উত্তর সম্পাদকীয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উত্তর সম্পাদকীয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০১৪

উত্তর সম্পাদকীয় - চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

উত্তর সম্পাদকীয়
চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না

‘আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন’ সাংসদ, তব্য গর্বিত নয় রাজ্যবাসী



এই রাজ্য থেকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হয়েছেন একজন আহমেদ হাসান ইমরান, যিনি পেশায় সাংবাদিক। তাকে জেতাতে কংগ্রেস, আর এস পি এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের বিধায়কদের ভোট কেনা হয়েছিল বলে অভিযোগ। কেনার অভিযোগ উড়িয়ে শাসক দলের মুখ বলেছেন, মমতা সরকারের উন্নয়নের জোয়ারে তারা স্বেচ্ছায় এসেছেন। মানুষ জানেন, বিনা স্বার্থে রাজনীতিবিদরা এক পা ফেলেন না, উৎকোচ-উপঢৌকনই সার কথা। ইমরানের জয়কে সংখ্যালঘু স্বার্থে তৃণমূলের পদক্ষেপ বলা হয়েছিল, কিন্তু বলা হয়নি ইনি আসলে কে? ইমরান “হঠাৎ কোথা হতে এল ফাগুন-দিনের স্রোতে...” (গুরুদেব মাফ করবেন আশা করি), সেটাও জানা দরকার। জানা দরকার, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লিগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হঠাৎ সে দেশের সংসদে দাঁড়িয়ে এমন একজন সাংবাদিক-রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের আর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনলেন কেন?

আমাদের সমস্যা আরও বেশি। ভোট আসলেই আমাদের খাবারের পরিমাণ বেড়ে যায়। সব দল কিছু না কিছু খাওয়াতে চায়। আমাদের খেতেই হয়, কিন্তু খেলেই কি হজম হয়? হয় না। আমাদের তো রাহুর দশা। আমি এবং আমাদের বেশিরভাগটাই তাই খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না।

সরকারি গোয়েন্দাদের তথ্য বলছে, ১৯৭৭ সালে জন্ম নেওয়া জঙ্গী ছাত্র সংগঠন স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া বা সিমি-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পশ্চিম বাংলায় সিমি-র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বা ‘আমীর-ই-হলকা’ ছিলেম এই ইমরান। সিমি-কে নিষিদ্ধ করেছিল অটল বিহারী বাজপেয়ীর সেই সরকার যার মন্ত্রী ছিলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইমরান নিজে ‘ইসলামিক মিল্লাত’ এবং জেহাদ-এর সমর্থক, মিল্লি কাউন্সিল-এর অন্যতম কর্তা এবং ‘কলম’ পত্রিকার সম্পাদক। একসময় তিনি নিজেকে ইরানের ‘তেহরান রেডিও’-র সাংবাদিক বলে দাবি করতেন। কট্টর ধর্মীয় মৌলবাদী ইরানের একটি রেডিও কলকাতায় কেন প্রতিনিধি রাখবে, তা দুর্বোধ্য। ওয়াশিংটন পোস্ট বা নিউ ইয়র্ক টাইমস এর মত কাগজও ভারতের জন্য একজনকেই প্রতিনিধি রাখতে পারে, তাও দিল্লিতে। গোয়েন্দাদের মতে, তিনি ‘পেইড ফরেন এজেন্ট’ এবং এর প্রমাণ তাঁদের আছে। চার বছর সিমির ‘আমীর-ই-হলকা’ থেকে ইমরান ১৯৮১ সালে ১৯ দরগা রোড ঠিকানা থেকে প্রকাশ করেন মাসিক পত্রিকা ‘কলম’। পত্রিকাটি ১৯৯৩-৯৪ সাল সাপ্তাহিক হয়ে চলে আসে ৪৫ ইলিয়ট রোড-এ আর দরগা রোডের বাড়িটি হয় সিমির কমিউন। সিমি-র অফিস হয় লেনিন সরণীর অন্য একটি বাড়িতে। কলমের তখন সবচেয়ে বেশি প্রচার ছিল আসামের মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলিতে, আর তা সম্ভব হয়েছিল পরবর্তীকালে গঠিত এআইডিইউএফ চেয়ারম্যান বদরুদ্দিন আজমলের। এ-পর্যন্ত খেয়েই ঢেকুর উঠল - আলিগড়ের ছাত্র ইমরান সিমিতে থাওকে থাকতে হঠাৎ একটি পত্রিকা প্রকাশ করে তার বিপুল প্রসারের মত অর্থ কোথা থেকে পেলেন? কারা করল লগ্নী, কেন --- সবই প্রশ্ন।

এখন জানা যাচ্ছে, তার লগ্নী অর্থের জোগান আসত বাংলাদেশের ইসলামিক জঙ্গী সংগঠন ‘জামাত-এ-ইসলামী’-র থেকে। জামাতের নেতা ছিলেন মানবতা-বিরোধী যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধী গোলাম আজম। তাঁর ছেলে তথা বাংলাদেশের ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মামুন আল-আজমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেন ইমরান। জানা যাচ্ছে, মামুন কয়েকবার কলমের ইলিয়ট রোডের অফিসেও এসেছেন। ইমরানকে তিনি ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের ভারতীয় শাখার পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বে এনেছিলেন। গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, এই পদে ইমরানের কাজ ছিল এপার বাংলায় ইসলামিক জঙ্গী গোষ্ঠিগুলির জন্য অর্থের যোগান বজায় রাখা। ফলে, মুসলিম সমাজের উন্নয়নের নামে আইডিবি-র টাকা এলেও তা সম্প্রদায়ের গরিবদের স্বার্থে ব্যবহৃত হয় নি। ইমরানের সঙ্গে এ-বাংলার জামাতের কাগজের দায়িত্ব দেওয়া আছে, তিনি জনৈক আলাউদ্দিন। এই কারণেই ইমরান তসলিমার লজ্জা বা উতল হাওয়া উপন্যাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সঙ্গে দেখা করে তসলিমার বই নিষিদ্ধ করার আর্জি জানিয়েছিলেন এবং আদালতে মামলাও করেছিলেন। তসলিমাকে কলকাতা থেকে তাড়ানোর জন্যে সংখ্যালঘু অংশের সমাজবিরোধীদের দিয়ে বাম সরকারের আমলে দাঙ্গা-পরিস্থিতি সৃষ্টির পিছনেও তাঁর মদত ছিল। তসলিমার লেখা কাহিনি-নির্ভর ‘দুঃসহবাস’ সিরিয়াল বন্ধের জন্য চ্যানেলের কর্ত্রিপক্ষের সঙ্গে মৌলবাদীদের বৈঠকে হাজির ছিলেন কলমের সম্পাদক তথা উর্দূ কাগজ ‘আজাদ হিন্দ’ এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক ইমরান।

মৌলবাদ-ফ্যসজেধী ও ধর্মনিরপেক্ষ শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই তাই ষড়যন্ত্র করেছেন জামাতপন্থী ইমরানরা। তাঁদের কাগজের পাতায় পাতায় তখন শশবাগ-বিরোধী সংবাদ, যার অধিকাংশই মিথ্যা, প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু, সংবাদপত্রের ভূমিকা ছাপিয়ে গিয়ের কলকাতায় বাংলাদেশের জামাতের সমর্থনে বাংলাদেশ দূতাবাসে মিছিল নিয়ে যাওয়ার মত কাজ তাঁরা সংগঠক হিসাবে করেছে। শহীদ মিনারে জামাত এ-ইসলামীর নাম না নিয়ে তারই ছত্রচ্ছায়ার এক ডজন সংগঠনের নামে প্রকাশ্য সমাবেশ করে সেখান থেকে ঘোষণা করা হয়েছে ““বাংলাদেশের জামাত-এ-ইসলামী আমাদের ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন।” যারা এই কর্মসূচীর সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজক ছিলেন, তাঁদের অন্যতম কলমের দুই কর্মকর্তা।

লক্ষ্যণীয়, শাহবাগের সমর্থনে কলকাতায় একটিও মিছিল করার জন্য অনুমোদন দেয় নি ধর্ম্নিরপেক্ষ সংবিধানের নামে শপথ নেয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। শাহবাগের একাডেমির সামনে থেকে ছোট্ট মিছিলকে পথেই নামতে দেওয়া হয় নি। অথচ, হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বাসঘাতক রাজাকার-আল বদরদের ভারতীয় সংস্করণের জন্য সব অনুমতি দিয়ে রেখেছিল সেই প্রশাসন। তাদেরই অন্যতম প্রবক্তা হলেন ইমরান, যাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল সাংসদ করে পাঠাল। এই সম্পর্কের জেরেই জামাতের স্বার্থ দেখে তিস্তা চুক্তিতে সায় দেন নি মুখ্যমন্ত্রী। দৈনিক হিসাবে প্রকাশের আগেই কলম পত্রিকাকে মমতা সরকারের গ্রন্থাগার বিভাগের প্রকাশিত ‘ক্রয়যোগ্য কাগজ’ এঁর তালিকায় আনা হয়েছিল। আর তাঁর পিছনে মানুষের রক্ত জল করা টাকার থলি নিয়ে হাজির হতে হয়েছিল জালিয়াতি ফান্ড সারদা-র চিট সুদীপ্ত সেনকে। সুদীপ্ত সেন গ্রেফতার হওয়ার পর অন্য অনেক কাগজ বন্ধ হলেও কলম কিন্তু চালুই রইল এবং দেখা গেল, তাঁর পাশে এসে দাড়িয়েছেন তৃণমূলের নম্বর টু – মুকুল রায়। ফলে, ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ এঁর ব্যাপারটা অজানা কিন্তু জিজ্ঞাসার মধ্যেই থাকায় খেতে বাধ্য হওয়ার পরও গেলা আর হল না। হজম হবে না তো!

আহমেদ হাসান ইমরান তাহলে বেশ জনপ্রিয় মানুষ। দেখন বঙ্গবাসীর কী দুর্ভাগ্য, এতদিন সেটা অজানাই ছিল। ডঃ নজরুল ইসলাম, মীরাতুন নাহার থেকে শুরু করে কত কত বুদ্ধিজীবীর চেয়েও যে তিনি খ্যাত, তা বোঝা গেল বাংলাদেশের সংসদে তাঁর নাম যখন উচ্চারিত হল। ২০০ তম টেস্ট খেলার পরও শচীন তেন্ডুলকরের নাম বা বিশ্বসেরা হওয়ার পরও বিশ্বনাথন আনন্দের নাম বাংলাদেশের সংসদে উচ্চারিত হয়য় নি, হল কিনা ইমরানের নাম। ভাবুন! সেখানে শাসন দল আওয়ামী লিগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য তথা প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম ১১২ ফেব্রুয়ারি বললেন, ভারতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে জামাত এ-ইসলামীর কিছু জঙ্গী। সম্প্রতি সাতক্ষিরায় তল্লাশির সময় তাঁরা ভারতে ঢুকে পরে। পারস্পরিক সম্পরক ও কূটনীতির তোয়াক্কা না করে তাঁদের আশ্রয় দিয়েছেন ইমরান সাহেব। সে কারণে ইমরানকে বাং;লাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ডঃ মন্মোহন সিং এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্যোপাধ্যায়ের প্রতি আহবান জানান তিনি। মনে করালেন, বাংলাদেশে বসে ভারত-বিরোধী চক্রান্তে যুক্ত অনুপ চেটিয়াকে ঢাকার সরকার গ্রেফতার করে ফেরত পাঠিয়েছে। সেভাবেই ইমরানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হোক।

এহ বাহ্য! কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরপিএন সিং-কে সম্প্রতি পাঠানো একটি নোটে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা বলেছেন, জঙ্গী গোষ্ঠী বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানির চেষ্টা করছে। তাঁদের এই কাজ সহজ হয়ে গেছে ইমরান সংসদে নির্বাচিত হওয়ায়। আগেই তিনি জামাত এ-ইসলামী ও জামাতের ছাত্র শাখা ছাত্র শিবিরকে মদত দিতেন, এখন সেটা আরও বেশী করে দিচ্ছেন। সাতক্ষিরায় বাংলাদেশি বাহিনীর অভিযানের সময় ৪০ জন জঙ্গী ভারতে ঢোকে এবং দ্রুত তাঁদের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সরিয়ে ফেলা হয়। সেই কাজে ইমরানের ভূমিকা ছিল বলে তাদের রিপোর্ট।

অনেক ভেবে ভেবে দেখলাম, ইনিই হলেন আদর্শ ‘খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না’-র ব্যক্তিত্ব। ‘আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন’ হয়েও সাংসদ রাজ্যবাসীকে গর্বিত করতে পারলেন না। কী দুর্ভাগা আমরা!

