কবিতা ভাবনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবিতা ভাবনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

কবিতা ভাবনা - অঞ্জন আচার্য

অঞ্জন আচার্য
কবিতা লিখি কেন


কেনো লিখি? বিশেষ করে কবিতা? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি প্রায়শই আমাকে হতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের প্রশ্নে নিশ্চুপ থাকি। উত্তর যে নেই তা কিন্তু নয়। আছে। উত্তরটি বরং রবীন্দ্রনাথের ওপর চাপিয়ে দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করি। রবীন্দ্রনাথের তাঁর পঞ্চভূত গ্রন্থের পরিচয় প্রবন্ধের এক জায়গায় বলেছিলেন- “জীবন এক দিকে পথ আঁকিয়া চলিতেছে, তুমি যদি ঠিক তার পাশে কলম হস্তে তাহার অনুরূপ আর একটা রেখা কাটিয়া যাও, তবে ক্রমে এমন অবস্থা আসিবার সম্ভাবনা, যখন বোঝা শক্ত হইয়া দাঁড়ায়- তোমার কলম তোমার জীবনের সমপাতে লাইন কাটিয়া যায়, না তোমার জীবন তোমার কলমের লাইন ধরিয়া চলে। দুটি রেখার মধ্যে কে আসল কে নকল ক্রমে স্থির করা কঠিন হয়। জীবনের গতি স্বভাবতই রহস্যময়, তাহার মধ্যে অনেক আত্মখণ্ডন, অনেক স্বতোবিরোধ, অনেক পূর্বাপরের অসামঞ্জস্য থাকে। কিন্তু লেখনী স্বভাবতই একটা সুনির্দিষ্ট পথ অবলম্বন করিতে চাহে। সে সমস্ত বিরোধের মীমাংসা করিয়া, সমস্ত অসামঞ্জস্য সমান করিয়া, কেবল একটা মোটামুটি রেখা টানিতে পারে। সে একটা ঘটনা দেখিলে তাহার যুক্তিসংগত সিদ্ধান্তে উপস্থিত না হইয়া থাকিতে পারে না। কাজেই তাহার রেখাটা সহজেই তাহার নিজের গড়া সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হইতে থাকে, এবং জীবনকেও তাহার সহিত মিলাইয়া আপনার অনুবর্তী করিতে চাহে।” অর্থাৎ নিজের জীবনের রেখার পাশে কলমের রেখা দেওয়ার জন্যই হয়ত লিখি। সত্যিকার অর্থে আমার কিছু বলার আছে যা সবার সাথে ভাগাভাগি করার। ভাবনাগুলো তাই লিপিবদ্ধ করি। বলা যায় ভাবনার বুদ্বুদগুলো মস্তিষ্ক থেকে প্রসব করি মাত্র।

তবে কবিতাই যে কেন লিখি তা আমার কাছে অনেকটা রহস্যময়। হয়ত সহজ কথা সহজভাবে বলতে পারি না বলেই কবিতার রহস্যময়তার আশ্রয় নেই। আসলে আমার ভাবনাগুলোই ছন্দবদ্ধ হয়ে ধরা দেয় মাথার ভেতর। মোটা দাগে বলতে গেলে, আমি কবিতা লিখি না, কে যেন আমাকে দিয়ে লেখায় কবিতা। ভাবনা-বুদ্বুদগুলো খুব সংক্ষিপ্ত; অথচ বিস্তৃত অর্থবহ। যেমন আমার একটি কবিতার লাইন এ মুহূর্তে মনে পড়ছে। কবিতাটি মাত্র দু লাইনের- “আগুন পোড়ায় না হাত/ হাত পোড়ে আগুনে।” এ দিয়ে কী বোঝা গেল? আসলে আমরাই আগুনের কাছে যাই। পুড়ে অঙ্গার হই। কাব্য প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন- “...কাব্যের আনুষঙ্গিক ফল যাহাই হউক কাব্যের উদ্দেশ্য উপকার করিতে বসা নহে। যাহা সত্য যাহা সুন্দর তাহাতে উপকার হইবারই কথা, কিন্তু সেই উপকারিতার পরিমাণের উপর তাহার সত্যতা ও সৌন্দর্যের পরিমাণ নির্ভর করে না। সৌন্দর্য আমাদের উপকার করে বলিয়া সুন্দর নহে, সুন্দর বলিয়াই উপকার করে।” আমিও তাই মনে করি।

