতে পরপর খুলে যায় সমূহ জানলা, নিজেকে বড় তুচ্ছ, নিয়তিগ্রস্ত মনে হয়। ভেবে দ্যাখো, সন্তপর্ণে নিভে যাচ্ছে মাটির পিদিম, আচমকা উঠোনময় নৈঃশব্দের চাষাবাদ। অন্ধ শালিকের ক্ষোভ নিয়ে এভাবেই বাঁচে একলা মানুষ। কেউ বোঝে না, দীর্ঘশ্বাসে তার মিশে আছে কতটা বারুদ, কতটা আঘাতে হায়, ডুবে গেছে জলহীন ভীষণ জোয়ার। বিষণ্ন চারিধার, গুটিয়ে নেয় বৃদ্ধ মাতাল রাতের অবশিষ্ট অন্ধকার। চৌষট্টিতম
সিগারেট ছুড়ে ফ্যালে সে দুর্বোধ্য আঁধারে। শেষবারের মত দেখে নেয় সাদাকালো
আকাশ, উড়ে যায় দু-তিনটা জন্মান্ধ বাদুর।

অন্ধকার হ'লে এখন অনেকেই মুছে যায়।

প্রবন্ধ - ব্রততী চক্রবর্তী

আমার শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন
ব্রততী চক্রবর্তী



শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম রোমাঞ্চকর পর্ব । শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আবিষ্কারের পর বাংলার সাহিত্য জগতে যে ঝড় উঠেছিল তার রেশ এখনো ফুরিয়ে যায়নি । রচয়িতা থেকে রচনাশৈলী তথা রচনা কাল - সমস্ত প্রকারে তৎকালীন বাংলা সাহিত্য মোদী তথা সমালোচকদের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন যেভাবে বিচলিত করেছিল তার প্রমান সাহিত্য- পরিষৎ পত্রিকার পুরনো সংখ্যাগুলি ! একদিকে চণ্ডীদাস বিতর্ক, ভাষা ও লিপির পুরাতাত্ত্বিক অবদান আর অপরদিকে রুচিহীনতার অভিযোগ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে সর্বকালে বিতর্ক ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু করে রেখেছে।



১৩১৬ সালে (ইং ১৯০৯) বসন্ত রঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের কাকিল্যা গ্রামের শ্রী দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের গৃহ থেকে এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন। কৃষ্ণ লীলা বিষয়ক এই বৃহৎ কাব্যটি বসন্ত বাবুকে অত্যন্ত উৎসাহিত করে। ওই কাব্যের দ্বিতীয় অনুলেখন বহু সন্ধানে ও পাওয়া যায় নি। তাল শিক্ষার একটি পুঁথিতে কয়েকটি পদ পাওয়া গেলেও এই গ্রন্থ এক ও অদ্বিতীয় । প্রাপ্ত পুঁথির মধ্যে এক টুকরো তুলোট কাগজ পাওয়া যায় । এই চিরকুট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে বনবিষ্ণুপুরের রাজ গ্রন্থাগারে ১০৮৯ সালে পুঁথিটি বর্তমানের প্রমান পাওয়া যায় । অনুমান করা যায় বৈষ্ণবধর্ম অনুসারী বনবিষ্ণুপুরের রাজ পরিবারে কৃষ্ণলীলা বিষয়ক অনেক পুঁথি ই ছিল। সম্ভবত ওই বংশের রাজগুরু শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র বংশধর শ্রী দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের সাথে রাজ পরবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারনে ওই পুঁথি শ্রী মুখোপাধ্যায়ের অধিকারে আসে। যাইহোক, ১৩১৮ সালে ওই গ্রন্থটি বসন্ত বাবু কর্তৃক সাহিত্য পরিষদের জন্য সংগৃহীত হয় এবং ওই বছর ই সাহিত্য- পরিষৎ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় এই গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রকাশিত হয় । কিন্তু মুদ্রিত না হওয়ার কারনে অনেকেই এর সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেননি । পরবর্তীতে ১৩২২ সালে বসন্ত বাবু এবং প্রাচীন লিপি বিশারদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মিলিত ভাবে সাহিত্য - পরিষৎ পত্রিকায় এই কাব্য সম্পর্কে একটি লেখা প্রকাশ করেন। এই লেখায় প্রাপ্ত পুঁথির লিপি বিচার করে এই রচনাকে অতিশয় প্রাচীন বলে বর্ণনা করা হয়।শুধু তাই নয় এই লেখায় প্রাপ্ত কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডিদাস কে আদিতম চণ্ডিদাস বলে ঘোষণা করেন। এই লেখা পাঠক মহলে যথেষ্ট আলোড়ন তোলে । এর কয়েক মাস পরে ১৩২৩ সালে (ইং ১৯১৬) বসন্ত রঞ্জনের সুযোগ্য সম্পাদনায় এই কাব্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয় আর প্রকাশ মাত্রেই চণ্ডীদাস বিতর্ক প্রবল আকার ধারন করে।