রবিবার, ২ মার্চ, ২০১৪

উত্তর সম্পাদকীয় – চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য



খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না



কেমনে নাচি তোমার কথায় মোদি বাবা

ভোট আসছে। আসছে মানে এই এসে গেল বলে! তাই এখন হল আমাদের মত ছা-পোষা কেরানি-ঘরণী হকার-বেকার গেঁয়ো এবং ঘেয়োদের কিছু পাওয়ার সময়, কিছু খাওয়ার সময়। খাওয়ানো অবশ্য শুরু হয়েই গেছে। আমরাও আনন্দিত, আনন্দে ভুলেই যাচ্ছি আজকাল না প্রতিদিন না বর্তমানকে গুরুত্ব দেব, নাকি ৩৬৫দিনই গুরুত্ব পাবে? নিজেদের সকাল-বিকাল ঠিক রাখাই দায়, তা কেন সময়কাল কে পাত্তা দেব, ভাবার সময় কই। আমাদের কানের কাছ দিকে জনমত সমীক্ষার মিসাইল ছুটে চলেছে মুহুর্মুহু। এই বলে গেল মোদি ১৫০, তিন দিন পর সেটাই হয়ে গেল ১৭০, আরও কিছুদিন যেতেই সেটা ১৯০। আরে ব্বাস! বাড়ছে তো বাড়ছেই! হাউই যেন! এ-ভাবে বাড়তে থাকলে ভোত পর্যন্ত দেখা যাবে মোদির দল যে ৬০০ আসনে জিতে যাবে! ভাবা যায়! সংসদের ৫৪২টি আসনের মধ্যে মোদির দল ৬০০র বেশী আসনে জয়ী! ভাবতেই শিহরিত, রোমাঞ্চিত, পুলকিত… আরও কতি না ‘ইত’ হয়ে গেছি। কত খেয়ে ফেলেছি ভাবতে গিয়েই দেখি, হু হু বাবা, খেয়েছি বটে… কিন্তু গিলেছি কই…! সব যে উগরে আসছে…

এতদিন ভাবছিলাম, এ-ভাবে আর বাঁচা যাবে না। বাংলার তো আগেই দফা রফা হয়েছিল। একটু বনয় বদলে যদি হাল ফেরে। হল যা, সেটা আধীর চৌধুরির ভাষায়, “হটালাম হার্মাদ/ আনলাম উন্মাদ” হয়ে বসে আছে। ছা-পোষা কেরানিবাবু থেকে পুলিশ এবং ‘ফুলিশ’ টিচারদের ডিএ আর বাড়ে না। সব গেছে আটকে। ঘরণীর কলকণ্ঠ এখন হৃদয়ে বাজায় ভাঙা বাঁশি। তাই বাভছিলাম ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোনওখানে’ যদি বাস করা যায়, তাহলে বোধ হয় বাঁশ খাওয়া কমানো যাবে। তা খোঁজ করে এক গাঢ় হিন্দু বন্ধু জানালেন ‘গুজরাত যাও। দেশের সেরা রাজ্য। বিকাশপুরুষ আছেন সে দেশের মাথায়। চিন্তা থাকবে না।“

আমি মশাই, বড্ড ভীতু মানুষ। তাই সবার কথাতেই গুরুত্ব দেই। এক পাবাড়ানোর আগে, দশ বার ভাবি – ‘ট্রেনের নাম নম্বর তো মিলছে, কিন্তু এটাই সেই ট্রেন তো? যেখানে যাওয়ার সেখানেই যাবে তো? টিটিকে জিজ্ঞাসা করি, কুলিকে জিজ্ঞাসা করি, হকার পেলে হকারকেও… তবে উঠি। তা অন্য রাজ্য বাছাইয়ের সময় ভাববো না? সেই বন্ধু ভাবার অবকাশ দিতেই রাজি না। এক গুচ্ছ খবরের কাগজ এনে হাজির করল… দেখ দেখ… ভাইব্র্যান্ট গুজরাত। সব শিল্পপতি মোদির পক্ষে। সবাই সেখানে কারখানা গড়ছে। গুজরাত সরকারের ভিডিও দেখাল… কি ঝকঝক করছে রাস্তাঘাট! শিশুদের হাসিতে ভরা নিটোল মুখ… স্বাস্থ্যবতী মায়েরা… মোদির প্রায় ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে ফেলেছেন মুকেশ আম্বানী… মোদির যাতায়াতের জন্য একটা প্লেন দিয়ে দিয়েছেন আদানী গ্রুপের মালিক গৌতম আদানি। টাটা তাঁর ন্যানো কারখানা নিয়ে গিয়েছেন।

গিন্নিকে সব বললাম। আরে কী কুক্ষণেই যে বললাম! গিন্নি তো প্রায় মারমুখী! কি বলেন জানেন? বলেন, “মোদির রাজ্যে…? জানো, তিনি একটা মেয়েকে বিয়ে করে আর তাঁর সঙ্গে খর করে নি। তাঁর শিক্ষা কম, এই অজুহাতে পাঁকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেই মহিলা লেখাপড়া শিখে স্নাতক হলেন। কিন্তু মোদি তাঁকে আর সংসারে নিলেন না। বাধ্য হয়ে নিজের খরচ নিজে চালাতে তিনি একটি স্কুলে টিচারি নিলেন। এদিকে, মোদি নেতা হলেন, মন্ত্রী হলেন, মহানেতা হলেন, মুখ্যমন্ত্রী হলেন, এখন প্রধানমন্ত্রী হতে চান… কিন্তু সেই মহিলা পড়ে রইলেন বাপের দেশে। একটা মেয়ের স্বামী-সংসার করাি হল না। অথচ, মোদি কিন্তু ডিভোর্স দেন নি! তিনি অনেক মহিলার সঙ্গে ঘনিষ্ট হলেও, তাঁর স্ত্রীর তো আর তা সম্ভব ছিল না। তিনি উপেক্ষিতই রইলেন। আরে বাবা, রামচন্দ্রও সীতার বিরুদ্ধে অযথা সন্দেহ করেছেন, অগ্নিপরীক্ষার কথা বলেছেন। আর এই কলির নেতা! তিনি নাকি সাক্ষাৎ সত্যবাদী যুধিষ্ঠির! তা বিধান্সভার ভোটে দাঁড়ানোর সময় তিনি তো হলফনামায় লেখেনই নি তিনি বিবাহিত, না অবিবাহিত না কি বিবাহবিচ্ছিন্ন বা বিপত্নীক। আরে বাবা, কোনও পুরুষ তো এই চারটি ভাগের বাইরে নয়! তিনি সত্যটা লিখলেন না কেন? ও দেশে যাব না, শেষে তুমিও অমন কর…!”

খবর নিলাম, দেখি গিন্নিই সত্যি বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী ১৯৬৮ সালে মেহসানা জেলায় ভাড়নগর গ্রামের বাড়িতে বিয়ে করেছিলেন যশোদাবেন চিমনলাল মোদীকে। যশোদাবেনের জন্ম হয়েছিল ১৯৫১ সালের ১৫ জুন। বিয়ের সময় মোদীর বয়স ছিল ২০ এবং যশোদাবেনের ১৮। এই নিয়ে কলকাতার এক ব্যবসায়ী সুনীল সারাওগি ভারতের নির্বাচন কমিশনে একটি মামলা ঠুকেছেন আহমেদাবাদের মনিনগর কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীর বিরুদ্ধে। তাঁর আগে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দরজায় গিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু মোদিকে ক্লিন চিট না দিয়ে নির্বাচন কমিশনে মামলা করার কথা বলে মন্তব্য করে যে, রিটার্নিং অফিসার তো এই মনোনয়ন পত্র নেমেছেন। তা হলে মামলা তো হবে নির্বাচন কমিশনে। সুনীল সারাওগি বলেছেন, কেবল স্বামী/স্ত্রীর নামই নয়, তিনি কত টাকা আয় করেন ও তাঁর সঞ্চিত সম্পত্তি কত সেটাও প্রার্থীর হলফনামায় থাকা বাঞ্ছনীয়। এই তথ্য গোপন করা হয়ে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনকে পদক্ষেপ নিতেই হবে। এই অভিযোগ প্রসঙ্গে মোদীর পেশ করা হলফনামাকে ‘মিথ্যাভাষণ’ বলে মন্তব্য করে সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী কলিন গঞ্জালভেস বলেছেন, “যেহেতু, ওই হলফনামার বক্তব্যে অসঙ্গতি ও সন্দেহর কারণ আছে, তাই রিটার্নিং অফিসারেরই উচিৎ ছিল সেটি বাতিল করা।”

গিন্নির বোনটি আরও সরেস। বিয়ের সময় একবার ভেবেচিলাম মালাটা ভুল করে তাঁর গলাতেই দিয়ে দিই…। যাক, সে সব গোপন কথা, কাউকে বলবেন না যেন। তিনি এখন অন্যের ঘরণী, মাঝে মাঝে এখানে এলে হৃদয়ের শতছিদ্র বাশিটি আজও বেজে ওঠে, আর কি। তাঁর দিদিকে তিনি বলে দিলেন, “খবরদার দিদি, ও দেশে যাবি না।”। তারপর প্রায় একটি ভোটের বক্তৃতার মত একের পর এক তথ্য তুলে তুলে আমাকে ধরাশায়ী করে দিলেন।

