বৃহস্পতিবার, ২ মে, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ৭ম সংখ্যা

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ৭ম সংখ্যা



যখনি মরতে সে চায় মরতে যে দাও নির্বিকারে
এই কি তোমার মনের কথা এই কি তোমার স্বাধীনতা
যখনি সে আপনজিতের ফ্যাস্লা নিতে নীরব নিভয় এমন হারে
তুমি তারে কথায় হারাও স্বয়ম্‌জিতের সমব্যথায়
কই সে প্রেমের বাঁধন আগলে রাখে সোহাগসুখে চিরতরে
কই সে বাঁধন এমন হার মেনেছে হারের কাছে মায়ার তোড়ে
তুমি তো পাগল বলেই খালাস হবে এমন পাগল
যে ভোগে সে জানে এই অসুখ শুধুই প্রেমের আগল

অতঃপর ফোন কেটে গেল ! ওপাশের অমানুষিক নিস্তব্ধতা শ্বাস ফেলছে । আমার কানে ছিটকে এসে লাগছে বিদেহী গরমের ফোঁটা । তাচ্ছিল্যের অণুরণন চাপা দিতে গিয়ে অথৈ প্রাবল্যের চিতকার ডুবিয়ে দিতে পারেনি নিজের প্রতি অবজ্ঞা বা উপেক্ষা - মানুষ বড় নিজের জন্য লড়ছে প্রতিটি লড়াইয়ের হেতু নিজেকে টিকিয়ে রাখা...নিজে টিকলে আরেকজনকে ...আরেকজন টিকলে আবার আরেকজন ... কারোর কোনো দায়বদ্ধতা নেই,সব কবিতার মত বাষ্পীয় হয়ে গ্যাছে ধরা-অধরার নাগাল ঊর্ধ্বে !একটা জটিলতা ব্যাখ্যার চেষ্টা চলছে পুরোদমে না পারলেই সমাধান সহজ হয়ে যাচ্ছে অপনয়নে, শুধু প্রথম বন্ধনীর মাঝখানে পড়ে আছে অতএব পাগলামি ধরে নেওয়া হোলো! সহজ সরল সমাধান মাল্টিপলচয়েস লাইফস্টাইলের এটাই সবচে বড় প্রো ...রবীন্দ্রনাথ-রোম্যান্স-গাঁজা-ফ্লার্ট-একাকীত্ব-নারীদের প্রতি সম্মান এগূলো আরো অন্যকিছুর মতোই অপশনাল।বাঙ্গালী বালকেরা বড় হইয়াছে ইহা বুঝাইবার দুটি বড়ো উপায় :


একটি পছন্দমত রঙ নিয়ে খেলা,মাঝে মাঝে সিরিয়াস হয়ে যাওয়া কাউকে মেরে ফেলে বীরত্ব জাহির –তোমার এই আত্মত্যাগ আমরা উমুক জায়গায় কাচিবো তুসুক জায়গায় শুকাইব আদিতে ইতি ! আবার ধুম্রপান করে ধুম্রপান করিবার সার্থকতা ব্যাখ্যাপূর্বক নিজের ক্যাসুয়াল বিউটি রগড়ানো।মিষ্টির প্রতি পিপীলিকা বাহিনীর ন্যাক সামাজিক ভাগ-বাটোয়ারার সিলেবাসে ঢোকানো হচ্ছে জোর করে জোর করে ঢোকালে কি হয় এ অ্যাক চিরন্তন প্রশ্ন... তবে হাঁ টেনসন নেহি লেনে কা সার্কাস মে ঈতনে সারে জীব্জন্তু রংবাহারি ঠোঁট তুলতুলে হ্যাকচাপ্যাটাং আপকো কভি অকেলা মেহ্‌সুস হোনে নহি দেগা হৈ মানো ঈয়া না মানো উই ডোণ্ট হ্যাভ অ্যানি ন্যানো,রবীন্দ্রনাথ হাসিমুখে পায়চারি করছেন পাসপোর্ট হয়ে গ্যাছে এবার বিদেশে যাবেন বিদেশ বিদেশ মানে জানো ?কি নেই !অতঃপর ফোন কেটে গ্যালো রক্তবিহীন বিপ্লব –বিপ্লব আমার দ্যায়োরের নাম ননোদের কাম ! বিপ্‌ বিপ্‌ আসবে না মানে ?বাপ বাপ বলে আসবে,একদিনে না দুদিনে না তিনদিনে বিপ্লবের সৎ বাবা আসবে ... কামিং সুন ভরতকে কেন জড় বলা হবে? না চলবে না ,আরেকটু ঘুমটুসকি লুলে দাও । বিপ্লব আসবে তবুও তো আমরা বড়ো হয়ে যাচ্ছি খুচরো কয়েকটা কেলেঙ্কারির মতো কিছু না ঘটলে এই বয়সে বিনোদন হবে কী করে?




- ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে ঋষি সৌরক

মলয় রায়চৌধুরীর ডায়েরি

হিন্দি সাহিত্যিক ফণীশ্বরনাথ রেণুর সঙ্গে তাড়িসন্ধ্যা
মলয় রায়চৌধুরী



পাটনায়, চল্লিশ দশকের ইমলিতলায়, এখন ভাবি, ‘খারাপ’ আচরণ ব্যাপারটা , এখন যেসমস্ত আচরণকে বলা হবে সীমালঙ্ঘণ, তা সম্ভবত ছিল না । আমাদের বাড়ির সামনের রকে আমার শৈশবের বন্ধু কপিলের দাদু একটি খিস্তি শেখাবার স্কুল চালাতেন ; তাঁর কাছে শিশুদের রেখে মায়েরা যে-যার কাজে ব্যস্ত থাকার সময়ে কপিলের দাদু, যাকে আমরা বলতুম রামচন্দর, কোনো পথচারীর দিকে নির্দেশ করে একটি শিশুকে বলতেন, ‘এই তুই ওকে অমুক গালাগালটা দে’। শিশুর কন্ঠ থেকে বেরোত এমন সমস্ত খিস্তি যা শুনলে বর্তমান কালখণ্ডে মারামারি-খুনোখুনি আরম্ভ হয়ে যাবে । নিজে তাড়ি খেতে-খেতে শিশুদেরও খাইয়ে দিতেন এক-আধ ঢোঁক ।


ওই পাড়ায় কারা কারা চুরি পকেটমারি ছিনতাইবাজি ইত্যাদি করে জীবন চালাত তা ইমলিতলার সকলেই জানত । স্বাভাবিক যে পাড়ার তাড়িখোররা তাড়িও চুরি করে এনে খেত। ছেলে-ছোকরারা খবর আনতো যে কোথায় কোন কোন গাছে তাড়ির হাঁড়ি বাঁধা হয়েছে । ব্যাস , ভোর রাতে বেরিয়ে পড়ত একদল লোক । পাড়ায় পৌঁছে যেত বেশ কয়েকটা তাড়ির হাঁড়ি । সকালে নামিয়ে আনা বলে কিছুক্ষণ রেখে দেয়া হতো যাতে রোদের গরমে গেঁজিয়ে ওঠে ।

আমার তাড়ি পানের হাতেখড়ি ওই ইমলিতলা পাড়াতেই, শৈশবে । কিন্তু আমাদের তাড়ি খাওয়াবার জন্য বড়োজ্যাঠা বকুনি দিতেন, আমাকে নয়, যারা তাড়ি খাইয়েছে তাদের । তবে তাড়ি খাওয়াকে খারাপ চরিত্র-লক্ষণ মনে করা হতো না, কেননা আমাদের বাড়িতেও, বিহারি সংস্কৃতির প্রভাবে বোধহয়, বলা হতো যে তাড়ি স্বাস্হ্যের পক্ষে উপকারী ; ভোর রাতের তাড়ি খেলে মোটা হওয়া যায় । গেঁজিয়ে-ওঠা তাড়ির গন্ধ আমার ভালো লাগত না ; নাক টিপে খেতে হতো । তাড়ি খাবার জমায়েত দেখলে তাই এড়িয়ে যেতুম, যদিও পেছন থেকে ডাক পড়ত, টিটকিরিও মারত বয়স্কদের অনেকে ।



হিন্দি সাহিত্যিক ফণীশ্বরনাথ রেণুর সঙ্গে বসে নানা রকমের নেশা করেছি । ওনার গ্রামের বাড়ি ছিল নেপালের সীমান্তে । বিহারি তরুণ কবি-লেখকরা ওনার বাড়িতে একত্রিত হলে কখনো-সখনো গাঁজা খাওয়া হতো ; গাঁজার শৌখিন ছিলিম ছিল রেণুজীর । তবে উনি ভালোবাসতেন রাম খেতে, নিট রাম । আমি দরিয়াপুরের বাড়িতে যাবার পর উনি বাড়ির কাছে এসে আমার নাম ধরে হাঁক পাড়তেন । রিকশায় উঠে আমরা যেতুম একটা বারে; সেটা ছিল ‘সেন্ট্রাল হোটেল’ নামের পোড়োবাড়িতে । আরও অনেকে এসে পৌঁছোত । রাম খাওয়া হতো । রামও আমার প্রিয় নয় । আমি কম খেতুম ।


একবার উনি ওনার রাজেন্দ্রনগরের ফ্ল্যাটে সাহিত্যিক আড্ডার ব্যবস্হা করেছিলেন, হিন্দি সাহিত্যিকরা যাকে বলতেন ‘গোষ্ঠী’ । এখন এই জমায়েতগুলোকে কী বলা হয় জানি না । গোষ্ঠী জমজমাট হয়ে উঠলে ট্রেতে সাজানো কাটগ্লাসের পাত্রে চলে এলো পানীয় । ফিকে কমলা রঙের, ছোটো এলাচের গুঁড়ো ভাসছে তার ওপর। অপরিচিত গন্ধ । ভোর রাতের তাড়ি ফ্রিজে রেখে তার সঙ্গে মেশানো হয়েছে জাফরানের জল আর ওপর থেকে ছোটোএলাচ!

বলাবাহুল্য যে প্রত্যেকের কবিতাপাঠের পর ‘ওয়াহ’ ‘ওয়াহ’ ধ্বনি উঠছিল । ষাটের দশকের পর উঠে গেছে এই ধরণের কবিতাপাঠের আসর।

কবিতা - নির্মাল্য বন্দ্যোপাধ্যায়

নির্মাল্য বন্দ্যোপাধ্যায়


জোছনা করেছে আড়ি শুনতে শুনতেই হৈ হৈ করে বেসামাল করলো রংরুট ফৌজ। আড়াল মানেই তেমন কোনো দাঁড়ানোর পালা নেই। চাঁদ জোড়া বেসাতিও নেই। উহ থেকে আহা পর্যন্ত লালিত সীমানা... দুয়ারভাঙ্গা অভিজ্ঞান। অগম্য সে ফিরোজামিনার। পরিমিতি লিখবে নান্দনিকে, সেরকম জোরালো একক বিস্ময়ভ্রমনে। মহাবিশ্বে মহাকাশে নেতি নেতি নেতি।অণু থেকে পরমাণু ঘুরে আবার যদি ইচ্ছে করা জীবনমাদকে এক্কাদোক্কা মোক্ষসমান। এই বেশ ভালো ও ধারালো।



দুর্গরহস্য-৬



বন্ধু বন্দুকে দলমাদল
তীরের বাঘনখে যে আন্দাজ
সে সব ইতিহাস আলতোভুল
ছেলেটি ছুঁতে চায় উল্কাজল

দুর্গজোড়া সেই পাগলপন
দেখেও পরিচিত হিসেবঘর
ফিরেছে সৈনিক, টার্গেটে
অবোধ ছেলেটির হৃদখনন

ছেলেটি তখন এক ভুলবোঝায়
ছেলেটি ক্রুশকাঠ, কান্নাঝড়
রিক্ত, নীরক্ত, শ্বাসরহিত
ছায়াটি অস্থিতে বদলে যায়

আকাশ কালো হয়, বাতাস নীল
ছায়াটি অস্থিতে বদলে যায়
নিঝুম, একঘরে, ঘুমবিহীন
পাগল শুয়ে থাকে, দুয়ারে খিল

দুর্গরক্ষক প্রতীক্ষায়
পরিখাজোড়া এক রসিক বিল
পেরিয়ে আয়, ছেলে, জিদ্দি দিল
উল্কাক্ষত ভরা ভালবাসায়...



