ব্যক্তিগত গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ব্যক্তিগত গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৪

ব্যক্তিগত গদ্য – সুপ্রভাত



শারীরিক

সুপ্রভাত রায়


আজ আবার...আজ আবার...বাইক পাংচার। কাল দুপুরেই একটি অশ্লীল সাইজের পেরেক বাইক এর পিছনের চাকার ভিতর ঘরে এমন বেঁকেচুরে ঢুকে গেছিল যে পাংচার সারানোর মোবাইল আশিষদা প্লাস দিয়ে ওটা বের করার পর অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতো ওটা চোখের সামনে তুলে ধরল প্লাস সমেত। দিয়ে সামনের দোকানদারকে দেখাল পেরেকটার সাইজ। দোকানদার করুন মুখ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে আমার দিকে তাকাল। আমি যেন গভীর অসুখ করা রুগির অভিভাবক। টিউবটা পাল্টাতে হল। ওইটুকু সহবাসেই টিউব হাওয়া ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল এক্কেবারে। স্কুল কলেজে নতুননতুন প্রেমে যেমন সারাক্ষন মনে হয় এই বুঝি প্রেমিকা ছেড়ে চলে গেলযাদের বাইক আছে তারা জানে নির্জন রাস্তায় ওই রকমই সারাক্ষণ মনে হয় এই বুঝি হাওয়া ছেড়ে চলে গেল টিউবকে। আজ আবার... হাইওয়েতে। মাথাটা শান্ত করে দাঁড়ালাম। বাইকটা স্ট্যান্ড করলাম। দেখলাম আজ আর একটা নয়, একটা আলপিন আর একটা কালকের পেরেকের সেজ ভাই এর বয়সি পেরেক। মনে হল আমার সময়টা ববি দেওল-এর থেকেও ফ্লপ যাচ্ছেএকে ওকে জিজ্ঞেস করে কাছাকাছি একটা দোকান পেলাম। পরীক্ষা শুরুর আগের মুহূর্তের প্রার্থনা নেমে এল আমার চোখে। হে ভগবান টিউবটা যেন টিকে থাকে, কালকেই পাল্টেছি। হ্যাঁ, আজকেও। আলপিন, পেরেক কি আর একসাথে সামলাতে পারে ভার্জিন টিউব। ফর্দাফাঁই। পাংচার সারানোর লোকটা বলল নতুন টায়ার তো’ ? আমি হ্যাঁ এর দিকে মাথা নাড়ালাম। লোকটা তারপর বলল নতুন টায়ারের সাথে পেরেকের সম্পর্কটা খুব ভাল বুঝলেন। নতুন টায়ারে যে চিটটা থাকে সেটা পেরেককে একটু পেলেই ভেতরে টেনে নেয় বুঝলেন। একটু পুরনো হয়ে গেলে আর টানবে না বুঝলেনএই শুনে আমি স্বার্থপরের মতো নতুন টায়ারের সাথে পেরেকের সম্পর্কে নজর দিয়ে দিলাম। কবে যে পেরেকের সাথে টায়ারের শারীরিক সম্পর্কটা শিথিল হয়ে আসবে। সেদিন আর একটু টাচ পেলেই টিউব এর ভিতর পেরেককে ঢুকতে দেবে না টায়ার।

ব্যক্তিগত গদ্য – শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়




পাঠশালা

শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়


আমাদের বাড়ির পাঁচিলের গায়েই পড়ে-থাকা একটা বড়োসড়ো জমি। সেখানে আগাছার জঙ্গল, মানুষসমান ঝোপঝাড়, একটা ছাতিম আর কয়েকখানা নারকেল গাছ। এছাড়া বড়ো বড়ো কচুপাতা, বিষকাঁটালি আর কন্টিকারির ঝোপ। মাঝে মাঝেই দেখা যায় ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে হেঁটে চলেছে বেঁজিদের সারি। ওদের ওই তুর্‌তুর্‌ করে হেঁটে যাওয়া, সন্তর্পণে এদিক-ওদিক তাকানো বেশ লাগে। চলে গেলে মনে হয় ওদের পেরিয়ে যাওয়া জায়গাটায় কিছুটা ধূসর-বাদামি ঔদাসিন্য পড়ে আছে। নিজেদের সামান্যটুকু নিয়েই যেন বড়ো ব্যস্ত রয়েছে ওই বেঁজির দল। পুঁচকে বেঁজিগুলো সাপের সঙ্গে লড়তে পারে, একথা আমার কিছুতেই বিশ্বাস হত না। কিন্তু একদিন আমাদের বাড়ির পিছনের ওই বাগানেই একটা বেঁজিকে সাপ ধরতে দেখলাম। কালো-হলুদ একখানা সাপ। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। আমাদের পাঁচিল থেকে অল্প দূরেই মাটি থেকে কিছুটা ওপরে ফণা তুলে সাপটা কেবলই এগিয়ে যাচ্ছে বেঁজিটার দিকে, ছোবল দিচ্ছে, ফোঁস করে শব্দ হচ্ছে বেশ জোরে। অমনি বেঁজিটা ঘুরে যাচ্ছে কিছুটা, সাপের মাথার পিছন দিকে। মাথা ঘোরাতে কিছুটা সময় নিচ্ছে সাপটা, আর সেই সুযোগে মাথার পিছন থেকে তাকে কামড়ে ধরার চেষ্টা করছে বেঁজি। যতটা সম্ভব দ্রুত ঘুরে পরের ছোবলটা মারতে মারতেই সাপটা দেখছে বেঁজি নেই। বেশ কিছুক্ষণ এমন দ্বৈরথের পর সাপটা একবার কেটে পড়ার চেষ্টা করল অন্তত আমি তাই ভাবলাম। হঠাৎ ফণাটা নামিয়ে দ্রুত ঢুকতে গেল কাছেই একটা ঝোপে। একটু দূর থেকে এই দেখে যেই না বেঁজিটা পেছন থেকে ওর লেজ কামড়ে ধরতে গেছে, অমনি সাপটা চকিতে ঘুরেই ফণা তুলে এক ছোবল! কি আশ্চর্য বেঁজিটা যেন বাতাসে শরীরখানা ভাসিয়ে টুক্‌ করে অল্প পিছিয়ে গেল। অসাফল্যে, রাগে সাপটার তখন সেকি গজরানি। তারপর আবার কিছুক্ষণ সেই উদ্যত ফণা, সেই আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা। খানিক পর দেখি বেঁজিটা গতি বাড়িয়ে বেশ দ্রুত ঘুরপাক খেতে লাগল সাপটার চারধারে। ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘুরতে ঘুরতে একসময় কিছুটা অবসন্ন হয়ে পড়ল সাপ। তারপর হঠাৎ অলৌকিক ক্ষিপ্রতায় বেঁজিটা একদিক অর্ধেক পাক ঘুরেই দিক বদলে অন্যদিকে গিয়ে পিছন থেকে কামড়ে ধরল সাপের মাথা। শরীর মুচড়ে মুচড়ে সাপটার সে কি ছট্‌ফটানি। কিন্তু বেঁজির কোনো বিকার নেই। বেশ কিছুক্ষণ সাপটাকে কামড়ে ধরে শান্ত হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। তার গায়ে তখন লুটিয়ে পড়ছে গড়ানো-দুপুরের ম্লান রোদ্দুর, লতাপাতার আলোছায়া। আমার শৈশবের সামান্য চরাচরে সে তখন বিজয়ী এক বীর রাজা। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছি তার দিকে। কষ্ট হচ্ছে, কেন ভাষা জানি না তার। কত কি জানার ছিল ওর থেকে! একসময় মুখে-ধরা শরীরটা নিথর হয়ে আসলে বেঁজিটা ধীরপায়ে ঝোপের আড়ালে মিলিয়ে গেল। আমি বিস্ময়ে, উত্তেজনায় অপলক দেখেছিলাম এই লড়াই। প্রত্যেক মূহূর্তে কি আশ্চর্য ক্ষিপ্রতা, কি অদ্ভুত সব কৌশলপ্রয়োগ। ছোট্ট ছোট্ট দুটি প্রাণীর যুদ্ধে যেন ঝলসে উঠছিল সময়ের একেক বিন্দু। বেঁজিটা চলে যেতে, নিহত সাপটার জন্য আমার মনখারাপ হল। চুপ করে খানিকক্ষণ বসে রইলাম কুয়োতলায়। সামনের জঙ্গলবাগান আবার শান্ত, শব্দহীন, যেন কিছুই ঘটেনি। দুপুরের নিদ্রালস বাতাসে অল্প অল্প দোল খাচ্ছে লতাগুল্মের শুঁড়, হাওয়া খেলে যাচ্ছে নারকেল, ছাতিম গাছের পাতায় পাতায়। ফুড়ুক ফুড়ুক করে উড়ে উড়ে এগাছ ওগাছ করছে কিছু পাখি। আমাদের পেয়ারাগাছে ফল খেতে এসে বসছে ঘুঘুর দল। বিষণ্ণ শব্দ হাওয়ায় ভাসিয়ে ডাক পাঠাচ্ছে দূরবর্তী সঙ্গীদের। ওদের মধ্যেও কেউ কেউ নিশ্চয়ই দেখেছে এই মহারণ। কিন্তু আমিই বোধহয় একমাত্র প্রথমবার একটা জ্যান্ত লড়াই চাক্ষুষ করলাম। তাই এত আলোড়ন, রক্তের ভেতর এত অস্থিরতা। ভাবছি সাপটার পরিবারের কথা, অনাথ সন্তানসন্ততির কথা। কিন্তু যুদ্ধের তো কোনো নিজস্ব মন নেই। সে এক আকস্মিক আগুনের মতো; মূহূর্তের স্ফুলিঙ্গপ্রসূত। আর ওই গাছপালা, আহারসন্ধানী ওই পাখির দল, সমস্ত প্রাণীজগত এই পৃথিবীতে ওরা তো সকলেই আমার চেয়ে বড়ো; তাই বোঝে যুদ্ধের চেয়ে কাজ-করাই বড়ো। কাজ-করাই আনন্দ ও মুক্তি।

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০১৪

ব্যক্তিগত গদ্য - অর্জুন চক্রবর্তী

অনুভূতির দোরগোড়ায়
অর্জুন চক্রবর্তী



সেদিন খুব বৃষ্টি পড়ছিল, আকাশ কালো মেঘের কল্যাণে নিজের জৌলুষ হারিয়েছে । মুম্বাইয়ের বর্ষাকাল যে কি যন্ত্রণাদায়ক তা শুধু তারাই বুঝবে যারা ওখানে থেকেছে । সমুদ্রের গায়ের সাথে সেঁটে থাকা বেশ বড় বাংলোর মুখে হুমড়ি খাওয়া বারান্দায় বসে আমি আর বাসুদা ( বিখ্যাত পরিচালক বাসু ভট্টাচার্য ) গরমাগরম তেলে ভাজা সহ চায়ের ওপর ভর করে আড্ডায় বিভোর । এখানে বলে রাখি, বাসুদার সাথে আমার পরিচয় - প্রথম যখন আমি মুম্বাই যাই তখন থেকে । আমি গুলজারের সহকারী হয়ে কাজ আরম্ভ করার পর সম্পর্কটা আরো কাছের মনে হত । এককালের স্বনামধন্য পরিচালক বিমল রায়ের সহকারী ছিলেন গুলজার ও বাসু ভট্টাচার্য দুজনেই, সেই হিসেবে ওরা গুরুভাই । বিমল রায়ের সহকারী এবং পরবর্তী কালে স্বাধীন ভাবে কাজ করে সম্মান, জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন ( র্হিষিকেশ মুখার্জি, দেবু সেন, মুকুল দত্ত , আরো অনেকে ) এদের মধ্যে এরা দুজনেও ছিলেন । এদের সাথে কাজ করে আবার অনেকে নিজেদের প্রমান করেছেন, যেমন- বাসু চ্যাটার্জি ( বাসু ভট্টাচার্যের সহকারী ছিলেন ) গুলজারের সহকারী মেরাজ , রাজ. এন. সিপ্পী. এন. চন্দ্রা ( যাঁর বিখ্যাত ছবি 'অঙ্কুশ' এ আমি অভিনয় করেছিলাম ) এবং আমি নিজে । হৃষীকেশ মুখার্জি’র সহকারী ছিলেন বীরেশ চ্যাটার্জি, যাঁর ছবি 'কড়ি দিয়ে কিনলাম' এক সময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, তাতে সনাতনের ভূমিকায় অভিনয় করে আমি প্রচুর সুখ্যাতি কুড়িয়েছি । এটি এক বিশাল পরিবার ও আমি এই পরিবারেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ, এরকম ধারণা শুধু আমার নয় আমাদের সবার মনে ভালো ভাবে বাস করে, এখনো । এই ধারাবাহিকতাকে এনজয় করি আবার গর্বও হয় এই ভেবে যে এক সূত্রে বাঁধা এত মনিষীদের সাথে আমিও আছি। চারবছর ভাই-এর ( আমি ' গুলজার ' কে এই নামেই সম্বোধন করি ) সঙ্গে কাজ করার পর, দক্ষিন ভারতীয় বিখ্যাত পরিচালক কে. বালাচান্দারের ছবি 'জারা সি জিন্দগী'তে বেশ বড় একটি চরিত্রে অভিনয় করে অভিনেতা হয়ে যাই তারপর আমারই গুরুভাই এন. চন্দ্রা ‘অঙ্কুশ’ ছবিতে আমায় মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করার সুযোগ দিয়ে আমায় জনপ্রিয় করে তোলে । সেদিন বৃষ্টিভেজা দুপুরবেলা বাসুদার সঙ্গে বসে চা, তেলেভাজা খেতেখেতে সেই সব স্মৃতি আওড়াছিলাম, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠলো, কথা সেরে বাসুদা ফিরে এলেন, তাঁকে যেন একটু বিচলিত মনে হলো ।

