পুস্তক সমালোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পুস্তক সমালোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১ অক্টোবর, ২০১৩

বুক রিভিউ – ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী

কালকূট এর ‘মুক্ত বেণীর উজানে’ বইটি নতুন করে পড়ে জানালেন ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী


কালকূটের লেখা উপন্যাসের উপরে অভিমত প্রকাশ করতে হবে এই ধারণাটা মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দের সঞ্চার করেছিল। তাই আরও বেশি সতর্ক ছিলাম, যে অনুভূতির প্লাবনে যেন ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্রতর বিষয়গুলি যেন ঢাকা না পরে যায়। লোক কথায় বা দর্শনেও আছে, কোন জায়গার আন্তরিক ডাকই তাকে তীর্থ বানায়। ভাবলে অবাক লাগে এই তীর্থ কি শুধু বাইরে, নাকি অন্তরেও। মানুষের মন ও অনুভূতির জগতে এমন এমন সব জায়গা আছে যা আমাদের কাছে তীর্থের মতন আকাঙ্ক্ষিত। মুক্ত বেণীর উজানে পড়তে পড়তে শুধু ভ্রম লাগে যে এই সকল তীর্থ স্বরূপ মন জগতের স্থান গুলি কি শুধু মাত্র ভেসে আসা চরিত্র গুলির মনের নাকি লেখকের চোখ যা এক মানবতার চশমা হিসেবে আমাদেরকে দেখতে সাহায্য করছে। প্রত্যেকটি চরিত্র রোজকার উঠে আসা জীবন থেকে নেওয়া অথচ তারা নিজ গুনে বিরল। কাহিনীর শুরু হয় লেখকের ত্রিবেণী যাত্রা পথের বর্ণনা দিয়ে। সেখান থেকেই ঘটনা প্রবাহ এগোতে থাকে। শুরুতে ওপার বাংলার থেকে আসা সর্বহারা মহিলাদের রিফিউজি ক্যাম্প এবং তাদের জীবন যাত্রার কাহিনী আমাদের কাছে দেশ ভাগের এক বাস্তব ও করুন চিত্র প্রকাশ হয়। এই সকল মেয়েদের চাওয়া পাওয়া কামনা সমস্ত কিছুই লেখকের চোখ এড়ায় না। যেমন এড়ায় না এমদাদ আলি খাঁর চোখ। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তার মধ্যে যেমন পুরোমাত্রায় কৌতুক রস যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে এক মানবিকতা বোধ। মানবিকতা বোধ বলতে গেলে প্রথমে যে প্রশ্ন আসে মানুষ বলতে কি বুঝি। দয়া, মায়া, মমতা , এমন কি প্রাসঙ্গিক ভাবে বেশ্যার শব বহন করার জন্য লেখকের কাঁধ বাড়িয়ে দেওয়া। নাকি তার বাইরেয়ও কোন



প্রাসঙ্গিকতা আছে। মানুষের মনের মধ্যে যে এই দ্বিধা এবং তার স্তর ভেদ; তার চেতন ও অবচেতনের লড়াই, এ সবই আমাদের মানুষ করে। মৃতা বেশ্যা চন্দ্রাবলীকে কেন্দ্র করে যে চাওয়া পাওয়ার ছবিটি ফুটে উঠেছে, তার মধ্যে যেমন তিক্ততা আছে তেমনি মাধুর্য আছে। ভ্রম হয় কোনটা রক্তের সম্পর্ক আর কন্তি নয়; তার ছেলের অর্থলিপ্সা যেমন আমাদের কষ্ট দেয় তেমনি বাকি বেশ্যাদের তার শব বহন করার মধ্যে দিয়ে কর্তব্য ছাড়িয়ে যে মানবিকতা বোধ ফুটে ওঠে তা পাঠক কে মুগ্ধ করে। এই সকল ছোট ঘটনার থেকে এক বিরাট চিত্রের ইঙ্গিত বহন করে আনে। মৃতা মহিলাকে কেন্দ্র করে যেমন অনুভূতির মেরুকরণ যেমন বিদ্যমান তেমনি থাকুরমশাইয়ের মত চরিত্রে বিদ্যমান অনুভূতির সদা আসা যাওয়া। সবচেয়ে মুগ্ধ করে যেটি সেটি হচ্ছে মানুষের প্রতি মানুষের এক স্নেহের ফল্গু ধারা। এর গতিপথ যেমনি জটিল তেমনি আকস্মিক; অচেনা অজানা পাথরে ধাক্কা খেয়ে সে ধারা সমানে বহে চলে। সবচেয়ে বড় উধাহরন হল চক্রবর্তী মহাশয়। তার আপাত রুক্ষ স্বভাব ও জাত পাতের ভেদের আড়ালে যে তার মানবিক স্নেহশীল মনটা লুকিয়ে ছিল তার পরিচয় পেতাম না যদি না লেখক তার বাড়িতে আশ্রয় না নিতেন। শুধুমাত্র চক্রবর্তী মহাশয়ের কথা বললে একটি পরিবারের আন্তরিকতার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ বলা হয়না। তার স্ত্রী ও তার মেয়ে, তার পরিবারের দুই নারী চরিত্র তাদের অহেতুকই ভালোবাসা এক অচেনা ব্যাক্তির প্রতি আমাদের মুগ্ধ করে। এবং স্বাভাবিক ভাবেই তার প্রকৃতি আলাদা। প্রত্যেকটি ভালবাসা আলাদা আলাদা করে তার স্বকীয়তা বজায় রাখে। একটি কিশোরীর মনের পথের আলিন্দে যে চাওয়া পাওয়া বা ভালোবাসার কথা লেখা থাকে তা অত্যন্ত সুন্দর ভাবে এখানে প্রকাশিত হয়েছে। এবং কাহিনীর শেষে আসে এমন একজন চরিত্র যা আমাদের মনে ভয়, পুলক এবং আনন্দের সঞ্চার করে। এই “খ্যাপা বাবা” এমন একটি ব্যাক্তি যিনি দুজন তরুণী ও একজন চেলা কে নিয়ে নৌকা বিহার করেন। এক বিরাটের অবস্থান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল দুই ভিন্ন পরিবেশের মানুষের (খ্যাপাবাবা ও লেখক) মেয়েদের সম্বন্ধে অভিমত নিয়ে। এখানেই সবচেয়ে অসামন্যতা, দুজনেই তাদের জীবন আর অভিজ্ঞতা দিয়ে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন “নারী তুমি, তুমি শক্তি, তুমি প্রেম, তুমি ত্রিভুবন ধারা ।” ভারতের শাক্ত ধর্মের ইতিহাসে এমন অনেক সাধক দেখতে পাই। কিন্তু তাদের মন জগতে প্রবেশ করার সৌভাগ্য কজনের হয়। এবং সেখানে পউছেও শত অচেনার মাঝে সেই চেনা সুর কানে বাজে, চোখের সামনে ধুসর হয়ে যায় তীর্থের আচার আচরণ , শুধু ভেসে ওঠে কালব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের চাওয়া পাওয়া ভালোবাসার কথা।

সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৩

পুস্তক সমালোচনা : সুবীর সরকার

নির্বাচিত কবিতাঃ সুবীর সরকার
একলব্য হরিণ


একজন কবির ষোল বছর ধরে লিখে চলা কবিতার বইগুলি থেকে যখন নির্বাচিত সংগ্রহ পড়া হয় তখন তা শুধুই কবিতাপাঠ থাকে না,তা হয়ে ওঠে অভিযাত্রাও। কবির ভাঙা-গড়া আলো-অন্ধকার হয়ে ওঠে পাঠকেরও আত্মজ্ঞান।কবিতার মাধ্যমে একজন কবি তো নির্মাণ করে চলেন তাঁর বিশ্ববোধ,তাঁর সময়। চলমানতার এই বিষয়টি পাঠকের একটি বাড়তি পাওয়া।এই বাড়তি পাওয়া টুকু সঙ্গে নিয়েই আমরা হাতে তুলে নিই সুবীর সরকারের নিবার্চিত কবিতা।এই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ যাপনচিত্র থেকে ২০১১-তে প্রকাশিত বিনোদন বিচিত্রা পর্‍যন্ত ১৬ টি গ্রন্থের নিবার্চিত কবিতাগুলি।

প্রথম কবিতাটি শুরুই হচ্ছে -অথচ নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে সুপুরীবাগান পর্‍যন্ত/ যাওয়া হয়ে ওঠেনি আমার।একটি কবিতা যখন অথচ এই সংযোজক দিয়ে শুরু হয় তখন আমরা বুঝি কবি পাঠককে একটু অচেনা পথে হাঁটার আমন্ত্রন জানাচ্ছেন।সংযোজক দিয়ে কবিতা আরম্ভের ব্যাপারে অনেকে তাঁদের অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বাংলাসাহিত্যে।আমরা সেইসব নিষেধাজ্ঞা আপাতত অমান্যই করছি।আসলে যে পংক্তিটি হওয়া উচিত ছিল কবিতার শেষ পংক্তি তাকেই প্রথমে নিয়ে এসে ভেঙে দিয়েছেন মান্য পারম্পর্‍য।বাধ্যতার রাস্তাঘাটগুলি কবিকে তাঁর একান্ত গন্তব্য থেকে বিরত রাখছেঃ আর সেই শহরের ঝুলে থাকা রাস্তাঘাট/আমি কিছুতেই অতিক্রম করতে পারিনা।বাধাস্বরূপ এইগুলি তো আসলে গুরুত্বপুর্ন নয়,গুরুত্বপুর্ন ছিল প্রসঙ্গতঃ এই যে না যেতে পারা,আকাঙ্ক্ষা থেমে যাওয়া এই এক বিষন্নবোধ সুবীরকে বলা যায় কখনওই পিছু ছাড়ে না। পরবর্তীতে জোকারের দিনলিপি কবিতায় আবার তাকে আমরা বলতে শুনছি-বড় জোর কাঠের পুল তার বেশি আর যাওয়া হয় না।দূরে কোথায়,দূরে কবির মন ঘুরে বেড়ায়,সুবীর যেন কিছুতেই সেই দূরত্বটুকু অতিক্রম করতে পারেন না।তাই রোমান্টিকতা সুবীরকে জারিত রাখে।যাই হোক,বিষয়টি ঠিক একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।উনিশে আগস্টের কবিতা থেকে আত্মজীবনীর ছেঁড়া অংশ-র প্রথম অংশ-র শুরুর শব্দটি হল তারপর; আরও স্পষ্ট করে কবিকে আমরা স্পর্শ করতে পারি যখন তৃতীয় অংশ তিনি শুরু করেন এই বলে যে-তো ব্যস্ত রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে একা একা নদীর দিকে যায় জীবন—।আমাদের এইরকম মনে হয় যে কোনও আরোপিত অবস্থান নয়,এই লেখক কবিতাযাপন করেন।দিনের যে কোনও মুহুর্ত,উচ্চারিত যে কোনও প্রাত্যহিকতা থেকে সুবীরের কবিতা শুরু হতে পারে,হয়ে যায়।

