ভালোবাসি বাংলা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভালোবাসি বাংলা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

ভালোবাসি বাংলা - বঙ্গজীবনে চরিত্রবদল - শ্রী শুভ্র

বঙ্গজীবনে চরিত্রবদল
শ্রী শুভ্র


কোনো একটি জাতিগোষ্ঠির চরিত্র কালের প্রবাহে; সেই জাতিগোষ্ঠির মাতৃভূমির ভৌগলিক অবস্থানের নিরিখে এবং বিশ্বের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির সাথে মেলামেশার প্রবাহে কালে কালে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে! সেটাই স্বাভাবিক! চরিত্রের সেই বিকাশের পর্ব থেকে পর্বান্তরে অনেক ভাঙ্গা গড়ার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে জাতিসত্তা! সেই জাতিসত্তার চরিত্রের বদল কিন্তু দুদিনেই হঠাৎ হয় না! প্রায় দুইহাজার বছরের ইতিহাস ব্যাপী এই যে বঙ্গজীবন এর পরতে পরতে কালের পালে এসে লাগা হাওয়ায় ঘটে গেছে পরিবর্তনের পর পরিবর্তন! কিন্তু সেই পরিবর্তনের ফলে যে বাঙালির চরিত্রের বদল ঘটবেই তা নয়! আবার ঘটলেও তাকে বাস্তব বলে মেনে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত! কাম্য না হলেও!

এক কালে কালাপানি পেরোলে বাঙালির জাত যেত! পুরুত ডাকিয়ে গোবর খেয়ে রীতিমত যাগযোজ্ঞ করে তবেই তার প্রায়শ্চিত্য হতো সম্পূর্ণ! তারপর বাঙালি যখন ইংরেজের বৈভবে দিশাহারা হল, তখন অবস্থা গেল বদলে, সমাজে বিলেত ফেরতের কদর গেল বেড়ে! বিলেত ফেরত না হলে, নামের পাশে বিলাতী ডিগ্রী না ঝুললে পণ্ডিত বলে আর মান্যিগন্যি পাওয়া যায় না সমাজে! কি আশ্চর্যম!ঘরজামাইয়ের যুগ নেই আর! একদিন মান্যিগন্যি ব্যক্তিরা ঘরজামাই রেখে সমাজে ছড়ি ঘোরাতে পারতেন! এযুগে এন আর আই জামাই দেখিয়ে শ্বশুর শ্বাশুরীর গর্বে মাটিতে পা পড়ে না!সংস্কৃত পণ্ডিতদের দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল এককালে! আজ তারা থাকলে করুণার পাত্র!গৃহশিক্ষকের কাজও জোটে না! এও বদল!

রামমোহনের যুগে বঙ্গ সমাজে সহমরণ প্রথার বড়োই মহিমা ছিল! মৃত স্বামীর সাথে জ্যান্ত বৌ পুড়িয়ে ধর্মরক্ষা করা হতো! যুগ পাল্টিয়েছে তবু বৌ পোড়ানো বন্ধ হয়নি! বদলে গেছে ধরণ! সে যুগে মৃতের সম্পত্তি থেকে তার বৌকে বঞ্চিত করার দায় ছিল! এখন বৌকে চাপ দিয়ে তার বাপের বাড়ির সম্পত্তি সম্পদ হাতিয়ে নেবার প্রচলন হয়েছে সমাজের সর্বচ্চো স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্য্যন্ত সর্বত্র! চাহিদা পুরণ না হলেই ভর্তুকির কেরোসিন গায়ে ঢেলে দেশলাই জ্বালিয়ে দিলেই হলো! তাই বলে বৌকে লাই দেওয়া কদাপি নয়! সেযুগে স্বামীর পরিজন বাড়ির বধুকে জ্যান্ত দেহে চিতায় ওঠাতো! এযুগে স্বামী নিজেই মূল উদ্যোগতা হয়ে দেশলাই কেরোসিনের ব্যায় বহনের দায়িত্ব নেন!

সে এক যুগ ছিল, সমাজে শিক্ষককূলের একটা আলাদা সম্মান ছিল! শিক্ষকের গৃহে দারিদ্র ছিল কিন্তু আদর্শের অভাব ছিল না! কালের প্রবাহে শিক্ষককূলের ঘরে আর অভাব নেই! তবে তার সাথে আদর্শও ফাঁকা হয়ে গিয়েছে অলক্ষ্যে! আগে ছাত্রদের মধ্যেই স্কুল ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা ছিল সীমাবদ্ধ! আজ শিক্ষককূলও স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাঁধা মাহিনার সাথে বাড়িতে ছাত্র পড়িয়ে উই টি আই এর নানান স্কীম থেকে শেয়ার বাজারেও ফাটকা খেলছেন নিশ্চিন্তে! মানুষ গড়ার কারিগররা এখন জয়েণ্ট পাশ করাচ্ছেন! বিষয় বস্তুতে ছাত্রদের বিদ্যাদানের বদলে নোটদান করছেন! কোশ্চেন লিকের নতুন নামকরণ হয়েছে শিওর সাজেশানস! সেই দেখেই শিক্ষকের গৃহে অভিভাবকের লম্বা লাইন!

এক সময় শিক্ষকের সম্মান ছিল ছাত্র সমাজে! আজ শিক্ষকের প্রয়োজন পরীক্ষার খাতায় নম্বর বাড়াতে! আগে ছাত্ররা শিক্ষকের ভয়ে সভ্য হয়ে থাকত সুবোধ হয়ে! পরিবর্তনের হাত ধরে সেসব বদলে গেছে ধীরে ধীরে! ছাত্র আন্দোলনের সূত্রে শিক্ষকরা হতে থাকলেন ঘেরাওয়ের শিকার! আর আজ ছাত্রদের হাতে উত্তম মধ্যম জোটে শিক্ষকের ভাগ্যেও! আগে শিক্ষকের কথায় ছাত্ররা ওঠবোস করতো! এখন ছাত্র ইউনিয়ন পরিচালনা করে শিক্ষকদের! আগে অভিভাবকদের স্বপ্ন ছিল সন্তান মানুষ হবে! এখন অভিভাবকরা সন্তানের জন্য ডিগ্রী কিনতে ঘটিবাটি বেচতেও রাজী! আগে অভিভাবকরা শিক্ষা দিতেন সততার! আজ তারা শিক্ষা দেন চতুরতার! শিক্ষার লক্ষ্য এখন লাক্সারি ফ্ল্যাট গাড়ী, বিদেশ যাত্রা!

আগেকার কালে বাল্যবিবাহ বহুবিবাহর প্রচলন ছিল ঘরে ঘরে! আইন করে সেসব কুপ্রথা রদ হয়েছে ঠিক! তবে এখন বাল্য প্রেমের পরিণতি বিবাহ থেকে মুখে এসিড ছুঁড়ে মারা পর্য্যন্ত গড়িয়েছে! বহুবিবাহ আইনত বন্ধ বলে পরকীয়া পল্লবিত হয়েছে নানা রঙে! বাঙালির প্রেম আড়াল থেকে এখন সর্বসমক্ষে উত্তীর্ণ! বিবাহ বিচ্ছেদ এখন আর বিরল ঘটনা নয়! বরং অধিকাংশ প্রেমের পরিণতি বিবাহ না বিচ্ছেদ সেটাও গবেষণা সাপেক্ষ! বিধবা বিবাহ এখন আর সামাজিক নিন্দার নয়! ফলে বাঙালির সামাজ জীবনের নানান পরিবর্তনের সাথে চরিত্রবদল ঘটে গেছে ব্যক্তি বাঙালির বহিরাঙ্গে! কিন্তু প্রশ্ন হল সেই বদল বাঙালির ব্যক্তি চরিত্রের অন্তরাঙ্গে কতটা হয়েছে বা আদৌ হয়েছে কি?

বহুযুগ ধরেই বাংলার মানুষের মধ্যে কোনো অভিন্ন জাতিসত্তা গড়ে ওঠেনি! ক্রমাগত বিদেশী শাসনে অভ্যস্ত হয়ে শাসকের অনুগ্রহ অর্জনেই সে ব্যস্ত থেকেছে সবচেয়ে বেশি! ফলে বাঙালির ব্যক্তি চরিত্রের মধ্যে গড়ে ওঠেনি আত্মপ্রত্যয়! বরং প্রশাসকেরসেবার মধ্যেই সে আত্মমর্যাদা লাভে হয়েছে স্বচেষ্ট! ঠিক এই কারণেই বাঙালির চরিত্রের সাথে স্তাবকতার সুসম্পর্ক বহুদিনের! এই ভাবেই সে আখের গোছাতে মনোনিবেশ করেছে বংশ পরম্পরায়! এর অবশ্যাম্ভাবি ফলসরূপ লুব্ধচিত্তে সে ঐশ্বর্য্যশালী পরাক্রমী জাতির করুণা অর্জনে কাঙাল হয়েছে! আর অবজ্ঞা করেছে নিজ জাতির দরিদ্র জনসাধারণকে! বঞ্চিত করেছে তাদেরকে তাদের প্রাপ্য থেকে! এই চরিত্রের বদল হয়েছে কোথায়?

শত শত শতাব্দী ব্যাপী বাঙালি একের পর এক বিদেশী জাতির শাসনের অধীনে থেকে নিজস্ব জাতীয়তায় কোনোদিনই দীক্ষিত হয়ে ওঠেনি! আজ বিভক্ত বাঙালির একপক্ষ দিল্লীর কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে থেকে নিজেকে যতটা ভারতীয় নাগরিক বলে বিশ্বাস করে, বাঙালি বলে ততটা অনুভব করতে চায় না নিজেকে! সর্বদা তার লক্ষ্য কতটা ভারতীয় হয়ে ওঠা যায়! আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইংরেজী আর রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে হিন্দী ভাষার প্রতি তার সাধনা যত; নিজের মাতৃভাষার প্রতি তার সাধনা ও ভালোবাসা তার ভগ্নাংশ মাত্র! ফলে স্বদেশী বাঙালির প্রতি ব্যক্তি বাঙালির সংবেদনশীলতা খুব বেশি নয়! যে কারণে বাংলার প্রতি তার স্বদেশ প্রেমও আজও দানা বাঁধল না!

মোঘোল সম্রাট বাবর তাঁর আত্মচরিতে বাঙালি সম্বন্ধে লিখেছিলেন; "বাঙালিরা পদকেই শ্রদ্ধা করে, তারা বলে আমরা তখতের প্রতি বিশ্বস্ত! যিনি সিংহাসন অধিকার করেন আমরা তাঁরই আনুগত্য স্বীকার করি!" যার ফলসরূপ বাঙালির চরিত্রের মধ্যে তোষামোদ, চাটুকারিতা, পরনিন্দা পরচর্চা, সুযোগসন্ধানী সুবিধেবাদী মানসিকতা,তদ্বির প্রবণতা প্রভৃতি প্রকৃতিগুলি ভীষণ ভাবেই প্রবল! ভোগলিপ্সা তার মজ্জাগত কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ফাঁকিবাজিতে সে ওস্তাদ! কোনো যৌথ প্রয়াসে বাঙালির সাফল্য যে বিশেষ দেখা যায় না, তার জন্যে এই কারণগুলির সাথে ঈর্ষাপরায়ণতাও দায়ী! মূলত স্বাজাত্যবোধ না জাগলে প্রকৃতিগত এই ত্রুটিগুলি কোনো জাতির পক্ষেই কাটিয়ে ওঠা যায় না!

আত্মপ্রত্যয়হীনতায় ভুগে বিদেশী প্রশাসকের ভাষা সংস্কৃতিতে দক্ষতা অর্জনকেই বাঙালি তার সমৃদ্ধি বলে মনে করেছে! ফলে অন্ধ অনুকরণ প্রবণতা তাকে মৌলিকতা অর্জনে কোনো কালেই উদ্বুদ্ধ করে নি জাতিগত ভাবে! বাঙালির চরিত্রের এই মৌলিক প্রকৃতির কোনোই বদল তো হয়নিই, বরঞ্চ তা সমাজদেহের সর্বত্র ছড়িয়েছে! এবং এই আবিশ্ব বিশ্বায়নের গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে বর্তমানে বাঙালি বাঙালিত্ব বর্জন করে অতি দ্রুত আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার মত্ততায় ছুটেছে নেশাগ্রস্তের মতো! ফলে স্বাধীনতার পূর্বে ও পরেও বাঙালি রয়ে গেছে বাঙালিতেই! পৃথিবীর অন্যান্য জাতি যখন স্বাজাত্ববোধে দীক্ষিত হয়ে আপন জাতিসত্বায় গর্বিত! বাঙালী তখন ভারতীয়তায় আত্মবিসর্জনে মগ্ন!

