ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৪

ছোটগল্প - নীলাব্জ চক্রবর্তী



হারামি আর হারামিরা

নীলাব্জ চক্রবর্তী




বাস থেকে নেমে খিদে পেয়ে গেছিলো হারামির। কিছু পরে দ্যাখা যায় কচুরির দোকান থেকে বেরিয়ে আসছে সে। বাবু, হামকো দোঠো কচোরি খিলাইয়ে না একটা মৃদু স্বর তার বাঁদিক থেকে আসছে টের পায় হারামি। প্রায় বুড়ো লোকটা। সেমি-আড়চোখে একবার মেপে নেয় হারামি। আর, স্রেফ ইগনোর করে। মাফ করো বা ঐ টাইপের কিছুও বলে না। সে শুনতেই পায়নি য্যানো কিছু। বা অ্যাজ ইফ নেই-ই য্যানো লোকটা। সিগন্যালে ট্যাক্সির জানলায় ভিখারি এলে কিন্তু হারামি এরকম ১০০ পারসেন্ট নেই করে দিতে পারেনা কখনো। কিছু না দিলেও অ্যাটলিস্ট তার উপস্থিতিটা অস্বীকার করতে পারেনা। অল্প হেসে বা একটা কায়দার মুখভঙ্গি করে কিছু-পাওয়া-যাবে-না টাইপের একটা কম্যুনিকেশন ঘটিয়ে ফ্যালে সে। হুঁ। ওটা স্ট্যাটিক মোমেন্ট। আর এটা ডায়নামিক। এক্ষুনি পায়ে হেঁটে জায়গাটা আর লোকটাকে পেরিয়ে যাবে হারামি। দু-তিন পা হেঁটে রিক্সাস্ট্যান্ড। চাইকি রিক্সাও ধরে ফেলতে পারে একটা। কিন্তু সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাক্সিতে তার স্ট্যাটিক দশা তো নিজের ইচ্ছায় পাল্টাবে না। বড়জোর জানলা বদল হতে পারে ট্যাক্সিতে একা থাকলে। স্বাধীন চলরাশি আর অধীন চলরাশির মতো অনেকটা। তাই হয়তো...। কিন্তু এখন সত্যি সত্যিই একবার সে ভাবে লোকটাকে দুটো কচুরি দিতে বলবে নাকি দোকানদারকে। একটা তো দশটাকার নোট। ধুর, কী দরকার? আশেপাশের লোকে ক্যামোন চোখে তাকাবে। হয়তো, দোকানদারই তাকে মুরগী ঠাওরে বসলো। না, সে মুরগী নয়। সে হারামি। তার এক্ষুনি একটা রিকশা দরকার। রিকশাওয়ালাদের এখনো হ্যালো বলে ডাকার চল হয়নি, না? একটু বিপন্ন বোধ করে হারামি। আরেকটু হলেই তার মুখ দিয়ে ওটা বেরিয়ে আসছিলো। আজকাল প্রায়ই হচ্ছে এটা। অদলবদল হয়ে যাচ্ছে। কখনো সম্বোধন কখনো প্রতিক্রিয়া কখনো গোটা সিকুয়েন্স। এখন এটাকে আপনি রিপ্লেসমেন্ট বলবেন না জাক্সটাপোসিশন সে আপনার ব্যাপার। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে হারামি আসলে কোনও একজনের নাম আর হারামি আসলে কোনও একজনের নাম নয়। হারামি আসলে কয়েকটা আলাদা আলাদা ঘটনার একটা কালেক্টিভ সর্বনাম হয়তো। তা হবে।