যেমন অসুখ সংবাদ পড়ছি কবিতাটি।পরিচিত কেউ,হয়তো বিশেষ কেউই,হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর রয়েছে।কবি তাকে দেখতে গিয়েছেন।এই সরল স্বাভাবিক ঘটনা থেকে শুরু হয়ে কবিতাটি ভেঙে ফেলল তার স্বাভাবিক চলন।সুবীর লিখলেনঃ

অস্ত্রোপচারের পর তুমি কেমন আছো এটা জানবার
জন্য আমি হাসপাতালে যাই
অন্ধকারে বেজে ওঠে ব্যান্ডপার্টি... জলাশয়ে জল নেই
তাই সরাইখানা নাম পালটে এখন গার্লস হস্টেল
প্রতিরক্ষা ভেঙেপড়ছে...যদিও ডেটল সাবান, ব্লাডব্যাঙ্ক
অ্যাম্বুলেন্স-এইসব কেন্দ্রে রেখে
জীবন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে আমার

অসুস্থ-আমরা সঠিকভাবেই ধরে নিচ্ছি-মেয়েটির অবস্থা আমাদের কবি স্পষ্ট করে জানান না।ব্যান্ডপার্টির উল্লেখে আরোগ্যের কথা ভাবি,আবার প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ছে ভেবে আমাদের ভাবনা অন্যতর হয়।এবং এইসব অনুষঙ্গে এবং এই আরোগ্য বা আরোগ্যহীনতায় কবির জীবন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।

ঠিক এই কবিতার পাশাপাশি আমরা যখন তুমি দীর্ঘবেনী খুলে দিলে-র মত কবিতা পড়ি তখন পাঠক হিসেবে সে এক পরিপূরক প্রাপ্তি।নিজের মত করে বলে ওঠা সম্বোধনে,নিজের মত করে ভেবে ওঠা শব্দের রূপমায়ায় কবিতাটি সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে।ধ্রুপদী রোমান্টিকতার বৈশিষ্ট্য যে বিষন্নতা-সেই বিষন্নতা কবিতাটিকে স্পর্ষ করে র‍য়েছে।তাই আমরা পড়ছিঃ

আলোঢালা আকাশ আমি তোমার কাছে
সমুদ্রের ঠিকানা চেয়েছিলাম
জীবনে আঙুল ডুবিয়ে বিষাদের আঙুল ডুবিয়ে
দেখি আরো আরো জীবন

তুমি দীর্ঘবেনী খুলে দিলে শুরু হবে নগরকীর্তন।

যে গল্পটির আভাস লুকিয়ে রেখেছে কবিতাটি,সেই গল্প এই সংকলনে প্রায় ফল্গুর মতন বহমান।কেবল পালিয়ে বেড়ানো এক অবয়ব, পরিপূর্নভাবে স্পর্ষ করতে না পারা এক অনুভব সংকলনটিকে এক মায়ারহস্যের আলোর ভরিয়ে রেখেছে।চাপা বিষাদের কবিতা-র নাম থেকে আমরা এই বোধটিকে চাপা বিষাদের বোধ হিসেবে অভিহিত করতে পারি।শোকচিহ্ন কবিতাটি জন্মদিনের কথা বলেছে,কিন্তু আমরা একটু বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করি তার পিছনে খেলা করছে কিছু অন্ধকার।বক্তব্যবিহীন দু-একটি ছবি-কিন্তু তারাই এঁকে দিচ্ছে জীবনের কোনও একটি টুকরো কিন্তু সম্পুর্ণ ক্যানভাসঃ

হারিয়ে যাবার কথা উঠলেই একটা গোটা
হাসপাতাল
জন্মদিন পালন করি রক্ত
ও ডেটল দিয়ে।
বিজ্ঞাপনের শহর-কবিতায় সুবীর সম্ভবত একটি আত্মস্বীকৃতি নথিভুক্ত করেছেনঃ ...এইসব
কেন্দ্র করে ধিরস্থির জমে ওঠে আমাদের
বিষাদযাপন
এই মূল ভরকেন্দ্রসম সুরটিকে আমরা মান্যতা দিলাম।

০২।

একজন কবিকে তাঁর শব্দব্যবহার,তাঁর দৃষ্টির ভিন্নতা দিয়ে যদি চিহ্নিত না করা যায় তাহলে তা কিঞ্চিৎ হতাশই করে।সুখের কথা সুবীরের কবিতা আমাদের হতাশ করে না।

জ্যোৎস্নায় কিছু বর্ণনা করলে আমরা চাঁদের আলোয়-ই সাধারণতঃ লিখে থাকি।সুবীর লেখেন-কিছুটা চাঁদের আলো ধার করে।এই যে ধার করা ক্রিয়াপদ তিনি চাঁদের আলো সম্পর্কে লিখলেন প্রথম পংক্তিতে (কবিতার নামকরণেও),আমরা অন্যমনস্ক হতে পারি না।আর তিনি শেষ করছেন এই লিখে যে-আর কিছুটা চাঁদের আলো ধার করে উড়ে/আসে বৃষ্টিঠোঁট পাখিরা। ছোট কবিতা; কিন্তু সূচনা ও সমাপ্তির মধ্যে তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন ব্যক্তিগত শোকযাত্রা,মহাজাগতিক সংঘটন,লোকগান। প্রক্ষিপ্ত নয়,বিস্তারিত নয়___ কিন্তু নিজস্ব রসায়নে কবিতা হয়ে ওঠা।

কবিতা হয়ে ওঠা এই নৈপুন্যে সুবীর আমাদের আশ্চর্‍য করেন তাঁর মিতবাক দক্ষতায়।প্রায় সমস্ত কবিতাতেই সুবীর পংক্তির একটি বা দুইটি শব্দকে ভেঙে দিয়ে আলাদাভাবে লেখেন।একটু বেশি গুরুত্ব আদায় করে নেন পাঠকদের কাছ থেকে।ফলে কবিতার শরীরে যেমন একদিকে অতিরিক্ত শাখাপ্রশাখা যুক্ত হয়,অন্য দিকে নির্মিত হয় একটি নিজস্বতা।আমরা একটি মাত্র কবিতার উল্লেখ করছি___ আবহসংগীত (গ্রন্থঃ মেঘকলোনির কবিতা)।প্রথম পংক্তি থেকে দ্বিতীয়ে,দ্বিতীয় থেকে তৃতীয়ে,তৃতীয় থেকে চতুর্থে... এই ভাবে পংক্তিগুলি সামান্য ছোট করতে করতে সুবীর গান গড়িয়ে নামার একটি চিত্র উপস্থাপিত করেন।তারপর,একদম শেষ পংক্তিতে শেষের শব্দটি ভেঙে নীচে লিখে কবিতাটি সম্পুর্ন করেন।শব্দটি পংক্তিতে সংযুক্ত থাকলে যে অভিঘাত জাগাত পাঠকের মনে, তার থেকে অনেক অনেক বেশি ভারী হয়ে ওঠে আলাদা লেখায়। শব্দটি?অন্যমনস্কতা।

সুবীর, ব্লারব থেকে জানলাম তিনি কুচবিহারে থাকেন।কুচবিহারে কিছুদিন ধরে রয়েছেন আরও এক অগ্রজ কবি সুব্রত রুদ্র।সহনাগরিকত্বের কোনও এক বন্ধন বোধহয় কবিতাকেও জারিত করে।সুব্রত –কে নিয়ে সুবীর লিখেছেন ওড টু এ টল পোয়েট...। আমরা যারা সুব্রত-র কবিতাকে চিনি,তারা জানি সুবীরের ___আপনার নিঃশ্বাসের ভিতর অতিমন্থর বৃষ্টিদিন বা নাতিদীর্ঘ সেতুর ওপর আপনি রেখে আসেন/পিতামহর চিরুনি,গত শতকের পালকি/আর আপনাকে অনুসরণ করে প্রেমের গল্প,টুকরো মেঘ।এবং পরবর্তী গ্রন্থের নাম-উনিশে আগস্টের কবিতা। নাম কবিতাটি এক কবির জন্মদিনে উৎসর্গ করা হয়েছে।ঘটনাচক্রে আমাদের জানা আছে দিনটি কবি সুব্রত রুদ্র-রও জন্মদিন।সব মিলিয়ে বিষয়টি বাংলাকবিতার বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।নব্বই-এর একজন সহযাত্রী হিসেবে সুবীরকে এই প্রতিবেদকের অভিনন্দন।

বোধে ও অনুভবে,মেধায় ও নির্মাণে সুবীর সরকার তাঁর প্রকৃতিসম্মেলনে,সংলাপময়তায় এবং প্রেমের সংবেদন ও বেদনায় বাংলাকবিতায় এক নিজস্ব ভুবন গড়ে তুলছেন।তাঁর শহরে,তাঁর কবিতায় কখনও কখনও আমাদের ভ্রমন আমাদের আনন্দ দিয়ে চলুক।


নির্বাচিত কবিতাঃ সুবীর সরকার
কবিতা ক্যাম্পাস,হাওড়া-০৬
কলকাতা বইমেলা,২০১২

শনিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১২

ভানুসিংহের পদাবলী - ইন্দ্রাণী সরকার

ভানুসিংহের পদাবলী
ইন্দ্রাণী সরকার

ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ কৈশোর ও প্রথম যৌবনে "ভানুসিংহ" ছদ্মনামে বৈষ্ণব কবিদের অনুকরণে কিছু পদ রচনা করেছিলেন | ১৮৮৪ সালে সেই কবিতাগুলিই ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী নামে প্রকাশিত হয় | কবিতাগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশের পূর্বে বিভিন্ন সময়ে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাগুলি রচনার ইতিহাস পরবর্তীকালে জীবনস্মৃতি গ্রন্থের ভানুসিংহের কবিতা অধ্যায় বিবৃত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