ভালোবাসি বাংলা - বাঙালির চরিত্রবদল - ফেরদৌস আলম


বাঙ্গালির চরিত্রবদল
ফেরদৌস আলম



গত তিন দশকে বাঙালির চরিত্রে ঘটে গেছে অসামান্য বদল । স্বভাব বাঙালি যুগান্তরের বন্দেমাতরম ও চট্টগ্রাম অভ্যুথান পরীক্ষায় সিদ্ধ করেছিল নিজের বিপ্লবী সত্তা । সব্যসাচী ছিল তার আদর্শ, চোখে ছিল তরুণের স্বপ্ন । নেতাজির আন্তর্জাতিক রোম্যান্টিকতা যাদের চোখে স্বপ্ন ভরে রাখতো , রাসবিহারী বোসের INA যাদের দিন রাতের ঘুম কেড়ে নিতো , সেই বাঙালির চোখের সামনে একে একে ডুবে গেলো সমস্ত জাহাজ ...নৌ- বিদ্রোহ সফল হবার পর ক্রমশ রাতের নৈঃশব্দে স্বাধীনতার পদচারণা । মধ্যরাতে পতাকা বদল । নোয়াখালী , বেলেঘাটা , রাজাবাজার , পার্কসার্কাস ... মৃচ্ছকটিকের ঢাকা-শিয়ালদহ ট্রেন ...অনশনরত বৃদ্ধ , ফকির । গান্ধীর কৌপীন ধরে বাঙালি গান্ধীবাদী হোলো ।

পটনার প্রবাসী ডাক্তারের সুদীর্ঘ প্রশাসনকালে বাঙালিকে শেখালো উদ্যমী হতে ... শিল্পজীবি হোতে ... মহলানবীশি অর্থনীতির হাত ধরে চাষি বাঙালি শিল্পের শ্রমিক বনলো । বাঙালির চরিত্রে চা - পাট - ব্রিটিশের শিল্পেরা ছিলই , ছিল কেরানীবৃত্তি , বাবু-কালচার ... পঞ্চাশের বাঙালির মুকুটে জুড়লো আধুনিক শিল্পের পালক । হাওড়া-শেফিল্ড এবং গঙ্গাপারের শিল্পাঞ্চল পেরিয়ে রাঢ় বঙ্গের ইস্পাত তর্জমা ... । এরপর ক্রমিক বিকাশে মহলানবীশি ইস্পাতভারত ... ডিভিসির কল্যাণে কয়লা ও লোহার গড়ভূমিতে তিন তিনটে ইস্পাতপ্রকল্প ।

বাঙালির চরিত্র বদলের কথা বলতে গেলে অপ্রাসঙ্গিক হবে না তার আনুগত্যবদলের চিত্রণ । বাঙালির নিজস্ব ইতিহাস শশাঙ্ক ও পরবর্তী মাৎস্যন্যায় থেকে শুরু , যার পর প্রথম গণতান্ত্রিক রাজবংশ পালদের আগমন ... এরপর কনৌজী সেনবংশের হাতে বাঙালির স্বাধীনতার বলি । তারপর হুসেনশাহী অত্যাচারের গৌড়বঙ্গ এবং মুর্শিদকুলী সিরাজদের শেষ স্বাধীন নবাবী শাসন ...বাঙালি এরপর থেকেই কোম্পানি এবং ব্রিটিশের দাস এবং ভারতবর্ষে রেনেসাঁর প্রথম ধারক ।

ইতিহাসের পাতায় বাঙালির দ্বৈত চরিত্র বড়ো বেশি পরিস্ফুট । বৃহত্তর গোষ্ঠী যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল সেখানেও মুষ্টিমেয় প্রগতিশীল বাঙালির হাত ধরে বাংলায় রেনেসাঁর মানবিক বিকাশ । রামকৃষ্ণ , রামমোহন , বিদ্যাসাগর এবং কেশব সেনের নববিধান এবং রামকৃষ্ণ মিশনের আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গোষ্ঠীদ্বন্দের বিশ্বজনীন চেহারা । পাণ্ডববর্জিত বাঙালি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে নেমে বুঝতে পারে ... রোমান্স আর গণসমর্থন ভিন্নগামী , বুঝতে পারে প্রতিক্রিয়াশীল মোসাহেবী সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে জিততে চাই নিজস্ব সেনাবাহিনী । বাঙালির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নায়ক পৃথিবীর অন্যতম সেনাবাহিনীর প্রধান হাফিজ হয়ে যান ... মোসাহেবীদের চক্রান্তে বাঙালির সামনে ফেরবার এই স্বপ্ন নিয়ে উদয় হন আরেক তরুণ শেখ মুজিবর । ভাষার ভিত্তিতে পৃথিবীর প্রথম দেশ গঠন বাঙালির একুশের ক্ষতে অল্প মলম লাগায় ।

সেই বাঙালি পূবেতে ঘাত অভিঘাতে আর পশ্চিমে নিরর্থক আন্দোলন আর শিল্পনাশা আর কর্মনাশা তিন দশকের প্রতিঘাতে ন্যুব্জ হয়ে যায় । তার HDI , তার HQ হ্রাস পায় দ্রুতগতিতে ।তার মনীষার তারকাখচিত অতীত আকাশ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবির মৃত্যুর পর , কল্লোল গোষ্ঠীর তারাপাতের পর , আকাশের সাতটি তারার জনকের ধারাপাতের পর এমন এক ধারাপাতের মুখে পড়ে যার কোনো ইতিহাস নেই । একদিকে প্রতিষ্ঠান সর্বস্ব কিছু মনীষা অতীত বামপন্থার কালিমা ভুলে বাণিজ্যিক বিপ্লবে বলীয়ান , অন্যদিকে দলে উপদলে বিভক্ত অপ্রতিষ্ঠানিক ... তার কৌলীন্যে অলঙ্কৃত শ্রেষ্ঠ মনীষার কলরব । নাট্যদিগন্তেও একই নাটককে ভিন্ন আস্বাদে চিনে নেওয়া ... যাত্রাপালার ক্রমিক শীর্ষমন্তাজ এবং পতন । স্মৃতির আড়ালে তলিয়ে যাওয়া নাট্যনক্ষত্রের দিগন্তবলয় । ব্রেখট , গোর্কি , গিরীশ , এবং সোফোক্লেস এবং মৌলিক বিভিন্নভাষী অধুনা নাটকের অ্যাকাডেমি পরিক্রমা । , দুঃসময়ের স্রষ্টার হাত ধরে সিঙ্গুর , নন্দীগ্রাম ... মোমমিছিল ... তারকা সমাবেশে বিভাস শাঁওলী থেকে সমীর শুভাপ্রসন্ন মহাশ্বেতা ... যখন বাঙালির দৃষ্টি নিবদ্ধ হতো সত্যজিত , মৃণাল ঋত্বিকের ক্যামেরায় বাঙালি ৭১ এর গণহত্যার প্রতিবাদ করেনি । তাই বাঙালি সসম্মানে শিরোধার্য করেছে রুনু - সিদ্ধার্থ , সোমেন , লক্ষ্মী আর প্রিয় , সুব্রতকে । আজো বাঙালি নিরাপদ দূরত্ব থেকে শূন্য অঙ্ক কষে কালবেলায় , কালপুরুষে । বাঙালি কি বদলেছে ?

বাঙালি বদলেছে । আগে মনীষার ঘর ছিল তিনটি । যুগান্তর , আনন্দবাজার আর গণশক্তি । কংগ্রেসি যুগান্তরের যায়গায় এসেছে তৃনমূলী প্রতিদিন । জরুরী অবস্থায় বাঙালি আজ গর্জায় , সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের ঘটনায় যেমন তেমনি কার্টুনকাণ্ডের প্রতিবাদে , এবং একনায়িকার খেয়ালিপনার বিরুদ্ধে ... বাঙালি রাজনীতি ভোলে না । বাঙালি তসলিমাকে ফেরাবার সাহস ধরে না । ছুঁৎমার্গে ভুলে ব্যান করে নিরীহ বই আবার শারুখ অমিতাভকে সাথে নিয়ে বানায় বৃহত্তম ফিল্মসিটি । কলকাতা চলচিত্র উৎসবকে বিমুক্ত করে নন্দন থেকে নেতাজী ইনডোরে । সমান ভিড় ভাঙে রবীন্দ্রজয়ন্তী আর সুনীলের তিরোধানে ।

ভবিষ্যৎ উত্তর দেবে বাঙালি প্রগতির রথে চড়বে কিনা ... যেমন সে দাপাচ্ছে বাঙ্গালুরু , সাইবেরাবাদ , গুরগাঁও , নয়দা , মুম্বাই , লন্ডন রাইন প্যারিস দুবাই ... সেকি পারবে প্রগতির রথটার রশি পাকড়ে নিজের মাটিতে ফের স্থাপন করতে ? বাঙালি কি বুঝতে পারছে শুধু কেন্দ্রের অসহযোগিতার বুলি কপচে আর চলবে না ? লালগড় , গোর্খাল্যান্ড ... সব্বাইকে সাথে নিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দীপ হাতে বাঙালি কি সূচনা করবে নতুন ক্যানভাসের ?

ভালোবাসি বাংলা - প্রবাসে বাঙালির জীবন - ইন্দ্রাণী সরকার

প্রবাসে (আমেরিকায়) বাঙালির জীবন
ইন্দ্রাণী সরকার


আমেরিকায় বাঙালির জীবন নিয়ে লিখতে বসে অনেক কিছু কথাই মনে পড়ছে | এখানে ছাত্র অবস্থাতেই বেশির ভাগ লোকেরা দেশ থেকে আসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য | লেখাপড়ার যে পদ্ধতি তা দেশ থেকে অনেকটাই আলাদা | ছাত্রছাত্রীরা কলেজের ডর্মে (হোস্টেল) থেকে পড়াশুনা করে | কলেজের (ব্যাচেলর) মেয়াদ চার বছরের হয় | স্নাতক (ব্যাচেলর) ডিগ্রী লাভ করা যায় ক্রেডিট হিসেবে | প্রতি বছরে যে কোর্স নেওয়া হয়, তার উপর পরীক্ষার ভিত্তিতে গ্রেডিং হয় | ছাত্রছাত্রীদের অনেক স্বাধীনতা দেওয়া হয় কোর্স পছন্দ করার ব্যাপারে |

স্নাতকোত্তর ডিগ্রী দুই বছরের | এখানেও ক্রেডিট হিসেবে ডিগ্রী প্রাপ্তি হয় | পড়ার চাপ স্নাতক বা বি. এস. ডিগ্রী থেকে অনেক কম হয় | এরপর পি. এইচ. ডি. আর তারপর পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রী তো আছেই |

আপাত পড়াশুনা শেষ করার পর চাকরির খোঁজ, বিভিন্ন জায়গায় রেসুমে পাঠিয়ে চাকরির অ্যাপ্লাই করা সে সব তো আছেই যা প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই |

সংসারী লোকেরা প্রথমেই সুবিশাল অট্টালিকায় বাস করতে পারে না | জীবন শুরু হয় ভাড়া এপার্টমেন্ট (ফ্ল্যাট) থেকে, তারপর ধীরে ধীরে কন্ডমিনিয়াম বা টাউনহাউস এবং তারপর নিজস্ব বাড়ি | এর মধ্যে থাকে কত পরিশ্রম আর প্ল্যানিং| বাড়ি তো সাধারনত কাঠের হয় কিন্তু তার দাম তো অনেক | কিস্তিতে বাড়ি কেনা হয় | ব্যাঙ্কের থেকে ধার নিতে হয় যা প্রতি মাসে একটু একটু করে শোধ হয় | শহর ছাড়া যে কোন শহরতলিতে গাড়ি ছাড়া জীবন চলবে না | বাজার, অফিস, বেড়ানো সবেতেই গাড়ির নিতান্তই প্রয়োজন হয় | বাড়ির মত গাড়িও ধারে কেনা যায় যা প্রতি মাসে অল্প অল্প করে শোধ দিতে হয় | এখানে এটাই একটা সুবিধা যে প্রায় সব কিছুই ধারে কেনা যায় |

এই দেশে মানুষের পরিশ্রমের অনেক দাম, খাবারের দামের থেকেও বেশি | যে কোন জিনিস সারাতে যদি অন্য লোকের সাহায্য প্রয়োজন হয় তা খুবই খরচ সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায় | এই কারণে অনেকেই ছোটখাট সারানোর কাজ শিখে নেয় পয়সার কিছু সুরাহা করতে |

খাবারের দাম সত্যিই খুবই কম | এই জন্য মজা করে বলা হয় যে আমেরিকায় আর কিছু না হোক না খেয়ে কেউ মরবে না |

সাধারনত কর্মস্থলে খুব-ই কাজের চাপ থাকে | ডেডলাইন বজায় রাখতে গিয়ে যেন ডেড হয়ে যাবার যোগাড় হয় | কাজের ফাঁকে আড্ডা ইত্যাদির সুযোগ খুবই কম |

তবুও এরই মধ্যে মানুষ জীবন উপভোগ করে | শনি ও রবি এই দুটো দিন ছুটি থাকার জন্য সারা সপ্তাহের অসমাপ্ত কাজ, বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাওয়া, বন্ধুর বাড়ি পার্টি ইত্যাদি এই সব নিয়ে হৈ হৈ করতে করতে ছুটির দুটো দিন কেমন করে যেন চলে যায় এখানে বাঙালির যে সব ছেলে মেয়েরা জন্মায় স্কুলের পড়াশুনার চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা বা বাঙালিয়ানার থেকে ক্রমশ যেন দূরে সরে যায় | এতে তাদের কোন গাফিলতি থাকে না | পড়াশুনা ছাড়াও এক্সট্রাকারিকুলাম একটিভিটি ইত্যাদি এত বেশি হয়ে যে সমস্ত কিছু ধরে রাখা প্রায়ই অসম্ভব হয়ে যায় | তবুও এরই মধ্যে অনেক ছেলে মেয়েই প্রাচ্যের সংস্কৃতি বজায় রাখতে সক্ষম হয় | উচ্চশিক্ষা প্রাপ্তির সুযোগ সুবিধা খুব ভাল থাকার জন্য বাঙালির সন্তানরা অধিকাংশ সময়েই জীবনে ভালোভাবে দাঁড়াতে সক্ষম হয় |

সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১২

ভালোবাসি বাংলা - সম্পাদনা উষসী

বাংলা সাহিত্যের কথা
রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য


(প্রথম পর্ব)

আজকাল যে বাংলা সাহিত্য আমরা পড়ি,তার আরম্ভ কি করে হয়েছিল এ ব্যাপারে যথেষ্ট কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। গদ্য না পদ্য, কি ভাবে লেখা হত এই সাহিত্য? কিরকম ছিল সেই ভাষা? আসুন, দেখা যাক কি ভাবে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা!
যতদূর জানা যায়,আনুমানিক খ্রীষ্টীয় নবম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় (মাগধী এবং প্রাকৃতের বাতাবরণে সংস্কৃতভাষার গর্ভে বাংলাভাষার জন্ম।) সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়। খ্রীষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ দোঁহা-সংকলন চর্যাপদ, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন।
অনেকেরই ধন্দ ছিল, চর্যাপদ আদৌ বাংলা ভাষায় রচিত কিনা!
প্রাচীন বাংলার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলির সন্ধানে প্রাকৃত বাংলায় রচিত চর্যাপদ একটি মূল্যবান উপাদান। ১৯২৬ সালে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রথম এই বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেন, তাঁর The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে। এরপর ডক্টর সুকুমার সেন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, তারাপদ মুখোপাধ্যায়, পরেশচন্দ্র মজুমদার ও ডক্টর রামেশ্বর শহ, চর্যার ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন। ফলে আজ চর্যার ভাষার স্বরূপটি অনেক বেশি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।
চর্যা পদসংগ্রহ প্রকাশিত হবার পর চর্যার ভাষা নিয়ে যেমন প্রচুর গবেষণা হয়েছে, তেমনি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্বজ্জনেরা এই ভাষার উপর নিজ নিজ মাতৃভাষার অধিকার দাবি করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর সম্পাদিত হাজার বছরের পুরান বাঙ্গলা বৌদ্ধ গান ও দোহা গ্রন্থের ভূমিকায় চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহপাদ ও কৃষ্ণাচার্যের দোহা এবং ডাকার্ণব-কে সম্পূর্ণ প্রাচীন বাংলার নিদর্শন বলে দাবি করেছেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের আবিষ্কর্তা ও সম্পাদক বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভও তাঁর দাবিকে সমর্থন করেন। ১৯২০ সালে বিজয়চন্দ্র মজুমদার তাঁদের দাবি অস্বীকার করে চর্যা ও অন্যান্য কবিতাগুলির সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্বন্ধের দাবি নস্যাৎ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৯২৬ সালে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর সেই, The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে চর্যাগান ও দোহাগুলির ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও ছন্দ বিশ্লেষণ করে শুধুমাত্র এইগুলিকেই প্রাচীন বাংলার নিদর্শন হিসাবে গ্রহণ করেন। ১৯২৭ সালে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্যারিস থেকে প্রকাশিত Les Chants Mystique de Saraha et de Kanha গ্রন্থে সুনীতিকুমারের মত গ্রহণ করেন।
যে সকল ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য চর্যার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ককে প্রমাণ করে সেগুলি হল সম্বন্ধ পদে –অর বিভক্তি, সম্প্রদানে –কে, সম্প্রদানবাচক অনুসর্গ –অন্তরে (মধ্যযুগীয় ও আধুনিক রূপ –তরে), অধিকরণে –অন্ত, -ত, অধিকরণবাচক অনুসর্গ –মাঝে, অতীত ক্রিয়ায় –ইল এবং ভবিষ্যত ক্রিয়ায় -ইব। চর্যা মৈথিলী বা পূরবীয়া হিন্দিতে রচিত হলে অতীত ক্রিয়ায় –অল ও ভবিষ্যতে –অব যুক্ত হত।
• গুনিয়া, লেহঁ, দিল, ভণিআঁ, সড়ি, পড়িআঁ, উঠি গেল, আখি বুজিঅ, ধরণ ন জাঅ, কহন না জাই, পার করেই, নিদ গেলা, আপনা মাংসে হরিণা বৈরী, হাড়ীত ভাত নাহি ইত্যাদি বাগভঙ্গিমা ও শব্দযোজনা বাংলা ভাষায় পরবর্তীকালেও সুলভ। এর সঙ্গে অবশ্য তসু, জৈসন, জিস, কাঁহি, পুছমি প্রভৃতি পশ্চিমা অপভ্রংশের শব্দও আছে। তবে সেগুলি মূলত কৃতঋণ বা অতিথি ( Loan words) শব্দ হিসাবেই চর্যায় ব্যবহৃত হয়েছে।
• এছাড়া সম্প্রদানে –ক এবং –সাথ, -লাগ, -লগ-এর বদলে সঙ্গে, সম অনুসর্গের ব্যবহার এবং নাসিক্যধ্বনির বাহুল্যের জন্য চর্যার ভাষাকে রাঢ় অঞ্চলের ভাষা বলে মনে করা হয়। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “চর্যার আচার্যেরা কামরূপ, সোমপুরী, বিক্রমপুর – যেখান থেকেই আসুন না কেন, আশ্চর্যের বিষয়, এঁরা সকলেই রাঢ় অঞ্চলের ভাষানীতি গ্রহণ করেছিলেন।”
• রাহুল সাংকৃত্যায়ন বা অন্যান্য ভাষার বিদ্বজ্জনেরা যাঁরা চর্যাকে নিজ নিজ ভাষার প্রাচীন নিদর্শন বলে দাবি করেছিলেন, তাঁরা এই রকম সুস্পষ্ট ও সুসংহত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের দ্বারা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হননি।
• চর্যার প্রধান কবিগণ হলেন লুইপাদ, কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, শবরপাদ প্রমুখ।লেখকেরা রাঢ় অঞ্চলের ভাষানীতি গ্রহণ করেছিলেন। সেটা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু কেন?
তাহলে, রাঢ় অঞ্চল সম্বন্ধে একটু লেখা যাক। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম ভাগে বর্ধমান বিভাগের অন্তর্গত একটি বিস্তৃত সমভূমি অঞ্চলের নাম ছিল/আছে রাঢ়। এর সীমানা পশ্চিমে ছোটনাগপুর মালভূমির প্রান্তভাগ থেকে পূর্বে গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের পশ্চিম সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চল ঈষৎ ঢেউ খেলানো ও এর ঢাল পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে।
‘রাঢ়’ শব্দটি এসেছে সাঁওতালি ভাষার ‘রাঢ়ো’ শব্দটি থেকে, যার অর্থ ‘পাথুরে জমি’। অন্যমতে, গঙ্গারিডাই রাজ্যের নাম থেকে এই শব্দটি উৎপন্ন। সুপ্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের অন্যতম প্রধান অবদানকারী।
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যেও রাঢ়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।মহাভারতে সুহ্ম ও তাম্রলিপ্তকে পৃথক করে দেখা হলেও গুপ্ত শাসনে রচিত দণ্ডীর ‘দশকুমারচরিত’-এ বলা হয়েছে ‘সুহ্মেষু দামলিপ্তাহ্বয়স্য নগরস্য’। অর্থাৎ দামলিপ্ত (তাম্রলিপ্ত) সুহ্মেরই একটি নগর ছিল। ধোয়ীর পবনদূত কাব্যে রাঢ় প্রসঙ্গে বলা হয়েছে –
গঙ্গাবীচিপ্লুত পরিসরঃ সৌধমালাবতংসো
বাস্যতুচ্চৈ স্তুয়ি রসময়ো বিস্ময়ং সুহ্ম দেশঃ।

অর্থাৎ, ‘যে-দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল গঙ্গাপ্রবাহের দ্বারা প্লাবিত হয়, যে দেশ সৌধশ্রেণীর দ্বারা অলংকৃত, সেই রহস্যময় সুহ্মদেশ তোমার মনে বিশেষ বিষ্ময় এনে দেবে।’ পরবর্তীকালে রচিত ‘দিগ্বিজয়-প্রকাশ’-এ বলা হয়েছে –
গৌড়স্য পশ্চিমে ভাবে বীরদেশস্য পূর্বতঃ।
দামোদরোত্তরে ভাগে সুহ্মদেশঃ প্রকীর্তিতঃ।
অর্থাৎ, গৌড়ের পশ্চিমে, বীরদেশের (বীরভূম) পূর্বে, দামোদরের উত্তরে অবস্থিত প্রদেশই সুহ্ম নামে খ্যাত। এই সকল বর্ণনার প্রেক্ষিতে বর্তমান হুগলি জেলাকেই প্রাচীন রাঢ়ের কেন্দ্রস্থল বলে অনুমান করা হয় এবং এর সীমানা বীরভূম থেকে মেদিনীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে অনুমান।

চৈতন্যচরিতামৃতের বর্ণনা অনুসারে, রাঢ়ের জঙ্গলাকীর্ণ পথে চৈতন্যদেব কাশীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কবির বর্ণনায় রাঢ়ের অরণ্যভূমির একটি কাল্পনিক বর্ণনা পাওয়া যায়, যা বাংলা সাহিত্যে একটি অন্যতম উজ্জ্বল কবিকল্পনা –

প্রসিদ্ধ পথ ছাড়ি প্রভু উপপথে চলিলা।
কটক ডাহিনে করি বনে প্রবাশিলা।।
নির্জন বনে চলেন প্রভু কৃষ্ণ নাম লৈয়া।
হস্তী ব্যাঘ্র পথ ছাড়ে প্রভুকে দেখিয়া।
পালে পালে ব্যাঘ্র হস্তী গণ্ডার শূকরগণ।
তার মধ্যে আবেশে প্রভু করেন গমন।।
ময়ূরাদি পক্ষিগণ প্রভুকে দেখিয়া।
সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ বলে নাচে মত্ত হৈয়া।।
হরিবোল বলি প্রভু করে উচ্চধ্বনি।
বৃক্ষলতা প্রফুলিত সেই ধ্বনি শুনি।।
ঝারিখণ্ডে স্থাবর জঙ্গম আছে যত।
কৃষ্ণনাম দিয়া কৈল প্রেমেতে উন্মত্ত।।
যাই হোক, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ছিল কাব্যপ্রধান। হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম ও বাংলার লৌকিক ধর্মবিশ্বাসগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এই সময়কার বাংলা সাহিত্য।মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, শাক্তপদাবলী,বৈষ্ণব সন্তজীবনী, রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের বঙ্গানুবাদ, পীরসাহিত্য, নাথসাহিত্য, বাউল পদাবলী এবং ইসলামি ধর্মসাহিত্য ছিল এই সাহিত্যের মূল বিষয়।
বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাস প্রধানত তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত:
• আদিযুগ বা প্রাচীন যুগ (আনুমানিক ৯০০ খ্রী.–১২০০ খ্রী.)
• মধ্যযুগ (১২০০ খ্রী.– ১৮০০ খ্রী.)
• আধুনিক যুগ (১৮০০ খ্রী. – বর্তমান কাল)।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো নির্দিষ্ট সালতারিখ অনুযায়ী সাহিত্যের ইতিহাসের যুগ বিভাজন করা সম্ভব নয়। যদিও সাহিত্যের ইতিহাস সর্বত্র সালতারিখের হিসেব অগ্রাহ্য করে না। সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্যে ও বৈশিষ্টে নির্দিষ্ট যুগের চিহ্ন ও সাহিত্যের বিবর্তনের ধারাটি বিশ্লেষণ করেই সাহিত্যের ইতিহাসে যুগবিভাগ করা হয়ে থাকে।
যেমন ধরুন:- এই লেখাটি এক শিলালিপিতে পাওয়া:-
শুতনুকা নম দেবদশিক্যী
তং কময়িথ বলনশেয়ে
দেবদিনে নম লূপদখে
এর অর্থ:- সুতনুকা নামে( নম) এক দেবদাসী(দেবদশিক্যী), তাকে(তং)কামনা করেছিল(কময়িথ) বারাণসীর(বলনশেয়ে)দেবদিন নামের এক রূপদক্ষ(লূপদখে), মানে ভাস্কর।

