বড়গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বড়গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৩

বড়গল্প - কৌস্তভ ভট্টাচার্য

ফিসফিসোনি ইন্টারন্যাশানাল
কৌস্তভ ভট্টাচার্য



নয়-ছয়-অ্যানাবেল


নয়-ছয় মিলে যে পনেরো হয়, সেটা আমরা মাঝেসাঝেই ভুলে যাই – আর ভুলে যাওয়াটা অনেকসময় কম পেইনফুল। নইলে গোটা অগাস্ট মাস জুড়ে পনেরোই অগাস্টের দেশজ উৎসবে মাততে মাততে – আমরা বরাবর একটা আন্তর্জাতিক হয়ে যাবার চান্স মিস করে ফেলি – না ফ্রেন্ডশিপ ডের কথা হচ্ছেনা – সেটা তেসরা অগাস্ট, আমরা যথাবিধি – কুছ কুছ হোতা হ্যায়ের রিস্টব্যান্ডে, ফেসবুকে অন্যের ওয়াল থেকে ফোটো শেয়ার করে, আর প্রায় প্রেমিককে ‘উই আর জাস্ট ফ্রেন্ডস – ইউ সি’ বলে নির্বাহ করি।

যেটা ভুলে যাই – শুধু আমরা না, গোটা কয়েক তীব্র পলিটিক্যাল র‍্যালি ছাড়া এদেশের পৃথিবীর প্রায় সবাই আজকাল যেটা ভুলে যায় – ফ্রেন্ডশিপ ডের থেকে তিন তিন দিন দূরত্বে দুটো পাপ, আমাদের ঠাকুর্দারা যখন বাঙলাদেশ ছাড়বেন কি ছাড়বেন না ভাবছেন – তখন টুপটাপ জাপানের বুকে ঝরে পড়েছিল। কর্ণেল পল টিবেটস – যে বি-২৯ টা চালাতেন নিজের মায়ের নামে তার নাম রেখেছিলেন – এনোলা গে। ঠিকই ছিলো – মায়ের গর্ভ সবসময় ধারণ করার বস্তু নয়, মাঝে সাঝে লজ্জা ঢাকতে গর্ভপাতও সভ্যতার রুলবুকের ফুটনোটে আইনসিদ্ধ। এক্ষেত্রে গর্ভপাতটা একটু দেরিতে হওয়াতেই সম্ভবতঃ লজ্জাটা পুরোপুরি ঢাকা যায়নি – তিনের দ্বিতীয় গুণিতকে ‘লিটল বয়’ আর তৃতীয় গুণিতকে ‘ফ্যাট ম্যান’ এর পাপের মেলানকোলি, তাই আমরা তিনের প্রথম গুণিতকে বাৎসরিক বন্ধুত্ব দিবসের তলায় চাপা দিয়ে বেশ কয়েকবার উঁকি মেরে দেখি – পাছে কেউ জেনে ফেলে।

সম্ভবতঃ মিত্রশক্তির হাতে লাগা রক্ত মুছতেই হিউ হাতে ভালোবাসার পোক্ত পালিশ লাগাতে চেয়েছিলো। ভালোবাসা আল্টিমেটলি বেশ আজিব মাল। কেউ তাকে জীবনের সমস্ত কমপ্লিকেশনস ভেবেই মোলো, কেউ আবার সমস্ত কমপ্লিকেশনসের সলিউশন। থ্যাঙ্কফুলি হিউ দ্বিতীয় শ্রেণীর যাত্রী – অ্যাটলিস্ট এই কেসটায়।

হিউ প্যাক্সটন জন্মসূত্রে ব্রিটিশ, কেন্টের বাসিন্দা। প্রকৃতি প্রাপ্তি হয়েছিলো সুদূর প্রাচ্যে – টোকিওর রাস্তায়। মিডোরি জাপানকন্যা – ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের হয়ে একটি ভারী শান্তশিষ্ট জানোয়ার সংরক্ষণ করাই ওর পেশা – বাঘ। হিউ, মিডোরির টইটইয়ে সদাসঙ্গী – পেশায় লেখক – আর্টিকেল লেখে বেড়াবার রসদ জোগাড় করতে – গল্পগুলো ইচ্ছের পেট ভরাতে। আফ্রিকায় টাইগার নেই – সেটা যেকোনো ঋজুদা পাঠক থাপ্পড় মেরে পৃথিবীর তাবড় শিকারীকে শিখিয়ে দিতে পারে – তাও ওরা সাউথ আফ্রিকা গেছিলো – কি জানি কি খুঁজতে – বোধহয় সিংহ আর বাঘের হিসুর সিমিলারিটি ও ডিফারেন্স জাতীয় কিছু। গিয়ে কাজের কাজ যেটা হয়েছে – হিউ প্রথম গল্পের বইটা নামিয়ে ফেলেছে।

আপাততঃ ওরা ব্যাঙ্ককেই সেটলড – একটি সাত বছরের ছটফটে হুরীপরী শুদ্ধু – মায়ের রূপ পেয়েছে – আর বাবার দেওয়া নাম – অ্যানাবেল।


হাজার দশেক

কৃষ্ণ আর আমি একবার একসাথে চাঁদের ছবি তুলতে গেছিলাম। ওর নিকন ডি৩২০০ সঙ্গে ১৮-৫৫ লেন্স – আর আমার ক্যানন এস-এক্স ৩০ডি – গাধার পুরুষাঙ্গের মতো বড়ো হওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সুপার জুম কেপেবিলিটি সহ।

তো যেটা দাঁড়ালো – ওর চাঁদটাকে বেশ আকাশের গায়ে একটা দইয়ের ফোঁটার মতো দাঁড়ালো। আমারটায় বেশ ক্রেটার ফ্রেটার সহ একটা নাসা মার্কা উচ্চনাসা এফেক্ট এসে গেলো। পৃথিবীর সব ডিএসেলারের মুখে আমার বিজয়লাথ।

নাগারহোল ন্যাশানাল পার্ক এদেশে প্রায় অপরিচিত আর বিদেশে বহুপরিচিত একটি জঙ্গল। কেরালা আর কর্ণাটকের বর্ডারে কাবিনীর কাছে গা ঘাপটি দিয়ে পড়ে থাকা একটাই থাকা খাওয়ার হার্বাল মাসাজ পাবার এলাহি ব্যবস্থা। আর পৃথিবীর বেশিরভাগ ধলা চামড়ার কাছেই যেহেতু ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়াকে দান করার জন্য অঢেল ডলার থাকে তাই প্রতিদিনের খরচ – বেশি না মাথা পিছু হাজার দশেক - থাকা-খাওয়া-জঙ্গলে ঘুরঘুর-এক জানলা হনুমান সাক্ষী রেখে নতুন বউয়ের বুকের তিল আবিষ্কার ইনক্লুসিভ।

তো আম্মো গেসলাম – বাপ মা কে ট্যাঁকে গুঁজে – প্রিয়তমাসু ক্যানন এস-এক্স ৩০ডি গলায়।

সেখানে জঙ্গলে বেশ একটা হুডখোলা জিপে ঘোরায়। বালাই ষাট বাঙালি পাঠক মেলোড্রামাটিক হবার আগে পুরোটা শুনুন – জঙ্গলে গাউর, বাঘ সব থাকলেও – জিপে দু’দুটো বন্দুকবাজও থাকে।

তো হিউ, মিডোরি আর অ্যানাবেল জায়গা পেয়েছিলো আমার জিপের পেছনের সিটে। আমি সপরিবার ও সক্যামেরা সামনে। হিউদের ছিলো টেন্ট নাম্বার ৫, কিন্তু জিপে অ্যালোকেশান ছিলো রুম নাম্বার ৫ এর। কোথা থেকে কি হইলো বোঝা গেলনা – দেখা গেলো টেন্ট নাম্বার ৫ আর রুম নাম্বার ৬ কে ‘হাত ধর প্রতিজ্ঞা কর’ গাইয়ে বিদেয় দিলো ট্যুরিস্ট লজ।


পেয়েছি পেয়েছি, থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু

টাইগার কল বস্তুটি যারা শোনেননি তাদের কি করে বোঝাই জিনিসটা কিরকম। দাঁড়কাকের গলাটা ছ’মাসের বাচ্চার মতো হয়ে গেলে ব্যাপারটা যে’রম দাঁড়াবে অনেকটা সেরকম।

বুদ্ধদের গুহ হবার কোনো ইচ্ছে বা সক্ষমতা কোনোটাই আমার নেই – তবু এটুকু পাব্লিকের জ্ঞাতার্থে – আমরা আসার রাস্তায় একটা বাঘের তাড়া খাওয়া গাউর দেখেছি (যাকে বাইসন লিখলে আমার জঙ্গুলে দাদা বিক্রমাদিত্য গুহ রায় আমাকে দুই কুমীরে পা দিয়ে দাঁড়াতে বলতে পারেন) যে গায়ের রঙটা বাদে টোটালি সলমন খান – কিন্তু সম্ভবতঃ ভয়ে, অথবা পরাজয়ের গ্লানিতে একটা বেচারা গাছে শিঙ ঘষে ঘষে গাছটার ছালবাকলের সাড়ে দেড়টা বাজাচ্ছিলো। ভিডিও তোলা আছে – দেখতে চাইলে বলবেন।

তো মূল জঙ্গলে ঢুকলাম – জঙ্গলটার ভালো ব্যাপারটা হচ্ছে – জঙ্গলটা পর্ণমোচী গাছের জঙ্গল – আর সময়টা শেষ ডিসেম্বর – তো প্রায় একটা শান্তিনিকেতনের ঝোপঝাড়ের মতো চেহারায় জঙ্গলটা মান রক্ষার হতাশ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ট্যুরিস্টের পৌষমাস – কারণ পাইকারি রেটে অ্যানিমাল ওয়াচ হচ্ছে, হাতি ময়ূর, হাজার খানেক পাখি, শূয়োর, ওয়াইল্ড ডগ বা ঢোল কি নেই তাতে।

প্রত্যেকটা জঙ্গলেই একটা জায়গা থাকে যেখানে সব জন্তু জানোয়ার – দিনে একবার করে মাটি থেকে চেটে চেটে নুন খেতে আসে। সেই জায়গাটায় গেলে ওয়াইল্ড লাইফ দর্শনের সম্ভাবনা বেশি হয়। তো আমাদের জিপটা ঘুরতে ঘুরতে সেই পার্টিকুলার জায়গাটায় আসার পর – আমাদের পাকা চুল গাইড হঠাৎ করে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিলো। সেই আওয়াজটা শোনা যাচ্ছিলো – হরিণের, বাঁদরদের – যেটার কথা বিক্রমদার মুখে, ঋজুদার বইয়ে, ন্যাশানাল জিওগ্রাফিকে শুনেইছি শুধু – এক্সপিরিয়েন্স করা হয়নি – ততপূর্বে।

গাড়িটা যেখানে দাঁড়িয়েছিলো – সেই জায়গাটায় রাস্তাটা একটা এল শেপের টার্ণ নিয়েছে। গাইড ড্রাইভারকে বললো গাড়িটা চালাতে, টার্নটা নিয়ে গাড়িটা দু-তিনহাত এগিয়েছে কি এগোয়নি – ভদ্রলোক রাস্তা পেরোলেন – আমার বাবা আর মা একে অন্যের হাত চেপে লাফালাফি করতে লাগলো সাউন্ড না করে – হিউ আর মিডোরি খালি গাইডকে থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু করে গেলো।

আমি কি করলাম? আমি ঘটনাটা ঘটার পর রিয়ালাইজ করলাম যে আমি ভিডিও তুলতে এতো ব্যাস্ত ছিলাম যে একটা খাঁটি বেঙ্গল টাইগার সচক্ষে দেখা মিস করেছি। শুধু ভিডিওটা ঠিকঠাক আসার জন্য পেয়েছি পেয়েছি করে গেছি।

আর মিডোরি – নিজের ক্যানন ৬০ডি – তার সাথে একটা টেলি লেন্স এটসেট্রা হাতে নিয়ে বসে খালি বাঘটা দেখেই গেছে – ছবি আর তোলেনি।


পে প্যাল


তখন আমি হায়দ্রাবাদে। নাগারহোল থেকে ফেরৎ এসে গেছি প্রায় মাস দুয়েক। কোলকাতার জন্য মনটায় একটা টানটান না পাওয়া জমে থাকে হরবখৎ।

মিডোরি, হিউ আর অ্যানাবেলের সাথে আলাপটা সেই বাঘ দিবসের রাত্তিরেই হয়েছিলো। মিডোরি আমার কাছ থেকে বাঘের ভিডিওটা নিয়েছিলো। সেখানেই জানলাম ওর ইউনাইটেড নেশনসের সাথে কাজকম্মের কথা। হিউ টিপিক্যাল ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে বললো – ‘ইউ মাইট এন্ড আপ গেটিং সাম মানি ফর দিস’।

তো ভালো – বাঙালি মধ্যবিত্ত ছেলে – মেয়ে আর পয়সা চিনতে ভুল করেনা। মাঝের দু’মাস যে ছবিগুলো মেইল করিনি ওদের – সেটা নেহাৎ ল্যাদ।