হারামি একটা উপন্যাস লিখেছিল একবার। সাকুল্যে সাড়ে ছয় জন পড়েছিলো সেইটা। সেই এক ধোঁয়া ওঠা ওঠা বর্ষাকাল ছিলো বটে। নীল নীল করছিলো বাতাস। ঐ সাড়ে ছয় জনের মধ্যে দুই দশমিক সাত পাঁচ জন খুবই আন্তরিক ভাবে রিঅ্যাকশন জানিয়েছিলো হারামিকে। আপ্লুত হারামি কি করবে ঠিক করতে পারছিলো না। আহা, এই রিঅ্যাকশনগুলোকে বেশ একখান মস্তবড় করে লাইক মেরে রাখা যেত --- ভাবে হারামি। তাতেও কি আর এই আহ্লাদের যথেষ্ট প্রকাশ? তবে হ্যাঁ। মোট সাড়ে ছয় জনের মধ্যে সেই দুই দশমিক সাত পাঁচ জন ছাড়া বাদবাকি তিন দশমিক সাত পাঁচ জন ছিলো আরও বড় হারামি। বোঝে সে। এর কয়েকদিন পর মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে হারামি দেখে তার বালিশ থেকে কয়েকটা কালো অক্ষর চুপিচুপি বেরিয়ে এসে খাট থেকে নেমে যাচ্ছে আর ঘরের দেওয়ালে জড়ো হচ্ছে। এটা একটা গূঢ় সঙ্কেত। খানিকক্ষণ ভাবে বিছানায় বসে। ঠিক করে এবার থেকে সে ছন্দ মেলাবে। পরের দিন সকালে অফিসের বাসে বসে বসেই বিনা আয়াসেই সে দেখলো দুয়েকটা বানিয়ে ফেলতে পারছে। য্যামোন --- ঋত্বিকা বৃত্তিকা অমুকতমুক / সবে মিলে নাচে আর পায় কতো সুখ। এইরকম একটা দুলাইনের ছড়া ছন্দ মিলিয়ে বানাতে পেরে হারামি খুশি হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গেই প্রায়, তার মাথায় আরেকটা এরকম দুলাইনী আসছে টের পায় সে --- হাসিমুখে বাচ্চারা আবোলতাবোল / খায়দায় গান গায় বাজে ঢাক-ঢোল। আহ্লাদে প্রায় উলু দিয়ে ওঠে হারামি। ব্যাস। এবার কিছু গুছনো লোকজন জোগাড় করতে হবে ফেসবুকে। তার ছড়ায় ছন্দে পটাপট লাইক দেবে তারা। কমেন্ট করবে আহা-উহু করে। ক্রমে এমন হবে, সে, এমনকি একটি করে শুভসন্ধ্যা বন্ধুরা বা সুপ্রভাত বন্ধুরা ছাড়লেও লাইক-কমেন্টের নোটিফিকেশনে আকুলব্যাকুল হয়ে উঠবে তার অ্যাকাউন্ট। আর পায় কে এখন হারামিকে? তারপর সারাদিন অফিসে দারুণ কেটে গ্যালো হারামির...


বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় হারামি একটা অস্পষ্ট গলার আওয়াজ শুনতে পেল বাস থেকে নেমে। কে যেন বললো, প্রভাবিত কবিতাতারপর আরেকটা গলার আওয়াজ। একটু কম অস্পষ্ট। হ্যাঁ বন্ধু ঠিক বলেছো, তোমার কোন একটা মৌলিক ছড়ায়, না না সরি, কবিতায়... কবিতায়... তোমার কোন একটা মৌলিক কবিতায় ঢাক-ঢোল শব্দটা ব্যবহার করেছিলে না? নির্ঘাত ওইখান থেকে প্রভাবিত হয়ে এটা বানিয়েছে। তাছাড়া, অমুকতমুক শব্দটাও তো অমুকদা বহুবার ব্যবহার করেছেন ওঁর তমুক কাব্যগ্রন্থে। আর এই স্টাইলেও তো অনেএএএক মৌলিক কবিতা রয়েছে আগে থেকেই। তবে? নাহ, এসব চলতে দেওয়া যায় না। এইসব ভয়ংকরভাবে প্রভাবিত যৌগিক ছড়া, না না সরি, কবিতা... কবিতা...। হ্যাঁ, যা বলছিলাম, এইসব প্রভাবিত যৌগিক কবিতা লিখবে এরা! লোকে পড়ে কী বলবে? দাঁড়াও, এগুলো নিয়ে ফেসবুকে একটা লম্বা স্ট্যাটাস দেবো কালই। একটা সামাজিক দায়িত্ব আছে না আমাদের!


হারামির গল্প এখানেই শেষ হয়। আর, হারামিদের গল্প এখানেও শেষ হয় না। যাবতীয় অসমাপিকা ক্রিয়া আর ধাতুর প্রসারণ গুণাঙ্ক সমেত ওটা আপনার হাতে ছেড়ে দেওয়া আছে। আপনি শেষ করবেন বলে...

