Look সংস্কৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Look সংস্কৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১২

পল্লব ভট্টাচার্য


ডুগডুগি বাজাই


শিবের গাজন কথাটা শুনলেই , আমার কেন যেন একটা উলট পালট ব্যাপার মনে হয় । মনে হয় , স্হিতাবস্থাকে পাল্টে দেওয়ার নামই গাজন । মাঝে মাঝেই যখন মেয়েকে শোনাই , “আমরা দুটি ভাই / শিবের গাজন গাই “ , তখন দুই ভাই কথাটার চেয়েও , শিবের গাজন কথাটাতেই জোর বেশি পড়ে । আর এই ছড়ার এটুকু পড়লে মনে হয় , শিবের কীর্তিগাঁথা গাওয়ার নামই গাজন ।
শিবঠাকুরের যা চেহারা , পোষাকআশাক , চলনবলন , তাতে ভদ্রসমাজে তার তেমন প্রভাবপ্রতিপত্তি থাকার কথা নয় । বরবেশী তাকে দেখে শ্বাশুড়ি সনকাকে ঘোমটা টানতে হয় লজ্জ্বায় , কারণ জামাই নেংটা । এতদূর প্রথাবহির্ভূত যার চলন , তাকে স্বীকার করে নিতে প্রথাগত সমাজ দুটো কারণে বাধ্য হয় , এক তার প্রথাবিরোধীতা যদি বেশিরভাগ মানুষের সমর্থণ পায় , অথবা সেই প্রথাবিরোধিতা সমাজকে পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে ।
শিবঠাকুরের ক্ষেত্রে দেখা গেছে , প্রথম থেকে এখন অব্দি তার ভক্তরা ঠিক যাকে বলে সামাজিক ভদ্দরলোক তেমন নয় । সমাজ যাদের নিম্নবর্গ বানিয়ে রেখেছে , হাড়ী , মুচি , বাগদী , শব্দকর , মালাকর , কৈবর্ত , জেলে-মালো শ্রেণীর লোকেরা , তারাই তার ভক্ত । শিবের গাজন বা চড়কের মূল অনুষ্ঠানটা হয় চৈত্রমাসের সংক্রান্তিতে । একমাস , অর্থাৎ পুরো চৈত্রমাস মানত রেখে , গেরুয়া বা লালশালু কাপড় পড়ে শুদ্ধাচার পালন , ভিক্ষান্নে একবেলা হবিষ্যান্ন ভোজন করে জীবনধারণ করে, একধরণের আত্মসংযম আর আত্মপীড়নের মধ্য দিয়ে গৃহীরাও সন্ন্যাসজীবন যাপন করতেন । তাদের বলা হতো ভক্তা বা সন্ন্যাসী ।
এখন এই যে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করা নিম্নবর্গের মানুষ , গাজনের নাচ বা গান গাইছেন , এর সঙ্গে প্রথাবিরোধিতার একটা যোগসূত্র খোঁজার কারণ কি শিবঠাকুরের নামটাই ?
উনিশ শতকের “কলিকাতার ইতিবৃত্ত” য়ে প্রাণকৃষ্ণ দত্ত জানিয়েছেন , “ গাজনের সন্ন্যাসীদিগের মধ্যে হাড়ী , মুচি , বাগদী প্রভৃতি ইতরজাতীয় লোকেরাই বাণ ফুঁড়িত , উপবীতের ন্যায় একগোছা সুতা গলায় পরিধান করিত “, এই উপবীতধারণ করার ব্যাপারটাই তো সামাজিকভাবে একধরণের প্রথাভাঙা বা প্রথাবিরোধীতা । যা কোনও অর্থেই উচ্চবর্গের মানুষের কাছে স্বস্তিদায়ক ছিল না । তবু কৃচ্ছসাধনের এই একমাস ব্রাহ্মণ ছাড়া অনেকেই তাদের প্রণাম করতো , আদরের সঙ্গে ভোজন করাতো ।
