রবিবার, ২ মার্চ, ২০১৪

ছোটগল্প – গৌতম চট্টোপাধ্যায়



অ-মানুষ



“Mr. Mandal,right?” একটা কড়া খনখনে গলার আওয়াজ ঠিক কানের পর্দায় সুড়সুড়ি দিয়ে থমকে দাঁড়াল। পাশে মুখ ঘুরিয়ে দেখি,হাল্কা বিস্কুট রঙের শার্ট আর কালো প্যান্ট পাট-পাট ইস্তিরি করা,আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট হাসছে। গলা ভারী ও গম্ভীর হলেও বয়স যে খুব বেশি নয় তা দেখে সহজেই আন্দাজ করা যায়। তো এই পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুত তো বটেই বিস্মিতও কম হইনি। একজন সম্পূর্ণ অচেনা ছেলে আমার পদবী ধরে ডাকছে! আমার স্মৃতিশক্তি বেশ প্রখর বলেই জানি। চোখ বন্ধ করলে শৈশবের প্রায় সকল ঘটনা দিব্যি তুলির টান দেয়। কে কি বলল,কে কি করল তা সহজেই মনে ধরে। একবার কাউকে দেখলে আমার এই চোখদুটো এমন ছবি তুলে রাখে যা সম্পূর্ণ ‘blackout’ না হলে এই memory card থেকে মোছা মুশকিল। তো ইনাকে আগে কখনও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না। আমার এই আত্মবিশ্বাসী স্মৃতিশক্তি-তে সর্বোচ্চ চাপ দিয়েও উদ্ধার করার চেষ্টা করেছি। ঠেলার নাম বাবাজী,যদি সে উত্তর দেয়। কিন্তু না,সম্পূর্ণ অচেনা অজানা মানুষটিকেই সামনে দেখছি।একটু বেশ থতমত খেয়েই বললাম,“আজ্ঞে,আমার নাম প্রীতম মণ্ডল,কিন্তু...”

আমায় মাঝপথে থামিয়েই সেই আগন্তুক বলে উঠল,“Me Mr. Chatterjee,Sayak Chatterjee.”

সায়ক চ্যাটার্জি! হুম,চেনা চেনা লাগছে,কোথাও যেন একটা...



এই ভাবছি আর বার বার চোখ যাচ্ছে কালো বড় লেন্সের সানগ্লাসে ঢাকা শ্যামলা মুখের দিকে। এতক্ষণে অবশ্য সেই ব্যক্তিটি সানগ্লাস খুলে আমার বন্ধু মৃন্ময়ের সাথে বেশ ভালই আলাপ জমিয়েছে। আলাপের ধরণ দেখে বোঝার বাকি রইল না যে তারা পূর্বপরিচিত। তার খালি মুখটা দেখে আর কোন সংশয় রইল না। সে আমায় চিনতে ভুল করেনি কিন্তু আমার স্মৃতিশক্তিই যেন একটু ভনিতা করছিল। তাকে দেখেছি,আবার দেখিনিও। আসলে ছবিগুলো যে কখন জ্যান্ত হয়ে মনের মাঝে জায়গা করে নেয় তা আমরা টেরও পাই না। ও কি আমার বন্ধু? ঠিক বন্ধুও বলা যায় না। আসলে ফেসবুকের এই অচেনা শহরে বন্ধুত্ব না হলেও যে একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে তা মেনে নিতে কোন অসুবিধা হয় না। তবে এই বন্ধন কেবলই এক সুতো না নাইলনের দড়ি তা সময়ই বলবে।

একটু বেশ লজ্জিত হয়েই সায়ক-কে বললাম,“আসলে তোমাকে ঠিক চিনতে পারিনি।”

সায়ক সপাটে উত্তর দিল,“No,no its ok,এমন হয়। তবে আমার কিন্তু চিনতে ভুল হয় না।”

হঠাৎ অফসাইডে গোল খেয়ে একটু হতভম্ব হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।