পৃথিবীর কোনো কিছুই সাধনা ছাড়া হয় বলে আমার মনে হয় না। কবিতা তার বাইরের কিছু নয়। প্রতিনিয়ত সাধনার ফলেই নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে গড়ছি আজো। প্রতিভা-ফতিভা বলে কিছু থাকলে, তা থাকতে পারে। আমি তার ওপর নির্ভর করে বসে নেই। আজ থেকে দশ-বারো বছর আগে লেখা আর আজকের লেখার মধ্যে এই যে আমি বিস্তর ফারাক দেখতে পাই- তা তো সাধনারই ফল। যদি সেসময়ের লেখাকে এখনও কালজয়ী ভেবে বসে থাকতাম, তাহলে কুয়োর ব্যঙ হয়ে বেঁচে থাকতে হতো। নিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ জলের উপর জলছাপ-এর অনেক লেখাই এখন আমার কাছে লেখা মনে হয় না। প্রথম সন্তানের প্রতি একটু আলাদা দরদ থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই বলে তার কোনো ত্রুটি থাকতে পারবে না- তা ভাবা অন্যায়। আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ আবছায়া আলো-অন্ধকারময় নীল সেই সাক্ষ্যই বহন করে। নিজেকে নিজের থেকে ক্রমাগত অতিক্রম করা মানেই তো জীবনের সার্থকতা। আর লেখালিখি তো জীবনেরই এক অংশ। যারা কলম-শ্রমী তাদের কাছে লেখা এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ জীবনের।

তবে কবিতার পাঠকই কবিদের বাঁচিয়ে রাখে যুগের পর যুগ। তাদের স্মৃতিকোষেই বেঁচে থাকে কবিতার পঙ্‌ক্তি। তারা তো ইতিহাসের নীরব বাহক। আজ যাদের কবিতা আমরা পড়ি কিংবা শুনি, তার অনেকাংশ প্রশংসার দাবিদার ওই পাঠকেরা। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় কবিতার পাঠকরা একটু ভিন্নতর। তারা কবিতার মতোই সংবেদনশীল। সবাই কবিতা পড়েন না। তারাই কবিতা পড়েন যারা সত্যিকার অর্থেই কবিতা ভালোবাসেন। জীবননান্দ যেমন বলেছিলেন- “কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।” কবিতা তো তেমনই। পৃথিবীতে যদি একজনও আমার কবিতার পাঠক থেকে থাকে- আমি তার জন্যই কবিতা লিখে যেতে চাই আমৃত্যু। মৃত্যুর আগে অন্তত এ ভেবে শান্তি পাবো, যে অন্তত একজনের কাছে আমি কবিতার মধ্য দিয়ে পৌঁছাতে পেরেছি।