প্রসেসিং ট্রসেসিং করে মিডোরির মেইল আইডিতে পাঠালাম ওগুলোকে।

কিছুদিন পর রিপ্লাই এলো – মিডোরির নয়, হিউয়ের কাছ থেকে – ওরা এখন বাঘ ছেড়ে শাশুড়ি সামলাচ্ছে। ছবিগুলো ভালো লেগেছে। ডিটেলে কথা আছে। পরে বলবে।

বললো – কিছুদিন পরেই।

হিউয়ের একটা আর্টিকেল বেরিয়েছে সেই গাউরকূলের সলমন খানকে নিয়ে – আমি হিউকে বলেছিলাম – ওটা লিখলে যেন আমায় পাঠায় – আমি বাঙলা করে ছাপাবার ব্যাবস্থা করবো – সে আর হোলোনি। কারণ আমাদের ম্যাগাজিনটা তখনো নেহাত ওয়েবম্যাগ – সাহেবসুবোকে ডলার দিতে গেলে – হেঁ হেঁ ওই আর কি।

যাই হোক – বেশ কিছু পাখির ছবি তুলেছিলাম নাগারহোলে – হিউয়ের একটা বড়ো আর্টিকেল যাচ্ছে, নাগারহোলকে নিয়ে। নিপ্পন এয়ারওয়েজ নামের জাপানী এয়ারলাইন্সের ইনহাউস ম্যাগাজিন উইংস্প্যানে। সেটার জন্য আমার কিছু ছবি চেয়েছে । ছবি পিছু ৫০ ইউ-এস-ডি দেবে, চারটে ছবি অর্থাৎ ২০০ ইউ-এস-ডি।

ইউ-এস-ডি শব্দটা নেশা ধরাবার পক্ষে চুল্লু-চরসের থেকে কম যায়না – তবে কিনা সাহেব মানুষ। আর আমার থেকে আমার বাবা-মার সাহেবে বেশি ভয় – যদি ছবিগুলো নিয়ে পয়সা না দেয়। বিক্রমদাকে জিজ্ঞেস করলাম একবার। বিক্রমদা ছবিগুলো দেখে প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে দিলো হিউ এন্ড কোং ছবির কিস্যু বোঝেনা – নইলে এইসব ছবি চাইতো না।

যাই হোক – আমিও বামুনের ছেলে – ঠাকুর্দা বর্ডার পেরিয়েছেন – অল্পতে নাহি দমে এই শর্মা। দিলাম পাঠিয়ে – হিউ বললো আমার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেবে। তার জন্য একটা পে-প্যালে অ্যাকাউন্টও খুলে ফেললাম।

সেখান থেকে আমার কাছে টাকা এলো বটে – প্রথম দু’মাসে ১.৩২ টাকা – অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশানের জন্য পে-প্যাল থেকে বিনামূল্যে ইলেট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারায়িত।


ভেসে আসে কোলকাতা


হিন্দি ছবির নাচা-গানা-ঢাক-ঢোল আমার বরাবরের প্রিয় জিনিস। মানে ইয়ে রুচি নিয়ে যদি প্রশ্ন তোলেন তবে স্বীকার করতে হয় আমার করণ জোহরের বোলে চুড়িয়া বোলে কঙ্গণা গানটার পিকচারাইজেশান বড়ো ভাল্লাগে।

সুরের জন্য নয়, কথার জন্য নয়, উৎসবের জন্য।

হিন্দি সিনেমায় ওই যে একটা প্রচন্ড রঙচঙে সেটে – ততোধিক রংবেরঙের কস্টিউম পড়ে প্রায় শ’খানেক লোক একসাথে তাথৈ করে ওটা আমার বড়ো ভাল্লাগে।

আমার – রঙ ভাল্লাগে।

রঙ – যেটা আমার শহর কোলকাতাকে ভারতবর্ষের আর পাঁচটা শহরের তুলনায় আলাদা করে দেয়। সেই রং - যেটা কখনো রাজনৈতিক লাল-সবুজ, কখনো একাকিনী হলদেটে, কখনো ঋতুপর্ণ ঘোষকে অকালে হারিয়ে বিষণ্ণ সাদা-কালো।

এই রঙগুলো নিয়েই কোলকাতা ঘুম থেকে ওঠে, কলোনী এরিয়াগুলোতে এখনো কলের লাইনে দাঁড়ায়, চলন্ত পাব্লিক বাসের পিছনে ছোটে, ২টাকা খুচরোর জন্য অটোওয়ালার বাবা-মা এক করে দেয়, ব্র্যান্ডেড টি-শার্ট পরে ঝুপসে খেতে যায়, দাম্পত্য কলহে মুখ গোমড়া করতে করতে ‘মধ্যরাত্রের আচমকা মিলন’ আবিষ্কার করে।

মুম্বই ছাড়া আর বাকি সমস্ত ভারতবর্ষীয় শহরের কাছে কোলকাতা ঠিক এখানেই জিতে যায়। বাকি শহরগুলোর মোনোক্রোমকে হারিয়ে দিয়ে একটা ইজেল হয়ে দাঁড়ায় – যেখানে ইচ্ছে মতো রং মেলানো যায়। আর মুম্বইয়ের বর্ষাকাল দেখে কালিদাসের কথা মনে পড়েনা। তাই – কথা হবেনা।

কোলকাতা ফিরে এলাম তাই – গত জুনে। সবাই বললো ভুল ডিসিশান – সবাই বললো ব্যাঙ্গালোর জাতীয় কোথাও যেতে – সবাই বললো এ শহরে সব জান্তব, সব মৃত, সব ভুল।

মন বললো – ঠিক, ঠিক, ঠিক।

এর মাঝে আর হিউদের সাথে কথা হয়নি।


অক্টোবর


কোলকাতায় আসার থেকে বিশেষ ছবি তোলা হয়নি। আসলে এইসব আঁতলামি করতে একটু একাকীত্ব লাগে। মনটা যদি বেজায় ভালোবাসা সম্পৃক্ত থাকে – মানুষে, বাবা-মায়, বন্ধুবান্ধবে – তখন আর ক্যামেরার কথা মনে থাকেনা।

কিন্তু অক্টোবর এসে গেলো কত্তা – ওয়ান মোর নাচনকোঁদন মাস – দুগগাপুজো অন দ্য কার্ড। এইসময় ক্যামেরা হাতে না বেরোনো মানে ক্যামেরাকে ব-কার শ-কার তুলে খিস্তি দেবার সমতুল্য।

আমার বাড়ির কাছে একটা ঠাকুর বানাবার জায়গা আছে – সাইজ করে তুলতে পারলে সেটা যে কুমোরটুলি নয় বোঝে কার বাপের সাধ্যি।

তাই গেনু – সেই পুওর ম্যানস কুমোরটুলিতেই – খচখচাৎ করলুম বেশ কিছু ছবি। দু’টো ফোটোগ্রাফার বন্ধুকে দেখালাম – একজন বললো বড্ডো কমন অ্যাঙ্গলস, আরেকজন বললো থট প্রসেসটা স্টিলের নয়, ভিডিওর।

তো যাই হোক,শ্রদ্ধেয় তপন রায়চৌধুরী বলেছেন - সাহেবদের মাথায় অতো বুদ্ধি হয়না – নইলে কেউ সোনামুখ করে ওরিয়েন্টাল কুইজিনের স্বাদ পেতে কাঁচা লঙ্কা চিবোয়না।

তাই হিউকেও ছবিগুলো পাঠিয়ে দিলাম। সাথে একটা মেইলও জুড়ে দিলাম। মনটা যে একটু ইউ-এস-ডি ইউ-এস-ডি করছিলোনা তা বললে পরমপিতা আমাকে পাপ দেবেন।

হিউ,

এখন আমি প্র্যাকটিকালি ঘরের ছেলে ঘরে ফেরৎ এসে গেছি। কোলকাতা থেকে লিখছি, দূর্গাপুজো সম্বন্ধে শুনেছো বোধহয় – আমাদের এদিকে সবচেয়ে বড়ো উৎসব। বড়োই আনন্দে আছি।

আমার সেই বাঘবন্দীর ক্যামেরায় কয়েকটা ছবি তুলে পাঠালাম। গুগল ড্রাইভ একটা বেশ নতুন ও ভালো ফিচার। ওটাতেই তুললাম। দেখে জানিও কেমন।

~কৌস্তভ


আনন্দ এবং

কৌস্তভ,

প্রথমে কয়েকটা কম আনন্দের খবর বলি। আমার নিজেকে বেশ গিলটি লাগছে তোমার নাগারহোলের ছবিগুলোর ভবিতব্য জানাতে। আসলে কোনো ভবিতব্য নেই – যেটা রয়েছে সেটাকে ফুলস্টপ বলাই ভালো।

আমি এডিটরকে ছবিগুলো পাঠিয়েছিলাম (যে আবার কিনা বিদেশে ছুটি কাটায় বেশিরভাগ সময়), কোনো এক সাব-এডিটর ছবিগুলো হারিয়ে ফেলেছে। হপ্তা-মাস-বছর কাটতে চললো। এবার নিজেরই লজ্জা লজ্জা লাগছে।

আমার প্রত্যেক দিন মনে হয় আগামীকাল তোমাকে একটা মেইল করে খোলাখুলি জানিয়ে দিই, কিন্তু আগামীকালটা এখনো এসে পৌঁছয়নি।

এক্সিকিউটিভ সামারি – তোমার পে-প্যালের অ্যাকাউন্টে আর কেউ নিশ্চয় কিছু জমা করেছে। কিন্তু আমি কিম্বা উইংস্প্যান কিছু করিনি।

এবারের ছবিগুলো দেখতে পারলাম না। দুর্গাপুজোর সম্বন্ধে শুনেছি তো বটেই – বেশ ড্রামাটিক লেগেছিলো। আমার কম্পিউটারের টেম্পারমেন্ট ইদানীং ভালো যাচ্ছেনা। তাই গুগল ড্রাইভের লিঙ্কটা খুললো না। দেখবো নিশ্চয়। এবার ডিরেক্ট মেইল করে দিও – এই সোশাল মিডিয়াগুলো আজকাল আর ইউজ করিনা।

অন্য কথা বলি?

তুমি আনন্দে আছো জেনে ভাল্লাগছে।

আনন্দ এমন একটা জিনিস যেটার গুরুত্ব আমরা প্রায়শই বুঝিনা – আন্ডারএস্টিমেট করে ফেলি।

কোলকাতায় ফিরেছো জেনে ভালো লাগছে। আশা করি কোলকাতায় বিল্ডিংগুলোর সিকিউরিটি ব্যবস্থা ভালোই।

বন্ধুদের বিবিসি ওয়ার্ল্ডে ধ্বংসস্তূপ থেকে রেসকিউ হতে দেখেছো কখনো? নাইরোবিতে ওয়েস্টগেটের খবর দেখছিলাম ব্যাঙ্ককে বসে বসে – চা খেতে খেতে।

অ্যানাবেল হঠাৎ করে বলে উঠলো – ‘বাবা দেখো দেখো, লুসি আর ফ্লোরা’।

নাইরোবিতে দু’মাস হলো গেছে ওরা। এর আগে একবারই মাত্র একটা প্রায় জীবনসঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছিলো ওরা দু’জন – একটা বাইসাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে।

আসলে আমরা স্বাভাবিক ভাবে এতো ভরে থাকি, যে টুকরো আনন্দগুলো প্রায়শই ওভারলুক হয়ে যায়। রাস্তায় চলার মধ্যে, একটা খাজা বই পড়ার মধ্যে, নিজের পরিবার গড়ে তোলার মধ্যে যে একটা তীব্র আনন্দ আছে – সেটা ভুলতে বসি।

কিন্তু জীবনটা তো আসলে সন্ধানের গল্প – মানুষ খুঁজে বেড়াবার, ইমোশন খুঁজে বেড়াবার, আশা খুঁজে বেড়াবার, বন্ধুত্ব খুঁজে বেড়াবার।

আনন্দ খুঁজে বেড়াবার।

তাই তোমার আনন্দের জন্য শুভেচ্ছা রইলো। আনন্দেই থেকো।

~ ব্যাঙ্কক থেকে হিউ, মিডোরি আর অ্যানাবেল

বড়গল্প - অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

কৈসে যাওব
অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
১.