এটা কবে লেখা হয়েছিল, এখনও গবেষণার বিষয়বস্তু। তবে এটা যে আদিযুগ বা প্রাচীন যুগে লেখা হয়েছিল, মনে হয় এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলা সাহিত্যের উন্মেষের পূর্বে বাংলায় সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অবহট্ট ভাষায় সাহিত্য রচনার রীতি প্রচলিত ছিল। এই সাহিত্যের মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যের আদি অধ্যায়ের সূচনা হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি আক্রমণের বহু আগেই বাঙালিরা একটি বিশেষ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। উন্মেষ ঘটে বাংলা ভাষারও। তবে প্রথম দিকে বাংলায় আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও অনার্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেনি। সংস্কৃত ভাষায় লেখা অভিনন্দ ও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন, উমাপতি ধরের কাব্যকবিতা, জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় ও সদুক্তিকর্ণামৃত নামক দুটি সংস্কৃত শ্লোকসংগ্রহ; এবং অবহট্ট ভাষায় রচিত কবিতা সংকলন প্রাকৃত-পৈঙ্গল বাঙালির সাহিত্য রচনার আদি নিদর্শন। এই সব বই বাংলা ভাষায় রচিত না হলেও সমকালীন বাঙালি সমাজ ও মননের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীকালের বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্যে গীতগোবিন্দম কাব্যের প্রভাব অনস্বীকার্য।
আগেই বলেছি,বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন হল চর্যাপদ। খ্রিস্টিয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত চর্যা পদাবলী ছিল সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনসংগীত। আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকগণ বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে চর্যার ভাষা প্রকৃতপক্ষে হাজার বছর আগের বাংলা ভাষা। সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্র এই পদগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে। সাহিত্যমূল্যের বিচারে কয়েকটি পদ কালজয়ী।

শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন, বড়ুচণ্ডীদাস নামক জনৈক মধ্যযুগীয় কবি রচিত রাধাকৃষ্ণের প্রণয়কথা বিষয়ক একটি আখ্যানকাব্য। ১৯০৯ সালে বসন্ত রঞ্জন বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রাম থেকে এই কাব্যের একটি পুঁথি আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ সালে তাঁরই সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামে পুঁথিটি প্রকাশিত হয়। যদিও কারও কারও মতে মূল গ্রন্থটির নাম ছিল শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ। কৃষ্ণের জন্ম, বৃন্দাবনে রাধার সঙ্গে তাঁর প্রণয় এবং অন্তে বৃন্দাবন ও রাধা উভয়কে ত্যাগ করে কৃষ্ণের চিরতরে মথুরায় অভিপ্রয়াণ – এই হল শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের মূল উপজীব্য। আখ্যানভাগ মোট এগারোটি খণ্ডে বিভক্ত। পুঁথিটি খণ্ডিত বলে কাব্যরচনার তারিখ জানা যায় না। তবে কাব্যটি আখ্যানধর্মী ও সংলাপের আকারে রচিত বলে প্রাচীন বাংলা নাটকের একটি আভাস মেলে এই কাব্যে। গ্রন্থটি স্থানে স্থানে আদিরসে জারিত ও গ্রাম্য অশ্লীলতাদোষে দুষ্ট হলেও আখ্যানভাগের বর্ণনানৈপূণ্য ও চরিত্রচিত্রণে মুন্সিয়ানা আধুনিক পাঠকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চর্যাপদের পর ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ বাংলা ভাষার দ্বিতীয় প্রাচীনতম আবিষ্কৃত নিদর্শন। বাংলা ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসে এর গুরুত্ব তাই অপরিসীম। অপরদিকে এটিই প্রথম বাংলায় রচিত কৃষ্ণকথা বিষয়ক কাব্য। মনে করা হয়, এই গ্রন্থের পথ ধরেই বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলীর পথ সুগম হয়।

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর, ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানী, বাংলার দেওয়ানী বা রাজস্বের আদায়ের ভার পেয়ে গেল।ফলে, কয়েক বছরের মধ্যেই কোম্পানী; দেশের রাজশক্তি,একেবারে কুক্ষীগত করে ফেলে।“বণিকের মানদণ্ড পরিণত হলো রাজদণ্ডে”। পরবর্তী কালের নিরীখে, সূচনা হলো এক নতুন যুগের। এ সময়ের কিছু আগে থেকেই, বাংলায় গদ্য রচনা আরম্ভ হয়ে গেছিল। শুধু, খ্রীষ্টান মিশনারীরা নয়; ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরাও এ বিষয়ে যত্নবান হয়েছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য, স্মৃতি ও ন্যায় শাস্ত্রের কয়েকটি গ্রন্থের বাংলা অনুবাদের কাজ অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকেই শুরু হয়েছিল।বৈদ্য চিকিৎসকরাও, কয়েকটি কবিরাজী বই, বাংলা গদ্যে লিখেছিলেন। তেতো লাগলেও, এটা মেনে নিতে লজ্জা নেই যে ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অভ্যুদয় না ঘটলে; এ প্রচেষ্টা কতদূর ফলপ্রসু হতো, তা গবেষনার বিষয়বস্তু।কারণ,ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানী সাম্রাজ্যবাদের কুৎসিত নমুনা হলেও; বাংলা গদ্য সাহিত্য এই সাম্রাজ্যবাদের কাছেই ঋণী।ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানী, রাজ্যভার পেয়েই, দেশে আইনকানুন প্রণয়ণ করতে লাগল। সবটাই অবশ্য নিজেদের সুবিধের জন্য। চিঠিপত্র, দলিল দস্তাবেজের বাইরে, এটাই হলো বাংলা গদ্য ভাষার প্রথম কার্য্যকর ও ব্যাপক ব্যাবহার।
তারপর, বাঙ্গালিকে, ইংরেজী আর ইংরেজকে বাংলা শেখাবার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে, ব্যাকরণ আর অভিধান রচনা করা হতে লাগল। এ পর্যন্ত, হাতে লেখা বইয়ের ব্যাবহার ছিল। প্রচুর নকলনবীশ ছিলেন, যাঁরা এই বই গুলো হাতে নকল করে লিখতেন। কিন্তু, এগুলো ছিল, সময় ও ব্যায়সাপেক্ষ। তাই, ছাপার যন্ত্র আর বাংলা টাইপের প্রয়োজন অনিবার্য্য হয়ে উঠল।
বাংলা টাইপের সর্বপ্রথম ছেনী কাটেন একজন ইংরেজ।ইনি ছিলেন,ইস্ট- ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন কর্মচারী। নাম- চার্লস উইলকিনস। পরে অবশ্য ইনি স্যার উপাধি পেয়েছিলেন। এই সাহেব, শ্রীরামপুরের শ্রী পঞ্চানন কর্মকারকে বাংলা টাইপের ছেনী কাটান শিখিয়ে দেন। এইভাবে, বাংলা টাইপের আবির্ভাব হলো।বাংলা টাইপের প্রথম ব্যাবহার হয়; হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণে।১৭৭৮ সালে এটি হুগলি থেকে প্রকাশিত হয়।


যালহেডের আসল বাংলা ব্যাকরণ বইটির প্রচ্ছদের প্রতিলিপি

ফলে, বই আর সংকীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ না থেকে সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত হল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে, আমরা দেখতে পাই-দু- একটি আইনের বই; বাংলায় লেখা হয়েছিল। বইগুলো দলিল পত্রের মত, আরবী-ফার্সী শব্দে ভরা। তাই, পরবর্তীকালে এগুলোকে ঠিক সাহিত্যের কোঠায় ফেলা হয় নি।ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে বাংলা গদ্য সাহিত্যের ঢল নামল।খাস বিলেত থেকে আসা ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীদের(এদের সিভিলিয়ান বলা হত) শিক্ষার জন্য ১৮০০ খ্রীঃ এ কোলকাতায় কলেজ অব ফোর্ট উইলিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হল।এই কলেজে প্রাচ্য ভাষার অধ্যক্ষ নিযুক্ত হলেন-শ্রীরামপুরের মিশনারী পাদ্রী উইলিয়াম কেরী।১৮০১ সালের মে মাসে;উইলিয়াম কেরীর সহকারী পণ্ডিত ও মুনশী কয়েকজনকে নিযুক্ত করা হলে; কলেজের প্রকৃত কাজ শুরু হয়।
সিভিলিয়ানদের বাংলা পড়াতে গিয়ে, দেখা গেল- বাংলা বই গুলো সবই কাব্য। এখন প্রয়োজন হয়ে পড়ল বাংলা গদ্যের।কারণ, ব্যাবহারোপযোগী বাংলা গদ্য না পড়ালে সিভিলিয়ানরা তথাকথিত নেটিভদের সাথে কথা বলবে কি করে?
উইলিয়াম কেরী, তাঁর মুনসী এবং পণ্ডিতদের বললেন ব্যাবহারোপযোগী বাংলা গদ্যের বই লিখতে। নিজেও লেগে গেলেন। লিখে ফেললেন- একটা ব্যাকরণ, একটা অভিধান, একটা কথোপকথনের বই আর একটা গদ্য গ্রন্থ সংকলন। সূচনা হলো, বাংলা গদ্যের। নিজেদের রাজ্য শাসনের জন্য, এগুলো তৈরী করলেও; ভবিষ্যতের বাংলা গদ্য সাহিত্য ঋণী হয়ে থাকল এঁদের কাছে। যে বছর কলেজ কাজ আরম্ভ করল, সেই বছরেই প্রকাশিত হলো; কেরীর “ব্যাকরণ”, ‌‍রামরাম বসুর “প্রতাপাদিত্যচরিত্র”, আর গোলোক শর্মার “হিতোপদেশ”।‌‍রামরাম বসুর “প্রতাপাদিত্যচরিত্র”,বাংলা অক্ষরে ছাপা প্রথম মৌলিক গদ্য গ্রন্থ।

এর আগে, পোর্তুগীজ পাদ্রীরা যে সব গদ্য গ্রন্থ বের করেছিলেন, সে সবই ছিল ইংরাজি বা রোমান হরফে ছাপা।
এ প্রসঙ্গে, জানিয়ে রাখা যেতে পারে; অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে যে তিনখানা আইনের অনুবাদ গ্রন্থ এবং ১৮০০-০১ সালে বাইবেলের যেটুকু অনুবাদ, শ্রীরামপুর মিশন প্রকাশ করেছিল, তা কিন্তু বাংলা অক্ষরে ছাপা হয়েছিল।
রামরাম বসুর আর একটি গদ্য গ্রন্থ- “লিপিমালা”, প্রকাশিত হয়; পরের বছর অর্থাৎ ১৮০২ সালে। ১৮০৫ সালে প্রকাশিত হয়,চণ্ডীচরণ মুন্সীর- “তোতা ইতিহাস”। রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়ের- “ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম্” ।
সবাইকে ছাপিয়ে গেছিলেন- মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার। কলেজের শ্রেষ্ঠ গদ্য লেখক ছিলেন এই মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার। সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ এই মহাপণ্ডিত, কেরী সাহেবের ডান হাত ছিলেন। দেশী লোকের লেখা প্রথম ভারতবর্ষের ইতিহাস- “রাজাবলি”, এনারই রচনা। ১৮১৯ সালে ইনি প্রয়াত হন।
এরপর এলেন বিদ্যাসাগর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার, বিশেষত বাংলা গদ্যের বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধান পুরুষ ও অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। তিনিই প্রথম বাংলাভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ লিখেছেন, যা মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণেরই প্রসারণ/অনুবাদ হলেও আজ অব্ধি বাংলাভাষার ব্যাকরণ এই আদলের মধ্যেই রয়েছে। প্রয়াত হূমায়ুন আজাদ একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন পূর্ণাঙ্গ বাংলাভাষার ব্যাকরণ রচনার আগ্রহ ও প্রয়োজনীয়তার কথা অনেকবার বললেও কাজটি শেষ পর্যন্ত আরদ্ধই রয়ে গেছে, সম্ভবত যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে।
• মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগের ১৬টি স্বরবর্ণ রেখেছিলেন।
• ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ে প্রথম ভাগের ১৬টি থেকে কমিয়ে ১২টি স্বরবর্ণ করলেন। তিনি দেখালেন ৯, দীর্ঘ ৯, দীর্ঘ ঋ কারের কোনো দরকার নেই।
• মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগের ৩৪টি ব্যাঞ্জনবর্ণ ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগে ৪০টি ব্যাঞ্জনবর্ণ আনলেন।

শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়! অপেক্ষাকৃত নতুন বাংলা ভাষার বাক্যবিন্যাস কিন্তু নেওয়া হয়, ফার্সী থেকে। এলেন ঋষি বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ!


