টুকরো কথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
টুকরো কথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১২

বিকাশ সরকার


প্রাইমারি স্কুলের জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হতো বিগুলঝোরা নদীটির পাড়ে কাশফুল কত ঘন হলো। স্কুলের পিছনেই নদী, তারপর নদীর পাড়। নদীর ওপাড়ে একরত্তি চর জেগে থাকত, কিন্তু মাঝের এই জঙ্গলের জন্য সেটা দেখা যেত না। কিন্তু যখন একটু একটু করে সেখানে কাশফুল ফুটে উঠতে শুরু করত, আমরা ভাঙা জানালা দিয়ে একটু একটু করে দেখতে পেতাম। কেমন যেন এক আলো খেলা করত সবার চোখেমুখে। সে আলো শরৎকালের। কাশ যত মাথা উঁচু করে, আমাদের চোখেমুখে সে আলো আরও আনন্দিত হয়, আরও ঘন হয়। মনে হয় কলমির ওই জঙ্গল পেরিয়ে একটু বেড়িয়ে আসি ওই পাড়ে। ওপাড়ের ঘন কাশবন যেন স্বপ্নের মধ্যেও আনাগোনা করে। না, আমাদের গ্রামে কোনো বুক দুরুদুরু করা আমলকী বন ছিল না। তবে গাছগুলি দেখে দিব্য বোঝা যেত সত্যিই পাতা খসানোর সময় হয়ে এসেছে। আর ছিল স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে এর বাড়ি-তার বাড়িতে বিস্তর শিউলি গাছ। রাস্তার ধারেও ছিল মালিকানাহীন সেইসব গাছগুলি। শিউলির গন্ধ ভেসে এলেই বোঝা যেত পুজোএসে গেছে। লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, কার্তিকপুজো...সব পুজোর সঙ্গেই দেবতার নাম জড়ানো থাকে; কিন্তু স্রেফ ‘পুজো’ মানে হলো দুর্গাপুজো। দেবতা এখানে নিমিত্তমাত্র, পুজোটাই আসল; এবং পুজোর আনন্দ। ঢাকিরা পুজো শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ঢাক বাজাতে বাজাতে মন্ডপের দিকে যেতে থাকেন; সেই বাদ্য বুকের ভিতর কী উন্মাদনা তোলে। ‘ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালেবিলে’—এই বাক্যে তার সমর্থন চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। অতএব কাশফুল ফুটল, শিউলির গন্ধ পেলাম আর বুকের মধ্যে বেজে উঠল ঢাক; এই ত্র্যহস্পর্শ না হলে আর পুজো কই?

গ্রাম বলতে তো তিনদিকে চা বাগান আর একদিকে বন। মাঝখানে একটুখানি লোকালয়। একচিলতে বাজার। পুজো হতো একটাই। সেটা বারোয়ারি মন্ডপে। শামিয়ানা টাঙানো হতো। লাল-নীল-সবুজ-হলুদ কাগজ তেকোনা করে কেটে নারকেলের দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। সেই পতকাবৎ কাগজগুলি যত ওড়ে ততই যেন আনন্দ বাড়ে আমাদের। বেলুনওলা আসে সাপবেলুন ফুলিয়ে, লংকাবাজি-চরকি-বুড়িমার চকোলেট-তুবড়ি নিয়ে দোকান বসে, ঘুগনি আর পেঁয়াজির দোকান বসে। পুজো শুরু হয়ে যায়। মাইকে পুরুতমশায়ের মন্ত্র ভেসে আসে। টিউবলাইটের নীচে আরতি কম্পিটিশন হয়। সেখানে সারা বছরের জমানো যত কসরত দেখান বীরেনমিস্ত্রি-ফিটারকাকু-রমেনধোপা। আর আসে যাত্রাপার্টি। অষ্টমীতে আরতি কম্পিটিশন তো নবমীর রাতে ‘রহিম বাদশা রূপবান কন্যা’ দেখে চোখের জলে বুক ভেসে যায়।