আমি যখন জন্মাই, তখন নাকি মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। কোলকাতায় পুলিশের জীপ, ট্যাক্সি অর্ধেক ডুবে গেসলো সেদিন।
সেদিন, আষাঢ়স্য বিংশ দিবসে।


বাতাবাড়ি, রাজর্ষিদার সাথে। রাজর্ষিদা বরানাগরিক। মন যদিও সায় দিচ্ছিল না যেতে। মন বলছিল আসবে, ফোন। শকুন্তলার। তাও যাওয়া হল। কদমতলা গার্লসের সামনে থেকে বাস ধরে বাতাবাড়ি ফার্ম মোড়। ঘণ্টা দেড়েক। সকালের বাকি ঘুমটুকু বাসে পুষিয়ে নিয়ে যখন মাথা চুলকোতে চুলকোতে নাবলাম বাস থেকে, তখন দেখি, সামনে লেখা জায়গাটার নাম, মাথাচুলকা। এক প্যাকেট সিগারেট কিনে যে সাইকেল ভ্যানটায় উঠলাম, তাতে সিমেন্ট, রড এসবও আছে। প্যাসেঞ্জার, মোরা দুজনায়। বারেবারে ফোনটা দেখে যাচ্ছি। শকুন্তলার ফোন এলো না। প্রায় আধ ঘন্টা দুলতে দুলতে গিয়ে পৌঁছলাম, লতিফ ভায়ের বাড়ি। রাজর্ষিদার মুখে এই নামটা শোনা ইস্তক মাথায় ঘুরছে একটাই শব্দ, বীফ। ভ্যান থেকে নেমে, রাস্তার ঢালু দিয়ে লতিফ ভায়ের বাড়ির দিকে যেতে যেতে, এই শব্দটাই মাথায় ঘুরছিল আবার। আর, স্যালাইভাতেও। যাই হোক, ব্যাগপত্তর রেখে আমরা যাচ্ছি সেই বহুশ্রুত জায়গাটা দেখতে। যেখানে অদূর ভবিষ্যতে একটা লিটল ম্যাগাজ়িন লাইব্রেরি হবে। একটা ফ্রি স্কুলও। মোট দেড় বিঘে জমি। মিউটেশনের কাজ চলছে। জায়গাটার তিনদিকে খুঁটি পুঁতে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। এখানে হাতি আসে খুব। একটা খুঁটি ভেঙে দিয়ে গেছে ক’দিন আগে। একপাশ দিয়ে লাগানো হবে দেড়শো সুপুরি গাছ। তার ফাঁকে ফাঁকে ঝাউ। গেটের সামনে দুটো রাণিচাপ। বর্ষায় জল উঠে আসে ষোড়শী তণ্বীর মতো ঐ নদীটা থেকে। তাই বোল্ডার ফেলা হচ্ছে তার পাড় ঘেঁষে। পাশেই লাটাগুড়ি ফরেস্ট। অনেক চা বাগান। চা বাগান দেখেই, আমার আবার মনে পড়লো, শকুন্তলার কথা। ক’দিন আগেই আমি আর শকুন্তলা সুকনা ফরেস্টে গেছিলাম। সেখানে ওর খুব ইচ্ছে করছিল জঙ্গলের ভেতরে হারাতে। ডুয়ার্সের জঙ্গলের মতো এত মায়াবী জঙ্গল আর কোথাও কি আছে! চুপ করে কান পেতে আমরা শুনতে থাকি জঙ্গলের শব্দ। সে যেন তার নিজের খেয়ালে আছে। নিঃশ্বাসে একটা বুনো চাপ চাপ গন্ধ। নাক থেকে ফুসফুস, গোটা স্নায়ুতে সেই গন্ধটা ছড়িয়ে যেতে থাকে। আসার সময় আমাদের অটোটা থেমেছিল সুকনা স্টেশনের কাছে। ছোট্ট স্টেশন। ছবিতে এরকম দেখা যায়। জঙ্গল এই জায়গাটার মনটাই যেন অন্যরকম করে গড়ে দিয়েছে। শকুন্তলা স্টেশনের ছবি তুলছিল। আমার মনে হচ্ছিল, এই স্টেশনের স্টেশন মাস্টার আর হাওড়া স্টেশনের স্টেশন মাস্টার দুজনেই এক পদে চাকরি করেন, তবু দুজনের জীবন কতটা আলাদা। আমরা দুটো চা বাগানের মাঝখানে বসে ছিলাম। রাস্তা থেকে অনেকটা ভেতরে। ও শুয়ে ছিল আমার

কোলে মাথা রেখে। কি কথা বলছিলাম আমরা তখন? মনে পড়ছে না। ছবিটা ভাসছে। আমি খুব ছবি তুলছিলাম, ওর ক্যামেরায়। বিকেল হতেই ও বলছিল,

— তাড়াতাড়ি উঠতে হবে, এখানে সন্ধ্যের পরে হাতি বেরোয়।

একটা জলের ফোঁটা হঠাৎ যেন পড়লো আমার হাতে।

— বৃষ্টি? কিরে? চ’ উঠি।

অনেকটা ভেতরের দিকে এসে গেছি আমরা। বেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠতে সময় লাগবে। তাই পা চালিয়ে। ফোঁটা আর পড়ছে না, তবুও, তাড়াতাড়িই বেশ ঝরাবে মনে হচ্ছে। ধ্রুপদী সঙ্গীত পরিবেশনের আগে ওস্তাদেরা যেমন যন্ত্রগুলির স্কেল ঠিক করে নেন টুং টাং করে বাজিয়ে, বৃষ্টি এখন সেরকম। এখানে ঢোকার সময় একটা ব্রিজ পেরোতে হয়েছে। ব্রিজটা তৈরি হচ্ছে। নিচের নদীটায় জল ছিল না। আর ব্রিজটায় মাঝেমাঝে কাঠের পাটাতন, কোথাও বেশ ফাঁকা। ফাঁকগুলো বাঁচিয়ে পাটাতনে পা রেখে রেখে ও দিব্যি চলে গেল ওপারে। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম মাঝপথে। শুধু ফাঁকগুলোই দেখতে পাচ্ছি। মাথা ঘুরছে। ও হাসছে ওপারে দাঁড়িয়ে। এখন কি করা? পেছনে মিস্ত্রিগুলো নেপালি ভাষায় সাহস দিচ্ছে আমাকে।

— যানুস যানুস, কেই হুন্দেই ন

কিন্তু সাহস এমন একটা জিনিস একবার গেলে আবার চট করে আনা মুশকিল। একটা মিস্ত্রি নিজেই এগিয়ে এলো। আমার হাতটা ধরে পার করে দিল ব্রিজটা। ফেরার সময় মনে পড়লো, এই রে! আবার পেরোতে হবে ঐ ব্রিজটা? এখন তো মিস্ত্রিগুলোকেও পাবো না। বলতেই মাথায় খেললো, আরে! বাঁ-পাশ দিয়েই তো আরেকটা রাস্তা আছে। আমরা ঐ পথটাই ধরলাম। খিদেও পাচ্ছে এবারে। ছবি তুলতে তুলতে ফিরছি আমরা। শকুন্তলা খুব কায়দা করে ছবি তুলতে জানে। লোকজন টেরই পাবে না, ও ছবি তুলে নেবে। আবার কাছে গিয়ে, দাঁড় করিয়েও ছবি তোলে। বিস্কুট আর আলুর চিপ্স কিনে, সুকনা স্টেশনের কাছ থেকে যখন অটো ধরলাম, বৃষ্টি তখন আলাপ ছেড়ে মুখড়া ধরেছে। অটোর পর্দাটা হিমশিম খেয়ে নামালাম আমি আর উলটো দিকে বসা ছেলেটা, দুজনে মিলে। আমি তো ছাতা নিয়ে বেরোই নি। শকুন্তলার সাথে ছাতা আছে। ও আমাকে বলছিলো,

— কেন ছাতা নিয়ে আসিসনি? সবসময় ছাতা নিয়ে বেরোন উচিত।

আমি বেশ জোর দিয়ে বললাম—

— দ্যাখ, আর কেউ ছাতা নিয়ে আসেনি। কেউ তো জানতোই না যে বৃষ্টি আসবে।

আমার কথা শুনে, অটোতে বসা সবাই জানালো তারা ছাতা নিয়েই বেরিয়েছে। দু’একজন ব্যাগ থেকে বের করেও দ্যাখালো। সিটি সেন্টারের সামনে যখন নামলাম দুজনে, বৃষ্টি তখন ঝালায় পৌঁছে গেছে। ও ছাতাটা খুললো, নেমে। আমরা দৌড়ে ঢাউস ঐ বাড়িটার ভেতরে হারিয়ে গেলাম। হ্যাংআউটে বসা গেল না বৃষ্টির জন্য। টেবিলে আমরা মুখোমুখি বসে, আর অঝোরে তখন বাইরে ঝরছে বৃষ্টি। সুনীল গাঙ্গুলি বলতো, আগেকারদিনে গল্প-উপন্যাসে প্রায়ই এরকম একটা লাইন থাকতো, ‘তখন নিয়তি দেবী অলক্ষ্যে দাঁড়াইয়া হাসিলেন’। সেদিন হ্যাংআউটেও বোধহয় তিনি ছিলেন। এবং হাসছিলেন। নইলে কে জানতো, সেদিন রাতেই আমাদের দুজনের তুমুল ঝগড়া হবে! আর শকুন্তলা ভোর চারটের সময় হোটেল থেকে বেরিয়ে যেতে চাইবে!



কিন্তু, তাই বলে বাতাবাড়িতে বৃষ্টি? রাজর্ষিদার গুঁতো খেয়ে তিরতিরে ঐ হাঁটুজল নদীটায় নেমে স্নান করতেই হল। উঠে আসতেই নামল বৃষ্টি। আর বাজ। ওফ্! সে এক দৃশ্য। চারদিকে মাঠ, আর চা বাগান, তার একপাশ দিয়ে নদীটা। নদীর ঠিক পাশেই একটা টং ঘরে আমরা। কুচকুচে আকাশ। এখানেও ছাতা আনিনি। কেউই আনেনি। আমার মনে হচ্ছিল, সব জায়গার বৃষ্টি কি আলাদা? আমার জন্মের সময়ের বৃষ্টি, শিলিগুড়ির বৃষ্টি, বাতাবাড়ির বৃষ্টি, সুকনার বৃষ্টি, সব জায়গার বৃষ্টির মেজাজটাই তো আলাদা। রাজর্ষিদা বলছিলো, শকুন্তলাকে আনলে পারতাম। ওর ভাল্লাগতো। বৃষ্টি একটু থামতে, নেমে এলাম টং ঘর থেকে। লতিফ ভাই, রাজর্ষিদা আর আমি। হাঁটছি। রাতে থাকবো কি থাকব না, এই নিয়ে দোনামনা চলছে আমাদের দুজনের। নাঃ, দুপুরে বীফ জুটলো না। কিন্তু তার বদলে যা জুটলো তাও দারুণ। খেয়ে উঠে আমরা ঠিক করলাম, থাকবোনা। যাব কোথায়? ও যাবে, আলিপুরদুয়ার। শৌভিকদার বাড়ি। আর আমি? আমি কোথায় যাব? জলপাইগুড়িই ফিরে যাই। মন তখনও বলছে আসবে আসবে, ফোন আসবে। শকুন্তলা আজকে শিলিগুড়িতে। জলপাই থেকে শিলিগুড়ি যাওয়াটা সহজ হবে। অবশ্য, যদি শকুন্তলা ডাকে। আর না ডাকলে? তাহলে কালই ফিরে যাব কুচবিহার। কিন্তু, রাজর্ষিদা চাইছে আমাকে আলিপুরে নিয়ে যেতে। বিকেল সাড়ে তিনটে প্রায় তখন। ভাবলাম এখনও যখন ফোন এলো না, তাহলে চলো আলিপুর। তারপরে দেখা যাবে। বৃষ্টি থেমে গেছে। আমরা আবার ভ্যানে চেপে বাতাবাড়ি ফার্ম মোড়। মালবাজারের বাস। মনটা কিন্তু খচখচ করেই যাচ্ছে। মালবাজারে পৌঁছে, রিকশা নিয়ে রেল স্টেশন। স্টেশনের কাছে এসেছি যখন, ট্রেন ঢুকছে। রাজর্ষিদা বললো—

— অর্জুন, যা দৌড়ে টিকিটটা কাট। আমি রিকশা ভাড়াটা দিয়ে আ—

ব্যাগ রইলো ওর কাছেই। আমি নেমে দৌড়। টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্মে আমি, রাজর্ষিদা দু’দুখানা ব্যাগ নিয়ে আধা দৌড় আর দু’পাশে আধা হেলতে হেলতে ঢুকছে। আর ট্রেনও ছেড়ে দিল তখন। দৌড়ে ধরলাম তাকে। আঃ…. পেরেছি। ঝাঁঝা এক্সপ্রেস।



আগের রাতে প্রায় সাড়ে তিনটে অবদি কথা হয়েছে শকুন্তলার সাথে। তারপরে সাত সকালে উঠে বাতাবাড়ি। ঘুম হয়নি তেমন। বাসের ঐ দেড় ঘন্টায় আর কতটুকু হয়! ট্রেনে উঠে জায়গাও পেয়ে গেলাম কপালজোরে, দুজনেই। আমি মালবাজার থেকেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ রেলস্টেশনে, ঘুম। তাও জার্নির সময় যা