বাংলা হরফের বিবর্তন ও আরও কিছু ছবি


(২য় পর্ব )

উনবিংশ শতাব্দী থেকে বাংলা ভাষার আধুনিক যুগের শুরু । বাংলা সাহিত্যে গদ্যের ব্যবহার, এই যুগের থেকেই আরম্ভ হয়েছিল ।

সংস্কৃত শব্দের বা তৎসম শব্দের আমদানি হয়েছিল, গদ্যশৈলীর প্রবর্তনে । অধিকাংশ গদ্যলেখক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন বলে, এই সব তৎসম শব্দের বাড়াবাড়ি হয়েছিল, এটা বলতেই হবে ।

ইদানিং যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটা হল-বাংলা সাহিত্যে, ইংরেজী ইডিয়মের ব্যবহার প্রচুর । বিশেষ করে কম্পিউটার আসার পর, এই সব “টার্ম” প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার হচ্ছে । উভয় বঙ্গের “ভাষা সাহিত্যের” ভাষা এবং কোলকাতা অঞ্চলের ভাষা, শিক্ষিতের ভাষায় স্বীকৃত হচ্ছে নজর এড়িয়ে । এটা ভালো না মন্দ- ভবিষ্যৎ বলবে । রায় দেবার সময় এখনও সময় আসে নি । তবে, একটা কথা মনে হয়- লোকেরা যে সব শব্দে অভ্যস্ত, সেগুলো ব্যবহার করলে, গদ্য বা পদ্য আরও পাঠক পাবে ।

আগেই আমরা দেখেছি, বাঙলা ভাষার উপভাষা এবং কোন কোন অঞ্চলে চালু । এবারে বিশিষ্ট লক্ষণ গুলো দেখা যাক ।

রাঢ় বা পশ্চিমবাঙলার উপভাষায় অভিশ্রুতি আর স্বরসঙ্গতির ফলে বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে । যেমন :-

রাখিয়া > রেখে

করিয়া > কোরে

দেশী > দিশী

বিলাতি > বিলিতি

অ- কার এবং ও কারের প্রবণতা এই উপভাষায় লক্ষণীয় । যেমন :-

অতুল > ওতুল । আনুনাসিক স্বরের উপস্থিতিও একটা প্রধান বিশেষত্ব ।

চাঁদ, আঁট, কাঁটা, হাঁসপাতাল ( ইং – হসপিটাল) – এই গুলো উদাহরণ ।

পশ্চিমবঙ্গের উপভাষায় পদের স্বরধ্বনিতে শ্বাসাঘাত হয়ে থাকে , আর তার ফলে পদের শেষে থাকা ব্যঞ্জনবর্ণের মহাপ্রাণতা অথবা ঘোষবত্তা লোপ পেয়ে যায় ।

উদাহরণ দিচ্ছি :-

দুধ > দুদ, মধু > মদু, ইং লার্ড ( লর্ড) > লাড> লাট ।

কয়েকটা জায়গায়, অঘোষধ্বনি, ঘোষ হয় । ছত্র > ছাত > ছাদ, কাক> কাগ, শাক> শাগ, ফারসী গলৎ > গলদ ।

এবারে, পূর্ববঙ্গের উপভাষায় অভিশ্রুতি আর স্বরসঙ্গতি নাই । তাই স্বরধ্বনিতে অনেকটা প্রাচীনত্ব বজায় আছে ।

রাখিয়া >*রাইখিআ > রাইখা , করিয়া > *কইরিয়া > কইরা, দেশি > দেশি ।

য- ফলা যুক্ত যুক্তব্যঞ্জনেও অপিনিহিতি হয় । সত্য > সইত্ব । ব্রাহ্ম > *ব্রাহ্ম্য > ব্রাইম্ম ।

আবার, এ- কার এবং ও- কার প্রায়ই আ্য- কার এবং উ- কারে পরিণত হয় । লক্ষণীয় যে, আনুনাসিক স্বরধ্বনির অস্তিত্ব একেবারেই নেই । শ্বাসাঘাতেরও নির্দ্দিষ্ট স্থান নেই । ঘোষ বর্ণের মত মহাপ্রাণ অর্থাৎ চতুর্থ বর্ণ মহাপ্রাণতা ছেড়ে এক রকম বিশেষ তৃতীয় বর্ণে রূপান্তরিত হয় ।

ভাত >ব’আত্ ,ঘা > গা’আ ।

ড়-কার,ঢ়-কার, রকারে পরিণত হয়ে যায় । এইজন্যই অনেকের র-কার আর ড়- কার ঠিক মত বসাতে পারেন না ।

এবারে, যে সব শব্দ আধুনিক বাংলা ভাষায় সরাসরি সংস্কৃত থেকে এসেছে , সেগুলো তৎসম ( তাহার সম ) শব্দ । এবারে কালের নিয়মে উচ্চারণ দোষে সে শব্দগুলো একটু বিকৃত হয়ে গিয়েছে, সেগুলো হল – অর্দ্ধ তৎসম শব্দ ।

শ্রদ্ধা ( তৎসম ) >সাধ >ছেদ্দা,ছরাদ । কৃষ্ণ > কেষ্ট > কানাই, কানু ( এটা তদ্ভব , মানে “ কেষ্ট” থেকে এর উদ্ভব ) ।

এছাড়াও প্রচুর আরবী, ফারসী, তুর্কি,পর্তুগীস, ওলন্দাজ, ইংরেজী শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে । এগুলোকে ইংরেজীতে বলে- লোন ওয়ার্ডস । বাংলা করলে দাঁড়ায় কৃতঋণ শব্দ ( বাংলাদেশ এই শব্দটার বাংলা করেছে) । পশ্চিম বঙ্গে বলা হয় – অতিথি শব্দ ।

আলমারী, পাঁও, আনারস, আলপিন,বাসন – পর্তুগীস শব্দ ।

আবার দেখুন – ঝিঙ্গা হচ্ছে সাঁওতালি শব্দ । লুঙ্গি- বার্মিস ।

কিছু গ্রীক শব্দও এসেছে ।

যেমন- দাম ( এখানে পয়সা অর্থে, বাংলা শব্দ ) । সংস্কৃত হলো – দ্রাম্য । গ্রীক মূল শব্দ- দ্রাখ্ মে । (drakhme)

আন্দাজ, খরচ, কম, বেশী, নগদ- ফারসী শব্দ ।

আক্কেল, হুঁকা, কেচ্ছা,খাসী, তাজ্জব – আরবী শব্দ ।

আলখাল্লা, উজবুক,কাবু, কুলি,চাকু – তুর্কি শব্দ ।

এগুলোও বাংলা ভাষা আত্মসাৎ করেছে । যেমন , কয়েকটা ইংরেজী শব্দ বাংলাভাষা আত্তিকরণ করেছে ।

সিনেমা, চেয়ার, টেবিল, কাপ, প্লেট – উদাহরণ ভুরি ভুরি ।

ইদানীং নেটের কল্যাণে এসেছে – আড্ডানো, আপলোডানো , ফেসবুকীয়র মত বহু শব্দ । তাই বাংলা ভাষা এখন আর সংস্কৃতের ঘেরাটোপে আবদ্ধ নেই । প্রামাণ্য বাংলা ভাষাও বলে আজকাল আর কিছুই নেই । এটা আক্ষেপ নয় । এই রকম প্রচুর শব্দ আছে । লেখক কি লিখবেন, সেটা তাঁর নিজস্ব পছন্দ । পাঠক পড়ে যদি বুঝতে পারেন, তাহলে এই সব ব্যবহারে বাংলা সাহিত্যে ছুৎমার্গ না রাখাই ভালো ।

একটা অক্ষম প্রয়াস করলাম । ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, পরিবর্তন যদি জীবনোর সব ক্ষেত্রে আসে, তবে ভাষায় কেন আসবে না ?

অলমতি






ধর্ষণ একটি সামাজিক ব্যাধি
শ্রীশুভ্র


শোনা যায় ভারতবর্ষে প্রতি কুড়ি মিনিটে একটি করে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটে! এরসাথে শ্লীলতাহানী যৌনহয়রানী যোগ করলে পরিসংখ্যানটি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে! শারীরীক সক্ষমতায় মেয়েরা দূর্বল বলেই যে এঘটনা ঘটে তা নয়! পুরুষের মনস্তত্বে নারী মানেই ভোগ্যপণ্য স্বরূপ! মূল কারণটা নিহিত আছে এখানে! আর এই মানসিকতা থেকে প্রায় কেউই মুক্ত নন! তারা সবাই যে ধর্ষণে উৎসাহ পাচ্ছেন সর্বদা, তা নয়! কিন্তু সমাজের সেকল শ্রেণীতেই নারী মানেই পুরুষের ইচ্ছাধীন, পুরুষের কামনা বাসনা মেটানোর নরম ক্ষেত্র! পারিবারিক সূত্রেই এই বোধ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে বেড়ে ওঠে একটি বালক! ফলে সামাজ বাস্তবতার প্রতিফলনে এই জমিতেই জমে ওঠে তার মূল্যবোধ!

ভারতবর্ষের ঐতিহ্যের মধ্যেই নারীকে পুরুষের ভোগ্য করে রাখার প্রচলন চলে আসছে আবহমান কাল ধরেই! ফলে যারা বলেন পশ্চিমী খোলা দুনিয়ার খোলামেলা পোশাকের সংস্কৃতি এই সব অপসংস্কৃতির মূলে তারা সঠিক বলেন না! যে দেশে একদিকে দেবদাসী প্রথা আর একদিকে একটি পুরুষের বহু বিবাহ সমাজ স্বীকৃত ব্যবস্থা ছিল বহু শতাব্দীব্যাপী এবং আজও কোনো কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ে পুরুষের বহুবিবাহ প্রথা আজও প্রচলিত; সেখানে নারীর উপর পুরুষের ক্ষমতায়ন সতঃসিদ্ধ হবেই! ফলে ভালো মন্দ সকল পুরুষের মধ্যেই নারীকে ভোগ করার মানসিকতাতেই পুরুষার্থ বোধটি ষোলো আনা কাজ করে! এই সামাজিক পটভূমিতেই পারিবারিক সংস্কৃতির বিন্যাসে বেড়ে উঠতে থাকে ছেলেরা!

ভারতবর্ষের অধিকাংশ জাতিতেই অধিকাংশ সম্প্রদায়েই পুরুষতন্ত্রের ঘেরাটোপে, নারী মানেই পুরুষের পোষ্য! পুরুষের ইচ্ছাধীনেই নারীর স্বাধীনতার পরিসর! এখানেই পুরুষের মানসিকতায় নারীর প্রতি কোনো সম্মানবোধ গড়ে ওঠার পরিসর থাকে না! ফলত ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক সমাজবাস্তবতার উত্তরাধিকার সূত্রেই নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান কোনোকালেই দেওয়া হয় নি! বর্তমানে স্বাধীন ভারতবর্ষের সমাজে নারীর অবস্থানের মৌলিক কোনো পরিবর্তন আজও সূচীত হয়নি! হয়নি বলেই বধু নির্যাতন বধু হত্যার এত বাড়বাড়ন্ত! যে সমাজে নিজের স্বামীর কাছে, শ্বশুর বাড়িতেই নারীর জীবনের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে পথে ঘাটে তার সুরক্ষার নিশ্চয়তা কে দেবে!

ফলে ভারতবর্ষে ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়! এই রকম সামাজিক প্রেক্ষিতেই সুপ্ত থাকে এই জঘন্যতম অপরাধের বীজ! উপযুক্ত জলবায়ু পেলেই তা অঙ্কুরিত হয়ে ওঠে! পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজে শিশুদের শৈশব থেকেই প্রায় ছেলে মেয়েদের মধ্যে স্বাভাবিক মেলামেশার ক্ষেত্রগুলিকেই যথাসম্ভব সঙ্কুচিত করে রাখা হয়! আর এই পর্যায়ে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় ছেলেদের মেয়েদের আলাদা আলাদা স্কুল কলেজগুলি! জ্ঞান উন্মেষের সূচনা লগ্ন থেকেই সম্পূর্ণ এই অপ্রাকৃতিক অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগে শিশুমন সুস্থ হয়ে বিকশিত হবার সুযোগ পায় না! গড়ে ওঠে অজানা কৌতুহলের হাত ধরে একটা অসম্ভ্রমবোধের মানসিকতা! স্বাভাবিক মেলামেশার অভাবে শ্রদ্ধাবোধ জাগে না!

সামাজিক উৎসবে পার্বণেও এই লিঙ্গভেদের দূরত্বের কারণে ছেলেমেয়েদের মেলামেশা সহজ সচ্ছন্দ হয় না! ফলে একটা অজানা আকর্ষণ ক্রিয়াশীল থাকে! যে আকর্ষণটা মূলতই বয়সসন্ধি জনিত শারীরীক উত্তেজনা প্রসূত! যেখানে মানসিক সৌকর্য গড়ে ওঠার পরিসর থাকে না সমাজ বাস্তবতার পরিকাঠামোতেই! এইযে মানসিক সৌকর্য, এরই পরিশিলীত নিরন্তর অনুশীলনে গড়ে ওঠে পরস্পরের সম্বন্ধে শ্রদ্ধাজনিত সম্ভ্রমবোধের! যা থেকে সৃষ্টি হয় দরদের! গড়ে ওঠে দায়িত্ববোধ! সামাজিক প্রেক্ষিতে সুস্থ নৈতিকতার বাস্তবায়নে যা সবচেয়ে জরুরী! কিন্তু দুঃখের বিষয় ভারতবর্ষের

সমাজের সকল স্তরেই এই জরুরী বিষয়টাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত! এই অবহেলার পথরেখা ধরেই সমাজে দানা বাঁধে অসুখ!