চণ্ডীদাস বাঙালি মনের অত্যন্ত কাছের একজন কবি। চণ্ডীদাস পদাবলীর সুমুধুর স্নিগ্ধ ধারায় বাঙালি সাহিত্য পিপাসা মিটে আসছে সুদীর্ঘ সময় ধরে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে কেন্দ্র করে চণ্ডীদাস বিতর্ক এমন প্রবল আকার ধারন করে যার এক মাত্রিক সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি । বলা বাহুল্য যে বাংলা সাহিত্যের আর কোন কবি ও কাব্যকে এত সওয়াল - জবাব, এত যুক্তি - প্রতি যুক্তির সম্মুখীন হতে হয়নি। এই বিতর্কের মূলে আছে চণ্ডীদাসের পদাবলীর সাথে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাব ও প্রকাশ রীতির পার্থক্য । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে শৃঙ্গার ও আদি রসের আধিক্য আর পদাবলীতে 'যূথিকা-শুভ্র' নির্মল ও পবিত্র প্রেমের জোয়ার । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ব্যবহৃত শব্দ ও বানান রীতি ও যথেষ্ট প্রাচীনতার সাক্ষ্য বহন করে । প্রথমে পদাবলী ও শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের রচয়িতা হিসেবে এক জন চণ্ডীদাসের কথাই ভাবা হয়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধে স্বয়ং রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী ও এই এক চণ্ডীদাস তত্ত্ব সমর্থন করেন । খেদের সাথে ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন ও বলেন - " অপরিনত বয়সের চাপল্যে চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের মতো একখানি অতি অশ্লীল কাব্য রচনা করেছিলেন । পরে শিল্পী স্বভাবের ক্রম বিবর্তনের ফলে সেই একই কবি অপূর্ব প্রেম-ভাব- সমৃদ্ধ পদ সাহিত্য রচনা করেন । " কিন্তু এই তত্ত্ব প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ল । মধুস্যন্দী পদাবলী রচয়িতার এমন স্থূল, অশালীন রচনার সম্ভাবনাকে বাঙালি মন মেনে নিতে পারল না। অনেকেই প্রতিবাদে সোচ্চার হলেন । ভনিতা, শব্দ চয়ন, কাব্যের প্রাচীনতা ইত্যাদি বিচার করে দুজন চণ্ডীদাসের অস্তিত্বের কথা স্বীকৃত হয় - একজন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস এবং অন্যজন পদাবলী রচয়িতা চণ্ডীদাস । যাইহোক চণ্ডীদাস সমস্যা ও সেই সংক্রান্ত আলোচনা ও বিতর্ক বিশাল এবং কোন রোমাঞ্চ উপন্যাসের থেকে কম উপভোগ্য নয় । পরবর্তীতে তৃতীয় একজন চণ্ডীদাসের অস্ত্বিত্ব এই বিতর্ককে আরও আকর্ষণীয় করে। তবে আজ পর্যন্ত চণ্ডীদাস - সমস্যা বিষয়ে শেষ কথা বলা সম্ভব হয়নি ।


শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কাহিনী 'খণ্ড' ভাগে বর্ণিত । পুঁথিটির কিছু অংশ মিসিং হলেও ঘটনার ধারা অনুসরন করতে অসুবিধে হয়না । মূলত তের খণ্ডে বিভক্ত এই কাব্য - জন্ম খণ্ড, তাম্বূল খণ্ড, দান খণ্ড, নৌকা খণ্ড, ভার খণ্ড, ছত্র খণ্ড, বৃন্দাবন খণ্ড, কালীয় দমন খণ্ড, যমুনা খণ্ড, হার খণ্ড, বাণ খণ্ড, বংশী খণ্ড ও রাধা বিরহ । জন্ম খণ্ডে দেবগনের প্রার্থনায় ভূভার হরনের জন্য ভগবান বিষ্ণু ও লক্ষ্মী দেবীর কৃষ্ণ ও রাধা রূপে জন্ম গ্রহন। তাম্বূল খণ্ডে রাধার অসামান্য রূপ লাবন্যের কথা শুনে শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক বড়াই মারফত মিলন-আমন্ত্রন সূচক তাম্বূলাদি রাধাকে উপহার প্রেরণ, রাধা কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যান ও বড়াইকে অপমান। দান খণ্ডে কৃষ্ণ ও বড়াইয়ের রাধা লাভে ষড়যন্ত্র এবং দানী সেজে বিভিন্ন ঘটনা ক্রমের পরে কৃষ্ণের বল পূর্বক রাধাকে সম্ভোগ । নৌকা খণ্ডে মাঝি বেশে কৃষ্ণ গোপীদের যমুনা পার করায় ও মাঝনদীতে ইচ্ছাকৃত নৌকাডুবি ঘটিয়ে রাধার সাথে জলবিহার করে। ভার খণ্ড ও ছত্র খণ্ডে শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক রাধার দধি-দুগ্ধের পসরা বহন ও ছত্র ধারনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। বৃন্দাবন খণ্ডে রাধা কৃষ্ণের মিলন ও যমুনা খণ্ডে কালীয় দমন, কৃষ্ণ দ্বারা গোপীদের বস্ত্র হরণ ইত্যাদি বিবৃত আছে। হার খণ্ডে রাধার হার অপহৃত হয়, অভিযোগের তীর কৃষ্ণের দিকে, যশোদার কাছে রাধার নালিশ। বাণ খণ্ডে ক্ষুব্ধ কৃষ্ণের প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য রাধার প্রতি মদন বাণ নিক্ষেপ, রাধার মূর্ছা, কৃষ্ণের অনুতাপ, ক্রুদ্ধ বড়াই কর্তৃক কৃষ্ণকে বন্ধন, কৃষ্ণের সকাতর অনুনয়, বন্ধন মোচন - পরে রাধার মূর্ছা ভঙ্গ ও রাধা কৃষ্ণের মিলন। রাধা বিরহ খণ্ডে রাধার বিরহ, পরে রাধাঁ - কৃষ্ণ মিলন এবং পরিশেষে রাধার নিদ্রাবস্থার অবকাশে কৃষ্ণের মথুরা যাত্রা।


শ্রীকৃষ্ণকীর্তন প্রধানত আখ্যান কাব্য। এতে নাট্য রসের প্রচুর উপাদান আছে । কাহিনীতে কবি কোথাও নিজে উপস্থিত থেকেছেন সূত্রধর হিসেবে কোথাও সংস্কৃত শ্লোকের মাধ্যমে সংলাপের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করেছেন । চরিত্র চিত্রায়নেও কবি বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন । কাব্যের রচনা নীতি ও কাব্য কলা বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে - বিশেষত বর্ণনা কৌশল, অলঙ্কার সন্নিবেশ ও শব্দযোজনা অনুমান করা যায় ভাষা ও অলঙ্কার শাস্ত্রে কবি ছিলেন কৃতবিদ্য। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের ছন্দ বৈচিত্র্য ও অপূর্ব । এতে মোট সাত প্রকারের পয়ার বর্ণিত হয়েছে। মাত্রাগত কিছু ত্রুটি থাকলেও পয়ার ত্রিপদীর কাঠামো বজায় আছে। কাব্যটির কোথাও কোথাও কিছু শিথিল, নিয়মহীন, চঞ্চল ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এই ব্যবহার ইচ্ছাকৃত ও হতে পারে; তৎকালীন লোকসঙ্গীত বিশেষত ঝুমুরের প্রভাবে ও এমন নৃত্য চপল ছন্দ পরিকল্পিত হয়ে থাকতে পারে। তবে কোথাও দ্বিমাত্রিক পয়ারের ধ্বনি বৈশিষ্ট্য ক্লান্তিকর। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে ব্যঙ্গ পরিহাসের বিশেষ প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায় না । শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে রাধা ও কৃষ্ণের বাক্য বিনিময়ের মধ্যে কখনো তীব্র ব্যঙ্গ বিদ্রূপের তীব্রতা প্রকাশ পেয়েছে যা মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যে সহজ লভ্য নয়। উল্লেখ্য যে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের কাব্যরস সংক্রান্ত আলোচনা বাংলা সাহিত্যে বেশ সীমিত।