এখন হঠাৎ করে দেখি দুর্গাপুজোর সেই উপচারগুলি যেন এক এক করে খসে পড়েছে। যেন দুর্গারই দশ হাত একটা একটা করে খসে পড়া। মহালয়ার ভোর যে কী উন্মাদনাকর ছিল সে আজ কাউকে বলেও বোঝানো যায় না। গ্রামজুড়ে হাজারটা রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র গমগম করে চন্ডীপাঠ করছেন, মাঝেমাঝে গান, সঙ্গে শিউলির গন্ধ, সেসব আজ আর নেই। এখন মহালয়া শোনার জিনিস নয়, দেখার জিনিস। পাঠটা গৌণ, মুখ্য হলো কে কত ড্রামা করতে পারছে। তেমনি দুর্গাপুজোও তার সেই রূপ হারিয়েছে। পালটে গেছে পরম্পরা। আলোর রোশনাই, গগনচুম্বী লক্ষ টাকার প্যান্ডেল, হিন্দি গানের সঙ্গে উদ্দাম নৃত্য—এসব এখন পুজোর অন্যতম অংশ। এত আলো তবু যেন মনে হয় যাঁর পুজো সেই দেবী দুর্গা অন্ধকারে ডুবে আছেন তাঁর ছেলেপুলে নিয়ে; কেউ তাঁদের দিকে ফিরেও তাকায় না, সবাই প্যান্ডেলের কারুকাজ দেখতে মগ্ন। এখন তো বহুজাতিক কোম্পানিগুলিও তাদের পণ্যের প্রচারের জন্য পুজো স্পনসর করছে। তাই ঢাকিরা সব কোনো মোবাইল নেটওয়ার্কের গেঞ্জি পরে ঢাক বাজায়, আর দূর থেকে কেউ তাঁদের ধমকে বলেন, ‘ওরে ঢাক বাজানো বন্ধ কর, এখন আমাদের হিমেশ রেশমিয়া শুরু হবে।’ ঢাকিরা সব মুখ কালো করে এক কোণে বসে থাকেন, শুরু হয়ে যায় ‘ঝলক দিখলা যা’র সঙ্গে নৃত্য। তান্ডবের ‘তা’ আর লয়-এর ‘ল’ দিয়ে যে ‘তাল’ হয়েছে তা এই বঙ্গসন্তানেরাই প্রমাণ করেছেন। ওদিকে বেচারা পুরুতমশায় যে তাঁর চেলা নিয়ে কী করছেন সেদিকে কারও কোনো লক্ষ্যই নেই। তিনি হয়তো তখন বীতশ্রদ্ধ হয়ে মায়ের সন্ধ্যারতি করছেন। আসলে, পরম্পরাও যে পণ্য হতে পারে তা আজকের দুর্গাপুজোই জ্বলন্ত নমুনা। মনে হয়, একটা সময় আসবে যখন পুজোয় আর ঢাকই বাজবে না। অঞ্জলি হবে না। আরতি তো সেই কবেই বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু প্যান্ডেল থাকবে। তীব্র আলোর ঝলকানি থাকবে। আর থাকবে উন্মাদনৃত্য।

এবং বাজির গন্ধে ভরে যাবে বাতাস, শিউলির গন্ধ সেখানে মুখ লুকনোরও জায়গা পাবে না। আমরা তখন ফিরে যাব সেই গ্রামটিতে, যেখানে কাশবনে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন দুর্গা, পিছনে পিছনে ছুটছে অপু, আসলে আমি।



অলংকরণ – মেঘ অদিতি কৌশিক বিশ্বাস

শুক্রবার, ২ মার্চ, ২০১২

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

টুকরো কথা - ১ 

ভালই বাস, কি হত্যাই কর !