এই যে সামাজিক অসুখ এরই অন্যতম ভয়ংকর প্রকাশ এই ধর্ষণ! মানুষের সমাজে এর থেকে জঘন্য অপরাধ আর হয় না! অথচ এই অপরাধের ফলে সমাজে প্রায় একঘোরে হয়ে পড়ে ধর্ষিতা নারী! সমাজ তাকে আর আশ্রয় দেয় না সসস্মানে! এই যে সমাজের ভূমিকা, যেখানে সে ভিকটিমের পক্ষে ততটা সহানুভূতিশীল নয়; এই ভূমিকাই অপরাধীদের উৎসাহ দেয় অপরাধে! একটি সমাজ যখন তার নৈতিক দায়বদ্ধতার দায় এড়িয়ে উদাসীন থাকে, বুঝতে হবে সেই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পচন! সেই পচন থেকেই সৃষ্টি হয় দূর্নীতির! জন্ম নেয় অপরাধী! ফলে ধর্ষণের ঘটনার দায় সমাজের ওপরও বর্তায়! আমরা স্বীকার করি আর না করি! আর সেই সুযোগে দূর্নীতির পালে হাওয়া লাগিয়ে অবাধে বিচরণ করে বেড়ায় অপরাধীরা!

ভারতবর্ষের সমাজে ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সর্বস্তরে যে অনৈতিকতা এবং আদর্শহীনতার বাড়বাড়ন্ত তারই প্রতিফলন; একদিকে গণতন্ত্রের নামে রাজনৈতিক দলতন্ত্রের ক্ষমতা নিয়ে ব্যাভিচার যার ফলে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দূর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার, আর অন্যদিকে অপরাধীদের অবাধ স্বাধীনতা ও দুঃসাহস! ধর্ষণের এত বাড়বাড়ন্ত এই সমস্ত কারণেই আজ এতখানি সমাজবাস্তব! ফলে ধর্ষণের বিরুদ্ধে যে কোনো সামাজিক আন্দোলনের অভিমুখকেই এই সমগ্র বাস্তবতার বিরুদ্ধে লড়তে হবে! কোনো একটি ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত নির্দিষ্ট অপরাধীর চরমতম শাস্তিবিধান নিশ্চিত করতে পারলেই কিন্তু আন্দোলন সফল হবে না! ধর্ষণমুক্ত সমাজ দূর্নীতি মুক্ত প্রশাসন ছাড়া সম্ভব নয়!

আবার দূর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নির্ভর করে সুস্থ সবল সুন্দর দায়িত্বশীল সমাজের উপর! যে সমাজ গড়ে ওঠে সুশিক্ষিত সুনাগরিকের ভিতের উপর! ফলে দেখা যাচ্ছে ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়ার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সুশিক্ষিত সুনাগরিকের সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে! তাই এই সামাজিক আন্দোলনের মূল অভিমুখ থাকা দরকার সার্বিক সুশিক্ষার প্রসারের দিকে! যে শিক্ষার ভিত্তি হবে সমস্ত রকম লিঙ্গ বৈষম্যের উর্ধে! যে শিক্ষার সূত্রপাত হতে হবে একেবারে প্রতিটি সংসারের নিজস্ব চৌহদ্দী থেকে! সমাজে সম্প্রদায়ে স্কুল কলেজে কর্মক্ষেত্রে যে শিক্ষাকে করতে হবে সর্বত্রগামী! সামাজিক অসুখকে সমাজের অন্তর থেকে না সারালে শুধুমাত্র ওপর থেকে কটা আইন প্রনয়ণ করে হবে না!

যে কোনো আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা রক্ষা করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের! যে দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রশাসন যত বেশি নিরপেক্ষ থাকতে পারে, সে তত বেশি দক্ষ হয়! এই নিরপেক্ষতা আর দক্ষতার বিষয়ে ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক প্রশাসনের সুখ্যাতি কেউ করবে না! কিন্তু এদেশের প্রশাসনের প্রতিটি অলিন্দে যে পরিমাণ দূর্নীতির চর্চা হয়, তাতে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে সাধারণ মানুষের অবস্থা জলে কুমীর ডাঙায় বাঘ নিয়ে বেঁচে থাকার মতো! ফলে এই রকম সামগ্রিক পরিস্থিতিতে নারীর সুরক্ষার বিষয়ে নিশ্চিত নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে কে? আইন আদলতও তো দূর্নীতির উর্দ্ধে নয়! পুলিশ সরকারী দলের আজ্ঞাবহ! স্বভাবতই এই অবস্থায় রক্ষকও ভক্ষক হয়ে উঠবে সেটাই খুব স্বাভাবিক! এবং অপরাধীরাও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক মঞ্চকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে সক্ষম হবে! ভারতবর্ষের সমাজে এটাই বাস্তব চিত্র! এই প্রেক্ষিতেই মোকাবিলা করতে হবে ধর্ষণের মতো নারকীয় অপরাধের সাথে! ফলে কাজটি যে চুড়ান্ত কঠিন তা বলাইবাহূল্য! শুধুই আইন আদালতের উপর ভরসা করে থাকলে কপাল চাপড়াতে হবে! কারণ সর্ষের মধ্যেই যে অনেক সময়ে ভুতের উপদ্রপ! আর এইখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সদর্থক সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয় উপযোগিতার! সমাজের সর্বত্র দূর্নীতির পচন ধরলেও এখনও বহু মানুষ সুনীতির পক্ষে আদর্শের পক্ষে জীবন সংগ্রাম করে চলেছেন! প্রয়োজন শুধু সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠার!

সামাজিক আন্দোলনের স্বার্থে চিন্তাশীল সুনাগরিকদের প্রবলভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে গড়ে তুলতে হবে সামগ্রিক প্রতিরোধ! এই প্রতিরোধী গণ আন্দোলনের অভিমুখ একদিকে যেমন সমাজের ভিতর থেকে শুদ্ধিকরণের প্রস্তুতিতে ক্রিয়াশীল থাকবে; সেই সঙ্গে একই সাথে সরকারী প্রশাসনের দায়বদ্ধতা সুদক্ষতা এবং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির উপর নিরন্তর গণতান্ত্রিক চাপ বজায় রাখতে স্বচেষ্ট থাকবে! প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও প্রয়োজনে অকার্যকর আইনের সংশোধন করে সংঘটিত অপরাধগুলির দ্রত সুবিচার সম্পন্ন করার বিষয়ে সংঘবদ্ধ সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম! বিভিন্ন গণ সংগঠন গুলির এই ব্যাপারে সামনে এগিয়ে আসা উচিৎ!

সংগঠিত প্রতিরোধী এই সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্বের ভার নিতে হবে নারীদেরকেই! কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ঘরে বাইরে নারী আজও শেষ পর্য্যন্ত পুরুষের উপরেই নির্ভরতার জীয়ন কাঠিটি ন্যাস্ত রাখে! আর তখনই মুখ থুবড়ে পড়ে সমস্ত প্রয়াসের মূল কার্যকারিতা! তাই নারী আন্দোলনের প্রবক্তাদের নিজেদের এই পুরুষ নির্ভরতা কাটিয়ে উঠে আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে হবে দ্রুত! নেতৃত্ব দিতে হবে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সুনাগরিকদের আত্মবিশ্বাসী প্রত্যয়ে! সামাজিক ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার সূত্রেই ধর্ষণ মুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব! এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার হাত ধরেই সম্ভব দেশের সামগ্রিক উন্নতির বাস্তবায়ন! সামাজিক সুস্থতা আজ তাই নারী আন্দোলনের উপরই নির্ভরশীল!

বাংলা সাহিত্যের কথা - রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

বাংলা সাহিত্যের কথা
রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য


(প্রথম পর্ব)

আজকাল যে বাংলা সাহিত্য আমরা পড়ি,তার আরম্ভ কি করে হয়েছিল এ ব্যাপারে যথেষ্ট কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। গদ্য না পদ্য, কি ভাবে লেখা হত এই সাহিত্য? কিরকম ছিল সেই ভাষা? আসুন, দেখা যাক কি ভাবে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা!
যতদূর জানা যায়,আনুমানিক খ্রীষ্টীয় নবম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় (মাগধী এবং প্রাকৃতের বাতাবরণে সংস্কৃতভাষার গর্ভে বাংলাভাষার জন্ম।) সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়। খ্রীষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ দোঁহা-সংকলন চর্যাপদ, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন।
অনেকেরই ধন্দ ছিল, চর্যাপদ আদৌ বাংলা ভাষায় রচিত কিনা!
প্রাচীন বাংলার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলির সন্ধানে প্রাকৃত বাংলায় রচিত চর্যাপদ একটি মূল্যবান উপাদান। ১৯২৬ সালে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রথম এই বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেন, তাঁর The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে। এরপর ডক্টর সুকুমার সেন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, তারাপদ মুখোপাধ্যায়, পরেশচন্দ্র মজুমদার ও ডক্টর রামেশ্বর শহ, চর্যার ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন। ফলে আজ চর্যার ভাষার স্বরূপটি অনেক বেশি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।
চর্যা পদসংগ্রহ প্রকাশিত হবার পর চর্যার ভাষা নিয়ে যেমন প্রচুর গবেষণা হয়েছে, তেমনি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্বজ্জনেরা এই ভাষার উপর নিজ নিজ মাতৃভাষার অধিকার দাবি করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর সম্পাদিত হাজার বছরের পুরান বাঙ্গলা বৌদ্ধ গান ও দোহা গ্রন্থের ভূমিকায় চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহপাদ ও কৃষ্ণাচার্যের দোহা এবং ডাকার্ণব-কে সম্পূর্ণ প্রাচীন বাংলার নিদর্শন বলে দাবি করেছেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের আবিষ্কর্তা ও সম্পাদক বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভও তাঁর দাবিকে সমর্থন করেন। ১৯২০ সালে বিজয়চন্দ্র মজুমদার তাঁদের দাবি অস্বীকার করে চর্যা ও অন্যান্য কবিতাগুলির সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্বন্ধের দাবি নস্যাৎ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৯২৬ সালে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর সেই, The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে চর্যাগান ও দোহাগুলির ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও ছন্দ বিশ্লেষণ করে শুধুমাত্র এইগুলিকেই প্রাচীন বাংলার নিদর্শন হিসাবে গ্রহণ করেন। ১৯২৭ সালে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্যারিস থেকে প্রকাশিত Les Chants Mystique de Saraha et de Kanha গ্রন্থে সুনীতিকুমারের মত গ্রহণ করেন।
যে সকল ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য চর্যার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ককে প্রমাণ করে সেগুলি হল সম্বন্ধ পদে –অর বিভক্তি, সম্প্রদানে –কে, সম্প্রদানবাচক অনুসর্গ –অন্তরে (মধ্যযুগীয় ও আধুনিক রূপ –তরে), অধিকরণে –অন্ত, -ত, অধিকরণবাচক অনুসর্গ –মাঝে, অতীত ক্রিয়ায় –ইল এবং ভবিষ্যত ক্রিয়ায় -ইব। চর্যা মৈথিলী বা পূরবীয়া হিন্দিতে রচিত হলে অতীত ক্রিয়ায় –অল ও ভবিষ্যতে –অব যুক্ত হত।
• গুনিয়া, লেহঁ, দিল, ভণিআঁ, সড়ি, পড়িআঁ, উঠি গেল, আখি বুজিঅ, ধরণ ন জাঅ, কহন না জাই, পার করেই, নিদ গেলা, আপনা মাংসে হরিণা বৈরী, হাড়ীত ভাত নাহি ইত্যাদি বাগভঙ্গিমা ও শব্দযোজনা বাংলা ভাষায় পরবর্তীকালেও সুলভ। এর সঙ্গে অবশ্য তসু, জৈসন, জিস, কাঁহি, পুছমি প্রভৃতি পশ্চিমা অপভ্রংশের শব্দও আছে। তবে সেগুলি মূলত কৃতঋণ বা অতিথি ( Loan words) শব্দ হিসাবেই চর্যায় ব্যবহৃত হয়েছে।
• এছাড়া সম্প্রদানে –ক এবং –সাথ, -লাগ, -লগ-এর বদলে সঙ্গে, সম অনুসর্গের ব্যবহার এবং নাসিক্যধ্বনির বাহুল্যের জন্য চর্যার ভাষাকে রাঢ় অঞ্চলের ভাষা বলে মনে করা হয়। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “চর্যার আচার্যেরা কামরূপ, সোমপুরী, বিক্রমপুর – যেখান থেকেই আসুন না কেন, আশ্চর্যের বিষয়, এঁরা সকলেই রাঢ় অঞ্চলের ভাষানীতি গ্রহণ করেছিলেন।”
• রাহুল সাংকৃত্যায়ন বা অন্যান্য ভাষার বিদ্বজ্জনেরা যাঁরা চর্যাকে নিজ নিজ ভাষার প্রাচীন নিদর্শন বলে দাবি করেছিলেন, তাঁরা এই রকম সুস্পষ্ট ও সুসংহত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের দ্বারা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হননি।
• চর্যার প্রধান কবিগণ হলেন লুইপাদ, কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, শবরপাদ প্রমুখ।লেখকেরা রাঢ় অঞ্চলের ভাষানীতি গ্রহণ করেছিলেন। সেটা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু কেন?
তাহলে, রাঢ় অঞ্চল সম্বন্ধে একটু লেখা যাক। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম ভাগে বর্ধমান বিভাগের অন্তর্গত একটি বিস্তৃত সমভূমি অঞ্চলের নাম ছিল/আছে রাঢ়। এর সীমানা পশ্চিমে ছোটনাগপুর মালভূমির প্রান্তভাগ থেকে পূর্বে গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের পশ্চিম সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চল ঈষৎ ঢেউ খেলানো ও এর ঢাল পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে।
‘রাঢ়’ শব্দটি এসেছে সাঁওতালি ভাষার ‘রাঢ়ো’ শব্দটি থেকে, যার অর্থ ‘পাথুরে জমি’। অন্যমতে, গঙ্গারিডাই রাজ্যের নাম থেকে এই শব্দটি উৎপন্ন। সুপ্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের অন্যতম প্রধান অবদানকারী।
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যেও রাঢ়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।মহাভারতে সুহ্ম ও তাম্রলিপ্তকে পৃথক করে দেখা হলেও গুপ্ত শাসনে রচিত দণ্ডীর ‘দশকুমারচরিত’-এ বলা হয়েছে ‘সুহ্মেষু দামলিপ্তাহ্বয়স্য নগরস্য’। অর্থাৎ দামলিপ্ত (তাম্রলিপ্ত) সুহ্মেরই একটি নগর ছিল। ধোয়ীর পবনদূত কাব্যে রাঢ় প্রসঙ্গে বলা হয়েছে –
গঙ্গাবীচিপ্লুত পরিসরঃ সৌধমালাবতংসো
বাস্যতুচ্চৈ স্তুয়ি রসময়ো বিস্ময়ং সুহ্ম দেশঃ।