চণ্ডীদাসের পদাবলী বাংলা সাহিত্যের অর্জুন হলে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নিঃসন্দেহে কর্ণ ! সাহিত্য মূল্য তথা কাব্যগুণ ঢাকা পড়ে গেছে চণ্ডীদাস বিতর্ক ও অশ্লীলতার অভিযোগের আড়ালে। গ্রাম্য স্থূলতার অভিযোগের আড়ালে হারিয়ে গেছে দেবতার মানবীকরনের সাহস, ঐশী প্রেম সাধনার সুরকে এক বিশেষ দেশ-কালের সাধারন দুই মানব মানবীর প্রেমাচরণের বাস্তবের ধূলা - মাটি মাখা আখ্যানে রূপান্তরের স্পর্ধা ! উনবিংশ শতকের বাংলা সাহিত্য প্রতিনিধিরা মুখ ফিরিয়ে থেকেছেন। অথচ শৃঙ্গার রসকে সমাদরে গ্রহন করেছে সংস্কৃত সাহিত্য এবং বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার মধ্য যুগীয় সাহিত্য। এই ভাবনাকে শ্রী শিশির কুমার দাশ তার "The history of Indian literature" গ্রন্থে সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন - " The representation of sex in Indian literature was not a new phenomenon. The classical as well as precolonial literature in various Indian languages had a strong erotic component, at times bordering the pornography. And yet from nineteenth century on wards sex became a taboo in Indian literature and representation of sex in literature was considered to be insidious effect of western literature. " যাইহোক, আদি রসের প্রাধান্য ছাপিয়ে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের আধুনিকমনস্ক সৃজন বাংলা সাহিত্যকে উজ্জ্বল করে। তাই শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন আজও প্রাসঙ্গিকতার দাবী রাখে।

দু'টি কবিতা - শৈলেনকুমার দত্ত

শৈলেনকুমার দত্ত

চিত্রপট


রাত্রি গভীর হলে চাঁদ একা নেমে আসে বিবস্ত্রা রমণী
যৌনগন্ধী সুরঞ্জিত দেহ......ঝিমোনো বটের ডালে নাড়া দেয়
মধ্যরাতে পুরুষ হতে বলে----
চোরাচোখে অপরূপ দৃশ্য দ্যাখে শালিক-দম্পতি
নির্জনে হিসেব করে --- এত তাপ তাদেরও কি ছিল!
বিবসনা সরোবর সেও আর্ত আরেক রমণী
বাড়ায় উন্মুখ ঠোঁট....এলোমেলো কিছুটা উদগ্র
সুদীর্ঘ দুহাতে তাকে কাছে ডাকে সীমাহীন চর
প্রাণবন্ত দয়িতের দুরন্ত আবেগে
সময়ের হাতে থাকে অবিনাশী এই চিত্রপট

উড়ান

তুমি নগ্ন হতে হতে প্রতিমা হয়ে উঠলে
গোপন মুদ্রাগুলি ফুটে উঠল ফুল হয়ে!
রতিমুখর রাত্রি তখন থমকে দাঁড়িয়েছে
সে স্বর্গ থেকে সংবাদ এনেছে--
বাসরশয্যা হয়ে উঠেছে উপবন
আর তার অলীক ভেলায় চেপে
আমাদেরও উড়ে যেতে হবে

দুটি কবিতা- সমর বন্দ্যোপাধ্যায়

সমর বন্দ্যোপাধ্যায়
সম্পর্কের সহজপাঠ
কোনো কোনো প্রতারণা হজম করাই বিচক্ষণের কাজ,
যেরকম গূঢ় বিপর্যয়ে কি নিষিদ্ধ উৎসবে
অথবা চরম তৃপ্তিতে সাক্ষী না রাখা উচিত
বিবেচনা করে নীরব থাকাই শ্রেয়......এ চতুর পদক্ষেপ
জটিল গার্হস্থ সাজাতে কাজ দেবে ভেবে ভেবে হৃদয়ের ক্ষয়ক্ষতি
তবু স্বীকার করাই ভালো, যতোটা চেনা গেছে ...ভনিতা করো
বুঝতে বাধ্য করো সম্পর্কের সহজপাঠ,
যদিনা এতেও বুঝতে পারে তবে আরো তির্যকে

তুমি কিছু গোপন করেছো তো সে-ও কিছু মিথ্যা বলেছে
একথা উভয়ে উদ্ভাসিত অথচ নির্লজ্জ সে যৌথবঞ্চনা দুজনকে কাছে আনে
যে ঘৃণ্য রফায়---একদিন তা সহ্য করোনি সেই ভালোবাসাবাসি কালে
বলে এ অর্থহীন গৌরবে কি দিন যাবে?

ভাঙো, উপদ্রুত স্মৃতি...অলীক শিকল
যা কল্পনাও করোনি তাই---শুরু হোক ঠান্ডা লড়াই।


বর্ণালি

আলো একি জল ওলো আলো নাকি হাওয়া
ভুলেরই মাশুল তাই ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া
তবু ওকে বোলো তাকে বোলো সবই বুঝি
হয়নি মনের ভেদ ফল্গুতে মন-এরই পূঁজি
অর্থে অনর্থ খুঁজি কই কি আছে কি নেই
জন্মে মরেছি কানা মরে যাই একটু ছুঁতেই
জনম জনম রূপ নেহার তু আছো তু নেই
জানতে বুঝতে বেলা গেলো হারালো যে খেই...