ধানমণ্ডি, ঢাকা ১২০৯

কবিতা ভাবনা - পলিয়ার ওয়াহিদ

পলিয়ার ওয়াহিদ
কবিতার রূপ ও স্বরূপ


কবিতা একটি অমিমাংশিত শব্দশিল্প। মূলত কবিতার কোনো নিদিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে এটাও বলা যাবে না যে, আসলে কবিতার কোনো সংজ্ঞা হয় না। কবিতা খানিকটা আলো-আধারির খেলা বলা যেতে পারে। যারা চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে গিয়েছেন তারা নিশ্চয়ই জানবেন সেখানকার পরিবেশ খানিকটা আধো আধো আলো ছায়ার একটা ব্যাপার থাকে। অবশ্য এ রকম পরিবেশ সবাইকে মুগ্ধ করে। কবিতাও সে রকম সবাইকে মুগ্ধ করে এটা আমরা সবাই স্বীকার করি। ঝাঁঝালো অতি সচেতন শব্দ- কবিতা নয়, তাকে স্লোগান বলাই শ্রেয়। কবিতা শব্দটির নাম শুনলে আমাদের মধ্যে কেমন যেন একটা আবেশ ছড়িয়ে আবেগের ঘরে প্রবেশ করায়। সবাই যেন কোথায় মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে যায়। এই যে হারানো, হারিয়ে যাওয়া ক্ষণিকের জন্যে এটাই কবিতার আত্মা। কবিতা এক নান্দনিক শব্দ সমাহার বিশিষ্ট কথামালা। কবিতার ক্ষেত্রে কবিকে প্রথম এসে ভর করে চিন্তা। তারপর কবি ভাবের সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকেন। সচেতন একটি উপলব্দি এসে সুরসুরি দিয়ে কবিকে করে যান অবচেতন। তারপর শব্দের ভেলায় চড়ে বাক্যের রাজ্যে এগিয়ে যান কবি। তৈরি হয় কবিতার শরীর। চিন্তা-চেতনা, স্বপ্ন-কল্পনা, ভাব-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি, উপলব্দি-অভিজ্ঞতা যখন শব্দের সংমিশ্রনে মিলেমিশে বাক্যে রূপ নেয় তখন তা কবিতায় অবয়ব ধারণ করে। কবির মনে এক ধরনের মৃদু দোলা অনভূব হয়। ভালো কবিতা প্রথমে কবিকে দুলিয়ে যায়। কবি কখনো কখনো হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলেন। মানুষের মন থেকে আগত যে কোনো ভাব, মস্তিষ্কে ব্যবহৃত ভাবনা, দক্ষতার সাথে পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার ছন্দোবদ্ধ শিল্পিত প্রকাশই কবিতা বা পদ্য। যদিও কবিতা সাহিত্যের প্রাচীনতম শাখা। কিন্তু আজ অবধি কবিতার সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা আমরা পাই নি। এই যে কোনো সংজ্ঞা পাওয়া যায় নাই এর মানে দাঁড়ায় কবিতা গণিতের মতো কোনো সূত্রতো নয়ই বিজ্ঞানের কোনো বিশেষ ছকেও সীমাবদ্ধ নয়। কবিতা এক অসীম আকাশের ঠিকানা। কবিতা কখনো আবেগ কেন্দ্রিক, কখনো অনুভূতিপ্রবণ মনের বহিঃপ্রকাশ, কখনো সমকালের মুখপাত্র, কখনো শাব্দিক ঝংকার, কখনো বেদনাবিধুর হৃদয়ের কান্না, কখনো শোকাহত হৃদয়ের আর্তনাদ, কখনো সংগ্রামী স্বশস্ত্র সৈনিক, কখনো আবার অধিকার বঞ্চিত শ্রমজীবি মানুষের মুখপাত্র।

প্রশ্ন হতে পারে কবিতা তাহলে কি? সাধারণত আমরা যারা কবিতার সাথে দিনরাত উঠা বসা করি তারা এভাবে বলতে চেষ্টা চালায় তাহলো এমন ‘কবিতা একটা সুন্দরী নারীর মতো।’ তাকে তুমি মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজাও। তার কপালে কালো টিপ নাকি লাল টিপ আঁকলে ভালো লাগবে তা কবিকে নির্বাচন করতে হয়। ললাটে পরাতে পারো সোনার টিকলি। নাকে নথ, গলায় গজমতি হার নাকি হীরার হার কোনটা মানাবে সবই তো কবিকে সিদ্ধন্ত নিতে হবে। সংগীতে বাঁধতে পায়ে নুপুর এবং আলতা পড়াতে পারো নিজের মতো করে। কামনীয় করতে কোমরে পারাতে পারো বিছা। এজন্য কবিকে তো অনেকে নবী কিংবা প্রভূ বলে থাকেন। কারণ তার সৃষ্টির মধ্যে কেউ নাক গলাতে পারে না। যেমন পারে না সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতে। এভাবে তাকে সাজাতে হয় আবার লক্ষ্য রাখতে হবে সাজাতে সাজাতে যেন স্বরস্বতীকে কালী না বানিয়ে ফেলি তাহলে ঘটবে বিপত্তি। যে নারীর শরীরে বাড়তি মেদ নেই সেই নারীই কিন্তু হয়ে উঠে মোহনীয় কামনীয় সর্বপরি সৌন্দর্যের আধার। তাই সব দিকে খেয়াল করে কবিতার শরীরকে আঁকতে হবে। যেন বাড়তি মেদে সৌন্দর্যের হানি না ঘটে। আবার অনেকে বলেন, ‘কবিতার জন্য কবিতার সৃষ্টি; আর কারো জন্য নয়।’ এটা কোনো কথা নয়। কবিতার জন্যে আবার কবিতা কিসের? শিল্পের জন্যে শিল্প এ কথাকে তো অনেক আগেই অগ্রজ বাঙলী কবিরা খারিজ করে দিয়েছেন। পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি সবকিছু মানুষের জন্যে। সব শিল্পই জীবনের জন্যে আর মানুষ জীবনের মধ্যে নিহিত। এটা এক ধরনের চতুর বিলাপ। অনেকে অভিযোগ করে বলেন, কবিদের কোনো দ্বায়বোধ নেই তারা সংসার বিরাগী হয়। এসব খোঁড়া যুক্তি। সংসার বিরাগী হয় তো কবি বিশ্বসংসারের সংসারী হওয়ার জন্যে। সমাজের সবচেয়ে কমিটেড ব্যক্তিটি হচ্ছে কবি। কবির চেয়ে আর কেউ কমিটেড হতে পারে না। কবির একটা কমিটমেন্ট থাকতে হবে। দ্বায়বোধ না থাকলে আর যায় হোক অন্তত কবি হওয়া সম্ভব নয়।