অর্থাৎ, ‘যে-দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল গঙ্গাপ্রবাহের দ্বারা প্লাবিত হয়, যে দেশ সৌধশ্রেণীর দ্বারা অলংকৃত, সেই রহস্যময় সুহ্মদেশ তোমার মনে বিশেষ বিষ্ময় এনে দেবে।’ পরবর্তীকালে রচিত ‘দিগ্বিজয়-প্রকাশ’-এ বলা হয়েছে –
গৌড়স্য পশ্চিমে ভাবে বীরদেশস্য পূর্বতঃ।
দামোদরোত্তরে ভাগে সুহ্মদেশঃ প্রকীর্তিতঃ।
অর্থাৎ, গৌড়ের পশ্চিমে, বীরদেশের (বীরভূম) পূর্বে, দামোদরের উত্তরে অবস্থিত প্রদেশই সুহ্ম নামে খ্যাত। এই সকল বর্ণনার প্রেক্ষিতে বর্তমান হুগলি জেলাকেই প্রাচীন রাঢ়ের কেন্দ্রস্থল বলে অনুমান করা হয় এবং এর সীমানা বীরভূম থেকে মেদিনীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে অনুমান।

চৈতন্যচরিতামৃতের বর্ণনা অনুসারে, রাঢ়ের জঙ্গলাকীর্ণ পথে চৈতন্যদেব কাশীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কবির বর্ণনায় রাঢ়ের অরণ্যভূমির একটি কাল্পনিক বর্ণনা পাওয়া যায়, যা বাংলা সাহিত্যে একটি অন্যতম উজ্জ্বল কবিকল্পনা –

প্রসিদ্ধ পথ ছাড়ি প্রভু উপপথে চলিলা।
কটক ডাহিনে করি বনে প্রবাশিলা।।
নির্জন বনে চলেন প্রভু কৃষ্ণ নাম লৈয়া।
হস্তী ব্যাঘ্র পথ ছাড়ে প্রভুকে দেখিয়া।
পালে পালে ব্যাঘ্র হস্তী গণ্ডার শূকরগণ।
তার মধ্যে আবেশে প্রভু করেন গমন।।
ময়ূরাদি পক্ষিগণ প্রভুকে দেখিয়া।
সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ বলে নাচে মত্ত হৈয়া।।
হরিবোল বলি প্রভু করে উচ্চধ্বনি।
বৃক্ষলতা প্রফুলিত সেই ধ্বনি শুনি।।
ঝারিখণ্ডে স্থাবর জঙ্গম আছে যত।
কৃষ্ণনাম দিয়া কৈল প্রেমেতে উন্মত্ত।।
যাই হোক, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ছিল কাব্যপ্রধান। হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম ও বাংলার লৌকিক ধর্মবিশ্বাসগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এই সময়কার বাংলা সাহিত্য।মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, শাক্তপদাবলী,বৈষ্ণব সন্তজীবনী, রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের বঙ্গানুবাদ, পীরসাহিত্য, নাথসাহিত্য, বাউল পদাবলী এবং ইসলামি ধর্মসাহিত্য ছিল এই সাহিত্যের মূল বিষয়।
বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাস প্রধানত তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত:
• আদিযুগ বা প্রাচীন যুগ (আনুমানিক ৯০০ খ্রী.–১২০০ খ্রী.)
• মধ্যযুগ (১২০০ খ্রী.– ১৮০০ খ্রী.)
• আধুনিক যুগ (১৮০০ খ্রী. – বর্তমান কাল)।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো নির্দিষ্ট সালতারিখ অনুযায়ী সাহিত্যের ইতিহাসের যুগ বিভাজন করা সম্ভব নয়। যদিও সাহিত্যের ইতিহাস সর্বত্র সালতারিখের হিসেব অগ্রাহ্য করে না। সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্যে ও বৈশিষ্টে নির্দিষ্ট যুগের চিহ্ন ও সাহিত্যের বিবর্তনের ধারাটি বিশ্লেষণ করেই সাহিত্যের ইতিহাসে যুগবিভাগ করা হয়ে থাকে।
যেমন ধরুন:- এই লেখাটি এক শিলালিপিতে পাওয়া:-
শুতনুকা নম দেবদশিক্যী
তং কময়িথ বলনশেয়ে
দেবদিনে নম লূপদখে
এর অর্থ:- সুতনুকা নামে( নম) এক দেবদাসী(দেবদশিক্যী), তাকে(তং)কামনা করেছিল(কময়িথ) বারাণসীর(বলনশেয়ে)দেবদিন নামের এক রূপদক্ষ(লূপদখে), মানে ভাস্কর।

এটা কবে লেখা হয়েছিল, এখনও গবেষণার বিষয়বস্তু। তবে এটা যে আদিযুগ বা প্রাচীন যুগে লেখা হয়েছিল, মনে হয় এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলা সাহিত্যের উন্মেষের পূর্বে বাংলায় সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অবহট্ট ভাষায় সাহিত্য রচনার রীতি প্রচলিত ছিল। এই সাহিত্যের মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যের আদি অধ্যায়ের সূচনা হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি আক্রমণের বহু আগেই বাঙালিরা একটি বিশেষ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। উন্মেষ ঘটে বাংলা ভাষারও। তবে প্রথম দিকে বাংলায় আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও অনার্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেনি। সংস্কৃত ভাষায় লেখা অভিনন্দ ও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন, উমাপতি ধরের কাব্যকবিতা, জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় ও সদুক্তিকর্ণামৃত নামক দুটি সংস্কৃত শ্লোকসংগ্রহ; এবং অবহট্ট ভাষায় রচিত কবিতা সংকলন প্রাকৃত-পৈঙ্গল বাঙালির সাহিত্য রচনার আদি নিদর্শন। এই সব বই বাংলা ভাষায় রচিত না হলেও সমকালীন বাঙালি সমাজ ও মননের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীকালের বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্যে গীতগোবিন্দম কাব্যের প্রভাব অনস্বীকার্য।
আগেই বলেছি,বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন হল চর্যাপদ। খ্রিস্টিয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত চর্যা পদাবলী ছিল সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনসংগীত। আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকগণ বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে চর্যার ভাষা প্রকৃতপক্ষে হাজার বছর আগের বাংলা ভাষা। সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্র এই পদগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে। সাহিত্যমূল্যের বিচারে কয়েকটি পদ কালজয়ী।

শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন, বড়ুচণ্ডীদাস নামক জনৈক মধ্যযুগীয় কবি রচিত রাধাকৃষ্ণের প্রণয়কথা বিষয়ক একটি আখ্যানকাব্য। ১৯০৯ সালে বসন্ত রঞ্জন বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রাম থেকে এই কাব্যের একটি পুঁথি আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ সালে তাঁরই সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামে পুঁথিটি প্রকাশিত হয়। যদিও কারও কারও মতে মূল গ্রন্থটির নাম ছিল শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ। কৃষ্ণের জন্ম, বৃন্দাবনে রাধার সঙ্গে তাঁর প্রণয় এবং অন্তে বৃন্দাবন ও রাধা উভয়কে ত্যাগ করে কৃষ্ণের চিরতরে মথুরায় অভিপ্রয়াণ – এই হল শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের মূল উপজীব্য। আখ্যানভাগ মোট এগারোটি খণ্ডে বিভক্ত। পুঁথিটি খণ্ডিত বলে কাব্যরচনার তারিখ জানা যায় না। তবে কাব্যটি আখ্যানধর্মী ও সংলাপের আকারে রচিত বলে প্রাচীন বাংলা নাটকের একটি আভাস মেলে এই কাব্যে। গ্রন্থটি স্থানে স্থানে আদিরসে জারিত ও গ্রাম্য অশ্লীলতাদোষে দুষ্ট হলেও আখ্যানভাগের বর্ণনানৈপূণ্য ও চরিত্রচিত্রণে মুন্সিয়ানা আধুনিক পাঠকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চর্যাপদের পর ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ বাংলা ভাষার দ্বিতীয় প্রাচীনতম আবিষ্কৃত নিদর্শন। বাংলা ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসে এর গুরুত্ব তাই অপরিসীম। অপরদিকে এটিই প্রথম বাংলায় রচিত কৃষ্ণকথা বিষয়ক কাব্য। মনে করা হয়, এই গ্রন্থের পথ ধরেই বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলীর পথ সুগম হয়।

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর, ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানী, বাংলার দেওয়ানী বা রাজস্বের আদায়ের ভার পেয়ে গেল।ফলে, কয়েক বছরের মধ্যেই কোম্পানী; দেশের রাজশক্তি,একেবারে কুক্ষীগত করে ফেলে।“বণিকের মানদণ্ড পরিণত হলো রাজদণ্ডে”। পরবর্তী কালের নিরীখে, সূচনা হলো এক নতুন যুগের। এ সময়ের কিছু আগে থেকেই, বাংলায় গদ্য রচনা আরম্ভ হয়ে গেছিল। শুধু, খ্রীষ্টান মিশনারীরা নয়; ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরাও এ বিষয়ে যত্নবান হয়েছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য, স্মৃতি ও ন্যায় শাস্ত্রের কয়েকটি গ্রন্থের বাংলা অনুবাদের কাজ অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকেই শুরু হয়েছিল।বৈদ্য চিকিৎসকরাও, কয়েকটি কবিরাজী বই, বাংলা গদ্যে লিখেছিলেন। তেতো লাগলেও, এটা মেনে নিতে লজ্জা নেই যে ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অভ্যুদয় না ঘটলে; এ প্রচেষ্টা কতদূর ফলপ্রসু হতো, তা গবেষনার বিষয়বস্তু।কারণ,ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানী সাম্রাজ্যবাদের কুৎসিত নমুনা হলেও; বাংলা গদ্য সাহিত্য এই সাম্রাজ্যবাদের কাছেই ঋণী।ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানী, রাজ্যভার পেয়েই, দেশে আইনকানুন প্রণয়ণ করতে লাগল। সবটাই অবশ্য নিজেদের সুবিধের জন্য। চিঠিপত্র, দলিল দস্তাবেজের বাইরে, এটাই হলো বাংলা গদ্য ভাষার প্রথম কার্য্যকর ও ব্যাপক ব্যাবহার।
তারপর, বাঙ্গালিকে, ইংরেজী আর ইংরেজকে বাংলা শেখাবার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে, ব্যাকরণ আর অভিধান রচনা করা হতে লাগল। এ পর্যন্ত, হাতে লেখা বইয়ের ব্যাবহার ছিল। প্রচুর নকলনবীশ ছিলেন, যাঁরা এই বই গুলো হাতে নকল করে লিখতেন। কিন্তু, এগুলো ছিল, সময় ও ব্যায়সাপেক্ষ। তাই, ছাপার যন্ত্র আর বাংলা টাইপের প্রয়োজন অনিবার্য্য হয়ে উঠল।
বাংলা টাইপের সর্বপ্রথম ছেনী কাটেন একজন ইংরেজ।ইনি ছিলেন,ইস্ট- ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন কর্মচারী। নাম- চার্লস উইলকিনস। পরে অবশ্য ইনি স্যার উপাধি পেয়েছিলেন। এই সাহেব, শ্রীরামপুরের শ্রী পঞ্চানন কর্মকারকে বাংলা টাইপের ছেনী কাটান শিখিয়ে দেন। এইভাবে, বাংলা টাইপের আবির্ভাব হলো।বাংলা টাইপের প্রথম ব্যাবহার হয়; হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণে।১৭৭৮ সালে এটি হুগলি থেকে প্রকাশিত হয়।