ছোটগল্প – অভীক দত্ত




শেষের শুরু

অভীক দত্ত



আসলে বিয়ের পরে সব কিছু শেষ হয়ে যায় না। জীবনটা তো বাংলা মিষ্টি প্রেমের রিমেক ছবি না। বরং বলা যায় বিয়ের পরে আসল স্টোরি শুরু।
 আমার আর দেবপ্রিয়ার প্রেমটা কলেজ অবধিও পৌছায় নি। আদতে প্রেম বলেও কিছু ছিল না। ওদের বাড়িতে পড়তে যেতাম এই অবধিই। পড়তে যেতাম একা আমি না, আরও কয়েকজন। আর আমি বিরাট হিরো টাইপ কিছুও না। বরং অতিরিক্ত সময় বাথরুমে কাটাবার ফলস্বরূপ মুখে ব্রণর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল।
ঘটনাটা ঘটেছিল এক বৃষ্টির দিনে। কেউ পড়তে যায় নি। আমি চলে গেছিলাম। সেদিন নাকি স্যারই ফোন করে বলেছিলেন আসতে পারবেন না। সবাই জেনে ছিল, আমি কোন কারণে মিস করে গেছিলাম। দেবপ্রিয়ার বাড়িতে বেশ কিছুক্ষণ বসেছিলাম। ওর বাবা মা ছিলেন, কথাও বলেছিলাম তাদের সাথে।
পরের দিন থেকে বুঝছিলাম একজোড়া চোখ একটু প্রেম প্রেম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাড়া করছে। সেটা কি কারণ ছিল এখন জানি না, তবে যেটুকু বুঝি সেটা হল বয়ঃসন্ধির সময় এসব হতেই পারে।
ক্লাস ইলেভেনে এটা হয়েছিল, টুয়েলভ অবধি ওদের বাড়িতে পড়তাম। তখন মাঝেমাঝে ফোনেও কথা হত। কিন্তু জয়েন্টে একটা অদ্ভুত র‍্যাঙ্ক করে ফেলায় আমাকে সেই জলপাইগুড়ি চলে যেতে হয়, আর দেবপ্রিয়া জেনারেল লাইনেই পড়াশুনা করে, এবং কোন রকম ভালবাসাবাসির চাপে না পড়ে থার্ড ইয়ার নাগাদ ওর বিয়ে হয়ে যায় এক  কলকাতাবাসী বড় চাকুরে ছেলের সাথে।আমাদের মফস্বলে এই সব খবর চাপা থাকে না, ব্যাচে পড়ার সময় আমার কেসটা যে বন্ধুরা জানত তারাই খবরটা দিয়েছিল।তখন আমি হোস্টেলে রাম আর পুরিয়া মেরে লাট হয়ে পড়েছিলাম, খবর শোনার পর কি রিয়্যাকশান দিয়েছিলাম ভাল করে মনেও নেই তবে এটুকু মনে পড়ে বুকের কোন অংশেই খবরটা কোন রকম ভাইব্রেশন তৈরি করতে পারে নি। বিয়ে বাড়ির খাবারের কথা অবশ্য মনে হয়েছিল, তাই দুই পার্টনারকে রাজি করিয়ে মাঝরাতে এক কাছাকাছি বিয়েবাড়িতে হানা দিয়ে মাংসভাত খেয়ে এসেছিলাম। মেয়ের বাবা যদিও বুঝেছিলেন আমরা নেমন্তন্নহীন অতিথি, তবু পরম স্নেহে আমাদের খাওয়ার তদারকি করেছিলেন।
যাই হোক, এই সব পুরিয়া টুরিয়া বন্ধ হয়ে গেছিল কলেজ পেরতেই, তখন আবার ভাল ছেলে হয়ে কয়েকবছর ব্যাঙ্গালোরে সফটওয়্যারে চাকরি করে কলকাতায় পোস্টিং নিয়ে বিয়ে করে ফেললাম। মেয়ে কলকাতারই তবে সেও চাকরি করে, প্রেম ঠিক হয় নি কিন্তু কি বুঝলাম কে জানে, মনে হয়েছিল কম্প্যাটিবিলিটি ম্যাচ করছে, ধাঁ করে কথা বার্তা বলে বিয়ে হয়ে গেল।
আমার বউয়ের নাম সুপর্ণা। অতিশয় ল্যাদ। এরকম ল্যাদ মেয়ে আজকালকার দিনে পাওয়া দুষ্কর। বিয়ের সময় আমরা মাত্র সাতদিন ছুটি পেয়েছিলাম। দ্বিরাগমনের আগেই জয়েন করতে হত। সুপর্ণা জয়েনিং এর দিন সকালবেলা আমায় বেজায় আদর করে বলল “আমি আর জয়েন করছি না, তুমি যাও”।