হয়, টানা হয়না। যা হয়, ছেঁড়া ছেঁড়া। রাজর্ষিদা একবার বললো,

— শকুন্তলাকে ফোন করে বলে দে ট্রেনে উঠে গেছিস।

— থাক।

ওকে আর বললাম না, সকালের পর থেকে ওর ফোন স্যুইচড অফ। মালবাজার থেকে ট্রেনে আড়াই-তিন ঘণ্টা লাগে আলিপুর যেতে। সন্ধ্যে যখন হব হব, ট্রেনও গন্তব্যের কাছাকাছি এসে গেছে, অন্য প্যাসেঞ্জারদের মুখ থেকে জানা গেল, আলিপুরে ভয়ানক বৃষ্টি হচ্ছে। ছ’টা নাগাদ নিউ আলিপুরদুয়ারে আমরা নেমে দেখলাম, বৃষ্টি তখন চলে গেছে। সে যে এসেছিল, তার চিহ্ন সর্বত্র। বছর চারেক হল আমি আর ছাতা ব্যবহার করিনা। চার-পাঁচ বছর আগে, এক জুলাই মাসে, ঘোর বর্ষায় আমি বেয়াক্কেলের মতো পরপর ছ’সাত খানা ছাতা হারিয়েছি। শৌভিকদাকে ওর আই-টেন সমেত দেখা গেল একটু এদিক ওদিক করতেই। ওর বাড়িতে ব্যাগ রেখে আমরা চারজনে আবার বেরিয়ে গেলাম। আমি, রাজর্ষিদা, শৌভিকদা আর আই-টেন। রাজর্ষিদাও খুব ভালো গাড়ি চালায়। এখন শৌভিকদাই চালাচ্ছে। পেছনে আমরা দুজন। মদ আর শসা কিনে, কবি সুদীপ মাইতির বাড়ি। শঙ্খবাবু যতই বলুন ‘মদ খেয়ে তো মাতাল হতো সবাই’, মদের যে কিছু গুণ আছে সে তো মদ্যপায়ী মাত্রেই জানে। বাকিরা শুধু বিয়োগই দ্যাখে। গুণ অঙ্কটা এখনো অনেকেই ভালো করে কষতে পারে না। রাজর্ষিদার সামনে আমি মদ খেলে, ও কাকা আর জ্যাঠার মাঝামাঝি একটা গার্জেন হয়ে যায়। আমি দু’পেগ খেলে, ও বলে, আমি চার পেগ খেয়েছি। আমাদের কবিতা, পান চলতে চলতেই আবার নামলো বৃষ্টি। রাত প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা আড্ডা ভাঙলাম। প্ল্যান হল পরদিন চিলাপাতা যাওয়া হবে। আমি তখনও জানি না, আমি যাচ্ছি না। শকুন্তলার আর ফোন না আসায় আমি ভেবেছি এখান থেকেই কুচবিহার ফিরে যাব। অনেকদিন পর মদ খেয়ে সত্যি মাতাল মাতাল লাগছে। রাতে প্রায় বারোটা নাগাদ ফোন এলো শকুন্তলার। আশ্চর্য হয়ে গেলাম এটা জেনে, ওর মনেই নেই কাল রাতে আমরা প্রায় সাড়ে তিনটে অবদি কথা বলেছি। এমন কি আজ সকালেও যে আমি বাসে ওঠার একটু পরে, ন’টা নাগাদ ও ফোন করেছিল, আমি ওকে বলেছিলাম বাতাবাড়ি যাচ্ছি, সেসবও কিচ্ছু মনে নেই। ঘাবড়ে গেলাম। কিন্তু ওকে বুঝতে দিলাম না সেটা। শকুন্তলা বললো,

— কাল আসতে পারবি?

আমিও হ্যাঁ বলে দিলাম। রাত তখন আড়াইটে। আলিপুর থেকে শিলিগুড়ি যেতে সাড়ে চার ঘণ্টা তো লাগবেই। সকাল সকাল বেরোতে হলে এখনই শুয়ে পড়া দরকার। কাল শকুন্তলাকে আবার দেখার উত্তেজনা নিয়ে শুয়ে

পড়লাম। শুধু চিন্তা একটাই, আগেরবার গিয়ে উঠেছিলাম শিবমন্দিরের একটা হোটেলে, সোনার তরী। ভালো হোটেল। কিন্তু সেটা ও যেখানে থাকে একদম সেই এলাকায়। ওর বাড়িওলা, পাড়ার লোকেদের কাছ থেকে একটা অন্য দৃষ্টিলাভ হয় এর ফলে। তাহলে? শিলিগুড়ি একেবারেই আমার চেনা শহর নয়। তাহলে ভরসা সুব্রত। আমার বন্ধুই বলা চলে। আমার চেয়ে বেশ বড় একটু বয়েসে। কিন্তু বন্ধুই। এনজেপিতে থাকে। ওর এক বন্ধুর হোটেল আছে মেডিকেলের কাছে। ঠিক হোটেল বলা ভুল, রেস্টুরেন্ট কাম বার। সকাল সকাল উঠে রাজর্ষিদাকে বললাম,

— বেরোচ্ছি, শিলিগুড়ি।

ট্রেনের খোঁজ করে জানা গেল সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ একটা গাড়ি আছে। শৌভিকদার বাড়ির কাউকে না জানিয়েই বেরিয়ে গেলাম। ওরা তখনো ওঠেনি ঘুম থেকে। রাজর্ষিদা আমাকে কিছুটা এগিয়ে দিল। আমি অটো ধরে আবার নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনে। কালই সন্ধ্যায় নেমেছিলাম এখানে। স্টেশনে পৌঁছে কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেল সাড়ে বারোটার আগে ট্রেন নেই। আমি আবার অটো ধরে চৌমাথায়। বাস পেয়ে গেলাম। জায়গাও। রাজর্ষিদাকে এসএমএস করে দিলাম।



শকুন্তলা জলপাইগুড়ি শহরের মেয়ে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছে এখন, ভুগোল নিয়ে। পেটে একগাদা খিদে নিয়ে যখন তেনজিং নোরগে বাস স্ট্যাণ্ডে নামলাম, তখন দুপুর প্রায় বারোটা। নেমেই সুব্রতকে ফোন করলাম। ও আধ ঘণ্টার মধ্যে মেডিকেলের হোটেল মালিকের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করে দিল। আমি বেশ নিশ্চিন্ত হলাম। টেনশনটা গেল। তখন নিয়তি দেবী বোধহয় অলক্ষ্যে দাঁড়াইয়া আবার হাসিলেন। ওখানে গিয়ে ঘর বুক করে শিবমন্দিরে এসে দেখা পেলাম শকুন্তলার। তখন দেড়টা। পেট আর কিছুই মানছে না। জানা গেল দুপুরে আমাদের দুজনের নেমন্তন্ন, নার্গিসদির বাড়ি। যেতে যেতে শকুন্তলা বললো—

— যেখানে যাচ্ছিস সেটা কিন্তু আর্মি ম্যানের বাড়ি। যদি আমাকে কষ্ট দিয়েছিস, তাহলে থানা না পুলিশ না, একেবারে কোর্ট মার্শাল।

নার্গিসদির বর, শামসেরদা, বি.এস.এফ-এ চাকরি করে।

* * *

বিকেল বিকেল নার্গিসদির বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা এদিকে ওদিকে আর সিটি সেন্টারে ঘুরেই কাটালাম। সন্ধ্যেবেলা হোটেলে ফিরে মাথায় বাজ পড়ল। এত দৌড়ঝাঁপে শরীর এমনিতেই ক্লান্ত। জানা গেল, মহিলা নিয়ে থাকা যাবে না। মানে? আমার তো আগে থেকেই বলা ছিল। আমি ভাবলাম, মালিকের সাথে নিশ্চই এদের এখনো কথা হয়নি। আমি কি তখন জানতাম, নিয়তি দেবী আগেই অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে খানিকটা হেসে নিয়েছেন! সুব্রতকে ফোন, মালিককে ফোন। ব্যবস্থা কিছুই হল না। অগত্যা মধুসূদন। সোনার তরী। খোঁজ করা হল আগেরবারের ঘরটা খালি আছে কিনা। ওটা আমাদের দুজনেরই পছন্দ। খালি নেই। অন্য ঘর পাওয়া গেল। আমরা অনেকক্ষণ নিভৃতে কাটালাম, একসাথে। শকুন্তলা ওর নতুন একটা লেখা শোনালো। গত

সপ্তাহে যখন এসেছিলাম, এই হোটেলেই পাশের ঘরে উঠেছিলাম আমরা। শনি-রবি দু’দিন ছিলাম। ভোর অবদি জেগে থাকতাম পাশাপাশি। প্রথম দিন ওকে হোটেলে রেখে রাতের খাবার কিনতে বেরিয়েছি। মটর পনীর, রুটি। আমাকে এসএমএস করে জানালো, চার প্যাকেট প্যানটীন শ্যাম্পু আর ময়েশ্চারাইজ়ারের ছোট প্যাকেট একটা। কিনে নিলাম। আমার নিজেকে বেশ সাংসারিক সাংসারিক মনে হচ্ছিল। ফিরে এসে দুজনে গল্প করছি বিছানায় বসে। একটু রাত করেই খাব আমরা। দুধের মতো ধবধবে সাদা চাদর পাতা বিছানায়। চুমু খেতে গেলাম, বলে কিনা না, হবে না। আমার মুখে নাকি গন্ধ। আগে ব্রাশ করে আয়। ব্রাশ এনেছি, কিন্তু পেস্ট তো আনিনি। রাত দশটায় বেরিয়ে পেস্ট কিনে এনে ব্রাশ করলাম। শকুন্তলা টিভিটা চালিয়ে দিল। যাতে পাশের ঘরে শব্দ না যায়। হোটেলের ঘরে টিভি কি এই জন্যেই থাকে? একই জিনিস যখন যেভাবে কাজে আসে। আদর থামিয়ে ও কবিতা পড়ছে, কবিতা থামিয়ে আদর। এবারে শকুন্তলা রাতে থাকবে না। আর কি যোগাযোগ! এই ঘরে টিভি নেই। ঠিক হল পরদিন আমি প্রদীপের মেসে শিফট করে যাব। প্রদীপ এখানেই থাকে, মেসে। তরুণ কবি। সাড়ে ন’টা নাগাদ বেরিয়ে আমরা ডিনার সেরে নিলাম। ওকে ওর ঘরে পৌঁছে আমি ফিরে এলাম সোনার তরীতে। প্রায় একবছর আগে, গত বছর জুলাই মাসে প্রথম আসি এখানে। সেবার রাত প্রায় এগারোটা অবদি আড্ডা দিয়েছি ওর ঘরে। তার পরেরদিন ভোরবেলা, পাঁচটা নাগাদ, শকুন্তলা হোটেলে হাজির। বৃষ্টি পড়ছে বাইরে, টিপ টিপ করে। আমি তো চমকেই গেছি। এতো ভোরে! দেখি গেরুয়া রঙের একটা সালোয়ার পরে এসছে। খোঁপা বাঁধা উঁচু করে। বোষ্টমীর মতো লাগছিলো ওকে দেখতে। অত ভোরে হোটেলের লোকগুলোও ঘুমে কাদা। আমি যত ডাকি-

— ও দাদা, ও দাদা, ঊঠুন, গেটটা খুলে দিন।

কে শোনে কার কথা। একবার শুনে ঊঁ—আঁ ক’রে আবার পাশ ফিরে শোয়। শেষে আমাকেই দেখিয়ে দিল বালিশের নিচে চাবি আছে। আমি চাবি নিয়ে গেট খুলে দিলাম। কিন্তু, এবারে যেটা নেই, তা’ হল বৃষ্টি। এবারে সকালে আমরা অনেকক্ষণ ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে। গতবছর রাতের অন্ধকারে ঘুরেছিলাম। এবারে সকালের আলোর কৈশোরে। আমরা ফুল কুড়াই, ছবি তুলি। আঙুল ছুঁয়ে থাকি। কেউ কাউকে না ছুঁয়ে পাশাপাশি হাঁটলেও শরীরে-মনে একটা লেনদেন হয়। সকালের হাল্কা রোদ মাখা গাছগুলো আস্তে মাথা ঝোঁকায়, অল্প হাসে আমাদের দেখে। কাল ও জলাপাইগুড়ি ফিরে যাবে। আমি কুচবিহারে। পরশু ও যাবে কোলকাতায়, ডাক্তার দেখাতে। ফিরে পিএইচডি আর বি.এড-এর পড়াশোনায়, আমি চাকরির জন্য জি.কে। কিন্তু, ফেরার পথে গল্পটা একটু জলপাইগুড়ি ছুঁয়ে গেল। এয়ারভিউ মোড় থেকে কুচবিহারের কোনো বাস না পাওয়ায় ময়নাগুড়ির একটা বাস ধরে নিলাম। আমরা গোসালায় নেমে যাব। ও রিকশা নিয়ে বাড়ি, আমি বাস ধরে কুচবিহার। বাসে আমরা দুজনেই একটা ভালো জায়গা পেলাম। ও জানলাটা নিল। আমি ওর পাশেরটা। আমাদের দুজনের ঠোঁটই কাতর ও প্রত্যাশী হয়ে ছিল, বোঝা যাচ্ছিল ওর ঠোঁটের তিরতির করে কেঁপে ওঠা

দেখে। গোসালায় নেমে আবার মত পাল্টালাম আমরা। আমি শংকরদার বাড়ি যাব। ও সন্ধ্যে বেলা আসবে দেখা করতে। পরদিন সকালেও আসবে, ট্রেন ধরার আগে।
* * *

সন্ধ্যায় শকুন্তলা এলো। সকালেই বেরোবার সময় ও রায়তা করে নিয়ে এসছিলো। আমার ব্যাগে রাখা ছিল সেটা। বের করে নুন দিয়ে ঝাঁকিয়ে ভাল করে বানালাম। বেশিক্ষণ বসলো না। রিমঝিম শংকরদার মেয়ে। সেভেনে পড়ে। ওকে স্কুল থেকে টেবিল ক্যালেণ্ডার আর পেন স্ট্যাণ্ড বানাতে দিয়েছে। তাই নিয়ে বেশ একটা হুলুস্থুল পড়ে আছে বাড়িতে। আমি বারান্দায় বসে সিগারেট খাই, পেপার পড়ি। কিছু মনে এলে খাতায় টুকে রাখি। লেখা হলে বৌদিকে খুব পোলাইটলি বলি—

— ব্যস্ত আছো? একটা লেখা শুনবে?