কবিতার সংজ্ঞা নিরূপণ নয় কবিতা আসলে কি এবং কেন তা জানার নেশা আমার রক্তের সাথে মিশে গেছে বলেই আমি নিবেদিত হয়েছিলাম বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থের উপর। তাতে অবশ্য অশেষ উপকারই হয়েছে আমার নিজের আর আমার সাহিত্যকর্মী বন্ধুদের। কারণ প্রতেকটা ধর্মই সুন্দর সুন্দর তথ্য দিয়েছে কবিতার। যা আমরা ভাবতে পারি না। এখানে অনেকের গা রি রি করে উঠতে পারে। কবিতার সাথে আবার ধর্মের সম্পর্ক কিসের? আছে আছে সমাজের এমন হোনো বিষয় নেই যে তা নিয়ে কবিতা আলোচনা করে না। কবিতা নিজেই একটা সার্বিক শিল্প এর মধ্যে বিশেষের কোনো স্থান নেই। মানবমুক্তির একমাত্র আসমানী কিতাব আল-কুরাআনে বলা হয়েছেÑ ‘সুসংবদ্ধ সত্যসুন্দর শব্দ সমষ্টিই গজল বা কবিতা।’ আবার গীতা’য় বলা হচ্ছেÑ ‘সুনন্দন তত্ত্বের সমাহার বিশিষ্ট শব্দমালাকে শ্লোক বা কবিতা বলা হয়।’ অন্যদিকে বাইবেল গ্রন্থে বলছেÑ ‘পরস্পর মেলবন্ধন বা সংযুক্ত সৎ ও স্বচ্ছ কথাধ্বনিকে বলা হয় সংগীত বা কবিতা।’ এভাবে আমি আরো তথ্যের জন্যে অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থের স্বরপাণœ হয়েছি। যতটা পারা যায় কবিতা সম্পর্কে আমি জানতে চায় উজার করে। তাই আমার এই সামান্য চেষ্টা। তবে এই চেষ্ট শেষ নয়। অতিসামান্য ভেবে কবিতার এই নানাবিধ সংজ্ঞা আমি দিতে পারি কিন্তু সিদ্ধান্ত দিতে পারি না। আমি শুধু চেষ্টা করেছি কবিতার বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্ব সম্পর্কে পাঠকের সাথে স্ববিস্তর আলাপ করতে। আর এই জন্যে কবি বন্ধু রাসেল আর আজিম হিয়ার অনুরোধে এই কঠিন কাজে মগ্ন হবার মতো দুঃসাহস দেখাতে চেষ্টা করেছি।