আমি বিয়ের আগে হিসেব করা চাকরি করা বউয়ের সূত্রে প্রাপ্ত টাকা পয়সা, লাভ ক্ষতির হিসেবে গুলি মারতে মারতে বউয়ের আবদার আরামসে মেনে নিলাম। সুপর্ণা গৃহিণী হিসেবে অবশ্য ভাল তবে একটু বেশিই বাপের বাড়ি গিয়ে থাকে।বিয়ের তিন বছর পর ক্রিসমাসের ছুটিতে আমাদের মফস্বলের বাড়িতে ফিরলাম সুপর্ণাকে ছাড়াই কারণ ওর বাড়িতে কি কাজ ছিল।
এবং ফিরে বাজারে ঘুরতে গিয়ে দেখা হল দেবপ্রিয়ার সাথে, সামান্য মোটা হলেও ভাল লাগছিল দেখতে, আর আমি অ্যাভয়েড করব করব ভেবেও গিয়ে কথা বলে ফেললাম ‘ কিরে কেমন আছিস?’
আমার প্রশ্ন শুনে খুব একটা না ঘাবড়েই জবাব দিল ‘ভাল আছি, তুই ঠিকঠাক?’
আমি মাথা নাড়লাম, তারপরে জিজ্ঞেস করলাম ‘তোর হাসব্যান্ড কোথায়?’
ও মুখ ব্যাজার করে বলল ‘কোন ছুটি নেই, আমিই একা একা এলাম, তোর বৌ?’
আমিও মুখ ব্যাজার করে বললাম ‘সে বাপের বাড়িতে। কাজ আছে কিছু’।
আমার উত্তরে দেবপ্রিয়া খুশি বলে মনে হল। বলল ‘চ কোথাও একটা গিয়ে বসি’।
আমাদের মফস্বলে এখনো কেবিন আছে, প্রেমিক প্রেমিকাদের নিভৃতে কথা বলার জন্য। আমরা একটা রেস্টুরেন্টের কেবিনে গিয়ে বসলাম। দেবপ্রিয়ার খুব একটা আপত্তি হল না কেবিনে বসার ব্যাপারে, আর আমারও মনে হচ্ছিল খোলা জায়গায় গিয়ে কথা বলার থেকে একটু প্রাইভেসি থাকা ভাল।
একথা সেকথা আকথা কুকথার পর জানা গেল দেবপ্রিয়ার বিয়ের এত বছর পরেও কোন বাচ্চা হয় নি, সেটা বরের জন্য না বউয়ের জন্য এই ব্যাপার নিয়ে কদিন হল দু বাড়িতে ব্যাপক টানাপোড়েন চলছে। দেবপ্রিয়ার কথায় আমার মনে পড়ে গেল আমিও গত এক বছর ধরে একই সমস্যায় ভুগছি। দুবাড়ি থেকেই প্রবল চাপ আসছে বাচ্চা নেবার ব্যাপারে কিন্তু সব রকম পন্থা অবলম্বন করেও আসলে অশ্মডিম্ব প্রসব হচ্ছে।
দুজনের এত বছর পরে দেখা হওয়ার পরে একই পরিস্থিতি বুঝে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম আর তারপরেই দেবপ্রিয়া সেই অদ্ভুত প্রপোজালটা দিল, যেটা আমাদের খানিকটা পিছিয়ে পড়া মফস্বলের সাথে একেবারেই বেমানান ছিল।
“আমি আর তুই একটা ট্রাই করবি? যদি সাকসেসফুল হয় তাহলে আমি একটা বাচ্চা পেলাম আর তুই পাবি তোর পুরুষত্বের প্রমাণ?”
কেন জানি না আমার প্রস্তাবটা একেবারেই ভুল ভাল লাগে নি বরং বিয়ের তিন বছর পরে পুরুষের পরকীয়া প্রেম সানন্দে সেই প্রস্তাবটা মেনে নিয়েছিল। আমি পরিষ্কার বুঝেছিলাম দেবপ্রিয়া যথেষ্ট মরিয়া এই ব্যাপারে, একটা পরনারীশরীর দখল করার লোভটা ক্রমাগত আমার ওপর জাঁকিয়ে বসছিল। বেশ খানিকক্ষণ আরও আলোচনা হবার পর আমরা ঠিক করে ফেললাম কলকাতায় যাবার নাম করে দু তিনটে ষ্টেশন বাদে কোন এক হোটেলে আমরা এই কাজটা করে ফেলব।
আসলে রান্নাটা বিরিয়ানি হোক কিংবা ইলিশ ভাপা, রোজ রোজ একই রান্না খেতে খেতে মুখে কেমন একঘেয়ে ভাব চলে আসে। সুপর্ণার প্রবল উপস্থিতি সত্ত্বেও দেবপ্রিয়ার এই প্রস্তাব আমায় ব্যাপক ভাবে দখল করে বসল এবং তার একদিন পরেই পরিকল্পনা রুপায়ন হয়ে গেল।