পদাবলী শব্দের অর্থ

পদাবলী শব্দের উৎস জয়দেবের ‘মধুরকোমলকান্তপদাবলী’। ‘পদসমুচ্চয়’ অর্থে পদাবলী শব্দের প্রয়োগ প্রথম পাওয়া যায় সপ্তম শতাব্দীতে, আলঙ্কারিক আচার্য দণ্ডী-র কাব্যাদর্শে। বাংলায় সুদীর্ঘ কাল ধরে পদাবলীকে যোগরূঢ় অর্থে গানের পর্যায়ভুক্ত করবার প্রচলন চলে আসছে। পদাবলী ভারতীয় গীতিকবিতার সমৃদ্ধ ভাণ্ডারের মধ্যে অন্যতম। বৈষ্ণব সাহিত্যের অন্তর্গত এই গীতিকবিতাগুলি রাধাকৃষ্ণের প্রেম বিষয়ক। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৈষ্ণব মতের আধিপত্যের সময় সেই অঞ্চলের বৈষ্ণব পদকর্তারা মিথিলা অঞ্চলের লৌকিক ভাষা মৈথিলীতে বৈষ্ণব পদ রচনা শুরু করেন। পরবর্তী কালে মৈথিলীর সঙ্গে অন্যান্য লৌকিক ভাষার সংমিশ্রণে একটি কৃত্রিম সাহিত্য সৃষ্টির ভাষার উদ্ভব হয় যা ব্রজবুলি নামে পরিচিত। বৈষ্ণব পদাবলিতে প্রাচীন সংস্কৃত কাব্য প্রভাবিত ছন্দের প্রাধান্য দেখা যায়, ভান বা ভানিতা অর্থাৎ পদের মধ্যে পদকর্তার নামের উল্লেখ বৈষ্ণব পদাবলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
প্রাচীন বৈষ্ণব কবিদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তরুণ রবীন্দ্রনাথ আনুমানিক ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সকালের মধ্যে ‘ভানুসিংহ’ এই ছদ্মনামে যে ২১ টি পদ রচনা করেন, তাই ভানুসিংহের পদাবলী নামে পরিচিত। আঙ্গিক ও সুর সংযোজনার বিচারে এই পদাবলী রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত সৃষ্টির এক অন্যতম বিশিষ্ট সম্পদ।

‘জীবন-স্মৃতি’ র ‘ঘরের পড়া’ পরিচ্ছেদে কবি জানিয়েছেন, অক্ষয়চন্দ্র সরকার ও সারদাচরণ মিত্র সম্পাদিত প্রাচীন কাব্যসংগ্রহ সেই বয়সেই তার বিশেষ প্রিয় ছিল। ১২৮১ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাস থেকে এই পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে মাসে মাসে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, রামেশ্বর প্রমুখ প্রাচীন বৈষ্ণব কবির পদাবলী টীকা সহ প্রকাশিত হতে থাকে ১২৮৩ অবধি। কবি জানাচ্ছেন, বাড়ির গুরুজনেরা এগুলির গ্রাহক হলেও নিয়মিত পাঠক ছিলেন না বলে এগুলো জড়ো করে আনতে বালক কবিকে বেশি কষ্ট পেতে হত না। জ্যতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে এই সংগ্রহের অনিয়মিত ভাবে প্রকাশিত খণ্ডগুলি আসত। গুরুজনদের পড়া হলে বালক কবি এগুলো সংগ্রহ করে নিতেন। বিদ্যাপতির দুর্বোধ্য বিকৃত মৈথিলী পদগুলি অস্পষ্ট বলেই বেশি করে কবির মনোযোগ টানত। কবি টীকার ওপর নির্ভর না করে নিজে বুঝবার চেষ্টা করতেন, বিশেষ কোনো দুরূহ শব্দ ও ব্যাকরণের বিশেষত্বগুলি কবি তার বালক বুদ্ধি অনুসারে যথাসাধ্য নোট করে রাখতেন একটা ছোট বাঁধানো খাতায়। এই খাতার নোট অবলম্বনে রচিত বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ, প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ – বিদ্যাপতি, প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ – উত্তর প্রত্যুত্তর, বিদ্যাপতির পরিশিষ্ট, প্রভৃতি ভারতী পত্রিকায় যথাক্রমে ১২৮৮ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ, ভাদ্র এবং কার্তিক সংখ্যায় পত্রস্থ হয়।

‘জীবন-স্মৃতি’ র ‘ভানুসিংহের কবিতা’ পরিচ্ছেদ থেকে জানা যায় প্রাচীন কাব্যসংগ্রহের মৈথিলীমিশ্রিত ভাষা বালক রবীন্দ্রনাথের কাছে দুর্বোধ্য ছিল বলেই তিনি বিশেষ আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের সাথে তার মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন।

সূচনা

রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থের সূচনায় লেখেন:
অক্ষয়চন্দ্র সরকার মহাশয় পর্যায়ক্রমে বৈষ্ণব পদাবলী প্রকাশের কাজে যখন নিযুক্ত হয়েছিলেন আমার বয়স তখন যথেষ্ট অল্প। সময়নির্ণয় সম্বন্ধে আমার স্বাভাবিক অন্যমনস্কতা তখনো ছিল, এখনো আছে। সেই কারণে চিঠিতে আমার তারিখকে যাঁরা ঐতিহাসিক বলে ধরে নেন তাঁরা প্রায়ই ঠকেন। বর্তমান আলোচ্য বিষয়ের কাল অনুমান করা অনেকটা সহজ। বোম্বাইয়ে মেজদাদার কাছে যখন গিয়েছিলুম তখন আমার বয়স ষোলোর কাছাকাছি, বিলাতে যখন গিয়াছি তখন আমার বয়স সতেরো। নূতন-প্রকাশিত পদাবলী নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, সে আরো কিছুকাল পূর্বের কথা। ধরে নেওযা যাক, তখন আমি চোদ্দয় পা দিয়েছি। খন্ড খন্ড পদাবলীর প্রকাশ্যে ভোগ করবার যোগ্যতা আমার তখন ছিল না। অথচ আমাদের বাড়িতে আমিই একমাত্র তার পাঠক ছিলুম। দাদাদের ডেস্ক্ থেকে যখন সেগুলি অন্তর্ধান করত তখন তারা তা লক্ষ্য করতেন না। পদাবলীর যে ভাষাকে ব্রজবুলি বলা হোত আমার কৌতুহল প্রধানত ছিল তাকে নিয়ে। শব্দতত্ত্বে আমার ঔৎসুক্য স্বাভাবিক। টীকায় যে শব্দার্থ দেওয়া হয়েছিল তা আমি নির্বিচারে ধরে নিই নি। এক শব্দ যতবার পেয়েছি তার সমুচ্চয় তৈরি করে যাচ্ছিলুম। একটি ভালো বাঁধানো খাতা শব্দে ভরে উঠেছিল। তুলনা করে আমি অর্থ নির্ণয় করেছি। পরবর্তীকালে কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ যখন বিদ্যাপতির সটীক সংস্করণ প্রকাশ করতে প্রবৃত্ত হলেন তখন আমার খাতা তিনি সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। তার কাজ শেষ হয়ে গেলে সেই খাতা তাঁর ও তাঁর উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে ফিরে পাবার অনেক চেষ্টা করেও কৃতকার্য হতে পারি নি। যদি ফিরে পেতুম তা হলে দেখাতে পারতুম কোথাও কোথাও যেখানে তিনি নিজের ইচ্ছামত মানে করেছেন ভুল করেছেন। এটা আমার নিজের মত। তার পরের সোপানে ওঠা গেল পদাবলীর জালিয়াতিতে। অক্ষয়বাবুর কাছে শুনেছিলুম বালক কবি চ্যাটার্টনের গল্প। তাঁকে নকল করার লোভ হয়েছিল। এ কথা মনেই ছিল না যে, ঠিকমত নকল করতে হলেও শুধু ভাষায় নয়, ভাবে খাঁটি হওয়া চাই। নইলে কথার গাঁথনিটা ঠিক হলেও সুরে তার ফাঁকি ধরা পরে। পদাবলী শুধু কেবল সাহিত্য নয়, তার রসের বিশিষ্টতা বিশেষ ভাবের সীমানার দ্বারা বেষ্টিত। সেই সীমানার মধ্যে আমার মন স্বাভাবিক স্বাধীনতার সঙ্গে বিচরণ করতে পারে না। তাই ভানুসিংহের সঙ্গে বৈষ্ণবচিত্তের অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা নেই। এইজন্যে ভানুসিংহের পদাবলী বহুকাল সংকোচের সাথে বহন করে এসেছি। একে সাহিত্যের একটা অনধিকার প্রবেশের দৃষ্টান্ত বলেই গণ্য করি। প্রথম গানটি লিখেছিলুম একটা স্লেটের উপরে, অন্তপুরের কোণের ঘরে––
গহনকুসুমকুঞ্জমাঝে
মৃদুল মধুর বংশি বাজে।
মনে বিশ্বাস হল চ্যাটার্টনের চেয়ে পিছিয়ে থাকব না। এ কথা বলে রাখি ভানুসিংহের পদাবলী ছোটো বয়স থেকে অপেক্ষাকৃত বড়ো বয়স পর্যন্ত দীর্ঘকালের সূত্রে গাঁথা। তাদের মধ্যে ভালোমন্দ সমান দরের নয়।

রচনা

কৈশোরে রবীন্দ্রনাথ অক্ষয়চন্দ্র সরকার ও সারদাচরণ মিত্র সম্পাদিত প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ গ্রন্থের মধ্যযুগীয় মৈথিলি কবিতাগুলির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। জীবনস্মৃতি গ্রন্থে ভানুসিংহের প্রথম কবিতা রচনার যে ইতিহাসটি বর্ণিত হয়েছে তা নিম্নরূপ:
"একদিন মধ্যাহ্নে খুব মেঘ করিয়াছে। সেই মেঘলাদিনের ছায়াঘন অবকাশের আনন্দে বাড়ির ভিতরে এক ঘরে খাটের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া একটা শ্লেট লইয়া লিখিলাম ‘গহন কুসুমকুঞ্জ-মাঝে’। লিখিয়া ভারি খুশি হইলাম।" রবীন্দ্রনাথ ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী উৎসর্গ করেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে। উৎসর্গপত্র থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের নূতন বৌঠান কাদম্বরী দেবী তাঁকে ভানুসিংহের কবিতাগুলি ছাপাতে অনুরোধ করেন। উল্লেখ্য, এই গ্রন্থ প্রকাশের পূর্ববর্তী বছরেই আত্মহত্যা করেছিলেন কাদম্বরী দেবী। পরবর্তীকালে ভানুসিংহের পদগুলিতে কবি প্রচুর সংশোধনী আনেন।