একেক জনের দৃষ্টিতে কবিতার সংজ্ঞা এক-এক রকম স্বাদ পেয়েছে। এখন হাজির করবো বিভিন্ন কবিদের কাছ থেকে পাওয়া কবিতা সম্পর্কিত সংজ্ঞা। পৃথিবীর অনেক কবি আজ পর্যন্ত কবিতার বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। আর তাদের সংজ্ঞায় ও দর্শনে ফুটে উঠেছে কবিতার নান্দনিকতা। ম্যাথ্যু আর্নল্ড-এর কবিতাবিষয়ক বিখ্যাত সেই সংজ্ঞাটির কথা আমরা জানিÑ যে সংজ্ঞায় তিনি কবিতাকে ‘ক্রিটিসিজম অব লাইফ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কেউ কেউ স্বীকার করেন, ‘পয়েট্রি ইজ ইমিটিশন অব লাইফ, মিরর অব লাইফ’। এটাই যে কবিতার সংজ্ঞা প্রকৃত তা কিন্তু নয়। হুমায়ুন আজাদের মতেÑ ‘যা পুরোপুরি বুঝে উঠবো না, বুকে ওষ্ঠে হৃৎপিণ্ডে রক্তে মেধায় সম্পূর্ণ পাবো না; যা আমি অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার পরও, রহস্য রয়ে যাবে রক্তের কাছে, তার নাম কবিতা।' অসাধারণ জটিল কাব্যিক সংজ্ঞা এটি। সিকানদার আবু জাফরের মতেÑ ‘আমার চোখের সামনে যা দেখি তাকে অনুভব করেই যা সৃষ্টি হয় তাই কবিতা।’ বুদ্ধদেব বসুর মতেÑ ‘কবিতা বোঝার বিষয় নয়, এটাকে অনুভব করতে হয়। কারণ কবি সম্ভবত বুঝেসুঝে কবিতা লেখেন না; কেবল মাত্র বিষয়কে সামনে রেখে তাকে অনুভব করেই কবিতার জন্ম হয়। কবিতা সম্বন্ধে 'বোঝা' কথাটাই অপ্রসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনা, কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে, ‘বোঝানো যাবে না’। আল মাহমুদ বলছেন ‘পাখীর নীড়ের সাথে নারীর চোখের সাদৃশ্য আনতে যে সাহসের দরকার সেটাই কবিত্ব।’ এর থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে কবিতা লিখতে যথেষ্ট সাহসের প্রয়োজন। অর্থাৎ, কবি সাহসী।’ সৈয়দ শামসুল হকের মতেÑ ‘কবিতা হচ্ছে সর্বোত্তম ভাবের সর্বোত্তম শব্দের সর্বোত্তম প্রকাশ।’ শেলীর ভাষায়Ñ ‘কবিতা হলো পরিতৃপ্ত এবং শ্রেষ্ঠ মনের পরিতৃপ্তি এবং শ্রেষ্ঠ মুহূর্তের বিবরণ।’ রবার্ট ফ্রস্ট বলেন ‘কবিতা হল পারফরমেনস ইন ওয়ার্ডস।’ কবি কোলরিজ এর মতামতÑ ‘গদ্য মানে শব্দ সর্বোৎকৃষ্টভাবে সাজানো। আর পদ্য মানে সর্বোৎকৃষ্ট শব্দ সর্বোৎকৃষ্টভাবে সাজানো।’ এডগার এলান পোর মতে ‘সৌন্দর্যের ছন্দোময় সৃষ্টি।’ কীট্স বলেনÑ ‘কবিতা মুগ্ধ করবে তার সূক্ষ্ম অপরিমেয়তায়, একটি মাত্র ঝংকারে নয়। পাঠকের মনে হবে এ যেন তারই সর্বোত্তম চিন্তা যা ক্রমশ ভেসে উঠছে তার স্মৃতিতে।’ কবি এলিয়ট বলতেÑ ‘কবিতা রচনা হলো রক্তকে কালিতে রূপান্তর করার যন্ত্রণা।’ কার্লাইল বলেনÑ ‘কবিতা হলো মিউজিক্যাল থট।’ জগৎ বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল কবিতার সংজ্ঞায় বলেন ‘কবিতা দর্শনের চেয়ে বেশি, ইতিহাসের চেয়ে বড়ো।’ কবি সেন্ট অগাস্টিন বলেনÑ ‘যদি জিজ্ঞাসা করা না হয়, আমি জানি। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আমি জানি না।’ বিখ্যাত ফরাসি কবি বোদলেয়ার বলেনÑ ‘প্রত্যেক কবি অনিবার্যভাবেই সমালোচক। একজন সমালোচক কবি হয়ে উঠলে আশ্চর্য হওয়া যতটা স্বাভাবিক তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য হতে হবে যদি একজন কবির মধ্যে সমালোচক জেগে না থাকে।’ ইংরেজ কবি জনসন বলেনÑ ‘কবিতা হল মেট্রিক্যাল কম্পোজিশন। আনন্দ এবং সত্যকে মেলাবার শিল্প যেখানে ৎবধংড়হ কে সাহায্য করার জন্যে ডাক পড়ে রসধমরহধঃরড়হ এর।’ কবি মিল বলেনÑ ‘চিন্তা এবং বাক্য, যার মধ্যে আবেগ পেয়ে যায় নিজের শরীর।’ মেকল বলেন ‘ কবিতা বললে আমরা বুঝি সেই শিল্প যা শব্দকে ব্যবহার করে এমন ভাবে যা কল্পনার রাজ্যে জাগিয়ে দেয় এক স্বপ্ন।' ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেনÑ ‘কবিতা সমস্ত জ্ঞানের শ্বাস-প্রশ্বাস আর সুক্ষ আতœা।’ এসব সংজ্ঞা থেকে প্রতিমান হয় যে কবিতা এক ‘আবেগের ঘোর’। যাকে উপলব্দি করতে হয়, বুঝা যায় কিন্তু বোঝানো যায় না। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল¬াহ কবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে নিজেই সংশয়ে পড়েছেন। ‘সত্যি অর্থপূর্ণ কবিতার সংজ্ঞা দেওয়া খুবই কঠিন।’

কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে আমার সবচেয়ে ভালোলাগে যে কয়েকটি লাইন তাহলো কবি শঙ্খ ঘোষের ‘বোধ’ কবিতাটি পাঠকের বোধের জন্য দ্বায়বোধ মনে করেই উপস্থাপন করছিÑ
‘‘যে লেখে সে কিছুই বোঝে না
যে বোঝে সে কিছুই লেখে না
দুজনের দেখা হয় মাঝে মাঝে ছাদের কিনারে
ঝাঁপ দেবে কি না ভাবে অর্থহীনতার পরপারে!’’
আমার মনে হয় না যে আর কোনো কবিকে হাতে করে শেখাতে হবে না যে কবিতা এ রকম ও রকম। এরপরও যদি কাউকে বলে দিতে হয় কবিতা এ রকম তা হলে তাকে দিয়ে কবিতা হবে না অন্য কিছু ভাবতে বলায় মঙ্গল।



পলিয়ার ওয়াহিদ
সাব এডিটর, দৈনিক যায়যায়দিন

কবিতা ভাবনা - কুহক মাহমুদ

কবি ও কবিতা
কুহক মাহমুদ


যান্ত্রিকতার ছায়া আজ এতটাই বড় যে কোনটা নিজের ছায়া আর কোনটা আধুনিকতার তাতে ভ্রম হয়। মাঝখান থেকে ঐতিহ্যের রূপ-রস আহরণ করে সুস্থ-সংস্কৃতির বিকাশ কিভাবে সম্ভব তা প্রশ্নের সম্মুখিত করে বৈকি, যেখানে নিজেকে দেবার মতো সময় বের করা আর গোধূলির প্রস্থানে পূর্ণিমা নামানোর মতই দূরহ। তবু আশার কথা এই যে, জীবন চর্চার আরাধনা আর ফসল ফলানো সংস্কৃতির বুনিয়াদ গড়ে উঠছে আয়ি রাণী পিপিলিকার শশব্যস্ততায়। ঐতিহ্যের নানান উপকরণ সংস্কৃতির রন্দ্রে রন্দ্রে সঞ্চারমান কিন্তু সব উপকরণ বিরাজমান নয়। তাই মনে করি কবির কাজ অতীতের দিকে ফিরে তাকানো। সে সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। ইতিহাস থেকে সব উপকরণ সংগ্রহ করে সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করাটাও যে কাজ, আজকের সব উত্তর আধুনিক কবিরা তা ভুলতে বসেছেন। এহেন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখবো কি করে বুঝতে পারি না। এটা আমাদের মানতেই হবে যে চিন্তাধারার পরিবর্তন এলে আমাদের চারপাশের পার্থিব বস্তুর রূপ-রস-গন্ধ ভিন্ন মাত্রা পায়। যা হয়তো পূর্বে বাস্তব ছিলো বা ধ্রুব সত্য ছিলো তার মাঝে কতটুকু মিথ্যা আছে তা প্রস্ফুটিত হয় চর্চার মাধ্যমেই। পশ্চিম থেকে ধার করা উত্তর আধুনিকতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে তীব্র আলোর ঝলসানিতে দেখা যায় আমাদেরই দগ্ধমুখ আর আয়নার সামনে দাঁড়ালে এই মুখশ্রীই আমাদের বিমোহিত করছে। পশ্চিম আমাদের যতটা না শিখিয়েছে সাহিত্যকলা তার চাইতে বেশী শিখিয়েছে প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয়কে বারুদগন্ধ সহ্য করবার ক্ষমতা। এটা অস্বীকার করবার জো নেই যে, হাজার বছরের ইংরেজী সাহিত্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ তাই হয়তো অনেক কবিকেই ইংরেজী সাহিত্যের প্রভাবদোষে আক্রান্ত বলে দোষারপ করা থেমে যাবে না। এখানে হয়তো বলা যেতে পারে