আমাদের দুজনের কাউকে দেখেই লম্পট মনে হয় না, হোটেলের জন্য একটা ব্যাগ আর পরের দিন ভোরের বাস ধরতে হবে এই নির্দোষ মিথ্যাতেই আরামসে এক রাত কাটানো গেল, গোটা রাত ধরে স্কুল লাইফের সেই মেয়েটার সাথে অনেকক্ষণ শরীরে শরীরে সময় কাটিয়ে ভোর বেলা যখন বেরলাম, দুজনের মনেই এতক্ষণ বিলুপ্ত থাকা অপরাধবোধ ফিরে এল এবং ফেরার পথে কেউই কারও সাথে কোন রকম কথাবার্তা বললাম না।
বাড়ি ফিরে আর আমাদের দেখাসাক্ষাৎও তেমন হয় নি। আমি কলকাতায় ফিরে গেলাম আর দেবপ্রিয়ার ব্যাপারেও কোন খোঁজখবর রাখলাম না।
এই ঘটনার প্রায় দু বছর পরে বাড়ি ফিরেছি। আমাদের সমস্যা মিটে গেছিল, আমাদের মেয়ে হয় তার এক বছর বাদে। যদিও মফস্বলী মানসিকতায় এখনো মেয়ের থেকে ছেলেই সবাই বেশি চায় কিন্তু যেহেতু প্রায় বিয়ের চার বছর পরে মেয়ে হয়েছিল সেজন্যে সবাই এই ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশি চাপ নেয় নি। বাচ্চা ছোট বলে সুপর্ণা বাড়ি থেকে বেশি বেরত না যদিও বেশিরভাগ সময়টা বাড়ি থাকলে মেয়ে আমার কাছেই থাকত। অনেকক্ষণ মেয়েকে ধরে আমি ঘরে থেকে থেকে তিতিবিরক্ত হয়ে বাজারে বেড়াতে গেলাম এবং  এমন কপাল সেই দেবপ্রিয়ার সাথেই দেখা হল।
আমি এবার আর নিজে থেকে কথা বললাম না তবে এবারে দেবপ্রিয়াই এগিয়ে এল, ওর সাথে বেশ হ্যান্ডসাম একজন স্মার্ট যুবক ছিল আন্দাজে বুঝতে পারলাম ওর বর। পরিচয়পর্ব মেটার পর বুঝলাম আমার অনুমান ঠিকই ছিল।
এই দুবছরে মফস্বলের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, কেবিনওয়ালা রেস্টুরেন্ট ভেঙে তিনতলার ঝকঝকে রেস্টুরেন্ট খুলেছে, পশ্চিমি কায়দায় আগে টোকেন নিয়ে পরে খাবার নেওয়ার প্রচলন ঘটেছে। দেবপ্রিয়ার বর আমায় জোর করে টেনে একটা টেবিলে বসিয়ে টোকেন কাটতে চলে যাবার পর দেবপ্রিয়া অত্যন্ত উত্তেজিত ভাবে আমাকে বলল “সেদিনের পরেও আমার কিছু হয় নি জানিস, ডাক্তার টেস্ট করে দেখেছে আমার কিচ্ছু নেই। একদম ফিট আমি, তাহলে কি তোরও শুভ্রদীপের মত একই সমস্যা আছে?”
আমি এই কথার উত্তর একবাক্যেই দিলাম “দূর, আমার মেয়ে হয়েছে এক বছর হল”। তারপরেই যেন আমি একটা চারশো চল্লিশ ভোল্টের শক খেলাম, দুজনে হাঁ করে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
এরপরে বেশ খানিকক্ষণ শক পরবর্তী অবস্থায় বসে রইলাম, ঝা চকচকে পরিবর্তিত রেস্টুরেন্ট কিংবা দেবপ্রিয়ার বরের কোন কথাই আমার আর কোন কানে ঢুকছিল না।
যদিও জানি, সারারাত একসাথে থাকলেই বাচ্চা হবেই এরকম কোন গ্যারান্টি নেই, হতে পারে, দেবপ্রিয়ার মেডিক্যাল টেস্ট ভুল আছে...
তবু জানি এই কাঁটাটা সারাজীবন আমার গলার কাছে বেঁধে থাকবে।
সাধে কি আর বলে, বিয়ের পরে সিনেমা শেষ হয়। জীবন শুরু হয়...