দ্বিতীয় পর্ব:- 
ফতেমা একদিন ওই দিগন্ত পার হয়ে বানজারাদের কাফেলার সাথে চলে গেলচলেই গেলতাঁর মতন মানুষের সঙ্গে থাকা অনুচিত ফতেমারখৈয়ামের বেগম আছেফতেমার ঠাঁই কই? তাছাড়া এসব নেশা মাত্রকাল নেশা ছুটে গেলে তখন? ফতেমাকে পরে থাকতে হবে ছেঁড়া কাপড়ের মতনকাবেলার ভাই-বেরাদর যত সকলেই একথা বলেছেফতেমা মেনে নিয়েছেতাঁদের মিলন নেইতাঁদের কুষ্ঠীতে নক্ষত্রের দোষফতেমা কাফেলার সঙ্গে চলে গিয়েছে মরুভূমি পার
তারপরের থেকে নক্ষত্র দেখেছেন তিনিদীর্ঘ্যকাল রাতের আকাশে তাকিয়ে থেকেছেনঘুম আসতো না তাঁরকষ্ট ভারী হয়ে ঝুলতো তাঁর পড়ার ঘরের কোণ-কুলুঙ্গিতেঢুকলেই ঝাঁপিয়ে পড়তো তাঁর উপরে যেন দামাল এক শিশুতিনি তাকে কোলে নিয়ে আদর করতেন, খেলা করতেনকাঁদাতেন, কাঁদতেনএকদিন যখন আর জল ছিল না কোনো তখন ওই অনন্ত আকাশের দিকে চাইলেনযখন তিনি চাইলেন তখন মনে পড়লো তাঁকে ফতেমা বলেছিল,
- আমরা দুজন যেন দুটি সমান্তরাল রেখাচলে যাচ্ছি আর চলে যাচ্ছি
খৈয়াম, যে সুলতান মালিক শাহ-র পরামর্শদাতা, যে কিনা বলখ-এ শেখ মুহাম্মদ মনসৌরির ছাত্র, খোরাসান-এ যাকে শিক্ষা দিয়েছেন স্বয়ং ইমাম মোয়াফফক নিশাপুরি, সে যতই তাঁবু বানানেওয়ালা পরিবারের সন্তান হোক সে আর ফতেমা সমান নাতাঁবু বানানেওয়ালা পরিবারের অনেক অর্থ সঞ্চয় হয়েছিলতাদের দরকার ছিল রাজ বংশের সান্নিধ্যতারা ক্ষমতার কাছে থাকতে চেয়েছিলতাই না আফঘানিস্তান থেকে খোরাসান সর্বত্র নিয়ে গিয়েছে ওমর-কেএই ওমর বানজারা ফতেমার সঙ্গে সব ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে তা কি করে হয়? অনেক পড়াশোনা করে খৈয়াম সার বুঝেছেন যখন ফতেমা এক রাতের আঁধারে চলে গেল মরুভূমির অজানা কোনো প্রান্তে
শিশুকালে যখন শিখেছি অনেক কিছু ইস্কুলে,
যখন পড়াতে এসেছি পরে তখনও কি আনন্দ!
অথচ জানার কথাটি ছিল কাকে শেষ বলে,
শেষটা আসলে ধুলো্‌, আর ডানা হবে নিষ্পন্দ!
রাতের আকাশ দেখেছে খৈয়ামদেখেছে দিন গুণতে গুণতেফতেমা ঠিক কতদিন গেল? কতদিন হল? গুণতে গুণতে তিনি ঠিক করে ফেলেছেন জালালি দিনপঞ্জিকাসূর্যের গমনাগমনের উপর নির্ভর করে ঠিক করেছেনপারস্যের শাহ মেনে নিয়েছেন তাকেএই এখন সমগ্র ইরানীয় অঞ্চলের দিনপঞ্জিকাতিনি কি সূর্য? আদিদেবের মতন? কে জানে? কিন্তু তিনি নিজের কথা জানেনজানেন না ফতেমার কথাফতেমা এখন কোথায়? যাকে তিনি নিবিড় হয়ে ডাকতেম 'মাহ' বলে'মাহ' মানে চাঁদযাকে তিনি রোজ রাতে দেখেনযাকে তিনি কখনো হারান নাযে চাঁদ সুরের লাবণ্য হয়ে ঝরে পড়তো তাঁর বুকে বালির চূড়ায়বালির সমুদ্রে তাঁরা ভাসতেনকখনো কখনো তিনি তার গভীরে ডুব দিয়ে ডেকে উঠতেন,
-'ওহ মাহি'!
'মাহি' তখন মাছ'মাহি' মানে মাছসেই মাছ যে ধারণ করে আছে পৃথিবীকেজন্ম হবে, মৃত্যু হবেচেতনা থাকবেসৃষ্টির গভীরে থাকবে চেতনাযে নানান চেহারা নেবেযেমন তাঁর গবেষণাগারে ধাতুগুলো নেয় তেমন
"Whose secret Presence, through Creation's veins
Running, Quicksilver-like eludes your pains:
Taking all shapes from Mah to Mahi; and
They change and perish all - but He remains;"
---  Rubaiyat of Omar Khayyam, Edward Fitzgerald's translation, stanza 52
যার গূঢ় উপস্থিতি সৃষ্টির শিরায়
দৌড়োয়, রূপোলি সৃষ্টিছাড়া ধাতু
তোমার বেদনাকে অতিক্রম করে যাবে
মাহ থেকে মাহি সব, সমস্ত রূপকেও
সব বদলাবে এমনকি উবে যাবে
যবে, সেদিনও শুধু সে থেকে যাবে
তিনি ধাতুতত্ত্ব জানেনওই রূপোলি মতন ধাতুটি একমাত্র যে সাধারণ তাপমাত্রাতে তরল থাকেযে এখন ঠান্ডা-কঠিন, মুহুর্তে আবার গলে যেতেও পারেকোনো ঠিক নেই তারকিচ্ছু ঠিক নেইপ্রেমের মতন অনিশ্চিত ওই ধাতুতিনি জানেনতাঁর চুল্লীতে কতবার খেলেছেন এই ধাতুর সঙ্গেযেন খেলছিলেন ফতেমার সঙ্গে