"মৃনালদা মুম্বাইতে আছেন, আমার এখানে আসছেন আজ, এখুনি" । বাসুদার কথা শুনে আমিও উত্তেজিত, সেই ‘বাইশে শ্রাবণ’ , ‘কলকাতা ৭১’, ‘ভুবন সোমে’র মৃনাল সেন ! যাঁর 'নীল আকাশের নিচে', 'খারিজ', ওকা কুরি কথা' আলোড়ন তুলেছিল এককালে, সেই মৃনাল সেন ! অন্য এক কাজে যাবার তাড়া ভুলে গেলাম ! কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে চারটে । দরজার বেল বাজলো । হন্তদন্ত হয়ে বাসুদা যাঁকে নিয়ে এলেন, প্রথমে তাঁকে দেখে, পরে তাঁর সাথে কথা বলে মন ভরে গেল । ধপধপে সাদা সুতির পাজামা পাঞ্জাবি, মাথায় উষ্কখুষ্ক কাঁচা-পাকা এক রাশ ঘন চুল, চশমার মোটা কাঁচ ভেদ করা তীক্ষ্ণ এক জোড়া অস্থির চোখ, ঠোঁটের ডগায় হালকা মুগ্ধ করা হাসি যেন সর্বক্ষণ সঙ্গী । ওনার গল্পে, প্রশ্নে, উচ্ছাসে - সারা বাড়ি যেন জেগে উঠলো । রিঙ্কি বৌদি ( বাসুদার স্ত্রী ও বিমল রায়ের কন্যা ) চা, সিঙ্গাড়া নিয়ে এলেন । সরল, সোজাসাপটা কথা, গল্পে সব কিছু কেমন যেন সুন্দর হয়ে উঠলো । বাসুদা মৃনাল্ দা কে আমার কথা বলাতে উনি চমকে তাকালেন আমার দিকে, কারণটা ওনার কথায় বোঝা গেল । "আরে ! আমি তো ভাবলাম ও নর্থ ইন্ডিয়ার ছেলে, তা তুমি হিন্দি বলতে পারো ?" বাসুদাই আমার দুটো হিন্দি ছবি ও আমার গুলজারের সাথে সহকারিতার কথা ওনাকে বলাতে মুশকিল আসান ! অনেক্ষণ আমার হাত ধরে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন । "আমি একটা ছবি করব, হিন্দিতে, রমাপদ চৌধরীর গল্প - 'বীজ' । তাতে একটা চরিত্র, তুমি করবে ?" আমার মনে হল যেন হাওয়ায় ভাসছি ! সজোরে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলতে যাব, উনি বলে উঠলেন, "শোনো তুমি আবার রাজেশ খান্নার মত গাছের ডাল ধরে গান করার জন্যে বায়না কোরনা যেন, আমি ওসব পারবনা !" সবাই এই কোথায় হেসে যখন লুটোপুটি খাচ্ছে, তখন আমি বোকার মতো ওনাকে বোঝাবার চেষ্টায় ব্যস্ত যে আমার সেরকম কোনো চাহিদাই নেই ! কলকাতায় শুটিং, আমায় কবে যেতে হবে, কবে থেকে কাজ আরম্ভ, সব বলে দিলেন । কলকাতায় আমার নিজস্ব বাড়ি আছে জেনে খুব খুশি । উনি চলে যাবার পরও আমি অনেকক্ষণ বসে রইলাম বুঁদ হয়ে । যথাসময় কলকাতায় পৌঁছে ওনার বেলতলার ফ্লাটে গেলাম, কাজের লোক থাকা সত্তেও নিজেই দরজা খুলে আমায় দেখে হইহই করে উঠলেন । কিছুটা সময় কালো চা সহ আড্ডা , মুকুল বাবু ( মৃনাল’দার প্রোডাকশন দ্যাখেন ) আমায় অন্য ঘরে নিয়ে গিয়ে কয়েকটা কাগজে সই করালেন, এরই মধ্যে মৃনাল’দা দুবার উঁকি মেরে বলে গেলেন, 'টাকাকড়ির ব্যাপারে কোনো অসুবিধে হলে আমায় বোলো, লজ্জা কোরনা । আমি শুনেই লজ্জা পেলাম ! আবার আড্ডা, একসময় আমায় জিগ্যেস করলেন "তোমার পরা পুরানো পাজামা আছে, শুটিং এ লাগবে ?" আমি তখন বাড়িতে বারমুডা বা বাবা কাকাদের মতো লুঙ্গি পরতাম, লুঙ্গির কথা শুনে উনি বলে উঠলেন, "না না লুঙ্গি না, লুঙ্গি পরে থাকলে মনে হয় You are easily available ! "হা হা করে সবাই হেসে উঠলো, দেখি উনিও মিটিমিটি হাসছেন ! একথা ওকথার পর আবার প্রশ্ন, "তুমি তো গুলজারের সহকারী ছিলে, তার মানে হিন্দিটা ভালই জানা আছে ?" চায়ে চুমুক দিয়ে মৃনাল’দা আমার দিকে তাকালেন । আমি কিছু বলার আগে ওখানে বসা একজন বলে উঠলেন, "অর্জুন তো হিন্দি বেল্টের ছেলে, ওর জন্ম ওদিকে, হিন্দি জানবেনা ?" ব্যাস আর কোনো কথা নয় আমাকে এই ছবির হিন্দি সংলাপ লিখে দিতে হবে এবং সংলাপ পরিচলকের দায়িত্বও সামলাতে হবে ! ওনার আবদার । রাজি না হয়ে উপায় নেই । যথাসময় অরোরা ষ্টুডিওতে শুটিং আরম্ভ হলো । সে সময় আমার গাড়ি ছিলনা, মুকুল বাবু কিছু বলার আগেই মৃনাল’দার গলা, "অর্জুন’কে আমি পিক আপ করব, ও তো পূর্ণ দাস রোড-এ থাকে, কাছেই, অসুবিধে হবেনা ।" মৃনাল সেন ! প্রতিদিন, তাঁর আম্বাসাডার গাড়ি করে আমায় তুলে ক্যামেরাম্যান কে. কে. মহাজন’কে তুলে ষ্টুডিও যাচ্ছেন ! ভাবা যায় ! শাবানা আজমি, শ্রীরাম লাগু, উত্তরা বাওকর, অনিল চ্যাটার্জি, অপর্ণা সেন, রূপা গাঙ্গুলি আরো অনেক ভালো ভালো অভিনেতা ছিল, যাদের সাথে কাজ করে যে কি আনন্দ পেয়েছিলাম তা ঠিক ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাবেনা । আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি এই ভেবে যে, কে. বালাচান্দার থেকে গুলজার, এন. চন্দ্রা থেকে তপন সিংহ, নব্যেন্দু চ্যাটার্জি থেকে মৃনাল সেন ! কত সত্যিকারের পরিচালকদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি । কামাল হাসান, নানা পাটেকার, নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, দীপ্তি নাভাল, নীলু ফুলে, আবার ভারতী দেবী থেকে মুনমুন সেন, হরিধন ব্যানার্জি থেকে হারাধন ব্যানার্জি । কত শিল্পী, কত কিছু শিখলাম, জানলাম, আজও শিখে চলেছি । আমার পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবি, 'টলি লাইটস্‌' যখন বেরোল, স্বয়ং গুলজার ভাই এসেছিলেন মুম্বাই থেকে । ছবি দেখে মুগ্ধ ! আমার ছবিতে গীতা দে’র অভিনয় দেখে ভাই বলে উঠলেন, "ওনার অস্কার পাওয়া উচিত !" আমার মুখে কথা নেই । গুলজার ভাই আমায় আশীর্বাদ করে মুম্বাই চলে যাবার কয়েকদিন পর আমার ফোনে একটি কন্ঠস্বর ভেসে উঠলো । সেই অতিপরিচিত গলা ! মৃনাল সেন ! আমাদের প্রিয় মৃনাল’দা ! "কী ! মুম্বাই থেকে গুলজার এসে তোমার ছবি দেখে যাচ্ছে ! আমায় ডাকলেনা ! কেন ?" কি বলব কি বলব করে আমতা আমতা করে মুখ দিয়ে সত্যি কথাটা বেরিয়ে গেলো ! "দাদা আমার সাহসে কুলোয়নি, আপনাকে ডেকে আমার ছবি দেখাবো !"

“ওসব কথা ছাড়ো , কবে দেখাবে বল ?"

"যেদিন আপনি বলবেন !"

"আরে আমি তো বাড়িতেই বসে, তোমার কবে সুবিধে জানাও ?"

"আজ দেখবেন ? প্রিয়া তে ? কাছেই , আমি নিজে গিয়ে আপনাকে নিয়ে আসবো !" আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল !

"না না তার দরকার নেই, আমি চলে আসবো, তুমি থেকো কিন্তু ।"

অন্ধকার সিনেমা হল, আমার পাশে সেই মৃনাল সেন ! নীল আকাশের নিচে, ভুবন সোম, খারিজ, এক দিন আচানাকের - মৃনাল সেন ! পর্দায় ছবিটা ঝাপসা লাগে কেন ? পলক ফেলেতে দেখি - চোখের জল গালে ! একটা অদ্ভুত আত্মতৃপ্তিতে বুক ভরে গেল, আস্তে আস্তে আমার পাশে বসা মানুষটার দিকে তাকালাম । দেখি, ধীমান পুরুষের গভীর নিঃসঙ্গতা নিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন একজন, পর্দার দিকে ! আমাদের সবার গর্ব, সবার প্রিয় - মৃনাল সেন ! আমাদের মৃনাল’দা !

ব্যক্তিগত গদ্য - বিমোচন ভট্টাচার্য

আমার ছোটকাকা
বিমোচন ভট্টাচার্য



যে ঘটনার কথা লিখতে যাচ্ছি সেটা আমার ছোটবেলার ..মানে আমি তখন সাত বা আট , আমাদের বিরাট যৌথ পরিবার ছিল তখন ... আমার ছোটকাকা আমার বড় দাদার চেয়ে ছোট ছিলেন.. দুজনে দুজনকে নাম ধরে ডাকলেও ছোট কাকা, তাঁর ছোট বেলা থেকে বিদ্রুপ শুনেছেন দাদার থেকে ছোট হবার জন্যে ..সেই জন্যেই , এখন মনে হয় , ছোট কাকা খুব সেক্লুডেড জীবন যাপন করতেন ,, একটি কুকুর ছিল তাঁর আলসিসিয়ান। তার নাম ছিল শীর্ষেন্দু ,,,কুকুরের নাম শীর্ষেন্দু? পরে শুনেছিলাম শীর্ষেন্দু নামে তাঁর এক অতি প্রিয় বন্ধু প্রয়াত হবার পর ই তিনি কুকুরটি পুষতে শুরু করেন .. তাই ওই নাম.. একদিন ... খুব গরম তখন .. বারান্দায় আমরা ক ভাই খেলছিলাম, এমন সময় আমার এক খুড়তুতো ভাই আমাদের দেখালো আমাদের শীর্ষেন্দুর সঙ্গে রাস্তায় একটা কুকুরের লেজের সঙ্গে লেজ জড়িয়ে গেছে ..(এটাই আমাদের বলা হত তখন ), অনেক মানুষ জড়ো হয়েছেন, তার মধ্যে হাসছেন ও কেউ কেউ। ওদেরই একজন আমাদের বললেন-'তোদের ছোট কাকাকে ডাক ',... আমরা সকলে মিলে ছোট কাকাকে গিয়ে ঘটনাটা বললাম, ছোট কাকা তরতর করে নেমে গেলেন নীচে.. আমরা আবার বারান্দায় .. ওপর থেকে আমরা দেখলাম আমার ফর্সা ছোট কাকার মুখটা লাল হয়ে গেছে.... মা চিত্কার করছেন -' ওরে পিন্টু ,বাড়িতে ঢুকে আয় ..ও তো চলেই আসবে একটু পরে ..আর লোক হাসাস না .. আমার দাদা দিদিরাও দেখলাম মুখ টিপে হাসছেন ... আপাতশান্ত আমার ছোট কাকা কিন্তু বাড়িতে এলেন সঙ্গে শীর্ষেন্দু কে নিয়ে .. স্নান করালেন কুকুরটিকে সাবান দিয়ে তারপর নিজের চিলে কোঠার ঘরে শীর্ষেন্দুকে নিয়ে চলে গেলেল.. দরজা বন্ধ হয়ে গেল আর তার পরেই শুরু হলো বেত দিয়ে কুকুরটিকে প্রহার... আমার এখনো মনে পরে ছোট কাকার সেই প্রলাপ আর শীর্ষেন্দুর সেই চাপা আর্তনাদ.. মা দরজা ধাক্কা দেন .. আমার অতি নিরীহ ঠাকুমা, আমার দাদা দিদিরা সবাই ডাকাডাকি করেন (বাবা বাড়ি ছিলেন না ) , আমার অন্য কাকারা ডাকেন কিন্তু ছোট কাকার কোনো হুঁশ নেই .. বেশ কিছু সময় পর ছোট কাকা দরজা খোলেন .. চোখ দুটো লাল ... ঠাকুমা ধরতে যান ছিটকে সরে গিয়ে ছোট কাকা নীচে নেমে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন .. শীর্ষেন্দু তখন অর্ধমৃত .. মা বললেন ' আহা রে এমন করে কেউ মারে. মলম এলো ..লাল ওষুধ এলো সেগুলো লাগানো হলো ওর গায়ে ।ছোট কাকা ফিরলেন অনেক রাতে। ততক্ষণে বাবা ফিরেছেন এবং তাকে পাড়ার লোকজন ই ব্যাপারটা বলে দিয়েছেন পাড়ায় ঢোকা মাত্রা।সেটা আমরা তাঁর কাছেই শুনলাম .. মা , ঠাকুমা না খেয়ে বসে ছিলেন ..ছোট কাকাকে বাবা বললেন 'কুকুরটাকে ওই ভাবে মারলি কেন ?? তুই তো জানিস এই সময় ওদের কিছু শারীরিক প্রয়োজন থাকে (কিছুই মানে বুঝিনি তখন ).. সেই প্রথম দেখলাম ছোট কাকার চোখ ভর্তি জল .. এদিকে ছোট কাকা বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে শীর্ষেন্দু পায়ের সঙ্গে লেপ্টে গেছে ... বাবা আরো বললেন -যা খেয়ে নে ..মা আর তোর বৌদি না খেয়ে বসে আছে সেই সকাল থেকে ... ছোটকাকা খাওয়া দাওয়া করে শীর্ষেন্দুকে নিয়ে ফিরে গেলেন চিলেকোঠার ঘরে । বেশ কিছুদিন ছোটকাকাকে পাড়ার বন্ধুরা ক্ষেপাতো ওই ব্যাপারটা নিয়ে ,, দাদা বেশি মেলামেশা করত পাড়াতে, মাকে প্রায় ই বলত পিন্টুর জন্যে পাড়ায় মুখ দেখানো যাচ্ছেনা ... মা বকাবকি করতেন দাদা কে ...তার পর আসতে আসতে ব্যাপারটা চাপা পড়ে গেল .. পাড়ায় অন্য কোনো ঘটনা ঘটলো যেটা এর চেয়েও মুখরোচক , সকলে সেটা নিয়ে পড়লো । আমাদের বাড়িতে দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটলো বেশ কিছুদিন পর। সেই কুকুরটির বাচ্ছা হলো বেশ কয়েকটি যার সবকটাকেই প্রায় আমাদের শীর্ষেন্দুর মত দেখতে ।সেই কুকুরটি থাকত আমাদের বাড়িটার নিচের রকে।আমাদের তো খুব ফুর্তি ঐরকম ফুটফুটে ছ সাত টি বাচ্ছা দেখে .. মা, ঠাকুমা সাবধান করলেন , এ সময় মা কুকুররা খুব কামড়ে দেয় কিন্তু আমরা এত আদর করা সত্যেও পাঁচী কিন্তু আমাদের কিছুই বলত না .. ব্যাস আবার পাড়ায় শুরু হয়ে গেল গুঞ্জন -দাদার মুখ গম্ভীর হলো .. ছোট কাকা আরো গম্ভীর .. বাড়ির বাইরে বেরোলেই বাচ্ছা কুকুরগুলো পায়ে পায়ে ঘুরত .. ছোট কাকা একটা লাঠি নিয়ে বেরোত .. বাচ্ছা গুলোকে নয় ওদের মাকে দেখতে পেলেই মারতে যেত ....একদিন আমরা বাইরে খেলছি .. ছোটকাকা বেরোচ্ছেন হাতে লাঠি.. ছোটকার এক অতি ঘনিষ্ট বন্ধু টনিকাকু ছোটকাতে বললেন ---কি রে তোর বৌমার ওপর এত রাগ কেন তোর ?? আর নাতি নাতনি গুলোকে তো একটু আদর টাদর করতে পারিস.. তা না দেখা হলেই লাঠি পেটা করিস... টনি কাকুর সঙ্গে যারা ছিল সবাই হেসে উঠলো আর ছোটকা এমন একটা কান্ড করলো যা ইতিপূর্বে আমরা কোনদিন করেতে দেখিনি .. হাতের লাঠিটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো টনি কাকুর ওপর, এলোপাথারী মারতে লাগলো টনিকাকুকে , মাথা ফেটে গেল টনিকাকুর ছোটকাকেও বেশ ভালই মারলো বাকি লোকেরা .. মা , ঠাকুমা দাদা কোনরকমে বাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে আনলো ছোটকাকাকে ।আজকের দিন হলে থানা পুলিশ হত কিন্তু তখন সেসব হয় নি । ছোটকা আসতে আসতে কি রকম যেন হয়ে গেল .. পাড়ায় বেরোনো বন্ধ করে দিল .. একদিন টনি কাকু এসেও বোঝালো , কিন্তু ছোটকা নির্বিকার ।বেশীর ভাগ সময় ঘরের ভেতরই থাকতো । একদিন সকালে বাড়িতে হইচই ..আমাদের ওপরে উঠতে দেওয়া হচ্ছেনা .. তবুও শুনতে পেলাম চিলেকোঠায় ছোটকা গলায় দড়ি দিয়েছে ... শীর্ষেন্দুর একটা চাপা কান্না শুনতে পাচ্ছিলাম .. দেখতে পাচ্ছিলাম মা , ঠাকুমা . পিসিমারা , দাদা দিদিরা কাঁদছেন.. পুলিশ এলো বাড়িতে .. এক সময় ছোটকার বডি নামালো হলো নীচে ..পুলিশ সেই বডি নিয়ে চলে গেল । পরদিন আবার আমাদের বাড়িতে এলেন ছোটকা .. ফুলে ফুলে ঢাকা হয়ে ,সবাই কাঁদছে .. হঠাত কোথা থেকে টনি কাকু এসে আছড়ে পড়লো ছোটকার দেহে ..বিলাপ করতে লাগলো হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে -'আমার জন্যেই তোকে চলে যেতে হলো রে পিন্টু ..কেন যে তোকে বলতে গেলাম ওই কথা গুলো সেদিন ।সরিয়ে নেওয়া হলো টনি কাকুকে ... দেখলাম পাঁচী তার বাচ্ছা কাচ্ছা নিয়ে দেখছে ছোট কাকাকে ... বাবা বললেন -' শীর্ষেন্দুকে নিয়ে চল শ্মশানে ...চলে গেল সবাই হরিধ্বনি দিতে দিতে শ্মশানের দিকে । এর কিছুদিন পর শীর্ষেন্দু ও মারা যায়, কিছুই প্রায় খেত না ছোটকা চলে যাবার পর .. আমরাও অন্য পাড়ায় চলে আসি ওই বাড়িটা ছেড়ে । আজ এতদিন পর ছোটকার কথা লিখলাম কেন ? কাল ছোটকার জন্মদিন ছিল .. একটা প্রায় ধুসর হয়ে যাওয়া ছবিতে কাল আমার পঁচাত্তর বছর বয়েসের দাদা একটা মালা পরালো ..আর আমার মনে পড়লো আমার একটা ছোটকাকা ছিল ।

বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

ব্যক্তিগত গদ্য - সুপ্রভাত রায়

আনটাইটেল্‌ড
সুপ্রভাত রায়



সহজ পাঠে আঙিনা প্রসঙ্গটা অনেকবার এসেছে দেখেছি বড় হয়ে। আঙিনা মানে যে উঠোন সেটা আমায় কে প্রথম বলে দিয়েছিল কে জানে। ক্লাস টু এর রুমু পড়া নিতে এসে বলল স্যার তোমাদের বাড়িতে উঠোন আছে ? উত্তরে আমাদের বাড়ির উঠোনটার সাইজে যেটুকু ছোট্ট করে হ্যাঁ বলা যায়; বললাম। আর পড়াতে গিয়ে ওকে আমাদের স্কুলের ডবল এক্সএল উঠোনটা দেখিয়ে উদাহরণ টেনেছিলাম। ও বলল ওদের বাড়িতেও আছে। যেন সেই সময়ের কালার টিভি, তোমাদের বাড়িতে আছে ? আমাদের বাড়িতেও আছে। উঠোন শব্দটা হয়ত আমাদের বেঁচেটেঁচে থাকতে থাকতেই টেঁশে যাবে। আর স্টিফেন স্পিলবার্গ যদি উঠোন নিয়ে কোনো ছবি না বানান তা হলে তো আর পরের বাকিরা চোখে চেখে দেখতেও পাবে না টেকনিক্যালি উঠোন জিনিসটা ঠিক কি রকম দেখতেটেখতে ছিল। একটা হেব্বি উঠোন ছিল আমাদের সেই পুরনো মাটির বাড়িটায়। ঝড়ের পূর্বাভাসে আতঙ্ক ভেসে উঠত যখন আমাদের সব্বার মনের স্ক্রিনে, বা ঝড়টা যখন নেট প্র্যাক্টিস করত—ঠিক সেই রকম সময়ে জেমা (জেঠিমা) আমাকে একটা পিঁড়ে দিয়ে মন্ত্র শিখিয়ে দিত ‘পবনদেব শান্ত হও পবনদেব শান্ত হও পবনদেব শান্ত হও’। মাঝ উঠোনে এই মন্ত্রটা বলে পিঁড়েটা পেতে আসতাম আমি। পবনদেব শান্ত হয়ে খুব একটা বসতেন না পিঁড়েতে। উনার বোধ হয় পিঁড়ে পছন্দ ছিল না, ঘোরানো চেয়ার পছন্দ ছিল।

ব্যক্তিগত গদ্য – আলোকপর্ণা

বন্ধ কারখানা
অলোকপর্ণা



আইসি সফেদি অউর কাহাঁ


পুরনো ফটোফ্রেম তুলে নিয়ে গেলে দেওয়ালে যেমন তারই সাদা অবয়বটুকু পড়ে থাকে, আমি আমার হাতের পাতায় তাকাই, বুঝি, এইখানে কাউকে ধরতে চেয়েছিলাম। এখন সমগ্র পাতা জুড়ে শুধুমাত্র তারই ছোঁয়াচ লেগে আছে। মুঠো খুলে হাওয়ায় ছোঁয়াচগুলো উড়িয়ে দিতে শূন্য হাতে আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে এল, যেন সব সাদা ধুয়ে ফেলার প্রচেষ্টায়। আমি জানি, এসব কিছুই নয়, এখন শুধুমাত্র নিরীহ বর্ষাকাল।

ভীড়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছি। একেকটা গল্প ঘাড়ে বৃষ্টির ফোঁটারা নেমে আসছে মাটিতে, আমায় পাশকাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে একে অন্যের হাত ধরে, গল্প তৈরি হচ্ছে। গল্পে ঠাসা শহরে আমি আমার গল্প খুঁজতে বেরিয়েছি, আমার নামে কি একটাও বৃষ্টি নামল কোথাও? রাস্তা ছেড়ে ফুটপাথে উঠে এলাম। এছাড়াও এখানে কুকুরের বাচ্চা, নোংরা ভিখারি, প্লাস্টিকের চায়ের কাপ দাঁড়িয়ে আছে, গল্প খুঁজে পাওয়ার আশায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি গল্পের ট্রাম চলে গেল গঙ্গার দিকে, দেখছি ফুটপাথের পসরা থেকে তুই ঘড়ি তুলে নিচ্ছিস, হাতে পরে নিচ্ছিস ‘হরেক মাল একশোর’ আমার সস্তা সময়। তোর ইচ্ছেয় মিনিটের কাঁটা দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে, আর তুই একলাফে ট্রেনে উঠে পড়লি, তোর ট্রেন তোর গল্প নিয়ে দূরে... চলে যাচ্ছে।

আমি পরের পাতা ওলটালাম। সমস্তটা সাদা। হাতের পাতায় মা প্রথম অন্ধকারে কিছু আদুরে ক্রিসক্রস এঁকে দিয়েছিল, কিন্তু এখানে- একটা অক্ষরও নেই।





আমি জিভ দিয়ে দাঁত গুণে দেখলাম... তিরিশ। আর মাত্র দুবার, তারপর নতুন আর কিছুই তৈরি হবে না আমার শরীরে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত বন্ধ কারখানা হাতড়ালে, বালিতে ডুবে আসবে হাত, ঝিনুক ফেলে গেছে কারা যেন, এখানে সেখানে ভেজা পায়ের ছাপ। নিজেদের সমুদ্র ছেড়ে কেউ কেউ উঠে চলে গিয়েছে। পড়ে আছে শাঁখের শূন্য খোলস, সাদা।



দর্দ আচ্ছে হ্যায়

ছোটবেলার কষ্টগুলো ফার্স্টবেঞ্চে বসা, আড়ি- ভাব, বেস্টফ্রেন্ড, কারেন্ট চলে গিয়ে মিকিমাউস ক্লাব হাউস দেখতে না পারা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। ওরা টের পায়নি কখন আমার জামাগুলো গায়ে ছোট হতে শুরু করল বা ওরাও তুচ্ছ হতে থাকল আমার কাছে। এমনকি আমিও বুঝতাম না মাঝরাতে কিসের জন্য অন্ধকার ছাদে গিয়ে দাঁড়াতাম, অন্ধকার দেখে যেতাম একনাগাড়ে। আঁকার স্যর বললেন, “তুই কিছু খুঁজছিস আসলে।” আমি ‘আসলে’ কি খুঁজছি? বড় বড় কষ্টদের এড়াতে ছোট হয়ে যাওয়া কষ্টদের খুঁজে ফিরছি, অন্ধকারে?

ঘরের কোণায় প্যান্ডোরার বাক্সটা রাখা, ততদিনে আমার টেক্সট বইয়ে ‘যোগ্যতমের উদবর্তন’ শব্দটা যুক্ত হয়ে গেছে। আমি বাক্স খুলে তোকে বার করে আনি, অ্যালবামে তুই হাসছিস, দ্বিতীয় পাতায় তুই আমার দিকেই তাকিয়ে, যেন আলতামিরা গুহাচিত্রের মত আজন্মকাল থাকবি!! (হাস্যকর), তৃতীয় পাতায় কোনো ছবি নেই, ব্ল্যাংক। আমি আর্তনাদ করে উঠি, দেখতে পাইনা কিচ্ছু, চেঁচিয়ে বলি, “এটা কি হল! কেন এরকম হয়...”



