আত্মজীবনী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আত্মজীবনী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২ মে, ২০১৩

মলয় রায়চৌধুরীর ডায়েরি

হিন্দি সাহিত্যিক ফণীশ্বরনাথ রেণুর সঙ্গে তাড়িসন্ধ্যা
মলয় রায়চৌধুরী



পাটনায়, চল্লিশ দশকের ইমলিতলায়, এখন ভাবি, ‘খারাপ’ আচরণ ব্যাপারটা , এখন যেসমস্ত আচরণকে বলা হবে সীমালঙ্ঘণ, তা সম্ভবত ছিল না । আমাদের বাড়ির সামনের রকে আমার শৈশবের বন্ধু কপিলের দাদু একটি খিস্তি শেখাবার স্কুল চালাতেন ; তাঁর কাছে শিশুদের রেখে মায়েরা যে-যার কাজে ব্যস্ত থাকার সময়ে কপিলের দাদু, যাকে আমরা বলতুম রামচন্দর, কোনো পথচারীর দিকে নির্দেশ করে একটি শিশুকে বলতেন, ‘এই তুই ওকে অমুক গালাগালটা দে’। শিশুর কন্ঠ থেকে বেরোত এমন সমস্ত খিস্তি যা শুনলে বর্তমান কালখণ্ডে মারামারি-খুনোখুনি আরম্ভ হয়ে যাবে । নিজে তাড়ি খেতে-খেতে শিশুদেরও খাইয়ে দিতেন এক-আধ ঢোঁক ।


ওই পাড়ায় কারা কারা চুরি পকেটমারি ছিনতাইবাজি ইত্যাদি করে জীবন চালাত তা ইমলিতলার সকলেই জানত । স্বাভাবিক যে পাড়ার তাড়িখোররা তাড়িও চুরি করে এনে খেত। ছেলে-ছোকরারা খবর আনতো যে কোথায় কোন কোন গাছে তাড়ির হাঁড়ি বাঁধা হয়েছে । ব্যাস , ভোর রাতে বেরিয়ে পড়ত একদল লোক । পাড়ায় পৌঁছে যেত বেশ কয়েকটা তাড়ির হাঁড়ি । সকালে নামিয়ে আনা বলে কিছুক্ষণ রেখে দেয়া হতো যাতে রোদের গরমে গেঁজিয়ে ওঠে ।

আমার তাড়ি পানের হাতেখড়ি ওই ইমলিতলা পাড়াতেই, শৈশবে । কিন্তু আমাদের তাড়ি খাওয়াবার জন্য বড়োজ্যাঠা বকুনি দিতেন, আমাকে নয়, যারা তাড়ি খাইয়েছে তাদের । তবে তাড়ি খাওয়াকে খারাপ চরিত্র-লক্ষণ মনে করা হতো না, কেননা আমাদের বাড়িতেও, বিহারি সংস্কৃতির প্রভাবে বোধহয়, বলা হতো যে তাড়ি স্বাস্হ্যের পক্ষে উপকারী ; ভোর রাতের তাড়ি খেলে মোটা হওয়া যায় । গেঁজিয়ে-ওঠা তাড়ির গন্ধ আমার ভালো লাগত না ; নাক টিপে খেতে হতো । তাড়ি খাবার জমায়েত দেখলে তাই এড়িয়ে যেতুম, যদিও পেছন থেকে ডাক পড়ত, টিটকিরিও মারত বয়স্কদের অনেকে ।



হিন্দি সাহিত্যিক ফণীশ্বরনাথ রেণুর সঙ্গে বসে নানা রকমের নেশা করেছি । ওনার গ্রামের বাড়ি ছিল নেপালের সীমান্তে । বিহারি তরুণ কবি-লেখকরা ওনার বাড়িতে একত্রিত হলে কখনো-সখনো গাঁজা খাওয়া হতো ; গাঁজার শৌখিন ছিলিম ছিল রেণুজীর । তবে উনি ভালোবাসতেন রাম খেতে, নিট রাম । আমি দরিয়াপুরের বাড়িতে যাবার পর উনি বাড়ির কাছে এসে আমার নাম ধরে হাঁক পাড়তেন । রিকশায় উঠে আমরা যেতুম একটা বারে; সেটা ছিল ‘সেন্ট্রাল হোটেল’ নামের পোড়োবাড়িতে । আরও অনেকে এসে পৌঁছোত । রাম খাওয়া হতো । রামও আমার প্রিয় নয় । আমি কম খেতুম ।


একবার উনি ওনার রাজেন্দ্রনগরের ফ্ল্যাটে সাহিত্যিক আড্ডার ব্যবস্হা করেছিলেন, হিন্দি সাহিত্যিকরা যাকে বলতেন ‘গোষ্ঠী’ । এখন এই জমায়েতগুলোকে কী বলা হয় জানি না । গোষ্ঠী জমজমাট হয়ে উঠলে ট্রেতে সাজানো কাটগ্লাসের পাত্রে চলে এলো পানীয় । ফিকে কমলা রঙের, ছোটো এলাচের গুঁড়ো ভাসছে তার ওপর। অপরিচিত গন্ধ । ভোর রাতের তাড়ি ফ্রিজে রেখে তার সঙ্গে মেশানো হয়েছে জাফরানের জল আর ওপর থেকে ছোটোএলাচ!

বলাবাহুল্য যে প্রত্যেকের কবিতাপাঠের পর ‘ওয়াহ’ ‘ওয়াহ’ ধ্বনি উঠছিল । ষাটের দশকের পর উঠে গেছে এই ধরণের কবিতাপাঠের আসর।

সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৩

মলয় রায়চৌধুরীর ডায়েরি

মলয় রায়চৌধুরীর ডায়েরি
কবি রাজকমল চৌধুরীর শেষ কনডোম


ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত, সন্তোষ রায় সম্পাদিত ‘জলজ’ পত্রিকার নভেম্বর ২০১২ সংখ্যায় হিন্দি কবি রাজকমল চৌধুরীর বিখ্যাত ( আলোচকদের মতে কুখ্যাত ) ‘মুক্তিপ্রসঙ্গ’ কবিতার বিশ্বজিত সেনকৃত বাংলা অনুবাদ পড়ার পর রাজকমল সম্পর্কে অনেক কথা মনে পড়ছিল । ‘মুক্তিপ্রসঙ্গ’ একটি দীর্ঘ কবিতা । হাংরি আন্দোলনের সময়ে রাজকমল কলকাতায় ছিল আর ওর সান্নিধ্যে কলকাতার অন্ধকার জগতটা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল, কেননা সেসময়ে ওই জগতটির নিচুতলার বেশির ভাগ কুশীলব ছিল বিহারি, অনেকে রাজকমলের জেলার । তখনকার কলকাতায় চিনে পাড়ায় চিনেদের জন্যে যে বিশেষ চিনা রমণীদের রেড লাইট এলাকা আছে তা রাজকমলের দরুন জানতে পেরেছিলুম ।

রাজকমলের গ্রাম মাহিশিতে একটা মন্দিরের কথা বলত ও, যেখানে মোষ বলি হত আর গ্রামের সবাই সেই মোষের রান্নার ভোগ খেত । আমাকেও নিয়ে গিয়েছিল মোষের মাংস খেতে । আমি অবশ্য তার আগেই নেপালে কচিলা খেয়েছিলুম, গমের মদ সহযোগে । রাজকমলের মতে, ওই মন্দিরের তারা মূর্তির মাথায় ফুল রাখলে ফুলটা যদি না পড়ে তাহলে মনোকামনা পূর্ণ হয় । রাজকমল, আমার সামনেই কয়েকবার চেষ্টা করেছিল, প্রতিবারই ফুল পড়ে গিয়েছিল । ফুল রাখছিল ওর দ্বিতীয় স্ত্রীর ভাইঝিকে প্রণয় নিবেদন করে সফল হবার আশায় ।



রাজকমলের বাবার স্ত্রীর মৃত্যুর পর আবার বিয়ে করেছিলেন । রাজকমলের বিমাতা ছিলেন রাজকমলের চেয়ে ছোট । বাড়িতে অবস্হা ঘোরালো হয়ে উঠছে অনুমান করে রাজকমলের বাবা রাজকমলকে সৌরঠ সভার গণবিবাহের মাঠে নিয়ে গিয়ে শশীকান্তা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন , আর রাজকমলকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন আমাদের কলেজের হোস্টেলে । বিয়ের চার বছর পর রাজকমল সাবিত্রী শর্মা নামে একটি মেয়েকে বিয়ে করে, প্রথম বউ যদিও তখন বাড়িতে । সাবিত্রীর সঙ্গে বিয়ে এক বছরের বেশি টেকেনি, তার ভাইঝির প্রতি রাজকমলের টানের কারণে ।

দ্বিতীয় স্ত্রী সঙ্গে বিচ্ছেদের পর কলকাতায় চলে এসেছিল রাজকমল । তখন আমি হাংরি মকদ্দমার দরুন কলকাতায় ফ্যা-ফ্যা করছি । আমার ফ্যা-ফ্যা বৃত্তির সঙ্গে যোগ দিল রাজকমল । ও ছিল ফালগুনী রায়ের মতন । গাঁজা আর চরসের নেশা ওকে ধরে ফেলল । ফলে শরীর বেশ খারাপ হওয়া আরম্ভ হতে ফিরে গেল পাটনায় ।

Add caption

আমি হাইকোর্টে মকদ্দমা জিতে পাটনায় গিয়ে দেখি রাজকমল হাসপাতালে ভর্তি । ওর জন্যে পাটনা হাসপাতালের রাজেন্দ্র ওয়ার্ডে একটা আলাদা ঘর বরাদ্দ হয়েছিল । প্রতি সন্ধ্যায় তরুণ সাহিত্যিকদের আড্ডা হতো । টের পাওয়া যাচ্ছিল ওর শরীরের অবনতি হয়ে চলেছে । ও বলত সার্জেন বলেছে অপারেশান টেবিলে পেট চেরার পর পুরো হাসপাতাল গাঁজার ধোঁয়ায় ভরে যাবে ।