 
যালহেডের আসল বাংলা ব্যাকরণ বইটির প্রচ্ছদের প্রতিলিপি

ফলে, বই আর সংকীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ না থেকে সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত হল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে, আমরা দেখতে পাই-দু- একটি আইনের বই; বাংলায় লেখা হয়েছিল। বইগুলো দলিল পত্রের মত, আরবী-ফার্সী শব্দে ভরা। তাই, পরবর্তীকালে এগুলোকে ঠিক সাহিত্যের কোঠায় ফেলা হয় নি।ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে বাংলা গদ্য সাহিত্যের ঢল নামল।খাস বিলেত থেকে আসা ইষ্ট- ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীদের(এদের সিভিলিয়ান বলা হত) শিক্ষার জন্য ১৮০০ খ্রীঃ এ কোলকাতায় কলেজ অব ফোর্ট উইলিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হল।এই কলেজে প্রাচ্য ভাষার অধ্যক্ষ নিযুক্ত হলেন-শ্রীরামপুরের মিশনারী পাদ্রী উইলিয়াম কেরী।১৮০১ সালের মে মাসে;উইলিয়াম কেরীর সহকারী পণ্ডিত ও মুনশী কয়েকজনকে নিযুক্ত করা হলে; কলেজের প্রকৃত কাজ শুরু হয়।
সিভিলিয়ানদের বাংলা পড়াতে গিয়ে, দেখা গেল- বাংলা বই গুলো সবই কাব্য। এখন প্রয়োজন হয়ে পড়ল বাংলা গদ্যের।কারণ, ব্যাবহারোপযোগী বাংলা গদ্য না পড়ালে সিভিলিয়ানরা তথাকথিত নেটিভদের সাথে কথা বলবে কি করে?
উইলিয়াম কেরী, তাঁর মুনসী এবং পণ্ডিতদের বললেন ব্যাবহারোপযোগী বাংলা গদ্যের বই লিখতে। নিজেও লেগে গেলেন। লিখে ফেললেন- একটা ব্যাকরণ, একটা অভিধান, একটা কথোপকথনের বই আর একটা গদ্য গ্রন্থ সংকলন। সূচনা হলো, বাংলা গদ্যের। নিজেদের রাজ্য শাসনের জন্য, এগুলো তৈরী করলেও; ভবিষ্যতের বাংলা গদ্য সাহিত্য ঋণী হয়ে থাকল এঁদের কাছে। যে বছর কলেজ কাজ আরম্ভ করল, সেই বছরেই প্রকাশিত হলো; কেরীর “ব্যাকরণ”, ‌‍রামরাম বসুর “প্রতাপাদিত্যচরিত্র”, আর গোলোক শর্মার “হিতোপদেশ”।‌‍রামরাম বসুর “প্রতাপাদিত্যচরিত্র”,বাংলা অক্ষরে ছাপা প্রথম মৌলিক গদ্য গ্রন্থ।

এর আগে, পোর্তুগীজ পাদ্রীরা যে সব গদ্য গ্রন্থ বের করেছিলেন, সে সবই ছিল ইংরাজি বা রোমান হরফে ছাপা।
এ প্রসঙ্গে, জানিয়ে রাখা যেতে পারে; অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে যে তিনখানা আইনের অনুবাদ গ্রন্থ এবং ১৮০০-০১ সালে বাইবেলের যেটুকু অনুবাদ, শ্রীরামপুর মিশন প্রকাশ করেছিল, তা কিন্তু বাংলা অক্ষরে ছাপা হয়েছিল।
রামরাম বসুর আর একটি গদ্য গ্রন্থ- “লিপিমালা”, প্রকাশিত হয়; পরের বছর অর্থাৎ ১৮০২ সালে। ১৮০৫ সালে প্রকাশিত হয়,চণ্ডীচরণ মুন্সীর- “তোতা ইতিহাস”। রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়ের- “ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম্” ।
সবাইকে ছাপিয়ে গেছিলেন- মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার। কলেজের শ্রেষ্ঠ গদ্য লেখক ছিলেন এই মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার। সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ এই মহাপণ্ডিত, কেরী সাহেবের ডান হাত ছিলেন। দেশী লোকের লেখা প্রথম ভারতবর্ষের ইতিহাস- “রাজাবলি”, এনারই রচনা। ১৮১৯ সালে ইনি প্রয়াত হন।
এরপর এলেন বিদ্যাসাগর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার, বিশেষত বাংলা গদ্যের বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধান পুরুষ ও অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। তিনিই প্রথম বাংলাভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ লিখেছেন, যা মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণেরই প্রসারণ/অনুবাদ হলেও আজ অব্ধি বাংলাভাষার ব্যাকরণ এই আদলের মধ্যেই রয়েছে। প্রয়াত হূমায়ুন আজাদ একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন পূর্ণাঙ্গ বাংলাভাষার ব্যাকরণ রচনার আগ্রহ ও প্রয়োজনীয়তার কথা অনেকবার বললেও কাজটি শেষ পর্যন্ত আরদ্ধই রয়ে গেছে, সম্ভবত যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে।
• মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগের ১৬টি স্বরবর্ণ রেখেছিলেন।
• ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ে প্রথম ভাগের ১৬টি থেকে কমিয়ে ১২টি স্বরবর্ণ করলেন। তিনি দেখালেন ৯, দীর্ঘ ৯, দীর্ঘ ঋ কারের কোনো দরকার নেই।
• মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগের ৩৪টি ব্যাঞ্জনবর্ণ ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগে ৪০টি ব্যাঞ্জনবর্ণ আনলেন।

শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়! অপেক্ষাকৃত নতুন বাংলা ভাষার বাক্যবিন্যাস কিন্তু নেওয়া হয়, ফার্সী থেকে। এলেন ঋষি বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ!


বাংলা হরফের বিবর্তন ও আরও কিছু ছবি


(২য় পর্ব )

উনবিংশ শতাব্দী থেকে বাংলা ভাষার আধুনিক যুগের শুরু । বাংলা সাহিত্যে গদ্যের ব্যবহার, এই যুগের থেকেই আরম্ভ হয়েছিল ।

সংস্কৃত শব্দের বা তৎসম শব্দের আমদানি হয়েছিল, গদ্যশৈলীর প্রবর্তনে । অধিকাংশ গদ্যলেখক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন বলে, এই সব তৎসম শব্দের বাড়াবাড়ি হয়েছিল, এটা বলতেই হবে ।

ইদানিং যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটা হল-বাংলা সাহিত্যে, ইংরেজী ইডিয়মের ব্যবহার প্রচুর । বিশেষ করে কম্পিউটার আসার পর, এই সব “টার্ম” প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার হচ্ছে । উভয় বঙ্গের “ভাষা সাহিত্যের” ভাষা এবং কোলকাতা অঞ্চলের ভাষা, শিক্ষিতের ভাষায় স্বীকৃত হচ্ছে নজর এড়িয়ে । এটা ভালো না মন্দ- ভবিষ্যৎ বলবে । রায় দেবার সময় এখনও সময় আসে নি । তবে, একটা কথা মনে হয়- লোকেরা যে সব শব্দে অভ্যস্ত, সেগুলো ব্যবহার করলে, গদ্য বা পদ্য আরও পাঠক পাবে ।

আগেই আমরা দেখেছি, বাঙলা ভাষার উপভাষা এবং কোন কোন অঞ্চলে চালু । এবারে বিশিষ্ট লক্ষণ গুলো দেখা যাক ।

রাঢ় বা পশ্চিমবাঙলার উপভাষায় অভিশ্রুতি আর স্বরসঙ্গতির ফলে বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে । যেমন :-

রাখিয়া > রেখে

করিয়া > কোরে

দেশী > দিশী

বিলাতি > বিলিতি

অ- কার এবং ও কারের প্রবণতা এই উপভাষায় লক্ষণীয় । যেমন :-

অতুল > ওতুল । আনুনাসিক স্বরের উপস্থিতিও একটা প্রধান বিশেষত্ব ।

চাঁদ, আঁট, কাঁটা, হাঁসপাতাল ( ইং – হসপিটাল) – এই গুলো উদাহরণ ।

পশ্চিমবঙ্গের উপভাষায় পদের স্বরধ্বনিতে শ্বাসাঘাত হয়ে থাকে , আর তার ফলে পদের শেষে থাকা ব্যঞ্জনবর্ণের মহাপ্রাণতা অথবা ঘোষবত্তা লোপ পেয়ে যায় ।

উদাহরণ দিচ্ছি :-

দুধ > দুদ, মধু > মদু, ইং লার্ড ( লর্ড) > লাড> লাট ।

কয়েকটা জায়গায়, অঘোষধ্বনি, ঘোষ হয় । ছত্র > ছাত > ছাদ, কাক> কাগ, শাক> শাগ, ফারসী গলৎ > গলদ ।

এবারে, পূর্ববঙ্গের উপভাষায় অভিশ্রুতি আর স্বরসঙ্গতি নাই । তাই স্বরধ্বনিতে অনেকটা প্রাচীনত্ব বজায় আছে ।

রাখিয়া >*রাইখিআ > রাইখা , করিয়া > *কইরিয়া > কইরা, দেশি > দেশি ।

য- ফলা যুক্ত যুক্তব্যঞ্জনেও অপিনিহিতি হয় । সত্য > সইত্ব । ব্রাহ্ম > *ব্রাহ্ম্য > ব্রাইম্ম ।

আবার, এ- কার এবং ও- কার প্রায়ই আ্য- কার এবং উ- কারে পরিণত হয় । লক্ষণীয় যে, আনুনাসিক স্বরধ্বনির অস্তিত্ব একেবারেই নেই । শ্বাসাঘাতেরও নির্দ্দিষ্ট স্থান নেই । ঘোষ বর্ণের মত মহাপ্রাণ অর্থাৎ চতুর্থ বর্ণ মহাপ্রাণতা ছেড়ে এক রকম বিশেষ তৃতীয় বর্ণে রূপান্তরিত হয় ।

ভাত >ব’আত্ ,ঘা > গা’আ ।

ড়-কার,ঢ়-কার, রকারে পরিণত হয়ে যায় । এইজন্যই অনেকের র-কার আর ড়- কার ঠিক মত বসাতে পারেন না ।

এবারে, যে সব শব্দ আধুনিক বাংলা ভাষায় সরাসরি সংস্কৃত থেকে এসেছে , সেগুলো তৎসম ( তাহার সম ) শব্দ । এবারে কালের নিয়মে উচ্চারণ দোষে সে শব্দগুলো একটু বিকৃত হয়ে গিয়েছে, সেগুলো হল – অর্দ্ধ তৎসম শব্দ ।

শ্রদ্ধা ( তৎসম ) >সাধ >ছেদ্দা,ছরাদ । কৃষ্ণ > কেষ্ট > কানাই, কানু ( এটা তদ্ভব , মানে “ কেষ্ট” থেকে এর উদ্ভব ) ।

এছাড়াও প্রচুর আরবী, ফারসী, তুর্কি,পর্তুগীস, ওলন্দাজ, ইংরেজী শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে । এগুলোকে ইংরেজীতে বলে- লোন ওয়ার্ডস । বাংলা করলে দাঁড়ায় কৃতঋণ শব্দ ( বাংলাদেশ এই শব্দটার বাংলা করেছে) । পশ্চিম বঙ্গে বলা হয় – অতিথি শব্দ ।

আলমারী, পাঁও, আনারস, আলপিন,বাসন – পর্তুগীস শব্দ ।

আবার দেখুন – ঝিঙ্গা হচ্ছে সাঁওতালি শব্দ । লুঙ্গি- বার্মিস ।

কিছু গ্রীক শব্দও এসেছে ।

যেমন- দাম ( এখানে পয়সা অর্থে, বাংলা শব্দ ) । সংস্কৃত হলো – দ্রাম্য । গ্রীক মূল শব্দ- দ্রাখ্ মে । (drakhme)

আন্দাজ, খরচ, কম, বেশী, নগদ- ফারসী শব্দ ।

আক্কেল, হুঁকা, কেচ্ছা,খাসী, তাজ্জব – আরবী শব্দ ।

আলখাল্লা, উজবুক,কাবু, কুলি,চাকু – তুর্কি শব্দ ।

এগুলোও বাংলা ভাষা আত্মসাৎ করেছে । যেমন , কয়েকটা ইংরেজী শব্দ বাংলাভাষা আত্তিকরণ করেছে ।

সিনেমা, চেয়ার, টেবিল, কাপ, প্লেট – উদাহরণ ভুরি ভুরি ।

ইদানীং নেটের কল্যাণে এসেছে – আড্ডানো, আপলোডানো , ফেসবুকীয়র মত বহু শব্দ । তাই বাংলা ভাষা এখন আর সংস্কৃতের ঘেরাটোপে আবদ্ধ নেই । প্রামাণ্য বাংলা ভাষাও বলে আজকাল আর কিছুই নেই । এটা আক্ষেপ নয় । এই রকম প্রচুর শব্দ আছে । লেখক কি লিখবেন, সেটা তাঁর নিজস্ব পছন্দ । পাঠক পড়ে যদি বুঝতে পারেন, তাহলে এই সব ব্যবহারে বাংলা সাহিত্যে ছুৎমার্গ না রাখাই ভালো ।

একটা অক্ষম প্রয়াস করলাম । ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, পরিবর্তন যদি জীবনোর সব ক্ষেত্রে আসে, তবে ভাষায় কেন আসবে না ?

অলমতি