দুটি কবিতা - প্রণব বসুরায়

২৪ জানুয়ারি ও অলৌকিক
(শম্পার সৌজন্যে)

প্রণব বসুরায়

রাত হ'ল, দূরে শুনছি ট্রেনের হুইসিল
তোমার জন্যে আনা রক্তকরবীর মালা
গলায় পরাবার কোনো সুযোগ পাইনি আজ
হাতে তুলে দিই, নেবে?

হিরের গয়নার সঙ্গে মানায়না -এই সঙ্গত কার
তুমি কাচের থালায় রক্তকরবী সাজিয়ে রাখলে......
ঘরের দৃশ্যে অন্য মাত্রা এলো, সবাই বললে, বাঃ

শুধু আমিই জানি
কতো ফোঁটা রক্ত মিশে গেল ফুলের ধমনিতে

কবিতার নিচে স্বাক্ষর করিয়ে নিতে ভুললে না, দেখে
কেঁপে উঠল আমার ভুবন

২৪ জানুয়ারি ঘটে গেল এইসব অলৌকিক ঘটনাবলি



দ্বি

কে জাগবে আমার জন্যে, এবং জাগবে কেন
তার যেন আর সংসার নেই, পুত্র-কন্যা হেন
ফুলের গুচ্ছ, হাস্যমুখর, বিদ্যুৎ ঝলমলে
এমন সময় মন্দ কথা কেউ কখনো বলে?
#
" থাকুক সে সব গুপ্তকথা, অন্য দিনে হবে
এখম দ্যাখো মাছের ছবি ...একটা কিছু খাবে
মাথার আমি দিব্যি দিলাম পোশাক বদলে এসো ...
আমি যাচ্ছি শোয়ার ঘরে, সোফায় গিয়ে বসো "

এই সংখ্যার কবি - তন্ময় ধর

তন্ময় ধর

গোধুলির স্লাইডিং

১।
অস্নানের একটু বার্নট সায়ানা
কুহকের
এই অস্পৃশ্য কোণে
লিখলাম বা বৃষ্টির স্বরে এগোলাম

২।
সদ্য মৃতের ত্বক
ব্লেড, কুয়াশা,দুধ, শিলালিপি ও ধাতুযুগ
গল্পের শিকড়ে সব
‘স্থলকমলগঞ্জনং মম হৃদয়রঞ্জনং জনিতরতিরঙ্গপরভাগম
ভণ মসৃণবাণি করবাণি চরণদ্বয়ং সরসলসদলক্তকরাগম’
স্বচ্ছ করে দিচ্ছো তোমার কান্নার ইনফ্রা-রেড

৩।
এক রহস্যময় ডুবসাঁতার আমার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে
পিছনে
আর এক অন্ধ জলস্তর
স্মৃতিহীন শাদা মথ ও রক্তবস্ত্রের উপকথা-
‘ঝালটা কি একটু বেশি হয়ে গেছে?’
উত্তর এসে
ভাসিয়ে রাখে খড়-মাটির কঙ্কাল


অপরাহ্নের স্লাইডিং

১।
কঙ্কালের উপসর্গ আসার আগে
ওই নাভিবিন্দু থেকে উড়ে গেছে
আহত সরাল

২।
মাছের খাবারের ছায়ায় আরেকটু জলরঙ
পূর্বমাতৃকার উচ্চারণ থেকে সরতে থাকে
মাছের আঁশ ও ট্রমা

৩।
‘অধরসুধারসমুপনর ভামিনি জীবয় মৃতমিব দাসম’
একটি প্রাচীন উভচর
স্বপ্নের বিপরীতে
খুঁজে চলে সীমানার অন্ধতা


দ্বিপ্রাহরিক স্লাইডিং

১।
ডুবলে আর একটু কোয়ার‌্যান্টিন
অলোকসামান্যে
যত বৃথামাংসের কুসুম কুসুম
ভাঙলেও
অতিচার
জন্মান্ধ আঙুলের ইমেজ

২।

না-ভাষায়
এইভাবে স্বচ্ছ সন্তানের মৃতদেহ ভেসে আসে;
ওর চুল থেকে মৃত ঝিনুক ছাড়িয়ে নেয় পূর্বমাতৃকা
নীল রঙের এক একটা পচন

দূর থেকে
আমাকে দেখে পক্ষীমাধ্যমের ধুলিখেলায়

৩।
স্বাদের হালকা ক্যালকুলেশন থেকে
টুপ
নির্দেশতল ছাড়াই উড়ছে নীলশির হাঁস

মীনপংক্তির সহজিয়ায়
জলের বিম্ব ফিরছে
চুপচাপে

কবিতা - দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়

ফ্রয়ডিয়ান স্লিপ
দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়


যৌবন নদীতীরে মৌ-বন গ্রামে
জয়সিয়ান এপিফ্যানি জেগেছিল কামে

পালটে গেল নলচে যাদের পালটে যাবে বোল
প্রথম দিনের পৃথিবীতে সকলে অ্যাস্‌হোল

কেউ বোঝে না কেমন রসে ক্ষণে কি কুক্ষণে
পদাবলী বিভাব ঝরে বৈষ্ণবীদের ভনে

অফুরন্ত জীবন তাঁদের অপরাহ্নে লাল
কীটনাশকের স্পর্শে আসে প্রেমের ক্রান্তিকাল

অবিশ্বাস্য খাদ্য তুমি পেটে ঢুকছো কার
বাংলা বইয়ের গোবরগণেশ রাষ্ট্রীয় গোদার

মাথার মধ্যে বুকের মধ্যে সুখের মধ্যে কাঠি
আমার স্বপ্নে দোষ ছিল না বোঝেনি কন্যাটি

যাবজ্জীবন এ দৈনতায় জীবন আমলাশোল
তোমার পায়ের ফাঁকে আমার গোড়ায় গণ্ডগোল

প্রাভদার পাতায় যেদিন সেন্সরশিপ হয়
ক্ষুধার রাজ্যে রুটিও কি পূর্ণিমা চাঁদ নয় ?