একদিন সবাই চলে যাবার পর রাজকমল আমায় বলল, পরের দিন সকালে আমি যেন ওকে এক প্যাকেট কনডোম দিয়ে যাই । বলল, একটি নার্স রাজি হয়েছে । একটু পরে একজন মালায়ালি নার্স এসে ওর মাথায় যখন হাত বোলানো আরম্ভ করল, রাজকমল বলল, এই যে এই মেয়েটিই রাজি হয়েছে । মেয়েটি আমার দিকে চেয়ে হাসল , জানাল যে, আপনি কাল সকালে দিয়ে যাবেন এক প্যাকেট কনডোম ।


পরের দিন সকালে গিয়ে দেখি ঘর ফাঁকা । খোঁজ নিয়ে জানতে পারলুম যে রাতেই মারা গেছে রাজকমল । ওর মরদেহ বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ওর প্রথম স্ত্রীর কাছে ।

মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০১৩

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডাইরি


খামচানো কালপৃষ্ঠা
গিন্সবার্গের লোগো ও গৌতমবুদ্ধের পদচিহ্ণ
মলয় রায়চৌধুরী


বিট আন্দোলনের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯৬৩ সালের এপ্রিল মাসে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন আমাদের পাটনার বাড়িতে । তার আগে তাঁর সঙ্গেআমার পরিচয় ছিল না । তিনি আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে চাইবাসায় দেখা করতে গিয়েছিলেন ১৯৬২ সালে দোল খেলার সময়ে । পাটনায়উনি এসেছিলেন বেনারসে থাকাকালীন, বোধগয়া হয়ে । বোধগয়াতে যাবার আগে পর্যন্ত তিনি হিন্দু ও মুসলমান সাধুসন্তদের সম্পর্কে বেশি আগ্রহান্বিত ছিলেন । বোধগয়ায় ধানখেতের ধারে দুটো ইঁটের ওপর বসে হাগবার ( তখনও জাপানিদের টাকা বোধগয়াকে ঝলমলে করেনি ) সময় তিনি টের পান যেএকটা ইঁট একটি বৌদ্ধবিহারের, খুদে-খুদে বুদ্ধমূর্তি ছিল তাতে । সেটি ধুয়ে পুঁছে রেখে নেন নিজের কাছে । এই ঘটনার পরেই তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতিআকৃষ্ট হন । এই পাথরটি কোনো বৌদ্ধবিহারে জমা না দেওয়ায়, এবং ভিখারি, বিকলাঙ্গ, কাঙালি, কুষ্ঠরোগিদের ফোটো তুলে সেই ফিল্মটি আমার বাবার ফোটোগ্রাফির দোকানে ডেভেলপ করতে দেয়ায়, বাবার সঙ্গে তাঁর তর্কাতর্কি হয়েছিল । বাবা ওনাকে বলেছিলেন যে বিদেশি কবিদের সঙ্গে ট্যুরিস্টদের কোনো তফাত নেই ; সবাই গরিব ইন্ডিয়াকে বিক্রির ধান্দায় থাকে । বিট আন্দোলনের গবেষক বিল মর্গান এবং অ্যালেন গিন্সবার্গ ট্রাস্টের সচিব বব রোজেনথাল ২০০৪ সালে যখন কলকাতায় আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, আমি ওনাদের এই ঘটনাটির কথা বলেছিলুম ।



ওনাদের দুজনকে আমি আরেকটি ব্যাপারের বিষয়ে বলেছিলুম । গিন্সবার্গের ইন্ডিয়ান জার্নালস বইটির শুরুতেই একটি ড্রইং আছে যা তিনি ভারত থেকে ফিরে গিয়ে প্রকাশিত তাঁর অন্যান্য গ্রন্হ, অ্যালবাম ও চিত্রপ্রদর্শনীর কার্ডেও ব্যবহার করতেন । বিল মর্গান ও বব রোজেনথালের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলুম যে অ্যালেনের কাগজপত্র থেকে ওনারা এই ড্রইংটির উৎস জানতে পারেননি । গিন্সবার্গ নিজেই স্পষ্ট ব্যাখ্যা করে যাননি । একটি ক্যাথলিক গোষ্ঠী ভেবেছিল যে ড্রইংটির সাহায্যে ভারতীয়রা সম্ভবত যিশুখ্রিস্টের ক্রুসকাঠ এঁকে থাকবে । তাদের গিন্সবার্গ একটা ভাসাভাসা জটিল বাক্য লিখেছিলেন যেটি পড়ে মনে হবে ড্রইংটির সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের সম্পর্ক আছে ।



ড্রইংটা হল এমন তিনটি মাছের যাদের দেহ আলাদা কিন্তু একটিই মাথা । এমনভাবে মাথাটি আঁকা যে তা একটি বৃত্তের মধ্যে ত্রিভূজের আকার পেয়েছে । তাদের মস্তিষ্ক যেহেতু একটি, তাদের চোখ আলাদা নয়, যদিও তিনটি মাছের কানকো আলাদা আলাদা । ড্রইংটা গিন্সবার্গ পেয়েছিলেন মোগল বাদশাহ আকবরের সমাধিক্ষেত্রে, যার প্রবেশপথের সিংদরোজার সামনে লাল পাথরের ওপর নকশাটা খোদাই করা দেখেছিলেন তিনি, এবং খাতায় টুকে নিয়েছিলেন । নকশাটা আকবরের সর্বধর্ম সমন্বয়ের দীন-এ-ইলাহি তত্বকে ব্যাখ্যা করে ; হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধরা হল তিনটি মাছের দেহ , এবং তাদের বক্তব্য যেহেতু একই, তাই তাদের একটিই মাথা । পাটনায় খুদাবক্শ লাইব্রেরিতে দীন-এ-ইলাহি গ্রন্হটির যে ক্যালিগ্রাফি-প্রতিলিপি ছিল তার প্রচ্ছদেও ড্রইংটি দেখেছিলেন গিন্সবার্গ ।


ভারত থেকে ফিরে গিয়ে বিল মর্গান আমাকে গিন্সবার্গের একটা প্রবন্ধসংগ্রহ পাঠিয়েছিলেন । তার ভূমিকায় বিল লিখেছেন যে ড্রইংটি হল গৌতম বুদ্ধের পদচিহ্ণ ! বিল যেহেতু একজন গিন্সবার্গ-বিশেষজ্ঞ, পরবর্তীকালে গিন্সবার্গ গবেষকরা সকলেই এই ড্রইংটিকে গৌতম বুদ্ধের পদচিহ্ণ বলে প্রচার করে চলেছেন । এই একই বক্তব্য ইনটারনেটেও পাওয়া যাবে ; অনেকে ড্রইংটিকে নানা রূপ দিয়েছেন , এমনকী পাথুরে রূপ । গৌতম বুদ্ধের পায়ের তলায় চাপা-পড়া তিনটি জীব, এরকম ধারণা মার্কিন বুদ্ধিজীবিরাই করতে পারেন ।


গিন্সবার্গ যদি বাঙালি কবি হতেন তাহলে বাঙালি আলোচকরা তাঁকে এই ড্রইংটির ভুল ব্যাখ্যার জন্য ছিঁড়ে ফালা-ফালা করে ফেলতেন ।

শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৩

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডায়রি

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডায়রি

খামচানো কালপৃষ্ঠা
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঠেলাগাড়িতে


দাদার অধিকাংশ সাহিত্যিক বন্ধুদের সঙ্গে আমার পরিচয় দাদা কলকাতায় সিটি কলেজে পড়ার সময় থেকেই হয়ে গিয়েছিল। অনেকেই আমাদের পাটনার বাড়িতে আসতেন । দাদার চাইবাসায় পোস্টিঙের সময়ে দল বেঁধে আসতেন বন্ধুরা । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় চাইবাসায় তাঁদের কাণ্ডকারখানা নিয়ে নিজেদের মতন করে উপন্যাস লিখেছেন --- একই ঘটনা নিয়ে ।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল বহু পরে । শ্যামল দাদার কলেজের বন্ধু ছিলেন না ।উনি কখনও পাটনা বা চাইবাসায় আসেননি । আসেননি বলে আক্ষেপ করতেন । বলতেন, অনেক গল্প লিখতে পারতাম । মিস করলাম সুযোগটা । শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল দাদার বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে । দাদা পাটনায় থাকতেন বলে ওই বিশাল বাড়িতে থাকার জন্য বন্ধুদের অনুরোধ করতেন । কেউ রাজি হতেন না । বলতেন, ওটা কলকাতার বাইরে । তখন বাঁশদ্রোণীতে এখনকার মতন এত বাড়িঘর তৈরি হয়নি । প্রায় ফাঁকা ছিল । দাদার বাড়ি থেকে উষা ফ্যান মোড় পর্যন্ত রিকশা পাওয়া যেত না । এখন অটো চলে । উষায় মেট্রো ট্রেন স্টেশন তৈরি হয়েছে ।



বাড়িটা ফাঁকা পড়েছিল বলে দুশ্চিন্তায় ছিলেন দাদা । শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় রাজি হয়ে গেলেন বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে থাকতে । তিনি একাকীত্ব খুঁজছিলেন, বিভিন্ন কারণে । প্রথমত সুনীল-সন্দীপনদের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে অবিরাম গল্প-উপন্যাস লেখার চাপ। দ্বিতীয়ত, তিনি প্রেমে পড়েছিলেন এবং সেকারণে পরিবার থেকে দূরে থাকতে চাইছিলেন । তৃতীয়ত, 'দারা শিকো' লেখার জন্য গবেষণা আর একাগ্রতার প্রয়োজন ছিল তাঁর ; কম বয়সী প্রেমিকাটি তাঁকে প্রচুর সাহায্য করতেন তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে ।

দাদার বাড়িতে যাঁরা গেছেন তাঁরাই জানেন সেখানে মশার দাপট কেমন । শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় যখন ছিলেন তখন মশারা শুকনো মৌরি গাছ থেকে মৌরির মতন ঝরে-ঝরে পড়ত । দাদার বাড়িতে ঢোকার মুখে আট বর্গ ফুটের যে বারান্দা আছে তার মাপের বিশাল মশারি তৈরি করিয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তার মধ্যে চেয়ার-টেবিল পেতে লেখালিখি করতেন । তাঁর সঙ্গে যাঁরা দেখা করতে আসতেন তাঁরাও বসতেনওই মশারির ভেতরে । দাদার বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কেই দেখেছি পাঁজি মেনে দশকর্ম করতে, পৈতে পরতে, হোমযজ্ঞ করতে । একবার গিয়ে দেখি দাদার ছোটো সফেদা গাছ কাটিয়ে তার কাঠ দিয়ে যজ্ঞে বসেছেন ।