ভানুসিংহের পদাবলী

সূচীপত্র

১- বসন্ত আওল রে
২- শুন লো শুন লো বালিকা
৩- হৃদয়ক সাধ মিশাওল হৃদয়ে
৪- শ্যাম রে, নিপট কঠিন মন তোর
৫- সজনি সজনি রাধিকা লো
৬- বঁধুয়া, হিয়া-পর আও রে
৭- শুন, সখি, বাজই বাঁশি
৮- গহন কুসুমকুঞ্জ-মাঝে
৯- সতিমির রজনি, সচকিত সজনী
১০- বজাও রে মোহন বাঁশি
১১- আজু, সখি, মুহু মুহু
১২- শ্যাম, মুখে তব মধুর অধরমে
১৩- বাদরবরখন, নীরদগরজন
১৪- সখি রে, পিরীত বুঝবে কে
১৫- হম, সখি, দারিদ নারী
১৬- মাধব না কহ আদরবাণী
১৭- সখি লো, সখি লো, নিকরুণ মাধব
১৮- বার বার, সখি, বারণ করনু
১৯- হম যব না রব, সজনী
২০- কো তুঁহু বোলবি মোয়
২১- মরণ রে তুঁহুঁ মম শ্যামসমান

বৃহস্পতিবার, ১ নভেম্বর, ২০১২

সূরজ দাশ



পুস্তক পর্যালোচনা

আত্মার ট্রিগার : কবি রঞ্জন আচার্য
সূরজ দাশ

কবি পুরুলিয়ায় থাকেন । কবিতায় সারাক্ষণ শব্দের চাবুক চালান । যারা কম বেশি রঞ্জনের কবিতার খোঁজ খবর রাখেন, তারা জানেন মহানগর থেকে অনেক দূরে, তথাকথিত কবিতার ধ্যাস্টামো থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে নিজের লেখাটা অতি সন্তর্পণে লিখে চলেছেন । কোনোও চালাকি নেই, ভান নেই, নিরভেজাল কবিতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করায় কবির কাজ । কঠোরভাবে নির্বাচিত তাঁর কবিতা পাঠককে সমকালীন বিভিন্ন যন্ত্রণায় বিদ্ধ করে । কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে আমরা পাই এক নির্মল প্রশান্তি ।
যারা এই সময়ের কবিতা সম্পর্কে টুকটাক খোঁজ খবর রাখেন, তাঁরা জানেন, রঞ্জনের কবিতার ধার । মূলত শূন্য দশকের শুরু থেকে রঞ্জনদা ও তাদের বন্ধুরা ‘নাটমন্দির’ নিয়ে সারাক্ষণ হইচই করে কাটাতেন । হয়তো এখন আর সেই উন্মাদনা নেই, নেই তারুন্যের ছটফটানি, তবু এখনো নিরলস প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ‘নাটমন্দির’কে বাঁচিয়ে রেখেছেন ।
কবিতার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখা যে কি ভীষণ সংগ্রাম, তা পাঠক মাত্রই অবগত আছেন । নব্বই এর শেষে এবং শূন্য দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমরা যারা মফসসল শহরে কবিতা নিয়ে, পত্রিকা নিয়ে হইচই করতাম, তখন থেকেই রঞ্জন দা আমাদের ঠেকে একটা পরিচিত নাম, আলোচনার বিষয় । সে সময় আমাদের বন্ধুদের মুখে মুখে তার কবিতার প্রচুর পঙক্তি ঘুরতো ।

আমার এখনো মনে আছে কিছু অসাধারণ পঙক্তি । যেমন .....
অভিশাপ দিল সময়ের হাততালি
ঝাণ্ডা হাসলো রাক্ষসদের হাতে
তেলের খুঁটিতে বাঁদর হলাম খালি
দেশ ভরে গেলো বাঞ্চোতে বাঞ্চোতে
একই কবিতার আরও একটি পঙক্তি যা আমাদের ভীষণভাবে আলোড়িত করতো ।
        গুছালো আখের আসছে আসছে বলে
        মিথ্যে আশায় মিছিলে ছোটালো পা
        সন্ধ্যে হলেই জিন মিশে যায় জলে
        ভালোই আছেন বিপ্লবী কাকুরা
২০০১ সালে রঞ্জনদার প্রথম কবিতার বই ‘কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’ বের হয় । মাত্র ১ ফর্মার বইয়ে ১২টি কবিতা । তাতেই জাত চিনিয়েছেন কবি । আমাদের বন্ধুদের এ হাত সে বদলা বদলি হতে হতে একদিন ‘কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’ বেহাত হয়ে যায় । রুগ্ন একটি কবিতার বই, তাতেই কিনা আমাদের টগবগানি । এখনো স্বপ্নে খুজে বেরাই সে বই ।
        দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১২ তে কবির দ্বিতীয় কবিতার বই ‘আত্মার ট্রিগার’ (৪ ফর্মা), বের হয় কলকাতা বইমেলায় । প্রকাশক – ‘নাটমন্দির’, স্বরূপ দত্ত, ‘কথা কও’, ডাক্তার ডাঙা, পুরুলিয়া । প্রচ্ছদ – জিশান রায় ।  রচনাকাল – ২০০১ – ২০১১ ।
        যে বই নিয়ে আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি, তার সূচক কবিতাটি আপনাদের পড়তে বলবো ।
        রাগ দিলে মাথার ভেতরে
        শরীরে ছড়িয়ে দিলে দুরারোগ্য ব্যাধি
        ফাঁসে আটকে যাওয়া জন্তুর মতো
        চিৎকার করছি – হৈ হৈ করে ছুটে আসছে ব্যাধ
        শালা শয়তানের বাচ্চা
        ভগবান সেজে বসে আছে মাথার ওপরে
মরে যাচ্ছি – আগুন আগুন
নেভানোর জন্যে কেউ জেগে নেই
ওসি-র মেয়ের বিয়ে, মেজোবাবু মদে চুর
একটার ওপর আর একটা চেপে বসে আছে আগুন নেভানো গাড়ি
রাতের বাংলায় অন্ধকার গোপন গুহায়
জ্বলে পুড়ে মরছি আর অভিশাপ দিচ্ছি –
                আমি আমার পূর্বপুরুষকে...

রঞ্জনদা লেখেন এমনই । সোজা কথা সহজভাবে কবিতায় ব্যক্ত করা খুব কঠিন কাজ । সে কাজটায় উনি ভীষণ সাবলীলভাবে করে চলেছেন ।

                দুহাত তুলেছি
                দেখে নাও আপাদমস্তক
                ষড়যন্ত্রে ঘৃণা করি
                যা হবে সামনা সামনিই হবে

ভিন্ন ধারার ভিন্ন মতের কবিকে যারা চেনেন, তারা জানেন, কবির লেখনির জোড় । ‘ঠোক্কর খেতে খেতে বিশ্বাস বোবা হয়ে গেছে’ । এই সমাজ , এই সংসার সব কিছুরিই একটা মানে আছে । মানে আছে এই অচেনা অজানা সম্পর্কেরও । কিন্তু সেটা একবার ফাঁস হলেই ভয়ঙ্কর শব্দে থেমে যাবে পৃথিবী । মানুষের মৃত্যুর ভেতরেও কিভাবে শুয়ে থাকে বেড়াল ... কবির ছোট ছোট বাস্তব অনুভুতি পাঠককে সব সময় বিমোহিত করে রাখে । কবি মনে করেন ,
                সব সত্যের গিঁট হাল্কা করে দিতে নেই
                কিছু রেখে দিতে হয় উত্তর পুরুষের জন্য ...

যেকোনোও সাধারণ মানুষের সামান্য বেঁচে থাকার ইছচ্ছাগুলো কবি বার বার ছুঁয়ে দেখতে চান । সেসব নিয়েই কবি ভালো থাকেন । ভালো থাকার এটাই তাঁর পাসওয়ার্ড । পাঠক পড়ুন ...

        কোনো কারণ ছাড়াই মানুষ মানুষের পোঁদে লাগে আজকাল
কোনো কারণ ছাড়াই সকালের প্রেম বিকেলে ভেঙে যায়
তবু এসবের মধ্যেও তোমাকে লিখতে চাই
রমেন ফমেন আমি চিনি না
তুমি যার সঙ্গে ইচ্ছে ঘুমোও জেগে ওঠো
গ্যাংটকে যাও জাহান্নামে যাও
আমার কিছু যায় আসে না
কিন্তু আমি যখন তাকিয়ে থাকব
কেউ যেন ডিস্টার্ব না করে

এরকম অসংখ্য মুগ্ধ করা কবিতার বিদ্যুৎ ছড়িয়ে আছে তাঁর আত্মার ট্রিগার-এ । এই সময়ের প্রত্যেক তরুণ কবির অবশ্য পাঠ্য এই কবিতার বই । রঞ্জনদার কবিতা নিয়ে বেশি কথা নয় । যারা এখনো ওনার এই কবিতার বইটি হাতে পান নি, তাদের জন্য আমি আমার পছন্দের কিছু পঙক্তি পরপর উঠিয়ে দিলাম পাঠকের জন্য ।
               
                এসবের মাঝেও লড়ে যাচ্ছি রতনখুড়ো
                খিদে চেপে যৌনতা চেপে
                দু ফরমার জীবন উল্টে চলেছি
                দুপাশে ফিসফিস করে কথা বলছে লোকজন
                মাকড়শার ফাঁদে পোকা দেখে জিভ চাটছে টিকটিকি

আমি আমার কবিতায় লিখেছি
একই সাথে পুরুষ ও গরীব হয়ে জন্মানো কী ভীষণ অপরাধ
কিন্তু কেউই তা উল্টে পাল্টে দেখেনি আজ পর্যন্ত
আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়
মানুষ চটজলদি সভ্য হয়ে যাওয়ার ফলে
প্রকৃত যৌনতা অনাবিষ্কৃতই থেকে গেলো বোধহয় !