তোর ছবিরা বাক্স থেকে দ্রুত বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে যায়, ওড়াউড়ি করে, ওদের সঙ্গে লড়াই করে একসময় আমি অবসন্ন হয়ে পড়ি, দেখি বাক্সের তলায় পড়ে আছে আমার ছোট ছোট কষ্টগুলো। আমি ওদের নিয়ে জোর করে ব্যস্ত হই এবার। ভাবি অভি কেন আমায় খেলায় নিল না, ভাবি অনন্যা কেন গ্রিটিংস কার্ড দেয়নি ১৯৯৮এ, বাবা কেন কোলকাতায় দুর্গাপুজো দেখাতে নিয়ে যায়নি কোনোদিন, কেনই বা জন্মদিনে কেক আসেনি কখনও... আমি খেয়াল করি,- তুই ছোট হয়ে আসছিস এতদিন ধরে জমে থাকা অন্যসব ‘কেন’র পাশে। প্যান্ডোরার বাক্সে মাথা রেখে ঘুম নেমে এল। চোখ বুজতে বুজতে যে দীর্ঘশ্বাসটা এসে দাঁড়াল আমার সামনে, গায়ে বিষণ্ণতার চাদর টেনে দিয়ে সে বলে গেল, “দর্দ আচ্ছে হ্যায়।”





আই হ্যাভ এ ড্রিম

একদিন মনে হল জিভ আটকে আসছে। আমি কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। কলেজ স্ট্রীট মোড়ে তখন সন্ধ্যে নেমেছে, জোর গলায় নিজের নিজের কথা বলে যাচ্ছে কোনো এক পলিটিকাল পার্টি, অথচ আমার কথা বন্ধ হয়ে আসছে। অসহায় অবস্থায় বাস ধরার চেষ্টা করলাম, “দাঁড়াও!” -আওয়াজ বেরোল না।
রাজনৈতিক অধিবেশন শেষ হল কলেজ স্ট্রীটে, তকমা লাগানো মানুষেরা রাস্তায় নেমে ভীড়ে মিশে সাধারণ হয়ে গেলেন। শুধু দেখলাম ফুটপাথে প্রৌঢ় এক পাগলি বসা, দুহাতে খুচরো ভর্তি বাটিটা তুলে সেও বক্তাদের উদ্দেশ্যে অকাতরে হাততালি দিয়ে চিৎকার করছে, “আই নিড এ চেঞ্জ! আই নিড এ চেঞ্জ!” দুর্ভাগ্যবশত আমি তার সাথে গলা মেলাতে পারিনা, আমার জিভটা ততক্ষণে ভীড়ে হারিয়ে ফেলেছি। আর সেই ভীড় কত শব্দ হয়ে হাতিবাগান, শিয়ালদহ, ধর্মতলা অথবা হাওড়ার দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে, একা একা ঘরে ফিরে যাচ্ছে, সন্ধ্যেবেলায়।

রাত তিনটে নাগাদ দেখলাম খয়েরি কার্ডিগান আমায় জড়িয়ে বলছে, “আমি জানি...” ট্রেনের দমকে জানি না তখনও মোঘলসরাই পার করে চলে গেল কি না আমার স্বপ্নটা, সে বলছে, “আর কেউ থাকুক না থাকুক, তুই থাকবি...” আমি ঘুম ভেঙে ভেঙে রেল ট্র্যাকে ছড়িয়ে দিচ্ছি যেন মুড়িমুড়কি, যেন মৃতদেহ নিয়ে গেছে কেউ এপথে, “...তুইই থাকবি।” উঠে বসে দেখলাম রাত তিনটে আমার জানালায় আমারই ছায়া তৈরি করে পিছিয়ে দিচ্ছে বিহার, মধ্যপ্রদেশ, গাছ, অন্ধকার। ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয় জেনে আমার ঘুম আসেনি আর। পরে, প্রায় একজন্ম পরে জেনেছিলাম, স্বপ্নে আমরা অচেনা কাউকে দেখিনা।
আমি দ্বিধায় পড়লাম, আমার পড়ে পাওয়া গোটা তিনেক ‘তুই’-এর কোন ‘তুই’ আমায় অপেক্ষায় রেখে গেলি তাহলে?





বন্ধ কারখানা


আমাদের ছোট নদীরা এখন আঁকে বাঁকে চলছে। রেল লাইনের তারা মত একটিবার কাছে আসছে, কাটাকুটি করে আবার চলে যাচ্ছে দূরে। এমতাবস্থায় আমি টের পাই একটা দ্বীপ তৈরি হচ্ছে আমার মধ্যে। সেখানে সমুদ্র থাকবে, বালুচর থাকবে, শালবন, ঝিনুক, কাঁকড়ার দল থাকবে, থাকবে নারকেল গাছ, দূরে ভেসে থাকা নৌকো, থাকবে শয়ে শয়ে বালির প্রাসাদ,- ঢেউয়ের আঘাতে বারংবার ভেঙে পড়ার জন্য। আর আমি, এসব জেনেও দাঁড় টানতে থাকব, শরীরে বন্ধ কারখানার কঙ্কাল নিয়ে, প্রাণপণ চেষ্টা চালাবো ওই দ্বীপ ছোঁয়ার।

অথচ প্রশ্ন করবেনা কেউ যে, একদিন একা এই দ্বীপে আমি একমাত্র কাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইব... কারণ প্রশ্ন করার মত এ লক আউটের বাজারে এখন আর কেউ নেই।

সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৩

ব্যক্তিগত গদ্য - অলোকপর্ণা।

সাফ্‌ল
অলোকপর্ণা



নীচে পড়ার একটা আরাম আছে, সমস্ত দায়ভার আলগা হয়ে কাঁধ থেকে ঝরে যায়। যেমন আমার হল, ব্যাগ থেকে সবজিগুলো রাস্তায় ছড়িয়ে গেল যে যার নিজের মত,- মাইগ্রেশান। তিথি চেয়েছিল, ইউনিভার্সিটি থেকে, পরিবার থেকে, আমার থেকেও। বাদবাকীগুলো অনেক ঝড়ঝাপ্টা পার করে তিথিতে পৌঁছালেও আমি দেরী করিনি তাকে ছাড়পত্র দিতে। তিথি যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল, “তুমি যা বলো, তা করেই ছাড়ো।” স্তুতি না দোষারোপ,- আজ অবধি বুঝিনি আমি। তাই এরপরে আমি এমন কিছু বলিনি আর কখনও, যা আমার দ্বারা করা সম্ভব হবে না। তাই আমি বলেছি, অফিসে যাব, অফিসে বোনাস, বৎসরান্তে সি এল নিয়ে দীঘা, গোপালপুর সবই হবে। আমি করিও, বাবাকে হসপিটাল, মা কে ফিজিও, ভাইকে প্রাইভেট ফার্ম- সমস্তই করি। তাও আশ মিটলো কই। রোজ সূর্য ওঠার আগে আমি মনে মনে ভালো হয়ে চলার কথা বলে, ব্রাশ করে, আরো যা যা প্রত্যাশিত সমস্ত ‘করেই ছাড়ি’।

বাজারের পথে পুকুর পার, এখানে এখনো সে সব পুরনো ছায়া পড়ে আছে। সেসব ছায়া এখনো সিগারেট জ্বেলে চোখ বুজে বলে দিচ্ছে সি পি এমের আরও বছর পঞ্চাশ... দীর্ঘশ্বাসগুলো কলেজের দিন ছুঁয়ে ঘুরে ঘুরে টুপ করে জলের মধ্যে পড়ে, ছায়াগুলো ভয়ে কেঁপে যায়। বাজারের ব্যাগ আরও দৃঢ় হয়ে হাত চেপে ধরে, ঠিক যেন তিথি, রাস্তা পার হতে হবে যে। প্রচুর সিগনাল! প্রচুর যানজট। আরও যেসব সেপিয়াগুলো গাছতলায়, মিত্রদের রকে, বঙ্কু টি হাউসে ক্লিপড হয়ে আছে সেগুলোর দিকে তাকাইনা আর। হন হন করে হেঁটে যাই। নাহলে যে চোখে পড়ে যাবে, আজ অবধি যা করার কথা ছিল তার কিছুই আমি করে উঠিনি।

এবছর বাড়িতে ইলিশ এলো না। মা-র প্রিয়। ভাইয়ের মিউজিক সিস্টেম ভাইয়ের পিছু পিছু অফিস ফেরতা ঢুকে গেল ভাইয়ের একান্ত ঘরে। মা,- চিরকালের মত সেদিনও মিউট হয়ে থেকো। আমি আর মা পাশাপাশি ফ্যামিলি ফটোতে যেন সবচেয়ে বেশি সাদাকালো। আর বাবা... বাবা জল চেয়ে চেয়ে চাকরী জীবন থেকে ফিরে শয্যা নিলো যেদিন আমি নিশ্চিত হলাম এবার মরে গেলেই বাবা চাতক হয়ে জন্মাবে। চাতক চাতক, চাতক জীবন, চাতক চোখদুটোও,- এখনো আশা করে, এবারের মোড়টা পেরোলেই তিথিকে দোতলার ছাদে দেখা যাবে। বাজারের ব্যাগটা পর্যন্ত হাওয়ায় দুলে দুলে হেসে উঠলো।

সামনে বালিশে তুলো ভরার দোকান, তার পাশ কাটিয়ে মাংস কাঁটা গলি তিথির সিঁথির মত পশুর রক্তে লালচে। প্রতিবার মরন্ত মুরগী দেখেও নিরামিষাশী হওয়া হোল না। পাতে পড়লেই সব মাংস আমি হয়ে যায়,- আমি আর যাকে খাচ্ছি- সেই মুরগি পর্যন্ত সবই আর কিচ্ছু নই মাংস ছাড়া। তিথিরা আমাদের মাপমত কেটে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। তিথিরাই খাচ্ছে কব্জী ডুবিয়ে আমাদের, হাড় থেকে মজ্জা চুষে আলাদা করে নিচ্ছে,- আহ্‌ এতেও কি তৃপ্তি! “এক কেজি সলিড দেখে, মাথা দেবেন না।” কচকচ আওয়াজটা ঢাকবার জন্য আমি চারদিকে তাকাই। এদিক ওদিক ছিটিয়ে আছে পালক, রক্ত, টেলার, মোবাইল রিচার্য আর নিষেধ সিডি।

বটি থেকে মাথা সরিয়ে নিয়ে আমি স্কুল জীবনে তাকালাম। জ্বলজ্বলে চোখে স্কুল তাকিয়ে আমারই দিকে, মিটমিটে চোখে কলেজ আর অর্ধনিমির্লিত চোখে তিথির ইউনিভার্সিটি। বাবার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স রিচার্যড হোলনা বলে যেখানে পা পড়লো না আর। এক প্লাস্টিক মাংসলো স্বপ্ন নিয়ে আমি চাকরীর বাজারে লাফিয়ে পড়লাম। এইতো লাস্ট ল্যাপ!! ফিনিসিং লাইন ওই যে,... ওই তো... আর একটু! ফিনিসিং লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে বাবার ক্যান্সার আমার গলায় বিজয়মাল্য পড়িয়ে দিল।



আনাজ, শাক আর সময়, মা রোববার রোববার আনতে বলে। আনাজে ঢাকবে স্বচ্ছল পারিবারিক সাপার, শাকে আমাদের এক এক জনের সমস্ত না পারারা ঘুমিয়ে পড়বে শীতের পাতে। তাহলে বাবার হাতে থাকলো আর ছয় মাস। কড় গুনে গুনে বাবা অংক কষেছে আর রাফ করছে, সিঁড়ি ভাঙার অথবা বাঁদর আর তৈলাক্ত বাঁশের। যখন বড় হলাম, দেখলাম, ওসব অঙ্ক মেলাতে গিয়ে বাবা পিছলে পিছলে পড়েছে বার বার, সিঁড়ি থেকে, উঁচু থেকে। ছোটবেলার ইচ্ছে মতো আজ আমি অর্ধেক বাবার মতই হয়েছি, তাই তার গর্বের শেষ নেই আমায় নিয়ে। শেষ ছমাস আমার কাঁধে ভর দিয়ে তাই বাবা রিক্সা থেকে নামবে, সিঁড়ি দিয়ে উঠবে, আর পিছলাবে না।

বাজারের ব্যাগ কাঁধের দায়ের থেকে কোনো দিনই ভারী হয়ে উঠবে না, আমি জানি। আপাতত তাই পঞ্চাশ বছরের নিশ্চিন্তি। অর্ধেক বাবা হয়ে আমিও এমনই একদিন সিঁড়ি ভাঙা অংক কষবো, বাদরের সাথে পাল্লা দিয়ে তৈলাক্ত বাঁশ থেকে পিছলে পিছলে পড়ব, আর বাকি অর্ধেক মা হয়ে সন্তানের স্পষ্ট হয়ে ওঠা নির্বাক দেখব। তিথি তখন কোথায়? তিথির হাত পা বুক পেট নাভি টেলারের ম্যানিকুইনের মত আলাদা আলাদা হয়ে মাটিতে পড়ে থাকবে, কিছু নেবে ওর বর, কিছুটা সন্তান, কিছুটা জীবন। আর আমার চোখে তখন তিথির নানা অংশ সাফল করে নিয়ে নেবে ভীড় বাসের মহিলা সহযাত্রী, হোটেলের রিসেপ্টশানিসস্ট, দুম করে ধাক্কা দিয়ে সরি ছুঁড়ে দিয়ে যাওয়া পথযাত্রীনী। আমি দেখবও না, কি ভাবে তিথির মাথা বসে যাচ্ছে মাঝরাতে বউয়ের মাথায়, তিথির হাত ভাগ করে নিচ্ছে কাজের লোক আর আমার মেয়ে। অফিসের স্টেনো হয়তো পাবে তিথির পিঠ, বাসযাত্রীনী তিথিকোমর থেকে আমার লুব্ধ হাত ছিটকে সরিয়ে দিয়ে হয়তো চেঁচিয়ে উঠবেন –পার্ভার্ট! বলে। কন্ডাক্টার ততক্ষনে আমাকে ছিটকে ফেলে দেবে রাস্তায়।


আমি ফিরে এসে বাজারের ব্যাগ তুলে নিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে পিছলাতে পিছলাতে নামা শুরু করি। আমি বলি ‘সাফল্ড হয়ে চলো, সাফল করে দাও’। যা বলি তা করে ছাড়ার জন্য আমার পিছনে বাজার, তিথি, কলেজ, স্কুল, বাড়ি, মা, বাবা, ভাই, অফিস সমানে সাফল্ড হয়ে যেতে শুরু করে,- সারাজীবন সাফল হয়ে যায়।