আমার সঙ্গে উনি সাহিত্যের আলোচনা করতেন না । কিন্তু আমার 'ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস' উপন্যাসটা প্রকাশিত হবার পর সেটা পড়ে জানতে চাইলেন টাকা গোলমালের ঘটনাগুলো সত্যি নাকি আমার কলম আমাকে দিয়ে ঘটনাগুলো লিখিয়ে নিয়েছে । আমি জানিয়েছিলুম যে ওগুলো আমার প্রথম চাকরি থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা । শুনে উনি 'আজকাল' সংবাদপত্রের হয়ে চলে গেলেন ব্যাঙ্গালুরু, সংবাদটা ফলাও করে ছাপলে বেশ সাড়া ফেলে দেয়া যাবে অনুমান করে । যাবার পথে আমার সঙ্গে দেখা করতেএসেছিলেন লাল টকটকে টিশার্ট পরে । ফিরে এসে বললেন, "ধ্যুৎ, অনেক পুরানো ঘটনা , তুমি তো ওই চাকরি করতে পঁচিশ বছর আগে, খেয়াল ছিল না" । ফলে 'আজকাল' সংবাদপত্রে উনি লিখলেন, বিয়েতেউপহার দেবার জন্য 'ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস' একটি উৎকৃষ্ট উপন্যাস ।


আরকবার গেছি বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে । আমি মশারির ভেতরে বসে ওনার জন্য অপেক্ষা করলুম প্রায়আধ ঘন্টা । সিল্কের পাঞ্জাবি আর কোঁচানো ধুতি পরে, পারফিউম মেখে বেরিয়ে এলেন । বললেন, তাড়াআছে । বুঝলুম যে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন । বাড়ির বাইরে বেরিয়ে কোনো রিকশা পাওয়া গেল না । মাথার ওপর দুপুরের রোদ । কিছুক্ষণ পর একটা ভ্যান রিকশাকে দেখা গেল গলির মুখে, সিমেন্টের ধুলোয় অত্যন্ত নোংরা, সঙ্গে দুটো সিমেন্টের বস্তা । । শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তাকে বললেন মোড় পর্যন্ত আমাদের পৌঁছে দিতে । টের পেলুম, ইনিই আসল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, বেশিক্ষণআড়ালে থাকতে পারেন না । অমন জামাই-সুলভ সাজগোজ করে দিব্বি বসে পড়লেন গুঁড়ো-গুঁড়ো সিমেন্টের ওপর । আমাকেও বসতে হল ওনার পাশে । দেখলুম উঠে বসতে গিয়ে ওনার পা বেশ ছড়ে গেছে । রুমাল দিয়ে পুঁছে নিলেন ।

মোড়ে নেমে বললেন, চলো ওই দোকানটায় । আমি ভাবলুম কিছু-কেনাকাটা করার আছে । উনি কিছুই কিনলেন না । সামনে রাখা সৈন্ধ্যব লবণের চটের বস্তা থেকে এক চিমটি নুন নিয়ে বললেন, "কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে শুনেছ তো ? দেখতে চাই তার প্রকৃত অর্থটা কী " !

শনিবার, ২ মার্চ, ২০১৩

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডাইরি

খামচানো কালপৃষ্ঠা


কবি রাম বসুর দেয়া মহার্ঘ দু'আনা পুরস্কার

মলয় রায়চৌধুরী


ডায়রির এই এন্ট্রিটা লেখার জন্য গুগল ইমেজে কবি রাম বসুর ছবি খুঁজে পেলুম না । খটকা লাগায়, কৃষ্ণ ধর, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় খুঁজলুম, পেলুম না । কেমন যেন অপমানিত বোধ করলুম । এতকাল যাবত পশ্চিমবঙ্গের বাংলা অ্যাকাডেমি করছিলটা কী ? যতদূর জানি, এই কবিদের বলা হয় বামপন্হী মনোভাবাপন্ন । তাঁদের কবিতাতেও তাঁদের মনোজগত প্রতিফলিত । তার মানে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্হী সরকার এই কবিদেরওয়েবজগতে সংরক্ষণ করার কোনো ব্যবস্হাই করেনি । অথচ যারা, যাকে বলে ক্ষমতার অলিন্দ, সেখানে ঘুরঘুর করেছে, তারা আছে অনেকেই । 'দায়বদ্ধতা' শব্দটা নিয়ে কত কথা শুনেছি সেই সময়ে, সেই চল্লিশের দশকের আলোচকদের লেখায় । তারপর নকশাল আন্দোলনের সময়েও তাঁদের কবিতা থেকে রসদ খুঁজেছেন অ্যাক্টিভিস্টরা । অথচ কবিদের পাঠবস্তুতে দায়বদ্ধতা আছে কিনা তা যাচাই-পরখ করেই বিদ্যায়তনিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাধিকারীরা খালাস । খাদ্য আন্দোলনের সময়ে বড়ো দেবুদা ও ছোটো দেবুদা বহু ব্যানার ও মিছিল-তোরণে শ্রমিকদের ছবি এঁকে দিতেন, সেগুলোও হারিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে ।


রাম বসুর কথা তুললুম এইজন্য যে আমি যখন নাকতলায় থাকতুম, তখন হঠাৎই একদিন তাঁর টেলিফোন পাই । কোথা থেকে আমার নম্বর পেয়েছিলেন জানি না । তাঁর কন্ঠস্বরটিও, বার্ধক্যে যেমন হয়, কাঁপা-কাঁপা । আমার সঙ্গে তাঁর কখনও দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি । অগ্রজ যে কবিরা পাটনা, চাইবাসা, উত্তরপাড়া, আহিরিটোলাতে এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় দাদা সমীর রায়চৌধুরীর সূত্রে । তিনি জানালেন যে বাঁকুড়ার জনৈক কবি-সম্পাদক আমার একটি বই তাঁকে পড়তে দিয়েছিলেন আর সেই বইটি পড়ে তিনি আমাকে পুরস্কৃত করতে চান ; তিনি ওই কবি-সম্পাদকের মুখে শুনেছেন যে আমি কোনো পুরস্কার নিই না, তা সত্ত্বেও দিতে চান, আর আমাকে তা নিতেই হবে । রাম বসুর কথা শুনে টের পেলুম যে বাঁকুড়ার যে কবি-সম্পাদক আমার ফ্ল্যাটে এসে আমাকে এক হাজার টাকা দিয়ে ফ্ল্যাটেই অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন, তিনিই রাম বসুকে বলে থাকবেন । আমিওনাকে বললুম যে আমি সত্যিই কোনো সাহিত্য পুরস্কার নিই না, তা সে সরকারি, বেসরকারি, লিটল ম্যাগাজিন যারই পুরস্কার হোক না কেন । কেননা আমি চাইনা যে আমার মনোপরিসর অন্যের মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের দ্বারা দূষিত হোক । সেকারণে আমি কোনো সম্বর্ধনাও নিই না ।


রাম বসু বললেন যে উনি আমার বিষয়ে সেসব কথা শুনেছেন আর এত বয়স হওয়া সত্ত্বেও তিনিআমার পাঠক । কথা এগিয়ে নিয়ে যেতে বিব্রত বোধ করছিলুম, অনুমান করে থাকবেন উনি । বললেন, ওনার সংগ্রহে বহু পুরোনো একটি দুআনি আছে।সেইটেই তিনি আমাকে আমার 'ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস' উপন্যাসের জন্য পুরস্কার হিসেবে দিতে চান ।


শুক্রবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডাইরি


খামচানো কালপৃষ্ঠা
কী ভাবে যৌবন ফিরে পাওয়া যায়
মলয় রায়চৌধুরী



উত্তরপ্রদেশের নেপাল সীমান্তের, পাহাড়ি জঙ্গলঘেঁষা গ্রামগুলোয় ক্ষেত্রসমীক্ষা করতে গিয়েছিলুম, আমার সঙ্গে সহায়ক হিসেবে পশুচিকিৎসক অফিসার, তেলেগুভাষী, ডক্টর রাজাইয়া । ভারত সেবাশ্রম সংঘ আর কোনও একজন রাজনৈতিক নেতা কেন্দ্র সরকারকে অনুরোধ করেছিল এই ধরণের একটি ক্ষেত্রসমীক্ষা করাবার জন্য । আমাদের কাজ ছিল খাঁটি ভারতীয় গোরু বলে কিছু আর অবশিষ্ট আছে কি না তা খুঁজে বের করা । তাঁদের বক্তব্য ছিল যে সারা ভারতবর্ষ ছেয়ে গেছে সংকর জাতের গাইগোরুতে । ক্যালেন্ডারে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যে গোরুগুলো দেখতে পাওয়া যায়, সেগুলো নিউ জারসি বা হলস্টিন ফ্রিজিয়ান । বাজারের বিশ্বায়নের বহু আগে থাকতে গৃহপালিত জানোয়ারের বিশ্বায়ন হয়ে চলেছে । হায়দ্রাবাদের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যন্ড মলিকিউলার বায়লজি সংস্হার বিজ্ঞানীরা ভারতবর্ষের সবরকম গোরুর জিন মানচিত্র তৈরি করছিলেন সেসময়ে । তাঁরা জানতে চাইছিলেন কোন-কোন গোরু সবচে বেশি দুধ দেবে, মাংস দেবে আর খাটুনির বলদ দেবে । আমাদের অনুসন্ধান ছিল একেবারে আলাদা । গোমাতা নামে কি কোনও প্রাণী টিকে আছে, নাকি সবই হয়ে গেছে কাউমাম্মি ?