ছোটগল্প - কৌস্তভ ভট্টাচার্য




আমার গল্প
কৌস্তভ ভট্টাচার্য


অফিসে কার্ড পাঞ্চিং মেশিনটা রোজ যখন বিপ বিপ শব্দ করে কার্ডটা পাঞ্চ করলে - মনে হয় একটা টাইমবোমার দিকে হাত এগিয়ে দিচ্ছি।

আজকাল সব সিগারেট খুব পানসে লাগে। নেশাদের বয়েস বেড়ে যাচ্ছে।

বাসে সিট না পেলে রোজ রোজ দু'তিনটে যাত্রীকে খুন করে ফেলি-ঘুম ভাংলে দেখি তারা আমার জন্য জায়গা ছেড়ে নিজের নিজের স্টপে নেমে গেল।

তোমার সাথে অনেকদিন কথা হয়নি দীপান্বিতা-ফেসবুকে তোমাকে ব্লক করে দেবার পর-সব মহিলাকেই বড়ো ভন্ড মনে হয়।

অ্যালার্ম ক্লকটা এককোণে পড়ে রয়েছে অবহেলিতা ঘরের বউয়ের মতো-আজকাল আমি আমার মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করি-সুদৃশ্য হারামিদের মতো তার মিঠে আওয়াজ-আমাকে রোজ বাস্তবে ফিরিয়ে আনে।

ফোরামের পাশের গলিতে -কফিশপটায় সেদিন কথা হচ্ছিল-

আমি: রক্ত আর রেড ওয়াইন-এর লাল রঙ দেখলে মনে হয়না দুজনের মধ্যে কোথাও একটা মিল রয়েছে?

তুমি: আমার তোমার মতো?

সে: তোমাদের মিলটা রঙের মিল নয় । বরং অনেকটা ধর্ষিতা আর সন্ত্রাসবাদীর মিল । রাষ্ট্র কাউকেই মেনে নেয়না ।

আমি হাড্ডি বর্জনীয় মনে করিনা-আমি বোনলেস চিকেন খাইনা-প্রেম করতে গেলে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি প্রেমকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের সামনে অক্সিডাইজড করে-ভ্যাপসা জলীয় বাস্পগুলো আলাদা হয়ে যায়-নিজেকে বেশ নতুন নতুন লাগে।

তবে আমাদের প্রেমটা বোধহয় ভেঙে যাবে। কিছুই হয়নি-কিন্তু আমার সিক্সথ সেন্স, যাকে ইন্টিউশনও বলে কালকে আমাকে বলে গেছে -

"যেদিন দেখবে হাওড়া ব্রিজের জায়গায়  টাইটানিক চলছে-সেদিন আর প্রেম করতে ভালো লাগবে না"।

"ধ্যাত তা আবার হয় নাকি-হুগলির জলে আজকাল নিয়মিত ড্রেজিং করতে হয়-আর টাইটানিক তো কবে ডুবে গেছে"।

"সব কিছু রোজ রোজ জ়োড়া লাগতে হবে সেটা কোথায় লেখা আছে"।

এলগিন রোড মেট্রো স্টেশনে সামনে দেখলাম বড়ো মিছিল বেরিয়েছে-প্রায় একশো মেয়ে-কারো গায়ে একটাও কাপড় নেই।

কে যেন বললো এরা সবাই কখনো না কখনো ধর্ষিত হয়েছে - লোকের বাড়ি কাজ করতে গিয়ে, অফিসের ঘরে, কিম্বা নিজের বরের কাছে।

"কনসেপ্টটা মণিপুর থেকে টোকা মনে হচ্ছে না?"