মায়াদাস


আধোলীন অগ্নিগোলক
মায়াদাস, কাছেই থাকি
বারোমাস এই পেয়েছি
শরীরের দিনখোরাকি

উপবাসে সন্ধ্যেসকাল
যায় যাক, লা পরোয়া
সোনামন, রাতউনুনে
মাড়ভাত অস্তিছোঁয়া

জড়িবুটি আধকপালে
ছত্রাকে শৈবালে ঝড়
জাদুকরী, চাঁদের বুড়ি
মিলেমিশে আত্মসফর

চরকায় নৈশনূপুর
গোলকের দিন বুঝি শেষ
মায়াদাস, মধ্যযামে

এই তোর গৃহপ্রবেশ।

কবিতা - রঙ্গীত মিত্র

আহা হা কী সুন্দর ঘটনা
রঙ্গীত মিত্র

ঘুমন্ত দৈত্যরাও ভুলে গেছে তাদেরও ভগবান বলে কিছু আছে কি না।
তারা মাঝে মাঝে আমাকেও খোঁচায়। আমাকে দেখলেই ভাবে : জিজ্ঞাসা করি রঙ্গীত কি করছে ?
কখনো তারা বিভিন্নরূপ নিয়ে এসে ভাবে, আমি এতই বোকা যে কিছুই বুঝিনা।
কিন্তু আমি যে ঐরকমটা নই। অন্যধাতুতে তৈরি বলে জেনে বুঝে বিশ্বাস করি ;
কিন্তু এখন তো কাউকে আর পতাকা দিয়ে চুপ করে বসে থাকা যায় না ।
প্রতিযোগীতার স্থল থেকে অনেক দূরে, গোপন ক্যামেরায় দেখতে হয় সে কি করছে ।
আমি না দেখতে পেলেও কিন্তু গোপন ক্যামেরা নিয়ে ঈশ্বর তোমাদের ঠিক দেখে যাচ্ছেন।

কবিতা - সোহম নন্দী

সোহম নন্দীর লেখা

মোহন বাদুড় তুমি ওড়াও বিদায়ে- ভূতে পাওয়া
বসবাসে বৃক্ষমূলে- বাঁধা গ্যালো দম্পতি মানত
দেহাতি গ্রাম দ্যাখো- নিবিড় কড়চায়
তর্কের অবসানে গলে যায় সিঁদুর- হলুদ
কারা যেন ফেলে যায় মালা উপচার- জুটে
যায় আরও কিছু ওলাওঠা মাস
নির্ভীক হাঁড়ি হাতে রমণী নিরোগ
বিদায়ে ওড়াও মোহন- ফেলো কার্তিক

কবিতা - দেবাদৃতা বসু

দেবাদৃতা বসুর কবিতা


নীরব ইমারৎ নিয়ে
কাছে, কোনো কোনো আলো নেই মাঠ
ঘাম ও স্নায়বিক মদ হয়ে
যতদূর কার্যকর এবং তার মোহাবিষ্ট সফরনামা ।
হৈ চৈ গড়িয়ে পড়া সাবধানে স্নান হোল । অস্ফুটে ক্রমশ চাঁদ
ট্রেন ধরার বাধ্যতামূলক দৌড় ঝাঁপ
এমনকি স্বর শুষ্ক টেলিফোনে ।
যা সমস্তই অনুবাদযোগ্য ।

কবিতা - পৃথা রায়চৌধুরী

সব শিখেছি
পৃথা রায়চৌধুরী


জানালা বন্ধ রাখো মা, দরজায় পাহারা দাও
বাবা, তুমি আমাকে আর খেলতে দিও না
রাস্তায়; অনেক মোমবাতির ভিড় চলে যায়
দেখেছি, বুঝিনি কিছু তখন,
এখন বুঝি, মোমবাতির মানে ব্যথা, রক্ত
মরণ যন্ত্রণা
                                    ভয়, শুধু ভয়।

গরমে ওই কালো কমলা বোতলের জল
ওসব ভালো না বাবা,
দোকানকাকুদের বলো ওসব না বেচতে
চাই না আমি, জল দাও মা বলবো
রক্তগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে দেখছি, ওগুলোও
কেমন জল জল।

দিদুন, গল্পের দত্যিদানো কেমন হয়
তোমরা জানো না,
বাবার মতো, ছোটোকাকুর মতো,
কিছুটা মেজোমামার মতো;
নতুন বানান করতে শিখেছি
                                   ক্ষতবিক্ষত।

কবিতা - সাজ্জাদ সাঈফ

দুটি কবিতা
সাজ্জাদ সাঈফ


প্রেম-১
চিবুকে রোদ পড়তেই আড়মোড়া ভেঙে উঠলে যেন,কতটা কি ভাবছো ভারি,তাকাতেই
বুকে দস্যি হাপড়;ছইঘরে সাঁতরে ওঠে ঢেউ,দামাল তুফান;

সাঁকো অব্দি সর্পিল পথ,ঘাসফুল,জলা,পুকুর কচুরি,ছনবাঁধা ঘর,এলোমেলো মন,সাঁকো পেরোলেই তোমার বাড়ি,কত আয়োজন লুকিয়ে দেখার,নথ রিবনের রোদমাখা দিন,ইচ্ছেদুপুর!

চোখের কাঁজলে কত জল লুকানো তোমার,কোন শতাব্দীর হয়ে জলাধার তুমি অর্পিতা!

কাছাকাছি নামতার সুরে নেমে আসি মেঘ,বৃষ্টিকে দেখাবে না উঠোনের পথ?


প্রেম-২

অতটা উতলা কেন হোস মন,ঝাউতলা পাথরে বাঁধাস,উঠোনে পলাশ বসন্তে লাল,রোদে

রাহাজানি উন্মাদনা-

তুফানের ডানা খুলে দিলে ঝাঁপিয়ে পড়বো জলে,ডুবি তুমি চাও,আয়না মুছে তফাতে দাড়াও,সিল্ক চুলে ঢেঊ তবু তা'ই রহস্য ঘোর, একাকীত্ব প্রণয় আমার-

কী ঠান্ডা কাঁপা কাঁপা জল কোমরে পাতো,লাজুক পাতার মতো নাড়িয়ে যাও গাছ,মানুষের ভিড় ঠেলে নেমে আসি জলে,ডুবি তুমি চাও,উৎকর্ণ সরোদ বাজে নক্ষত্রে নিপুন চয়ন,পাতাবাহারের ঘাম উহ্য শিশির,আলগোছে ভেজা পা, ডুবি তুমি চাও প্রসঙ্গত,কেউ ফেরে না এই ভেবে!

ডাকছি নে লোম দাঁড়াক নিজেই,মৈথুন দাঁতে শিরশির ভেঁপু,মশাল জ্বলুক রক্তশিরায়

হিংসে কেন হবে আজকালকার প্রেমে,আমি যে প্লেটনিক চাই।

কবিতা - নীলাঞ্জন সাহা

প্রলাপ
নীলাঞ্জন সাহা



নদীর যে প্রান্তে আমি থাকি
সেখান থেকে শুধু সূর্যাস্তই দেখা যায় ,
দিন আসে না , চলে যায় কেবল
রাত আসে কিন্তু যায় না
টেবিলে এলার্ম ঘড়ির পাশে বেমালুম
রাখা থাকে ঘুমের ট্যাবলেট !
একটি খসে পড়া পালকে
কতটুকু পাখি থাকে ?
বন্ধুর চিঠিতে কতটুকু শত্রু তুমি ?
এসব প্রশ্ন ঘোরে মাথায়
এবং আমি বেঁচে থাকি
বেঁচেই থাকি
কারণ ,
আত্মহত্যার সহজতম উপায় হলো
বেঁচে থাকা !

কবিতা - অমলেন্দু চন্দ

কাকে ছাড়ি - কাকে ধরি
অমলেন্দু চন্দ


বৃত্ত কাকে বলে—
বৃত্তের বলয় থাকে – যেমন সুগোল হয় শাঁখা পলা নোয়ার বলয়
জীবন সীমান্ত ঘিরে যে বলয় ছায়া দেয় মায়া দিয়ে
বাঁধন বন্ধনী হয় –

বেশ বেশ সেতো হল – বন্ধনী না থাকলে প্যান্টুল খুলে যাবে সেটা খুব সত্যি কথা,

বৃত্তের সত্যি হল অন্ন বস্ত্র বাসস্থান এবং উদ্বৃত্ত এইসব হিসেব নিকেশ টুকু বুঝে পেতে
ঠিক ঠাক করে নিতে সকলেই কাজ করি, অকাজও যে করিনা তা নয়,
তারস্বরে ঝগড়া করি, সন্ধিও হয়।

যথার্থ বলেছ – কখনো বা সাথে সাথে, কখনো কাজের ফাঁকে, নতুবা দিনান্তে এসে,
আমাদের ইরাক ইরান, বার্লিন বেনাপোল, কিম্বা নয় এগারোতে,
বিস্ফোরণ থাকে কিন্তু ধ্বংসের তাণ্ডব নয়, তাই মিটে যায়।

সত্যি কি মিটে যায়?
তাহলে এমন মাঝে মাঝে ভারাক্লান্ত কেন লাগে?
অবুঝ শূন্যতার মেঘ কেন জমে মাথার ভেতর?
ভয় লাগে এই বুঝি সবকিছু গোলমাল হয়ে যাবে!

দুত্তরি শুরু হল প্যাঁচার পাঁচালি…

বেশবেশ অন্য কথা বলি…
স্মৃতির পাথার ছেনে ভিন্ন কোন কথা—-।
স্মৃতি সত্ত্বা ভবিষ্যৎ –

এবারে ঝোলাবে তুমি অকারণ বক্ বক্ করে–

আরে না না — শোনোই না… স্মৃতি নিয়ে দূটো কথা বলি…
কখনো যখন মবি ডিকের সেই বোকা ক্যাপ্টেনের মত
সমুদ্রে বঁড়শী নিয়ে ধাই অবেলায়, কিম্বা প্রান্তরে খাঁচা –
তখন সেখানে সেই একা একা একান্ত সময়ে অনুসারী আমার পেছনে চুপি চুপি গুঁড়ি মেরে
ধেয়ে আসে কুড়ি কুড়ি বছরের পার হতে
ফেলে আসা কথা হাঁসি গান,
মনে পড়ে দাপটে উল্লাসে মেশা মিথ্যে অহংকারী নেশা,
এলাচগন্ধের মতো মনে পড়ে যায় মায়ের আদর করা…

ওয়াহ গুরু ভালই বলেছ কবিতার ঠেলায় ফেলে স্মৃতি কি বোঝানো–

শোনোই না — আরও আছে–

এই ড়ে মরেচে — কখন থামতে হয় সেটাই শেখনি !!