পরদিন সকালে দশটা নাগাদ আবার এলো শকুন্তলা। বিকেলে ট্রেন ওর। রিমঝিমের হাতের কাজটা করে দিল। যেন ও আগে থেকে জানতো কি করতে হবে। আগে থেকেই যেন ওর প্ল্যান করা ছিল কিভাবে করবে ওটা। ফটাফট করে দিল জিনিসটা। আমি চেয়ারে বসে বসে দেখলাম। তারপরে ছাদে গেলাম আমরা। দুপুর মেঘলা তখন। ও নিভৃতে চাইছিল আমাকে। এ বাড়িতে ছাদের ওপরে ছাদ আছে একটা। অনেক বাড়িতেই থাকে। সেখানে উঠে আবিষ্কার করা গেল একটা ঘরও আছে। হুড়কো খুলে, ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম।

* * *

শকুন্তলার ঠোঁট এখন নতুন জিভের মতো অল্প লাল হয়ে আছে। ও বললো, আমার ঠোঁটও তাই। ছাদের ঘরটা থেকে আমরা বেরিয়ে, নেমে এলাম নিচের বড় ছাদে। রেলিঙে হাতের ঠেস দিয়ে ঝুঁকে আছি দুজনে। এখান থেকে শংকরদার ফ্ল্যাটে ঢোকার গলিটা দেখা যায়, স্পষ্ট। গলির মাথায় রাস্তাটাও দেখা যায় কিছুটা। শকুন্তলা বললো,

— নিচে চল। বৌদি স্নান করে বেরিয়ে ছাদে কাপড় মেলতে আসবে হয়তো।

আমরা তাও আরো কিছুক্ষণ তুলোর মতো লেগে লেগে ভেসে ভেসে বেড়ালাম ছাদের এখান থেকে ওখানে। ওর গলায় ঘাড়ে মুখ গুঁজে ওর গন্ধ মেখে নিচ্ছি। শিবমন্দিরে থাকার সময়, এক রাতে ক্যাডবেরি কেনা হয়েছিল। ডেয়ারি মিল্কের ছোট প্যাকেট পাওয়া গেল না। তাই, অপছন্দের কিটক্যাট। আমি হোটেলের ঘরে ফিরে আসার পর শকুন্তলা বারবার জিজ্ঞেস করছে,

— ক্যাডবেরি এনেছিস?

— না।

— কেন?

— এমনিই… ক্যাডবেরি দিয়ে কি হবে?

— বলনা.. এনেছিস তাইনা?

— না বললাম তো

— ও, আচ্ছা। ঠি-কা-ছে।

আমি শ্যাম্পু, ময়েশ্চারাইজ়ার এগুলো টেবিলের ওপর রাখছি। ও বাথরুমে গেল। এই ফাঁকে আমি ক্যাডবেরিটা আমার ব্যাগে লুকিয়ে রাখলাম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে, আমার ব্যাগ ঘাঁটতে লাগল। কি করে যেন ঠিক সন্দেহ করেছে। কিন্তু পেলো না। সালোয়ার পালটে শকুন্তলা এখন হাউজ় কোট পরেছে। লাল আর কালো মেশানো। আমাকে বাঁ-হাত দিয়ে ঠেলে শুইয়ে দিল বিছানায়। তারপর বাঘিনীর মতো আস্তে আস্তে আমার ওপরে উঠে আসছে। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। কামাতুরা সব নারীর চোখ কি এক? যেমন সানি লিওন তেমনিই শকুন্তলা? টিভি চলছে। বোধহয় অ্যানিমেল প্ল্যানেট। টেবিলের ওপর রাখা রাতের খাবার। আমি হাত বাড়িয়ে ব্যাগ থেকে ক্যাডবেরিটা বের করে ওর হাতে দিলাম। ওর চোখে একটা দুষ্টুমি ঝিলিক দিল। আর ঐ ঝিলিকটাকে চোখে রেখেই খুলে ফেললো কিটক্যাটের প্যাকেটটা। এক টুকরো ঢুকিয়ে নিল নিজের মুখে। আমার মুখের ওপর ঝুঁকে এলো শকুন্তলার মুখ। জিভ দিয়ে কিটক্যাটের ভেজা টুকরোটা চালান করে দিল আমার মুখে। ঠোঁটের ভেতরে ঠোঁট, জিভের ভেতরে জিভ, আর তার ভেতর দিয়ে কিটক্যাটের একটা টুকরো এ-মুখ থেকে ও-মুখে চলে যাচ্ছে। তারপর মুখ সরিয়ে আয়নায় দেখি, দুজনের ঠোঁটই অল্প লাল অল্প বাদামি। দুজনের চোখেই আদরের ভাষা বরফের মতো ঝরে ঝরে পড়ছে। আমরা হোটেলের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। রাত গভীর হচ্ছে আস্তে আস্তে। রাস্তার বাতিগুলো কি এক অজানা মনখারাপ নিয়ে চুপচাপ ঝুঁকে আছে। দুটো নেড়ি কুকুর এখানে সেখানে রাস্তার ময়লা শুঁকছে। দূরে কোথায় একটা দুটো কুকুর ভৌউউউউউ করে উঠল। নেড়ি দুটো চমকে তাকালো এদিক ওদিক, কান খাড়া ক’রে। আমাদের হোটেলটাও চুপ করে আছে। শকুন্তলা হঠাৎ বলে উঠল—
There lies the heat of summer
On your cheek’s lovely art:
There lies the cold of winter
Within your little heart.
That will change, beloved,
The end not as the start!
Winter on your cheek then,
Summer in your heart.
— হঠাৎ হাইনে!

— কাল আমার ডায়রিতে যেটা লিখে দিয়েছিলি এটা তার উত্তর।

— কাল? কাল কি লিখেছিলাম?

— মনে কর

— কাল… কাল… কাল… কি লিখেছিলাম রে?

— মনে কর মনে কর… তুই-ই তো লিখেছিলি। তোরই তো মনে থাকা উচিত

— আঃ, মনে পড়ছে না তো, বল না—

— তাড়াহুড়ো নেই তো কোনো। পরে মনে ক—

— মনে পড়েছে

— ভালো

— ওটা ভাস্কর চক্রবর্তীর লাইন। ‘সঙ্গে থেকো সঙ্গে থেকো। সবসময় সঙ্গে সঙ্গে থেকো।’


২.

এত মন কেমন নিয়ে এই শহরের জল ছুঁইনি কখনো, আগে। এত জল এত মেঘ এত শহরও এই শহরে দেখিনি আগে। একটা বাসার নাম রাখা হয়েছিল, অক্ষরবৃত্ত। না, বরং বলা ভালো, রাখা হবে এমনটাই ঠিক হয়েছিল। এখন সেখানে ছন্দ কম, পড়িয়াছে। কিন্তু আমি জানি, মাত্রা অক্ষর পর্বে নয়, ছন্দ সব থেকে বেশি বাস করে যতির বাসায়। তবে, যতিতে থাকে স্মৃতি। তার পূর্বের সবটুকুর চলা ডুবে থাকে, মিশে থাকে যতির চুল থেকে নখ। একটা বাসার নাম রাখা হয়েছিল, অক্ষরবৃত্ত। এখন যতিতে এসে, সে বাসা, জ্বলজ্বল ও ছলছল করছে। বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতেও কি থাকে না বন্যার জল, মিশে?