ব্যক্তিগত গদ্য - শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়

হে আশ্চর্য হে আকাশ ...
শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়



খোলা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে মুখে ঠান্ডা হাওয়ার ছোঁয়া পেলে দেশের কথা খুব মনে পড়ে। বাড়িঘর, পাড়ার পুকুরটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে পুকুরপাড়ের রাধাচূড়া গাছটার কথা। গাছের সামনের রাস্তাটায় ক্রিকেট খেলতে খেলতে বল পড়ে যেত পুকুরের জলে। এদিক ওদিক থেকে ঢিল ছুঁড়ে তাকে টেনে আনা হত কাছে। সেই সব খোলামকুচিদের মনে পড়ে। একটু চ্যাপ্টা টুকরো পেলে তাকে নষ্ট করতাম না। ব্যাঙাচি করতাম। শরীরটাকে বাঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে পুকুরের এপার থেকে ওপার জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে লাফ খাওয়াতাম ইঁটের টুকরোটাকে। একদিন খেলা সেরে সবাই চলে গেলে রাধাচূড়ার গায়ে ইঁট দিয়ে ঘষে ঘষে আপন খেয়ালেই লিখেছিলাম দুটো কথা লিখেছিলাম। লিখেছিলাম – “আমি”। আর লিখেছিলাম – “খেলা”। তখন আকাশজুড়ে নেমে আসছে গোধূলি। সন্ধ্যার ফিরিওলারা একজন দুজন করে শুরু করেছে চলাচল। দূরে গলির বাঁকে দুলে উঠছে ঘটিগরমের লন্ঠন। সেইদিন কোনো শব্দ করেনি রাধাচূড়া গাছ। তার গা ছুঁয়ে একা একা দাঁড়িয়ে দেখলাম কে যেন তার স্বর্ণাঞ্চলের শেষপ্রান্তটিকে টেনে সরে যাচ্ছে আমাদের আকাশ থেকে অন্য আকাশে। সেই অতীত আকাশকে মনে পড়ে খুব। সেসব আকাশ কী স্পষ্ট বদলে যেত ঋতুবদলে, উৎসবে। হাওয়ায় পুজো পুজো গন্ধ এলেই দেখতাম বিকেলের আকাশ একটু একটু করে ভরে উঠছে রঙিন ঘুড়িতে। পাখিদের সমস্যা হচ্ছে। শূন্যে বেড়ে যাচ্ছে ভিড়। সাইকেল থামিয়ে, গাড়ির ধাক্কা খেতে খেতে, বুড়ি ঠাকুমাকে ফেলে দিতে দিতে ছুটে যেত হল্লাবাজ বালকের দল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে গেলে বাড়ি ফিরে আসতাম। তখনও জানলা দিয়ে আকাশে দেখি দিনাবসান মেঘে মেঘে ভেসে যাচ্ছে অবোধ কোলাহল। ছাদে ঘুড়ি পড়লে আমি খুব আনন্দ করে কুড়িয়ে নিতাম। একটা পাটকাঠি কিংবা কাঠের টুকরোয় অনেকক্ষণ ধরে জড়িয়ে নিতাম কাটা সুতো। তারপর একসম বাবাই বা গুলুকে ডেকে দিয়ে দিতাম ঘুড়িটা। সেই সব ঘুড়ি ওড়াতে না-পারার দিনগুলো ফিরে ফিরে আসে। দুঃখ ছিল ঠিকই, কিন্তু কোনো হাহাকার ছিল না মোটেও। আমি ঘুড়ি ওড়াতে পারতাম না, কিন্তু রোজ বিকেলে দেখতাম মাথার ওপর দোল খাচ্ছে বন্ধুদের ঘুড়ি। ওদের জাদুকর মনে হতো। আর যাদের চিনি না একেবারেই, ওই ঘুড়ির সূত্রে তাদের সঙ্গেও অল্প পরিচয় হয়ে যেত। ভাইকে যখন বলতাম, দ্যাখ্‌ দ্যাখ্‌ শতরঞ্চিটা চুপিচুপি বাড়ছে ... লাল চৌখুপিটাকে শিওর এ্যাটাক্‌ করবে ... তখন ঘুড়ির ওই অতর্কিত স্বভাবের কথা বলে আসলে তো চিহ্নিত করতাম লাটাই হাতে তার চালকটিকেই। তারই নাম হয়ে যেত শতরঞ্চি বা লাল চৌখুপি। নিজের অজান্তেই কারো একটা পক্ষ নিয়ে নিতাম। আমার খুব ভালো লাগত ময়ূরপঙ্খী ঘুড়ি। মনে হত আকাশের কেউ যেন তাকে আঘাত না করে। সে নিজের মতো উড়ুক। উড়তে উড়তে আকাশের বুকে বিভোর হয়ে থাকুক একচিলতে ধূপছায়া রঙ। কোনো ময়ূরপঙ্খীকে দেখে কেউ “দেড়ি দেড়ি” বললেই, আমি চাইতাম ময়ূরপঙ্খী নেমে যাক। সরে যাক আরও দূরে। তবু একেকদিন দেখতাম শেষ বিকেলের মায়ালোকে ভাসতে ভাসতে চলেছে একটা ময়ূরপঙ্খী। আমি ওর জন্য লোভ করিনি। ওকে ভাসতে দিয়েছি। আপনমনে ভাসতে ভাসতে চলে যাওয়া সেই ময়ূরপঙ্খীকে মনে পড়ে। আজ বুঝি সে গিয়ে পৌঁছেছে আমার অকালমৃত বন্ধুদের দেশে। চন্দনামাসি নাকি ছেলেবেলায় পাড়ার ছেলেবন্ধুদের সঙ্গে জুটে ঘুড়ি ওড়াত! ও-ই আমাকে নানান ঘুড়ি চিনিয়ে দিয়েছিল। আমি ওড়াতে পারি না জেনেও, ওদের ছাদে ঘুড়ি এসে পড়লে, আমার জন্য রেখে দিত। ঘুড়ি ধরতে গিয়ে বেপাড়ার একটা ছেলেকে ভালো লেগে গিয়েছিল ওর। সেই ভালোলাগা বহুদিন ছিল। কিন্তু বলতে পারেনি। সৎমা জানতে পারলে মেরে গায়ের চামড়া তুলে নিত। চন্দনামাসি বলেছিল, আজও আকাশে ঘুড়ি দেখলে সেই ছেলেটার কথা মনে পড়ে। এওতদিনে তার নিশ্চয়ই ঘরসংসার, ছেলেপুলে হয়ে গেছে... আকাশের দিকে চেয়ে থাকা চিরআইবুড়ো চন্দনামাসির দুঃখী অথচ প্রসন্ন সেই মুখখানা মনে পড়ে। আসলে ঘুড়ি-ওড়ার দিনগুলোয়, শরতকালের মেঘময় দিনগুলোয় আকাশে আকাশে ছড়িয়ে থাকে বন্ধুত্ব। আমার মতো মানুষদের জন্য নিঃশব্দ সখ্যতা। আর থাকে এক মায়ামাখানো স্বাধীনতা। মনে পড়ে কোজাগরীর আলোয় ভরে ওঠা আকাশ। কী অপরূপ সেই রাত্রিকাল, কী স্পর্শকাতর তার বিস্তার! সেইসব রাত্রির কাছে দাঁড়িয়ে নিজেকে কাঙাল মনে হত। কিছুতেই যেন প্রকাশ করতে পারছি না তাকে। বাড়িতে বাড়িতে পুজো হচ্ছে। আর ব্যক্তিগত সব প্রদীপের আলো একটু একটু করে মিশে যাচ্ছে জ্যোৎস্নায়। জ্যোৎস্না আমার এক পিসির নাম। লোকের বাড়ি বাড়ি ডিউটি করে। হপ্তায় হপ্তায় টাকা এনে তুলে দেয় ভাইয়ের হাতে। আর রাত্তিরে মাতাল হয়ে ফিরলে ভাই পিসিকে ধরে মারে। জ্যোৎস্নাপিসি চুপ করে থাকে। লুকিয়ে টাকা জমায়। ছোট্ট ভাইঝিটার জন্য রূপোর দুখানা নুপূর গড়িয়ে দেয়। আকাশভরা চন্দ্রালোক দেখে জ্যোৎস্নাপিসির কথা মনে পরে। মনে হয় তার হাত থেকে রূপোর নুপূর চুরি করে গলিয়ে কে ঢেলে দিয়েছে আকাশে। অনাদি অনন্ত ওই প্রবাহের মধ্যে আজ বিরাজ করছে পিসি। কোনো অনাদর কোনো আঘাত আর স্পর্শ করতে পারছে না তাকে। লক্ষ্মীপুজো পেরোলেই হাওয়ায় বাজিমশলার গন্ধভাসে। দিকে দিকে জন্ম নেয় হাজার হাজার শাদা মোমবাতি। বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে বসে চিলেকোঠার বাজি তৈরির ঘরটার কথা মনে পড়ে। একটাই ছোটো বাটখারা ছিল আমাদের। তাই অনেকগুলো ভারী পাঁচটাকার কয়েনকে ওজন করে বাটখারার মতো ব্যবহার করতাম। আর সুবিধাও হত। অর্ধেক ওজনের কিছু লাগলে, পাল্লা থেকে গুনে গুনে কমিয়ে দিতাম অর্ধেক কয়েন। কালীপুজোর দিন রাত্তিরেই একবার দেখা গেল মশলা লেগে লেগে ওই কয়েনের ওপরগুলো ক্ষয়ে গেছে। আর চলবে না সেগুলো। ভয়ে বাবাকে বলিনি সে কথা। বাবার হাতে একটা ঘরে বানানো রঙমশাল ধরিয়ে দিয়েছিলাম। বাবা শিশুর মতো ঘোরাচ্ছিল। আর দূরান্ত অবধি চলে যাওয়া সেই আলোয় খুব খুশি হয়ে উঠছিলাম আমরা ভাইবোনেরা। তার পর মাকে বললাম গিয়ে বাবার সঙ্গে হাত লাগাতে। ‘এই বুড়ো বয়সে ... তোদের যত সব ...’ বলতে বলতে মা কথা শুনেছিল। সেইদিন রঙমশালটা শেষ হচ্ছিল না কিছুতেই। আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের আকাশবন্ধুত্ব বুঝি ওর ভেতর ঢুকে পড়েছিল এক অনিঃশেষ প্রাণ হয়ে। আজ খুশি খুশি সেই মুখগুলো বড়ো মনে পড়ে। মণি বলছিল, দাদা ছবি তোলো ... ছবি তুলে রাখো ... শীতের মুখে তখন ঠান্ডা পড়ছে অল্প অল্প। ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে আছে চারধার। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে বাজির আওয়াজ। উৎসবের পরিব্যাপ্ত সেই চরাচরে আমাদের আনন্দিত বাড়িটার ছবি নিশ্চয়ই এঁকে রেখেছিল কেউ। সে কি কাল? সে কি অদৃশ্য বন্ধুজন কোনো? এখনও আমাদের দেশে অন্ধকার পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে আছে রাধাচূড়া। তার গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছি “আমি”। আমার অসমাপ্ত সব “খেলা”ধূলা। কোনো অলৌকিক উল্কাপাতে আমার অস্তিত্ব থেকে ভেঙে আলগা হয়ে গেছে আমার মন। বারবার সে ফিরে যাচ্ছে শ্যামসবুজ সেই ছোট্ট মফস্বলে, শরতশিশিরে ভিজে থাকা লক্ষ্মীর পদচিহ্নময় অলিতে গলিতে ...

আজও কোনো হিমশীতল অন্ধকার নেমে এলে ওপরে চেয়ে দেখি দীপাবলির আশ্চর্য আকাশ হয়ে আমার মাথার ওপর জ্বলে যায় বাবা আর মায়ের শাশ্বত যৌবন ...

শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

ব্যক্তিগত গদ্য - মধুছন্দা পাল

বিয়ে, আমাদের বাড়ীর
মধুছন্দা পাল

প্রায় প্রত্যেক বছর আমাদের বাড়ীতে একটা তো বটেই কখনও কখনও দুটো বিয়েও লাগতো । বাড়ীর দাদা দিদিদের ছাড়াও জ্যাঠতুত দিদির মেয়েদের বিয়েও আমাদের বাড়ী থেকে হতে দেখেছি ।

রান্না ঘরের ঠিক পাশেই একটা ঘর ছিল আমরা সেটাকে বড় ঘর বলতাম ।রান্নাঘর আর বড় ঘরের মাঝখানে একটা দরজা নিরামিষ উনুন ঘেঁষে । পিসিমা নিরামিষ উনুনে দুধ জ্বাল দিয়ে বড় ঘরের চৌকাঠের ওপারে রাখা বাটিতে বাটিতে ঢেলে রাখতো । কি ছিলনা ঐ ঘরে ! গৃহস্থের সাংসারিক প্রয়োজনের সব জিনিষ পত্র রাখার ব্যবস্থা ছিল ওখানে । আমাদের জমি থেকে আসা চাল ভর্তি বস্তা,একটার ওপর একটা উঁচু করে সাজিয়ে রাখা মাচার ওপর। উঁচুতে ঝোলান কাঠের শক্ত পোক্ত চার কোনে চারটে লোহার শেকল দিয়ে ঝোলান মাচায় বাড়ীর সমস্ত লেপ কম্বল । শীতের শেষে তুলে রাখা । , বড় একটা চৌকির ওপর বড় থেকে ছোট করে সাজানো খান দশেক শিল নোড়া , নানা মাপের লোহার হামানদিস্তা । আরও নানা রকম বাসন পত্র , পাথরের বাসনের সেট , আর চৌকির নীচে গরমকালে বস্তার ওপর সাজানো শ’দরে কেনা আম , উঁচু স্ট্যান্ডের ওপর সারি সারি খাবার জলের কলসি । ঐ ঘরের একটা খোপ মতো জায়গায় থাকতো ছোটকাকীমার বেলা দশটার স্পেশাল চায়ের সরঞ্জাম আর থাকতো পিসিমার খই ভাজার পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া বালি ভর্তি কড়া আর একটা নারকোল কাঠির ছোট ঝাঁটা । ,আর ।যা থাকতো সেটাকে বলা হত যজ্ঞির বাসন ।

সে সময় মনে হয় এখনকার মতো বাসন ভাড়া পাওয়া যেতনা । তাই বাড়ীতেই এই সমস্ত বাসনের ব্যবস্থা থাকতো । তবে আমাদের বাড়ী থেকে বাঙ্গালী প্রতীবেশীদেরও অনুষ্ঠানের জন্যে বাসন নিয়ে যেতে দেখেছি ।

কি কি বাসন ছিল একটু মনে করি । যতদুর মনে পড়ে বিশাল বিশাল কালো রঙের কড়া , হাঁড়ী , হাতা ঝাঁজরি , ডেকচি, নৌকো , বিরাট বড় বড় বারকোশ । আরও হয়তো কিছু ছিল । পেতলের বড় বড় গামলা । বঁটি বেশ অনেক গুলো । পরিবেশনের করার জন্যে ছোট বালতি , হাতা চামচ জল দেওয়ার জন্যে পেতলের জলের জগ।

বিয়ের আগে সে সমস্ত নামানো হতো । বেশ কিছুদিন ধরে চলত মাজাঘষার পর্ব । বাসনের ঘড়াম ঘড়াম আওয়াজেই মনে হতো শুরু হয়ে গেল বিয়ে বাড়ী।

কার বিয়ে কি বৃত্তান্ত অত কিছু নিয়ে মাথা ঘামায় কে? বাড়ীতে কতো লোকজন আসতো । কতো ছোট বাচ্চা । সেই আনন্দেই মশগুল । একটাকে ট্যাঁকে নিয়ে সারা বাড়ী চষে বেড়াতে পারলে আর কি চাই ! একবার মনে আছে , কার বিয়ে মনে নেই বড় বউদির এক বান্ধবী এসেছে বিয়ে উপলক্ষে । মনে হয় গায়ে হলুদের সময় । দিনের বেলা ।, কোলে একটা ছোট্ট বেশ মোটাসোটা মেয়ে । আমি ওকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি হঠাত বাচ্চাটা কিলবিল করে উঠলো আর আমার কোল থেকে সোজা মাটিতে থপাস করে পড়ে গেল । সত্যি করেই আওয়াজ হোল , থপাস । একটু দুরেই মেয়ের মা এবং আরও অনেকে । বাচ্চাটা একটু কান্না কাটি করলো ,ওর মা এসে কোলে নিলো । আমায় অবশ্য কেউই তেমন কিছু বললোনা ।