আরে না না – শোনই না বেশি নয়,
তারপর বর্ণহীন অন্তরের বাঁশবনে রব তোলে বিপন্ন শেয়াল,
অস্পষ্টতায় বহু স্মৃতি অসমাপ্ত থেকে যায়।।

থাম থাম, আবার ছায়ার কথা, আবার বিষণ্ণতা
ছোঁয়াচে রোগের মত – আস্ত পেসিমিস্ট কোথাকার।।

সেটাই সিদ্ধান্ত হলে এটাই সাব্যস্ত হয়, আর কোন কথা নয়!
এভাবেই গিলোটিনে তুলেছ তোমরা – আমাদের

ভাটিও না, এতটা বিরাট কিছু কবিরা হয় না কোনদিন
ভালবাসি তাই তো পারিনি নিতে সহজ সিদ্ধান্ত”টুকু
কাকে রাখি কাকে মারি …

গিলোটিন না তোমাদের!


কবিতা - সূরজ দাশ

বুকভারী যোগ-বিয়োগ
সূরজ দাশ


যাতায়াতের পথে বহুবার ভেবেছি
উঠোনে দাঁড়াবো তোর

নদীর দুহাত তুলে
তোর জন্য রেখে আসবো
অগাধ গানবাজনা আর পানকৌড়ি নেশা

তারপর অনেক অনেক সহভাগী ধুকপুক
মাথার ওপর দিয়ে
উড়ে গেল বেসামাল শালিখ-সন্ধ্যায়

রোদের কিনার ধরে এগোতে এগোতে
ধৈর্যের ডালপালা সেও গুটিয়ে নিচ্ছে অতীত

বুকের বোতামে সেঁটে থাকা বুকভারী যোগ-বিয়োগ
এখনও নিপাতনে সিদ্ধ হতে
তান্ত্রিক হতে চায়
ভাঙা সাইনবোর্ডের নিচে ওই তো
ওই তীর চিহ্নটা তোর দিকেই তাক করা এখনও 


কবিতা - রুচিরা দাস

খোঁজ
রুচিরা দাস


ছাতার নীচে দুটো মুণ্ডুকাটা ধড়
কাছাকাছি এসে থেমে যেতেই-
আমি গল্পের খোঁজ করি।

একটা টাকা নিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়
ছোট্ট একটা আবর্জনার স্তুপ, কানা গলির ভেতর;
আর আমি পথের খোঁজ করি।

কাকের দলের আলসেতে ফেলে যাওয়া
গলা নাড়িভুঁড়ির মরণ তত্ত্বের বিশ্লেষণ চিহ্নে-
আমি বাতাসের খোঁজ করি।

ওবাড়ির আইবুড়ি পিসিমার সুতোফুলে,
ঘুমের নক্সারা গান গেয়ে যায়।
আমি একমুঠো শান্তির খোঁজ করি।

আধবুড়ো লোকটার সিগারেটের রিং উঠে
ধোঁয়াশায় ভরায় স্টেশন চত্বর।
আমি মরা জীবনের খোঁজ করি।


কবিতা - অজিত দাশ

চৌকাঠ
অজিত দাশ



প্রকাশ্যে উড়ছে
যাবতীয় ব্যথার অগ্রন্থিত অক্ষর
তোমাকে জানা আর না জানা অকথিত ভঙ্গিমা মাত্র
অথচ কোন গোপন দর্জা খুলে গেলে
আশ্চর্য কী সব দেনা পাওনা মিটিয়ে দেখি
যারা এঘরে ওঘরে জমিয়ে রাখে অভাবের ছিটেফোঁটা
তারাও আজকাল দিব্যি কিনে নিতে পারে
প্রকাশের শালীনতা
যেদিকে দুর্লভ প্রতিভা মেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি
বিপন্ন চৌকাঠে লেগে থাকে মৃত্যু আর
মাতৃত্বের যন্ত্রকৌশল থেকে ভেসে আসে দুরত্বের অভিমান
যে দুরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে হিম হয়ে আসে যাবতীয় মনস্তত্ব

কবিতা - প্রশান্ত সরকার

কিছুতেই কিছু আসে যায়না 
প্রশান্ত সরকার


‘পাখী সব করে রব রাতি পোহাইল’

তাতে কিই বা এমন যায় আসে বলো
সেই তো সকাল হলেই
ঘাড়ে পৃথিবী বয়ে নিয়ে আসবে কাগজওলা
বারাসাত লোকালে
তোমায় নিয়ে আসবে সেজোমাসি
পাত্রপক্ষ দেখে যাবে সাজানো গোছানো মেয়ে
ঘরকন্যা সামলে রাখো কেমন করে
উপরন্তু ডিপ্লোমা আছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে......

তবু এসবে কিছুই আর আসে যায় না, হয়তো
যতক্ষণ রাত থাকবে
ততক্ষণই বারাত,
ফিরে যাবে ফুলগাড়ি আড়িয়াদহের দিকে
তারপরেই চওড়া সিঁথি জুড়ে ভোর হবে
তীব্র মেটালেও
পাখিদের রেওয়াজে দ্যাখো ‘সা’ ছুঁয়ে যাচ্ছে সরগম

কবিতা - কচি রেজা

পা ময় কুকুর
কচি রেজা


যখন-ই দেখি ধসে যেতে শুরু করে

যেন বরফ ধাওয়া করেছে
শ্লেজ টেনে হাঁপাতে হাঁপাতে
'পা ময় কুকুর,

অন্ধ তর্জনী্ ক্ষোভে কামড়ে দিচ্ছে
চিৎকার,
মাথার কোকিল,

কতদিন মানুষ হয়ে ও দেখি,
দুলে যাচ্ছে জ্বর,
তোমাকে কী বলেছি কখনও, আদরটি রাখো,
খ্যাতিমান হোক,

ফুরিয়ে যাচ্ছি, যখন
'পা ময় আয়না।

কবিতা - অলক বিশ্বাস

 
খাদান ধুলো
অলক বিশ্বাস



আরও একটু সময় যদি দাও
আরও একটূ ফর্সা হবে রাত
তোমাকে আমি বুঝেছি দুর্বার
কণ্ঠস্বরে তাই রেখেছি হাত।

গল্পে তুমি নদী চিত্রকল্প ঢেউ
ক্ষত বাড়ায় একটা ধাপা মাঠ
একটু একটু হচ্ছো জলহীন
এখনো তুমি মধ্যরাতের হাট।

খাদান জুড়ে বিষাদ গানের সুর
পাথর ভাঙে নি:স্ব পাজর বুক
খাদান ধুলো মাপো প্রতিধ্বনি
নতুন হতে ইচ্ছে করে খুব ।

কবিতা - হীরক মুখোপাধ্যায়

দুঃখবিলাস
হীরক মুখোপাধ্যায়



খুব ইচ্ছে করে আরেকবার ভাঙ্গতে
মিহিমিহি হয়ে ছড়িয়ে পড়ুক যত আমি
যদিও জানা আছে সাঁঝের প্রদীপ কিভাবে কালো করে অলিন্দের নিশ্চিত

তবু ইচ্ছে করে নিজেকে টুকরো'টুকরো করে ছড়িয়ে দিয়ে আবহ হই
দেখতে চাই, একেকটা গুঁড়োজল পাখির বাসা আঁকতে পারে কিনা

খুব ইচ্ছে করে ভাঙ্গতে বৃত্তের বসতি
অনিয়ন্ত্রণের আকাশ চোখগুলো আলগা'আলগা পালক হয়ে ভাসবে
আরেকটা নেকু-পুশু-মেনু মেলাঙ্কলি
পিয়ানোর বোতামে আদিখ্যেতার ছোঁয়া
কি এসে যায় আরেকটা কাব্যিক অনাসৃষ্টিতে
জানলার রোদ্দুর আত্মসাতের গল্পে ও'রম অনেক টুইস্ট থাকেই

কবিতা - মিহির নন্দন

মিহির নন্দন –এর দুটি কবিতা

এখন তুমি


চোখ খুলতেই শিউলি ঝরা সকাল
সারাটা রাত শব্দ বুনতে শেষ
তুমি এখন আকাশ ভরা রোদ
চোখ তখন আলমোড়া শিশির

চোখ খুলতেই অন্ধকার সাদা
নতুন শব্দ তাড়া দিচ্ছে নিবে
সকাল স্নানে দ্যা ভিঞ্চি কোথায়
তুমি এখন বারান্দা জুড়ে রোদ


অপরাজিতা মেঘ


ভালো আছিস
তুই আকাশে অপরাজিতা মেঘ
কার বন্ধু বলতে পারিস তুই ।

বরুণ বাতাস সঙ্গে নিয়ে
ইচ্ছে করে তোর সঙ্গে
চাঁদের কাছে শুই ।

কবিতা - ঋষি সৌরক


ঈল্পোজ্‌ড্‌ - এক মখমলি অ্যা হ শ্বাস্‌
ঋষি সৌরক


ফুটপাথে বই পড়ে আছে
খোলাপাতা থৈথৈহীন আকস্মিকতা
মোড়া মলাটে পড়ে আছে ফুটপাথ
সাদা রানির ঘরে সাদা রাজা
কালো অঘ্রাণ লাল রাজার ঘরে
কবিহীন অজস্র অক্ষরবাট নীল --
এলোপাথাড়ি সব কন্ট্রাস্ট নিয়ে
বই পড়ে আছে এঁটো মাংসের মতো
সচেতন কুকুরের ময়লা ক্যানাইন
প্রতিফলিত কুফল পড়ে আছে
দামহীন !
নির্বিশেষ ছিঁড়ে নেয় পশু ও মানুষ
দায়হীন হায়হীন যতটুকু যশোধর
তুলে নেওয়া যায়,সংসারী শহরের মাঝে
বইহাট ফুটপাথে নোংরা ও অশ্লীল
ঋতুমে খেপড়ে আছে ‘ছোঁবো কি ছোঁবো না’ বোধ
অতিশয় হাল্কা তবু টানটান শহরের পেট
খোলা বই পড়ে আছে পড়ে আছে বাবাদের বাঁ

কবিতা - ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত

এমন তো কথা ছিল না
ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত


কথা কি শেষ হয় শেষ কথা কে বলে
বাতাস নাকি মানুষ
হৃদয় নিংড়ে দিলে উজাড় করে কি আর থাকে

শেওলা পিছল দিঘীর পারে পা রেখেছ সাবধানে
ভেজা কাপড় শুকিয়ে যাচ্ছে গায়ে
তুমি নাকি বাউণ্ডুলে ভবঘুরে
হতেই পারে

এমন ভাবে জড়িয়ে যায় শব্দ পাহাড় কিসের নেশায়
বাসায় ফেরার আগে ঝোড়ো হাওয়ায় পাখি ডানা ঝাপটায়
কুলুঙ্গির পিদিম নেভায় হুহু বাতাস
আকাশ মেতেছে ঝড়ের নেশায়

ঘরের ভেতর অন্ধকার বাইরে প্রবল বজ্র হুঙ্কার
কোথায় তুমি যাবে এখন
তুমি কার কে তোমার
কবে কথা শেষ হবে
কবে তোমাকে পেরিয়ে যাবে তুমি

আমার স্বপ্নের মাঝে কেন ভুল জড়িয়ে দিলে
এমন তো কথা ছিল না

কবিতা - অরিন্দম চন্দ্র

কবিতার শেষে
অরিন্দম চন্দ্র



আজ আর কলমকারি নয়,
সারারাত জেগে আঁকিবুকির দিন
শেষ আজ...
মেঘমন্দ্র স্বরে বুকের কাছটায়
কে যেন গজরাচ্ছে।
বিস্ফোরণের ঠিক আগে
চেতনায় একটানা ঝিঁঝিঁর ডাক।।
কাউন্টডাউনের শুরু-
কবিতার শেষে ।

কবিতা - ইমেল নাঈম


অন্ধকারের ছবি
ইমেল নাঈম


এই সেই ঘর যেখানে কবি থাকতেন !