“চলো,lets go,” এক হাঁক পাড়তেই সব ভুলে চললাম গন্তব্যস্থল।



এই প্রথম কোন বন্ধুমহলে সম্পূর্ণ অপরিচিতদের মাঝে একটু হলেও স্বস্তি বোধ করছি। এখানে কিন্তু একপ্রকার কানকাটার মতই হাজির হয়েছি। আমন্ত্রণ জানানো হয়নি ঠিকই কিন্তু পা-গুলোকে তো শ্রীঘরে বন্দি রাখা যায় না। তাই ছুটে চলে এসেছি। সায়ক দিব্যি সিটি মারতে মারতে আমাদের সামনে আর আমরা দুই মেনি বিড়াল গুটিগুটি নিঃশব্দ পায়ে তাকে অনুসরণ করে চললাম। প্রথমে ঠিক ছিল যাওয়া হবে কোনো পুরনো রাজবাড়ি। কথায় কথায় মৃন্ময় বলেছিল এই ইচ্ছেটা। তখনি মনটা কেমন যেন নেচে উঠেছিল। পুরানো বাড়ি,বিশালাকার জানালা,চুন খসার আওয়াজ,ভাঙা শার্সি,পুরানো ধুলোমাখা ঝাড়বাতি হয়ত সাক্ষী শত শত আসরের, ঠাকুরদালান মেতে উঠত খরম আর ঢাকের আওয়াজে।ভিতর মহলে মহিলাদের কচকচানি আর সংহত হুকুম বাইরের পুরুষরূপী মানুষগুলোর। তাই এক প্রকার নস্টালজিয়া। নস্টালজিক বাঙালির অবশ্য জুরি নেই। এরই মধ্যে এই বিশালাকার স্তম্ভগুলিতে হয়ত রক্তের দাগ,শয়ন কক্ষে মহিলাদের সম্মান উদ্ধারের আর্তনাদ। এত কিছু ভাবতে ভাবতে একটা ভয়ঙ্কর ইচ্ছাও ছিল মনে। এই এত বছর পরও যদি মৃত ব্যক্তিদের জীবিত আভাস পাই তা হলে তো সোনায় সোহাগা।

শেষে ঠিক হল রাজবাড়ি ছেড়ে কাছাকাছি হুগলীর ইমামবাড়ায় যাওয়া হবে। উৎসাহের কিছুটা ভাঁটা পড়লেও মেজাজটা অক্ষুণ্ণই ছিল। পথ চলতে চলতে মৃন্ময়কে জিজ্ঞেস করলাম, “আমরা বাঙালি,সেও তাই,তবু ইংরেজি কেন?”

মৃন্ময় বলল, “হবে না? ছোট থেকেই ইংরেজী মাধ্যমের কাছে নতি স্বীকার করে এসেছে,তাই একটু দেখাতে হবে না?”

পাছে তার কানে পৌঁছায় তাই যথাসম্ভব মুখ টিপে হাসাহাসি করলাম। কথাবার্তা,ঠাঁটবাট দেখে আগেই এরকম কিছু আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু আমার দেখা মৃন্ময় যে পুরো ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে যে এমন একটি সুমধুর বাক্য বলবে,তা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।



যাই হোক,যথাস্থানে যথাসময়ে পৌঁছানো গেল। একটি লোক টেবিল চেয়ার সমেত গেটের সামনে বসে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। চেয়ারটি কাঠের,তার দৈন্যদশা দেখে সে যে বৃদ্ধ তা আন্দাজ করতে বেগ পেতে হয় না। টেবিলে একটি খবরের কাগজের পাশে রাখা একগুচ্ছ টিকিট। দাম মাত্র পাঁচটাকা। তা এই অগ্নিমুল্যের বাজারে যে এই কয়টি টাকার বিনিময়েও কাজ হয় তা এখানে না এলে কস্মিনকালেও জানতে পারতাম না। টিকিটের দাম পেয়ে বেজায় খুশি পাহারাদার লাল ঠোটের ফাকে কালো দাঁতগুলো বের করে এক গাল হেসে বলল, “এখানে অনেক কিছুই দেখার আছে। পাশের সিঁড়ি দিয়ে টাওয়ারে উঠুন,পুরো হুগলী দেখতে পাবেন।”

কথামত প্রথমে উঠলাম সেখানে। বিশালাকার মোটা থামের পাশ দিয়ে উঠে গেছে ঘোরানো সিঁড়ি। তাকে সম্বল করেই উঠতে থাকলাম এক অজানা পথের সন্ধানে। সিড়ির একপাশে বিশাল বেলঘর,যা প্রতি আধ ঘণ্টা অন্তর হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়ে বেজে ওঠে। প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে,মুখের আকৃতি বিকৃত করে অবশেষে পেলাম সেই আলোর সন্ধান। গঙ্গার ঠাণ্ডা বাতাসে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি আর চোখের সামনে নবদিগন্ত। তবে এখানে অনেকে যে প্রাকৃতিক শোভা উপভোগের বদলে যতাদের প্রেমের পাণ্ডুলিপি লিখতে আসে তা দেওয়ালগুলোর দিকে চোখ বোলালেই বোঝা যায়।