তাঁর ঘোষণা, ভারত সরকারের পরিসংখ্যান মন্ত্রকের ‘চিলড্রেন ইন ইন্ডিয়া, ২০১২’-র তথ্য বলছে, এই রাজ্যের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শিশুই কম ওজন নিয়ে জন্মায়। তাছাড়া, এই রাজ্যে গড়ে প্রতি ১০০০ সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে ৪৪ জন মারা যায়, যা দেশের গড় হারের চেয়ে বেশী। ‘বিকাশপুরুষ’ নরেন্দ্র মোদীর ‘ভাইব্র্যান্ট গুজরাত’ এর ফুলিয়ে ফাপিয়ে রাখা ফানুসে পিন ফুটে গেছে, বুঝলি। গুজরাতের সঙ্গেই আছে মেঘালয়, ছত্তিশগড়, উত্তর প্রদেশ ও ওডিশা। আগের বছরের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট বলেছিল, গুজরাতের অর্ধেক শিশুই অপুষ্টিতে ভুগছে। সেই রিপোর্ট মোদীর কাছেও গিয়েছে, তিনিও জানেন। তিনি এও জানেন যে, গ্রামে যেহেতু চিকিৎসার দারুণ অভাব এবং তফশিলী জাতি-উপজাতির পিছিয়ে পড়া লোকেরাই যেহেতু গ্রামে থাকেন, তাই তাঁদের মধ্যেই অপুষ্টি ও শিশুমৃত্যুর হার রাজ্যের তুলনায়ও অনেক বেশী।”

আমার বন্ধুদের আমি বিশ্বাস করি, সেই গাঢ় হিন্দু বন্ধুকেও বিশ্বাস করি। তাই প্রতিবাদ করতে গিয়েই গিন্নির দাবড়ানি… “থামো, ওকে বলতে দাও। নিজে কিস্যু জানবে না, উল্টোপাল্টা শুনে এসে তাই নিয়ে ঘর গরম করবেন তিনি!” গিন্নি এই অবসরে এক কাপ চা বাড়িয়ে দিয়ে আমার মুখ বন্ধ করল। আর শ্যালিকা বলে গেলেন, “আমার কথা না হয়য় বিশ্বাস নাই করলে জামাইবাবু, প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মার্কণ্ডেয় কাটজু কি বলেছেন জানো? তিনি লিখেছেন, “গুজরাতে অপুষ্টিতে ভোগা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর হার ৪৮ শতাংশ, যা শুধু জাতীয় হারের চেয়ে বেশীই নয়, সাব-সাহারা এলাকার সোমালিয়া এবং ইথিওপিয়ায় অপুষ্টির ভোগা শিশুর হারের চেয়ে অনেক বেশী। মোদী এঁর কারণ দেখিয়াছেন -- গুজরাতের মেয়েরা নিরামিশাষী এবং মোটা হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাঁরা দুধ খায় না। এ-সব ছেঁদো যুক্তি। গুজরাতের শিশুরা কি তবে মোদীর বানানো কারখানা, সড়ক আর বিদ্যুৎ খায়! … গুজরাতে সদ্যজাতের মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৪৮ জন, যার ফলে ভারতের সবচেয়ে খারাপ রাজ্যগুলির মধ্যে গুজরাত দশম স্থানে। … গুজরাতের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের এক-তৃতীয়াংশের শরীরের বডি মাস ইন্ডেক্স ১৮.৫ এঁর চেয়েও কম, ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে খারাপের দিক থেকে সপ্তম। … গুজরাতে প্রসূতিদের মৃত্যুর হারও বেশি…।”

এখানে না থেকে তাঁর দিদিকে বোঝালে, “শোন দিদি, কয়লা কেলেঙ্কারি নিয়ে মোদির দল কতদিন পার্লামেন্টে ঝামেলা পাকালো , মনে আছে? সিএজি যেনো এঁদের এক্কেবারে বাপের ঠাকুর। আর দেখ, সেই সিএজি বলেছে, গুজরাত সরকারের সুসংহত শিশু বিকাশ প্রকল্পের আইসিডিএস প্রকল্পে চিহ্নিত ২২৩.১৫ লাখ মানুষের মধ্যে ৬৩.৩৭ লাখকে কোনও পরিসেবা দেওয়া হয় নি। পুষ্টিকর খাবার রাজ্যে বছরে ৩০০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, ৯৬ দিন দেওয়াই হয়য় নি। সদ্য-যুবতীদের পুষ্টিকর খাদ্য দেওয়ার প্রকল্পে ঘাটতি আছে ২৭ থেকে ৪৮ শতাংশ। রিপোর্টে বলছে, মোট ১.৮৭ কোটি জনতা আইসিডিএস প্রকল্পের সুবিধা পান নি। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র যতগুলি দরকার, তাঁর ৩১ শতাংশকে তৈরির অনুমোদনি দেয় নি মোদি সরকার। যেগুলি তৈরি হয়েছে, সেখানেও ভবন, পরিশ্রুত পানীয় জল বা প্রস্রাবাগারের অভাব আছে। আর মোদির দলের টাকায় চালিত ওয়েবসাইট ‘ইন্ডিয়াস্পেন্ড’ লিখেছে, গুজরাতে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর হার ৪৪ শতাংশ। আর, সদ্যোজাতের মৃত্যুর হার হাজারে ৪৮ জন নয়, ৪৪ জন। কি রকম সত্যবাদীর রাজ্য ভেবে আজও পুলকিত হই… আ হা…!

বাংলাদেশ ঘুরে নিয়ে আসা একটা সিডি চালিয়ে দিদিকে ফকিরের গান শোনাবে বলে শ্যালিকা আমার গালে ঠোনা মেরে চলে গেল। বেজে উঠল আব্দুল করিম্ শাহ-র গান, “আগের মত খাওয়া যায় না/ বেশী খাইলে হজম হয় না…” ঠিক বলেছে আব্দুল করিম শাহ। তাই এখন আমি তাঁর পথ ধরেছি। খাচ্ছি, কিন্তু গিলছি না। মেরি বাবার গান শুনেছি অনেক আগে। তাই বলি, ও মোদি বাবা, কেমনে তোমার কথায় নাচি বল তো?

বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

উত্তর সম্পাদকীয় – চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না
চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য





পর্ব-১
অবিশ্বাসযোগ্য যৌনহেনস্থার অভিযোগে ক্ষতি মেয়েদেরই




“ঠোঙ্গা ভরা বাদাম ভাজা, খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না।” কি অনবদ্য লাইনটাই না লিখেছিলেন সুকুমার রায়! এতদিন পরও দেখা যাচ্ছে তাঁর বলা লাইনটা এক্কেবারে চুল-টু-পা ট্রু। আমাদের মাথার উপরে স্ব-মনোনীত অবিভাবকের মত বসে থাকা মিডিয়া-মনোহরেদের সম্পর্কে সুকুমার রায় কত বছর আগেও বিন্দাস আজকের হাল মানসচক্ষে দেখে আকাশবাণীর মত বলে রেখে গেলেন, ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। ইদানিং মিডিয়াই কেবল খাওয়ায়, আরে সুকুমার রায় কতদিন আগে এদেরকেও খাইয়ে গেছেন, ভাবা যায়!

কিছুদিন আগে শতবর্ষে পা দেওয়া এক সাংবাদিকের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে কলকাতার এক সিনিয়ার সাংবাদিক বলছিলেন, “মিডিয়ার এখন নতুন নতুন বিট হয়েছে, যার মধ্যে পড়ে ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ। কোথায় কে কি মন্তব্য করল, তাঁর জন্যেও সতর্ক থাকতে হয়।” তারি সর্বশেষ এক মনহারক নিদর্শণ দেখা গেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আশোক গাঙ্গুলীর বিরুদ্ধে এক ল’ইন্টার্নিকে যৌনহেনস্থার অভিযোগে। অভিযোগ সত্যি না মিথ্যে, তা প্রমাণের অপেক্ষা না রেখেই মিডীয়াবাগীশরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিচার করতে। বিচার বলে বিচার, এক্কেবারে পঞ্চায়েতী রাজ। গাঁয়ের খবর পত্রিকা পেলে লুফে নিত! অভিযুক্তের মতামত শোনার দরকারই নেই। “অহম গাঁয়ের পঞ্চজন, মনে করিয়াছি, অভিযোগ সিত্য এবং অভিযুক্তই অপরাধী। ব্যস” হয়ে গেল পঞ্চায়েতের রায়। রায় মানলে সম্পত্তি ছেরে পালা, না মানলে গাঁয়ের বার করে দেব। অর্থাৎ, সোজাই যাও আর বাঁকা, তুমি যাও ঢাকা কিংবা মক্কা।

মামলাটার পূর্বাপর একটু ভেবে দেখুন, বেশ মজা পাবেন। ঐ মহিলা ইন্টার্নি ঘটনার এক বছর পর এ-বছর নভেম্বরে নিজের ব্লগে এঁকে লিখলেন ‘সম্প্রতি’ ঘটা এক কাহিনী বলে। সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি ২০১২-র ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিজের হোটেলের রুমে তাঁকে ওয়াইন অফার করেছিলেন, মাথায় ও পিঠে হাত দিয়েছিলেন, হাতে চুমু খেয়েছিলেন। মহিলার মনে হয়েছিল এগুলি “আনওয়েলকাম বিহেভিয়ার’। তাই চলে আসতে চেয়েও ঐ বিচারপতির সঙ্গেই সে রাতে ডিনার খেয়ে তারপর ফেরেন। বিচারপতিই তাঁকে বাড়ি ফেরার গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন এবং গাড়ি পর্যন্ত তাঁকে ছেড়ে যান। সেখানেই তাঁর মনে হল, বিচারপতির আচরণ ‘অনওয়েলকাম বিহেভিয়ার, কিন্তু তিনি সেটা ব্লগেও প্রকাশ করলেন ২০১৩-র নভেম্বরে’, ১১ মাস বাদে।

এবার সূত্রগুলি মেলান। ঐ মহিলা খ্রিস্টান, তাই ২৫ ডিসেম্বর তাঁর উৎসবের রাত। উচ্চশিক্ষিতা ঐ মহিলা অন্য পার্টিতে যাওয়ার কথা ছিল। সে-রাতে খ্রিস্টান্দের ওয়াইন খাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। কেউ তা অফার করলে তা বরং তাঁদের রীতি মানার ভদ্রতা বলে গণ্য হওয়ার কথা। কোনও খ্রিস্টান বাড়িতে পৌষ সংক্রান্তির দিন যদি আপনাকে পিঠে খেতে দেয়, আপনি কি ভাবতেন? আনয়েলকাম বিহেভিয়ার হলে তো তাঁর তখনই চলে আসার কথা! তিনি সেখানে বসে ২৫-৩০পাতা টাইপ করার পর ডিনার খেয়ে বিচারপতিরই আনা গাড়িতে বাড়ি ফিরতেন না। এবং এ-সবই যদি মেনে নেয়া হয় যে মহিলাটিও ভদ্রতার খাতিরেি তৎক্ষণাৎ রিঅ্যাক্ট করেন নি, তাহলেও সেই অভিযোগ জানানোর জন্যে ১১ মাস! বিশ্বাস্য? এক জন আইনজীবির আচরণ কি বলছে?