একদিন খুব সাহস করে ঢুকে দেখি কবির ব্যাবহৃত কিছু আসবাব খুব যতন করে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে । ঘরটির ডানে রয়েছে বেতের এক সেট সোফা আর একটি টি টেবিল আর বা পাশে পুরনো পালঙ্ক খুব পরিপাটি করে গোছানো , যেমনটি গোছানো থাকে কবিতারা। দেয়াল জুড়ে রয়েছে কিছু পোট্রেট , সম্ভবত কবির আঁকা আর ফ্রেমে বাঁধাই করা দুটো কবি মুখ । ঘরের পূর্বে চোখ যেতেই দেখি বিশাল আকৃতির বুক শেল্ফ , বই গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখি কবি স্পর্শে তারা আজো প্রাণবন্ত , মিটি মিটি করে হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে । ঘরের কোনে চোখ যেতেই দেখি একটি পড়ার টেবিল , উপরে রাখা পুরু কাঁচের চশমা আর উই পোকায় খাওয়া কবিতার খাতা ।পশ্চিমের দরজা পেরিয়ে দেখি বারান্দা … সেখানে এক আরাম কেদারা স্থীরভাবে দাঁড়িয়ে আছে ।

সবার অলক্ষে খুব সাহস করে বসে যাই আরাম কেদারায় … বসা মাত্রই চোখে ভেসে উঠে অন্ধকারের ছবি ! সেখানে একে একে দৃশ্যপটে ভাসতে থাকে নয় তলা বিধ্বস্ত বাড়ি আর শত প্রাণের হাহাকার … কিছুক্ষণ পরে দেখি অন্ধ নাবিকদের মিথ্যে ফুলঝুড়ি ও অসৎ সারেংদের বিকৃত মুখ … আরো দেখি সাধারণের ঘৃণা ভরা দৃষ্টি ।

কিন্তু এই চেয়ারে বসে কবি দেখতেন পদ্মা নদী আর প্রকৃতির ছবি ।

কবিতা - সৈকত ঘোষ

চার আঙ্গুলে রুপকথা
সৈকত ঘোষ


অলসতা কখনো কখনো
সময় কে ছুয়ে যায়, প্রায় প্রতিদিন
আমি তুলেআনি কিছু অক্ষর
আঙ্গুলের ডগায় লেপ্টে থাকা
রঙিন আবর্তে
শিলালিপিরা দাম্ভিকতা হারায়
তুমি নিরাকার ঈশ্বর হলে
কাঁচের বয়ামে বন্দী মানুষ খুজতাম না
ঘড়ির কাঁটায় যোতিচিন্ন
কখনো কখনো বাধ্যতামূলক...

আমার ইচ্ছেরা রং পাল্টে
ইকোফ্রেন্ডলি খড়- কুটোয় নতুন ঠিকানা বানায়
শয়ে শয়ে তরঙ্গেরা সমুদ্র পার কোরে
জড়ো হয়

তোমার গর্ভে আরতো কটা মাস
জন্ম হবে নতুন গ্রহের ... 


কবিতা - নির্মাল্য চ্যাটার্জ্জি

বহুরূপী এন্টারপ্রাইজ
নির্মাল্য চ্যাটার্জ্জি




নিঃশব্দে পা ফেলে অন্ধকার, যুবতি সন্ধ্যায়
কিছু অস্পৃশ্য ছায়া সিঁদ কাটে, ঢালে বিষ।
দেশলাইয়ে স্নেহশীল টোকা, কিছু টুকরো কাগজে
আগুন, কাগজ পোড়া আলোয় দোষাশ্রিত হাতে
তোমার মুখোশের শেষ পাপড়ি খুলে দেখতে চাই,
জানতে চাই, বহুরূপী চামরা, পেশী, হাড়ের গায়ে
অনুগামী যৌথ-দিনের সংজ্ঞায়িত বিশ্বাসের দর্শন।
রক্ত মাংসের মেকআপে আজ দৃশ্যমান দ্বিধা, এক এক করে
জেব্রাক্রসিঙে লেগে থাকা সেদিনের লিপস্টিকময় উচ্ছ্বাসগুলো
থেঁতলে যায় ছোট-বর-মাঝারি টায়ারের নিচে। মাংসের উপমা
নিয়ে জোড়া পাপ, চোখ, চিবুক এতটা কাল কি অনায়াস দক্ষতায়
সম্মোহনী হাসিতে পামিং করেছিলে আদিম কদাকার ছায়া,
চরিত্রের ব্যাকরণ, বহুরূপী এন্টারপ্রাইজ'র সাফল্যের ট্রিক্স।

কবিতা - ইসফ়ানদিয়র আরিওন

সন্ধ্যার গ্লানি
ইসফ়ানদিয়র আরিওন



মাঠভরা একাকিত্বের মাঝে বাজছে তোমার স্মৃতিনির্বাপক বাঁশরি স্তব্ধ দীঘির উপরিতলের সুঠাম নীরবতা ঠোঁটে করে মেঘহও মাছরাঙা এক উড়ে চলে গেছে ফিরোজা মনোমালিন্যের শহরে এই প্রাণের অভিলাষ এই কোলাহল এই বিতৃষ্ণ জীবন সব ছেড়ে দিগন্ত দুয়ারে দাঁড়াই পড়ন্ত বিকেলের গগনবিহারী গঙ্গাফড়িঙের মতো একাকিত্বের হালকা ডানায় আমিও সন্ধ্যা পেরুই জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণবালা তার হাতে জাসমিনের জাদুকরি মলাট চিকণ করুণ আবাধ্য অলকের হাতছানি মাঝে মাঝে করুণ জীবন লাগি কসবীদের শরীরে শরীরে প্রতারণার আরাধনা



কত দিন ধরে সন্ধ্যা দেখি না তামাকপোড়া তামাটে সন্ধ্যা অথচ এই উপসাগরীয় বায়ুর আবদারে ঢিলেঢালা পোশাকে ভিজে একসার ভেতর-বাইরের সব গঙ্গাফড়িঙ সন্ধ্যা... কিবলামুখী পরশ্রীকাতর সন্ধ্যা... সন্ধ্যা... গোধুলির তলপেট থেকে জন্ম নেওয়া আরেক অনুভূতি মাঝে মাঝে মনে হয় সন্ধ্যা আমারই মতো আশাহত প্রেতাত্মা কোনও যে শেষ বিকেলের আবেগ নিভে গেলে একাকিত্বের এই কানাগলি ধরে প্রত্যহ হেঁটে চলে যায় বাতাসা রঙের ছোপ ছোপ কষ্ট ছড়াতে ছড়াতে সন্ধ্যা... গামগীন যে সন্ধ্যা... রহস্যের যে সন্ধ্যা... আমাকে কতকাল কত মানুষের কথা শুনিয়েছে অথচ আমি তো চাই নি মানুষ হয়ে পক্ষে পক্ষে শিকস্তা চাঁদের মতো ক্ষয়ে যেতে

গুচ্ছ কবিতা - তানভীর হোসেন

তানভীর হোসেন


অর্বাচীনের উপেক্ষাকথন-১


বৃষ্টিস্নাত প্রাগৈতিহাসিক ধবংসাবশেষ-
আর তোমার বয়সী চামড়ার বলিরেখা,
বেমালুম মিলে যায়।

চিঁড়েচ্যাপটা শহুরে ইঁদুরে-
ভরে গ্যাছে রাজপথ,
দুর্গন্ধ ছড়ায় ওদের উদজান আর
সালফারের রসায়ন।

আর আমি তাই
নিকোটিনে কটু গন্ধ ঢাকি আপ্রাণ।

জীবিত মানুষ কমে আসে-
শেয়ার বাজারের সূচকের মতো,
বেড়ে চলে লাশের নম্বর-এক,দুই,.. হাজার, অযুত।

এ শহর এখন মৃতের শহর,
জোম্বি'রা বিড়ি টানে-
ফুটপাত কিংবা টিএসসিতে।

চলে স্বপ্নের হরতাল লাগাতার,
আর জীবন সেতো এক সুদূর উপকূল।



অর্বাচীনের উপেক্ষাকথন-২

স্থানঃ মরিচীকার উৎস ,
সূ্র্যের দর্পণ-
কাক কালো রাজপথ।

কালঃ ইঁদুরে কাটা,
মলিন পান্ডুলিপির,
প্রতিবিম্ব কোন দুঃসময়।

পাত্রঃ প্রত্নতাত্তিক কাটাছেঁড়ায়,
আবিষ্কৃত প্রাগৈতিহাসিক রাজ্যের,
মৃত্তিকা মূর্তি যেমন,
পুরনো সভ্যতার সমৃদ্ধি,
গোচরে আনে;

সময় সাপেক্ষ ঘষামাজায়,
হৃদয় খুড়ে তুলে আনা প্রতিভার-
মহাজন কিছু মানুষও তেমন,
আগন্তুক আগামীর কথা বলে।

তাদের বসন্তে শীত মৃত্যু আনে,
অন্য পৃথিবীর অন্য বসন্ত।

উদ্দেশ্যঃধ্রুপদ মানসে ফুটোর সন্ধানে...



অর্বাচীনের উপেক্ষাকথন-৩


তারপর...

সে চলে গ্যালে,
আমি আমারি প্রতিপদার্থ
হয়ে,রাত্রিবিলাসের প্রাসাদ হলাম-
লোকান্তরে।

তার আরো পরে...

সে প্রাসাদ আমার,
মাকড়সার খামার,
একাকিত্বের আড়ম্বরে,
জীবন বাকী পড়ে অনন্ত অম্বরে।

এখন...

অগণিত হাতে আমার,
নিখোঁজ সংবাদ(জরুরি খবর),
পৃথিবী গর্ভের অন্য পৃথিবীতে,
আমি যে এখনো বিনিদ্র,
অন্য আমি হয়ে।

অবশেষে...