নিচে নেমে গেলাম মসজিদে। নমাজ পড়ার ঘরে কিছুটা হলেও আশা পূর্ণ হয়েছিল। ঝাড়বাতি রঙবেরঙের,বিভিন্ন আকৃতির। দেখলেই মায়ায় প্রাণ জুড়িয়ে যায়। লাল,নীল,হলুদ ও সবুজ রঙের মৃতপ্রায় শার্সির আর্তনাদ মনে বিষতীরের আঘাত হানতে বাধ্য। অবশ্যই ভোলার নয় গঙ্গার পাড়ে কাঠের পাটাতনের উপর সূর্যঘড়ি। সূর্য ওঠার সাথে সাথে সেই কাঠের ছায়া সময় বাৎলে দেয়। আর এই সূর্যঘড়ির কাছে ক্ষিপ্ত শিয়ালের হিংস্র ডাক বড়ই উপভোগ্য। উপভোগ্য বললাম বটে তবে এই শিয়ালমামা একবার সামনে এসে পড়লে যে কি করতাম তা কেবল ঈশ্বরই জানেন।

বিভিন্ন দিক ঘুরে যখন সূর্য পশ্চিমের কোলে ঢলে পড়ছেন তখন আমরা এ তল্লাট ছেড়ে ফিরলাম বাড়ির পথে। ভালো লাগলো ঠিকই তবে একটাই আফসোস রয়ে গেল। ভূত বাবাজী এবারও আমার প্রতি সদয় হলেন না। আমায় ভূতের মত দেখতে বলে তারাই উলটো দিকে দৌড়েছে কি না কে জানে। বেড়িয়ে সায়ক আমাকে ও মৃন্ময়-কে উদ্দেশ্য করে বলল, “Nice to have u all,Mr. Mandal and Mr. Bhattacharya.Its been a great pleasure to me.বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।”

হাসিমুখে হাত মিলিয়ে তাকে বিদায় দিলাম।

এর পর প্রায় গোটা একটা বছর অতিক্রান্ত। সায়কের সাথে আমার বন্ধুত্বটা ধীরে ধীরে বরফের মত জমাট বেঁধেছে। একসঙ্গে,এরপরও আনেক জায়গা ঘুরতে গেছি। একদিন,রাত প্রায় একটা নাগাদ,একটি ডিটেক্টিভ বই পড়তে পড়তে তন্দ্রাটা বেশ গাঢ় ভাবেই এসেছিল হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। স্পষ্ট শুনতে পেলাম সায়কের গলার আওয়াজ।

“Pritam,are you inside?একটু জল দেবে?”

সে এক করুণ সুর। এত রাতে! তবে একটু যেন আনন্দিতই হয়েছিলাম। বন্ধুদের ডাক শুনলে পরে মনটা কেমন যেন একটু নেচে ওঠে। তাই ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে জলের বোতল হাতে নিয়ে বাইরের গেটটা খুলি। আশেপাশে আছে ভেবে একটু এগিয়েও যাই।মনে একবিন্দুও ভয় কাজ করেনি। কিন্তু পরক্ষণেই মনে এলো সেই কঠিন বাস্তব সত্য। আমি কার ডাকে সাড়া দিয়েছি,সায়ক! নাম শুনে প্রায় চমকে উঠি।মাঝরাস্তায় আমার পা দুটোকে যেন কেউ শক্ত করে চেপে ধরেছে,এক বিন্দুও নড়ানোর জো নেই। এ শক্তি তো সাধারণ মানুষের হতে পারে না। নিশ্চয়...ভয়ে গা শিউরে উঠল। সায়ক তো এই তিনদিন আগে সুইসাইড করেছে! প্রেমে প্রত্যাখ্যাত,প্রেমিকার সাথে ঠোকাঠুকি ঠেলে দিল অতলে। ডাউন লালগোলার আওয়াজ শুনেও এক বিন্দুও নড়েনি মাঝলাইন থেকে। এই গত পরশুই তো মৃন্ময়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম ফোনে। আর আজ কিনা...! আর ভাবার অবকাশ নেই, গলা শুকিয়ে আসে।

এটাই কি তবে বহু চর্চিত নিশির ডাক? মানে তারা সত্যিই আসে! মানুষ রূপী এক ‘অ’-মানুষই কি জীবনের ব্রত?