কবিতা - বিদিশা সরকার

সূচনার কথা
বিদিশা সরকার

কোনো ভোর ছিলো কি আমাদের সুচনা -----
যদি থাকে কে আগে দেখেছে তার শুরু
কে আগে আকাশ হল, শারদীয়া অরুন অঞ্জলি
কাশবনে পৌছাতে কার দেরী হল কে পৌছালো আগে
অপেক্ষা করেনি বুঝি, তারসঙ্গে পথে হল দেখা
সে দিলো একগুচ্ছ কন্‌সোলেশন, বাকি পথ
তুমি দ্রষ্টা সে ই পথিকৃৎ গন্তব্য প্রান্তিক বিষয়ক
প্রান্তিকে বৃহৎ ঝিল তাকে ঘিরে খেজুর গাছেরা
হাঁড়ি বাঁধা উপ্‌চে পড়া রস কারা নিয়ে যায় রোজ
ভোর হলে, পাখি সব গেয়ে ওঠে ভোরাই নওরোজ
সম্মত ছিলো কি তারা শুভারম্ভে ডানায় ডানায় দুর্নিবার
ইচ্ছারা ছুঁয়েছে মেঘ -- মেঘও সম্মত ধারা সুখে
শহর নাকাল হোলো সূচনা ভিজেছে বার বার
নাগরিক পথে ওরা দুইজন খুঁটে খায় পাখির খাবার।

গুচ্ছ কবিতা - মধুসূদন রায়

শোক
মধুসূদন রায়


ক্রমশ গভীর হয় রাত
ছলছল চোখে তাকায় রাতজাগা বন্ধু !
জোনাকির মত আলো জ্বলে ওঠে -

আজ জ্যোৎস্না বড় অস্বচ্ছ
শহরের অলিগলি খুঁজে
অবশেষে শোক নেমে আসে

সোহাগ ভরা রাতের গল্প শুনে
চমকে ওঠে- দীর্ঘ আলাপন
শূন্য ঘর এখন - কেউ নেই-



বিশ্বাস


গনগনে আঁচে পুড়ে
আড়মোড়া ভাঙে আমাদের বিশ্বাসে -

ফুসফুসে কিছুটা বায়ু ভরে নিয়ে
শুরু হয় পথ চলা -
দীর্ঘ পথ চলা

পরিচয়হীন মানুষের ভিড়ে
দু'টো কুকুরের চিৎকার -
আমি আর আমরা ভাবছি



দামিনী


ঘুম ভাঙে উঠে বসি বিছানায়
কেউ কী ছিল পাশে -

ব্যথা আর যন্ত্রনায় কেটেছে সারাদিন

যন্ত্রনাকাতর চিন্তা আমার
মৃত্যু ভাবণা কী একটা মিথ - ?

কড়া নাড়া শুনে শুনে
কান খাড়া করি -
বিছানায় - কফিন বন্দী 'দামিনী '



র্নিলিপ্ত


মুখ নিচু করে থাকে মৌটুসী পাখি
চোখ বেয়ে গড়াচ্ছে তখনও,
অনাবৃত ক্ষত থেকে গড়িয়ে পড়ে
একটু একটু করে -

অবশেষে আলো ফুটে ওঠে
মোছে চোখ, মোছে
টুকরো টুকরো ঘাম -

আছো শহর জূড়ে বৃষ্টি
ভিজিয়ে দেয় - মিশে যায় চোখের জল,
মৌটুসী পাখিটা তখনও মুখ নিচু



ভালোবাসা


তারা ফিরে গেছে
ফিরে গেছে নিঃস্তব্ধে, হার মেনে -

হলদে চোখের করুন দৃষ্টি আর
বাসি স্যান্ডউইচের গন্ধে -বেওয়ারিশ জল প্রশ্ন তোলে

টি শার্টের ঘেমো গন্ধ
ক্লান্ত ফাস্টফুডের প্যাকেট
ফ্যাকাসে প্রজাপতির চোখ

আজ ছুটি দিলাম ভালবাসার ইস্তাহার


দাউ

তোমাকে ছুঁতে চাইলে
প্রচণ্ড ভয় পাই -

তোমার চোখে দেখি
জ্বলে ওঠা দাউ

কখনো-বা ঠোঁটের কোণের হাসি
সমুদ্রে উথলে পড়া ঢেউ

দীর্ঘ কবিতা - রেজওয়ান তানিম

 
কলম যোদ্ধা
রেজওয়ান তানিম

হাহ, আজ আবার হাতে নিয়েছি কলম!
কত দিন পরে ঠিক মনে নেই-
হয়ত বছর তিনেক হবে। বা আরো বেশি
অবশ্য এর কারণ এই নয় যে;
পুরোনো ধাঁচে, পুরোনো সুরে, সেই পুরোনো
বিষাদক্লিষ্ট মন নিয়ে, সেই গানগুলি আবার গাইব ।
যাক সে কথা, আগে বলে নেই, কেন ছেড়েছিলাম কলম আমি
তার কাহিনী।

বছর দু তিন আগেকার কথা।
তখন আমার পঁচিশ কি ছাব্বিশ বছর বয়স।
স্বীকার করছি, সময়ের চেয়ে ছিলাম
অনেক বেশী অপরিণত। নইলে এত মিছিল, মিটিং
দাবি আদায়ে এত মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম দেখেও
আমি ছিলাম নির্বাক, নিশ্চুপ! নিয়মিত ক্লাস নেয়া
সন্ধ্যায় লেখালেখি - কেটে যেত নিরুত্তাপ জীবন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের এত উত্তেজনা, মিছিল করা দেখে
মনে মনে বলতাম, ছেলেমানুষের দল!