আইনের ছাত্রী হিসাবে তিনি ভালই জানেন, যে কোনও ফৌজদারী অপরাধের অভিযোগ তখনই গ্রাহ্য হয়, যখন পুলিশে অভিযোগ এফআইআর বা জেনারেল ডায়েরি হিসাবে দায়ের করা হয়। পুলিশ তাঁর তদন্ত করে, মামলা হয়য় নিম্ন আদালতে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে জেলা আদালত, হাই কোর্ট তারপর সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে যায়। নদীর জল যেমন পাহাড় থেকে গড়িয়ে এসে সমুদ্রে এসে মেশাই তাঁর স্বাভাবিক পথ, উল্টোটা নয়; মামলার ক্ষেত্রেও ওটাই তাঁর স্বাভাবিক নিয়ম, উল্টোটা নয়। কিন্তু, বিচারপতির গাঙ্গুলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ঘটনায় দেখা গেল সমুদ্রের জল নদী বেয়ে পাহাড়ে যাচ্ছে।

বলার কারণ, মামলাটা নিম্ন আদালতে এলই না। কারণ, পুলিশে আজও কোনও অভিযোগই দায়ের হয় নি। ফলে জেলা আদালত, হাইকোর্ট ইত্যাদি সব ফালতু হয়ে গেল। সোজা গেল সুপ্রিম কোর্টে… না সেখানেও কোনও মামলা হয়য় নি, কেউ করেনি। প্রধান বিচারপতি স্বতপ্রণোদিত হয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি করলেন অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে। সেই কমিটি আসলে প্রশাসনিক তদন্তের, বিচারবিভাগীয় নয়। রিপোর্টে সেই মহিলা ‘আনওয়েলকাম বিহেভিয়ার এর কথাই পুণরুক্তি করে প্রাথমিকভাবে তারাও অভিযোগের খানিকটা সত্যতা পেয়েছেন, যদিও বিচারপতি গাঙ্গুলী তা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের কমিটি বলে দিন, “যেহেতু ঘটনার সময় বিচারপতি গাঙ্গুলী সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসর নিয়েছেন, তাই এই অভিযোগের বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার এক্তিয়ার সুপ্রিম কোর্টের নেই।” তা ছাড়া ‘এই ল’ইন্টার্নি স্টেলা জেমসও সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে যুক্ত নন’ বলে সর্বোচ্চ আদালত এ নিয়ে কিছুই করতে পারে না। দেখুন, একথা বলছেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বের কমিটি, যিনি নিজেই বিচারপতির গাঙ্গুলীর অবসর উপলক্ষে প্রদত্ত পার্টিতে ছিলেন। তিনি কি এই কমিটি গড়ার আগে জানতেন না যে উনি ঘটনার আগেই অবসর নিয়ে নিয়েছেন? জানতেন না যে অভিযোগকারিনী সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাক্টিশ করেন না? সে অজ্ঞানতার দায় কার? অজ্ঞানতাপ্রসূত একটি মন্তব্য যে গোটা ঘটনায় একজন বিচারপতির মর্যাদায় কালি ছেটাল, তাঁর কি হবে? সুপ্রিম কোর্ট এমন মন্তব্য করার ফলে মামলাটি আর নিম্ন আদালতে গেলেও সুবিচার দূর অস্ত। ফলে, গোটা বিষয়টাই কেচিয়ে এল। যদি, সত্যি বিচারপতি গাঙ্গুলী অপরাধীও হন, তাও তো তাঁর ন্যায্য বিচার সম্ভন নয়!

তাহলে এমনটা হল কেন? এর উদ্দেশ্যই বা কি? এর পিছনে কি কোনও কোট-আনকোট ষড়যন্ত্র আছে বা ছিল?

এগুলিই এখন জরুরি প্রসঙ্গ। এই লেখা লেখার সময়েই জানা গেল, এত দেরিতে অভিযোগ জনসমক্ষে আনায় সুপ্রিম কোর্টও বিরক্তি প্রকাশ করেছে। কিন্তু, সত্যি বললে, মেয়েটি কিন্তু কোনও অভিযোগই জানায় নি। সে ব্লগে লিখেছিল তাঁর কথা – তা সে ঠিক বা বেঠিক – যাই হোক। তাকে মুখোরোচক করে খবরে এনেছে নির্দিষ্ট একটি সংবাদপত্র। তারপর অন্য মাধ্যমগুলি ঝাঁপিয়ে পড়ে। কি ছিল সেই সংবাদ মাধ্যমের উদ্দেশ্য? প্রাপ্ত অভিযোগের সত্যাসত্য যাচাই না করে ব্লগের ভিত্তিতে খবর কতটা যুক্তিসংগত? এ সব নানা প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তারপরই দেখা গেল, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিচারপতি গাঙ্গুলীর অপসারণ চাইলেন। তিনি অবশ্য এক বচর আগে থেকেই বিচারপতি গাঙ্গুলীর উপর ক্ষুব্ধ। রাজ্যের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান হিসাবে তিনি পার্ক স্ট্রিট ধর্ষোণ থেকে অম্বিকেশ মহাপাত্র মামলা, শীলাদিত্যকে মাওবাদী বলে অন্যায় গ্রেফতারের মত ঘটনা সহ বহু ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর মনোভাব গোপন রাখেন নি, বরং বলেছিলেন, ““মানবাধিকার কমিশনে একজনকে আমরা বসালাম, তিনি এসে আমাদের বিরুদ্ধে রায় দিচ্ছেন।” যেন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর নিয়োগে সুপারিশ করেছেন বলে তাঁকে রায় দেওয়ার সময় ধামাধরা হতে হবে! এ কেবল হাস্যকর দাবীই নয়, বিপজ্জনকও। কোনও রাজ্যের বা দেশের প্রধান যদি এই দাবী করেন, তাহলে ধরে নিতে হবে সে রাজ্যে বা দেশে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ঘটেছে। যে বিচারপতি শ্রীমতী গান্ধীর নির্বাচনকে অবৈধ রায় দিয়েছিলেন, তাঁর নিয়োগও কিন্তু শ্রীমতী গান্ধীর সরকারি দিয়েছিল। তিনি কিন্তু এমন উদ্ভট তর্ক তোলার কথা স্বপ্নেও ভাবেন নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পদত্যাগ চেয়েছিলেন। এছাড়া কলকাতার আইন বিশ্ববিদ্যালয় এনইউজেএস-এর একদল অধ্যাপক সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর পদ থেকে বিচারপতি গাঙ্গুলীকে সরাতে কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়েছেন। এতেও আশ্চর্যের কিছু নেই। আইনজীবি কল্যাণবাবু তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ এবং দুর্মুখ, এটা সকলেই জানেন। মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা চাইলে সভাসদেরা যে ‘বলে তাঁর শতগুণ’, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। ইস্তফা চেয়েছিলেন মোহনবাগান ক্লাবের শীর্ষকর্তারাও, কারণ বিচারপতির সেদিনকার রিপোর্টে ক্লাবের বিপুল টাকা জরিমানা হয়েছিল। এই শীর্ষকর্তা আবার একই দলের রাজ্যসভা সাংসদ, অর্থাৎ সভাসদ। তাঁরা যে অপসারণ চাইবেন, এতে বিষ্ময়ের কি আছে!

বিষ্ময়ের বিষয় এল কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত সলসিটার জেনারেল (এএসজি) ইন্দিরা জয়সিংহ কলকাতায় এসে অভিযোগকারিণীর লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করে এবং দিল্লিতে সংসদে বিরোধী নেত্রী বিজেপির সুষমা স্বরাজ বিচারপতির ইস্তফা চাওয়ায়। অভিযোগকারিনী সুপ্রিম কোর্টের তিন-সদস্যক কমিটিকে যে মৌখিক বিবৃতি (কেন মৌখিক, তাও প্রশ্নবোধক) দিয়েছিল, তাঁর কপি অভিযুক্ত বিচারপতি গাঙ্গুলীও পান নি, কারণ সেটি ছিল আদালতের সম্পত্তি। আদালতের সম্পত্তি কিন্তু সরকারের নয়। দি-তিন দিন পর সেটাই মুখ্যমন্ত্রীর প্রসাদধন্য কলকাতার এক বাণিজ্যিক কাগজে ছাপা হয়ে গেল! তাতে লেখা হল, কেন্দ্রীয় সরকারের আইন মন্ত্রকের মাধ্যমে তাঁরা ঐ বিবৃতি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রক এমন কাজ করতে পারে কি? আইন মন্ত্রক বেআইনি কাজ করে বসে নি তো? সেখানেই জানা গেল, অভিযোগকারিনী ম্যেটির নাম স্টেলা জেমস। নাম তো প্রকাশ তো বেআইনি! হল কেন? কারা করল? এএসজি ইন্দিরা জয় সিং কি করে সেই বিবৃতি প্রেস কনফারেন্সে প্রকাশ করলেন, যা সুপ্রিম কোর্টের ভাষায় ছিল গোপনীয়’?

এমন বহু প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য। ইতিমধ্যে আরেকজন বিচারপতির বিরুদ্ধেও অভিযোগ এসেছে, এবং এ-ক্ষেত্রেও অভিযোগকারিনী কলকাতার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ইন্টার্নি। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আবার কেন্দ্রীয় গ্রিন ট্রাইবুনালের প্রধান বিচারপতি, যিনি পূর্বাঞ্চলের পরিবেশ আদালতটি কলকাতায় খোলার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন। তা ছাড়া, তাঁর দফতরে গিয়ে আটকে আছে এমন বহু বিনিয়োগের প্রকল্প, যেগুলি আদতে পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে। এমনই এক প্রকল্পে বাঁধা দেওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে জয়ন্তী নটরাজনের মত স্পষ্টবক্তা মন্ত্রীকে সরে যেতে হয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যৌনহেনস্থার এ-সব অভিযোগ কি আসলে বিচারপতিদের বিচার প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল হিসাবে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হল? এখনই এই নিয়ে চূড়ান্ত মতামত না দিলেও এমন প্রশ্ন ওঠাকে কিন্তু আটকানো যাচ্ছে না। নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্টের অনেক আইনজীবিই, যঅধিকাংশই মহিলা, এখন এই নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেছেন। তাঁরা চিন্তিত, এর পর বিচারপতিরা মহিলা ইন্টার্নদের আর সুযোগ দেবেন তো? এমনকি চেম্বার অ্যাডভোকেট হিসাবেও মহিলা আইনজীবিদের সুযোগ সত্যিই কমে গেল কি না! যদি একটি ঘটনাতেও প্রমাণিত হয় যে, অভিযোগটি কেবল মিথ্যাই নয়, ষড়যন্ত্রমূলক; সে ক্ষেত্রে অভিযোগকারিনীর পরিচয় গোপন রাখা যাবে তো? অভিযোগকারিনী যদি বয়ান বদল করে থাকেন, তাহলে আইনের চোখে তিনিই হয়ে যাবেন ‘কন্ডেমন্ড লায়ার’, বা স্বঘোষিত মিথ্যাবাদী। গুজরাত দাঙ্গার বেস্ট বেকারী মামলায় এই কারণে শাস্তি পেয়েছেন তিনি, যার পরিবারের প্রায় সবাই দাঙ্গায় নিহত হয়েছিলেন। এমন হলে কিন্তু সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হবে মহিলাদেরই। স্বার্থের ষড়যন্ত্রে আর কেউ জড়িয়ে পড়ার আগে, এই পরিণতিটাও মনে রাখা ভাল।







পর্ব-২
ধর্ষণের হ-য-ব-র-ল ঘটিয়ে দিল সর্বোচ্চ আদালত




মাঝের একটি সংখ্যায় আর আপনাদের জ্বালাতে আসিনি। বইমেলা নিয়েই মেতে ছিলাম। তাই এই লেখার শেষাংশ পাচ্ছেন এক মাস পর। আগের সংখ্যায় খেপচুরিয়ান-এর সম্পাদকমণ্ডলী এই লেখার উপর বিতর্কের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দেখলাম, দুজন এই লেখা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এক বন্ধু মিলন চ্যাটার্জি লিখেছেন, “বেশ ভালো লাগছে পড়তে । দেখা যাক আরও :)।” আরেক বন্ধু গৌতম চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “বিচারপতি গাঙ্গুলির কি দরকার ছিল ৩-জি স্ক্যামে রায় দেবার যেখানে অনেক দলের সংযুক্তি থাকতে পারে অথবা বাংলার জনবন্ধু সরকারের বিরাগভাজন নির্দেশ দেবার তাহলে এই অমূলক অভিযোগ উঠতই না!!!”