মুম্বাই থেকে বিমানে লখনউ, তারপর অ্যামবাসাডর গাড়িতে পিলিভিত, তারপর বনানীর ভেতর দিয়ে যতদূর জিপগাড়িতে বসে ঘন জঙ্গলের গ্রামগুলোয় ঢোকা যায় । শেষে মৈলানিতে ক্যাম্প করে সোনারিপু, ধনগড়হি, কৈলাটি, চন্দনচৌকি । বেশির ভাগ জায়গায় রাতে ফেরা অসম্ভব বলে কোনো ধনী পাঞ্জাবির বা গ্রামপ্রধানের অতিথি হয়ে থেকে যেতে হয়েছিল । নেপালের জঙ্গলঘেঁষা গ্রামগুলোয়, দেশভাগের পর, পাঞ্জাবি শিখ আর পূর্বপাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের সাড়ে সাত একর করে জমি দেয়া হয়েছিল । বাঙালি পরিবারদের জমি বন্টনের সময়ে লক্ষ্য রাখা হয়নি যে পরিবারটি চাষি কি না । পাঞ্জাবিরা যারা জমি পেয়েছিল তারা, গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটির হস্তক্ষেপে, সবাই চাষি পরিবারের । ফলে বাঙালিরা জমি হস্তান্তর করে দিনমজুরে রূপান্তরিত । সেসব কথা পরে আরেকদিন ।

দুসপ্তাহের ঘোরাঘুরিতে আমরা খুঁজে পেয়েছিলুম জংলি গোরুর পাল, স্হানীয় উত্তরখণ্ডীদের সাহায্যে, যাদের গ্রামগুলো আরও ওপরে । হ্যাঁ, জংলি । শহরাঞ্চলের গাধার মাপের ছোটো-ছোটো গোরু । জঙ্গলে শত্রুর সঙ্গে লড়ার জন্যে সামনেমুখো ছুঁচালো শিং । খুর একটু বড়ো যাতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ছুটে নামতে পারে । পাঞ্জাবি শিখরা গোটাকতককে ধরে দেখেছে এক-দেড় লিটারের বেশি দুধ দেয় না । বলদ বানিয়েও লাভ হয়নি ছোটোগতর বলে। খাবারের লোভ দেখিয়ে রাতের বেলায় পাঁচিল ঘেরা জায়গায় এক-একটা পালকে বন্দী করে বায়োগ্যাসের গোবর সংগ্রহ করে কেউ কেউ । তবে বিশুদ্ধ থাকতে পারবে কি না বলা যায় না। সমতল থেকে মারোয়াড়িদের ছাড়া ধর্মের ষাঁড় গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে উঠে এসেছে জঙ্গলে।


একদিন সকালে আমাদের ডাকতে এলেন বিডিও । বললেন, জলে ডুবে-মরা একটা বাঘের পোস্টমর্টেম করতে হবে, আর তার জন্য ডক্টর রাজাইয়াকে প্রয়োজন । জেলাসদর থেকে বন বিভাগ বা পশু বিভাগের পশুচিকিৎসক আসতে-আসতে দেড়-দুই দিন লেগে যাবে । জেলা শাসক বলেছেন ডক্টর রাজাইয়াকে দিয়ে করিয়া নিতে । আমরা গিয়ে দেখলুম, একটা বাঘিনী। স্হানীয় খালের দুধার সিমেন্ট বাঁধানো ; বাঘিনীটা জল খেতে গিয়ে পড়ে গিয়ে থাকবে । অনেক চেষ্টা করেও উঠতে পারেনি । জলে সাঁতরে কয়েকদিন টিকে ছিল । তারপর আর পারেনি ।

বাঘিনীটাকে, ডক্টর রাজাইয়ার নির্দেশমতো, চারজন লোক চার পা ধরে চিৎ করে শুইয়ে দিল। পাগুলো ধরে রইল পোস্টমর্টেমের সুবিধার জন্য । বুকের ওপর স্তনের সারি; রাজাইয়া বলল, দেখছেন তো, বাঘিনীও আমাদের সেক্স অ্যাপিল দিতে পারে। ( আমার 'অপ্রকাশিত ছোটগল্প' বইতে বাঘিনীর সঙ্গে সেক্স নিয়ে গল্প আছে ) । ক্রমশ ভিড় বাড়তে লাগল, স্হানীয় পাহাড়িদের ভিড় । তাদের সকলের হাতে পাত্র । বিডিও বলল, এরা বাঘের সবকিছু খায়, রক্তও । শুকিয়ে নেপালে পাচারও হয় । নেপাল থেকে চিনে । ভালো দাম পাবে ।

কাটাকুটি শুরু হতে, কুড়ি-পঁচিশ বছরের একজন পাহাড়ি যুবক আমাকে এসে বলল যে, হুজুর, আমাকে দুটো স্তনের বোঁটা দেবেন । সবাই আমাকেই খাতির করছে দেখে ভেবে থাকবে আমিই বাঘিনীর লাশের মালিক । আমার কোঁচকানো ভুরুর দিকে তাকিয়ে যুবকটি বলল, আমার একজন বউয়ের পঞ্চাশ বছর বয়স হল ; ওর মাহওয়ারি আর হয় না । ওদুটো খেলে আবার ওর বাচ্চা হবে , জোয়ান হয়ে উঠবে । বিডিওর দিকে তাকাতে, বিডিও বলল, স্যার স্হানীয়দের মধ্যে এখনও একাধিক স্বামী বা একাধিক স্ত্রীর প্রথা বজায় আছে ।


স্তম্ভিত বলতে যা বোঝায়, তাই হলুম । বাঘিনির মাইয়ের বোঁটা খেয়ে আবার মেন্সটুরেশান শুরু হবে, যৌবন ফিরবে !

শুক্রবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডাইরি

খামচানো কালপৃষ্ঠা
উজবুকের আছাড়
মলয় রায়চৌধুরী

রেড লাইট এলাকা কেমন হয় তা জানার ইচ্ছা থাকলেও, অনেকর পক্ষে, বিশেষ করে মহিলাদের, সেই এলাকাটি দেখার সুযোগ হয় না । নেদারল্যান্ডসের অ্যামস্টারডাম শহরে সেই অনুসন্ধিৎসা মেটাবার ব্যবস্হা ওই এলাকারই বাসিন্দারা করে দিয়েছেন । সে-উদ্দেশ্যে ১৯৯৪ সালে সংস্হাটি যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর নাম মারিসকা মাজুর, একদা এই এলাকারই যুবতী । পর্যটকেরা যাতে গাইডের সঙ্গে এলাকাটি ঘুরে-বেড়িয়ে দেখতে পারেন, যৎসামান্য ইউরোর বিনিময়ে, ডাচ-সরকার অনুমোদিত তেমন ভ্রমণবিলাস গড়ে উঠেছে ওই শহরের সুশোভিত অঞ্চলে । রেড লাইট এরিয়া শুনলেই যে নোংরা ঘিঞ্জি কুৎসিত ভয়াবহ ছবি ভেসে ওঠে ভারতীয়দের মনে, ওই অঞ্চলটি তেমন নয় । অঞ্চলটির অনুমোদন করেছিলেন নেপোলিয়ান, ফরাসি সৈনিকদের রাত কাটাবার জন্য । সেই সময় থেকেই এলাকাটি জুড়ে খুদে-খুদে ঘরের উদ্ভব । সুশোভিত হলেও ঘরগুলোর অধিকাংশ নারীর গল্প নিশ্চয়ই ভয়ংকর, কেননা পূর্ব ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকা থেকে তাদের ফুসলিয়ে বা উপড়েআনা হয়েছে । ঘরগুলো কেমনভাবে সাজানো তা জানার জন্য মারিসকা মাজুরের দপ্তর-সংলগ্ন একটি ঘর আছে, পর্যটকদের আগ্রহ মেটাবার জন্য ।



অ্যামস্টারডাম শহরের মাঝখানে পুরানো চার্চের কাছে বেশ কয়েকটি মনোরম খালে ঘেরা এই অঞ্চলটির নাম দ্য য়ালেঁ । নৌকোয় চেপে সারাদিন ঘুরে-ঘুরে শহরটাকে দেখা যায় । নেমে ভ্যান গঘ মিউজিয়াম বা রাইস মিউজিয়ামে রেঁমব্রাঁর বিখ্যাত 'নাইট ওয়াচ' বা অ্যানি ফ্র্যাংক যে ঘরে লুকিয়ে ডায়েরি লিখেছিলেন তা দেখতে যাওয়া যায় । যৌনতা সম্পর্কিত সবই আছে দ্য য়ালেঁ পাড়ায় । যৌনতার মিউজিয়াম, মিথুনরঙ্গের নাটক, যৌনতার উঁকি শো, মিথুনকর্মের ডিভিডি, যৌনসুখের ও যাতনার যাবতীয় জিনিসপত্র, এমনকী চাবুক-হাতকড়া-চেস্টিটি বেল্ট ইত্যাদি । আর আছে কফি শপ, যেখানে বসে গাঁজা ফোঁকা যায়, হরেক রকম গাঁজা । গাঁজাপাতারও মিউজিয়াম আছে ; এত রকমের যে গাঁজা হয় তা জানতুম না । যাঁরা র‍্যাঁবো পড়ে আবসাঁথ চেখে দেখতে চান তাঁদের জন্যআছে হালকা বা কড়া নানা নেশার সবুজ আবসাঁথ ।



খালপাড়ের রাস্তার ধারের ঘরগুলোয় সন্ধ্যা থেকে কাচের বিশাল শোকেসের অপরদিকে সেজে গুজে লাল আলো জ্বালিয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকেন প্রায় নগ্ন যুবতীরা । গাইড বলেছিলেন, বেশিরভাগ যুবতীকে তাদের প্রেমিকরা ফুসলিয়ে এনে মাফিয়াদের বেচে দিয়েছে । সমকামীদের আশ মেটাতে যুবকরাও আছেন এই বাজারে ; তাদের ঘরে জ্বলে নীলাভ আলো। যৌনসেবার সময়, আঙ্গিক ও দরদাম নির্ধারিত। কোনো-কোনো জানলায় অবশ্য আঙ্গিক-আদেখলা দরদস্তুরকারীদেরও দেখা মেলে । এলাকার বা কোনো জানালার ফোটো তোলা নিষেধ ; ফোটো তোলার চেষ্টা করলেই রক্ষীরা ক্যামেরা কেড়ে ফেলে দেবে খালের ঝিলিমিলি জলে, সাঁতার কাটতে-থাকা রাজহাঁসেদের মাঝে । সিসিটিভি লাগানো আছে লক্ষ্য রাখার জন্য । সন্ধ্যাবেলায় দর্শনার্থী পর্যটকদের ভিড়ই বেশি । যারা সেবা কিনতে আসে তারা একটু রাত হলে দেখা দেয় । ফল কেনার আগে যেন পুরো বাজারটা দেখে নিচ্ছে একবার, কার কাছে আপেল ভালো, কার কাছে তরমুজ ভালো, কার কাছে কমলালেবু !