আমাদের চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় কবিতার মাঝে গীতিময়তা শ্রুতিময়তার স্বাদে-গন্ধে প্রাণ উছলানো গতিময়তার ঝরণা কল্লোল থেমে গিয়েছিলো? তারপর কি আর আর কখনোই ফিরে পায়নি তার বাঙালিরূপ? এ প্রশ্ন অমীমাংসিত বা বাংলা কবিতার আত্মপরিচয়ের যে রূপ প্রকাশ করা হয়েছে তাতে মোটেও তুষ্টি নেই। অনেক বিদগ্ধ দার্শনিক চিন্তাবিদ এখনও এনলাইটমেন্টের ব্যাখ্যা করে চলেছেন এবং তাতে নিয়েজিত আছেন। মিশেল ফুকোর রূপ উদ্ঘাটনের জন্যে অষ্টাদশ শতকে প্রকাশিত ইম্যানুয়েল ক্যান্টের একটা লেখনির উপর ভর করে চমৎকার মন্তব্য করেছেন; আধুনিকতা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের সীমানা সংকীর্ণ, বিশ্লেষণ অস্পষ্ট আর তাই আধুনিকতা না বুঝে এনলাইটমেন্টের প্রয়োগ করাটাও ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হবে। আমাদের বর্তমান সময়ের এই উত্তর আধুনিক কাব্যচর্চাটা হওয়া উচিৎ রেঁনেসা বা রিফর্মেশনের মতোই ইতিহাস খ্যাত। একজন কবি মাত্রই শিল্পী; আর শিল্পের জন্ম অনুভব থেকে। এই অনুভব থেকেই ভাবাবেগের জন্ম যা প্রকাশিত হলে শিল্পরসিকদের আনন্দ প্রদান করে। এ বিষয়টি প্রয়োজন না মিটিয়েই আনন্দ দেয় তাই তা সুন্দর; হতে পারে তা জাগ্রত স্বপ্ন তবে এটাই ইচ্ছা পূরণের উপায়। হতে পারে তা কল্পনার বিষয়, তবে তা প্রকাশ ক্ষমতাকে নিখুঁতভাবেই গড়ে তোলে। শিল্পের আছে স্থিতি আর জীবনের আছে গতিময়তা। কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের যোগ বিয়োগ, অভিজ্ঞতার সাথে চিন্তার সমন্বয়, হৃদয়ের সঙ্গে বুদ্ধির প্রয়োগ, বিশ্লেষণের সাথে আত্মার বিমলানন্দ, বিচারের সাথে সহানুভূতির অবস্থান, রূপের মাঝে বিষাদ, জলের মাঝে রঙ এমনি সব ইন্দ্রিয়ানুভূতি পরিবেশনার নানান আকারে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়ে যখন একটা সংগতি বা সামঞ্জস্যপূর্ণ সৌন্দর্যকে খুঁজে নিয়ে আনন্দ দেওয়া সম্ভব হয় তাতেই শিল্পের দক্ষতা বা তাঁর ফসল জন্মদানকারীগণ এক একটা প্রতিভা। বেনেদেত্তোর ক্রোচের ভাষায় বলা চলে- ‘প্রতিভা- শব্দটি শুধুই শিল্পস্রষ্টার।’ তাই শিল্পীকে তার নিজস্ব চর্চাকৃত বিষয় সম্পর্কে সম্মক ধারনা পোষন করতে হবে, বিশেষভাবে জানতে হবে, গভীরভাবে অনুভব করতে হবে নয়তো তা হবে কারিগরের সৃস্টি বাজারে বিক্রয়যোগ্য পণ্য। কোনক্রমেই শিল্প হবে না। শিল্পী একাধারে দ্রষ্টা ও স্রষ্টা উন্নততর সৃজনীক্ষমতা ও মূল্যবোধের প্রতীক। কবি কথার বর্ণচ্ছটায় ষ্পর্শ ঘামে রঞ্জিত হওয়া তারুণ্যের সকাল-দুপুর-রাত স্বপ্ন আর ইচ্ছের সাম্পানমাঝি দরিয়ার বুকে তরতর করে বইয়ে দিবে বাক্যের স্রোতে। স্বপ্নকে সত্যি করবার উদ্দাম