হুতোমের নকশায়ও দেখা যায় ,-“বুড়ো মূল সন্ন্যাসী কানে বিল্বপত্র গুঁজে , হাতে এক মুটো বিল্বপত্র নিয়ে , ধুঁকতে ধুঁকতে বৈঠকখানায় উপস্থিত হলো ; সে নিজে কাওরা হলেও আজ শিবত্ব পেয়েছে , বাবু তারে নমস্কার কল্লেন ; মূল সন্ন্যাসী এক পা কাদাসুদ্ধ ধোব ফরাশের উপর দিয়ে বাবুর মাতায় আশীর্ব্বাদী ফুল ছোঁয়ালেন ,--বাবু তটস্থ !”
তাহলে দেখা যাচ্ছে , হাড়ী , কেওট সম্প্রদায়ের মানুষ , যারা সামাজিকভাবে নিম্নবর্গ হিসাবে পরিচিত , তারা চৈত্রমাসব্যাপী শিবের গাজন গাওয়ার মাধ্যমে , সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধাচারণ করেও , একধরণের সামাজিক মর্যাদা আদায় করে নিতেন ।
এতসব কথা মনে এলো যদিও , মেয়েকে শোনানোর মতো নয় । আর বললেও আমার এই ছোট্ট মেয়ের এতসব বোঝার বয়সই হয় নি । তাই নিজের মনে মনেই আওড়াই , কোন দুটি ভাই , এই শিবের গাজন গাইছি ?
শিবের দুই অনুচর ,-নন্দী ভৃঙ্গী ? নাকি কার্তিক গনেশ ? ছড়াটি তো সোজাসুজি বলছে দুই ভাই শিবের গাজন গাইছে । তাদের ঠাকুমা গয়া-কাশী গেছে , তারা ডুগডুগি বাজাচ্ছে ।
ডুগডুগি বা ডমরু কোনও অভিজাত বাদ্যযন্ত্র নয় । শিবের বাদ্যযন্ত্র । ছোটবেলায় ডুগডুগি বাজানো দুইধরণের লোক দেখেছি । শোনপাপড়িওয়ালা আর ভালুকনাচ দেখানেওয়ালা । এদের যে কেউ ডুগডুগি বাজালেই পেছন পেছন ছুট লাগাতাম । আর এরা কেউ সামাজিকভাবে উঁচুস্তরের লোক ছিলেন না । অথচ যে দুইভাই ডুগডুগি বাজাচ্ছে , তাদের ঠাকুমা যদি গয়া-কাশী নামের তীর্থে গিয়ে থাকেন , তবে তারা যে খুব একটা নিম্নবর্গীয় কেউ নন , তা স্পষ্ট ।
এই দুইভাইয়ের জট ছাড়ানোর আগে , গাজনের এই প্রথা বিরোধিতার উৎসটা একটু গভীর থেকে বুঝে নেওয়া দরকার ।
বৈদিক ভারতে অথর্ববেদের আগে শিব ঠিক ততটা আর্যীকৃত হন নি । রবং দক্ষরাজার যজ্ঞে শিবকে আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয়টি , আর্যঅহমিকার চিহ্ন হয়ে থাকলো । পরবর্তী দক্ষযজ্ঞ বিনষ্টিকারী শিব এবং শিবগণ ভীতিপ্রদ ও অনিষ্টকারী হিসাবেই স্বীকৃত হয়েছিল । আজকের মতো তখনও , শিব মূলত নিম্নবর্গীয় মানুষদেরই পূজ্য ছিলেন ।