ওদিকে আপামর জনতা, রাজনীতিবিদেরা হাতে মেলালেন হাত,
ছাত্রনেতাদের কণ্ঠ হয়ে উঠল অগ্নিঝরা।
বর্ষার ফুসে ওঠা, দুকূল ছাপানো পদ্মার জোয়ারের মত
বাড়ছে আন্দোলন, সবার মত মলয় বাবুরও বাড়ছে দুশ্চিন্তা।
আমায় বললেন তিনি; আনিস সাহেব, দেশের খবর রাখেন?
আমি নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলি, রাখি তো ।
ইয়াহিয়া ক্ষমতা ছাড়বেন, বঙ্গবন্ধু হবেন প্রধানমন্ত্রী ।
কল্পনায় ভাসবেন না, থমথমে মুখে বলেন
মলয় চক্রবর্তী, যুদ্ধ আসন্ন ।

এরপর এলো কালরাত, অন্ধ বিভীষিকা, মারণাস্ত্রের
নগ্ন হুংকার ঢাকার আকাশে বাতাসে।
একাত্তরের পঁচিশ, সে রাতে আমি ঢাকায় ছিলাম না।
পরদিন এসে দেখি, ঢাকার রাস্তায় ছোপ ছোপ
জমাট রক্ত। ইকবাল হল, জগন্নাথ হল এখন ধ্বংসাবশেষ ।
আকাশে ওড়াউড়ি একদল হাড়গিলে শকুনের।
আমি ঘরের পানে পা বাড়াই, দুঃশ্চিন্তার ডালি নিয়ে।
ফিরে দেখি, মেঝেতে লুটানো মা’র কাতরানো, বোনটি ঘরে নেই।
ছোট ভাই’টার হাতে ধরা কোরআন, শক্ত নিথর লাশ তার
দেয়ালে হেলান দেয়া, খোলা চোখে কি বীভৎস ভীতি!
আমি স্তম্ভিত, চেয়ে দেখি-বাবার রক্তে ভেসে গেছে
ঘরের মেঝে। আমি ভুলে গেলাম কাঁদতে, এ কী নিষ্ঠুরতা,
ভাই হয়ে ভাইয়ের রক্তহরণ!

আমার বিবেক আমায় দিল ধিক্কার, তীব্র হুংকারে
বলল আমায়, কাপুরুষ তুমি ।
জেগে ওঠো, শক্ত করো তোমার পেশী গ্রন্থি। ছাড়ো কলম
তোলো অস্ত্র। জানিনা কোথা হতে এলো এত সাহস,
এই সাদাসিধে আমার প্রাণে, নিরস্ত্র আমি
যুদ্ধে নেমে পড়ি। কী দিয়ে যুদ্ধ করেছি,
সে প্রশ্ন একান্তই অবান্তর আজ। কেননা হৃদয় দিয়ে যে যুদ্ধ হয়
তাতে অস্ত্রের দরকার পড়ে না! সামান্য বিস্ফোরক তখন
হয়ে ওঠে ধ্বংসাত্মক, আর্জেস গ্রেনেডকে উড়িয়ে দেয় এক ফুঁৎকারে।
দোলনা রাইফেল তখন হারিয়ে দেয় একে-৪৭ কে।
মনে পড়ে - সেই গাঁয়ের বধূর কথা, যার ঘরে একবেলা
খেয়েছি ক্ষুধার অন্ন। আপনি খাবেন না
জিজ্ঞেস করতেই, হাসি মুখে উত্তর তার-
আপনারে খাওয়াতি পারলাম, এই মোর পুণ্যি।
ফিরবার সময় ফিরবার সময় তার কান্নার ধ্বনি
ভগবান আপনাগো ভালা করুক- এই যে ভালবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ
জাত-পাত, ধর্মের বিভেদ ভোলা বাঙালির এক সুর;
সেই শক্তি মারণাস্ত্রের থেকে শক্তিশালী হাজারগুনে!
সে লিখল, বিজয়ের ঐতিহাসিক মহাকাব্য।

যুদ্ধ শেষ, দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠার দিন হল শেষ।
তথাকথিত বিজয়ে সবাই খুশি। কিন্তু আমার জীবন যুদ্ধ
চলতেই থাকে। সে আমায় গুপ্ত হন্তারকের মত
আঘাত করে নিয়ত, পিছন থেকে। বারবার মনে আসে
তার উপহাস ভরা কথাগুলি, কলমের দাসত্ব করে
কী পেলি? যাও বা পেলি, হারালি তো সর্বস্ব।
সত্যিই তাই-মায়ের পঙ্গুত্ব, বাবা, ভাইয়ের মৃত্যু
বোনের সম্ভ্রমহানি; আমারই ভুলে আমারই অবহেলায়।
অনুতাপে জর্জর আমি ছেড়ে দিলাম চাকরি,
ছাড়লাম লেখালেখি।

তারপর বছর খানেক যেতে না যেতেই দেখি
আবার যুদ্ধের ডাক! একী অনাচার, অবিচার-
বজ্রগর্জনে হুংকার দেয় সরকারি চাটার দল।
কবিরা লেখেন কবিতা - ভাত দে হারামজাদা,
সিরাজ শিকদারেরা হারায় ক্রসফায়ারে।
ছোট্ট শিশুর ক্ষুধার অন্ন জোটে না। গরিবের কম্বল
শোভা পায় চেয়ারম্যানের দামি খাটে। সামান্য খাবার নিয়ে
মা শিশুর কাড়াকাড়ি, মায়েরই ঢিলে মৃত্যু হয়
অভুক্ত সন্তানের। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস চারিদিকে;
আমায় নাড়া দেয়। আমার বিবেক জাগ্রত করে।
সে বলে, আবার এসেছে যুদ্ধ তবে ভিন্নরূপে।
এবারে কোন দৃশ্যমান শত্রু নেই, এবার যুদ্ধে জয় পাওয়া
হয়ত অনেক কঠিন, তবু এগিয়ে যাও লেখনীর যুদ্ধে;
কলম যোদ্ধা তুমি। তুলে ধর অন্যায় যত
তোমার লেখায়।

এই আমার দ্বিতীয়বার কলম ধরবার কাহিনী!
এবারের যুদ্ধেও আমি ঢেলেছি হৃদয়ের সবটুকু। একাত্তরে
অস্ত্র ছিল হৃদয়, তাই সে ছিল বল্লমসম লক্ষ্যভেদী।
আজও সেই আমি নির্ভয়ে নেমেছি অন্যায় দমনে, সত্য উদ্ধারে ।
হয়ত এ যুদ্ধ বিশাল দীর্ঘস্থায়ী, ক্ষয়ক্ষতি সীমাহীন;