ধন্যবার মিলনবাবু, পরের অংশটা এবার দেখে নিন। মতামত জানান। আর, ধন্যবাদ গৌতমবাবু! আপনিই ঠিক। শাসনও সেটাই চায়। সরকারের পদলেহনকারী বিচারক এবং বিচারের রায়। এমনিতেই যে কোনও সরকার অ্যাডভোকেট জেনারেল, সলিসিটার জেনারেল ও অ্যাডিশনাল সলিসিটার জেনারেল পদে তাঁদেরই নিয়োগ করে, যারা সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ বহন করবে। মামলায় তাঁরা সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থকেই রক্ষা করার চেষ্টা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কাজেই, অ্যাডিশনাল সলিসিটার জেনারেল পদে ইন্দিরা জয় সিং-এর নিয়োগ পুরোপুরি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ-কারণেই আশোক গাঙ্গুলীর বিরুদ্ধে তাঁর উষ্মা প্রকাশ স্বাভাবিক। মুম্বাইয়ের বাসিন্দা শ্রীমতি জয় সিং কিন্তু মূলত আইন-বিশেষজ্ঞ নন, নারীবাদী আন্দোলনের একজন এক্টিভিস্ট। ইউপিএ সরকার বর্তমান পদে তাঁকে নিয়োগ করে চেয়েছিল ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করাতে। কিন্তু, তাঁর অনভিজ্ঞতায় সেটি বর্তমানে নানা আইনী বাধায় আটকে গিয়েছে। এক্টিভিজম এক বিষয়, আর আইন প্রণয়ন আরেক বিষয়। এই দুইয়ের মেলবন্ধন অসম্ভব না হলেও বড়ই যে কঠিন, তা শ্রীমতী জয় সিং ভালই বুঝতে পারছেন। বর্তমান পদে তাঁর রাজনৈতিক নিয়োগে তিনি সচেতন । তাই সর্বোচ্চ আদালতেই বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজুর একটি মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেছিলেন, “আমরা ল-অফিসার, সরকারের মুখপাত্র না। আশা করি, আমি যদি কোনও বিচারকের ন্যায্য সমালোচনা করি, সরকার আমার পাশে থাকবে”।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির পদ থেকে অবসর নেওয়ার আগের দিন, অর্থাৎ ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১২ তারিখে বিচারপতি আশোক গাঙ্গুলীর বেঞ্চ ২-জি মামলার ১২২টি লাইসেন্স বাতিল করে রায় ঘোষণা করেন।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশী যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁরা দেশের বড় বড় কর্পোরেট হাউস – যার মধ্যে টাটা ও আম্বানীরাও আছে। তাদের কোচড়ে রাখা থাকে গুচ্ছ গুচ্ছ মিডিয়ার ম্যানেজার থেকে মালিক। টাটাদের নিজস্ব বৈষ্ণবী কমিউনিকেশনের নীরা রাডিয়ার ভূমিকা নিশ্চয় কেউ ভুলে যান নি। যতদূর জানা যায়, আম্বানীদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক আছে ইন্দিরা জয় সিং ও তাঁর নারীবাদী সংগঠনের। ফলে, প্রতিশোধ নেওয়ার এমন একটা সুযোগ কেউ ছাড়তেও চান নি।

আর কংগ্রেসের খেপে যাওয়ার আরও অনেক কারন আছে। জব্বলপুরের এডিএম বনাম শিবকান্ত শুক্লা মামলায় বিচারপতি আশোক গাঙ্গুলী ও বিচারপতি আফতাব আলমের বেঞ্চ রায় দিয়েছিল যে, ১৯৭৫-এ জরুরী অবস্থার সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় জনগণের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করেছিল। তাঁদের মতে, জরুরি অবস্থার সময় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ-সদস্যক সংবিধান বেঞ্চ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার স্থগিত রেখে এই অন্যায় করেছিল। তা ছাড়া, এক রায়ে তিনি বলেছিলেন, মানবিক কারণে দণ্ডপ্রাপ্তের শাস্তি মকুব বা কমাতেই পারেন রাষ্ট্রপতি বা এই মর্মে রাজ্যপাল সুপারিশ করতেই পারেন। কিন্তু, তাঁরা কেউই আইনের দায়রায় থাকা বিষয় নিয়ে কোনও বিরূপ মন্তব্য করতে পারেন না। এমন ঘটনা ঘটলে সেই মন্তব্য সেটি আইনী বৈধতা পাবে না এবং সেক্ষেত্রে আইনের হাতকেই অহেতুক লম্বা করার প্রশ্ন আসবে।

সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি আইনী ব্যাখ্যায় দেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার দায়রায় প্রবেশ না করেও তাঁর মন্তব্যের অধিকারের আইনী বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এমন ঘটনার নজীর অতীতে নেই। ফলে, কংগ্রেসের পক্ষে সহজে বিচারপতি গাঙ্গুলীকে মেনে নেওয়া কঠিন ছিলই। সামান্যতম সুযোগকে তাই ব্যবহার করার জনে উঠে পড়ে লাগেন সলিসিটার জেনারেল বাহনাবতী ও শ্রীমতী জয় সিং। বিষয়টি সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন, যা একেবারেই কাম্য ছিল না। তাঁরা আসলে যা করেছেন, তা বস্তুত কেন্দ্রীয় ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার। তাঁরা সহজেই পারতেন, মামলাটি দিল্লিরই নিম্ন আদালতে দায়ের করে বিচারপতি গাঙ্গুলির বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু, তাঁরা তা করেন নি। কারণ, সেক্ষেত্রে অপমানজনক পরাজয়ের নিশ্চিত রায় তাঁরা আগেই পড়তে পেরেছিলেন।

এবার আসি বিজেপির প্রসঙ্গে। তাঁদের পক্ষ থেকে ইস্তফার দাবীর পিছনে আছে বাণিজ্যিক মহলের অস্বস্তি। বিজেপি এখন ভারতের কর্পোরেট দুনিয়ার প্রশ্রয়ধন্য। তাঁদের ‘প্রধানমন্ত্রী’ পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদিকে পূর্ণত মদত দিচ্ছেন মুকেশ আম্বানীর রিলায়েন্স গোষ্ঠী। আম আদমি পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা তথা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ তো সরাসরি নরেন্দ্র মোদীকে আম্বানীদের সংস্থা ‘রিলায়েন্সের হাতের পুতুল’ বলে মন্তব্য করেছেন। কর্পোরেট লবি চায় মোদীকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে দেখতে। প্রকাশিত তথ্যে প্রমাণ, কর্পোরেটের সবচেয়ে বেশী দান ঢুকছে বিজেপিরই ফাণ্ডে। তাঁদের মধ্যেও অন্যতম আম্বানীরা। কেবল তাই নয়, গুজরাতে অন্যায়ভাবে বিদ্যুৎ বন্টনের বরাত কম দর দেওয়া সরকারি সংস্থার বদলে বেশী দর দেওয়া আদানী গ্রুপ-কে দেওয়ার অভিযোগ আগেই এনেছিলেন। এবার গ্যাসের দাম নির্ধারণ নিয়ে মোদীর নীরবতার প্রসঙ্গ টেনে নীরা রাডিয়া ও সংযুক্ত জনতা দলের এন কে সিং এর সঙ্গে কথোপকথনের উল্লেখ করেন। ওই কথাবার্তাতেই রিলায়েন্সকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রধান বক্তা অরুণ শৌরীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আম্বানীদের বিরুদ্ধে রাজনীতির অঙ্গনে অর্থ ও নানা উপঢৌকনে নিজের স্বার্থে কাজ করানোর অভিযোগও নতুন নয়। শেয়ার কেলেঙ্কারির সময়ে গুরুদাস দাসগুপ্ত তাঁর বাড়িতে আম্বানীদের পাঠানো ঝুড়ি ঝুড়ি আলফান্সো আম ফেরত পাঠিয়ে সরকারি স্তরে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। কংগ্রেসের একটি সূত্রে প্রকাশ, ইন্দিরা হত্যার পর নির্বাচনে চরম আর্থিক টানাটানির কারণে রাজীব গান্ধী প্রার্থী পিছু দু-লাখ টাকার বেশী দিতে পারেন নি। তখন আম্বানীরা এসে রাজীব গান্ধীকে কয়েকশো কোটি টাকা দিতে চেয়েছিলেন। রাজীবকে তাঁরা বলেছিল যে, এই টাকা শ্রীমতী গান্ধীর একটি গোপন একাউন্টের, যা তাঁদের কাছে রাখা ছিল। রাজীব তাঁকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরে, বলিউডের এক নামী অভিনেতার মাধ্যমে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর বাংলার এক নামী কংগ্রেস-ত্যাগী রাজনীতিবিদ নিজের দল তুলে দিয়ে ফের কংগ্রেসে ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করেন, নরসীমা রাওয়ের সরকারে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীত্বও পান। বর্তমানে সেই নেতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও কংগ্রেসে আর নেই। বস্তুত, আশোক গাঙ্গুলীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় চক্রান্তে তাঁকেও জড়িয়ে দেওয়ার পরই বিচারপতি গাঙ্গুলী ইস্তফা দেন।

এবার বাকি রইল শেষ একটি প্রশ্ন – অভিযোগকারিনী কেন এতবড় একটা ঝুকি নিলেন? তিনি আইন্সের ছাত্রী হয়েও আইনের পথে যান নি। আবার সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যক কমিটি বেআইনি জেনেও তিনি সেখানে মৌখিক বিবৃতি দিয়েছেন। আবার তাঁর দেওয়া ৬০ পাতার মৌখিক বিবৃতির সঙ্গে তাঁর ব্লগে লেখা বিবৃতির আকাশ-পাতাল ফারাক। আইনের ছাত্রী হিসাবে তিনি নিশ্চয়ই জানেন, আদালত গেলে বয়ান বদলের কারণে তাঁকে ‘হোস্টাইল’ ঘোষণা করে দিত আদালত। তিনি এও জানেন যে, কারও মর্যাদাহানী করাও সংবিধানের মৌলিক অধিকারের ২১ ধারার পরিপন্থী। তা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে কেন যে রাজনীতির খেলার পুতুল করে ফেললেন, সেটাই রহস্যের। তথ্যে জানা যাচ্ছে, খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী অভিযোগকারিনী যিনি নিজেই লিখেছেন যে ২৫ ডিসেম্বর তাঁদের ধার্মিক অনুষ্ঠান এবং তাঁর সেদিন তেমন এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল) আসলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যের অত্যন্ত ঘনিষ্ট আত্মীয়। পশ্চিমবাংলা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভায় নির্বাচিত সেই সাংসদের নাম ডেরেক ও-ব্রায়ান বলেই প্রকাশ।