বৈদিক সমাজের যাগযজ্ঞে ঋষিরা ইন্দ্র , মিত্রবরুণ , ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে হোম করতেন । ঋষি ব্রাহ্মণেরা ছিলেন উচ্চবর্গীয় , বেদ গান ও শ্রবনের অধিকার ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ব্যাতিরেকে আর কারও ছিল না , অর্থাৎ বেদ যদি জ্ঞান হয় , তবে সেই জ্ঞানের আওতা থেকে বাইরে ছিলেন নিম্নবর্গীয় মানুষ । আর এটাই ছিল সামাজিক প্রথা ।
সেই বৈদিক আমলেই , একদল ব্রাহ্মণ ঋষি এক আন্দোলনের সৃষ্টি করেছিলেন । ঋষি জরৎকারুকে মনে পড়ে ? এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়ান । পূর্বপুরুষদের অনুরোধে বংশরক্ষার জন্য বিয়েতে রাজি হলেন , কিন্তু শর্ত এই , মেয়ের নাম হতে হবে তার নামে । পুরাকথায় মনসা জরৎকারুর স্বামী এই ঋষি জরৎকারু “যাযাবর”গোত্রের ব্রাহ্মণ । এদের বলা হতো “ব্রাত” । এই ভ্রাম্যমান দলের সকলকে বলা হতো “ব্রাত্য” । তাদের গাওয়া সামগানের নাম “ব্রাত্যস্তোম” ।
এই ব্রাত্যস্তোম বা সাম গানের যে বর্ণনা পাওয়া যায় , তাতে মনে হয় , “ব্রাত্যস্তোম” হয়তো একধরণের শুদ্ধিযজ্ঞই ছিলো । প্রথা অনুযায়ী বৈদিক যজ্ঞে মাত্র একজনই যজমান থাকে , কিন্তু “ব্রাত্যস্তোম”য়ে হাজার হাজার যজমান থাকতে পারতো । সকলেই “ব্রাত্যস্তোমের পর পবিত্র হতেন এবং ঋষিদের সঙ্গে একত্রে খেতেন এবং রান্না করে খাওয়াতে পারতেন । ঋষিরা যজমানদের তিনবেদ পড়তে দিতেন । এই যে প্রথাবিরোধী একদল ব্রাহ্মণ , সমাজিক নর্মসের তোয়াক্কা না করে , চন্ডাল ব্রাহ্মণ সবাইকে সবাইকে সমান বানিয়ে , তিন বেদ পড়ার অধিকার দিয়ে দিচ্ছেন , তা কি একধরণের উলট পালট নয় ? এই যাযাবর “ব্রাত্য” ব্রাহ্মণদের দেবতা শিব । আগে “ব্রাত্যস্তোম” যখন তখন , যে কোনও সময়ে হতো , পরে একটি নির্দিষ্টদিনে এই হোম শুরু হয় ।
আজও চৈত্রসংক্রান্তির আগের রাতে শিবের গাজনের নাম -হোমপর্ব ।
ব্রাত্যস্তোমের মতোই গাজনেও চন্ডাল ব্রাহ্মণ সবাই উপবীত বা উত্তরীয় গ্রহণে সমান হয়ে যায় ।
তাহলে কি সুদুর অতীতের ব্রাত্যস্তোমের স্মৃতিই কি কোনও না কোনও ভাবে থেকে গেল আজকের গাজন উৎসবেও ? যেখানে হাড়ী কেয়ট মুচী বাগদীরাও সন্ন্যাসী হয়ে একমাস সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাব দেখানোর সুযোগ পেতো ? ব্রাত্যস্তোমের সেই সামাজিক নর্মসকে পাল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টাই কি ধরে রাখে নি এতযুগ পরেও গাজনের উৎসব ?
সে না হয় হলো , কিন্তু শিবের গাজন গাওয়া এই দুই ভাইয়ের হদিস কীভাবে পাই ?
আমরা দুই ভাই কারা ?