যদিও যৌনতার ভেতর দিয়েই
আমিও একদিন চলে এসেছি পৃথিবীতে
তবু আজও পাণ্ডুলিপি বগল দাবায় চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছি
আমার কোনো পাঠক নেই
                                প্রকাশক নেই
যাদের অন্তত একান্তে পড়ে শোনাতে পারবো
আমি ঠিক কীভাবে বাঁচতে চেয়েছিলাম এই পৃথিবীতে


...................................................
আত্মার ট্রিগার : রঞ্জন আচার্য
রচনা কাল : ২০০১-২০১১
১ম প্রকাশ : কলকাতা বইমেলা ২০১২
প্রকাশক : ‘নাটমন্দির’, স্বরূপ দত্ত , ‘কথা কও’, ডাক্তারডাঙা, পুরুলিয়া- ৭২৩১০১ ।

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১২

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

বীরত্ব, নাকি, ডুয়েল আত্মহননের পন্থা 
১৯৭১ সাল - 'যৌনরোমের ঘাসফুল' সবে দেখা দিচ্ছে দেহে। আমার এক গৃহশিক্ষক নিজেকে ব্যতিক্রমী ভাবতেন- আমাকে শোনাতে শুরু করেছিলেন ডিরোজিও'র কাহিনী । শিহরণ জাগতো দেহে , আস্তে আস্তে রণেশাঁ'র চিন্তাধারা আমাকে আচ্ছন্ন করে তুলছে । ইয়াং বেঙ্গল উদ্দীপ্ত করেছিলো আমাকে আমূল, আপাদমস্তক । ডিরোজিও সাহেব আমার অন্তরপুরুষ হয়ে ওঠেন । আজও অবচেতনে তিনি আমাকে চালিত করেন ।

অগস্ট ২০১২ - আমার এক আশি ছুঁইছুঁই বন্ধু এবং দাদা আমাকে হঠাৎ ফোনে চমকে দিয়ে জানালেন তিনি আবার উত্তরপ্রদেশের নয়ডা থেকে একাকী চলে এসেছেন কলকাতার মায়ায় ঘেরা পথে পথে কঠোর গ্রীষ্মে ঘুরবেন বলে । আতুর কণ্ঠে তিনি জানালেন জীবনের সমাপ্তি যদি হয়ে যায় সেই ভয়ে তিনি তাঁর রচিত দুটি গ্রন্থ আমাকে দিয়ে যেতে চান । দেখা হল বেদনায় , ভালোবাসায়, পেলাম ' ডিরোজিও'র ক্লাস' এবং ' ডুয়েল : একটি নিষিদ্ধ পাশ্চাত্য ঐতিহ্য ' । রচয়িতা শান্তিরঞ্জন বসু ।

যেই হাতে পেলাম ' ডিরোজিও'র ক্লাস' - রক্তে ঝলক উঠলো , আনন্দে সর্বাঙ্গে রোমাঞ্চ । পড়তে গিয়ে ঠোক্কর খেলাম -অরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও যে ডুয়েল বিষয়েও ছিলেন অনবদ্য জ্ঞানের আধার সে বিষয়ে আমি এই প্রাক্‌-ষাট পর্যন্ত আঁধারেই পাখসাট খাচ্ছিলাম । নিজেকে ছিঃছিঃ-কার জানাতে জানাতে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করছি আর ভাবছি এ দোষ তো একা আমার নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ও সমাজের- ফলে যতই আমরা ভাবি যে এই নেট-আবহে আমরা বহুদূর এগিয়ে গেছি ততই দেখছি নীট্‌ফল পশ্চাদপসারী । নালন্দা যুগে হিউয়েন সাং-রা আসতেন স্বীয় জ্ঞান বিতরন করতে , মুঘলযুগে ইব্‌ন্‌ বতুতা'র জ্ঞান থেকে সমৃদ্ধ হতেন ভারতবাসী, ইংরেজযুগে নজির অজস্র, রবীন্দ্রযুগে ভারততীর্থে আসতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন মণীষিকুল, এমনকি স্বাধীনোত্তর কয়েকটি দশকেও বিশ্বের ধীমান ব্যক্তিদের গতায়াত ছিলো ।

গ্রন্থটি জানিয়ে দিল যে, ডিরোজিও'র নিজের কর্মস্থল হিন্দু কলেজে ১৮৩ বছর আগে ১৮২৯ সালে ৫ ও ৬ জুন দুটি বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা হয়েছিলো। বক্তা ছিলেন ডিরোজিও আর এসেছিলেন ফরাসী পণ্ডিত ভিক্টর জ্যা৺কমো সুপণ্ডিত রামমোহন রায় ও ডিরোজিও'র সাথে আলোচনা করতে ।
সেই সুযোগে ৬ জুন তারিখে ব্যবস্থা করা হয় justification of duels বা ডুয়েলের যাথার্থ শিরোনামে কলোকিয়ামের । এই গ্রন্থে সেই ক্লাসে বলা বিখ্যাত ডুয়েল গুলির গল্প এক আচ্ছন্নতা তৈরি করে ।

আমাদের যৌবনে শিভালরি, প্রেমের জন্য ডুয়েল, ফেন্সিং এরকম কিছু শব্দ শোনা যেত , এখনো সদ্য যৌবন সেসব নিয়ে আলোচনা করেন কিনা জানিনা । তখন আমাদের ধারণা ছিল প্রেমের জন্যই যেন ডুয়েল লড়া হত, ডুয়েল হত নাইট ( knight )দের মধ্যে, ডুয়েলের জন্য ফেন্সিং বড়জোর গানশটকেই কল্পনায় রাখতাম । এই ধারণা দীর্ঘকাল লালন করেছি কিন্তু পরে জেনেছি প্রেম ছাড়াও অন্য যে কোনো দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত মীমাংসা-সূত্র হিসেবে ডুয়েল হত । ডিরোজিও'র বক্তৃতায় উঠে এসেছিল ডুয়েলের উদ্ভব, চলনশীলতা, ভয়াবহতা এবং সভ্যতা'র পরিচয় দিতে ইউরোপ সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন করে ডুয়েলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ইত্যাকার বহু বিষয় । ডিরোজিও'র গল্পগুলি ছিল পুরো ইউরোপ মহাদেশে পরিব্যাপ্ত এবং ভিক্টর জ্যাকমো'র পরিধি ছিল ফরাসী দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ।ডিরোজিও'র ক্লাস থেকেই আমাদের জানা হয়ে যাবে যে, ডুয়েলে অংশ নিতেন মহিলা ও পুরুষ,এমনকি বিপরীত লিঙ্গ-ধারীদের মধ্যেও ডুয়েল হয়েছে । দরিদ্র- ধনী উভয় আর্থশ্রেণীর বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তিরা ডুয়েলে আহ্বান জানাতো প্রতিপক্ষকে । ডুয়েলের কারণ থাকতো শুধু প্রেম নয়, পরকীয়া , ব্যবসা , সামান্য তর্কাতর্কি ( যেভাবে মুসলিম পুরুষ স্ত্রীকে তিনবার তালাক শুনিয়ে দেয় ), আর্থিক বিতর্ক , রাজানুগ্রহ প্রাপ্তি / অপ্রাপ্তি , রাজ্যগ্রাস ইত্যাদি । নিষিদ্ধকরণ হেতু আইনকে লবডঙ্কা দেখিয়ে গোপন জনহীন স্থানে পুলিশি ঝামেলা এড়িয়ে ডুয়েল হত, তেমনই লা-পরোয়া হয়ে প্রত্যক্ষ স্থানে ডুয়েলের অস্তিত্ব বিরল ছিলনা । আমাদের যৌবনের কল্পনার র‍্যাপিয়ার ( Rapier ) দিয়ে ফেন্সিং নয় শুধু , বর্শা , ছোরা, তলোয়ার, পিস্তল, রাইফেল এমনকি জন্তু কিংবা বিষপ্রয়োগও ছিল মান্য হাতিয়ার সমূহ । ডুয়েল তো শুধু যুদ্ধ বৈ আর কিছু নয় - বন্য আবহ যেমন গণ্য হত, তেমনি দুর্গ, সেনাবাহিনী, এমনকি জলপথে বা আকাশপথকেও ডুয়েলের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করে নিতেন উভয় ডুয়েলিস্ট ।

এই তো সেদিন ২০১২ সালের অক্টোবরের শুরুতে সম্ভবত আসানসোলের কাছে দুই তরুণী এক যুবকের মন পাওয়া বা শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার জন্য বাজি ধরেছিলেন যে দুই কন্যাই একই গুনের-একই পরিমানের -একই বিষ- একই সাথে গিলবে : যে বেঁচে থাকবে সে পাবে ঐ যুবককে । একজন মারা গেল একটুও জানতে না পেরে যে অন্যজন বেঁচে থাকবে আরো কয়েক ঘণ্টা মাত্র এবং তারপর বিষদ্রষ্ট বিষকন্যাকে যৌন দোসর রূপে পাওয়ার হাত থেকে যুবকটিকে রক্ষা করতে অবশ্যই মারা যাবে। এটা কি ভারতীয়দের নব্য ডুয়েল নয় ?