আরেকবার দেশের প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তের দ্বিচারিতার প্রসঙ্গটি দেখা যাক। স্টেলা জেমসের তোলা অভিযোগ নিয়ে জলঘোলার পর সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি স্বতন্ত্রকুমারের বিরুদ্ধেও এমনই যৌনহেনস্থার অভিযোগ আনেন আরেকজন মহিলা। দুটি মামলার মধ্যে তফাৎ হল, ঘটনাটির সময় স্বতন্ত্রকুমার সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসাবে কর্মরত ছিলেন। আর মিল হচ্ছে, বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় পরিবেশ ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান, যার কাছে গিয়ে আটকে গেছে অনেকগুলি পরিবেশ ধংসের শিল্পায়ন ও নগরায়নের প্রস্তাব। সেক্ষেত্রেও ক্ষতি হচ্ছে কর্পোরেট লবির। এবং, অভিযোগকারিনী স্টেলার মতই কলকাতার এনইউজেএস-এঁর স্নাতক। কিন্তু, এবার প্রধান বিচারপতি সদাশিবম পত্রপাঠ সেই ইন্টার্নকে বিদায় করে বলেছেন, প্রাক্তন বিচারপতিদের বিরুদ্ধে বিচার করার কোনও এক্তিয়ার সুপ্রিম কোর্টের নেই। তাঁর এই বোধোদয় অশোক গাঙ্গুলীর সময় হয় নি কেন? নাকি, তিনি নিজেই আইনের এক্তিয়ার জানতেন না? শেষেরটি হলে তো দুশ্চিন্তার বিষয় – কার হাতে রয়েছে সর্বোচ বিচারের ভার! তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, এমন মামলার কোনও ‘মেকানিজম’ সর্বোচ আদালতের নেই। সেই মেকানিজম সম্পর্কে পরামর্শ দানের জন্য দু-জনকে ‘আদালত-বান্ধব’ (এমিকাস ক্যুরি) নিয়োগ করেছেন। তাহলে, অশোক গাঙ্গুলির ক্ষেত্রে তিনি কোনও মেকানিজম ফলো করেছেন? তা ছাড়া, প্রধান বিচারপতি কি বিচারের মেকানিজম তৈরি করতে পারেন? সে তো আইনসভার কাজ।

এই ক্ষেত্রে অভিযোগকারিণীর পিছনে কারা টাকার থলি নিয়ে দাড়িয়েছিলেন, সেটি এখনও অন্ধকারে। কিন্তু, তাঁর ছায়া দেখা যাছে। অভিযোগকারিণীর আইনজীবি হিসাবে প্রকাশ্যে এসেছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবি হরিশ সালভে। তাঁর এক দিনের ফি ছয় লক্ষ টাকা বলে শোনা যায়। তাহলেই ভেবে দেখুন! অভিযোগকারিণীর হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, সিএনএন-আইবিএন। বিচারপতি স্বতন্ত্রকুমার এই সংবাদমাধ্যমগুলির বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের মানহানীর মামলা ঠুকে দিয়েছেন। আদালত বাধ্য হয়েই এই সংবাদমাধ্যমগুলিতে বিচারপতি স্বতন্ত্রকুমারের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই মামলার রায় প্রকাশ্যে এলে ষড়যন্ত্রের পর্দা ফাঁস হলেও হতে পারে।

কিন্তু, দ্বিতীয় ঘটনাটিকে বাতিল করে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, এতদিন পর কবর খুঁড়ে এসন মামলা সামনে আনার কোনও যৌক্তিকতা নেই। বিশেষ করে মেয়েটি নিজেই যেখানে আইনের ছাত্রী এবং তাঁর কি করণীয় ছিল, তা তিনি জানতেন; তবু তা করেননি। ঠিক বলেছেন প্রধান বিচারপতি সদাশিবম। কিন্তু, অশোক গাঙ্গুলির বেলায় এই সামান্য যুক্তি তাঁর মাথায় আসে নি কেন, তা যে বোঝা গেল না! এমনকি, প্রধান বিচারপতি স্বতন্ত্রকুমারের বিরুদ্ধে মেয়েটির দায়ের করা হলফনামার গুণাগুণ নিয়েও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন। সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু, অশোক গাঙ্গুলির ক্ষেত্রে শুধু হলফনামার ভিতিতেই যে তিনি বিচারপতি গাঙ্গুলিকে দোষী ঠাউরে ফেলেছেন? কোনও তদন্তের ধার দিয়েও যান নি! তবে কি তিনি নিজেও আইনের প্রাথনিক শর্তটাই লঙ্ঘন করে ফেলেছেন? সেখানে তো বলা হয়েছে, শত অপরাধী মুক্তি পেয়ে যেতে পারেন, কিন্তু একজনও নিরাপরাধ যেন শাস্তি না পান। স্টেলা জেমসের ঘটনায় ইন্দিরা জয় সিং দিল্লি থেকে উড়ে এসে সাংবাদিক সম্মেলন করে অশোক গাঙ্গুলির ইস্তিফা দাবি করলেও স্বতন্ত্রকুমারের ঘটনায় ‘নারী আন্দোলনের এক্টিভিস্ট’ হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি ততোধিক নীরব। কেন?

অতএব বোঝা যাচ্ছে, গোটা ঘটনাতেই একটা হ-য-ব-র-ল হয়ে গিয়েছে। সুকুমার রায় থাকলে বিশেষজ্ঞ্র মতামত দিতে পারতেন। আমরা বুঝি, রাজনীতিকেই সব কিছুর নিয়ন্তা ভাবতে গিয়ে ক্ষমতাসীনরা ধর্ষণের মত লজ্জাজনক ঘটনাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছেন। এই অপ-রাজনীতির অবসান হওয়া জরুরি।

মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৪

উত্তর সম্পাদকীয় - চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না

অবিশ্বাসযোগ্য যৌনহেনস্থার অভিযোগে ক্ষতি মেয়েদেরই
চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য



“ঠোঙ্গা ভরা বাদাম ভাজা, খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না।” কি অনবদ্য লাইনটাই না লিখেছিলেন সুকুমার রায়! এতদিন পরও দেখা যাচ্ছে তাঁর বলা লাইনটা এক্কেবারে চুল-টু-পা ট্রু। আমাদের মাথার উপরে স্ব-মনোনীত অবিভাবকের মত বসে থাকা মিডিয়া-মনোহরেদের সম্পর্কে সুকুমার রায় কত বছর আগেও বিন্দাস আজকের হাল মানসচক্ষে দেখে আকাশবাণীর মত বলে রেখে গেলেন, ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। ইদানিং মিডিয়াই কেবল খাওয়ায়, আরে সুকুমার রায় কতদিন আগে এদেরকেও খাইয়ে গেছেন, ভাবা যায়!

কিছুদিন আগে শতবর্ষে পা দেওয়া এক সাংবাদিকের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে কলকাতার এক সিনিয়ার সাংবাদিক বলছিলেন, “মিডিয়ার এখন নতুন নতুন বিট হয়েছে, যার মধ্যে পড়ে ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ। কোথায় কে কি মন্তব্য করল, তাঁর জন্যেও সতর্ক থাকতে হয়।” তারি সর্বশেষ এক মনহারক নিদর্শণ দেখা গেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আশোক গাঙ্গুলীর বিরুদ্ধে এক ল’ইন্টার্নিকে যৌনহেনস্থার অভিযোগে। অভিযোগ সত্যি না মিথ্যে, তা প্রমাণের অপেক্ষা না রেখেই মিডীয়াবাগীশরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিচার করতে। বিচার বলে বিচার, এক্কেবারে পঞ্চায়েতী রাজ। গাঁয়ের খবর পত্রিকা পেলে লুফে নিত! অভিযুক্তের মতামত শোনার দরকারই নেই। “অহম গাঁয়ের পঞ্চজন, মনে করিয়াছি, অভিযোগ সিত্য এবং অভিযুক্তই অপরাধী। ব্যস” হয়ে গেল পঞ্চায়েতের রায়। রায় মানলে সম্পত্তি ছেরে পালা, না মানলে গাঁয়ের বার করে দেব। অর্থাৎ, সোজাই যাও আর বাঁকা, তুমি যাও ঢাকা কিংবা মক্কা।

মামলাটার পূর্বাপর একটু ভেবে দেখুন, বেশ মজা পাবেন। ঐ মহিলা ইন্টার্নি ঘটনার এক বছর পর এ-বছর নভেম্বরে নিজের ব্লগে এঁকে লিখলেন ‘সম্প্রতি’ ঘটা এক কাহিনী বলে। সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি ২০১২-র ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিজের হোটেলের রুমে তাঁকে ওয়াইন অফার করেছিলেন, মাথায় ও পিঠে হাত দিয়েছিলেন, হাতে চুমু খেয়েছিলেন। মহিলার মনে হয়েছিল এগুলি “আনওয়েলকাম বিহেভিয়ার’। তাই চলে আসতে চেয়েও ঐ বিচারপতির সঙ্গেই সে রাতে ডিনার  খেয়ে তারপর ফেরেন। বিচারপতিই তাঁকে বাড়ি ফেরার গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন এবং গাড়ি পর্যন্ত তাঁকে ছেড়ে যান। সেখানেই তাঁর মনে হল, বিচারপতির আচরণ ‘অনওয়েলকাম বিহেভিয়ার, কিন্তু তিনি সেটা ব্লগেও প্রকাশ করলেন ২০১৩-র নভেম্বরে’, ১১ মাস বাদে।

এবার সূত্রগুলি মেলান। ঐ মহিলা খ্রিস্টান, তাই ২৫ ডিসেম্বর তাঁর উৎসবের রাত। উচ্চশিক্ষিতা ঐ মহিলা অন্য পার্টিতে যাওয়ার কথা ছিল। সে-রাতে খ্রিস্টান্দের ওয়াইন খাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। কেউ তা অফার করলে তা বরং তাঁদের রীতি মানার ভদ্রতা বলে গণ্য হওয়ার কথা। কোনও খ্রিস্টান বাড়িতে পৌষ সংক্রান্তির দিন যদি আপনাকে পিঠে খেতে দেয়, আপনি কি ভাবতেন? আনয়েলকাম বিহেভিয়ার হলে তো তাঁর তখনই চলে আসার কথা! তিনি সেখানে বসে ২৫-৩০পাতা টাইপ করার পর ডিনার খেয়ে বিচারপতিরই আনা গাড়িতে বাড়ি ফিরতেন না। এবং এ-সবই যদি মেনে নেয়া হয় যে মহিলাটিও ভদ্রতার খাতিরেি তৎক্ষণাৎ রিঅ্যাক্ট করেন নি, তাহলেও সেই অভিযোগ জানানোর জন্যে ১১ মাস! বিশ্বাস্য? এক জন আইনজীবির আচরণ কি বলছে?