বিয়ের সময় আমাদের পুরনবাড়ী নতুন করে সাজত । দরকার বুঝে রঙ করানো হতো । বিয়ের দিন থামে থামে রঙিন কাপড় জড়িয়ে দেওয়া হত নানা রঙের । আলো লাগানো হতো । আমাদের সেই বাড়ীকে যেন চিনতেই পারা যেতনা ।

কতো যে লোকজন আসতো বাইরের শহর থেকে । একেকটা ঘরে মেঝেতে টানা বিছানা হতো ।পছন্দমতো সঙ্গী বেছে তার পাশে শুয়ে বকবক করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়তাম । কলকাতা থেকে যেতো জ্যাঠামনির ছোট মেয়ে জামুদি । তার দুই মেয়ে প্রায় আমারই বয়সী । এইরকম আরও ছিল কেউকেউ

।আমরা কতো যে দৌরাত্ম করতাম । হাজার বার একতলা তিনতলা করতাম । পড়তাম , কেটে যেত , ছড়ে যেত । থুতনি কাটা তো স্বাভাবিক ঘটনা ছিল । খুব বকুনি খেয়েছি বলে মনে পড়েনা ।

আমাদের বড়দি মানে সবচেয়ে বড় জ্যেঠতুত দিদি যেত কলকাতার কাছাকাছি কোন ছোট শহর থেকে । কয়েকটি ছেলে মেয়ে থাকতো সঙ্গে । একবার কারো বিয়ের দুদিন পর যে যেখানে পেরেছে দুপুরে ঘুমিয়ে ক্লান্তি কাটাচ্ছে বা গল্প গাছা করছে । আর আমরা নেচে বেড়াচ্ছি সারা বাড়ী । বড়দির এক মেয়ে একটা পছন্দসই জায়গায় কষে ঘুম লাগিয়েছে । সেই সুযোগে কেউ একজন তার সারা মুখে আলতা দিয়ে এঁকেছে দাড়ি গোঁফ । সে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এলে সবাই ওকে দেখে হাসাহাসি করলেও বেচারা কিছুই বোঝেনি , একটু অবাক হলেও সকলের সঙ্গে হাসছে , কিছু বুঝতে না পেরে ।

শেষে অনেকপরে কেউ ওকে টেনে আয়নার সামনে গিয়ে হাসির কারণ দেখিয়ে দিল , বেচারি আমাদের জ্যাঠাইমার কোলে মুখ গুঁজে “ও দিদা , তুমি কেন কিছু বললেনা ।” বলে খানিকটা কেঁদে নিল । এই রকম ঘটনা আরও ঘটতো ।

সবসময়ই বিয়ে হয়েছে অন্য শহরের ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে । অন্য শহর থেকে বর এসে উঠত ধরমশালায় । ভাগলপুরে ভালো হোটেল তখনও হয়নি মনে হয় । ধর্মশালা বললে যেমন শোনায় ঠিক তেমন ছিলনা সেগুলো । সেসময় পূন্যকামী মাড়োয়াড়িরা অনেকেই পূর্বপুরুষের স্মৃতিতে একটা করে ধর্মশালা স্থাপন করতেন । অনেক জায়গা নিয়ে । বড় বড় ঘর , বাগান , ইত্যাদি নিয়ে দুতলা বাড়ী । আমাদের পাড়াতেও ছিল তেমন গোটা দুয়েক । খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা নিজেদের করতে হতো । তো বরযাত্রীদের সেখানে ওঠানো হতো । বাকি আদর আপ্যায়ন বাড়ী থেকে করা হতো । লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে মহিলারা সে সময় বরযাত্রির সঙ্গে আসতেননা মনে হয় । তাঁদের কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছেনা ।

বিয়ের বেশ কদিন আগে বসতো মিষ্টির ভিয়েন । রান্নাঘরের সামনের উঠোনে । এমনিতেই আমাদের গৃহদেবতা গোপালের মিষ্টি তৈরি হতো বাড়ীতে । সন্দেশ , রসগোল্লা , পান্তুয়া । আমাদের বাড়ীর তৈরি মিষ্টির নাম ডাক ছিল । কাজেই বিয়ের মিষ্টিও হতো খুবই উপাদেয় । বোঁদে হতো মনে আছে । বিয়ের সময় আমরা দইয়ে বোঁদে দিয়ে খেতাম । , মাটীর খুরিতে জমাট টক দই তার ওপর রসে টুপটুপে বোঁদে , আহা ! কি স্বাদ তার । মিষ্টির ভিয়েনের পর হতো যজ্ঞির রান্না । যখন মাছ ভাজা হত দাদারা মাছ ভাজা চুরি করে ওপর নিয়ে গিয়ে সবাই মিলে খেত । কদিন ধরে একতলার বারান্দায় লম্বা দুটো সারিতে আমরা খেতে বসতাম । বিয়ে কিম্বা বৌভাতের সময় তিনতলার ছাদে খাওয়া হতো । তখনও টেবিল চেয়ারে বসে খাওয়ার চলন হয়নি বিয়েবাড়ীতে । মাটিতে বসে শালপাতায় খাওয়ার ব্যবস্থা হতো। কলকাতার মতো কলাপাতায় নয় । শালপাতা আর মাটীর খুরি ,গ্লাস । কি যে খাওয়া হত সব মনে নেই । খুব সুন্দর পাঁঠার মাংস হতো মনে আছে । পরদিন সকালে আমরা বাসি লুচি দিয়ে পাঁঠার মাংস খেতাম জলখাবারে আর বোঁদে । আর একটা বিশেষ পদের কথা অনেকেই মনে করতে পারবেন , সেটা হোল “ছ্যাঁচড়া” । মাছের কাঁটা তেল ইত্যাদি আর শাক পাতা দিয়ে তৈরী। নাম শুনে যতই নাক সিঁটকান হোকনা কেন ঐ রকম স্বাদু চচ্চড়ি আর খেয়েছি বলে মনে হয়না । তবে এই পদটা হতো “ঘর যোগে” অর্থাৎ বাড়ীর লোকজনের খাওয়া দাওয়ার সময় ।

বাড়ীর ছেলেরা পরিবেশন করতো । কোমরে তোয়ালে অথবা গামছা জড়ানো পরিবেশকদের নিশ্চয়ই মনে আছে , অনেকেরই ! লুচির ঝোড়া হাতে “ লুচি, লুচি” বলতে বটে যাওয়া । মাছ কিংবা মাংসের বালতি হাতে আর একটুকরো মাছ অথবা মাংস বা মিষ্টি নেওয়ার জন্যে পেড়াপিড়ি । সেসব কোথায় আজ চলে গেছে । আমরা ছোটরা নুন লেবু আর জল দেওয়ার অনুমতি পেয়ে ধন্য হয়ে যেতাম । আর একটা কাজ করতাম মনে আছে । গোছা গোছা শালপাতা ধুয়ে ঠাকুরঘরের বারান্দায় রাখা থাকতো । আমাদের কখনও কখনও পরিস্কার কাপড় দিয়ে সেই শালপাতা মুছে রাখতে বলা হত ।

ছেলেদের বিয়ে হলে বউ আসতো সাধারনতঃ সকালের ট্রেনে ।সন্ধ্যেবেলা একটা মহিলা মহলের ঘরোয়া আড্ডা বসতো । সেখান নতুন বৌকে ঘিরে বসতো বাড়ীর আর প্রতিবেশী মহিলারা ।

প্রধানত নতুন বউয়ের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করার জন্যেই। নতুনবৌকে দিয়ে গান গাওয়ানো হতো । এ ছাড়া আর যার যা গুন আছে সে তাই প্রকাশ করতো । সে এক কাণ্ড ।আমি আর আমার উনিশদিনের ছোট জ্যাঠতুত বোন একদম সামনে গিয়ে বসতাম । আগে থেকেই জানতাম গান শুনে হাসি পাবে । জানিনা কেন এমন মনে হতো । সত্যি করেই হাসি পেত । হাসি চাপার জন্যে নানারকম দুঃখের ঘটনা মনে করার চেষ্টা করতাম ( পরশুরামের বিরিঞ্চিবাবা মনে পড়ছে তো ?) কিছুতেই কিছু হতোনা ।শেষ পর্যন্ত উঠে পড়তাম । আর এই রকম অসভ্যতা করার জন্যে বড় দিদিদের কাছে বকুনিও খেতাম ।

এটা আমার শোনা ঘটনা - আমাদের লালুদা আমাদের বাড়ীর বড় ছেলে । তার জন্যে মেয়ে দেখতে যাওয়া হয়েছে বিহার আর বাংলার সীমানার কোন শহরে । প্রথম ছেলের বিয়ে বলে কথা ! জ্যাঠা, কাকারা প্রায় সবাই গেছে ।সঙ্গে আমার দাদা । বেশ ছোট তখন । বড় বড় চেহারার পেছনে চাপা পড়ে গেছে প্রায় । মিষ্টিমুখ করার সময় দাদাকে আর কারো চোখেই পড়েনি । আমাদের হবু বৌদির ছাড়া । সে কাউকে দিয়ে ছোট্ট দেওরটিকে বাড়ীর ভেতরে ডেকে নিয়ে গিয়ে খাবার খাইয়েছে একটা হাঁড়ীর ঢাকায় করে ! মনে হয় রেকাবি কম পড়েছিল । পরে দাদা বড় হয়ে বউদিকে এই নিয়ে ঠাট্টা করতো আর বৌদি বলতো “তুই আবার কথা বলছিস ? খাওয়া তো হতই না , আমি না দেখলে । মুখচোরা কোথাকার ।”

এমনি করেই আনন্দ করে শেষ হতো বিয়ের দিন গুলো । অষ্টমঙ্গলার পর একএক করে ফিরে যেতো যারা যারা এসেছিল । বাসনপত্র উঠে যেত তাদের যায়গায় । আবার সেই আগের রুটিন । কিছুদিন খুব মন খারাপ লাগতো । আবার সব আগের জায়গায় ফিরে যেত। আমরাও ।

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১২

শৌনক দত্ত তনু





শৌনক দত্ত তনু

বর্ষা ফিরে গেলে কাশফুলে লেগে থাকে শ্রাবণের দাগ। কাশফুল কথা বলে। কবিতা লেখে। সমালোচনা করে। কাশফুল আপন পর চেনে না। রাজনীতি বোঝে না। গোষ্ঠী কিংবা দলবাজী করে না। হেঁটে যেতে যেতে স্কুল পালানো ছেলেটা কাশের পাশে বসে গল্প করে প্রথম সিগারেটের ধোঁয়া নিয়ে কাশতে থাকে।কাশফুল হাসে,চিকচিকে বালু উত্তাপ ছড়ায় কাশফুল কথা বলে নদী কবিতা লেখায়।উড়ে যাওয়া পাখি দেখে ছেলেটি পাখি হতে চায়।মেঘেরা উড়ে যায়।স্কুলপালানো ছেলেটি কাশফুল স্কুলে নদী মেঘ আর পাখিদের ক্লাশ করে।বখে যাওয়া সময়ে ভাষার জন্য রক্ত ঝরে পড়লে রাজপথে ছেলেটি প্রথম কাশের কথা আর নদীর কবিতায় নিজের কথা জুড়ে দেয়।গাছেদের বাহবা দেয় পাখিরা ছেলেটির কথা ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যায়।মেঘেরা কবিতা বলে ছায়া ফেললে কাশফুল ছেলেটির নাম রাখে কবি।ছেলেটির নাম এখন কবি।মুক্তির জন্য যুদ্ধ এলে কবি কবিতা লেখে।নদীর বুকে কবিতারা রক্তে ভেসে যায় পূর্ব থেকে পশ্চিমে।দেশান্তরী হয় মেঘ পাখি আর কাশফুল।কবি কাশফুলের পাশে দেখে কাঁটাতার।নদীর বুকে শূন্যতার চর।সময়ের ক্যালেন্ডার থেকে টুপ টুপ করে ঝরে পড়া এক একটি বছর,শতাব্দীর চাকায় ছুটে আসা অর্ধপাক নগরীর নৈঃশব্দিক আস্তরণকে উন্মোচন করে দেয়।