আমাদের দলের সামনেই ওপরে তাকাতে-তাকাতে এক মধ্যবয়সী লোক পড়ল, প্রায় মুখ থুবড়ে বলা চলে । আমাদের গাইড তাকে টেনে তুলে পথের ওপর পাতা একটা ব্রোঞ্জ রিলিফের দিকে নির্দেশ করলেন । দেখলুম সেটা একটা ভাস্কর্য । নারীর স্তনের কাছে স্পর্শসুখের উদ্দেশ্যে এগোনো হাত । গাইড বললেন, রিলিফটির ভাস্কর এটা লুকিয়ে বসিয়ে গিয়েছিলেন, যাতে বিপথগামীরা হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়ে ; সম্প্রতি জানা গেছে তাঁর নাম রব হজসন ।

সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১২

অপ্রকাশিত ডাইরি - মলয় রায়চৌধুরী

খামচানো কালপৃষ্ঠা


ফোরটিন গ্রিনস
মলয় রায়চৌধুরী





ইনারবিট মলের ফুড কোর্টে বসে অপেক্ষা করছিলুম এক দম্পতির, যাঁরা তাঁদের বিবাহবার্ষিকীউদযাপন করার জন্য আমাদের কয়েকজনকে মেইনল্যান্ড চায়নায় ডিনার করাবেন । নিমন্ত্রিতরা সবাই এসে পৌঁছোয়নি বলে গ্যাঁজাচ্ছি । একজন অচেনা সুশ্রী যুবতী এগিয়ে এলেন ; ভাবলুম তিনিও নিমন্ত্রিত । কিন্তু তিনি আমার কাছে এসে একটা লাল রঙের বই খুলে বললেন, ইংরেজিতেই বললেন,--- এই ধরণের মলে ঢুকলে সকলেই দেখি মাতৃভাষা ভুলে যায়---"স্যার, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছেআপনি বাঙালি ; কাইন্ডলি বলুন এই গ্রিনগুলোর ইংরেজি কী? এখানের ভেজি-মার্কেটে কেউ বলতে পারল না ; পাওয়াও যাচ্ছে না কোথাও , আমি ক্রফোর্ড মার্কেটে খোঁজ করেছিলাম, ওরা বলল যেইনঅরবিট মলে পাবো ।"

আমি বললুম, এটা তো বাংলা পাঁজি ? পাঁজি কোথায় পেলে ? ইনঅরবিট মলে পাঁজিও পাওয়া যায় নাকি ?

যুবতী বললে, "না স্যার, ঠাকুর ভিলেজের মাছের দোকান থেকে কিনেছি ।"

ঠাকুর ভিলেজ জানি, গ্রাম নয়, উচ্চবিত্তদের এলাকা । নিউ ইয়র্কের গ্রিনিচ ভিলেজ যেমন গ্রাম নয় ।

--মাছের দোকানে পাঁজি ? এই চালুনিও সেখান থেকে কিনেছ ? আজকাল তো আটা চালার ব্যাপারটা উঠেই গেছে ।

--হ্যাঁ স্যার । কয়েকটি মুসলমান ছেলে মেদিনীপুর থেকে এসে মাছের দোকান খুলেছে, তারা বাঙালির প্রয়োজনের সব জিনিস বিক্রি করে ।

মেয়েটিকে দেখে অবাঙালি মনে হচ্ছিল । যদিও সব যুবতীই আজকাল জিনস আর টপ পরে বেরোন । দুহাতে মেহেন্দি আঁকা । এক হাতে দামি ব্যাগ আর একটা চালুনি, অন্য হাতে পাঁজি । দামি পারফিউম লাগিয়ে থাকবে ।

বললুম, তুমি বাঙলা পড়তে পারো না ?

মেয়েটি বসল পাশের চেয়ারে । ব্যাগ আর চালুনি রাখল টেবিলের ওপর । পাঁজিটা মেলে ধরল । বলল, আমি কানপুরের মেয়ে, আমার হাজব্যাণ্ড বাঙালি । চালুনি কিনেছি করওয়া চৌথ অনুষ্ঠানের জন্য, প্লাসটিকের ইউটেনসিলের দোকান থেকে । আর এই রেড বুকে লেখা ফোরটিন গ্রিনস কিনতে বেরিয়েছি আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ির জন্য, সেই সকাল থেকে বেরিয়েছি । আমায় কিনতেই হবে, এটাআমার বিয়ের প্রথম বছর; ওনাদের ইমপ্রেস করার জন্য আমি এই ফোরটিন গ্রিনস যোগাড় করবই ।

"পাঁজিতে ফোরটিন গ্রিনস আবার কী জিনিস ?" জানতে চাইলেন আমার একদা এক সহকর্মীর স্ত্রী । সহকর্মীও অবসর নিয়েছেন । পাঁজিটা নিয়ে তিনি পাতা ওলটাতে-ওলটাতে বললেন, কতোকাল পরেবেণিমাধব শীলের পাঁজি দেখছি, বেশ নসটালজিক লাগে ।

সবায়ের নসটালজিক হাত ঘুরে পাঁজিটা আবার আমার কাছে এলো ; আমার চুলে বেশি পাক ধরেছে বলে সম্ভবত ।

মেয়েটি যে পাতাটায় পেজ মার্ক দিয়ে রেখেছে, সেখানে ফোরটিন গ্রিনসগুলো হলুদ রঙে হাইলাইট করা ।

সবাইকে পড়ে শোনালুম ফোরটিন গ্রিনসের নামগুলো, যদি কেউ কোনো হদিশ দিতে পারে । ভুত চতুর্দশীতে খাবার জন্য চোদ্দ শাক : ওলপাতা, কেঁউ, বেতো, সরিষা, কলকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা আর সুষণী ।

শুনে, সকলের মুখের মুচকি হাসিতে যুবতীটি বিব্রত বোধ করলে, আমার স্ত্রী মেয়েটির থুতনি ধরেআদর করে বলল, "এই ফোরটিন গ্রিনসের তিনচারটি ছাড়া মুম্বাই কেন তুমি কলকাতার বাজারেও পাবে না । তোমার শ্বশুর-শ্বাশুড়িও এই গ্রিনসের সব কয়টি দেখেছেন বলে মনে হয় না । আমরা কলকাতায় বহুদিন ছিলুম, চোদ্দশাক বাজারে বিক্রি হয় ভুতচতুর্দশীতে, কলমি, পুঁই, পালঙ, নটে, লাউ, কুমড়োশাক কুচোনো, তারসাথে হয়তো দুচারটে নিম আর সুষণী পাতা । উত্তরপাড়ার বাজারেআমার গোঁড়া শ্বশুরমশায়ও খুঁজে পাননি কখনও । আমি তো এই প্রথম শুনছি শাকের নামগুলো ।আমার শ্বাশুড়িও ভুতচতুর্দশী করতেন, ফোরটিন গ্রিনস দিয়ে নয়, দুতিনরকম শাকের চোদ্দ টুকরো । যা শাক পাও কিনে শ্রেডিং করে নাও, ব্যাস, ইয়োর ইনলজ উইল বি হ্যাপি ।"

আমার সহকর্মীর স্ত্রী, এক সময় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন, বললেন, রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দেও বোধহয় এই গাছাগাছালির নাম নেই ।

আমি ভাবছিলুম, ভুতচতুর্দশিতে যে এই শাকগুলো খেতে হয় তা-ই তো জানতুম না ।

বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১২

অপ্রকাশিত ডাইরি - মলয় রায়চৌধুরী

আলুর গৌরচন্দ্রিকা
মলয় রায়চৌধুরী




১৯৬৪ সালে ঠাকুমা ৯৪ বছর বয়সে মারা যাবার পর, আমাদের উত্তরপাড়ার বসতবাটী 'সাবর্ণ ভিলা' খন্ডহরে পরিণত হয়েছিল । কিন্তু কলকাতায় রাতে কোথাও আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না বলে ওই খন্ডহরেই রাতটা কাটাতে হতো । ঠাকুমা একা কী করে ওই বারো ঘরের বিশাল খন্ডহরে থাকতেন জানি না ; উনি পাটনায় আমাদের কাছেও যেতে চাইতেন না, বলতেন যে পাটনার বাড়িতে উনি হাঁপিয়ে ওঠেন ; গাছপালা নেই, খোলা আকাশ নেই, কুয়োতলা নেই, বাংলায় গল্প করার জন্য বুড়িদের জমায়েত নেই । ষাটের দশকে যখন আমার বিরুদ্ধে মামলা শুরু হল, আমি ওই খন্ডহরেই আদালত থেকে ফিরে যেতুম রাতটা কাটাবার জন্যে । ঠাকুমা থাকতে ওনার হবিষ্য খেয়ে চলে যেত । উনি মারা যাবার পর খাওয়াটা সমস্যা হয়ে দেখা দিল । সমস্যাটা আরও জটিল হয়ে উঠত কলকাতার বাইরে থেকে আমার বন্ধুবান্ধবরা আসলে । কলকাতায় তাঁদের আস্তানা নেই । অনেকে খন্ডহরটাই পছন্দ করত প্রধানত যা ইচ্ছা তাই করার বা ফোঁকার বা পান করার স্বাধীনতার জন্যে । ত্রিদিব মিত্রের বাড়ি ছিল হাওড়ার সালকিয়ায় ; তবু ও মাঝে-মধ্যে উত্তরপাড়ার খন্ডহরে থাকতে চলে আসত আমার সঙ্গে । ঠাকুমা মারা যাবার পর বাড়ির সিংদরজার পাল্লা দুটো আর দুটো পায়খানারই কপাট চুরি হয়ে গিয়েছিল । বন্ধুবান্ধবদের বলে দিতে হয়েছিল যে পায়খানায় গেলে সামনেই মগ রেখে দিতে, যাতে জানা যায় যে কেউ একজন ভেতরে বসে ধ্যান করছেন । আমি পাটনামুখো হলে ওরা পাটনাতেও চলে আসতো ।