খুঁজতে খুঁজতে কি আমাদের কলকাতায় যেতে হবে ? উনিশ শতকের বাংলার পথনির্দেশক মাইল ফলকটি তো কলকাতার দিকে তীরচিহ্ন দিয়ে আঁকা । সহজে দু’পয়সা রোজগারের আশায় গ্রাম থেকে দলে দলে বিভিন্ন পেশার লোক এসে ভিড় জমিয়েছিলেন কলকাতার বিভিন্ন পাড়ায় টোলায় । তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাহেবদের মুৎসুদ্দিগিরি করে হয়ে উঠেছিলেন নয়া কলকাতার বাবু । কিন্তু গ্রামীণ সংস্কৃতিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া তখনও সম্ভব হয় নি , নগর কলকাতার পক্ষে । ফলে নাগরিক নকুবাবু ছকুবাবুরা তাদের পুরনো আত্মপরিচয়টি যেমন অস্বীকার করতে পারেন না , তেমনি নব্যধনীর নতুন পরিচয়ে “জাতির কর্তা রাজীব রায়”কে উপেক্ষা করে “অক্কুর হল দত্ত , নকুড় হল ধর” । এই দোটানায় নগর কলকাতায় যে চড়ক বা গাজন সংস্কৃতি এসেছিল , তা অবিকল গ্রামীণ নয় । আজও গ্রাম বাংলায় ঢাকের নাচ , বাধনদার কাটনদারের কথা সুর তালের খেলা থেকে দূরে , কলকাতার বাবু কালচারে জন্ম নিয়েছিল , গাজনের সঙ । আর এই সঙের দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকও থাকতেন কোনও না কোনও বাবু ।
এই বাবুরা অন্তত প্রথাগত বাঙালি বর্ণ-সমাজকে তোয়াক্কা না করে , নিজেদের পছন্দমাফিক উচ্চ বর্ণে ওঠার যে তৎপরতা দেখিয়েছিলেন , তা প্রথাবদ্ধ সমাজের উপর একধরণের শিবের গাজন তো বটেই । ধন-বলে বলীয়ান , এই নতুন সমাজ কর্তাদের পেছুটান তাদের পিতমহীদের তীর্থদর্শনে পাঠানো আর এক ধরণের আভিজাত্য প্রদর্শন অন্তত তৎকালীন হিন্দু সমাজের কাছে । আর এই কর্মটি করা মানে , নিজেদের সামাজিক প্রতিষ্ঠার পূর্ণতা । সুতরাং এখন সমাজে ডুগডুগি বাজানো বাজিকর হয়ে উঠেছে , কলকেতার নব্যধনী দুইভাই ।
তাদের দিকে ঈষৎ বাঁকা চোখে তাকিয়ে , উনিশ শতকের কলকাতার স্বভাবকবিত্বের তীব্র উচ্চারণ হয়ে যদি এই ছড়াটির জন্ম হয়ে থাকে , তা কি খুব অস্বাভাবিক মনে হবে ?
মেয়ে অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল , টের পাই নি । হঠাৎ বললো ,-বাবা , তোমার ঠাকুমাও কি গয়া কাশী গেছে ?
না রে । আমার ঠাকুমা পৃথিবী থেকেই চলে গেছে ।
মনে মনে বললাম , তোর মেয়েকে কি তুই বলবি , তোমার ঠাকুমা বৃদ্ধাশ্রমে গেছে ?
সে আরেক কাশী । এই যুগের কাশী ।
কেন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে ? -মেয়ে বললো ।
আমি যেন ডুগডুগি না বাজাই ।
মেয়ে চোখ ছলছল করে বললো ,-আমি আর ডুগডুগি বাজাবো না । আম্মুকেও কোত্থাও যেতে দেবো না ।