অমলেন্দু চন্দ

টুকরো কথা - ২

কিছু টুকরো কথা - চ্যাট'এর সুবাদে প্রাণে এলো...


মাঝে মাঝেই প্রেম আর অপ্রেমের খেলায় ভালবাসা - নিদেন ভালোলাগা রেফিউজির মতো খোঁজে ক্যাম্পের সাকিন - একটু আশ্রয়...
আমি এক ভদ্রমহিলা কে জানতাম - চিনতাম একটু আধটু - তাঁর স্বামী কবিতা লিখতেন , আর পেশায় ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার - তো আমার সেই বন্ধুটিকে ভদ্রমহিলা ক্ষেপে গেলে বলতেন - দাঁড়াও, আর প্রেরণা দেব না ...
ভদ্রলোক সে কোন এক লালচে আলোর আবেশে ভালবাসার উন্মেষের সময় প্রায় নীল হতে হতে বোধহয় বলে ফেলেছিলেন - তুমি আমার কবিতার প্রেরণা ...
ব্যাস খেপলেই প্রেরণার আকাল - ডিমান্ড সাপ্লাই কার্ভের খেলা - আর ভদ্রলোক সে সব সময় বাঙালি চাষির মতো আকাশ দেখত - ঝড় ঝঞ্ঝা অগ্ন্যুৎপাত দৈব দুর্যোগ - আল্লা এরপর একটু আগে থেকে আভাষ দিও -
আসলে মানুষের মতো এতো সরল প্রাণী আর দুটি নেই - যখন যেখানে মনে ধরে সঙ্কেত পাঠায় - কিছুদিন খেলা চলে উদ্গত শিশিরে - আর তারপর - বিপদ হল ঘেন্না ধরে গেল এ স্লোগান টাও কিছুতেই তোলা যাচ্ছে না - কি ব্যাজ কি ব্যাজ
একটু আশ্বাস পেলেই বাঙালি গরুর কণ্ঠে অপরাহ্নবেলা কণ্ঠের ঘুণ্টি বেজে ওঠে - অরোরা বরিয়ালিশের আলোয় আবার ভরে যায় বৈদূর্য আকাশ - সাকিন সন্ধানে মাতে জীবনের সরল আখর - নিসচিন্দিপুর নিসচিন্দিপুর

সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

ভালই বাস, কি হত্যাই কর!