একবার অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, যারা আমাদের আন্দোলনের পোস্টার প্রচ্ছদ ইত্যাদির ড্রইং এঁকে দিত, ওরা এসে পৌঁছল খন্ডহরে । আমরা তিনজনে ওই বাড়িতে একত্রিত হয়েছি দেখে ত্রিদিবও পৌঁছে গেল । একেবারে খন্ডহর গুলজার । সকালে মুড়ি কাঁচালঙ্কা খেয়ে-খেয়ে কয়েকদিনে চোঁয়াঢেঁকুর আরম্ভ হলে ত্রিদিব আইডিয়া দিল যাওয়া যাক গৌরকিশোর ঘোষের বাড়ি, সকাল-সকাল । গৌরকিশোর ঘোষ থাকতেন বরানগরে । খেয়াঘাটের কাছে আমাদের বসতবাটী থেকে হন্টন দিয়ে বালিখাল, তারপর সেখান থেকে বাস ধরে বরানগর । বালিখাল ধেকে শ্যামবাজার যেত বাসগুলো । সকালের ব্রেকফাস্টটা গৌরকিশোর ঘোষের বাসায় সারা যাবে । তখন বালিখালের ফ্লাইওভারটা তৈরি হয়নি ।


সেসময়ে 'দর্পণ' নামে একটা ব্রডসাইড পত্রিকা প্রকাশিত হতো । তাতে আমাদের সম্পর্কে 'বিদেশি সাহিত্যের নকল' ধরণের টিটকিরি মেরে খবর বেরোত । প্রায় প্রতি সংখ্যাতেই বেরোত কিছু-না-কিছু । ঠাট্টা করে কার্টুনও বেরিয়েছিল কয়েকবার । কার মগজ থেকে ওই মন্তব্যগুলো বেরোচ্ছে তা জানার জন্য আমি, দেবী রায়, সুবিমল বসাক আর ত্রিদিব মিত্র ঢুঁ মেরেছিলুম 'দর্পণ' দপতরে । গিয়ে পাওয়া গেল না কাউকে । ফতুয়া-লুঙ্গি পরা একজন পাকাচুল ম্যানেজার ছিলেন যিনি অফিস সামলাতেন । তাঁকে আমাদের কয়েকটা বুলেটিন দিলুম সম্পাদকদের পড়তে দেবার জন্য । তাঁর কাছ থেকে জানতে পারলুম যে কাগজটা শুরু করেছেন যুগান্তর পত্রিকার অমিতাভ চৌধুরী আর আনন্দবাজার পত্রিকার গৌরকিশোর ঘোষ । ওনারা দুজনেই খবর পেলেন যে আমরা দলবেঁধে ঢুঁ মেরেছিলুম । অমিতাভ চৌধুরী, বুলেটিনগুলো পড়ে আমরা কী করতে চাইছি অনুমান করলেন, আর পর-পর দুটি সংখ্যা 'দৈনিক যুগান্তরে' সম্পাদকীয় লেখালেন ; আমাদের সমর্থন করেই বলা যায় । সম্পাদকীয় দুটো লিখেছিলেন কবি কৃষ্ণ ধর । আনন্দবাজারে আমাদের সমর্থনে লেখার প্রশ্নই ওঠেনা । অবশ্য 'দেশ' পত্রিকায় জ্যোতির্ময় দত্ত একটা দীর্ঘ তাচ্ছল্য-গদ্য লিখেছিলেন, 'বাংরিজি সাহিত্যে ক্ষুধিত বংশ' শিরোনামে , তাতেও সেই একই বক্তব্য, বিদেশি প্রভাব । জ্যোতির্ময় দত্ত এখন আমেরিকায় থাকেন । সম্প্রতি দিল্লির অরুণ চক্রবর্তী আমেরিকা গিয়ে জ্যোতির্ময় দত্তের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জ্যোতির্ময় অরুণকে জানিয়েছেন যে 'হাংরি আন্দোলনই বাংলা সাহিত্যের একমাত্র আন্দোলন' । মন্দ লাগেনি শুনে !


আসল প্রসঙ্গে ফিরি । গৌরকিশোর ঘোষ আমাকে ওনার বাসায় ডেকে পাঠালেন, সকালে একসঙ্গে রাধাবল্লভি আর আলুর দম খাবার নিমন্ত্রণ জানিয়ে । ওনার বাড়ির কাছে কোনো মিষ্টির দোকানে সকালে লাইন লাগে ওই কম্বিনেশান খাবার জন্যে । সেই সূত্রেই অনিল, করুণা, ত্রিদিবকে নিয়ে ওনার বাসায় ব্রেকফাস্টটা সেরে ফেলবার উদ্দেশ্যে রওনা দিলুম । চারজন পৌঁছে গেছি দেখে উনি চ্যাঁচারি ভরা রাধাবল্লভি আর হাঁড়িভর্তি আলুর দম আনালেন । খেতে-খেতে তর্কাতর্কি শুরু হল । গৌরকিশোর ঘোষ শুরু করলেন ওয়াল্ট হুইটম্যান-এর লিভস অব গ্রাস দিয়ে । ত্রিদিব জীবনানন্দে ইয়েটস, বাংলা কবিতায় সনেটের আঙ্গিক, ছোটগল্পের জন্ম ইত্যাদি প্রসঙ্গ তুলল । অনিল-করুণা রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকায় ফরাসি প্রভাব নিয়ে তর্ক জুড়লো । গৌরকিশোর ঘোষ আমাদের নাটকে 'থিয়েটার অব দি অ্যাবসার্ড'-এর কথা তুললেন । আমি কারোর পক্ষই সমর্থন করছিলুম না । একজন কোনো কথা বললেই, আমি শুধু আলুর দমের প্রসংশা করছিলুম । কী দারুন স্বাদ, এত বড়-বড় কেটেও কত নরম, ভেজে করে না সিদ্ধ করে করে, জ্যোতি না চন্দ্রমুখি, রাধাবল্লভির সঙ্গে রাজযোটক কম্বিনেশান ইত্যাদি বলে যাচ্ছিলুম । সাহিত্য নিয়ে একটি কথাও নয় । রাধাবল্লভি আর আলুর দম খাওয়াবেন শুনে আমি তর্কটার জন্যে তৈরি হয়েই এসেছিলুম ।


গৌরকিশোর ঘোষ, আমার দিকে তাকালেন , মিটিমিটি হাসি সহযোগে বললেন, ও, বুঝেছি, রূপদর্শীকে গুলগল্পের টেক্কা দিচ্ছ ! গৌরকিশোর ঘোষ রূপদর্শী ছদ্মনামে লিখতেন আর তাঁর সেই লেখাগুলোকে বলতেন গুলগল্প ।


আমি বললুম, হ্যাঁ দাদা, আলু জিনিসটা আমাদের দেশের নয় । আমাদের দেশে আসেওনি বেশিদিন হল । এই কন্দমূলটি পোর্তুগিজরা প্রথম জাহাঙ্গিরের দরবারে উপহার দিয়েছিল । স্পেন যখন ইনকাদের হারিয়ে তাদের দেশটাকে দখল করল তখন তারা লাল আলু নিয়ে গেল ইউরোপে । ইউরোপ থেকে লাল আলু এলো আমাদের দেশে । পর্তুগিজরা পেরু বলিভিয়া থেকে শাদা আলুর প্রচলন করেছিল উপনিবেশগুলোয় । আমাদের দেশে ওয়ারেন হেস্টিংস আলুচাষের ব্যবস্হা করেন । প্রথমে দেহরাদুনে চাষ হতো ; তাই তাকে বলি নইনিতাল আলু ; সেই আলুরই জাতভাই হল চন্দ্রমুখি ।


গৌরকিশোর ঘোষ পিঠ চাপড়ে বললেন, 'মক্কেল দেখছি ব্রিফ তৈরি করেই কেস লড়তে এসেছে । ঠিক আছে, পুরোদস্তুর নেমন্তন্ন রইল, পরের বার ফুল কোর্স লাঞ্চ খাওয়াবো ।'
আমার আর যাওয়া হয়নি । পঁয়ত্রিশ মাস ধরে কেস লড়তেই কালঘাম ছুটে গিয়েছিল । 