ডিরোজিও সাহেব জীয়ন্তে বহু নির্যাতন সহ্য করেছিলেন আপাদমস্তক ভারতীয় হতে চেয়ে - সেই তিনি কি জানতেন না ডুয়েল আদৌ ভারতে বিরল ছিল না বরং দ্বৈরথ ( = ডুয়েল ) ছিল স্বীকৃত যুদ্ধকৌশল এবং অবশ্যই মহাকাব্য ধন্য দ্বৈরথ বেআইনি ছিল না । এই গ্রন্থেও ডিরোজিও'র বক্তব্য অংশে পেয়ে যাই ভারতেই ওয়ারেন হেস্টিংস্‌, রবার্ট ক্লাইভ , জন ম্যাকফারসনের মত স্বনামধন্য সর্বোচ্চ প্রশাসকদের ডুয়েলের বিবরণ ।

বর্তমান গ্রন্থের লেখক শান্তিদা ৮০ বছরের মুখেও নিত্য নতুন বিষয়ে গবেষণায় নিমগ্ন থাকেন । ডুয়েল বিষয়ে লিখিত তাঁর গ্রন্থদ্বয়ের প্রথম খণ্ড ডিরোজিও'র ক্লাস গ্রন্থে উৎসাহী পাঠকের জন্য পরিশিষ্টাংশে রয়েছে বিখ্যাত ডুয়েলের তালিকা, গ্রন্থে উল্লিখিত ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও তাঁদের বর্ণানুক্রমিক সূচী আর গ্রন্থপঞ্জি ।

বীভৎস মজার ডুয়েল সংক্রান্ত গ্রন্থটি মুগ্ধশ্বাস পাঠ করতে করতে বারবার হোঁচট খাচ্ছিলাম মুদ্রণ প্রমত্ততায় । শান্তিদাকে জানাবো ভবিষ্যতে এগুলির অপনোদনের দায় নিতে । আরো ভালো লাগতো যদি উল্লিখিত ব্যক্তিদের নামের সূচীতে ভারতীয় নামগুলিও অন্তর্ভুক্ত থাকতো। এজন্য অন্তত শান্তিদা আরও অনেকদিন আমাদের মধ্যে থাকুন ।

' ডিরোজিও'র ক্লাস '/ শান্তিরঞ্জন বসু । মধ্যমগ্রাম : বাংলার মুখ, ২০১২ । ১০৯ পৃ । ১৪০ টাকা।

মিলন চ্যাটার্জী

অশোক চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যলোচনা
অশোক চট্টোপাধ্যায় আসলে একজন রূপকার । মনের গহন প্রদেশের গভীরতম অনুভব তার কবিতায় ফুটে ওঠে । তাঁর বেশীরভাগ কবিতাই স্বাদু এক আবহ রচনা করে । যেখানে নেই জটিল বাক্যবিন্যাস, নেই অযথা বাগাড়ম্বরের ঘনঘটা । কবিতা তখনই ভালো লাগে যখন তা আরোপিত হয় না । যখন কবিতা জোর করে পড়তে হয় তখন আর সেটা কবিতা হয়না। অশোক বাবুর কবিতার বড় গুন কবিতাগুলি আরোপিত নয় ।

অশোক চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই কবিতা লিখে চলেছেন । সম্পাদনা করছেন ' গোধূলিমন ' সাহিত্য পত্রিকা । তার মরমী মন বারবার প্রকাশ হয়েছে তার কবিতায় ।

অশোক চট্টোপাধ্যায়ের 'কাব্য সমগ্র' চারটি অংশে বিভক্ত । যথাক্রমে --
১ । উত্তর তিরিশে এসে
২ । সামুদ্রিক নোনাগন্ধ
৩ । আয় সখি,শেষ খেলা খেলি
৪ । নীল মগ্নতায় ।

'উত্তর তিরিশে এসে' কবির প্রথম দিকের লেখা । লেখাগুলিতে স্বাভাবিক ভাবেই রোম্যান্টিকটা তার নিজস্ব সাক্ষর রেখেছে । যেমন " কিংবা অন্যভাবে বলা চলে / প্রেমের অন্য নাম ১৭ ই জুলাই " । প্রেম এই লেখাগুলির অন্যতম উপজীব্য । লেখায় জটিলতা নেই ।

'সামুদ্রিক নোনাগন্ধ' -এ এসে কবির লেখা আরও শক্তিশালী হয়েছে । এখানে প্রেমের সঙ্গে মিশেছে কিছুটা একাকীত্ব , ফিরে ফিরে এসেছে রিক্ততার সুর । ঈশ্বরের প্রতি অনুযোগও আছে কিছু লেখায় । অনুষঙ্গের প্রয়োগ এই কবিতাগুলোকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে । যেমন " বাচাল মেয়ের মত সুখ মাঝে মাঝে শরীরেতে হিল্লোল তোলে / এ ভাবেই বিষণ্ণতা একদিন ঘুণপোকা হয় " ।

'আয় সখি,শেষ খেলা খেলি' রোম্যান্টিক অনুভবে লেখা । কিছুটা প্রেমবিলাস আর স্বপ্নের দেয়ালা এখানে খেলা করে যায় ।যেমন ''মেঘের পরে মেঘ জমিয়ে পাহাড় গড়ি /টুকরো টুকরো স্মৃতির মালায় স্বপ্ন গড়ি "। আবার কিছু কবিতায় আছে অভিমানের ছোঁয়া : " কত সহজেই তুমি / টপাটপ ভেঙে যাও সিঁড়ি "।

কাব্যগ্রন্থের শেষ অংশ ' নীল মগ্নতায় '। কবি পরিনত মনে ও শরীরে । ফেলে আসা উচ্ছলতা স্বাভাবিক ভাবেই কমে এসেছে । লেখায় রচিত হয়েছে একটা স্নিগ্ধ আবহ । অনুভব লীন হয়েছে মগ্নতায় । এই অংশে অদ্ভুত সুন্দর বাক্যবন্ধের ব্যবহার কবিতাকে করে তুলেছে ঋদ্ধ । "তরল সোনালী সোনা / পেয়ারাপাতায় আঁকে / জাফরির ছক "।

প্রকৃতির কাছে নিজেকে সমর্পণ, নস্টালজিয়া এই কবিতাগুলির বৈশিষ্ট্য । " এখন যৌবনের ঋজু খর তেজ আর নেই / শ্যাম স্নিগ্ধ কোমল মনন । / স্মৃতি জুড়ে অলৌকিক লাল বল খেলে।"

কবির প্রথম দিকের কবিতা স্বাভাবিকভাবেই যৌবনের কথা বলে । যদিও সেই উচ্চারণ মায়াময় । আস্তে আস্তে ঘটেছে চেতনার পরিণতি । তার লেখার শেষভাগে অনুষঙ্গ , রূপকের ব্যবহার কবিতাকে আরও স্বাদু করে তুলেছে ।কবির লেখার ভিতর একটা সহজ- সরল জীবনবোধ কাজ করেছে ।
বিষণ্ণতা , নস্টালজিক আবহ কবিকে এনে দিয়েছে পাঠকমনের বুকের কাছে । অনাবশ্যক জটিলতা তার কবিতাকে একবারও আক্রমন না করায় কবি সহজেই চলে এসেছেন পাঠকমনের কাছে ।

পরিশেষে বলি - মুদ্রণ প্রমাদ একটু কম হলে গ্রন্থটি আরও সুখপাঠ্য হত ।


কাব্য সমগ্র / অশোক চট্টোপাধ্যায় । ন্যাশানাল পাবলিশার্স ।২০৬ বিধান সরণি । কলকাতা - ৭০০০০৬

সোমবার, ১ অক্টোবর, ২০১২

পার্থপ্রতিম রায়

ঋপণ আর্য-এর কাব্যগ্রন্থের আলোচনা করলেন
পার্থপ্রতিম রায় 

প্রত্যাবর্তনের সথে আমি


আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্য অনুযায়ী ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতির বিশ্লেষণ করে থাকি। 'এলিমেণ্ট', ' বৈপরীত্য', ' ভাবনা' - এই সবই ঘোরগ্রস্থ দৃশ্যের বায়োস্কোপ । আসলে কবিতা হল একটা স্বাধীন সচলায়তন। এই অশরীরী সেলফরিওয়াডিং সিস্টেম ঈশ্বরের অন্যান্য সৃষ্টির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর 'মুহূর্ত' হল এই সিস্টেমের কর্ণধার। একটা আড্ডায় ঋপণদা ক্যাপ্টেনকে বোলে- "লক্ষবছর পাড় হলেও তোর সঙ্গে আমার সম্পর্ক থাকবে" - এই হয়তো মুহূর্তযাপন... 'মোমবাতি ও স্বপ্নের প্রত্যাবর্তন' বইটিতে 'সময় ও মুহূর্ত' নিয়ে খেলার প্রবণতা। খেয়াল করলে দেখা যাবে কবিতাগুলিতে অসম্ভব মুহূর্তের যত্নছাপ। যেমন- " সিঁড়ির ভাঁজে ভাঁজে তির্যকরেখা, ভাঙা কাঁচের গুঁড়োর মতো /অহংকার... সরলরেখা হয়ে খোলা দরজায় আত্মমোচনে / শিখে নেয় চুম্বনের বুনন ! ..." । আবার- " কিছু সত্যের ভুমিকায়, কিছু মিথ্যের প্রশয়ে / প্রতিশ্রুতিরা দেওয়াল-লিখন হয়ে যায় । / যার সাশ্রয় মুল্য নেই, তার অধিকার মূল্য / আমাদের গ্রাস করে... " - বাস্তবতার সংজ্ঞা নির্ধারণে ব্যর্থ মানুষকে এই বাক্যগুলির মাধ্যমে একীভূত করা যায় । এরপর ৬ থেকে ১০ নম্বর কবিতাগুলিতে, কবিতার ছায়াখণ্ডগুলি ছায়াছবিতে পরিনত । ভাবনার ভিতর 'ঘোর' সময়কে আবদ্ধ করে রাখে, এই অসাধারণ যাপন প্রকাশে কবি ও পাঠকের মধ্যে যোগসুত্র স্থাপন করে। জীবনের প্রবাহমানতায় ছোটখাটো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত টুইস্ট এনেছে কিছু কিছু কবিতায় ; যেমন-- " পাঠক" কবিতায়- “ ফিনিক্স হয়ে মরে/ কুয়াশায় সমুদ্রের/আলো হেঁটে গেছে...' ; "কাহিনি বন্ধু ছিল" কবিতায়- “ কাহিনি মরচে ধরা, জানালার শিকে চোখ গলে যায় / তবে কি চোখ অ্যাসট্রে, খুনির মতো মৃত্যুকুড়ায় !...' এছাড়াও 'কেলাসিত সূত্র', 'প্রেম বিষয়ক অন্য গল্প' কবিতায় ভাঁজকাটা অনুভূতি আমার সঙ্গি হয়, যা যুগপৎ আনন্দের প্রলেপ । আর "ফেরা" কবিতাটি আমার একটি প্রিয় কবিতা হয়ে থাকলো, অন্তর্ভেদী এই কবিতাটি আসলে নিজেকে ভেঙেচুরে উপলব্ধি করার প্রচেষ্টা অথবা অজানা ইশারায় নিজের সম্পূর্ণতাকে বাড়ায় । টুকরো টুকরো জীবনের ছবি নিয়ে তৈরি হয় আবছা অবয়ব । "...... স্বপ্নের প্রত্যাবর্তন" দেখার সময় আমার ভাবনার দরজা খোলা রাখি; কিন্তু ভাবনা থেকে / "প্রত্যাবর্তন" গুলো একটু বেশি সচেতন । অনুভূতির সৌন্দর্যময় পুলকবোধ মনকাড়ে রঙিন স্বপ্নের জগতের দিকে ... "প্রেম- মুহূর্ত- অনুভূতি আসলে আমাদের অতিপরিচিত আবার অতিঅপরিচিত দৈত-চেতনা..."