সম্ভাব্য সমাপ্তিতে,
আমি ঈশ্বরকে বলবো,
তোমার চৌকাঠ আর কতো,
নিদ্রার ভেট চায়!!!
চায় আর কতো নাস্তিক!

ইংরাজি কবিতা - ইন্দ্রানী সরকার

Indrani Sarkar


I FOUND MY STAR


I looked out the sky...
I found my Star is stolen
In the deep blue of the sky.
I looked for my Star through
The shadowy trees and
Through the clouds...
I only saw the Moon
Smiling at me mischievously.

Suddenly a storm came,
The trees started swaying
With the wind .....
The Moon hid behind the clouds....
All dark in the earth....

After a while the
Storm has stopped.
The clouds started
Gliding under the sky....
The moon re-appeared
With its lovely smile....
Through the darkness
Of the shadowy trees
I found my Star
Shining with an eternal beauty...



YOU, ME AND THE RAIN

It's going rain throughout the night.
What if an ocean forms in your courtyard?
Do you know how to swim?

The moon has disappeared behind the river.
Strange! Why is so?
Isn't today a lunar fortnight?

My wounded heart has forgotten
All the poems I wrote.

There lies my canvas, blank,
Waiting to be painted.

The clouds are wrapping the whole sky.
Let it rain with the sound of ringing bells.
We will celebrate the rain together.

I will remember my poems once more.
I will start to paint on the canvas again.

We will start singing in the rain,
All our old songs once again.



FALLING IN LOVE


In my heart, I stare at you,
with my eyes I love.
As you come to me, I cherish
every moment that I have.
Upon finding you, I seem
to have lost my senses.
The romance has begun
only due to your grace.
You have made me happy
with your gentle loving heart.
I shift between pain and joy,
what a spell you have cast?
As I look at you, flowers
start blooming around me.
Every second becomes a
wild wanting, it is and it will ever be.



THE JAPANESE MAPLE

The Japanese Maple has bent
due to the lavish rainfall.
The plant is like a young lady,
beautiful and shy.
The leaves are reaching the ground
due to the pouring rain.
With her sleek fingers she is trying
to reach the ground
as it's her best friend.
Her deep red color is shining
deeply after the rainfall.
She has stolen all the red
from the red roses, rainbows
and has become a red fairy.
As I touch her, her beautiful
and slim figure starts shaking
shyly from my touch.
All her leaves start swaying
to the breeze.
She whispered in my ear and
Said, "O my friend,
I have found
my best friend and
that is why I am so happy."

ইংরাজি কবিতা - শ্বেতা নীলাঞ্জনা ভট্টাচার্য

THE IRONICAL DEFEAT
Sweta Nilanjana Bhattacharya 



everyone talks about religion
and i talk about everyone
if religion diversified us,
even i want to state that ,'i am God'
and would pontificate
about the new religion i create..
i dont wnt followers though
i would declare a war against the whole world
and you see them assemble and start a row,
come on fight against mem..
hypothetically you will win.
but the ultimate winner is me...
i stood alone
and united you all..
i accept my ironical defeat.
HUMANITY-i am a slave

ইংরাজি কবিতা - সন্দীপন মজুমদার

THINGS FALL APART
Sandipan Majumdar



The things I felt
And , the things I liked
I discarded them
All into them
All into the silent womb
Of some alleyway
I drowned them out.
All into the insipid
Blue of a static bay
You see how the barren life,
Conjugates itself into the impotency
With an wound more profound.
I have been walking for years -
Throughout my empty regency .



Shadows in shades of a smog grey
Dance around a legend of a long last song.
A silhouette flutters among the dark
Of a juxtaposition of us,
Between the magician's floating mark
Trying to keep my soul, buried within
The comfort of your breast
I enquire a shelter, a place,
A nest for a conscience trying to take rest
But with a dempsey I display
That a gypsy has no home
Only a tired infinite walk
In search of mirage
Leading onto a dead and tomb.

ধারাবাহিক বিলাভারত-অভীক দত্ত

বিলাভারত- পর্ব ৪
অভীক দত্ত


ছেলেটা পড়াশুনায় ভাল ছিল। ক্লাস নাইন অবধি রেজাল্ট খাসা। সবাই বলত এ ছেলে বড় হয়ে শিওর আই আই টি পাবে, কিংবা মেডিক্যাল।

কিন্তু না, সেটা ঘটল না। কেন? মাধ্যমিকে দুর্ধর্ষ রেজাল্ট করে ছেলেটা যখন ইলেভেনে উঠল, ম্যাথস টিউশনে একটা অপূর্ব সুন্দরী মেয়ের সাথে তার হয়ে গেল প্রেম। ব্যস। পড়াশুনা মাথায় উঠল। সারাদিন ফোন, এস এম এস করেই কেটে যেতে লাগল। ফলস্বরূপ এইচ এসে অঙ্কে ব্যাক।

হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। এটা আমি এখনকার সময়ের অপ্সরার ভূমিকা বললাম। কিন্তু মজা সরিয়ে রেখে বলি, মহাভারতে অপ্সরার গুরুত্ব কিন্তু জাস্ট ভাবা যায় না বস!

বহু সচ্চরিত্র পুরুষ হৃদয়কে দুর্বল করার ক্ষমতা ছিল এই অপ্সরাদের। এবার বলি সচ্চরিত্র কাকে বলে? আপনি বলবেন কেন, যার চরিত্রভাল। এবার জিজ্ঞেস করা যেতেই পারে, কিভাবে ভাল হল? সে কি সুযোগ পেয়ে ছেড়ে দিয়েছিল? যদি বলেন হ্যাঁ, তবে মেনে নেব সচ্চরিত্র। কিন্তু যে সারা জীবনে কোন সুযোগই পেল না তাকে সচ্চরিত্র বলি কোন হিসেবে বলুন তো? অপূর্ব সুন্দরী কোন মেয়েকে তার ঘরে মাঝরাতে ঢুকিয়ে দিলে কি সে তার চরিত্র বজায় রাখতে পারত?

এই অপ্সরারা কোত্থেকে এল? বলা হয় অপ্সরাদের অসীম যৌবন, মানে পজিটিভ নেগেটিভ খুঁজতে বসলে দেখা যাবে, এরা যার তার সাথে শুয়ে পরত, তা বলে সহজলভ্য ছিল না একেবারেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যেত যে মুনি ধ্যান ট্যান করে ভালমতন র‍্যাপো জমানোর চেষ্টা করতেন স্বর্গ থেকে তার উদ্দেশ্যেই অপ্সরাদের পাঠিয়ে দেওয়া হত। তারপর প্রথম প্রহরে প্রভু চক্ষু মেলি দেখিলেন সামনে এক অপূর্ব সুন্দরী রমণী নেত্য করিতেছেন, তিনি মাথায় ঘাড়ে জল টল দিয়ে আবার মনোনিবেশ করলেন, তারপর আবার কৌতূহলবশে চোখ টোখ খুলে দেখলেন সামনে সানি লিওন বেশি অপ্সরা জন্মদিনের পোশাক পড়ে শুয়ে র‍য়েছেন তখন প্রভু কি করবেন বলুন? ধুত্তোর নিকুচি করেছে তোর ধ্যানের বলে শুয়ে তো পড়লেন অপ্সরার সাথে, তারপরেই হল বিপত্তি। তখন তো আর ডটেড ব্যাপার স্যাপার ছিল না, অপ্সরাদেবীও দিব্যি পেটটি বাগিয়ে বাচ্চা বিইয়ে স্বগগে পাইলে গেলেন, আর সেই বাচ্চা অন্য কোন বাপ মায়ের হাত ধরে জগত আলো করে বেড়াত। কালিদাস বিখ্যাত করে গেছেন শকুন্তলাকে। বিশ্বামিত্রের ঘোর তপস্যায় ভয় পেয়ে দেবরাজ ইন্দ্র তপস্যা ভঙ্গ করতে পাঠিয়ে দিলেন মেনকাকে। ব্যাস। তার হয়ে গেল তারপরে যা হবার। (তখনও transparent পোশাক পাওয়া যেত, মেনকার সে পোশাক বায়ু হরণ করলে একেবারে উলঙ্গ মেনকাকে দেখে বিশু কাকু আর ঠিক থাকতে পারেননি আর কি)।

মা মেনকা দিব্যি প্রসবের পরে ফেলে পালালেন। কণ্ব মুনি বড় করলেন। মেনকা, উর্বশী, ঘৃতাচী, অদ্রিকা প্রমুখ তখনকার দিনের স্বর্গ মর্ত অপেরার কুখ্যাত নায়িকা ছিলেন। কোমর দুলিয়ে মর্ত্যে এসে পাবলিক খেপিয়ে আবার স্বর্গে প্রস্থানই ছিল তাদের মূল কাজ। এ প্রসঙ্গে অন্য একটি কথা বলি। একেবারে পুরাকালে সমাজ বলে কিছু ছিল না। যখন যে পারত তার সাথে শুয়ে পড়ত। তারপরে মহর্ষি উদ্দালকের পুত্র শ্বেতকেতু দেখলেন তার বাবার সামনেই তার মাকে অন্য এক জন তার মার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে। শ্বেতকেতু অবাক হয়ে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন সেটাই দস্তুর। তখনই তিনি এই আইন করেন যে কোন পুরুষ যদি পতিব্রতা স্ত্রীকে ত্যাগ করে অন্য নারী সংসর্গ করেন কিংবা ভাইস ভারসা তবে সেটা ভ্রূণ হত্যার সমতুল্য পাপ হবে। তারপর থেকেই কিছুটা লাগাম এল। তবে সে সময় অপ্সরারা মূলত virgin মুনি ঋষিদেরই টার্গেট করতেন স্বর্গের আদেশ অনুসারে।

স্বয়ং ব্যাসদেব সত্যবতী নামের এক অপ্সরা কন্যার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। দ্রোণাচার্যের বাবা ভরদ্বাজ মুনি ঘৃতাচী অপ্সরাকে দেখে ঠিক থাকতে না পেরে এক কলসের মধ্যে তার শুক্র রেখে দেন, তার থেকেই জন্মগ্রহণ করেন দ্রোণাচার্য। এই দ্রোণাচার্যের জন্ম বৃত্তান্ত বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে হয় না। ডিম্বানু শুক্রানুর মিলন ছাড়া কি করে এ সম্ভব কে জানে। তবে তখনকার দিনের মুনি ঋষিরা চ্যাম্পিয়ন লোক ছিলেন। কত ছয়কে কে নয় করেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই...