আইনের ছাত্রী হিসাবে তিনি ভালই জানেন, যে কোনও ফৌজদারী অপরাধের অভিযোগ তখনই গ্রাহ্য হয়, যখন পুলিশে অভিযোগ এফআইআর বা জেনারেল ডায়েরি হিসাবে দায়ের করা হয়। পুলিশ তাঁর তদন্ত করে, মামলা হয়য় নিম্ন আদালতে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে জেলা আদালত, হাই কোর্ট তারপর সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে যায়। নদীর জল যেমন পাহাড় থেকে গড়িয়ে এসে সমুদ্রে এসে মেশাই তাঁর স্বাভাবিক পথ, উল্টোটা নয়; মামলার ক্ষেত্রেও ওটাই তাঁর স্বাভাবিক নিয়ম, উল্টোটা নয়। কিন্তু, বিচারপতির গাঙ্গুলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ঘটনায় দেখা গেল সমুদ্রের জল নদী বেয়ে পাহাড়ে যাচ্ছে।

বলার কারণ, মামলাটা নিম্ন আদালতে এলই না। কারণ, পুলিশে আজও কোনও অভিযোগই দায়ের হয় নি। ফলে জেলা আদালত, হাইকোর্ট ইত্যাদি সব ফালতু হয়ে গেল। সোজা গেল সুপ্রিম কোর্টে… না সেখানেও কোনও মামলা হয়য় নি, কেউ করেনি। প্রধান বিচারপতি স্বতপ্রণোদিত হয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি করলেন অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে। সেই কমিটি আসলে প্রশাসনিক তদন্তের, বিচারবিভাগীয় নয়। রিপোর্টে সেই মহিলা ‘আনওয়েলকাম বিহেভিয়ার এর কথাই পুণরুক্তি করে প্রাথমিকভাবে তারাও অভিযোগের খানিকটা সত্যতা পেয়েছেন, যদিও বিচারপতি গাঙ্গুলী তা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের কমিটি বলে দিন, “যেহেতু ঘটনার সময় বিচারপতি গাঙ্গুলী সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসর নিয়েছেন, তাই এই অভিযোগের বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার এক্তিয়ার সুপ্রিম কোর্টের নেই।” তা ছাড়া ‘এই ল’ইন্টার্নি স্টেলা জেমসও সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে যুক্ত নন’ বলে সর্বোচ্চ আদালত এ নিয়ে কিছুই করতে পারে না। দেখুন, একথা বলছেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বের কমিটি, যিনি নিজেই বিচারপতির গাঙ্গুলীর অবসর উপলক্ষে প্রদত্ত পার্টিতে ছিলেন। তিনি কি এই কমিটি গড়ার আগে জানতেন না যে উনি ঘটনার আগেই অবসর নিয়ে নিয়েছেন? জানতেন না যে অভিযোগকারিনী সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাক্টিশ করেন না? সে অজ্ঞানতার দায় কার? অজ্ঞানতাপ্রসূত একটি মন্তব্য যে গোটা ঘটনায় একজন বিচারপতির মর্যাদায় কালি ছেটাল, তাঁর কি হবে? সুপ্রিম কোর্ট এমন মন্তব্য করার ফলে মামলাটি আর নিম্ন আদালতে গেলেও সুবিচার দূর অস্ত। ফলে, গোটা বিষয়টাই কেচিয়ে এল। যদি, সত্যি বিচারপতি গাঙ্গুলী অপরাধীও হন, তাও তো তাঁর ন্যায্য বিচার সম্ভন নয়!

তাহলে এমনটা হল কেন? এর উদ্দেশ্যই বা কি? এর পিছনে কি কোনও কোট-আনকোট ষড়যন্ত্র আছে বা ছিল?

এগুলিই এখন জরুরি প্রসঙ্গ। এই লেখা লেখার সময়েই জানা গেল, এত দেরিতে অভিযোগ জনসমক্ষে আনায় সুপ্রিম কোর্টও বিরক্তি প্রকাশ করেছে। কিন্তু, সত্যি বললে, মেয়েটি কিন্তু কোনও অভিযোগই জানায় নি। সে ব্লগে লিখেছিল তাঁর কথা – তা সে ঠিক বা বেঠিক – যাই হোক। তাকে মুখোরোচক করে খবরে এনেছে নির্দিষ্ট একটি সংবাদপত্র। তারপর অন্য মাধ্যমগুলি ঝাঁপিয়ে পড়ে। কি ছিল সেই সংবাদ মাধ্যমের উদ্দেশ্য? প্রাপ্ত অভিযোগের সত্যাসত্য যাচাই না করে ব্লগের ভিত্তিতে খবর কতটা যুক্তিসংগত? এ সব নানা প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তারপরই দেখা গেল, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিচারপতি গাঙ্গুলীর অপসারণ চাইলেন। তিনি অবশ্য এক বচর আগে থেকেই বিচারপতি গাঙ্গুলীর উপর ক্ষুব্ধ। রাজ্যের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান হিসাবে তিনি পার্ক স্ট্রিট ধর্ষোণ থেকে অম্বিকেশ মহাপাত্র মামলা, শীলাদিত্যকে মাওবাদী বলে অন্যায় গ্রেফতারের মত ঘটনা সহ বহু ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর মনোভাব গোপন রাখেন নি, বরং বলেছিলেন, ““মানবাধিকার কমিশনে একজনকে আমরা বসালাম, তিনি এসে আমাদের বিরুদ্ধে রায় দিচ্ছেন।” যেন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর নিয়োগে সুপারিশ করেছেন বলে তাঁকে রায় দেওয়ার সময় ধামাধরা হতে হবে! এ কেবল হাস্যকর দাবীই নয়, বিপজ্জনকও। কোনও রাজ্যের বা দেশের প্রধান যদি এই দাবী করেন, তাহলে ধরে নিতে হবে সে রাজ্যে বা দেশে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ঘটেছে। যে বিচারপতি শ্রীমতী গান্ধীর নির্বাচনকে অবৈধ রায় দিয়েছিলেন, তাঁর নিয়োগও কিন্তু শ্রীমতী গান্ধীর সরকারি দিয়েছিল। তিনি কিন্তু এমন উদ্ভট তর্ক তোলার কথা স্বপ্নেও ভাবেন নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পদত্যাগ চেয়েছিলেন। এছাড়া কলকাতার আইন বিশ্ববিদ্যালয় এনইউজেএস-এর একদল অধ্যাপক সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর পদ থেকে বিচারপতি গাঙ্গুলীকে সরাতে কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়েছেন। এতেও আশ্চর্যের কিছু নেই। আইনজীবি কল্যাণবাবু তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ এবং দুর্মুখ, এটা সকলেই জানেন। মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা চাইলে সভাসদেরা যে ‘বলে তাঁর শতগুণ’, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। ইস্তফা চেয়েছিলেন মোহনবাগান ক্লাবের শীর্ষকর্তারাও, কারণ বিচারপতির সেদিনকার রিপোর্টে ক্লাবের বিপুল টাকা জরিমানা হয়েছিল। এই শীর্ষকর্তা আবার একই দলের রাজ্যসভা সাংসদ, অর্থাৎ সভাসদ। তাঁরা যে অপসারণ চাইবেন, এতে বিষ্ময়ের কি আছে!

বিষ্ময়ের বিষয় এল কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত সলসিটার জেনারেল (এএসজি) ইন্দিরা জয়সিংহ কলকাতায় এসে অভিযোগকারিণীর লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করে এবং দিল্লিতে সংসদে বিরোধী নেত্রী বিজেপির সুষমা স্বরাজ বিচারপতির ইস্তফা চাওয়ায়। অভিযোগকারিনী সুপ্রিম কোর্টের তিন-সদস্যক কমিটিকে যে মৌখিক বিবৃতি (কেন মৌখিক, তাও প্রশ্নবোধক) দিয়েছিল, তাঁর কপি অভিযুক্ত বিচারপতি গাঙ্গুলীও পান নি, কারণ সেটি ছিল আদালতের সম্পত্তি। আদালতের সম্পত্তি কিন্তু সরকারের নয়। দি-তিন দিন পর সেটাই মুখ্যমন্ত্রীর প্রসাদধন্য কলকাতার এক বাণিজ্যিক কাগজে ছাপা হয়ে গেল! তাতে লেখা হল, কেন্দ্রীয় সরকারের আইন মন্ত্রকের মাধ্যমে তাঁরা ঐ বিবৃতি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রক এমন কাজ করতে পারে কি? আইন মন্ত্রক বেআইনি কাজ করে বসে নি তো? সেখানেই জানা গেল, অভিযোগকারিনী ম্যেটির নাম স্টেলা জেমস। নাম তো প্রকাশ তো বেআইনি! হল কেন? কারা করল? এএসজি ইন্দিরা জয় সিং কি করে সেই বিবৃতি প্রেস কনফারেন্সে প্রকাশ করলেন, যা সুপ্রিম কোর্টের ভাষায় ছিল গোপনীয়’?

এমন বহু প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য। ইতিমধ্যে আরেকজন বিচারপতির বিরুদ্ধেও অভিযোগ এসেছে, এবং এ-ক্ষেত্রেও অভিযোগকারিনী কলকাতার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ইন্টার্নি। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আবার কেন্দ্রীয় গ্রিন ট্রাইবুনালের প্রধান বিচারপতি, যিনি পূর্বাঞ্চলের পরিবেশ আদালতটি কলকাতায় খোলার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন। তা ছাড়া, তাঁর দফতরে গিয়ে আটকে আছে এমন বহু বিনিয়োগের প্রকল্প, যেগুলি আদতে পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে। এমনই এক প্রকল্পে বাঁধা দেওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে জয়ন্তী নটরাজনের মত স্পষ্টবক্তা মন্ত্রীকে সরে যেতে হয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যৌনহেনস্থার এ-সব অভিযোগ কি আসলে বিচারপতিদের বিচার প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল হিসাবে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হল? এখনই এই নিয়ে চূড়ান্ত মতামত না দিলেও এমন প্রশ্ন ওঠাকে কিন্তু আটকানো যাচ্ছে না। নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্টের অনেক আইনজীবিই, যঅধিকাংশই মহিলা, এখন এই নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেছেন। তাঁরা চিন্তিত, এর পর বিচারপতিরা মহিলা ইন্টার্নদের আর সুযোগ দেবেন তো? এমনকি চেম্বার অ্যাডভোকেট হিসাবেও মহিলা আইনজীবিদের সুযোগ সত্যিই কমে গেল কি না! যদি একটি ঘটনাতেও প্রমাণিত হয় যে, অভিযোগটি কেবল মিথ্যাই নয়, ষড়যন্ত্রমূলক; সে ক্ষেত্রে অভিযোগকারিনীর পরিচয় গোপন রাখা যাবে তো? অভিযোগকারিনী যদি বয়ান বদল করে থাকেন, তাহলে আইনের চোখে তিনিই হয়ে যাবেন ‘কন্ডেমন্ড লায়ার’, বা স্বঘোষিত মিথ্যাবাদী। গুজরাত দাঙ্গার বেস্ট বেকারী মামলায় এই কারণে শাস্তি পেয়েছেন তিনি, যার পরিবারের প্রায় সবাই দাঙ্গায় নিহত হয়েছিলেন। এমন হলে কিন্তু সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হবে মহিলাদেরই। স্বার্থের ষড়যন্ত্রে আর কেউ জড়িয়ে পড়ার আগে, এই পরিণতিটাও মনে রাখা ভাল।



(বাকিটা পরের সংখ্যায়)

সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৩

উত্তর সম্পাদকীয় - অরিন্দম চন্দ্র

প্যাহলে “আপ”...প্যাহলে আপ
অরিন্দম চন্দ্র



চার রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের শেষে বেঁড়ে ব্যাটা “আম আদমি পার্টি” কেন ঘোড়া কেনাবেচা না করে,জনতার কাছে আশ্বাসিত দায় পালন না করে, রাজধর্ম না পালন করে আবার পূনর্নিবাচন চাইছে তাই নিয়ে জাতীয় মিডিয়া আজ কূট-তর্কে মেতেছে।ঠিকই তো,এদের উচিত ছিল বিজেপি বা কংগ্রেসের সাহায্য নিয়ে জল পরীক্ষায় নামা,যাতে প্যাহলে আপ প্যাহলে আপ বলতে বলতে গাড়ি না ফস্কে যায়।রাজ্যের প্রচারমাধ্যমগুলির কথা ছাড়েন,এরা সাবালক হতে হতে আমরা বুড়িয়ে যাব।

একথা সত্যিই যে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে “আপ” এক নতুন তৃতীয় বিকল্পের কথা দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরেছে,ঝাড়ু আজ স্টুপিড কমন ম্যানকে মূল্যবৃদ্ধিতে ফেঁসে দূর্ণীতির ঘন কুয়াশায় আবৃত রাজনীতির বাতাবরণ থেকে একটু হলেও মুক্তির আস্বাদ দিতে পেরেছে,যা কি না সরকারী বাম-দল গুলিও এই সময়ে ভোট-বাক্সে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়ছে।

কিন্তু প্রশ্ন অন্যত্র।এই যে কেজরিওয়ালরা আম-আদমির স্বার্থে সরকার গড়ার লাইন থেকে সরে যাচ্ছে সেটা কি নিছক আরেক সততার প্রতীকের নির্মাণ,না কি সমাজ পরিবর্তনের যে কথা তাঁরা পথসভা থেকে সোশ্যাল-নেটওয়ার্ক সাইট বা এসএমএস এর মাধ্যমে গোটা দিল্লীর ভোটদাতাদের কাছে পৌঁছে দিলেন তার মধ্যেই কিছু অজানা প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা রয়ে গেল ??

মূল্যবৃদ্ধি বা দূর্নীতির ইস্যু আজকাল লোক খুব খাচ্ছে।রাজপুরুষগনও মেতে উঠেছেন বাইট দিতে।আর খুব ঠাণ্ডা মাথায় তাই মিডিয়াও “রাগা” বনাম “নমো”র লড়াইকে হাইলাইট করছে হরবখৎ।কিন্তু কিসের যেন দুই পিঠই সমান,ভারতের মানুষ ইতিহাসটা খুব কম আয়াসে ভুলে যান।যেন এনডিএ আমলে ভারতে মূল্যবৃদ্ধি কম ছিল,দূর্নীতির লেশমাত্র ছিল না এ পোড়া দেশে।পেঁয়াজ আশী টাকা সব্বাই করেছে,সব্বাই ভুগেছে,কফিন থেকে কমনওয়েলথ—গল্পটা একইরকম।

তাই এডভান্টেজ নরেন্দ্র মোদী---মিডিয়ার চিৎকারের পরও কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই থেকে যায়।মধ্যপ্রদেশ বা ছত্তিশগড় মোদীর আমোদে আম-জনতা কতটা মেতেছে সেটার হিসাব পরে হবে,কিন্তু রাজস্থানেও মোদী হাওয়ার চেয়েও বোধকরি সরকারের ব্যর্থতা আর চুরিটা বেশী কাজে এসেছে সরকার গঠনের কাজে।মিজোরামের মত চুনোপুঁটিকে কেউ ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না,আমরাও ছেড়ে দিলাম।আর যে লোকের উন্নয়নের মডেলে গুজরাটের প্রায় অর্ধেক কন্যাশিশু আজও অপুষ্ট তার কথা ঝড় তুললেও গোটা দেশের মানুষ সেই ব্যক্তি বা তার দলকে এখনো কতটা বিশ্বাস করেন তার সারবত্বা জানতে আর কটা মাস অপেক্ষা করাই শ্রেয়।

বাকি রইল তৃতীয় বিকল্প।কেউ ভাবছেন ফেডেরাল ফ্রন্ট,কেউ অ-কংগ্রেস অ-বিজেপি আর কেউ বা এই হালের “আপ”।ফেডেরাল ফ্রন্টের নেতা-নেতৃদের পাল্টি মারা আগেও দেখেছি,তাই খুব বেশী আশা করলে চাষা যে মরবেই সেটা বোঝার জন্য ক্ষুরধার কূটবুদ্ধির দরকার নেই।আর অ-কংগ্রেস অ-বিজেপি জোটের ভিত্তি যতক্ষণ না নির্দিষ্ট কর্মসূচীর উপর বা বৃহত্তর ঐক্যের ভিত্তিতে হচ্ছে মানুষ তাকে কতটা বিশ্বাস করবে তাও এখনই বলা যাবে না।

বাকী রইল “আপ”।এটা ঠিক যে এই ঝাড়ুর ব্যাপক জনসমর্থনের পিছনে শুধুমাত্র নাগরিক সমাজের ভূমিকাই নেই, এই দেশের সাধারন মানুষের একটা “সিম্বলিক” সমর্থন আদায়ে তারা সমর্থ হয়েছে।কিন্তু ইলেক্ট্রিক বিলের বা জলকরের বোঝা বা দিল্লী জুড়ে মেয়েদের উপর অত্যাচারই কি সব? বা দূর্নীতি আর মূল্যবৃদ্ধি?? “আপ” কি গত দুই দশক জুড়ে নয়া-উদারনীতির বিরুদ্ধে??না কি এই এই নীতিকেই আরও সইয়ে সইয়ে খাওয়ানোর নয়া এক্সপেরিমেন্ট? যা বিজেপি বা ইউপিএ করতে পারছে না?? প্যাহলে “আপ” না কি প্যাহলে আপ????

বুধবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৩

উত্তর সম্পাদকীয় - অরিন্দম চন্দ্র

পরাধীনতাটা আজ আর দেশী নয়,আন্তর্জাতিক
অরিন্দম চন্দ্র



সেই কবে কবি লিখেছিলেন, “স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে...”। সত্যিই তো ১৯৪৭ থেকে প্রতি বছর এই দিনে আমরা এমন কত গান গাই,কবিতা আওড়াই, শপথ নিই। কিন্তু যাঁদের ঘাম-রক্তে পাওয়া এই স্বাধীনতা তাঁদের উত্তরাধিকার কিভাবে পাচ্ছি আমরা, কতটুকু স্বাধীন সত্যি সত্যি এ দেশের মানুষ?

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে দেশের ৭৭% মানুষ আজও দৈনিক ২০ টাকার বেশী খরচ করতে পারে না সেই দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে “স্বাধীনতা” শব্দটির ব্যঞ্জনা ঠিক কতটা হতে পারে সেটার প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ আমি-আপনি দিতে পারি না; কারণ প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আমরা প্রায় সব্বাই এদের ভোট দিই, তাতে আম-আদমি বা ম্যাঙ্গো-পিপলের ঐ ২০ টাকা-ওয়ালারাও আছে, আছি আপনি-আমিও। তাই দেশের এক রাজপুরুষের মুখে শোনা “দারিদ্র্য একটি মানসিক অবস্থা” জাতীয় নির্মমতাও আমরা সহজেই হজম করতে পারি বা এখনও এই দেশে দৈনিক ৫ টাকায় ভরপেট খেতে পাওয়ারবর্বরোচিত রসিকতাকে অম্লানবদনে সহ্য করে যাই। আর ভরপুর উদ্যমে দীঘা-শংকরপুর-মন্দারমণির হোটেলগুলি স্বাক্ষ্য দেয় আমাদের স্বাধীনতার। স্বাক্ষ্য দেয় শপিং-মলগুলির বাৎসরিক আজাদি মোচ্ছব।

কি ভাবছেন, বিপ্লবের বুলি ? বা প্রগতিশীল তকমায় অন্ধের হস্তীদর্শন ? গণতন্ত্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম পীঠস্থানের খুব কাছে মানেসর, মারুতির কারখানা। যে কোম্পানীর বার্ষিক আয় বৃদ্ধির হার ৪০% সেইখানে শ্রমিক-কর্মচারীরা ১৫% মাইনা বৃদ্ধির দাবীতে আন্দোলন করে আজ তাঁদের প্রায় ১৫০ জন জেলে পচছেন। দেশের ১২ কোটি মানুষ গত ২০-২১ শে ফেব্রুয়ারী ধর্মঘটে নেমেছিলেন, স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রীও যার দাবীগুলির মান্যতা দিতে একরকম বাধ্য হয়েছেন, সে দেশের কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এই ধর্মঘটের সরাসরি বিরোধিতা করেন নি, ব্যতিক্রম আমাদের পশ্চিমবাংলা। এ’গুলি কোন বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। আমি আপনি কোন ভাবে এই স্বাধীন দেশের রাজন্যবর্গের অপছন্দের কাজ করলে, সেটা যতই গণতান্ত্রিক পথে হোক না কেন, “চোপ” শব্দটা আসছে, কোথাও সরাসরি, কোথাও বা আইনী পথেই।

আর এই স্বাধীনতা হরণের সচল প্রয়াসটা শুধুমাত্র এই দেশের সীমারেখার মধ্যেই আবদ্ধ, এটা ভাবা সম্পূর্ণ ভুল। এই সমকালে সবচেয়ে বেশী সাংবাদিক জেলে পচছে তুরস্কতে। অথচ বর্তমান শাসক রেসেপ এর্দোয়ানই ২০০২ সালে গনতন্ত্রের অন্যতম জাজ্ঞিক হিসাবে উঠে এসেছিলেন। কাছাকাছি মিশরের চিত্রমালা আরও করুণ। অতি সম্প্রতি দু’জনের নাম উঠে এসেছে, এডওয়ার্ড স্নোডেন ও জুলিয়ান আসাঞ্জ। দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার নাগরিকদের অধিকার হরণের প্রয়াসের বিরুদ্ধে মুখ খুলে আজ একজন লণ্ডনের ইকুয়েডরস্থ দূতাবাসে স্থান পেয়েছেন, আরেক জন রাশিয়ার এয়ারপোর্টএ। এই পোড়া দেশের সরকারও আরো কঠিন-কঠোর আইন আনতে চলেছেন। সে আপনি পথে নামুন বা সাইবার-স্পেসকে ব্যবহার করে জনমতকে সংগঠিত করুন। আমার আপনার মোবাইলের I.M.E.I NUMBER, SIM CARD বা কম্পিউটরের I.P ADDRESS আজ রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে উন্মুক্ত। এ এক ভয়ঙ্কর ব্যবস্থা ! অরওয়েলের “বিগ ব্রাদার” আজ প্রতি মুহুর্তে নজরদারীতে ব্যস্ত, আর আমি-আপনি স্বাধীনতার নরম পানীয়তে উল্লাসের চুমুক মারছি টিভি খুলে।

পরাধীনতাটা তাই আজ আর দেশী নয়,আন্তর্জাতিক।গোটা পৃথিবীতে আজ ষড়যন্ত্রটার জ্যামিতিটা স্পষ্ট হচ্ছে। তবুও আশা জাগে, প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীনতা হয়তো একদিন কবির কন্ঠ থেকে আমার আপনার প্রত্যেকের চেতনার অস্ত্রকে শান দেবে,সকলের জাতীয়,না আন্তর্জাতিক হয়ে উঠবে সেই মহামন্ত্র,

“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উত্‍‌সমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়...............”