তবু চলবে আমার যুদ্ধ। কারণ এ যুদ্ধের জয়েই
লেখা হবে বাঙালির সমৃদ্ধির ইতিহাস। যেমন একাত্তরে

লেখা হয়েছে আমাদের আত্মপরিচয়ের কথা। এবার
আমাদের জিততেই হবে, হেরে গেলে আমরা বিনষ্ট হব;

হারাবে আমাদের জাতিসত্তা। তাই এ যুদ্ধ
আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ।

কবিতা - তানিয়া চক্রবর্তী

কিছু খসছে
তানিয়া চক্রবর্তী


বাতাসের মঞ্চে পাতাগুলি কোরাস গাইছে
উড়তে পারলে আগুন লিখতাম
নিষ্ঠুর সকালে নখকে দিতাম আদর
একটু একটু করে পালিয়ে যাচ্ছে সুর
শেষবার সরোদে জিলা কাফি
টানে টানে টালমাটাল
টান বড় নির্মম
বাঁচায় মারে

আরো অনেকচিছু পারে –
অণুরা ভুলতে পারে না সংসক্তি
বেকার ইঁট থেকে খসে পড়ে পলেস্তারা

কবিতা - অনির্বাণ মন্ডল

কেমন আছেন ?
(উত্সর্গ- জীবনানন্দ দাশ)
অনির্বাণ মন্ডল

আপনি ছিলেন এক বাতিঘর
ছিলেন সবুজ ঘাসের বন,
হাজার বছর হাঁটার পরে
পাব পাখির নীড়ের মন।
আপনি ছিলেন কবির কবিতা
আর দারুচিনির ফুল,
আপনাকে ছুঁতে পারেনি তো চিতা
নাবিক পেয়েছে কূল।

প্রায়শই আমি আপনাকে দেখি
আপনি চুলের গন্ধে;
কার্তিক মাঠে আপনিই সে কি,
মেশান ভালো ও মন্দে ?

আপনি মনের শিরায় শিরায় বাঁচেন,
বনলতা সেন, আজকে কেমন আছেন ?

কবিতা - নিশান চ্যাটার্জী

আমি পরস্ত্রীকাতর !
নিশান চ্যাটার্জী

যাচ্ছে জ্বলে যাচ্ছে পুড়ে, সমস্ত সংসার
যাচ্ছে ক্ষয়ে যাচ্ছে ছিঁড়ে সমস্ত পয়জার!
আলগা হাসি, তীব্র ব্যথা, বিপন্ন, গম্ভীর
জ্বলে
সৃষ্টি জ্বলে বৃষ্টিজলে, আরক্ত তুণীর।
জ্বলে ঈর্ষা জ্বলে শেষ বিকেলে
জল ভেসে যায় রং মিশেলে
তবু দিচ্ছে হানা, হাসতে মানা,
বীভৎস তৎপর!

জল যাচ্ছে জলে, একলা ঈথার
দেখো
জ্বলছে আলো, বাড়ছে মিটার

আমি জন্ম কানা প্রেত বিছানায়
পরশ্রীকাতর!

কবিতা - নীলাঞ্জন সাহা

দরজা
নীলাঞ্জন সাহা

পাখিরা বাসায় ফেরে , মানুষ খাঁচায়
মানুষ কতো পরিকল্পনা করে
বাথরুম সাজায়
যেন অনন্তকাল থাকবে !
এমন মানুষের ভীড়ে আমি কোথায়
বন্ধু কে পাবো ?
ঘরময় ছেলেভোলানো দরজা
যতবার করেছি প্রবেশ
ততোবার বেরিয়ে যাবো ।

কবিতা - অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

ডেস্টিনি
অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

মসৃণ শৃঙ্গার ভালো
ভালো চারুচিৎ
চতুর মখমল ঢাকা
চম্পা চামেলী -
সেই সবচেয়ে ভালো

গেলাশ ভরা বিলাস খাবো
বগলবাহার, বেগমবালিশ
গোলাপবালার কাছেই যাবো
আরো কাছে যাবো
গিয়ে গপ করে খেয়ে নেবো

মজাদার পপকর্ণ মায়াহীন চলে
বন থেকে বনে চলে চলিত চপোলা
চটুল ছটায় মজে
লোলুপ নাগর কিছু প্রিয় লালসায়

বাউল বিশিষ্ট বীর
মন বলে দোলদোল
বলদ হেঁটে চলে নির্বিকার
ভালোবাসা মরে গেছে
ধেনুপাল ম্রিয়মান চরে মাঠেঘাটে

দেহর ছন্দ শোনে ওই মার্তণ্ড অবিরাম
মুনাফা ও মর্কটে মিলমিশ হলে
লাল টিপ ইরোটিক সূর্যাস্ত
ঢেকে দেয় এই দেহ এই নশ্বর

সবাই কাঁদে
কাঁদিস না ও গৌরাঙ্গ,
কাঁদিস নে রে নেতাই
হারাবার পারাবার কি ভীষন ভালোবাসা
গোরিলার ভাল্ভা ধরে দানবের ডানপাশে ঝোলে

ডাণ্ডা মারে অপদার্থ বিন্যাস ব্যবস্থা
ব্যাপক ছড়া এ মহোজোনিতো সংক্রমণ
শঙ্কা হরণ করে শম্ভু শংকর।

জয় বলো সবে জয় জয় বলো
কানন কুসুমে ওই অলি আসে উড়ি
উড়ি উড়ি বসি যায় দেহের জন্মান্তরে
প্রিয় অংশ – কষা মাংস


কবিতা - অনন্যা দেব

তবুও আশা
অনন্যা দেব


ফ্যাকাশে ফ্যাকাশে রাত্রি
আর ফ্যাকাশে দিন,
সময়ের চোখ রাঙানিতে
শুধু উঠি আর বসি,
কথা বলতে ইচ্ছে হয়, কাছে আসি,
আবার এক দমকা হাওয়া
সরিয়ে দেয় দূরে আর দূরে।
অন্তহীন প্রতীক্ষা সুখের আসার,
উৎকণ্ঠ হৃদয়ের অসংখ্য দিন গোনা,
চোখের জলে বুকের আগুন নেভে না তো,
শুধু সুখের প্রতীক্ষায়, জীবন বয়ে যায়,
অবসন্ন মনের অবসন্ন দিন রাত্রি ,
ইচ্ছে গুলো স্বপ্ন দেখতে চায়,
আর তাদেরই গলা টেপে আততায়ী,
খুন হয়ে স্বপ্ন আমাদের দুনিয়ায়।