কাল শকুন্তলা বলছিলো, আমরা যদি বাকি জীবনটা হোটেলে হোটেলে কাটিয়ে দিই? আসলে কিন্তু আমি যতটা জীবন ও জীবিকা বিমুখ, শকুন্তলা ততটাই জীবনমুখী। আমিও ওরকম জীবনমুখী হয়ে থাকবার চেষ্টা করে দেখেছি কয়েকবার। দু’তিন মাসের বেশি টানতে পারিনি। হাঁপিয়ে যাই। মাঝে মাঝে মনে হয় সারাদিন সিগারেট খেয়ে যাওয়া আর আমজাদ আলি খান সাহেবের সরোদ শুনবার জন্যেই বোধহয় বেঁচে আছি। ছাদ থেকে নেমে এলাম আমরা। যতটা ধীরে নামা যায়। নামছি। বৌদি স্নান করে বেরিয়েছে সদ্য। ভেজা চুল খুলে পুজোয় বসেছে। শকুন্তলা বৌদিকে আর রিমঝিমকে বলে বেরিয়ে গেল। আমি ওকে খানিকটা এগিয়ে দিলাম। ফিরে এসে দেখি চশমাটা ফেলে গেছে। বিকেলের বাস ধরে আমিও ফিরে এলাম কুচবিহার। সঙ্গে ক’রে নিয়ে এলাম ওর চশমাটা। আর পরদিন থেকে কি এক ভয় কোত্থেকে এসে চেপে ধরলো আমাকে। চিনিনা জানিনা কি এক ভয়। এরকম দম বন্ধ করা, শ্বাসরোধী একা লাগছে কেন বুঝতে পারছি না… হয়ত ভয় পাচ্ছি… হয়ত বুঝতে চাইছি না… যদি সেই কারণটা এই একার থেকে বেশি জোরালো হয়…? সারাদিন ধরে একটার পর একটা সিনেমা দেখে যাচ্ছি… যতক্ষণ দেখছি, ততক্ষণ, নিরাপদ লাগছে সব কিছু। সিনেমা ফুরোলেই, সারা ঘর, টেবিল, খাট, বইয়ের তাক, এমন কি ফ্যানের হাওয়া, সব চেপে আসছে… একের পর এক সিগারেট খেতে খেতে আর একটার পর একটা সিনেমা দেখতে দেখতে আমি কি কারোর আসার জন্য অপেক্ষা করছি? সবকটা সিনেমা দেখা শেষ হয়ে গেলে তখন আমি কি করব, সেটাও আরেকটা ভয়। কি মনে হল, fbটা খুলে চলে গেলাম এক মৃত মানুষের অ্যাকাউন্টে… কেন গেলাম? একটা মানুষ একদিন নিজের হাতে সাজিয়েছিল এই প্রোফাইল, কভার। সেই পুরনো পোস্ট, পুরনো শেয়ার, পুরনো ট্যাগগুলো। পুরনো স্টেটাস। ছবি। সব আছে। লোকটা নেই। নিজের মনে এটাই ভাবছি, এটাই বলছি, কেন গেলাম? আমিও তো এক আত্মধ্বংসী, আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষ... এবং vulnerable... তাহলে? এত লিখতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু, কিছুতেই কিচ্ছু লিখতে পারছি না। জীবনের ঝামেলাগুলোর মতোন চুলগুলো মুখের সামনে, চোখের সামনে চলে আসছে বারবার। নাকি চুলগুলোর মতোন ঝামেলাগুলো চলে আসছে! সারাদিন ধরে মাথাটা ব্যথা করে করে কাঁপিয়ে দিল একেবারে। সন্ধ্যে একটু রাতের দিকে গড়াতে শুরু করলে, ব্যথাটাও কমেছে যাহোক। কি মনে ক’রে ভাতখন্ডের হিন্দুস্থানী সংগীত পদ্ধতির বইটা বের করলাম। পঞ্চম খন্ড। খুব ভালো লাগলো এই কথাটা— দেসরাগশ্চ দ্বিতীয়প্রহরে নিশি। কি সুন্দর কথাটা! দ্বিতীয়প্রহরে নিশি। যতবার উচ্চারণ করছি, কথাটা, ভেতরে ইকো হয়ে হয়ে ঘুরছে। দ্বিতীয়প্রহরে নিশি। দ্বিতীয়প্রহরে নিশি। সারাদিন খুব ঘুমিয়েছি। রাতে কি জাগবো তাহলে? যদি জেগেই থাকি, কে জাগবে আসলে? আমি? নাকি আমার মতোন দেখতে কেউ জাগবে? এই ঘরে, এই খাটে, এই কম্পিউটারের সামনে, বুকসেলফের পাশে, কে থাকে? আমি? বাথরুমে যাবার সময়, টবে রাখা গাছগুলোর দিকে চোখ যায়। না, ঠিক যাবার সময় নয়, তখন একটা তাড়াহুড়ো থাকে যাবার প্রতি। চোখ যায়, ফেরার সময়। খুব মায়া হয় ওই সবুজগুলোর জন্য। নেহাতই অল্প ওরা। কিন্তু, তাতেই কতটা ভরিয়ে রাখতে জানে। ভরে থাকতে জানে। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে, আমি যখন বাথরুমে যাই, আমার কেন দেস অথবা সৌরঠ, কোন রাগের কথাই মনে আসে না!? বেশ একটু বড় হয়ে, ইমন রাগ শিখছি তখন। কল্যাণ ঠাট। বেহালার তারে সে রাগ তুলতে গিয়ে যেই না কড়ি মা লাগিয়েছি, ছেলেবেলার সেই ডাক, ফিরে এলো কানে। সন্ধ্যেবেলা, খেলার মাঠ থেকে ফিরে, আধো আলো আধো অন্ধকারে, কলতলায় হাত-মুখ ধুচ্ছি, আর চিৎকার করে বলছি, মাআআআআআআআআ….. খেতে দাও খিদে পেয়েছেএএএএ…. সেই তীব্র মা… আমার স্কেলটা মিলে গেল ন্যাচরাল সি-তে। আর কি আশ্চর্য, এটাও সন্ধ্যের রাগ। সেই কতদিন আগে, সন্ধ্যেবেলা, না জেনেই, কড়ি মা লাগিয়েছি। বিশুদ্ধ কড়ি মা-য় ডেকেছি মাকে। তারও কত পরে লিখেছি, ইমন ধুয়ে গেছে মায়ের কল্যাণে। সেই সন্ধ্যে। সূর্যাস্ত। ঘটাং ঘট ঘটাং ঘট করে আমি টিউকল পাম্প করছি, আর হড়হড় করে জল নেমে আসছে, ধুয়ে ফেলছি হাঁটুতে, পায়ের পাতায়, আঙুলে, হাতে, ধুলো কাদা। আর সন্ধ্যে নামছে, আস্তে আস্তে কালো হয়ে আসছে মাঠ। দূরের বাড়িগুলো আরো আবছা হয়ে যাচ্ছে। শাঁখে ফুঁ দিচ্ছে মা। চৌকাঠে দিচ্ছে জল ছিটিয়ে। শকুন্তলা হঠাৎ করে কেন জানিনা যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ভাস্কর চক্রবর্তী নামের ঐ লোকটার মতো আমিও প্রতিদিন আরো বুঝতে পারছি, একমাত্র লেখাই পারে, লেখাই পারে আমাকে বাঁচাতে। রক্তের মধ্যে শব্দের চোরকাঁটা ঢুকে গেছে কখন, অজান্তে। রাস্তায় বেরোলে অবধারিত ভাবেই কিছু চেনা মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায়। তবে জানা মানুষ নয়। একজন মানুষের একটা জীবনে জানা মানুষ ক’জন থাকে? আমার ক’জন জানা মানুষ? কিছু কিছু মানুষের সামনে শুধু হাসতে হয়। ঠোঁটদুটো দুপাশে যতটা পারা যায় ছড়িয়ে রাখতে হয় তাদের সাথে কথা বলার সময়। তারা যখন কথা বলেন, তাদের কথাগুলো যেন শুনছি, এরকম একটা ভান করার জন্যে সবসময় তখনো ঐরকম হাসিটা ধরে রাখতে হয়। তারা মুখ নিচু করে দেখেন আমার দু’পায়ের বড় বড় নখ। আমি এদেরকে কখনো আমার ঘরে আসতে বলতে পারি না। এদের সামনে প্রচুর মিথ্যেও বলে ফেলি আমি অবলীলাক্রমে। দেখাই, আমি কত ভাল আছি এখন, কত কাজ করছি, কত দায়িত্ব সামলাই আমি। কত পড়াশুনো করছি। কবিতা উপন্যাস পড়ার মতো ফালতু পড়াশুনো নয়। এ হল কাজের পড়াশুনো। যে পড়া পড়লে চাকরি হবে। জি.কে., জি.আই., কারেন্ট এফেয়ার্স, রিজ়নিং টেস্ট। কত ঠিক এবং ঠাক আছি আমি আজকাল, ইদানীং, দেখাই। নীল রঙের একটা সাইকেল ভ্যান বাচ্চাদের নিয়ে ফিরছে স্কুল থেকে। সরু সরু গলার তীক্ষ্ণ কোরাসের আওয়াজ চিঁ চিঁ করতে করতে চলে গেল। আজ মঙ্গলবার। কিছু একটা পুজো-টুজো হবে হয়তো বা। পাশের কোনো বাড়িতে শাঁখে ফুঁ পড়ল তিনবার। তৃতীয়বারের ফুঁতে বেশি জোর পেলো না ফুঁ দাত্রী। আচ্ছা, যদি ইন্টারভিউতে আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমার কী করতে ভালো লাগে, আমি কি বলতে পারবো, আমার ‘দেসরাগশ্চ দ্বিতীয়প্রহরে নিশি’ কথাটা বারবার উচ্চারণ করতে ভালো লাগে?

সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১২

ধারাবাহিক বড়গল্প - মৌ মধুবন্তী

ফোর-ওহ-ওয়ান (এক)
মৌ মধুবন্তী


সবে চোখ জুড়ে ঘুমের মেঘমল্লার নেমে আসছে। এনালগ ফোনের ঢঙ্গে ক্রিং ক্রিং আওয়াজ। কান খুলে দিয়েছে তার দরজা, কিন্তু ঘুম চোখে মেঘেরা দূরে যেতে রাজী নয়। রাজ়িস্মিতা পাশ ফিরে শোয়। ঘুমের দেশে অসাড় দেহ ভাজ হয়ে পড়ে থাকে অর্থোপেডিক বেডে। নীল রঙের বিছানার চাদর। তার খুব প্রিয় রঙ। ঐ চাদরের উপর সে দিয়েছে আজ সাদা লেসের পিলো কভার। একটু হাল্কা এমব্রয়ডারির কাজ করা। বিছানার ব্যপারে রাজিস্মিতা সব সময় বেশী রকমের বিলাসি। ঘুমাতে যাবার আগে বেডে পারফিউম ছিটাবে। নতুন করে বিছানা ঝাড়বে। কুইল্টের নীচে একটা হাল্কা রঙের চাদর তার চাই-ই চাই।কি শীত কি গ্রীষ্ম কুইল্ট আর ফ্ল্যাট বেড শীট তার বিছানায় থাকবেই। বেডটাও কিনেছে মাত্র কিছুদিন আগে। আর ম্যাট্রেস হলো টাইম নাম্বারড। ইচ্ছে মতো ফার্ম বা শক্ত বা নরম করা যায়। হিটিং প্যাড লাগানো আছে। প্রবল শীতে সুইচ অন করলে পুরো বেড বা আংশিক বেড গরম হয়ে উষ্ণ-আরাম আমেজ তৈরি করে দেয়। কত কি আছে এই নর্থ আমেরিকায়।