টুকরো কথা

খুব স্বল্প আলোয় বসেছিলেন তিনিএই সময়টায় চলে আসেন নগরের বাইরে বানজারাদের তাঁবুতে বসে পড়েন এক পেয়ালা শরাব নিয়েমাথার পাগড়িটা বেশ কিছুটা নামানো, কাপড়টা মুখের এপার থেকে ওপারে টানাশুধু পেয়ালায় চুমুক দিতে একটু উঁচু করে নেন মাঝেসাঝেদু-চারজন এমন আদমি আসে এইখানেতারা চায়না তাদের কেউ জানুকঅন্যরাও জানার চেষ্টা করেনাতাছাড়া বানজারার অত কৌতুহলী নয়ওনিশ্চিন্তে বসেছিলেন তিনিখানিক পরেই শুরু হবে নাচ-গান বানজারা পুরুষ ও মেয়েরা নাচবেমরুভূমির বালি উড়বে পায়ে পায়েসামনের যে জায়গাটা খালি সেখানে আগুণ জ্বলে উঠবেতিনি পেয়ালায় চুমুক দিলেনএকটা শিরশিরে হাওয়া আসছে কোথা থেকে যেন! দুটো উট কিছুদূরে নিশ্চিন্তে বসে আছে বেশ কিছুদিন তারা এখানে বসেই থাকবেখাবে আর বসে থাকবেযখন এই বানজারার ডেরা-ডান্ডা গুটিয়ে যাবে তখন আবার ওরা উঠে দাঁড়াবে ভাল করেপিঠে বোঝা নিয়ে দুলতে দুলতে হাঁটতে শুরু করবেমিলিয়ে যাবে দিগন্তেমিলিয়ে যাবেইআহ্‌! আর সহ্য হয়না তাঁরসব মিলিয়ে যাবে? এত, এত কিছু সব? ফতেমার মতন? যার নাভিতে ছিল পদ্মের গঠন তার মতই? তিনি তাঁর যৌবনকে দেখতে পাচ্ছেনযে ওই মরুভূমির বালুর উপরে আধ শোয়াপাশে ফতেমাফতেমার নাভিতে রেখেছেন পেয়ালা কোথাও উঠে যেতে পারবে না সেআর নিজে তিনি কালো আঙুরের ঝাঁক নিয়ে বুলিয়ে দিচ্ছেন ফতেমার ঠোঁটে, চিবুকে, স্তনসন্ধিতে
যদি নেশায় চুর খৈয়াম তবে আনন্দ করো আয়োজন!
যদি রমণীর পাশে ঘোর, তবে আনন্দ করো আয়োজন!
ভাবনা কিসের বল, শেষে তো জানোই বিশ্ব শুধুই শূণ্য,
তার ফাঁকে ভাব তুমি ফাঁকি নও, তুমি তো এখন পূর্ণ!
ফতেমা একদিন ওই দিগন্ত পার হয়ে বানজারাদের কাফেলার সাথে চলে গেলচলেই গেলতাঁর মতন মানুষের সঙ্গে থাকা অনুচিত ফতেমারখৈয়ামের বেগম আছেফতেমার ঠাঁই কই? তাছাড়া এসব নেশা মাত্রকাল নেশা ছুটে গেলে তখন? ফতেমাকে পরে থাকতে হবে ছেঁড়া কাপড়ের মতনকাবেলার ভাই-বেরাদর যত সকলেই একথা বলেছেফতেমা মেনে নিয়েছেতাঁদের মিলন নেইতাঁদের কুষ্ঠীতে নক্ষত্রের দোষফতেমা কাফেলার সঙ্গে চলে গিয়েছে মরুভূমি পার
তারপরের থেকে নক্ষত্র দেখেছেন তিনিদীর্ঘ্যকাল রাতের আকাশে তাকিয়ে থেকেছেনঘুম আসতো না তাঁরকষ্ট ভারী হয়ে ঝুলতো তাঁর পড়ার ঘরের কোণ-কুলুঙ্গিতেঢুকলেই ঝাঁপিয়ে পড়তো তাঁর উপরে যেন দামাল এক শিশুতিনি তাকে কোলে নিয়ে আদর করতেন, খেলা করতেনকাঁদাতেন, কাঁদতেনএকদিন যখন আর জল ছিল না কোনো তখন ওই অনন্ত আকাশের দিকে চাইলেনযখন তিনি চাইলেন তখন মনে পড়লো তাঁকে ফতেমা বলেছিল,
- আমরা দুজন যেন দুটি সমান্তরাল রেখাচলে যাচ্ছি আর চলে যাচ্ছি
খৈয়াম, যে সুলতান মালিক শাহ-র পরামর্শদাতা, যে কিনা বলখ-এ শেখ মুহাম্মদ মনসৌরির ছাত্র, খোরাসান-এ যাকে শিক্ষা দিয়েছেন স্বয়ং ইমাম মোয়াফফক নিশাপুরি, সে যতই তাঁবু বানানেওয়ালা পরিবারের সন্তান হোক সে আর ফতেমা সমান নাতাঁবু বানানেওয়ালা পরিবারের অনেক অর্থ সঞ্চয় হয়েছিলতাদের দরকার ছিল রাজ বংশের সান্নিধ্যতারা ক্ষমতার কাছে থাকতে চেয়েছিলতাই না আফঘানিস্তান থেকে খোরাসান সর্বত্র নিয়ে গিয়েছে ওমর-কেএই ওমর বানজারা ফতেমার সঙ্গে সব ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে তা কি করে হয়? অনেক পড়াশোনা করে খৈয়াম সার বুঝেছেন যখন ফতেমা এক রাতের আঁধারে চলে গেল মরুভূমির অজানা কোনো প্রান্তে