বৃহস্পতিবার, ১ নভেম্বর, ২০১২

সুবীর সরকার

এপিটাফ
সুবীর সরকার


০৫

মেয়েদের সঙ্গে কথাবার্তা বলবার সময় আমাকে সবসময়ই এক ধরনের হাসি ঝুলিয়ে রাখতে হয়।জানিনা সেটা মুচকি হাসি বা খলখল হাসি কিনা।জীবনে বহু মেয়ের সান্নিধ্যে কিংবা সখ্যতায় আমাকে আসতে হয়েছে।বহু নারীর অপছন্দের তালিকায় আমার নাম।সামান্য কয়েকজনের পছন্দের তালিকাতেও।তবে আমার সৌভাগ্য আজ পর্‍যন্ত কোনো নারী আমাকে লম্পট বলেনি।তবে মাতাল বলেছে কেউ কেউ।তেমন জমিয়ে প্রেম হলো না আমার জীবনে।আসলে মেয়েদের সাথে আমার তেমন স্বাচ্ছন্দ আসে না।আমার কবিতায় বা গদ্যে বা জীবনযাপনে তেমন কোনো টান নেই।যাদু নেই।পেলবতা নেই।তবে মেয়েরা যখন ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকায় বা যুদ্ধবিমান দেখে তখন বেশ ভালো লাগে আমার।আবার ভালো লাগা থেকে একধরনের ঘোর তৈরি হয়।কখনো বৃষ্টির দিন কখনো বা শীতকাল আমাকে চেপে ধরে।তবে আজ এই ৪২-এ একটা কথা জানালে বেশ হয় যে ভালোবাসা শব্দটির প্রতি অবশেষে ঝুঁকে পড়তেই হলো আমাকে।আবার এই ঝুঁকে পড়াটাকে অনায়াসে ভালোবাসার মধ্যে নেমে যাওয়া বলা যেতে পারে।আমি একজন কথা কম বলা গানের সুরে সুরে দুলে ওঠা মেয়ের কথা বলছি।যথারীতি এই মেয়েটিও সরাসরি আমার কবিতার পাতায় হাওয়া বাতাসের মতো পৌঁছতে পারেনি।তবু পৌঁছতে না পারাটাকে কোনো ঘটনাই বলা যায় না।কারণ মেয়েটি আমাকে মুচকি হাসি আর রাজবাড়ির পালকির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।মুচকি হাসির থেকে ভালোবাসার দূরত্ব কয়েক সেকেন্ড মাত্র।আর রাজবাড়ির পালকির সাথে যুক্ত করে দিই যদি ভালোবাসা তবে ভালোবাসায় ভেসে যেতে যেতে আমি খুব একা আর খুব নিজস্ব চোখে মেয়েটির পিয়ানোর বাজনা শুনবো।মেয়েটির যাবতীয় কষ্ট মেয়েটির অনেক একক নিঃশব্দ লড়াই আমি অনিবার্‍যভাবে টুকে রাখব ডাইরিতে এবং শেষ পর্‍যন্ত দেরীতে হলেও আমার কবিতায় একজন নারী ঘুম ও ঘামের মতো জরুরী হয়ে উঠবে।

০৬।

সরে থাকতে চাই তবু বিরক্তিকর মানুষজনদের সাথে জড়িয়ে পড়তেই হয়।একসময় অবসাদ আসে।মানুষের জটিলতা অন্ধকারের তীব্রতম কুহক।কুহকের চোরাস্রোতে ভেসে যাই।জঙ্গল টানে।বনবাসী টানে।মাইল মাইল ধানের ক্ষেত তছনছ করছে হাতির দল।মানুষ মারছে।হাতি ছিল আমাদের লোকমনে লোকগানে আদরণীয়।এখন উত্তরবাংলায় নিম্ন অসমে হাতি মাহুতের গান ভাসে,বাতাসে বাতাসে ওড়ে।অথচ মানুষ এখন হাতিকে আতঙ্ক আর অভিশাপ হিসেবে দেখে।বিষ খাইয়ে হাতি মারে।অথচ হাতিদের তো কোনো দোষ নেই।যে রাস্তা দিয়ে নিত্যদিনের যাতায়াত ছিল সে পথরেখা অবলুপ্ত।জনবসতি।কুলিবস্তি।চায়ের বাগান।জঙ্গল উধাও হয়ে যাচ্ছে মানুষের আর সভ্যতার আগ্রাসনে।হাতিদের খাবার নেই।বন্যপ্রাণী বিপন্ন নয় কেবল সমগ্র বিশ্বের ইকো-সিস্টেম প্রবলভাবে বিপন্ন।আর বিরক্তিকর মানুষজন তাদের মো-সাহেবি ঘ্যানঘ্যান সৃষ্টিহীনতা যাবতীয় সব কিছু্র গায়ে মাঝে মাঝে ঢলে পড়ে চিত্রিত হরিণ,কুকুরছানা আর পেখম তোলা ময়ূর।আর ঢেউতোলা কষ্টগুলির পাশে তা লিখি।নদী নালার দেশে বোধ করি খুব গল্পগাছ ছিল।চা খেতে খেতে পুরনো মানুষেরা যখন সেসব বলেন তখন বুঁদ হয়ে শুনি।গল্প বলা গল্প শোনা দুইয়ের আবহে একধরনের ঝুঁকে পড়া ঘোরে চলে যাওয়া,মানে খুব কুয়াশা হলে যেমন হয় আর কি ? মানে কাছে দূরে ঘুরে বেড়ানো হেঁটে চলে বেড়ানো মানুষজনকে কেমন পটচিত্র কেমন গুহাকন্দর বা পরিত্যক্ত রাজবাড়ির ঘোরানো সিঁড়ি, ভাঙা পাঁচিল এরকম মনে হয়।মনে হওয়াটাকে স্থায়িত্ব দিতে হলে লিখে ফেলা দরকার ডানামেলা পাখির মতো জীবন।অথচ যখন ব্রিজ হয়নি যখন বন্যাপরবর্তীকালীন বিপন্নতায় দীর্ঘতম অহংকারী সেতু নির্মিত হয়নি তখন বিশালকায় গম্ভীর সেই নদীর বুকে মাইল মাইল কাশিয়ার জঙ্গল,ভাবনাবন।বাঘ বেরোত।ভালুকবিচরণ করতো।আর এত কিছুর পরেও প্রতিদিন আবিষ্কৃত হতো অসংখ্য পায়ে চলা পথ।আর সেইসব পথেরগল্পে মানুষই ছিল প্রধান উপজীব্য।