নিস্তব্ধতার চাদর সরিয়ে যানজট,জনবহুলতা,ইট কংক্রিটের খাঁচাবদ্ধ নগরী ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে জেগে ওঠে নিঃসীম নাগরিক ব্যস্ততায়।ঝকঝকে কাঁটা তারে জঙ লাগে।কাশফুলের নাম দেয়া সেই স্কুলপালানো কবি ছেলেটি বাংলা সাহিত্যচর্চার দুটি কেন্দ্রে ভাগ হয়ে যায় কলকাতা আর ঢাকা।কাঁটা তারের এপারের কবি কাঁটা তারের ওপারের কবি এক টা কাশফুল,নদী,মেঘ,পাখিরা জানে কিন্তু সাহিত্য কখনোই অভিন্ন বাংলা সাহিত্য হয়ে উঠতে পারেনি।হাওয়ায় দুলে দুলে ওঠে ছোট্ট প্রশ্ন।প্রশ্ন গভীর হয়ে ওঠে।ত্রিপুরা,আসাম,জেলা,গ্রাম দূরে সরে যেতে থাকে আর কবি ছেলেটির ছায়া পড়তে থাকে বাংলাভাষা ও মননে।কবি আকাশ দেখে আকাশ কি নীল কার্টিসপেপার নাকি ঈশ্বরের বেডকভার?ঈশ্বরের সাথে কথোপকথনে কবি ছেলেটি ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে ওঠে আকাশ তার নাম রাখে সাহিত্যিক।বয়স বাড়লে প্রশ্ন বাড়ে।গভীর প্রশ্ন।সাহিত্যিক আয়না দেখে ছায়ার সাথে কথা বলে বাংলাদেশ বাংলা ভাষার প্রধান লেখকদের স্মরণে বিশেষ ক্রোড়পত্র,অনুষ্ঠান,ছোটোকাগজগুলো বিশেষ সংখ্যা করে পশ্চিম বাংলায় তেমনটি ঘটে না কেন?তাহলে কি দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্য সম্পূর্ণ দ্বিখন্ডিত হয়ে গেছে?ছায়া কথা বলে বাঙালি মুসলমানরা বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলাসাহিত্যচর্চায় অবতীর্ণ হন।বাঙালী মুসলমানরা তাই একই সময়ে হিন্দু লেখকদের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায় এগিয়ে আসেননি,বাংলা সাহিত্যও শুরুর দিকে দুই ধর্ম সম্প্রদায়ের অভিন্ন সাহিত্য হয়ে উঠতে পারেনি।এরপর যখন দেশভাগ হলো তখনো বাঙালি হিন্দু লেখকদের তুলনায় বাঙালি মুসলমানদের রচিত সাহিত্য পরিমানগত দিক থেকে ছিল কম আর মানের দিক থেকে নিচু।
কাশফুলের কবি আর আকাশের সাহিত্যিক আয়না থেকে সরে আসে।ঈশ্বরকে ডেকে আনে চায়ের আড্ডায়।ঈশ্বর কিছু বই উপহার দিয়ে যায় অতীতের কবি বর্তমানের সাহিত্যিককে।ঈশ্বরের সাথে ভররাত আড্ডা মেরে ছোটো,ছোটো প্রশ্নগুলো গভীর হয়ে ওঠে।ঈশ্বর ফিরে গেলে গভীরতর হয়।ঐদিকে নদী শুকায়।পাখিরা হারায়।কাশফুল জঙ্‌ধরা কাঁটাতারে বেঁচে থাকে।কাশফুলের কদিন হলো শ্বাসকষ্ট ধরা পড়েছে।আগের মতো কথা বলতে কষ্ট হয়।মেঘ আসে ,ঈশ্বরের দেয়া বইগুলো থেকে তুলে নেয় প্রাজ্ঞ সাহিত্য ইতিহাসবিদ সুকুমার সেনের বইটি ।কবিকে পড়ে শোনায় ,সাহিত্যিক সেই ছেলেবেলার মতো শোনে।মেঘ পড়া শেষ করে প্রশ্ন করে কি বুঝলে কবি?সাহিত্যিক হেসে বলে কবি তো আমার ডাক নাম গো এখন আমি বড়ো হয়েছি আমার নাম সাহিত্যিক।মেঘ ও হাসে।আচ্ছা সাহিত্যিক বলো কি বুঝলে তুমি?
সাহিত্যিক গম্ভীর হয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে একরাশ শূন্যতা নিয়ে বলল বাংলাদেশের মুসলমান লেখকদের রচিত সাহিত্যকে বাঙালী হিন্দু সমালোচকরা কখনোই মূল বাংলা সাহিত্য বলে মনে করেননি।সুকুমার বাবু তাই এসময়ের মুসলমান রচিত বাংলা সাহিত্যকে 'এছলামি' বাংলা সাহিত্য বলে আখ্যায়িত করেছেন।সাহিত্যিকের আয়নার ছায়া যা বলেছিল তা মনে পড়ে এবং তখন তার মনে হয় বাংলা সাহিত্য তখন থেকেই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।দেশভাগ এ বিভক্তিকে দিয়েছে কেবল রাজনৈতিক বৈধতা।কবিবেলা মনে পড়ে তার।নিজের বিভক্তির কান্না চেপে সে নদীর কাছে যায়।নদী এখন ধীর বয়সের পলিতে।তাকে দেখে নদী প্রসন্ন চোখ মেলে।কি সাহিত্যিক কেমন আছো?আমাকে তুমি কবি বলো।নদী মুচকি হাসে কবি তো তোমার ছোট্টবেলার নাম এখন তুমি সাহিত্যিক।আচ্ছা বেশ আমাকে তুমি বাংলা সাহিত্যের কথা বলো।নদী নড়ে বসে।এই যে আমি,এই যে তুমি,ঐ যে কাশ,নীলাকাশ,মেঘ পাখি গাছ আমরা সবাই সাহিত্য কিন্তু তফাত কোথায় জানো আমাদের অর্ধেক আছে পশ্চিম দিকে অর্ধেক পূর্বদিকে,মাঝে শুধু কাঁটাতার নয়ত আমরা এক।একটা কথা তো অনস্বীকার্য,নতুন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য একটি একক রাষ্ট্রের জাতীয় সাহিত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে।এটাই হচ্ছে সমকালীন রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতা।এখানে উল্লেখ যোগ্য কি জানো গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ উপনিবেশ কবলমুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।তাই ওই সময় জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রয়োজনে দেখা দেয় জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা।তোমার মনে নেই বাহান্নতে তুমি কবি হয়েছিলে!ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এ প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটে।একাত্তরে আরও বিকশিত হয় নব্বইয়ে হয়ে ওঠে দূর্বার এ প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত আছে।তোমার নিশ্চয় কিউবার স্বাধীনতা আন্দোলনের কবি হোসে মার্তির কথা মনে আছে।যিনি বলেছিলেন সন্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে সাহায্য করে,রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতি সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত হয়।মার্তির এ ভাবনার প্রেক্ষাপটে বলা যায় বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে এর সাহিত্যও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।অন্যদিকে পশ্চিম বাংলায় বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছে ভিন্ন এক আর্থসামাজিক রাজনৈতিক পটভূমিতে।ফলে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য বাংলাদেশের সাহিত্য থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে গেছে।ঠিক তেমনে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দূরে থেকে গেছে আসাম,ত্রিপুরা।তবে কি জানো কবি একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষ যেখানে একটা জাতি হয়ে উঠলো সেখানে হয়তো ইচ্ছুক শিকার কিংবা অজান্তে পশ্চিম বাংলা হয়ে উঠলো সর্বভারতীয় সভ্যতার মায়াবিনী হাতছানির শিকার।তারা ত্যাগ করল তাদের আত্মপরিচয়,ভারতীয় এক জাতিসত্তার মধ্যে বিলীন হয়ে গেল।

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কী ভারতীয় জাতিসত্তা,কী পাকিস্তানি কোনোটির মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হতে দেয়নি।তারা স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় নিয়ে প্রতিষ্ঠা অর্জন করে।বৃহত্তর বাংলা সাহিত্য এভাবেই প্রথমে পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠন এবং পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে ওঠার সামগ্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পৃথক হয়ে যায়।সমকালীন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সীমান্তের এপার আর ওপারের লেখদের পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে থাকে।একই ভাষায় লেখা হলেও বাংলাদেশের সাহিত্য পশ্চিমবাংলার সাহিত্য থেকে আলাদা হয়ে যায়।তবে রাজনৈতিক বিভাজন যত সহজে তোমার চোখে পড়ে,সাহিত্যের পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্য তত সহজে ধরা পড়ে না।

নদী আর কবির ক্লাসে কখন কাশফুল আর মেঘ গাছ পাখিরা এসে বসে গেছে।কবি কাশের কাছে গিয়ে বসে তার বুকে হাত রেখে কুশল বিনিময় করে।কাশ আলতো করে কবির গাল ছুঁয়ে দিয়ে কপালে চুমু দেয় তারপর ধীর গলায় বলে কিন্তু কবি লক্ষণীয় কি জানো,এ পার্থক্য সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাহিত্যসমালোচক,কবি লেখকরা মনে করেন সমগ্র আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মধ্যেই তাঁদের অবস্থিতি,সৃজনী সাফল্যের দিকটিও তারা এ প্রেক্ষাপটেই বিবেচনা করে থাকেন।আধুনিক বাংলা কবিতা,উপন্যাস,গল্প,নাটক ইত্যাদি সম্পর্কে যখন আলোচনা করা হয়,তখন এ পটভূমির কথা তাঁরা বিস্মৃত হন না।স্বাভাবিকভাবেই বাংলা সাহিত্যের একটা তুলনামূলক ছবি তাঁদের বিশ্লেষণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপস্থিত থাকে।কিন্তু পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সমালোচনায় এ তুলনাসূত্রটি একেবারেই অনুপস্থিত।বাংলাদেশ, ত্রিপুরা,আসাম,জেলা,গ্রামের সাহিত্যকে তারা বিবেচনায় আনেন না বলেই এমনটা ঘটছে।কিন্তু এইসব সাহিত্যিকদের তারা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেন এমনটা কিন্তু মনে হয় না।গত এক দশকে তাকালে দেখবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস,হাসান আজিজুল হকের গল্প ও উপন্যাস,সেলিনা হোসেনের কথাসাহিত্য,তসলিমা নাসরিন,হুমায়ূন আহমেদ,শামসুর রহমান,আল মাহমুদ,আসামের শিলচর থেকে রণজিত্ দাশ,রানাঘাটের জয়গোস্বামী,মুর্শিদাবাদের আবুল বাশার প্রকাশিত হলে এর পরই পশ্চিম বাংলার পাঠকরা বুঝতে পেরেছেন যাদের সামগ্রিকভাবে পশ্চিম বাংলায় মানে কলকাতায় সাহিত্যের প্রকাশনা সেই অর্থে উল্লেখযোগ্য নয়।তাদের সৃষ্টিশীল প্রতিভা কতটা শিখরস্পর্শী ।

প্রজাপতি আর মৌমাছি উড়ে এলো।আরে কবি যে কেমন আছো?কাশফুল একটু শ্বাস নিয়ে বলল তা প্রজাপতি আমাদের একটু দুই বাংলার প্রকাশনা নিয়ে কিছু বলো।তুমি তো বেশ রঙ ছড়িয়ে বেরাচ্ছো।প্রজাপতি কবির দিকে তাকিয়ে বলল কবি বুঝি বই বের করবে?মেঘ বলে আরে না আমরা একটু আলাপ করছি আর কি অনেকদিন তো দেখা নেই।নদী ও সায় দিলো।কবির চোখে তাকিয়ে অনেকদিন পর দেখা হবার একটা রঙ ছড়িয়ে প্রজাপতি বলল দেখো বাংলাদেশে পশ্চিমবাংলার বই যেভাবে বিপনন হয় পশ্চিমবাংলায় তেমনটি হয়না।একে অনেকে উপেক্ষা কিংবা গুরুত্বহীন দৃষ্টিতে দেখে আসলে এখানে ভাবনাটা যতটা আবেগময় বাস্তবের সঙ্গে ততটাই অসংগতিপূর্ণ আসল রহস্য হচ্ছে বানিজ্য এটা বন্ধু মৌমাছি ভালো বলতে পারবে।মৌমাছি চিরকাল সদালাপী বানিজ্য নিয়ে তার পড়াশোনাও অনেক।একগাল হেসে নিয়ে মৌমাছি বলল এই তো বিপদে ফেললে প্রজাপতি বেশ তো বলছিলে এখানে আবার আমাকে ডাকার কি দরকার ছিল তা যখন ডাকলে বলতে তো কিছু হবেই।আমরা জানি বানিজ্য বসতি লক্ষ্মী তাছাড়া পুঁজিবাদের সুত্রে যদি যাই কি দেখবো।কাশফুল শ্বাস নিয়ে বলল ভাই অত্ত থিওরির দরকার নেই সোজাসাপ্টা কথা বলাটা তুমি আজো শিখলে না।মোদ্দা কথাটা বলো।
মৌমাছি একটু হেসে নিয়ে বলল তা যা বলেছো।মোদ্দা কথাটা হচ্ছে সাহিত্যের প্রকাশনা বা যেকোনো প্রকাশনার সবচেয়ে বড়ো দিক হচ্ছে ব্যবসা কিংবা বানিজ্য।এ ব্যবসা বিষয়টি নির্ভর করে পাঠকের রুচি ও উপভোগের চাহিদার গতিপ্রকৃতির ওপর।পশ্চিম বাংলার পাঠকদের কাছে বাংলাদেশের লেখকদের লেখার চাহিদা খুব কম বলেই পশ্চিমবাংলার প্রকাশকরা বাংলাদেশের সাহিত্য প্রকাশে তেমন আগ্রহী হন না।সোজা কথায় প্রকাশকরা ব্যবসা করেন,সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করা তাদের ধর্ম নয়।এই ব্যবসার জন্যই আনন্দ পুরষ্কারের ছায়ায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও হাসান আজিজুল হকের বই প্রকাশ পেয়েছে।বানিজ্যের কথা ভেবেই খোলামেলা মূর্তিভাঙা নারীবাদী আত্মস্মৃতি বা আত্মজৈবনিক রচনার জন্য তসলিমা নাসরিন রয়েছেন প্রকাশনার শীর্ষে।শুধু ব্যবসার জন্য মলয় রায় চৌধুরী,সমরজিত্ সিনহা,মুরারী সিং,পূণ্যশ্লোকদাশগুপ্ত,প্রবুদ্ধ,কিংবা কোচবিহার,জলপাইগুড়ি,মালদার অনেক প্রতিভাকে আমরা তেমনভাবে পাইনি কিংবা অনেক কে আজো পাইনি।কাশফুল তোমার নিশ্চয় মনে আছে 'হাওয়া৪৯'নামের একটি ছোটোকাগজের কথা অধুনান্তিক প্রান্তিক কবিতা সংকলনের কথা!এতে সাব অল্টার্ন ইতিহাসতত্ত্বের অনুসরণে ছাপা হয়েছিল নিন্মবর্গের শ্রেণীভুক্ত কবিদের কবিতা।

বটগাছটি এবার বল শোনো মৌমাছি আমি একটি কথা বলি।প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে যেমন রয়ে গেছেন অনেক উল্লেখযোগ্য প্রতিভা।তেমনি প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ও তাদের প্রাথমিক লক্ষ তবে এটাও স্বীকার্য প্রতিষ্ঠানের সহৃদয় হাতছানি পেলে তাঁদের অনেকেই পৌঁছতে চাইবে বৃহত্তর পাঠকের কাছে।এই ধরো না কবি উত্পলকুমার বসু,রনজিত্ দাশ কিংবা বিনয় মজুমদার যিনি আক্ষেপ করে বলেন তার কাছে কেউ যায় না।কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্ত্তীর কথাই ভাবো কিংবা বাংলাদেশের হরিপদ দত্ত প্রমুখ।সাহিত্যচর্চার বিষয়টি যদি বিবেচনা করি তাহলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পশ্চিম বাংলার চেয়ে অনেক বেশি অনুকূল।