মোমবাতি ও স্বপ্নের প্রত্যাবর্তন ▀ ঋপণ আর্য ▀ অভিযান পাবলিশার্স ▀ মূল্য- ১৫ টাকা



ঋষি সৌরক


অনুপমের হাইওয়ের চতুর্দিকের অনিশ্চয়তা লিখলেন
ঋষি সৌরক

পোস্টমর্ডান কবিতাগুলি মর্ডান নয় - কারন তারা পোস্টমর্ডান (আসল কারণটা পরে বলছি...)। এবং এই পোস্টমর্ডার্ন ধারাটিকে কবিতার জগতে বিভিন্ন কবি এনেছেন বিভিন্ন ভাবে,আকৃতি-প্রকৃতিতে বিপ্লব তো সেই কবে থেকেই ঘটে আসছে,নতুনত্বের সন্ধান করতে করতে আজ নতুনত্ব যখন ফুরিয়ে যাওয়ার মুখে, কবি অনুপম এক বিরাট হাইওয়ে র পেটে ছেড়ে দিলেন একা বোকা।

খুব চেনা চেনা শব্দভাণ্ডার,এক-দুটি শব্দ ছাড়া সবগুলিই কুড়িয়ে পাবেন হাইওয়ের পাশে।এরপরও কিন্তু একটা 'কিন্তু' থেকেই যায় – “কারণ ছাড়াই মনের মতো হয়ে উঠছে পথ এবং পথ” । অদ্ভুত ফ্যাণ্টাসি- অচেনা পথে ছড়িয়ে আছে চেনা ছাপ, অথচ লিঙ্ক খুঁজতে যাওয়া মূর্খামো,কিছুটা মিল...কিছুটা অমিল...অমিল..অমিল...মিল...যুক্তিবাদীরা দূরে থাকুন-চুপ করে দেখুন কবি অনুপম হাতে যাদুদণ্ড- আকাশজোড়া ক্যানভাস-'পর্দাতুলে রোদ আসছে /বিছানায় সাঁতার শেখার দাগ'- 'ঘসেটি বেগমের মাথার ওপর সাতটা সবুজ টিয়া -এইমাত্র উড়ে গেল'-কবি বললেন,'পুরো ছবিটাই একটানে এঁকে ফেলতে চাইছি'।একটানে আঁকা ছবিটি রেখায় রেখায় জোড়ে না; অসীমের দিকে সমাপ্তি নেয়। বিমূর্ততা এক অন্য জিনিস,তারও মূর্তরূপ আমরা দেখেছি,কবি অনুপম দেখালেন সহস্র বিচ্ছিন্ন ভাবনার সমায়ন, যেখানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাবনাগুলিও শার্পলি পয়েণ্টেড হয়েছে,আবার গুরুগম্ভীর চিন্তার ক্যাসুয়াল এণ্ডিং ও দেখানো

এভাবেই কবি অবিরত আপডেট এবং বিনোদন ঘটিয়েছেন দৃশ্যবদলের,ধ্রুবর কন্সেপ্টে বিশ্বাস নেই তার,তিনি সমস্ত কিছুর সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি কে ছুঁতে, চান,একটা জিনিস কে সেই জিনিসটার মত করে একবারই পেতে । অনুপমের কবিতায় ভাবনাগুলিকে মার্জ করানোর অহেতুক প্রচেষ্টা নেই,বরং ছবিতে রঙ ছেড়ে উনি খেলা দেখেন,রঙ্গের খেলা অথচ পরিমিতি বোধ তার সুদক্ষ শিল্পীর মতোই সদা তৎপর । ওই যে বিমূর্ততার কথা একটু আগেই বললাম,অনুপমের ছবিতে কোনো রেখা নেই,তাহলে? আছে এলোমেলো নানা ব্যাসার্ধের বিন্দু -অস্থিরতম বিন্দু,অনুপমের কবিতাকে ছেয়ে রেখেছে তারা অবিরাম অনিশ্চয়তায় ,গতিপথের আকস্মিক বাঁকে -অজানা সাসপেন্স ও রোমাঞ্চে - “মেঘ ছাড়াই সরে যাচ্ছে পাথরের দিকে।ঠোঁট ছাড়াই ডুবে যাচ্ছে জলের গেলাস।যে দেওয়ালে বারণ নেই - বিজ্ঞাপন লিখছে না কেউ।খিঁচুড়ির হলুদটাই ভ্যান ঘগের হলুদ।নদীতে ভেসে যাচ্ছে নকল একটা নদী।দীঘিতে ডুবে আছে আসল একটা দীঘি” ।

'টুসকির দুঃখু' একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য খণ্ড,প্রথম কবিতাতেই টুসকির বর্ণনা কবি দিয়েছেন এভাবে “টুসকি এখানে ফুল তুলছে। সূর্য এখন ডুবছে /টুসকি যখন তুলতে যায় রোদ তখনই পড়ে । / আমার মেয়ে।ফুলে ফুলে মুছে দিচ্ছে / পারফিউমের নাম।গন্ধ হওয়ার দুঃখ।" অর্থাৎ প্রথম কবিতাতেই কবি আভাষ দিলেন,টুসকি তার মেয়ে...পরবর্তী কবিতাগুলিকে এক অদ্ভুত স্নেহে লালন করেছেন কবি,'টুসকি খেলার রাণী'-'টুসকির চোখ খুব বড়।আমার আকাশে ও /আকাশ দেখতে পায়'-'টুসকি হয়তো আমার কাছে নেই!' 'টুসকি আমার মেয়ে।/উত্তরের বাতাসে দক্ষিণের হাওয়ায়' কখনো 'রাস্তাতে ওই গড়িয়ে গেল টুসকির মার্বেল' কিম্বা 'দুধের গেলাস ছুঁড়ে ফেলে পালাচ্ছে টুসকি' ...টুসকির বাচ্পনা এদিক-সেদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কবিতায়।এখন কথা হল,টুসকি আদতে কতটা বাচ্চা ? এই টুসকি ই কিন্তু কবির সিজনগুলির এক-একটি রঙ -দিনের বিভিন্ন সময়ের বিভাজিত অবচেতন-কবির মনের অন্তরমহলে চলতে থাকা কয়েককোটি নিষ্পাপ অভিব্যক্তির নিপুণ কারুকাজ-কবির স্বাধীনচেতা কবিতা-টুসকি ! টুসকিকেও কবি নিজের মাধ্যমে জেনারালাইজ করে দিলেন অবশেষে এবং এখানেই টুসকি চরিত্রটি যেনো আরো ব্যাপ্তি পেলো,'টুসকির দুঃখু' গুলো চিরন্তন হয়ে রইলো ...'বাউল বদল' এবং 'অদৃশ্য পেয়ালা ও সিলভারলাইনস্ বইটির প্রচ্ছদ করেছেন প্রিয় অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নামাংকন করেছেন দেবাশিস সরকার ... রঙ্গিন প্রচ্ছদে বইটির আভ্যন্তরীন সৌন্দর্য্যের সম্যক আভাস পাওয়া যায়,ছবিটিতে রয়েছে আধুনিক মনস্কতা এবং সুরিয়ালিস্টিক ছাপ,নামাংকনের ফন্টটি বেশ তীক্ষ্ণ ও সুস্পষ্ট,যা বইয়ের চরিত্রের সাথে সহজাত ভাবেই যায় ।

কাব্যগ্রন্থ - হাইওয়ে ▀ অনুপম মুখোপাধ্যায় ▀ নতুন কবিতা


শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

প্রদীপ কবির খান


কবি সুবীর সরকার এবং তার " বন্দুকনামা" কবিতা সংকলন নিয়ে দু'চার কথা

প্রদীপ কবির খান



প্রাজ্ঞ আধুনিক , জটিল সময়টাতে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের ছায়া জটিল থেকে জটিলতম করেছে চিন্তাধারা বোধের পরিধি'কে । মানুষের চিন্তা ও চেতনের ধারাবাহিক পরিবর্তন যেন সময়েরই মূর্ত ধূসর ছবি। এই সময় হাতে এসে পৌঁছল সুবীর সরকার মহাশয়ের "বন্দুকনামা" কবিতা সংকলন । উৎসর্গপত্রের নীচের লাইনে কবি যা বলেছেন ----

"
দ্যাখে পালাচ্ছে ফণা তোলা সাপ ; গুগল আর্থ"

আর্থসামাজিক পরিবেশের এই যে দৌড় পৃথিবী ছোঁয়ার , সমগ্র কবিতায় চেতন-অবচেতন জুড়েই তার অবস্থান পরিলক্ষিত হয় ।
সমগ্র কবিতা জুড়ে এই সময় , এই অস্থির সময়কে শব্দে বেঁধে ধরবার প্রয়াস যা সার্থক কবির মনন কলমে , সমস্ত কবিতা জুড়ে একটা নির্মোহ আবহ তৈরি করেছেন কবি ,
"
বন্দুকনামার" ১ নং কবিতায় ----

"
টেবিলে বন্দুক , যদিও মরচেধরা
বরফে ডুবে গেছে হাত-পা
ভুলে যাওয়াটাই সংগত , ভুল
                         ইতিহাস "

তো এই সময়ের যেন জীবন্ত ছবি , শুধু চোখের সামনে যে পর্দাটুকু আছে তাকে একটু সরিয়ে নিলেই যেন স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি চারপাশের দগ্ধ ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে কোথায় যেন একাত্মা হয়ে গেছে এই লাইনগুলো । কবি সন্দেহ প্রকাশ করছেন কিম্বা মনে মনে বিড়বিড় করছেন যে ইতিহাস আমরা পড়ছি সেটুকুই কি ইতিহাস ? কই সেখানে তো আমার কথা নেই !
সমস্ত কবিতায় কবি যেন নিজের সাথে নিজে কথা বলছেন , বিভিন্ন আঙ্গিকে ধরতে চাইছেন জীবন যন্ত্রণা অস্তিত্ব বিলোপের দিন , সমস্ত কবিতায় চাপা অন্ধকার , আবার কোথাও অন্ধকার উত্তরণের দিশাও খুঁজে পাচ্ছেন কবি , যেমন ----