উত্তরাধুনিক শয্যা। পেছনে ফেলে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে রাজী। উত্তরাধুনিক মনের উপর ও হামলা করেছে নবীন কোন উল্কা। গ্রহগুলো চারিদকে বিভীষিকাময়য়। জি পি এসের থ্রি ডি প্যানেল এ একের পর এক ফোন নাম্বার ঝলসে ওঠে। এখন সব কিছু অচেনা লাগে। রিয়ার ভিউ অন করতেই মন চলে যায় দূর অতীতে। মেমোরি সেল স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মত এনিমেশানে তুলে আনে হাই পীচ, মিডিয়াম হিউ আর সার্প কাট পীচ।
পিচ ব্রিজ পার হয়ে মাত্র চার বছর আগে রাজীস্মিতা কানাডায় আসে । সিরাত ও সে , তারা জীবনসঙ্গী হিসাবে দু’জন দু’জনকে গ্রহণ করেছে। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর ইন্সটিটিঊশানাল কোন দায় বদ্ধতা নেই। মানসিকভাবেও নেই বটে, কিন্তু বাবা-মায়ের কারণে দু’জনেই কোর্টে গিয়ে সাইন করে আই ডু করেছে। কোর্টেই তারা বলেছে, উই আর সোলমেট; লাইফ পার্টনার, ট্রু ফ্রেন্ড।
মিসিসাগার এরিন মিলসে তাদের দু’জন মানুষের জন্য পঁচিশ ‘শ স্কয়ার ফুটের অত্যাধুনিক ফেসিলিটিসসহ একটি টাউন হাউস। বাসার পেছনে ঘন সবুজ র‍্যাভিন। মাঝে মাঝে হরিণ এসে দেখা দিয়ে যায়। রাজিস্মিতার মা অনেকদিন আগে বলেছিল, সুখী বন্ধুদের কাছেই হরিণ আসে। তাই সে মাঝে মাঝে নিজের মনেই আহল্লাদিত হয়ে ওঠে। সে সত্যি সুখী। বন্ধনের নাম যাউ হোক সুখটা সবারই কাম্য।
আমেরিকায় মাইক্রোবায়োলজিতে পি এইচ ডি করার পরে, পরিচয় হয় সিরাতের সাথে, অনলাইনে। সিরাত ক্যামিস্ট্রিতে পি এইচ ডি করেছে টরন্টো ইউনিভার্সিটি থেকে। তারপর কোম্পানীর স্পন্সরশীপে সে স্থায়ী বাসিন্দা হবার ছাড়পত্র, পিয়ারকার্ড ও অবশেষে পাসপোর্ট পায়। রাজিস্মিতার স্টুডেন্ট ভিসা শেষ হলে তাকে দেশে ফিরে যেতে হবে। তার জন্য সে সম্পুর্ন প্রস্তুত ছিল। কিন্তু সিরাতের সাথে পরিচয় হলে, সেই প্রস্তুতিতে নতুন বাঁক আসে। তবে সে সিরাতের স্পন্সর নিতে রাজী হয়নি; বরং নিজেই কানাডায় ইন্ডেপেন্ডেন্ট ক্যাটেগরিতে এপ্লাই করে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে সরাসরি চাকুরী নিয়ে আসে।
যেদিন সে তার চকচকে নতুন হাইব্রিড টয়োটা ক্যামরি নিয়ে ইমিগ্রেশানের কাজ শেষে পিচ ব্রিজ পার হয়ে স্টেনলি রোড ধরে নায়েগ্রা সিটিতে ঢুকেছে, সেদিনকে মনে হচ্ছে, এই তো মুহুর্ত আগেই ঘটেছিল। যদিও মাঝে চলে গেছে নদীর স্রোতের মত চারটি বছর, পুরো আটচল্লিশ মাস আনন্দে ও উজ্জ্বল হাসিতে। ভাবেনি কখন ও এমনি করে উল্কা খসে পড়বে জীবনের সৌরমণ্ডল থেকে। আজ অজানায় সে গাড়ি চালাচ্ছে। লক্ষ্যহীন এই ফোর অহ-ওয়ানে
বোস্টন থেকে গাড়ি নিয়ে বেরুতে গিয়ে মনে হয়েছিল, আহা, গত ছয় বছরের সব স্মৃতি এখানে জমা রেখে যাচ্ছি এক গভীর প্রত্যয়ে। কোনদিন অবকাশ পেলেই ছুটে আসব এই স্মৃতির বেহালা বাজাতে। বেহালায় রাজীস্মিতার হাত দারুণ ভালো। কয়েকবার সে ইউনিভার্সিটিতে প্রতিযোগীতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। মিউজিক তার মজ্জায় গাঁথা। রাজীস্মিতার বাবাও একজন পন্ডিতসম বেহালা বাদক ছিলেন। তবে নিভৃতচারী বলে তিনি তেমন খ্যাতি অর্জন করেননি। করতে চাননি। মেয়েকে শিখিয়েছেন সমস্ত যত্ন দিয়ে।
হাজার পরীক্ষার চাপেও রাজীস্মিতা কোনদিন বেহালাকে দূরে রাখেনি। অন্তরঙ্গ বন্ধু অন্যতম অনুভব তার বেহালা।
ম্যাসাসুসেটস টার্নপাইক থেকে বার্কশায়ার এক্সিট নিয়ে নিউইয়র্ক স্টেট থ্রু ওয়েতে উঠেই গানের ধারা বদলে দেয় সে। Michael Lucarelli এর ক্ল্যাসিক্যাল গীটারের সাথে Theresa Ellis ক্ল্যাসিক্যাল বেহালায় স্প্যানিশ রোমান্স শুনছে। গাড়ির স্টিয়ারিং সে হাত দিয়ে টুং টাং করছে। এই রাস্তায় সে কোনদিন গাড়ি চালায় নি। তবু মনে হচ্ছে যেন কত চেনা। সিরাত অনেকবার বলেছে, সে এসে নিয়ে যাবে তাকে বস্টন থেকে। না। রাজীস্মিতার আহলাদ, আমাকে তুমি চমক দিও পথের মাঝে। কখন? কোথায় ? কিভাবে? জানিনা। এমনকি এই যে সে আজ রওয়ানা হয়েছে কানাডার দিকে তাও সিরাতকে জানায় নাই। কিন্তু সেল ফোনে কথা হচ্ছে অনর্গল ব্লু টুথ দিয়ে। জি পি এস মিডিয়া।
সিরাত- সুইট হার্ট কবে আসবে?
রাজিস্মিতা- যে কোনদিন, তিনমাসের মধ্যে কানাডায় ঢুকে পড়লেই হলো।
সিরাত- কেন, বেবি? আই ক্যান’ট ওয়েট। আই মিস ইউ।
রাজীস্মিতা- মি ঠু; বাট অনেক কাজ গুছাতে হবে, বুঝতে পারছ তো, অনেকদিনের ঘর সংসার , একার, তাতে কি? গুছাতে হচ্ছে সবকিছু।
সিরাত- খালি ল্যান্ডিং পেপার নিয়ে তোমার আত্মাটা সাথে নিয়ে চলে আসো; পথে তোমাকে আমি হাইজ্যাক করব। কোথায়? কখন ? কিভাবে করব জানবে না।
রাজীস্মিতা- হাম। সে হাসে মনে মনে। তুমি জানো না । কখন আমি কানাডার বর্ডার পার হয়ে গাড়ি ভর্তি জিনিস নিয়ে তোমার আলয়ে হাজির হব।
সিরাত- হাই সুগার, তুমি জানো না যে আমি তোমার প্রতি মুহুর্তের খবর রাখি। আর রাজীস্মিতা জানে না যে তাকে পেছনের গাড়ি দূর থেকে ফলো করছে, এবং সিরাতকে সে অনর্গল কমেন্ট্রি দিচ্ছে।
সিরাত তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে বললো, তুই কিছুতেই ধরা পড়িস না। আর বর্ডার ক্রস করিস না। এইপারে আমি অপেক্ষা করব। কিন্তু বন্ধু সে কথা মানেনি। সে ঠিক ঠিক বর্ডার ক্রস করেছে। কারণ সে পুরো মজা থেকে বঞ্চিত হতে চায় না। অনেকদিনের পুরনো বন্ধু বলে কথা।
রাজীস্মিতা নিউইয়র্ক স্টেট থ্রু এর আরেক নাম হোল আই-নাইন্টি ওয়েস্ট। এই আই-নাইন্টি ওয়েস্ট একসময়ে আইওয়েস্ট নর্থ সেভেন এ রূপান্তরিত হয়ে যায়। সাথে তার গানের সুর বদলে যায়। এবার সে তার বিশাল কালেকশান থেকে বেচে নেয়, রিচার্ড জোন্স এর ভায়োলিন ও ফিল গ্রেগরী-এর টেট্রিস মিউজিক ইম্প্রোভাইজেশান-এ। এই সুর তাকে হালকা করে দেয়, উড়িয়ে দেয় নরম চুলের মত, আকাশে পেঁজা তুলার মত, কিংবা সাদা পালকের মত ধনাঢ্য বাতাসে। উড়তে উড়তে আই-এইটি-সেভেন নর্থ আবার সংঙ্গমে লিপ্ত হয় আই-নাইন্টি ওয়েস্ট এর সাথে। রাজীস্মিতা যেমন একাই চলছে আরেকজনের সাথে মিলিত হতে, কিন্তু আসলেই সে একা নয়, তেমনি এই আই-নাইন্টি ওয়েস্ট তার সাথে একশ যোগ করে নতুন নাম নেয়, আই-হান্ডড্রেড নাইনটি ওয়েস্ট। মনে হলো সিরাত এসে বসে পড়ে রাজীস্মিতার আগে। গন্তব্য এক অথচ ভিন্ন একটা সংখ্যা। পারসোনালিটি ভিন্ন। সত্যি তো জীবনের সংখ্যায় এখন তারা দু’জন দু’জনার । সাথে একদল স্বপ্ন। বাকী যা কিছু শুধু পথ চলার আনন্দ সুর। নবগান, উল্লাস।
সিরাত আর আই-হান্ড্রেড-নাইন্টি ওয়েস্ট রাজীস্মিতাকে নিয়ে আসে এক্সিট নাইন দিয়ে বের করে পিচ ব্রিজ বর্ডার ক্রসিং এ। ইমিগ্রেশান শেষ করেই এসে উঠে কুইন এলিজাবেথ ওয়েতে। বাহ! অনুভূতিটা এখন সত্যি রাণীর মত। এমনটা হবে ভাবে নি সে কোনদিন। শক্ত মনের মেয়ে। ভালোবাসায় বিশ্বাস আছে অগাধ ও নির্মল। তবে কারোর মনের রাণী হবে এমন তার মনের অবস্থা ছিলনা। সহজ এক বৃত্তে বড় হয়েছে বেহালার সাথে প্রেম করে। এই তার অভিজ্ঞতা পি এইচডি ডিগ্রী অর্জনের আগ পর্যন্ত। একসাথে দু’টো ডিগ্রী পেয়েছে। বন্ধুরা তাই বলে। সে হেসে উড়িয়ে দেয়। তবে ধরে রাখে সিরাতকে অন্তরের গভীরে প্রত্যয়ে ও পরম মমতায়। কিউ ই ডাবল ইউ তে প্রায় বিশ মাইল গাড়ি চালিয়ে সে এখন উঠছে হাইওয়ে ফোর টুয়েন্টিতে। চারশ বিশ। রাস্তার এমন নাম কি বাংলাদেশে দেবে? হাসতে হাসতে সে ভাবছে, আহা আজ সিরাতের দম বন্ধ হবে তাকে দেখে। ফোর টুয়েন্টি। চারশ বিশ। চমকে উঠবে ভুতের মত। সিরাত হয়ত তাকে কোলে নিয়ে নাচতেই ভুলে যাবে। যেমন করেছিল প্রথম দেখায়। বস্টন মাতিয়ে রেখেছিল সেই সন্ধ্যায়। এখানে প্রথম ট্রাফিক লাইটেই সে এসে ঢোকে স্টেনলি এভিন্যুতে , আর সাথে সাথে বিকট হঙ্কের শব্দে সে এলোমেলো হয়ে পড়ে। কয়েকটা গাড়ি তার গাড়ীকে সামনে ও পেছন থেকে ঘিরে ধরে। রাইট সিগন্যাল ইনডিকেটর দিয়ে তাকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে পাশের পার্কিং লটে যেতে। ডেয়ারি কুইন আইসক্রিম এর দোকান।
বলাই বাহুল্য, যে এই ডেয়ারি কুইন এর মালিক বর্তমান সময়ের বিলিয়নাদের অন্যতম একজন ওয়ারেন বাফার। রাজিস্মিতা হার মানার নয়; দিনে দুপুরে কানাডায় না ঢুকতেই তাকে স্কট করে হ্যাইজ্যাক করবে, এমনটা সে আশাই করতে পারেনি। তবু সে হাল ছেড়ে দেবে না। মনে মনে কুইন এলিজাবেথকে বলছে তুমি রাণী, আমি ও রানী। তোমার দেশে এসেই আমি বেমালুম হাইজ্যাক হয়ে যাব, সে হবার নয়। সে স্টেনলি এভিনিউয়ের চার লেনের রাইট লেনেই সে আছে। সামনে রেড সিগন্যাল। বাঁয়ে যাবার উপায় নেই। ডানেই মোড় নিয়ে তাকে পার্কিং লটে যেতে হবে। প্রুস্তুত হয়েই রইলো, এই ভর দুপুরে দেখি তারা কি করে আমাকে হাইজ্যাক করে। সে ডান দিকে মোড় নিয়েই সার্প আরেকটা রাইট টার্ণ করে, ডেয়ারি কুইনের এন্ট্রেনসের সামনেই গাড়ি পার্ক করে, নিজেকে প্রস্তুত করে। সবগুলো গাড়ি তাকে ঘিরেই পার্ক করলো। পেছনে একটা বড় সাদা লিমোজিন এসে আটকে দিলো তাকে।
পেছনে ব্যাক করার উপায় নাই। একদল ইয়ং ছেলে মেয়ে বের হয়ে আসলো ডেইরী কুইন থেকে হোই হৈ করতে করতে। তারাও অবাক হয়ে দেখছে, কি হচ্ছে। দরজা লক করে দিয়ে সে বসে আছে গাড়িতে। জোরে সে মিউজিক ছেড়ে দিয়েছে তার মনকে শক্ত করতে। ভায়োলিনের (বেহালা) সুর তাকে যে কোন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে সাহায্য করেছে সারা জীবন; বিশ্বাস, আজো করবে। মুখে মাস্ক পরে এক লম্বা যুবক, কালো রঙের বস টক্সিডো পরে নেমে এসেছে লিমোজিন থেকে।
আজ রাজীস্মিতা পরেছিল সিরাতের প্রিয় নীল রঙের একটা শোল্ডারলেস মিডি। এই রঙ্গে রাজীকে দারুণ মানায়। মেসিস থেকে গতকালই সে মাত্র কিনেছে এই ড্রেস। সাথে সিলভার কালারের ড্রেস স্যান্ডেল। বর্ডার ক্রস করেই সে পা থেকে পাঙ্কি কেডস ও গা থেকে জিনস ও টি সার্ট খুলে, পরে নিয়েছিল নতুন পোশাক। কে জানতো এই পোশাক তাকে এমন বিপদে ফেলবে। কেডস থাকলে দুই চারটা কিক দেয়া যেত। আবার ভাবছে এই দিনে দুপুরে কি করে তারা সবার সামনে থেকে আমাকে হ্যাইজ্যাক করবে? দলবদ্ধ ইয়ং গ্রুপটি পার্কিং লটে আড্ডাবাজি করছে আর আড় চোখে খেয়াল রাখছে, বেগতিক দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে কেউ, কেউবা নাইন ওয়ান ওয়ান কল করবে এমন প্ল্যান। ওদের একজন এক্সিটের পাশে গাড়ি নিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করছে।