Look সংস্কৃতি – পল্লব ভট্টাচার্য

হাতে রইল শূন্য
পল্লব ভট্টাচার্য


মেয়েকে হাসিখুসির ছবি দেখিয়ে , বলি ,- এই দেখ , খোকা গেছে মাছ ধরতে ক্ষীর নদীর কূলে…..

মেয়ে আমার বুদ্ধিমতী , ছবির দিকে একটু তাকিয়ে বলে ,- ক্ষীর কই ?

সত্যি , রঙিন ছবিতে নদীটা তো আর পাঁচটা নদীর মতোই ,নীল রঙে আঁকা জলের ছবি ।

ভাবলাম , শিল্পী ক্ষীরের নদী আঁকতে পারেননি । মেয়েকে বললাম , -জলের তলায় আছে তো ক্ষীর , তাই দেখা যায় না ।

মেয়ে মাথা নেড়ে ছবি দেখতে লাগলো । বোধহয় জলের তলায় ক্ষীর খুঁজছিল ।

আমার কেন যে মনে হলো , বাংলাদেশে এত খাল-বিল-নদী-নালা থাকতে , খোকা কেন ক্ষীর নদীতেই গেল ? ক্ষীর নদীতে কি মাছ থাকে ? কেমন সে মাছ ? এই ক্ষীর নদী কি সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে ? সে-ই ক্ষীর সমুদ্র , যেখানে অনন্তশয্যায় ভগবান বিষ্ণু বিশ্রাম নিচ্ছেন আধশোয়া হয়ে , আর লক্ষীঠাকরুন তার পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ? তাহলে মাছটি কি দশাবতার স্তোত্রের সেই মীন অবতার ?

ধ্যুৎ , সবকিছুতেই মিথ খুঁজে বেড়ানো একটা বাজে স্বভাব । তার চেয়ে ভাবা যাক , খোকা মাছ ধরতে গেছে , এই কথাটুকু নিয়ে । জলে থাকে মাছ , একথা তো আমার ছোটো মেয়েটাও জানে । তাহলে খোকা কেন জানে না ! এই খোকাটি বোধহয় পাকা মাছ শিকারী নয় , কারণ সে প্রথমেই মাছ ধরার জন্য একটা ভুল জায়গা বেছে নিয়েছে । ক্ষীর নদীতে মাছ ধরতে কোনোও জ্ঞানগম্যিওয়ালা মানুষ যায় না । তাহলে , খোকাকে তো প্রথমেই একটা বুদ্ধু বানিয়ে দেওয়া হলো । যেখানে মাছ থাকা সম্ভবই না , সেখানে সে মাছ ধরতে গেছে ।