বিকেল গড়িয়ে এলে।বাবুই পাখি চা নিয়ে আসে আড্ডায় একটা বিরতি হয়।চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কথাটা টেনে নেয় পিপঁড়া দেখো বটা দা এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার কেননা বাংলাদেশ হচ্ছে একক ভাষার দেশ আর পশ্চিম বাংলায় বাংলা ভাষা হচ্ছে একটি প্রাদেশিক ভাষা।সর্বভারতীয় ভিত্তিতে হিন্দি আর ইংরেজীর দাপট।ভাষার আধিপত্য নয়,অধিকাংশ ভাষা বাংলা হওয়ায় বাংলাদেশে বাংলায় সাহিত্যচর্চা ও প্রকাশনার দিকটি পশ্চিম বাংলার মতো ততটা জটিল নয়।বাংলাদেশের প্রকাশকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি লেখককে প্রমোট করছে এবং ধীরে ধীরে চোখে পড়ার মতোন একটা পাঠকশ্রেনী গড়ে উঠছে।অন্যদিকে পশ্চিম বাংলা বা বাংলাভাষাভাষী রাজ্যগুলোয় আকাশ সংস্কৃতির জাল এ সাংস্কৃতিক ও ভাষাপ্রতিবেশে বাংলা ভাষার ব্যবহার সংকুচিত হয়ে পড়ছে।কিন্তু এরকম অবস্থায় দাঁড়িয়েও হিন্দি ইংরেজী ও বহু প্রাদেশিক ভাষার চাপে বাংলা সাহিত্যের চর্চা কিন্তু থেমে নেই বরং ক্রমবর্ধিষ্ণু।এর কারণ হতে পারে বাংলাভাষী জনসংখ্যা বৃদ্ধি,শিক্ষা ও পাঠাভ্যাসের হার পশ্চিমবাংলায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি,কিংবা বাংলা সাহিত্য পাঠের প্রতি পশ্চিমবাংলাও অন্য বাংলাভাষার রাজ্যগুলোতে শিক্ষিত বাঙালীদের অনুরাগ অনিঃশেষ বিশেষ করে সৃজনশীল ভালো লেখা হলে তার পাঠকের কোনো অভাব হয়না।এসোব কারণেই প্রকাশনা শিল্প ও লেখকের সংখ্যা পশ্চিমবাংলায় অনেক বেশি।

নীরব শ্রোতার ভূমিকায় থাকা নদী পিপঁড়ার কথার জের টেনে নিয়ে বলে তবে একটা কথা কি জানো পিপিলিকা পশ্চিম বাংলায় লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া খুব কঠিন।কেননা পশ্চিমবাংলায় যারা সাহিত্যচর্চা করে তাদের গভীর আত্মনিবেদন আর নিষ্ঠার সাথে সাহিত্যচর্চা করতে হয়।সাহিত্যশৌখিনতার কোনো সুযোগ সেখানে নেই।রীতিমতো সমগ্র বাংলাসাহিত্য মন্থন করে প্রতিমুহুর্তে নিজেকে আপডেট করে সৃজনী যুদ্ধে নামতে হয়।মন্থনের শেষে বিষ মিলবে না অমৃত তা কিন্তু অধিকাংশের কাছেই অজানা থেকে যায়।আরেকটি ব্যাপার হলো পশ্চিমবাংলার সাহিত্যিকগন কে সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটকে মানসপটে ছায়ার মতো রাখতে হয় ফলে তাদের দৃষ্টিকে রাখতে হয় প্রসারিত প্রাদেশিক হয়েও সর্বভারতীয় ফলে সাহিত্যে অনেক গভীর বিষয় ভাবনা যেমন উঠে আসার সম্ভাবনা থাকে তেমনি থাকে বহুভাষা বহুসাহিত্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।বাংলাদেশে সাহিত্যচর্চার পরিবেশটি তুলনামূলকভাবে তাই সহজ।বাংলাদেশ পশ্চিমবাংলার মতো আনন্দবাজার,উত্তরবঙ্গসংবাদ,প্রতিদিন,আজকাল কেন্দ্রিক নয় সেখানে প্রচুর দৈনিক পত্রিকা প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ করে।এছাড়া আছে তিনটি মাসিক পত্রিকা।

উত্তরাধিকার নামের মাসিক পত্রিকাটি প্রকাশ করে বাংলা একাডেমী আর কালি ও কলম এবং নতুন ধারা যার পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে বড়ো দুটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান।এছাড়া নতুন লেখকদের আত্মপ্রকাশের জন্য আছে প্রধান কেন্দ্র ছোটোকাগজগুলো।এই দিকে পশ্চিমবাংলা অনেকটা পিছনে।বাংলাদেশের চনমনে লেখকরা একটু নিষ্ঠার সাথে লেগে থাকলে তারা প্রকৃত পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণে খুব দ্রুত সমর্থ হন।এছাড়া সাহিত্যচর্চার বিকেন্দ্রিকতা ছোটো ছোটো প্রান্তিক শহর থেকে নতুন কবি গল্পকার উপন্যাসিক উঠে আসে ঢাকায়।
তবে কি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা,গোষ্ঠীবাদ,দলবাজী নেই বলছো নদী।বটগাছের প্রশ্নে ধনেশ পাখি মুখ খোলে,আছে তবে পশ্চিমবাংলার মতো এতটা নয়।বাংলাদেশেও ঢাকা কেন্দ্রিক একটা সাহিত্যচর্চা আছে কিন্তু তা কলকাতার মতো প্রকট নয়।কেন না বাংলাদেশে ছোটোকাগজগুলোর পাশাপাশি দৈনিকগুলোও একটু ভালো মান ও গুনগত সম্পন্ন হলে তরুন লেখা ছাপায় কার্পন্য করে না।তবে অদৃশ্য একটা গোষ্ঠীবাজী,লেজুড়বৃত্তি যে কাজ করেনা তেমন নয়।তুলনামূলকভাবে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এখনো বাংলাদেশ কিছুটা সমস্যাসংকুল হয়ে আছে।বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকরা তরুন,খ্যাতি অর্জিত নন এমন লেখকের বই ছাপতে চাননা।তাই নিজের টাকা খরচ করে প্রতারনার শিকার হয়ে তরুনদের প্রথম লেখকজীবনটা প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিয়ে বইপ্রকাশ করতে হয়।তারচেয়েও বড়োসংকট পাঠকসংকট আর মননশীল লেখক সংকট।বাংলাদেশে হাতে গোনা দুচারজন ছাড়া আর কারো তেমন পাঠকপ্রিয়তা নেই।ধনেশদা তুমি কি তবে বলছো পশ্চিমবাংলায় প্রকাশকরা তরুনদের ডেকে ডেকে বই ছাপিয়ে দেয়?বাবুইয়ের কথায় ধনেশ পাখি একটু হোঁচট খায়।বাবুই পাখি একটু হেসে বলে সেইদিনই তো শুনলাম সমরজিত্ সিনহার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বইপ্রকাশ করে মোট একশ না তিনশ বইয়ের মাত্র পনেরটি বই দিয়েছে এক প্রকাশক।

বাবুই কথার রেশ টেনে বলে যায় দেখো ধনেশদা এসব ব্যাপারে দুই বাংলাই সমান জায়গায় অবস্থান করছে কিন্তু সাহিত্যবিচার মূলত পরিমাণগত নয়,গুনগত।সেদিক থেকে বিবেচনা যদি করো তবে পশ্চিমবাংলার সাহিত্যচর্চার ইতিহাস দীর্ঘদিনের।অসংখ্য লেখকের সেখানে আবির্ভাব ঘটেছে।তাঁদের লেখার পরিমান যেমন বিপুল,তেমনি বৈচিত্র্য বা পরীক্ষা নিরীক্ষা বিস্ময়কর।একেকজন লেখক আবির্ভূত হয়েছেন একেক বৈশিষ্ট্য নিয়ে,জীবনের বহুকৌনিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছে কবিতা,উপন্যাস,গল্প,নাটক,প্রবন্ধ সাহিত্যের প্রতিটি দিক।সেই তুলনায় বাংলাদেশের সাহিত্য এতটা বহুমুখী নয়,অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ও সীমিত।আমার মনে হয় কারণটা মূলত আর্থসামাজিক।কেন নদীমাসি এমনটা বলছো কেন?দেখ বাবু পশ্চিমবাংলার জনজীবন অনেকটাই নাগরিক।পশ্চিমবাংলার গ্রামীণ জীবনেও লেগেছে নগর সংস্কৃতির ছোঁয়া।জনমানুষের প্রধান অংশটি মধ্যবিত্ত,কলকাতা থেকে শুরু করে ছোটো ছোটো শিল্প শহরে তারা ছড়ানো।গ্রাম্যজীবন বলতে যা বোঝায় পশ্চিমবাংলা থেকে তা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

ভাষাগত দিক থেকে পশ্চিমবাংলার বাংলা সাহিত্য প্রায় নিখুঁত।আবেগ অনুভূতির দিকটিও নাগরিক অর্থাৎ পরিমিত,সুনিয়ন্ত্রিত। ফলে আত্নরতি, নির্বেদ, নিঃসঙ্গচেতনা, মরবিডিটি, বিচ্ছিন্নতার বোধ যেমন প্রকট তেমনি হয়তো ওটাই পশ্চিমবাংলার বাংলাসাহিত্যের শক্তি।
বাংলাদেশের সাহিত্য সেই তুলনায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকাশমান। বাংলাদেশের নাগরিক জীবন বিকাশ তেমনভাবে ঘটেনি বলে নাগরিক পরিশীলন তেমন নেই। অধিকাংশ লেখকের শেকড় যেহেতু গ্রামে ফলে লেখায় তা গ্রামজীবনের সজীব স্পর্শে উজ্জ্বল। নাগরিক জীবন ও বিষয় ভাবনার দিক থেকেও বাংলাদেশের সাহিত্য পশ্চিমবাংলার সাহিত্যের তুলনায় অনেকটাই পৃথক। রাজনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলন,সংগ্রাম ও দেশকাল সম্পৃক্ততা হচ্ছে বাংলাদেশের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য।তাই বাংলাদেশের কবিতায় আবেগের প্রকাশ অবাধ,ভাষা উচ্চকিত কিংবা উঁচু স্বরগ্রামে বাঁধা।অন্যদিকে পশ্চিমবাংলার নাগরিকজীবন নির্বেদ এবং পরিশীলনের কারণে পশ্চিমবাংলার কবিতার স্বরগ্রাম অনেকটা নিচু অথবা অনুচ্চ।

পশ্চিমবাংলার কবি যেন সারাক্ষণ নিজের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে কথা বলেন।ব্যক্তিজীবন যেন ছোটো বৃত্তে আবদ্ধ।রাষ্ট্রীয় উত্থান পতন তাদের তেমন একটা স্পর্শ করে না।শুধু বড়ো ধরনের কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সংস্কার যদি দৈনন্দিন নাগরিক জীবনকে সংকটাপন্ন করে তোলে,তাহলেই কেবল তারা নড়েচড়ে উঠেন।অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় টানাপড়েন ও বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে যেতে হয় বলে বাংলাদেশের সাহিত্য কবিতা অধিকাংশই আদর্শায়িত জীবনবোধে উজ্জ্বীবিত।রাজনৈতিক উত্থান-পতন,রাষ্ট্রসংকট খুব সহজেই তাদের স্পর্শ করে।
সর্বভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে পশ্চিম বাংলার বাংলা সাহিত্য কিছুটা বিলুপ্তীর পথে হাঁটলেও বাংলাদেশ সেই পথে বিকাশমান এবং বাংলাসাহিত্য বাংলাদেশে হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা একেবারই নেই।পশ্চিম বাংলার অনেক লেখককে তাই আজ বাংলাদেশের পাঠকদের মুখাপেক্ষী হতে দেখা যায়।সেদিক থেকে বিবেচনা করলে একক নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও পশ্চিমবাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যকে সাথে নিয়ে আত্মমর্যাদার সাথে বাংলাদেশের সাহিত্য প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলছে বললে ভুল হবে না।বরং বলা যায় বাংলাদেশই হয়ে উঠছে বাংলা সাহিত্যের মূল কেন্দ্র।

অন্ধকার উড়ে এলে।কবি উঠে দাঁড়ায়।কোথাও কোন ছায়া পড়েনা।অন্ধকারে কাঁটাতার ডুবে গেলে পূবের আকাশ রঙ ছড়ায়।গায়েত্রী মন্ত্র আর ফজরের আযান মিলে মিশে গেলে কবি হাঁটতে থাকে।গত চারশত বছরের জাতিগত মানদন্ড ব্যবহার করে সাহিত্যবিচারের বৈশ্বিক প্রবণতা।জাতীয়করণকৃত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচারের খন্ডিত,একচক্ষুবিশিষ্ট অন্ধত্ব পিছে ফেলে।কবির কবিতা নদীর বুকে রেখে কবির কাশফুল ইস্কুলের সবাই মানচিত্রের রঙে মিশে যায় আর কবি আগত ভোরকে প্রত্যক্ষ করতে করতে তারাদের সাথে রাতে কে বুকে নিয়ে উচ্চারণ করে এখন সময় সাহিত্যকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখার,বিচার বিবেচনা করার।বিশ্বমানবের আর্ত,ভঙ্গুর অথচ উজ্জ্বীবিত মুখ যদি আমরা দেখতে চাই তাহলে জাতীয় সাহিত্যের ছোটো বৃত্ত কাঁটাতার কেটে বেরিয়ে ছুঁতে হবে দিগন্ত!দুইবাংলার সমালোচক ও ইতিহাসবিদের দৃষ্টি করতে হবে স্বচ্ছ।শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুতা বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ নয়,দুইবাংলার সাহিত্যিকদের ভাবতে হবে কী করে বাংলা সাহিত্যের সীমানা আরও প্রসারিত করে দেয়া যায়।বৈশ্বিক হয়েও তার শেকড় যেন প্রোথিত থাকে বাংলাভাষার মর্মমূলে।যে জীবন কাশফুল নদীর,যে জীবন প্রজাপতি মেঠোপথের,যে জীবন নগরের সে জীবন যেন মিলেমিশে হয়ে ওঠে সর্বজীবস্পর্শী ও মানবিক।

উড়ে যায় অন্ধকার নতুন একটি দিনের সূর্য আভায়... 




অলংকরণ - অমিত বিশ্বাস মেঘ অদিতি