রাজীর হাসি পাচ্ছে টক্সিডো পরে কেউ হাইজ্যাক করতে আসে নাকি? আবার মুখে একটা হ্যালোইউন মাস্ক। দরজায় নক করলেই রাজীর বুকের ভেতর ভয়ের চেয়ে কেমন যেন এক আনন্দের ঢেউ উদ্বেলিত হতে থাকে। মন বলে খারাপ কিছু নয়। একি অভিনব কোন পদ্ধতি? সে এবার মনকে শক্ত করে দরজার লক খুলে দেয়। যুবকের হাতে কোন বন্দুক নেই, পিস্তল নেই। কিন্তু একটি হাত পেছিনে লুকানো। হোক তাতে কি? লক খুলতেই শাট করে দরজা খুলেই যুবক তাকে হ্যাঁচকা টানে বের করে নেয় গাড়ি থেকে, সোজা তুলে নেয় বুকের উপর। রাজীর কোন শক্তি নেই যেন তাকে বাধা দেয়। এই ধরায় এক চির চেনা আবেশ আছে, আছে মায়া, মমতা। যুবক তাকে বুকে চেপে ধরে হাগ দেয়। চুলের ভেতরে হাত চালিয়ে আদর করতেই থাকে, রাজির শরীর ক্রঃমশ নিস্তেজ হতে থাকে।
কয়েক সেকেন্ড রাজী দ্বিগুণ ত্যাজে ঝাপটা দিয়ে মাস্ক খুলে নেয় যুবকের মুখ থেকে। সি রা ত!!! আনন্দে কান্নায় রাজী সিরাতের চুল টানতে থাকে। বুকে মুখ লুকিয়ে আদর দিতে থাকে, নাক ঘসে সব আড়ষ্টতাকে বিতাড়িত করে। সিরাত তাকে কোলে করেই তাকে তুলে দেয় লিমোজিনে। সবাই শিশ বাজিয়ে তাকে অভিনন্দিত করে কানাডায়। সিরাতের হাতে তখন ওয়ান ক্যারেটের ডায়মন্ড রিং, কিছুক্ষণ আগেই সে পিপলস থেকে কিনে এনেছে। বন্ধুরা সবাই একে একে তাদের গিফটগুলো তুলে দেয় রাজির কোলে। রাজী সবাইকে হাগ দিতে থাকে। তারপর চিৎকার করে বলে সি ----র---র, আই ওয়ান আইসক্রিম।
সির জানে, রাজী আইসক্রিমের পাগল। যদি ও সে স্বাস্থ্য সচেতন। গত ছয় বছরে এক পাউন্ড ওজন বাড়তে দেয় নাই সে। সে পুরোদমে একটা মেনিক্যান কন্যা। গায়ের রঙ তেমনি উজ্জ্বল, আপেলের মত। উচ্চতা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। সিরাতের উচ্চতা হলো পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি। স্ল্যান্ডার বডি। নিয়মিত ব্যায়াম করে। হাতে থোকা থোকা মাসল বানিয়েছে সে। বুকটাও বেশ চিতানো। পুরো হাত ও বুক ক্লিন শ্যাভেন। হাতে বুকে লোম সিরাতের একদম পছন্দ নয়। সে মেয়েদের মত ভ্রু প্লাগ করে নিয়মিত। ফ্যাশানে সে একদম ওয়েস্টার্ন কেতা দুরস্ত। রাজিও স্ট্রেস জিনস, লো কাট জিনস, টপস, মিনি স্কার্ট এই সবেই অভ্যস্ত। শাড়ি সে কোনদিন পরেনি। সালোয়ার কামিজে সে কোন ডিজাইন খুঁজে পায় না। নো কম্ফোর্ট এট অল।
রাজির গাড়িতে ড্রাইভিং সীটে বসে পড়লো ফোরম্যান, সিরাতের কানাডিয়ান বন্ধু। কেউ উঠলো লিমোজিনে, কেউ উঠলো রাজীর হাইব্রিড টয়োটাতে। সবাই মিলে এক বিরাট সমাবেশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে ডেয়ারি কুইন এর পার্কিং লট থেকে। ডান দিকে মোড় নিয়ে সোজা চলতে থাকে স্টেনলি এভিনিউতে। সেকেন্ড ট্রাফিক লাইটে লেফট টার্ণ করে তারা উঠে রবিনসন স্ট্রিটে। ফলসভিউ ব্যুলুবার্ড এ গিয়ে তারা সোজা ব্যালেট পার্কিং এর জন্য গাড়ি হোটেল শেরাটনের ফ্রন্ট ইয়ার্ডে রেখে চলে যায় প্যান্থহাউজে ফলস ভিউ রুমে। আজ ভিউ বদলে গেছে। পতন হয়েছে ভিউয়ের। সেই থেকে রাজিস্মিতা আজ এই অজানার পথে নতুন পথের সন্ধানে। সেদিনের টয়োটার বয়েস ছিল মাত্র একমাস। আজকের টয়োটার বয়েস হলো চার বছর একমাস।
পরদিন হোটেল থেকে বেরিয়ে সিরাত তার গাড়িতে, রাজী তার গাড়ি নিয়ে তাদের মিসিসাগার বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। কুইন এলিজাবেথ থেকে হ্যামিল্টন এসেই রাস্তা ভাগ হয়ে যায় হাইওয়ে ফোর ওহ থ্রিতে। হাইওয়ে ফোর ওহ থ্রিতে ধরে দু’জনের গাড়ি চলতে থাকে ইস্টের দিকে। পার হয়ে যায় বার্লিংটন, তারপর ওকভিল। মিসিসাগা আর বেশি দূরে নয়। কিন্তু হাইওয়ে ফোর ওহ থ্রি থেকে বেরিয়ে সিরাত সোজা উঠে যায় হাইওয়ে ফোর-ওহ-ওয়ানে।
রাজী ফলো করে , ভাবে, ও যাচ্ছে কোথায়? সিরাতের মাথায় সারাক্ষণ এডভ্যাঞ্চার ঘোরাঘুরি করে, অজানা নয় রাজির কাছে। হাইওয়ে ফোর-ওহ- ওয়ানে উঠেই সিরাতের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলা শুরু করে। সে সেকেন্ডে সেকেন্ডে লেন চেঞ্জ করছে। কখন ও অকারণে এক্সিট নিচ্ছে আবার উল্টো দিকে গিয়ে টার্ণ নিয়ে র‍্যাম্পে কসে থাপ্পড় লাগিয়ে মার্সেডিজ নিয়ে উঠে যাচ্ছে হাইওয়ে ফোর ওহ ওয়ানে। রাজী কি কম যায়? রাজীর বয়েস মাত্র ২৬ আর সিরাত তার থেকে দেড় বছরের বড়। রক্তে জোয়ানী টগবগ করে। এক্সিলেটর নিয়ে খেলতে এদের বয়েসের জুড়ি নেই। নতুন গাড়ি হলে তো কথাই নেই। সিরাতের গাড়ির বয়েস মাত্র ছয়মাস। এই হাইওয়ে ফোর ওহ ওয়ানে সর্বমোট পাঁচবার সে এক্সিট নিয়েছে এবং পাঁচবার সে ইউ টার্ণ করেছে। ছয়বারের সময় রাজীকে হারিয়ে ফেলে। ইস্লিংটন এসে রাজী তার জিপিএস এর মাত্রাতিরিক্ত ইউ আর ক্যাল্কুলেটিং এর রশি ধরে হাইওয়ে ফোর ওহ ওয়ানে ইস্টের থেকে ওয়েস্টে উঠে যায়। এবং ডিরেকশান ফলো করতে থাকে। এবার রাজির মাথায় শয়তানী বুদ্ধি। সে সিরাতের আগেই গিয়ে বাড়ি পৌঁছাবে। খুঁজুক সিরাত তাকে। সিরাত তার লেটেস্ট মডেলের গাড়ির ব্যাক ক্যামেরায় তাকিয়ে দেখে রাজী নেই পেছনে।
চিন্তিত হয়ে ব্লু টুথ এর সাহায্য নেয়। আই ফোন বলে দেয়, ডায়াল মেরি জান। ওদিক থেকে মিউজিক সিস্টেমে অপুর্ব একটা রিং টোন বাজে, সাথে ডায়ালগ মাই সুইট হার্ট, ইটস মি । রাজী হা হা করে হাসে আর জিজ্ঞেস করে কি করছ বেবি। তুমি কোথায়? তোমার অন্তরে। হার্টের মধ্যিখানে। হার্টের মধ্যিখানে জিপিএস লকেট করতে পারেনা। সেই রকম কোন কেরামতি এখনো কেউ আবিষ্কার করতে পারে নাই। কোথায় তুমি মাই সুগার।
সুগার তখন এক্সিট নিচ্ছে এরিন মিলসে। সিরাত এখন প্রায় ডন ভ্যালির কাছাকাছি। এই ডন ভ্যালির রোমাকন্টিকতা তাকে দুরন্ত করে তোলে। তার বাঁধ ভেঙ্গে দেয়। তার রন্দ্রে রন্দ্রে রক্ত টগবগ করে ফোটে। চুম্বনের আবেশে সে হারিয়ে যেতে চায় মেঘের ভেতর। এই মেঘ হবে আজ তার জান। জানতে চায় কোথায় সে এখন, উত্তরে শুধু খিলখিল হাসির কঙ্কন বাজে রিনিঝিনি।
সুগার তুমি কোথায়? ইউ টার্ণ এ। হাম। এই কাজ? আসছি আমিও। সুগার অপেক্ষা করতে থাকে। ডন ভ্যালি থেকে সিরাত এক্সিট নিতে যাচ্ছে ব্লোর স্ট্রীট এ। সেখানে সে র‍্যাম্প থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে আবার ওঠে ডন ভ্যালি নর্থ এ। ৯০ কিলোমিটারের বেশী এক কিলোমিটার স্পীড বাড়তে পারে না। জিরো টলারেন্সে গাড়ি চলছে। ফোন বেজে ওঠে। ব্লু ঠুথ সত্যি এক বিশাল সহায়ক গাড়ি চালাতে চালাতে কথা বলতে। মিউজিক থেমে যায় ফোন কল আসলে।
বল। কলার আইডিতে পাভেলের নাম। পাভেল তার আর পাঁচজন বন্ধু সহ টরন্টো আসছিল রাজির সাথে দেখা করতে। দু’টো গাড়িতে তিনজন বন্ধু। । এক গাড়িতে স্বামী স্ত্রী ও আরেকজন ব্যাচেলর বন্ধু। তারা হাইওয়ে ফো-অহ-ওয়ানে উঠেই বিরাট এক ট্রাকের ধাক্কায় নিসপিস হয়ে গেছে। গাড়িতেই তিনজন অন দা স্পট চিরদিনের জন্য বিদায় নেয়। পাভেল এই খবর জানালো সিরাতকে। সিরাত আবার গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা ছুটছে ফোর -ওহ- ওয়ান ইস্টে। রাজী অপেক্ষা করছে বাসার সামনে। তার কাছে কোন চাবি নেই। রাজি আমি মন্ট্রিয়ালের দিকে যাচ্ছি। তানিম তার স্ত্রীসহ চিরদিনের জন্য চলে গেছে।
রাজী বললো, সিরাত আমার জন্য ওয়েট করো, আমিও আসছি। তাদের আর বাসর হলো না। তাদের আর ঘরে ঢোকা হলো না। রাজী তার গাড়ী একটা হোটেলের ব্যালেট পার্কিং এ রেখে সিরাতের গাড়ীতে উঠে পড়ে। গাড়িতে কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। নির্বাক দু’জনেই। পশ্চিমের সুর্য ক্রঃমশ হাল্কা হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার লাগছে। পেটে খিধা আছে কিনা কেউ জানেনা। অনুভূতি একদম ভোঁতা হয়ে গেছে। গাড়িতে কোন গান বাজছে না। রাজির ভেতর অগ্নিগিরির জ্বালামুখ থেকে উত্তপ্ত লাভা নির্গত হচ্ছে। কেবল তার সাথে দেখা করতে আসতে গিয়ে এই রকম আত্মদান? একি উপহার! আগের রাতে তানিম মহা উচ্ছ্বাসে রাজিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, আজ সারা রাত আড্ডা হবে। নো ঘুম। নো একা থাকা। বস্টনের লাইফ ফিরে পেতে চেয়ে অনেক প্ল্যান এর কথা বলেছে রাজিকে। চোখ থেকে কোন জল ঝরছে না। মনে হচ্ছে চোখে নিঠুর পাথর তার স্থান করে নিয়েছে । সিরাত শুধু নিবিষ্ট মনে গাড়ি চালাচ্ছে। ফোর -ওহ -ওয়ান এ।
কিংস হাই ওয়ে ফোর -ও -ওয়ান আবার ম্যাকডোনাল্ড কার্টিয়ার ফ্রি ওয়ে নামেও আরেকটা পরিচিতি তৈরি করেছে। আবার আঞ্চলিক ভাষায় একে বলা হয় ফোর- ওহ-ওয়ান । উইন্ডসর থেকে শুরু করে মন্ট্রিয়াল পর্যন্ত এই হাই ওয়ে অন্টারিওর বুক চিরে এক ব্যাপক সংযোগ তৈরি করেছে। গানানক –ব্রকভিল সেকশানে বাই পাস করা হয়। যেখান থেকে তানিম বাইপাস করে চলে গেছে আরেক গ্রহে যার ঠিকানা আমাদের কারই জানা নেই। থাউজেন্ড আইল্যান্ড পার্কওয়েতে কত হাজার স্মৃতি তৈরি করেছে তানিম। তাই ভাবছে সিরাত । রাজি তো এতো চেনেনা। তাই তেমনি চুপচাপ বসে আছে।
পাভেল পুলিশ এম্বুলেন্স এদের সাথে চূড়ান্ত রকমের হেপার মধ্য দিয়ে গত কয়েক ঘন্টাকাটিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। স্বামী –স্ত্রী দু’জনেরই গলা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। গাড়ীর নৃশংস রকমের চুরমাচুর অবস্থা দেখে তারা দু’জনেই ভেতরে ছিন্নভিন্ন কিন্তু বাইরে ঠাটের উপরে দাঁড়িয়ে তারা সবাইকে ফোন করছে।
চার বছর পরে আজ রাজী এই ফোর-ওহ -ওয়ান এ বেরিয়ে এসেছে খালি হাতে। সব কিছু পেছনে ফেলে। সেদিন সে পিচ ব্রিজ দিয়ে কানাডায় প্রবেশ করে। আজ সে ব্রকভিল বাইপাস ধরে কোথায় বাই পাস নেবে কিছুই জানেনা। অনেক সখে গড়া স্বপ্নের সংসার, ইউনিভার্সিটির চাকুরী, ভালোবাসা ও সোসাইটি, বন্ধু, বন্ধুদের বাচ্চা ও গান সব ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে একশ বিশ কিলোমিটার গতিতে। সাথে আছে বাবার দেয়া অন্যতম বন্ধু, বেহালা। মনের ভেতর শিকে গাঁথা স্মৃতিগুলো কাবাবের গন্ধ ছড়াচ্ছে- গানানক এক্সিট পার হতে দিলোনা তাকে। হাতের ডান দিকে এক্সিট। তানিমকে দেখে যেতে হবে। একদিন এখানেই সমাপ্তি হয়েছিল তাদের। চরম লাকি। দুজন একসাথে। রাত কেতে গেছে সার্ভিস স্টেশানে। আকাশে ছিল তারা। বছরের শেষ দিন।
গাড়ি ছুটছে। এই জীবন থামার নয়। ৩১ ডিসেম্বর রাত থেমে থাকেনি। নতুন উদ্যমে চারিদিকে সুর্যের আলো ঘোষণা দিয়েছে চলতে চলতে নতুন পথ ঠিকানা খুঁজে দেবে কিনা জানা নেই- আছে শুধু অজানায় হারিয়ে যাবার এক বিস্তৃত ভাবনা। গাড়ির রেডিওতে বেজে ওঠে Said Dulevic er play—হ্যাপি নিউ ইয়ার দুই হাজার ১৩ এর চিত্তাকর্ষক বাজনা। স্পীড বাড়িয়ে দেয় রাজী-

টরন্টো, কানাডা, পৃথিবী
২৭ ডিসেম্বর, ২০১২