এরপরের ঘটনা তো আরও হাস্যকর ব্যর্থতার । খোকার মাছধরার ছিপ কোলাব্যাঙে নিয়ে যায় , আর মাছটা নিয়ে যায় চিলে । তাহলে , এই যে এত তোড়জোড় করে খোকা মাছ ধরতে গেল , তার নীটফল দাঁড়ালো , মাছ তো নয়ই , মাছধরার সরঞ্জামটুকুও গেল । শুধু এইটুকু ! এই করুণ হাস্যরসটুকু জানানোর জন্যই তবে এত বছর ধরে মায়েদের মুখে মুখে বলা হয়েছে এই ছড়া ? নাকি এর মধ্যেও রয়ে গেছে , বাঙালি জীবনের কোনোও করুণ সামাজিক অভিজ্ঞতার ইতিহাস ?

তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে অদ্বৈত মল্লবর্মন , বাংলাদেশে মালোদের জীবনকে তুলে ধরেছিলেন । প্রায় বিত্তহীন সেইসব মানুষ । মাছে ভাতে বাঙালির পাতে মাছ জুগিয়ে যেতে এই মানুষদের নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে কেড়ে আনতে হয় জলের ফসল , কিন্তু সেই ফসলের প্রকৃত মালিকানা তাদের ছিল না । এই ফসলও এমন যে , নির্দিষ্ট সময়ের পর তা পচে যাবে । তৎক্ষণাৎ বিক্রি না হলে , তা আর ব্যবহারই করা যাবে না । এই অনিশ্চিতি তাদের অর্থনৈতিক নিশ্চিতি দেয়নি । অন্যদিকে হিন্দু সমাজ কাঠামোয় তাদের যে নিম্নবর্গীয় স্থান চিহ্নিত করেছিল , তাতে সামাজিক সুস্থিতিও তাদের ছিল না । এই দুই অনিশ্চিতির মধ্যে যে জীবন , সেই জীবনে মাছ শিকারের উপকরণ জাল ও নৌকাও থাকে না বেশিরভাগ মালোর । নিতে হয় মহাজন বা বেপারিদের কাছ থেকে ধার হিসাবে বা আগাম হিসাবে । মাছ ধরার পর একটা অংশ চলে যায় তাদের ঋণ মেটাতে । বাকি অংশ সরাসরি বাজারে বা বেপারিদের (মধ্যসত্বভোগী) বিক্রি করে তার সংসার ও বেঁচে থাকা । সেখানে অর্থাৎ বাজার যারা বসায় , তারাও যখন বাজারে বসার মাশুল আদায় করতে চায় মাছের ভার পিছু , তখন ভার পিছু মাশুল দেওয়ার পর , কী থাকে অইসব মানুষদের হাতে মাছ শিকার করে আনলো নদীর বুক থেকে ।

প্রসঙ্গত মনে পড়ে , সামাজিক সম্ভ্রম আদায়ের উদ্দেশ্যে , এই নিম্নবর্গীয় মানুষদের মধ্যে চৈত্রমাসে গাজনের সন্ন্যাসী হওয়ার চল রয়েছে । বৈষম্য বা সামাজিক দমনের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ খুব সরল বা একরৈখিক কোনোও কালেই ছিল না । এমন কি প্রত্যাখ্যানের রাস্তা থেকে সরে , অনেক সময়ই উচ্চবর্গীয় ধ্যান ধারণা থেকেই বানিয়ে নিয়েছেন প্রতিবাদের রসদ । গাজন বা চড়কপুজোও তেমনই এক দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা প্রতিবাদের রূপ । এ নিয়ে বিস্তারিত অন্য কোথাও বলা যাবে , এখন শুধু বলার যে এই গাজনের সঙ্গে একটা সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশে , যেখানে ভক্তা অর্থাৎ সাময়িক সন্ন্যাসীরা নাচ ও গানের মধ্য দিয়ে তাদের প্রাসঙ্গিকতা ও সারবত্তা প্রকাশ করতেন । তেমনই একটি প্রশ্নোত্তর গানে আমরা দেখি ,-