অমলেন্দু চন্দ

জীবনানন্দ প্রসঙ্গে টুকরো কথা

উত্তর রবীন্দ্র যুগে জীবনানন্দ কতটা বিরাট প্রতিভা ছিলেন কতটাশ্রেষ্ঠত্তের অধিকারী ছিলেন কতবড় কবি ছিলেন এসব বিচার অনুভূতির আভাষ এখনো প্রায়শই বিবেচিত তবে তার কতটা জীবনানন্দের কাব্য চেতনার অনুভব থেকে আসা আর কতটা প্রয়োজনের হুজুগ এসব প্রশ্ন এলেই মনে মনে তর্জনী তুলে শাষাই এক পা যদি এগোস তবে আর, ওই চেয়ে দেখ ভীষণ তলোয়ারফলে প্রশ্নর দৌরাত্মি মাঠে মারা পড়ে আর মন খোঁজে সটীক উত্তর

লোকে বলে বাঙালি কবির জাত মিথ্যা কথাজীবনানন্দের কবিতার পড়ে মনে হয় কবি কই? কবিতা অনেককারুকে ছোটো করছি না, আসলে এটাই সম্ভবত জীবনানন্দময়তা আমাদের কাব্য চেতনায় রবীন্দ্রনাথ কতো সহজে বহির্বিশ্ব কে মহা জগতকে বিশ্বচেতনাকে জড়িয়ে নিয়েছেননিজের চেতনার আঙিনায় সে রূপের সে বোধের প্রশান্তির অনায়াস স্বাচ্ছন্দে আমরা ভেসেছি আর জীবনানন্দ প্রগাঢ় অন্তর্লীন স্পর্শাতুর মায়াতুলির আঁচড়ে ছবি এঁকেছেন অনবদ্য অনাময় সঞ্চরণশীলতায় আমরা ডুবেছি

জীবনানন্দের রুপচেতনা বিচ্ছিন্ন অনুভূতির মতো নয় , মনের ভীষণ গোপন নিভৃতিতে তাঁর শব্দের রূপকল্প এক অভিন্ন অচ্ছেদ্য সমান্তরাল জগত গড়ে তোলে - এই সমান্তরাল জগতের প্রতিভাস তাঁর কবিতার প্রতীতি - প্রতিটি শব্দের স্বরূপ নির্ধারণ হয় সেইজগতের অদ্ভুত অস্ফুট বাঙময় চৈতন্যের ঘরে - এই অন্তরের অন্তরঙ্গময়তাই জীবনানন্দের কবিতার অলঙ্কার - ক্রমাগত অন্তর্মুখী হয়েছেন কিন্তু সে অন্তর্মুখিতায় যে আলোর উদ্ভাস তা তাকে অদ্ভুত ব্যাপ্তি দিয়েছে - সে জগত , তাঁর আলো আমরা অনুভব করি আমাদের চেতনায় - মায়াবী নয় অদ্ভুত স্নিগ্ধতাই তাঁররুপালেখ্য

তাঁর কবিতা ইন্দ্রিয়ানুভুতিকে উলটে পালটে ইন্দ্রিয়েরভেতরেই আশ্চর্য বৈভবের সৃষ্টি করেছে যখন তখন –“তোমাকেকবিতায় বলছেন –“ মানবকে নয় নারী শুধু তোমাকে ভালবেসে বুঝেছি নিখিল বিষ কি রকম মধুর হতেপারে” ... ধুসর পাণ্ডুলিপির "মৃত্যুর আগে' কবিতায় বলছেন ...