"ও মা তা কেন হবে-ওই তো ইরম শর্মিলা চানু নিজে লিড করছেন-সাথে মণিপুরের সেই মায়েরা"।

দূর আমার দ্বারা কোনো বিপ্লব হবেনা-আমার মধ্যে সেই চাড়টাই নেই। আর আমার প্রেমিকাও আমার জামা ধরে টান মারছে-

"বাড়ি চলো মা চিন্তা করবে"।

মেট্রোয় টিকেট কেটে আসার সাথে সাথে দেখলাম ট্রেন ভরতি শুধু পুরুষ মানুষ। নেতাজী ভবন ছাড়াতেই একটা সাউন্ড এলো স্পিকারে-

"পরবর্তী স্টেশন হাওড়া ব্রিজ, প্ল্যাটফর্ম ডান দিকে"।

একি - ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো তো এখনো চালু হয়নি তবে।

এদিকে আমার প্রেমিকাকে নিয়ে কয়েকজন পুরুষ ছেঁড়াছিঁড়ি,কামড়াকামড়ি শুরু করেছে। ও আমার দিকে ফিরে বললো-

"বাড়ি যাবো মা চিন্তা করবে"।

তারপর আস্তে আস্তে ট্রেনটা এসপ্লানেড মেট্রো স্টেশন থেকে ইডেন গার্ডেনের পিচ ফুঁড়ে ওপরে চলে এলো। সেখানে তখন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হচ্ছিল-কি আশ্চর্য ইডেনেও সবাই পুরুষ-তারা একে একে ট্রেনে উঠে এসে আমার প্রেমিকাকে গণধর্ষণ শুরু করলো। আমার প্রেমিকা বললো-

"বাড়ি নিয়ে চলো-মা চিন্তা করবে"।

তারপর ট্রেনটা স্ট্র্যান্ডরোড ধরে হাওড়া ব্রিজে উঠে পড়লো।

ব্রিজের ওপাশে সেই মেয়েদের মিছিল দাঁড়িয়ে রয়েছে।

হঠাৎ করে তারা ছুটে আসতে শুরু করলো।

তার পর আমাদের পুরো ট্রেনটার জানলায় নিজেদের বেঁধে ফেলে মানবীশৃঙ্খল রচনা করে ফেললো সব নগ্ন ধর্ষিতারা।

কে যেন আমাকে জানলা দিয়ে টেনে বের করে আনলো।

আমার গণধর্ষিতা প্রেমিকা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললো -

"বাড়ি যাও মা চিন্তা করবে"।

আমি চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে ব্রিজের মাঝের কয়েকটা নাটবল্টু ঢিলে করে দিলাম-আগেরদিনের মতো হাওড়া ব্রিজ মাঝখান থেকে খুলে দুভাগ হয়ে গেল।

ট্রেনটা যখন হুগলীর জলে তলিয়ে যাচ্ছে দেখি পেছনের ইঞ্জিনের সামনে জ্যাক আর রোজের মৃতদেহ বাঁধা।পরে কাগজে পড়েছিলাম ওদের অনার কিলিং করা হয়েছিল।

সেই থেকে মোমবাতি হাতে হেঁটে যাচ্ছি-এখন আর প্রেম করিনা।

অ্যালার্ম ক্লকটা এককোণে পড়ে রয়েছে অবহেলিতা ঘরের বউয়ের মতো-আজকাল আমি আমার মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করি-সুদৃশ্য হারামিদের মতো তার মিঠে আওয়াজ-আমাকে রোজ বাস্তবে ফিরিয়ে আনে।

তোমার সাথে অনেকদিন কথা হয়নি দীপান্বিতা-ফেসবুকে তোমাকে ব্লক করে দেবার পর-সব মহিলাকেই বড়ো ভন্ড মনে হয়।


বাসে সিট না পেলে রোজ রোজ দু'তিনটে যাত্রীকে খুন করে ফেলি-ঘুম ভাংলে দেখি তারা আমার জন্য জায়গা ছেড়ে নিজের নিজের স্টপে নেমে গেল।আজকাল সব সিগারেট খুব পানসে লাগে। নেশাদের বয়েস বেড়ে যাচ্ছে।অফিসে কার্ড পাঞ্চিং মেশিনটা রোজ যখন বিপ বিপ শব্দ করে কার্ডটা পাঞ্চ করলে - মনে হয় একটা টাইমবোমার দিকে হাত এগিয়ে দিচ্ছি।