অপ্সরারা ছিলেন স্বর্গের বারবণিতা। দেবতাদের মনোরঞ্জনের জন্য নাচ টাচ ইত্যাদি করে স্বর্গ জমিয়ে রাখতেন। তারাও কিন্তু দেবতাদের মতোই অমর... কে জানে এখনো ছদ্মবেশে কত সুন্দরী রমণীর ভিতরে লুকিয়ে আছেন...
(চলবে)

ছোটগল্প - শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

ধোঁকাবাজি
শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়




।।হালকা গৌরচন্দ্রিকা।।

ধোঁকাভাজা বা ধোঁকার ডালনা খেতে আমার তো বেশ লাগে, অনেকেরই নিশ্চয়। একটু গ্যাস হতে পারে, তবে সেই ভয়ে বাঙালি খাওয়া ছেড়েছে কবে? বাঙালিবাড়িতে শ্রাদ্ধের নেমন্তন্নে ধোঁকার ডালনা মাস্ট, এখনও। অনেকের মতে ওটা নাকি মাছের পরিবর্ত হিসেবে মেনুলিস্টে আসে, আমিষ তো খাওয়া যায় না সেদিন। আমার মনে হয় কারণ আরও একটা আছে। আসলে জলজ্যান্ত মানুষটাকে কজনই বা পুরো চিনতে পেরেছিল। এখন সে ইহ জগতের মায়া কাটিয়েছে। কতজনে কতভাবে চিনে-জেনেছিল তাকে। আসুন আমরা একটু ধোঁকা শেয়ার করি। এ জগৎ তো মায়া, ধোঁকার টাটি।




।।এক।।

প্রিয়া। পছন্দের কেউ বা কিছু না। ভুঁইফোড় আর্থিক সংস্থা। গোদা বাংলায় চিটফান্ড। আমার প্রথম চোখের সামনে থেকে দেখা একমাত্র চিটফান্ড “প্রিয়া ইনভেস্টমেন্ট”। ১৯৮৬ বা ৮৭ সাল হবে, বিশুদা একদিন বাবাকে হঠাৎ ধরে বসল, “মামা, আপনার সদরঘরটা আমাদের দিন। সপ্তায় একদিন করে, মাত্র এক ঘণ্টা থেকে বড়জোর দেড় ঘণ্টা, বিকেলের দিকে। এই ধরুন পাঁচটা থেকে শুরু...”

কীসের শুরু সেটাই বুঝতে পারে না বাবা। বিশুর কি আবার নাটকের বাই চাগল নাকি! ওরে বাবা, সেতো এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার! সবকটা হেঁড়ে গলায় চেল্লাবে, চায়ের ভাঁড় আর বিড়ি-সিগারেটের মিলনমেলা হয়ে থাকবে সাধের সদরঘর। কোনও প্রয়োজন নেই... “না না, সেসব কিছু নয় মামা। ওসবের কি আর বয়েস আছে? রোজগারপানির ধান্দাও তো দেখতে হবে। আমরা প্রিয়া এজেন্ট, মাসে-সপ্তায়-দিনের স্কীমে আমরা মানুষের থেকে টাকা জমা নিই, আর সপ্তায় সপ্তায় আমরা জমা করে দিই এই এলাকার ডিও, মানে ডেভেলপমেন্ট অফিসারের কাছে। বছর শেষে ভালো রিটার্ন মামা। এ ছাড়াও আছে, একলপ্তে জমা, তিন বছরে টাকা ডবল। আপনাকেও একটা পলিসি করতে হবে কিন্তু মামা, আমি স্পেশাল কমিশনের ব্যবস্থা করে দেব। নদু, বুদ্ধু, শনু, শৈলেন... আমরা অনেকেই এখানকার এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেছি, তাও হতে চলল বছর দুয়েক।”

আমার সদরঘরে তোদের কাজটা ঠিক কী, সপ্তার মধ্যে কোন দিনটা (কবে কবে বসবি?)... “সেসব নিয়ে কিচ্ছু ভাবতে হবে না আপনাকে,” বিশু আর আগের বিশু নেই, এখন সে হাঁ করলে হাওড়া না হাবড়া স্পষ্ট বুঝে যায়, “শনিবার শনিবার, ওই বিকেলে যেমন বললাম, আমাদের মালিক সায়েব আসবে। একটা মিটিং মতো হবে, আর আমাদের সকলের কালেকশন, মানে জড়ো করা ক্যাশ নিয়ে চলে যাবে। আবার পরের শনিবার। সায়েবের নিজের বেয়ারাও আসবে সঙ্গে, যাবার আগে সব সাফসুতরো করে আপনার ঘর যেমনকে তেমন করে রেখে যাব মামা। আর মাসে মাসে কড়কড়ে পাঁচশো টাকা, রসিদ দিতেও পারেন, না দিলেও চলবে।”



।।দুই।।

শুরু হল প্রিয়া ইনভেস্টমেন্টের সাপ্তাহিক মিটিং, চালু লব্জে প্রিয়া কোম্পানির মিটিং। মালিক অয়ন সেনগুপ্ত এলেন নিজের বাজাজ নর্মদা স্কুটারে, পিছনে বসিয়ে খাস বেয়ারা জয়ন্তকে। প্রথম দিন এসেই বাবার সঙ্গে দেখা করে নমস্কার জানিয়ে গেলেন। বয়সের তুলনায় ছোট ঠাউরে আমায় একটা ক্যাডবেরিও দিলেন।

সদরঘরের একদিকের দেওয়ালে ছিল ভিতর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগের একটা জানালা। প্রতি শনিবার বিকেল বিকেল আমি সেই জানালায় স্থিত হতাম, নিজেকে গোপন রেখেই, মোটা পর্দার পিছনে। একটা অচেনা জগৎ, অচেনা কথাবার্তা, অচেনা আদবকায়দা পাকে পাকে জড়াতে লাগল আমার সেই বায়ো কি তেয়ো বছর বয়েস। অয়ন সেনগুপ্তর মধ্যে ছিল এক অজানা ম্যাজিক। কথা দিয়ে পরম শত্রুকেও বন্ধু করে নিতে দেরি হত না তাঁর। নদুদা-শনুদাদের মতো এজেন্টদের যেন বস নয়, বড় দাদা এই অয়নদা। বিজনেস পলিসি বোঝানোর সময় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনত সবাই। শনিবারের এই মিটিং তাই সবার কাছেই যত না কাজের, তার থেকেও বেশি আড্ডার, আনন্দের। ক্রমে ক্রমে সেই মিটিঙে পা পড়তে শুরু হল এলাকার ডানদিকের-বামদিকের রাজনৈতিক নেতাদের।

একদিন শৈলেনদা নিয়ে এল একজন মাঝবয়সী মানুষকে, তাকে নিয়ে সে কী হইচই! তিনি প্রদীপ ধর, ধর চানাচুরের তখন রমরমা ব্যবসা প্রায় পুরো হাওড়া-হুগলী জুড়ে। প্রদীপ ধরকে শৈলেনদা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, আর প্রদীপ ধর সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে এক-সুটকেস টাকা, পলিসি করতে চেয়ে। আমি চিকের আড়াল থেকে, সিনেমায় যেমন হয়, এক-সুটকেস ভরতি টাকা...!

তখন তো আর মোবাইল, সাথে ঘড়ি-ক্যামেরা-আলার্ম-রেডিও নিয়ে একটা চলমান বিস্ময় পকেটে পকেটে ঘুরত না। তাই সাপ্তাহিক চুক্তিতে পাশের পাড়ার উঠতি ক্যামেরাম্যান মন্টু ওরফে মনোতোষ মজুমদার প্রতি শনিতে ক্যামেরা কাঁধে উজ্জ্বল। ছবি তুলে নিত প্রিয়া কোম্পানির সঙ্গে এইসব রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক গা ঘষাঘষির। এসব ছবিই তো নিয়ে আসবে আরও আরও লগ্নি, বোঝাত অয়ন সেনগুপ্ত।

প্রিয়া কোম্পানি খুব ছোট অঙ্কের টাকা তুলত, এই যেমন রোজ পাঁচ কি দশ টাকা, দোকানে দোকানে ঘুরে। ফেরৎ কেমন? রোজ দশ টাকা করে জমা হলে বছরে তিন হাজার ছশো পঞ্চাশ, কিন্তু পলিসি ম্যাচিওর হল পাঁচ হাজার টাকায়। আরিব্বাস! সেই পাঁচ হাজার টাকা বিশ্বাসের ডানায় ভর করে “তিন-এ দুই”, মানে তিন বছরে ডবল স্কিমে ঢুকে গেল, বেরিয়েও এল দশ হাজার টাকা। এইবার এই দশ হাজার টাকা গিয়ে ঢুকবে “পাঁচ-এ তিন”, মানে পাঁচ বছরে তিনগুণ স্কিমে। স্কিম তো প্রচুর, যত স্কিম, তত স্ক্যাম।

বিশুদারা তখন আর নেহাৎ এজেন্ট নয়, ডেভেলপমেন্ট অফিসার। ওদের অধীনে আরও আরও এজেন্ট চষে ফেলছে, বাড়িয়ে তুলছে নিজেদের পরিধি। আমার বাবাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারেনি বিশুদা, তবে ডোমজুড়-সাঁকরাইল-জগাছা-জগৎবল্লভপুর থানা এলাকার ঢের-প্রচুর লোক টাকা জমিয়েছিল প্রিয়ার নানা প্রকল্পে। একদিকে আর্থিকভাবে দুর্বল দিনমজুর, মিস্ত্রি-জোগাড়ে-ঘরামি, বাড়ি বাড়ি তোলা-কাজের বউ-ঝি, ছোটখাট দোকানিদের বিপুল অংশের রোজের জমানো টাকা, আর অন্যদিকে ছিল এলাকার গুটিকয়েক ধনী-ব্যবসায়ীমহলে কালো টাকা সাদা করার হিড়িক। তিন-চার বছরের মাথায় ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠল। অয়ন সেনগুপ্তর চেহারা-চালচলন গেল বদলে। স্কুটার ছেড়ে ফিয়াট, ফিয়াট ছেড়ে কন্টেসা, বিড়ি থেকে ডানহিল ভায়া চার্মস, বাড়ির বউ ছেড়ে না দিয়ে বিভিন্ন শহরে আলাদা আলাদা বন্দোবস্ত...

আর আমাদের বাড়ির সদরঘরে এঁটে উঠছিল না প্রিয়া কোম্পানির মিটিং। দু’ বছর পুরো হবার আগেই আন্দুল বাসস্ট্যান্ডের মাথায় একটা অফিস নিয়ে নিল প্রিয়া ইনভেস্টমেন্ট, বড় হোর্ডিং লাগাল। আমার শনিবারের বিকেলবেলা গোপন ক্যামেরা সিরিজেরও ওখানেই শেষ।



।।তিন।।

নদুদা-বিশুদাদের সঙ্গে দেখা হত, রাস্তায়-বাজারে। ক্রমে দেখা হওয়া কমে গেল। ক্রমে ক্রমে শুনলাম শৈলেনদা নাকি নিজে প্রোমোটারি কাজ শুরু করেছে, বুদ্ধুদা বাড়ির সামনে একটা গুমটি দোকান দিয়েছে, চা-ঘুগনি-আলুরদম-পাঁউরুটির। প্রিয়ার আন্দুলের বুকে অফিসঘরও উঠে গেল, দুভাগে ভাগ হয়ে সেখানে একদিকে হল একটা ঝিনচ্যাক সেলুন, যেটাকে অনেক বলতে শুরু করল, ওটা নাকি আসলে সেলুন নয়, সালোঁ। আর অন্যদিকটা বহু বছর খালি পড়েছিল। এই হালে সেখানে সদা হিমশীতল চেরীরঙা অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের এটিএম।

সবই তো হল। কোথায় গেল অয়ন সেনগুপ্ত? তলে তলে অনেক আগে থেকেই গুটিয়ে নিচ্ছিল ব্যবসা, কাউকে কিচ্ছুটি না বুঝতে দিয়ে। “তিন-এ পাঁচ” স্কীমের প্রথম ঝাঁকটা যখন ম্যাচিওর হবার মুখে মুখে, সেই সময় রাতারাতি ধর্মপত্নী ও শিশুপুত্রকে নিয়ে ফেরার হয়ে যান। অধর্মপত্নীদের দায় উনি কেন নেবেন? দায় কেন নেবেন পঙ্কিল পথের সাথী যতেক কর্মচারীর ভবিষ্যতের বা আমানতকারীদের গচ্ছিত অর্থের?