প্রচেষ্টায় অনুপ্রাণিত করা কবিতার সান্নিধ্য দ্যুতি ছড়াবে সমাজে সংসারে। মনন আর মেধার মিশ্রনে জীবনের আভা ছড়াবে স্বতঃস্ফূর্ততার কবিতা। আবেগ তাড়িত সম্পন্ন মানুষের প্রতিকৃতিতে থাকবে বিশুদ্ধ মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবার নান্দনিকতায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যার মাঝে থাকবে দায়বদ্ধতা মিটিয়ে দেবার নৈকট্য। জীবন ও সামাজিক নিগূঢ় বন্ধনের অন্বেষায় মগ্ন কবি অস্তিত্বের পথ ধরে ইতিহাসের প্রজ্ঞা লগ্নিকারী হবেন, বিষন্ন বস্তুবিশ্বের একাত্মতায় যোগি না হয়ে জ্বালিয়ে দিবেন তন্দ্রালীন জোনাকির মশাল আর তার প্রতীক আশ্রিত শব্দমালায় সূর্য হবে নতজানু পদ্মের দোসর। আর খোঁজার আগ্রহ যাদের আছে, যারা বোঝেন ভাব-বাচ্যের আবেদন শব্দের নৈপুণ্যে সমৃদ্ধ হয়, নিজকে অন্যকে পুনরায় ভাবনার সুযোগ করে দেয় যে এইতো আমাদের নিত্য দিনের সংস্কৃতি তেমনি প্রাত্যহিক সমস্ত গ্লানি সরিয়ে দেবার কৌশল শিখে নেবার প্রত্যয় যেখানে আত্মবিশ্বাস বাড়ায় সেখান থেকে কবিতার জন্ম। আর সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি- তাই কাব্য ভাষা সকলের জন্যেও নয়। কবিতার সামনে দাঁড়ালে তার কাব্য ভাষার রূপময়তায় যা সুন্দর বা বাহ্ বলে উঠবার মতো চোখের অঞ্জন হয় তারাই আপন খেয়ালে শুদ্ধ কাব্য ভাষায় আমাদের সামনে দাড়িয়ে বলতে পারেন, আমি কবি বা কবিতা লিখতে পারি। সব মিলিয়ে আপন খেয়ালে নতুন কাব্য ভাষায় কবি অবলীলায় বন্দি করতে পারেন পাঠককে। পাঠক তাঁকে ঘিরে গড়তে পারেন যে কোনো বৃত্ত, যেখানে থাকে মুক্তির মতো আস্বাদ। এছাড়াও কবির মাঝে কবিতার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় সারল্য, সহজ জীবন বোধের দিন, উপমা ব্যাঞ্জনার সুখ প্রহ্লাদ। অনেক সময় দেহজ কামজ যন্ত্রনার বাইরেও যে অতিন্দ্রিয় কোন অনুভব থাকে, সেখানে কবি মাত্রই শব্দের আবেশে দিতে পারেন শুশ্রুষা, কবিকে তাই মুন্সিয়ানার ঘটকও বলা যেতে পারে, আমি আমরা যেথা হতে নিতেই পারি আত্মার বিমলানন্দ। কবি- নীলকণ্ঠী কৃষ্ণ অবতার। নৈঃশব্দ্যের মাঝ থেকে আহরণ করা শব্দের আকর খোঁজা চাষী। মাছরাঙার মতো জল অক্ষরের ভূগোল স্পর্শ করা দরাজ স্বর, হাওড় সংগীতে সময়কে স্তব্ধ করে দেবার অপার্থিব যাদুকর বা অর্ফিয়ুসের অমোঘ নিয়তি বা নার্সিসাসের আত্মমগ্নতার আত্মহুতি যেখানে দস্তায়েভস্কি প্রশ্ন ঝুলে থাকে টেলিগ্রাফের তারে- কবিরা মহিমান্বিত বেদনার সন্তান পূর্বাপর, আজন্ম ও অদ্যাবধি। তাই এই শৈল্পিক নৈতিকতার বিশুদ্ধতা রক্ষা করা অবশ্যকরণীয় কবির কর্ম, তাইতো কবিতা হৃদয়কে সৎ করে দেয়। আর কবিতা লেখার সময় কবি হয়ে ওঠেন বিশুদ্ধ, সৎ এক ধ্যানী সন্ত।