চালের ধুসর গন্ধে তরঙ্গেরা রূপ হয়ে ঝরেছে দু বেলা
নির্জন মাছের চোখেপুকুরের পারে হাঁস সন্ধ্যার আঁধারে
পেয়েছে ঘুমের ঘ্রাণ - মেয়েলি হাতের স্পর্শ লয়ে গেছে তারে...

কি অসম্ভব ক্ষমতায় শব্দের সাথে শব্দকে এনে এক অদ্ভুত নিরালা রূপকল্পের সৃষ্টি - সাদা বাংলায় গল্পটা বলতে গেলে হয়ে যাবে পুকুরের পাড়ের কাছে ছিটোন চাল মাছেরা খেতে আসে আর সন্ধ্যায় বউমনি হাঁস তাড়িয়ে নিয়ে যান সে পুকুরেরপার থেকে -যে কোন গাঁয়ের যে কোন পুকুর - অথচ কি আশ্চর্য মায়ায় শব্দ দিয়ে গড়েছেন মায়ার প্রাসাদ - ইন্দ্রিয়ানুভুতিকে উলটে পালটে ইন্দ্রিয়ের ভেতরেই সৃষ্টি করেছেন মায়া জগত - যে মায়াতে সমাহিত বাংলার রূপকল্প আলোর চেতনা

কবিতার জন্য পৃথক কোন পরিভাষা চাই নাকি চাই না এ আপ্ত আলোচনাও জীবনানন্দের কবিতাকে কেন্দ্র করে হয় তাঁর কবিতার ঐশ্বর্যের আলোয় এ আলোচনাও সমিচীন ধুসর পাণ্ডুলিপির কল্পনার ঐশ্বর্য, রূপসী বাংলার গ্রামীণ গ্রাম্য নয় সংস্কৃতিবোধ , বনলতা সেনের ইতিহাসনিষ্ঠ প্রেম, মহাপৃথিবীর অমেয়া নিরাকার ব্যাপ্তির বিশ্বাস, বা সাতটি তারার তিমিরের অন্তহীন প্রসারিত আত্মবীক্ষন এই সব মিলিয়েই জীবনানন্দের কবিসত্তার পরিচয়

পরিসর মাথায় রাখাভালো তাই থামতে হচ্ছেশেষ পাতে অম্লরস চাটনির মতো আমাদের সাধারণ দৃঢ়বিশ্বাস কবিদের শরীর হয় না, শুধু নাকি সত্তাটাই আসল ব্যাপারতাদের দেহাতীত বানীই সব, আকাশের গানের মতন দৈববাণী গোছের তো এটা বোধহয় সেকালেও মানে জীবনানন্দের কালেও ছিল, কারন তা না হলে ভদ্রলোক ট্রাম লাইনে কেন গন্ধ শুঁকলেন তাঁর ব্যাখ্যা তেও সেই অজর অমর বিশ্বাসী বাঙ্গালীচিত্তর দেখা মেলে কবির অভাব দৈন্য দুঃখ কষ্ট আর তাঁর ভীষণ জাগতিক সত্য আজও হয়ত অনাদৃততাই আজও কবিতার বই পয়সা দিয়ে ছাপাতে হয়গুনীজনেদের মধ্যেও নিশ্চয়ই ব্যাতিক্রম আছে, তো বলে না ব্যাতিক্রম নিয়ম কে স্বতঃ সিদ্ধ করেবাঙ্গালির সাধনা আর সিদ্ধি ওই ব্যাতিক্রমের মাধ্যমে নিয়মকে সিদ্ধ করেছে