বাতাসে নানা কথা ভাসত সেই সময়। উনি নাকি মিজোরামের রাজধানী আইজল-এ একটা মিশনারী স্কুলে অঙ্ক শেখান। আবার কেউ বলে ওঁকে দেখেছে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকুর্মম শহরে একটা সিনেমাহলের টিকিট-কাউন্টারে, টিকিট বিক্রি করতে। বিশুদার সাথে মাঝে দেখা হয়েছিল, অনেক বছর পর। কথাবার্তা-পোশাক তেমনই চৌকস, খালি চোয়াল ভেঙে গেছে, চোখমুখ ভিতরে ঢোকা। একটা গ্লোবাল মাল্টিলেভেল মার্কেটিং সংস্থায় কাজ শুরু করেছে । নাকি ছ’সাত বছর কাজ করলেই হবে, বাকি জীবন পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে-বসে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। মনে মনে ভাবছিলাম, আবারও চক্করে পড়ল বিশুদা!

এটা-সেটা কথার মাঝে এসে গেল অয়ন সেনগুপ্তর প্রসঙ্গ... “সে কী, তুই শুনিসনি! কাগজে তো বেরিয়েছিল। গুজরাতে থাকা এক বাঙালি পরিবারের তিনজনেই গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছে, ছেলেটা সদ্য ক্লাস টেন পাশ করেছিল...”


জানি না কোনটা সত্যি? তবে টাকা ফেরৎ পায়নি কেউ প্রিয়া ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি থেকে, এটা নির্জলা সত্যি। হয়নি কোনও অভিযোগেরও নিষ্পত্তি, না থানায়, না ন্যায়ালয়ে।

ছোটগল্প – দেবাশিস দে

ইচ্ছেপুরণ
দেবাশিস দে


আর মাত্র পাঁচ মিনিট আছে। খাতা জমা পরে যাবে। সন্দিপন তাড়াতাড়ি করছে। এই লাস্ট্‌ অংকটা তাকে যে করে হোক কপি করতে হবে। আগের ব্রেঞ্চে মনিতোষ খাতা খুলে অংকটা করেছে ঠিকই কিন্তু মাঝে মাঝে ওর হাতটা চাপা পরে যাচ্ছে খাতায়। তাও প্রাণপণ চেস্টা করেও সন্দিপন এই অংকটা মনিতোষের থেকে কপি করে যাচ্ছে। সন্দিপন অবশ্য আগে এই অংকটা খাতায় করে ফেলেছিল তারপর কি মনে হল নিজেই সেটা কেটে দিয়ে এখন মনিতোষেরটা কপি করছে।

যাক শেষ করা গেল। মনিতোষ খাতা জমা করল। সন্দিপনও খাতা নিয়ে এগিয়ে গেল জমা করতে। খাতা জমা দিয়ে সন্দিপনের খুব আনন্দ। আজ সে পেরেছে। দুই হাতের আঙুল তুলে নৃত্য করতে লাগল, মুখে বলে ও আন্টি আমি পেরেছি আজ, বহুদিনের শখ ছিল আমার টুকলি করবার - আজ পেরেছি। কি আনন্দ হচ্ছে ! ক্লাশের কেউ সন্দিপনকে এত উৎফুল্ল হতে দেখেনি কোনদিন। ক্লাশ শিক্ষিকা বলে কি বলছো সন্দিপন ? তোমার মাথা খারাপ হযে গেছে নাকি ?

পরের দিন সকাল এগারোটায় আবার ক্লাশ শুরু আগের মতো। পরীক্ষা শেষ। শ্রেনী শিক্ষিকা রোল কল করছেন একের পর এক। হঠাৎ সন্দিপন গিয়ে শিক্ষিকার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল । ক্লাশের সবাই খুব ভয় পেয়ে গেল। শিক্ষিকা সন্দিপনকে তুলবার চেষ্ঠা করে পারে না কিছুতেই, আরো জড়িয়ে ধরে সন্দিপন । শিক্ষিকা জিজ্ঞাসা করে কি হয়েছে তোমার – শরীর খারাপ লাগছে ? বাড়ি চলে যাবে ? না হলে বড়দির ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে পার। সন্দিপনের কান্না তত বাড়তে থাকে। অন্যান্য ক্লাশ থেকে দিদিমণিরা ছুটে আসে, সন্দিপন সবার পা জড়িয়ে ধরে একই ভাবে। বড়দি এসে ধমক লাগানোতে সন্দিপন বলে আমি আর টুকলি করব না আন্টি। বাবা আমায় কাল বেল্টের বারি মেরেছে, বলেছে আর যদি টুকলি করি বাড়িতে ঢুকতে দেবে না। মা আর ঠাকুমা আমায় অনেক বুছিয়েছে, আমি বুঝেছি টুকলি করা উচিত নয়। আমি আর টুকলি করব না কোনো দিন। সত্যি বলছি আন্টি।

আগের দিন খাতা জমা দিয়ে ও যা বলেছিল সে কথাতে সবাই ভেবেছিল ও মজা করছে, যেমন ও করে থাকে। কিন্তু সত্যি যে ও এ কাজ করবে আজ ব্যাপারটা শুনে সবাই অবাক হচ্ছে । এরই মাঝে অংক শিক্ষিকা এসে উপস্থিত। সে সব শুনে বলে ছিঃ ছিঃ সন্দিপন তুমি এটা কি করেছো ? তুমি এই রকম করবে আমরাতো কল্পনাও করতে পারি না। আমি তোমার খাতা কাল রাত্রিরে চেক করেছি। তুমি পুরো অংকটা ঠিক করে আবার তা কেটে দিয়ে ভুল করলে কি করে। পুরো দশটা নাম্বার তোমার কমে গেল, এই প্রথম তুমি একশোয় একশোর বদলে নোব্বই পাবে। ক্লাশে ফাস্ট বয় হয়ে তুমি এ সব কি করছো ?

কি করব আন্টি আমার বন্ধুরা আমায় বলে তুই শুধু পড়াশুনাই করবি আর কিছুই তোর দ্বারা হবে না। আমাদের মতো টুকলি করতে পারবি ? আমার কেমন জেদ চেপে গেল সত্যি আমি তো টুকলি করতে পারি না, তাই কাল চেষ্টা করলাম আন্টি ।

ধারাবাহিক উপন্যাস – রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

অবভাস
রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়



১।

আসলে হাইওয়েটাই সবকিছু গুলিয়ে দিচ্ছে...



সে তাকিয়ে থাকে আর দেখে তার ছোট্ট ঘরের দেওয়ালগুলো শুয়ে, জানলাগুলো নুয়ে আর ছাদ ভুঁয়ে এসে পড়েছে। বাইরে আকাশের দিকে একটা তোরণ, হতে পারে কোন মণ্ডপ আরনহবতখানা। তার আগে মেঘে মেঘে কিছু রঙ হয়েছিল। পৃথিবীর কন্যাদের বিদায়। এই সময়, যে, কন্যে নয়, হাইওয়ের দিকে উঠছিল। পেট্রোল ভ্যানের আলো মাপমত তার পেছনে এসেপড়েছিল। তারপর আর কিছু জানা নেই।

বিষাদ জ্বর নিয়ে গাছগুলো, মনে হয়, দেখেছিল। প্রলাপমারীর মধ্যে ছিল তারা। তাই সে ভাষা পাতায় পাতায় বোনা আছে। কোনদিন পাঠোদ্ধার হতে পারে। এদিকে তোলাবাজরা আকছার দানাব্যবহার করছে। সন্ধের পর থেকেই শোনা যাচ্ছে সেসব অনিপুণ হাতের কারবার। ভারী ভারী মোটরবাইক সব শহরে ঢুকে পড়ছে। যেসব দোকানীরা ফ্লাইওভার, মেট্রো, মল শুঁকে শুঁকেএসেছিল, তারা হাতের সাথে সাথে ল্যাজও গোটাচ্ছে। হয়েছে বেশ। খচ্চর ছোকরারা যা যা মারাচ্ছিল, তার সাথে সংস্কৃতি মিশিয়ে দিচ্ছে। দেদার। লুটছেও ভাল।

সে শুধু লক্ষ্য রাখছে। হিপ পকেটে একটা ছোট নোটবুক, আর পেন্সিলারদের হাতে যেরকম থাকে ঠিক সেরকম একটা পেন্সিল। সুযোগ পেলেই আঁকিবুঁকি কাটছে। আর এমন ভাবে লেখাগুলো আওড়াচ্ছে যে মনে হচ্ছে বাপের না হলেও তার নিজের শ্রাদ্ধের খরচপত্রাদি। একাজে স্টেশানটা তাকে সাহায্য করছে খুব। স্টেশানের নিচে বাজারচত্বর। সব কটা নেশার ঠেক। মদ্দামাগি। শনিমন্দির লাগোয়া মাদুলির দোকান। গেল শনিবারের শালপাতা যেখানে একটা বাছুর চাটছে, ঠিক তার পাশ দিয়েই হাইওয়েটাতে উঠে যাওয়া যায়। এখন একটা ছেলে আর দুটো মেয়ে উঠছে। আসলে হাইওয়েটাই সবকিছু গুলিয়ে দিচ্ছে।



২।

তার ঘুরন্ত স্কার্টের নিচে অনেকটা টানা শাদা মোজা, যেন পৃথিবীর সমস্ত স্থিতিস্থাপকতাকে স্তব্ধ করে শালীন হয়ে রয়েছে…


বাজারী পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় যেসব মফঃস্বলের কবিদের লেখা ছাপানোর আমন্ত্রণ জানানো হয় নি, তারা স্টেশান পেরিয়ে, এই প্রাচীন রাস্তাটার মোড় পেরিয়ে, বহু জন্মের নার্সিংহোমটার ঠিক নিচে, অফ্-সপটার সামনে, বাওয়াল দেয়। আর নক্কা ছক্কা নেশার পর যাদের লেখা ছাপা হয়েছে তাদের মা-মাসি করে। এরকমই একটা চাপের সন্ধ্যায় সে সেই নার্স-দিদিমণিকে নার্সিংহোমের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে দেখে ও দেখতে থাকে। তার ঘুরন্ত স্কার্টের নিচে অনেকটা টানা শাদা মোজা, যেন পৃথিবীর সমস্ত স্থিতিস্থাপকতাকে স্তব্ধ করে শালীন হয়ে রয়েছে।