বাঁধন - তোমরা তো সন্ন্যাসী ঠাকুর সব বলিতে পারো
কোনো সময়ে শিবের মাথায় নৌকা চলেছিল ?
কাটন ঃ স্বর্গ থেকে ভগীরথ গঙ্গা এনেছিল
সেই সময় “মালো”রা সব নৌকা বেয়েছিল ।

অর্থাৎ উচ্চবর্গীয় মিথ ইত্যাদিকে পরিত্যাগের বদলে , এই মিথগুলোকেই লৌকিক যুক্তি সাজিয়ে নিজেদের মতো করে নিয়ে , নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হচ্ছে নিম্নবর্গীয় চৈতন্যের একধরণের প্রতিবাদী প্রকাশ ।

এই প্রকাশ প্রবণতা মনে রেখে ক্ষীর সমুদ্র বা ক্ষীর নদীর কথা যদি আমরা ভাবি, তবে দেখা যাবে হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী এই ক্ষীরসমুদ্র মন্থন করেই তুলে আনা হয়েছিল , ধন-সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষীকে । মালোদের জীবনজীবিকাও নদীর গভীর থেকে তুলে আনা মাছের উপর নির্ভরশীল । মাছই তাদের ধন ।

এখন মাছ তুলে আনার যে উপকরণ , জাল , পলো , বড়োশি সেগুলো তাদের নয় । অনেকক্ষেত্রেই আড়তদার বা দাদন খাটানো মহাজনদের । তাদের গদিতে বসে থাকার ধরণটি কল্পনা করলে , পেট ফোলা , আধচোখ বোজা ব্যাঙদের সঙ্গে কেরিকেচারসুলভ একটা সাদৃশ্য সহজেই চোখে পড়বে । খোকার ছিপ যখন কোলা ব্যাঙ নিয়ে যায় , তখন কি অবচেতনেও জাগেনি , আড়তদার , দাদনদার , মহাজনদের চেহারা ?

তিতাস পাড়ে গোকন্নপুরের মালোদের নিজেদের নামে বসানো বাজারে মাছ নিয়ে বসানোর যে প্রতিযোগিতা শহরের দুই জমিদার আনন্দবাবু আর জগৎবাবুর মধ্যে আমরা দেখি , তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে , তার অন্তর্গত অভিপ্রেত আমরা দেখবো বহুদিন পর যখন আনন্দবাজারের জমিদারের লোকেরা মাছ বিক্রেতাদের কাছে মাছের ভার পিছু দুই আনা মাশুল বসালো । যদিও জমিদারের নায়েব , লেঠেলদের জুলুমের কোনোও আখ্যান অদ্বৈত মল্লবর্মন আমাদের শোনাননি , তবু তাদের ধন অর্থাৎ মাছের ছো মেরে নিয়ে যাওয়া চিলের অভাব কোনোও কালেই ছিল না ।

তাহলে খোকার মাছ ধরতে যাওয়ার কাহিনিটি যে শেষ পর্যন্ত কোলাব্যাঙ আর চিলের দ্বারা উপকরণ আর সম্পদ কেড়ে নেওয়ার কাহিনিতে পর্যবসিত হয় । আর জেলে মালোদের জীবন সংগ্রাম পরিণতি পায় ব্যর্থতায় ।

এই ব্যর্থতার করুণ কাহিনি কি অন্যভাবে লেখা রইল না , এই শিশুতোষ ছড়ায় ?

ভাবতে ভাবতে মেয়ের কথায় চমকে উঠি । মেয়ে জানতে চাইছে ,-বাবা , অ বাবা , খোকা তবে কী নিয়ে বাড়ি ফিরবে ?

উত্তর আমিও জানি না । বললাম , আবার খোকা মাছ ধরতে যাবে ।