নিজের সঙ্গে নিজে - পিয়াস মজিদ

কবিতাজীবনী-২
পিয়াস মজিদ


সৌন্দর্যসমস্ত এবং কুৎসিতের মাঝে সমভাবে ক্রিয়শীল অলঙ্কারশাস্ত্র; এর জারকরসেই সবকিছু প্রাণ পায়। বহতা সমুদ্রের গভীরে আছে অলঙ্কারজ্ঞান, সুউঁচু পর্বতের শিরদাড়াঁয় অলঙ্কারজিজ্ঞাসা জাজ্বল্য, শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যও অলঙ্কারবহুল। নিবিড় নীলিমা, সীতার পাতাল ইত্যাকার সবাই এক গূঢ় অলঙ্কারের নির্মাণমাত্র। আমার ভাবনায় নভোম-লের যাবতীয় সৃষ্টির অমোঘ সূত্র অলঙ্কারশাস্ত্র। কবিতা যদি প্রাচীন কলা হয়ে থাকে তবে অবশ্যই তার অলঙ্কারও প্রাচীনতম। অলঙ্কারের পরিস্রুতিতে কবিতার শরীরকাঠামো এবং আত্মা উভয়ই নির্মিত হয়। প্রাচীনকালে প্রকৃতির সঙ্গে কবি তথা মানুষের সম্পৃক্ততা এত ব্যাপকমাত্রার ছিল যে কাব্যালঙ্কারেও তার ছাপ দেখতে পাই। বিশেষত কৌম সমাজে কবিতা-পাঠের যে সংস্কৃতি তাতে জনমানুষের সঙ্গে যোগাযোগযোগ্য পদ্ধতিতে কবিতার সাজসজ্জার প্রচলন স্বাভাবিক। ধ্বনিবাহুল্যের কথাও এ প্রসঙ্গে প্রধানত উল্লেখ্য। আর চিত্রকল্প। সে কিভাবে কবিতার অন্তর্বয়ব ও বহির্দেশ তৈরি করে? বস্তুভিত্তির সঙ্গে দূরকল্পনার সংযোগ এমন সব চিত্রমালাকে দৃষ্টিসম্ভব করে তোলে যা একভাবে হয়তো খুব স্বাভাবিক, অন্যভাবে হয়তো অভাবিতপূর্ণ। এর আলিঙ্গন ও প্রহারে কবিতার প্রকৃত মুক্তি শুরু হতে থাকে। বাক্যের বন্ধন থেকে তার যাত্রা হয় অপার রহস্যালোকে। যে রহস্যই কবি এবং কবিতাপাঠকের অন্বিষ্ট। চিত্রকল্পের মৌলকাজ মনে হয় এমনই।
আমার নিজের কবিতার সূত্রে বলতে পারি যে কাব্যভাষাকে তার খটখটে, রুঠা ও নীরস অবস্থান থেকে দূরে সরিয়ে নেয় চিত্রকল্প। লাবণ্যের আদিখনি ওর কাছেই। সে ডাকে। কিন্তু আমার কবিতা কি তার ডাকে যথাযথ সাড়া দিতে পারে? কারণ কবিতায় বলার কথা প্রায়শই এত ক্লিশে হয় যে চিত্রকল্পের অনন্যতা বহনে সে হয় অক্ষম। আর তখনই জন্ম নেয় রাশি রাশি অকবিতার। তাই আমার কবিতার উদ্দিষ্ট কথাকে অর্থের সীমাবদ্ধ ঘেরাটোপ হতে ছিন্ন করে চিত্রকল্পের দূরগামিতার সাথে তার সংহতি প্রতিষ্ঠা। তবে সাথে সাথে এও মনে করি যে সংবেদন-প্রধান কবিতাও যেমন দূর্বল চিত্রকল্পের জন্যে মৃতবৃৎ মনে হয় তেমনি অনেক সময় চরম বক্তব্যবহুল কবিতাতেও প্রকৃত চিত্রকল্পের বিভা তাকে উত্তীর্ণ কবিতা হিসেবে প্রতিভাত করে। তাই চিত্রকল্পের ধরন তাৎপর্যবাহী। সামান্য একটি চিত্রকল্পের নির্মাণে ভূমিকা রাখে ভৌগোলিক বাস্তবতা, সমাজ-দেশগত অভিজ্ঞান, সময়ের তাপ ও শৈত্য ইত্যাদি অজস্র প্রপঞ্চ। কবিতার চিত্রকল্প অলৌকিক নয়, লৌকিক। কবির অশ্রু, রক্ত, প্রলাপ, হাহাকার, শক্তি, ক্ষয়, শান্তি ও নৈরাজ্য যেমন চিত্রকল্পের গাঠনিক উপাদান তেমনি চতুপার্শ্বের পঞ্চভূত, যাবতীয় রৌদ্র ও মেঘ, জনতা ও নির্জন সব-ই চিত্রকল্পের উদ্গাতা।
কবিতায় এমন এক চিত্রকল্পের সন্ধান করি যা স্বাভাবিক এবং একই সঙ্গে অদৃষ্টপূর্ব। যাতে মানবিক লিপ্ততার সাথে আছে অতিপ্রকৃতিক উদ্ভাবনা। কোন এক শক্তির পুরোহিত কাজ করে প্রত্যেক কবির অন্তরে; নিরন্তর। চিত্রকল্প সেই ঘুমন্ত পুরোহিতকে জাগায়। সকল ব্যাকরণ ফুরিয়ে গেলে সে পুরোহিত জ্বালিয়ে দেয় ভৌততম রসের ধারা।
এভাবে চিত্রকল্প, এভাবে কবিতা।

শনিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১২

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডাইরি

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডাইরি
খামচানো কালপৃষ্ঠা

শ্যাল আই ?

মালিশ কথাটা শুনলেই আমার মনে পড়ে যায় 'প্যায়াসা' ফিল্মে জনি ওয়াকারের অভিনয় ও মোহম্মদ রফির গান, 'সর যো তেরা চকরায়ে' । ছোটো শহরগুলোয় এখনও মালিশওয়ালাদের দেখতে পাওয়া যায়, হাতে তেলের শিশি নিয়ে 'চম্পি'র খদ্দেরের খোঁজে । কলকাতায় ময়দানেও দেখেছি বছর দশেক আগে ; এখনও আছে কিনা জানি না । এই জনিওয়াকারি মালিশ সনাতন ভারতের নাকি আরবদেশ থেকে এসেছিল ? বোধহয় সনাতন ভারতেরই আরামখোরদের আবিষ্কার । কেননা জনিওয়াকারি মালিশ তো তেল ছাড়া হবে না । কেরালাতেও আজকাল আয়ুর্বেদিক ম্যাসাজ করাতে বিদেশ থেকে ট্যুরিস্টরা আসেন । তাতেও তেল লাগে । হয়ত আদি শঙ্করাচার্য এত বেশি হাঁটাচলা করতেন যে তিনিই তেল-মালিশ ব্যাপারটার জন্মদাতা । তবে মালিশ আর ম্যাসাজ শব্দ দুটি একই ধরণের কাজ বা কুকাজের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে দেখে মনে হল যে ম্যাসাজ প্রক্রিয়াটার অন্য নাম থাকা দরকার ছিল । ভারতের উত্তরউদারনীতি আক্রান্ত শহরগুলোয় স্পা দেখা দিয়েছে , যেখানে নানারকম আরাম বিক্রি করা হয় নারী বা পুরুষ শরীরের জন্যে । এয়ারপোর্টগুলোয় দেখেছি পা টেপানোর স্পা রয়েছে, যাত্রীরা এদেশ-সেদেশ করার ফাঁকে পা টিপিয়ে নেন । ওগুলো হল পাশ্চাত্য কায়দার 'স্কুপিং' পদ্ধতির ডলারি মালিশ , যত আড়ম্বর তত আরামদায়ক সেবা পাওয়া যায় না ।


যুবক কবি-লেখকরা যদি বিদেশে যেতে চান, বিদেশে যেতে হলে, আমার মনে হয়, কম বয়সেই যাওয়া ভালো । আরও ভালো অবিবাহিত থাকার সময়ে যাওয়া । কেননা যত পারা যায় অভিজ্ঞতা এই সময়েই যোগাড় করে নিলে তা পরে ম্যাজিক-বাস্তব জগত গড়তে কাজে দেবে । যুবাবস্হায় আমার পকেটে খুচরোও থাকত না ; রোজগেরে হবার পর বিদেশগুলোয় যখন গেছি তখন, মগজ চাঙ্গা থাকলেও, মাংসের তাপ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে । অত হাঁটতে পারি না ; সিঁড়ি চড়তে পারি না ; সবরকম মাংস খেয়ে হজম করতে পারি না ; পেগের পর পেগ মদ, জাগের পর জাগ বিয়ার খেতে পারি না ; ইচ্ছানুযায়ী মাদকসেবন করতে পারি না । আর নারীসঙ্গের কথা তো বাদই দিতে হয় ।

ম্যাসাজের প্রসঙ্গ এলে থাইল্যান্ডের 'নুয়াড বো রান' পদ্ধতির কথা বলতেই হবে । থাইল্যাণ্ডের ম্যাসাজ একটি প্রধান রোজগারস্রোত হয়ে উঠেছে সে-দেশটায় । ম্যাসাজ শেখাবার সংস্হা আছে, বিশেষজ্ঞ আছেন । আমেরিকানরা ভিয়েতনামে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমোদ-প্রমোদের জন্যে আশেপাশের দেশে যাওয়া আরম্ভ করলে থাইল্যান্ডের পাট্টায়ায় নারীসঙ্গ, ম্যাসাজ আর ভোজন তাদের কাছে ডলার খরচের প্রয়োজনীয় ভোগপথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে । পাট্টায়া ছাড়াও অন্যান্য জায়গায় গো-গো বার গজিয়ে ওঠে । গো-গো বারে গিয়ে কোনও তরুণীকে পছন্দ হলে তাকে সেই রাতের জন্য বা বহু রাতের জন্য সঙ্গিনী করে নেয়া যায়, বার-মালিককে তরুণীটির অনুপস্হিতির জরিমানা দিয়ে । পাট্টায়া, ব্যাংকক ইত্যাদি শহরের হট জোনে কাঁচের দেয়ালের ওপাশে কেবল থং-পরা কচি-কচি তরুণীরা দাঁড়িয়ে থাকেন, রাতপ্রেমিকদের ডাকের আশায় । স্বাভাবিক যে থং পরে দাঁড়িয়ে যখন খদ্দেরের আশায় দাঁড়িয়ে আছে তখন তারা তো কেবল ম্যাসাজ করবে না, আরও অনেককিছু করবে ।
তার আগেও থাইল্যাণ্ডে পেশা হিসাবে মালিশ ব্যাপারটা থাকলেও, তার তেমন করকরে বাজার ছিল না । মালিশ থাইল্যাণ্ডে গিয়েছিল বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে । বৌদ্ধভিক্ষুদের পরিব্রজনে ক্লান্ত পা দুটিকে আবার চাঙ্গা করে তোলার জন্য ভারতেই আবির্ভাব হয়েছিল এই মালিশের, অর্থে এখন যাকে বলা হচ্ছে থাই মালিশ পদ্ধতি । গৌতম বুদ্ধের শিষ্য ও চিকিৎসক শিভাগা কোমারপাজ ( জীবক কুমারভট্ট ) হলেন থাই ম্যাসাজপদ্ধতিত জনক । ব্যাংককের ওয়াট ফো মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা আছে দেহের কোন-কোন জায়গায় হাত, কনুই, বাহু আর পা দিয়ে ম্যাসাজ করতে হবে । বৌদ্ধ ভিক্ষুণীদের বদলে ম্যাসাজ করেন থাই তরুণীরা ; অবশ্য তাঁরাও বৌদ্ধ । থাই ম্যাসাজ পদ্ধতিতে বিন্দু-নির্ভর চাপ, অ্যাকুপ্রেশার, পেশি-প্রসারণ আর সংকুচন করা হয় , তালে-তালে , হালকা সঙ্গীতের আবহে ।

থাইল্যান্ডে যখন এসেছি তখন থাই ম্যাসাজ না করিয়ে তো আর ফেরত যাওয়া যায় না, বিশেষ করে যখন শুনলুম যে আরথ্রাইটিস, বায়ুদোষ, মাইগ্রেন, পিঠব্যথা ইত্যাদি সারাবার-কমাবার জন্য অব্যর্থ । একবার ম্যাসাজ করালে দেহে ছয় মাস টানা এনার্জি থাকবে ! আমাদের দেশের মালিশের মতন সস্তা নয় কিন্তু থাই ম্যাসাজ । আমি দুই ঘণ্টার জন্য খরচ করেছিলুম দেড় হাজার টাকা ; এখন শুনি আরও বেশি দিতে হয় । প্রায়ান্ধকার সারি-সারি শীততাপনিয়ন্ত্রিত ঘর ; মাটিতে শাদা ধবধবে বিছানা পাতা । প্যান্ট ছেড়ে শাদা লুঙ্গি পরতে হল ; শার্ট ছেড়ে ঢোলা বুশশার্ট । কাকে দিয়ে ম্যাসাজ করাতে চাই তা বেছে নেয়া যায় ; তার কারণ , মানসিক আনন্দও চাই তো ! ম্যাসাজ আরম্ভ হল । যেমন যেমন নির্দেশ পাচ্ছিলুম, সেইমতো একবার উপুড় একবার এপাশ একবার ওপাশ করে-করে চলল ম্যাসাজ । বেশ আরামদায়ক , কোনো সন্দেহ নেই । পায়ের পাতা থেকে একজন তরুণীর দুটি হাত একটু-একটু করে ওপর দিকে উড়তে লাগল, বহুক্ষণ ধরে । ঘুমিয়েই পড়েছিলুম বলা যায় ।
হঠাৎ তন্দ্রা ছুটে গেল । আমার কুঁচকির কাছে অর্ধচন্দ্রাকারে হাত দুটি এনে মেয়েটি জিজ্ঞাসা করল, "শ্যাল আই?"

বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১২

মলয় রায়চৌধুরীর অপ্রকাশিত ডাইরি

খামচানো কালপৃষ্ঠা

ঘৃণিতের আহ্লাদ
মলয় রায়চৌধুরী


যখন লেখালিখি আরম্ভ করেছিলুম, তখন বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও লিখতুম । কিন্তু ইংরেজিতে লেখাগুলো কলম দিয়ে লেখার দরুণ ফেরত আসতো, এই সম্পাদকীয় বার্তা নিয়ে যে "দয়া করে আপনার রচনাটি টাইপ করে পাঠান ; টাইপ করার সময়ে খেয়াল রাখবেন দুই লাইনের মাঝে যেন স্পেস থাকে এবং বাঁদিকে এক-চতুর্থাংশ মার্জিন থাকে । " অনেক খুঁজে পেতে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড টাইপরাইটার কিনেছিলুম । টাইপ করাটা প্রথানুগতভাবে টাইপিংস্কুলে গিয়ে শিখিনি । এক আঙুল দিয়েই টাইপ করতুম । ১৯৬১ সালে যখন হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হলো তখন প্রথম দিকের বুলেটিনগুলো ইংরেজিতে বেরিয়েছিল । ওই টাইপরাইটারে এক আঙুল দিয়ে টাইপ করে প্রেসে ম্যাটার দিতুম । কলকাতা পুলিশ যখন আমায় গ্রেপ্তার করতে এসেছিল তখন তাদের সম্ভবতনির্দেশ দেয়া ছিল যে লেখালিখির সঙ্গে জড়িত যা হাতের কাছে পাবে সবই বাজেয়াপ্ত করে কলকাতায় নিয়ে আসবে । ইন্সপেক্টার মশায়, যিনি সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করছিলেন, তিনি বললেন, "এ শালা চোরের টানা মাল মনে হচ্ছে", এবং সেটিও, আরও কুড়িটি জিনিসের সঙ্গে নিয়ে নিলেন । প্রথম টাইপরাইটারটা গেল ।

দ্বিতীয় টাইপরাইটারটা আমেরিকা থেকে পাঠিয়েছিলেন 'সলটেড ফেদার্স' পত্রিকার সম্পাদক ডিক বাকেন । ওনাকে মামলার কাগজপত্র পাঠিয়েছিলুম আর তা থেকে উনি জেনেছিলেন যে আমার টাইপরাইটারটা গেছে । তাছাড়া ওনাদের লেখা পাঠাতে হচ্ছিল হাতে লিখে । মামলার পর বেশ কিছুকাল লেখালিখি করিনি । ডিক বাকেনের দেয়া টাইপরাইটারটা ব্যবহার না করার ফলে অকেজো হয়ে পড়েছিল । তারপর যখন পাটনা থেকে লখনউ চলে গেলুম তখন পাটনায় আমার জিনিসপত্র সব নয়ছয় হয়ে যায় । পাটনায় আর ফিরিনি । লখনউতে মা মারা যাবার পর যখন আবার লেখালিখি শুরু করলুম একটা পোর্টেবল রেমিংটন টাইপরাইটার কিনলুম । বাংলা লেখায় একাগ্র হবার কারণে এই টাইপরাইটারটিও পড়েপড়ে অকেজো হয়ে গিয়েছিল ।

লখনউ থেকে গেলুম মুম্বাই । সঙ্গে অকেজো টাইপরাইটারটিও । হঠাৎ একদিন একটা চিঠি পেলুম বাউলিং গ্রিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাওয়ার্ড ম্যাককর্ডের কাছ থেকে । উনি জানিয়েছেন যে আমেরিকার টমসন প্রেস ওদের আত্মজীবনী সিরিজে আমার আত্মজীবনী প্রকাশ করতে চায় ; এই আত্মজীবনীগুলো রাইটার্স ওয়র্কশপের ছাত্রদের পড়ানো হয় সেখানে । আবার টাইপরাইটারের প্রয়োজন দেখা দিলো । নাড়ানাড়ি করে দেখলুম যে জ্যাম হয়ে গেছে । তখন থাকতুম সান্টাক্রুজে । খোঁজ নিয়ে কোনো টাইপরাইটার মেকানিক পেলুম না । জুহু রোডে একটা কমপিউটার শেখার স্কুল ছিল ; সেসময়ে কমপিউটারে টাইপ করার জন্য অনেকে টাইপ করা অভ্যাস করতেন । সেই স্কুলে ঢুঁ মেরে জানতে পারলুম যে জুহুর সমুদ্রের ধারে গোয়ানিজ কলোনিতে একজন টাইপরাইটার মেকানিক থাকেন, তাঁর নাম ন্যাজারেথ ।

লখনউতে যখন পাটনা থেকে গিয়েছিলুম তখন সেখানের অকটোবরের শীত সামাল দিতে ফিকে সবুজ রঙের পাঠানি স্যুট বা আফগানি স্যুট করিয়েছিলুম । পাটনা অফিস যে কটা ফেয়ারওয়েল দিয়েছিল তাতে ওই স্যুট পিসটাও পেয়েছিলুম । আমার জামাকাপড়ের কোনোনিজস্ব স্টাইল নেই । বুশ শার্ট বা টি শার্টের সঙ্গে ফুলপ্যান্ট পরি । মুম্বাইতে যেটুকু ঠান্ডা পড়ে, গরম জামাকাপড় দরকার হয় না । তবে আমি শীতকাতুরে বলে জানুয়ারি মাসে আফগানি স্যুটটা পরতুম । লখনউতে দাড়ি রাখা আরম্ভ করেছিলুম । একগাল দাড়ি আর আফগানি স্যুটে লখনউতে বেশ নওয়াবি চালে হাঁটা-চলা করা যেত । অনেকেই আফগানি স্যুট পরতেন সেসময়ে । বাবরি মসজিদ কাণ্ড ঘটেনি তখন । মুম্বাইতেও পরা যেত আফগানি স্যুট, শিবসেনার সেনাবাহিনীর হাতে প্যাঁদানি খাবার ভয় ছিল না । অবশ্য অনেকে আফগানি স্যুট পরে কপালে একটা লাল টিকা এঁকে ঘুরে বেড়িয়েছে দাঙ্গার পরেও ।

ন্যাজারেথকে খুঁজে বের করতে গিয়েছিলুম আফগানি স্যুটটাপরেই । জুহু সেসময়ে এখনকার মতোন বৈভবশালীদের এলাকা হয়ে উঠেনি, এত নামিদামি হোটেল-রেস্তরাঁ আর হাইরাইজ হয়নি । সেসময়ে কিছু-কিছু বস্তিও ছিল । কয়েকটা বস্তিতে জিগ্যেস করে শেষে পৌঁছোলুম গোয়ানিজ বস্তিতে । তারপর সরু ঘিঞ্জি নোংরা গলির পাকে সেঁদিয়ে জিগ্যেস করে করে পাওয়া গেল ন্যাজারেথের চালাঘরটা । নামে গোয়ানিজ বস্তি হলেও পাড়াটায় যে নানা প্রদেশের আর ভাষার লোক থাকে তা বাসিন্দাদের দেখে টের পাচ্ছিলুম । ন্যাজারেথের চালাতে ঢুকেই বুঝতে পারলুম ঠিক জায়গাতেই এসেছি । ঘরের দেয়ালে কাঠের তাকের ওপর রাখা ছিল নানা কিসিমের টাইপরাইটার । ফ্রকপরা একজন মোটা কালচে গোয়ানিজ প্রৌঢ়া বেরিয়ে এলেন । ওনাকে আমার টাইপরাইটার সারাবার কথা বলতে, উনি জানালেন যে ন্যাজারেথ তো বেরিয়েছে, আমাকে অন্তত ঘন্টাখানেক বসতে হবে । ভাবলুম যে ন্যাজারেথ আসুন, সঙ্গেনিয়ে যাবো । তাড়াতাড়ি সারিয়ে টাইপ করে অন্তত প্রথম খসড়াটা পাঠিয়ে দিতে হবে ।

বসে-বসে হাই তুলছিলুম, কী-ই বা করি । সামনে বসে আছেন প্রৌঢ়াটি । ছোটোবেলায় ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছিলুম বলে ক্যাথলিকদের ঘর সাজানো দেখলেই খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তাঁদের আনুগত্য টের পাওয়া যায় । পর্তুগালের ক্যাথলিসিজমের ছাপ ঘরের দেয়াল জুড়ে । হঠাৎ সামনের বাড়িতে তারস্বরে গিটার আর ড্রাম বাজাবার আওয়াজ আসতে লাগল । মন্দ নয়, টাইমপাসের জন্যে ভালোই । বোকা চেহারা নিয়ে চুপচাপ এই প্রৌঢ়ার সামনে বসে থাকার চেয়ে বরং পাশ্চাত্য বাজনা শুনে সময় কাটাই । শুনছিলুম সেই দিকে তাকিয়ে ।

আচমকা প্রৌঢ়া বলে উঠলেন, "শুনছেন তো জগঝম্প ? কান ঝালাপালা করে দিলো এই প্রটেস্ট্যান্টগুলো ; এরা হিন্দুদের চেয়েও নোংরা, চিৎকার চেঁচামেচি হইচই ঝগড়াঝাঁটি ছাড়া থাকতে পারে না । "