আর ঠিক তেমনই তার শাদা জুতো।

নার্সদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণেই সে বাওয়াল দৃশ্য ত্যাগ করে তাকে অনুসরণ করে। ফোর পয়েন্ট ক্রসিঙে যে একটা নিদারুণ শাদা গাড়ি যে একটা নিদারুণ লাল আলো জ্বালিয়ে অপেক্ষা করছিল, দিদিমণি এসে সে-টাতে উঠে পড়ে। গাড়িটা শান্ত ও স্নিগ্ধ ভাবে গড়াতে শুরু করে, যেন তার অ্যাক্সিলিয়েটরে চাপ পড়তেই সন্ধ্যে হেলে যায়। আর ঠিক সে সময়েই, ভারী মোটরবাইকটা, এই দৃশ্য-কাব্যের মধ্যে জোর করে ঢুকে পড়বে বলে, সাইলেন্সর পাইপ ফাটিয়ে, গর্জনরত অবস্থায় গাড়িটার পিছু নেয়। এরপর আর কিছু জানা নেই। কারণ, জানা যায় না।

সে আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। গুনে গুনে দুটো হোঁচট খায়। কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্টকে সময় জিজ্ঞাসা করে। কাঠিকাবাব রোলের দোকানটা বন্ধ দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হয়। তারপর তার ডেরায় ঢুকে পড়ে।সেদিনের যা যা অনুসন্ধান নোটবুকে লিখে ফেলে। পেন্সিলটাকে ভাঁজে যত্ন করে রাখে।

এ সময়ে মোবাইলটা দুলে দুলে ওঠে। শব্দ তার কাছে বিভীষিকা বলে সে ওটাকে নিথর করে, ঠিক সেই নির্দেশে, যেভাবে ভাষ্যময় গলায় থিয়েটার শুরুর আগে রেকর্ডেড বাজানো হয়। সে অজান্তে হেসে উঠে। নিজেকে হেসে উঠতে শুনে একটু লজ্জিতও হয়। কারণ, তার বুকশেলফের পেছনে আর একটুও তলানি স্কচ নেই। যে কলটা ইনকামিং, সেটা তাকে আরও কিছু সময় বিব্রত করবে। তার আগে গলায় ঢেলে দিতে পারলে হত। কান দুটো গরম আর ভারী পড়ত। সে বাদ দিতে দিতে শুনত। তারপর না হয় বাদানুবাদে যেত।



৩।

... তখন ঠিক কী কারণে আকাশে একটা তারাবাজি ফুটেছিল...




ফ্লাইওভারের ঠিক নিচে তাকে যখন ফেলে যাওয়া হচ্ছিল, তখন ঠিক কী কারণে আকাশে একটা তারাবাজি ফুটেছিল, তা অন্যান্য অনেক কিছুর মতই জানা যায় না। ট্রাকের খালাসিরা, এক-দুজন করে,এক্সপ্রেসওয়ের ওধার থেকে প্রাতঃক্রিত্য সেরে নেমে আসার সময়ে তাকে দেখে। তবে, তাকে দেখার মত শুধু যা ছিল, তা তার অনিন্দসুন্দর গোড়ালি। এই একটা ভাবেই তাকে শনাক্ত করা যেত। আরসেটা একজনই পারত। বাকি কিছুর জন্য ফরেন্সিক রিপোর্টের অপেক্ষা করতে হবে।

প্রথম রাতটায় সে বিশেষ একটা ঘুমোয় নি। তবে একটা ঘোর ছিল। বেশ কিছু ছায়া ও ছবিরা তার ঘরের উত্তরমুখো দেওয়ালে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। ওই দেওয়ালের জানলা থেকেই এক্সপ্রেসওয়েটা দেখাযায়।

সে ভোরবেলা ঘুমিয়ে পড়েছিল। যখন সে ওঠে, বেলা গড়িয়ে গেছে। সমস্ত প্রামাণ্য সাক্ষ্য-চিহ্ন সহ। জটলারা আরও দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়েছে। কথারাও কান থেকে কানে ছড়াতে ছড়াতে হাওয়াকথা হয়েগেছে।



৪।

শালা হিজড়ের দল। সব কটার এক রা…



--খুব বেশি বাওয়ালি হচ্ছে...

লেখালেখির গাঁড় মেরে রেখে দেব

--হুঁ

-- হুঁ কি রে, বে? শ্লা...

--মাদারচোদ, সামনে এসে বল...

--দাদা হয়ে গেছ, সম্পাদকের দপ্তর পর্যন্ত এখন নাক গলাচ্ছ...

--মা,বউ, বউদিমণি সবার কোল ফাঁকা করে দেব



সে মনে করতে চাইছিল ঠিক কী ঘটেছিল, বাওয়ালটা কী নিয়ে কারা দিচ্ছিল...

এরপর কিছু মনে পড়ছিল না। আর কী নিয়ে দিতে পারত! দু আনার আবগারি। অল্প দাড়ি, পাঞ্জাবি গায়ে হাফ নেতা গোছের ছেলেটার চাকরিটা পর্যন্ত বদান্যাতায় পাওয়া। পাশেরটা রেহ্যাব থেকেসবে ফিরেছে। রেগ্যুলার উইথড্রয়াল।

শালা হিজড়ের দল। সব কটার এক রা।



তারপর সে রিপোর্টের দাগানো অংশগুলো আর এক বার দেখতে লাগলঃ



On December 14, 2012 Investigator Mr. Y of Kolkata Police, Law Enforcement Department sent me a sample to determine if the odor present in the sample was indicative of adecompositional human event.

… … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … …

However, a Secret Service agent asserted that a hair found on the white car window proved that Ms. X was sitting by the back passenger window, not out of range of the gun.

… … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … … …

I’m willing to testify this fact in a court of law and I will prove to the court that my opinion is correct. My Curriculum Vitae is attached and incorporated herein by reference.



Respectfully submitted,

Z



পি. এইচডি. রিসার্চ সাইন্টিস্ট তার প্রিলিমিনারি রিপোর্টে যে তথ্যাদি জানিয়েছিলেন।



৫।



পেন্সিল বললেই ছোটবেলা নটরাজ হয়ে যায়...




সেদিন সকালবেলা সে যথারীতি হাঁটতে বেরিয়েছে। ব্যারাকপুর কমিশনারেট ফর য়্যু আলো ফোটার আগে থেকেই কর্তব্যরত। ফোর-পয়েন্ট ক্রসিঙের গোলচাক্কিটাতে রং ঝলমল করছে। টুনিও জ্বলছে। নিবছেও। সে এক হয়েছে মজার। কী, কেন, কবে, কোথায় অপ্রয়োজনীয়। একটা কিছু লাগিয়ে দাও। গোটা শহরটাই একটা চাঁদমারি। লাগাতে পারলেই হবে। দাউ দাউ হবে। হচ্ছেও।



নিজের মনে বকতে বকতে এক সময় বকা ছেড়ে সে গতি বাড়াল। ঘামে ভিজতে হবে। কেউ রক্তে। সে সব পরে ভাবা যাবে। মানিকের ‘সমুদ্রের স্বাদ’ গল্পটা তার মনে পড়ল। সে পড়াত। না, দম বাড়িয়ে নাও। চোখের ওপর আর জুলপিটাতে ঘাম সামান্য চিকচিক করছে। রাজরোগ বলে কথা। নিয়ন্ত্রণে রাখ। নাহলে তারিয়ে তারিয়ে ফুটে যাও। অবশ্য কাউকে হিসেব দাখিল করার নেই। কিন্তু প্রত্যেকেরই তো নিজের কাছে নিজের একটা লেনা দেনা থাকে। তার মাপের নিজস্ব একটা হিসেবের খাতাও থাকে। তার ভাঁজে একটা টুকরো পেন্সিল।



পেন্সিল বললেই ছোটবেলা নটরাজ হয়ে যায়।



সেই পরাগ না কেশরে স্মৃতি লেখায় সে পেন্সিলটাই মনে করতে পারে নি। আবার একটা মেমরি-গেম খেললে কেমন হয়!



হাঁটতে গিয়ে উল্লেখযোগ্য সে যা যা দেখেছেঃ



১। শারদীয়া ও দীপাবলীর শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। বুড়ীমার শব্দবিহীন আতসবাজী। বেলুড়, হাওড়া।
(সব কটা বানান নির্ভুল ছিল)

২। Xpert Tutorial, WB Board, ICSE & ISC, CBSE, VII- XII, NEET, JEE. Also Home Tutors Available for All Subjects.

৩। উত্তর ২৪ পরগণা জেলা কমিটির ডাকে, ১লা এপ্রিল, প্রগতি সংঘের মাঠে বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট নেতার স্মরণ সভা।

ঠিক তার পাশেই-

৪। সাম্রাজ্যবাদ অনুসৃত কর্মসংকোচনের নীতির বিরুদ্ধে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের দাবীতে যুব সমাজ এক হও। (পাশে চে ও তারার ছবি)

৫। MAGMA GOLD LOAN (ম্যাগমা গোল্ড লোন) টোল-ফ্রী নম্বর 1800 3002 3200

৬। Entertainment, Real Estate & Food Hungama…



সে খুব মনে করতে চাইল ইভেন্টটা কোথায় ছিল। বাল, এগুলো তার কাজ!

ধারাবাহিক – সুবীর সরকার

এপিটাফ
সুবীর সরকার



(২৩)

নদীর ভিতর নদী শুয়ে থাকে।নদীর মধ্য থেকে তুমুল এক নদী উঠে আসে।হাই তোলে।পায়ে পায়ে গড়িয়ে যায় রাস্তা।গলিপথ।তস্য গলি।বস্তির বাচ্চারা গান গায়।গানের গায়ে জড়িয়ে যায় খিস্তিখেউড়।আবার এক একদিন সীমাহীন এক প্রান্তর হয়ে ওঠে পৃথিবী।বাতিদান বেয়ে রক্ত গড়িয়ে নামে।রক্তের দাগ অনুসরণকারী পাখিদের ডানার নীচে কাঁচপোকা,ফড়িং।জীবন কাঁটাগাছের দিকে পাশ ফেরে।দেশাচারের নকশির ভিতর হরেকরকম মানুষজন।বিলাপরত স্কুলবালিকা।গান বাজনার তারসে সংক্রমনতায় ফাঁকা হয়ে যাওয়া মাঠ প্রান্তর থেকে উড়ে আসে প্রজন্মপীড়িত কথকেরা।তারপর লোককথার ঢঙে গল্প এগোতে থাকে।অন্ধকারের নদীর পাশে তখন ভূতুড়ে ভাটিখানা।আর চোখে জল আসতেই মাতালেরা সব প্রেমিক হয়ে যায়।প্রান্তবাসীর হাতে হাতে বাঁশি ঘোরে।বাঁশি বেজেও ওঠে আচমকা।তখন হেরম্ব বর্মন উঠে দাঁড়ায়।মহামানব হতে পাবার সুযোগ হেলায় সরিয়ে দিয়ে সে ধুলো-মাটি আর মানুষের অ্যাখ্যানমালা সাবলীল বলে যেতে থাকে।অবিরাম তাঁতকল ঘোরে।আর নদীর মধ্যে থেকে তুমুল এক নদী উঠে আসে।




শিল্পকলা - অপূর্ব দাস