কবিতা - শর্মিষ্ঠা ঘোষ

ছুতো
শর্মিষ্ঠা ঘোষ

এসকর্ট গিগোলর হলুদ ট্যাক্সি চাবির রিং
কম্যুনিজমের ভদকা ফরাসী প্রেমিকের পানপাত্র
ভার্সেস পলিগ্যামি রেওয়াজি খাসি রবিবার
ভ্যাদভ্যাদে প্রেম পরকীয়া কালচার হস্তরেখা
প্রতিপক্ষে গুনে গুনে দশ গোল বউয়ের হিরো
আড্ডা রোয়াক ছেড়ে খোঁড়া কানা রাজ্য সড়কগামী
প্রলেতারিয়েত ঐতিহ্য বনাম এলিট ক্যালকাটা ক্লাব
হরেকমাল লে লে বাবু ইজ্জত মান্থলি ডিস্কাউন্ট সেল
লাল ছবি নীল ছবি সবুজ ছবি গেরুয়া ছবি
বলাৎকার ফেস্টুন হোরডিং সরকারি গনৎকারের প্রোমোশন
বক্সে আন্ডারলাইনে বোল্ডলেটারে ইটালিক্সে
এক কাপ চায়ে খেজুর পায়েস শীতের সকালে
আঃ! কি আরাম! কোথা থেকে কু ডাকে ফেউ
‘চা তো ছুতো’!

কবিতা - ধ্রুব

আমি যুদ্ধে যাবো
ধ্রুব

আমার খুব ইচ্ছে আমি তরুণ হবো,
আমার খুব ইচ্ছে আমি যুদ্ধে যাবো,
অজেয় বোধে ধারালো কিছু ক্ষোভ আনবো,
আমার খুব ইচ্ছে আমি যুদ্ধে যাবো।

গায়ে থাকবে আসাদের রক্তে রাঙা সার্ট,
হৃদয়ে থাকবে নূর হোসেনের গগনবিদারী চিৎকার,
উপারম্ভে অবরুদের রক্ত চুষে খাবো,
আমার খুব ইচ্ছে আমি যুদ্ধে যাবো।

উড্ডীয়মান স্বপ্নগুলো আরক্ত হওয়ার আগে,
বন্ধ কপাট ভেঙ্গে স্বপ্নের আরতি করবো,
অদৃশ্য রজ্জু ছিঁড়ে বিজয়ের মালা গাঁথবো,
আমার খুব ইচ্ছে আমি যুদ্ধে যাবো।

ক্ষয়িষ্ণু গনতন্ত্র চক্ষুশূল হওয়ার আগে,
কনীনিকার দুয়ার চিরতরে খুলবো,
ক্লীব নামক অপবাদের গলা টিপে মারবো,
আমার খুব ইচ্ছে আমি যুদ্ধে যাবো।

অ্যামবুশে অ্যামবুশে আমি ফেলবো মানব বোমা,
চিরতরে হারিয়ে যাবে মাংসাশী শকুনেরা,
বর্ষাত্যয়ে অন্তরীক্ষে সূর্যের আরাধনা করবো
আমার খুব ইচ্ছে আমি যুদ্ধে যাবো।

সাম্প্রদায়িকতার নামে স্বার্থ চরিতার্থ,
সারশূন্য গনতন্ত্রের বিষদাঁতে অন্তরাত্মা দগ্ধ,
ভিখিরির মুখে বুটের আঘাত চিরাচরিত দৃশ্য,
হরতাল মানে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত,
বোনের বুকের বসন আজ দুর্বৃত্তদের হাতে বন্দী,
প্রত্যর্থী মানুষগুলোর এখন হিংসার সাথে সন্ধি,
কালবেলার এই সময়টা খুব পরিচিত,
এটা আর কিছুই নয় পরাধীনতার চিত্র,
ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মা অপমান আর গ্লানিতে ভরা,
এসব দেখে জন্ম হয় মনে যুদ্ধে যাওয়ার বাসনা।

তিমির রাতের করাল গ্রাস হতে প্রভাতফেরী ছিনিয়ে আনবো,
বীরাঙ্গনা মায়ের অশ্রু প্রকৃতির চাদরে মুছবো,
মুক্তি সেনাদের স্বর্গের পথে কাঞ্চন মালা ছড়াবো,
আমার খুব ইচ্ছে আমি যুদ্ধে যাবো।

জীর্ণ শরীরে আজন্ম এক অনিরুদ্ধ বাসনা,
স্বাধীন দেশে অরাজকতার শাসন আমি মানবো না,

গনমিছিলে মশাল জ্বালাবো বিচ্ছেদ ব্যাথা ভুলে,
বেলা অবেলার শেষে আঁকবো স্বাধীন মানচিত্র বুক জুড়ে,

সব বাঁধন ছিন্ন করে আমি বিদ্রোহী হবো,
আমার খুব ইচ্ছে আমি যুদ্ধে যাবো।

কবিতা - জিনত জাহান খান

দু'জনে
জিনত জাহান খান


ঘোর লাগা পৃথিবীর আঁকা বাঁকা
সধবার সিঁথি প্রান্তে দু জন আমরা

স্বর্গের স্বপ্ন দোলে চোখ পর্দায়
কম্পমান হৃৎপিন্ড ঝড়ের পাখি
নয় অজানা পরের বাঁকে আর নেই কেউ
তুমি আর আমি , আমরা ।

স্ফুলিঙ্গ দৃষ্টি সমস্ত উত্তপ্ত জমিন জুড়ে
কূল ছাপিয়ে অন্ধ অদৃশ্য নদীর খরস্রোত
তীব্র আর্বতে চিহ্ন যায় মুছে দুরন্ত পৃথিবীর

যেখানে জয়ী আমি আর তুমি
আমরা দু'জন ।