"
শরণার্থীর সন্তরণবিলাসে
লণ্ঠনের আলোয় দৃশ্যপট
স্বপ্ন ফেরাচ্ছে ব্রিজ ও
জলাশয়
ফিনিশ হচ্ছে গসপেল
তর্কযুদ্ধের পর ভাষা সাজাই "

"
শরণার্থীর সন্তরণবিলাসে" কথাটা খাপছাড়া মনে হতে পারে , শরণার্থীর সেই বিলাসের সময় কই? কিন্তু এখানেই সার্থক কবি । দুঃখের মধ্যে জেগে থাকে মানুষের সুখের অনন্ত খোঁজ , কারন তার পড়েই আসতে পারে সুখের ভবিষ্যৎ , সেই জন্য যেন লন্ঠনের প্রতীকী আলোয় ব্রিজ পেড়িয়ে কোন এক সুখের দিকে জীবনের প্রবাহ চলতেই থাকে । মানুষের চিরন্তন এই চেতনকে কবি চমৎকার ধরেছেন ।
কবি সমগ্র কবিতায় নিজেকে এক জায়গায় বেঁধে রাখেননি , বিভিন্ন ভাবে ভেঙেছেন , গড়েছেন , নিজে মিশে গেছেন নিজের সঙ্গে , কখনও প্রলাপের মতো বলেছেন -----

"
একাকীত্ব টুকে রাখি । ঘুরে এসেছে
সাদা ফেনা । টানটান উইকএন্ড , লোকাল
ভাষায় গুঁজে দেওয়া । শেষ দৃশ্যে
স্মৃতিচারণ । গল্পের জট খুলছে ।
বইয়ের র‍্যাকে একাকীত্ব রেখে আসি "

এখানে লক্ষণীয় , প্রত্যেকটা দৃশ্য শেষে কবি দাঁড়ির ব্যাবহার করেছেন , কারণ বক্তব্য ওখানে শেষ হচ্ছে , ঐ সম্বন্ধীয় আর কিছু বলার নেই কবির , যেমন " একাকীত্ব টুকে রাখি । " কোথায় টুকে রাখেন আমাদের জানার দরকার নেই , কি হবে সেসব জেনে ! আর এই একাকীত্ব এই কবিতা জুড়ে নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা নিয়েছে , কী কী একাকীত্ব কবিকে গ্রাস করে কিছুটা বলেছেন , কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করেছে শেষ লাইন , লক্ষ্য করুন , শেষ লাইনে দাঁড়ির ব্যবহার করেননি কবি । কিন্তু প্রশ্ন কেন ? কবি সচেতনভাবেই করেছেন বলেই মনে হয় , একাকীত্ব তো একটা সীমাহীন প্রবাহ , তাকে কি শুধু বইয়ের র‍্যাকের মধ্যে বন্দী করে রাখা যায়! কবি যেন আর অনেক অনুভূতির মধ্যেই ফেলে এসেছি এই একাকীত্ব ।

কবি শুধু একটা সময়ের উপর থেমে থাকেন নি , বিমূঢ়ভাবে কিছু শূন্যতার দৃশ্য তুলে ধরেছেন , এটা দেখুন -

"
অবিক্রীত হাতপাখাগুলি পেখমের ওমে
চড়ুই শালিক কমে আসছে
ধানসেদ্ধ ভুলে দু'দণ্ড উদাসীন
রাত নামছে শেয়ালের গর্তে
হাওয়ার সাঁতার , নদীগর্ভে - "

দেখুন তো কী সুন্দর চিত্রকল্প ফুটিয়ে তুলেছেন , আহাঃ মুগ্ধতা । শীতকালের এই আবহ শব্দের কারিগুরিতে কি দারুণ মাত্রা পেয়েছেন ভাবতে পারছেন ? গরমের হাতপাখাগুলি এখন অন্ধকার কোন গরম জায়গায় পড়ে আছে , ধানসিদ্ধ ভুলে কে উদাসীন ? সে হয়তো আমার গ্রাম্য মা ঠাকুমা হবেন ! রোদ পোহাচ্ছেন আর হয়তো বিগত স্মৃতিচারণে সে ভারাক্রান্ত , উফফফ...! রাত নামছে শেয়ালের গর্তে , চিরকালীন , শেয়াল গর্ত মানে ? অগ্রহায়ণের পড় ফাঁকা মাঠের শূন্যতা , আর মাঠের ইঁদুরের গর্তেই শেয়ালের আস্তানা , এই এক লাইনের বোঝা যাচ্ছে কবি শীতের প্রভাবে প্রভাবিত , কিন্তু এই শীত বর্তমানের কোনো শীতের কথা কিংবা হয়তো শরীরের কোনো গন্ধ লেগে আছে মনে , হয়ত সেই গ্রামে ফিরবার ইচ্ছা এখনও সমানভাবে আছে জেগে । অনবদ্য কিছু অনুভূতি কবিতা জুড়ে এক প্রকার বিরহই সৃষ্টি করেছে , যা খাচ্ছে অস্থি-মজ্জা ।

গ্রাম বাংলার অন্ত্যজ ( সাধারণ মানুষকেই বলছি ) মানুষের রোজনামচা উঠে এসেছে কবির কলমে,

দুপুরে ঘি- ভাত , ভাঁটা শাক
পানাহার শেষে গান -
"
নদীতে বান আসিল রে "
নদিয়ালী মাছের বৃত্তান্ত
আশ্চর্য পদচিহ্ন , বনভোজন

এ তো সনাতনী বাংলার ছবি , একদম সাধারণ কিছু মানুষের চিত্র , যদিও ঘি খাচ্ছে দেখে
ভ্রম হতে পারে , কিন্তু এই ঘি তো নিজেদের গোরুর দুধ থেকে উৎপাদিত ,
আর এখানে কাদের কথা বলা হচ্ছে ? সাধারণ মৎস্যজীবী মানুষের কথা , সেই যেন
"
ছোট প্রাণ ছোট কথা " তাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে নদী , নদী কেন্দ্রীক সাধারণ মানুষের কথা কবি সহজ সরল ভঙ্গীতে চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন ।

প্রথমেই বলেছিলাম কবি সময়টাকে ধরেছেন নিজস্ব অনুভবে , আর কবির অনুভব এবং পাঠকের মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেলেই কবিতার সার্থকতা ।"বন্দুকনামা"র " ২৫ টি কবিতা বিভিন্ন ভাবে এই সময়টাকে নিয়ে খেলেছে , বন্দুকনামার শেষ কবিতাটা এবার দেখা যাক -----

"
দু'দণ্ড শোকার্ত হও --
ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে
                        থাকি
শীত ও শ্যাওলার যাপনদৃশ্য
শান্ত গলা , দোলাবাড়ি
মাঠময় জলের শব্দ
পাখিরা ভিজছে । ফাটা
                  গোড়ালি । "

শেষ কবিতায় এসে জীবনের- মরণের একটা বিরহসঙ্গীত বাজছে । ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে , আহা , সব্বাইকেই দাঁড়াতে হবে একদিন ছবি তোলার জন্য , জীবন তো আর আমার ইচ্ছাধীনে নয় ! " শীত ও শ্যাওলার যাপনদৃশ্য " এখানেই মানুষের পরাজিতের কাহিনী , উষ্ণতা লোভী মানুষ চিরকাল উষ্ণতার প্রত্যাশায় , তবুও সমস্ত শীতলতায় বোধহয় নেমে নিতে হয় ,কতকিছু করার ছিল তবুও করার আগেই নশ্বরের দিকে এগিয়ে যাওয়া ! সেই তো যেন মশকের জন্মের মতো জন্ম , কিছুদিন রক্ত চুষে , পেট ভরিয়ে নোংরা জলে সন্তান উৎপাদনের মেশিন হয়ে বিদায়ের ঘণ্টাধনির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মনে পড়বে , আরে , এই জীবনে কিচ্ছু করা হয়ে উঠলো না , জীবনটা বৃথায় গেল চলে ! কিন্তু , এখানেই জীবন শেষ নয় , কবি কিছু আশাও দেখতে পাচ্ছেন
"
মাঠময় জলের শব্দ পাখিরা ভিজছে " এ কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে ? পুনর্জন্ম ? নাকি আমি না থাকলেও জীবন থেমে থাকবে না! সুদূর অতীত হতেই চরৈবেতি , এই অল্প সময়ের মধ্যেই জীবনের পূর্ণতা , গতকাল স্বপ্ন , আগামী আগত , আজ যদি ভালোভাবে বাঁচা আগামীকাল সুখের স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয় , বন্ধু , আজকের দিনে আজকের দিকে তাকাও ।


সুবীর সরকার মহাশয়ের কবিতা পাঠের তেমন সুযোগ ঘটেনি আগে , ইতিউতি কিছু পড়েছি এখানে-ওখানে , "বন্দুকনামা" হাতে এল যখন তখন কিছু কথা বলার প্রয়োজন মনে হল ।

"
বন্দুকনামা" সরাসরি বন্দুক তাক করে রেখেছেন বুকের দিকে , বিদ্ধ তোমাকে করবেই .
সমগ্র বন্দুকনামার মধ্যে সর্বাত্মক কিছু ধনাত্মক অনুভূতি কুরেকুরে খাই হাড়মাস নিজে বুঝে ওঠার আগেই , নদীর নিস্তেজ শীতকালীন স্রোতের মত প্রবাহিত ধারায় যে গান হয় , তেমনভাবে ধীরে ধীরে সমগ্র কবিতায় একটা আবেশের ছোঁয়া মুগ্ধ করে ।
মনের নিরুচ্চারিত কথা শব্দের মায়াজালে আবদ্ধ করে পাঠকের হৃদয় , এই কবিতায় যেন নিজেকেই আবিষ্কারের খেলা , তবু খেলতে ক্লান্তি নেই , নির্ভেজাল এক আত্মতুষ্টি নিজেকেই জাগিয়ে রাখে অনেকক্ষণ , আর সেখানেই কবি সফল ।
অন্য আরো কিছু কথা না বললে আলোচনা অসমাপ্ত থাকবে । আধুনিক কবিতা কোথাও যেন শব্দের এবং অসমাপ্ত ভাষণে বহুমুখী পথ খুলে দিচ্ছে , কবির উচ্চতায় উঠে কবিতা পাঠের চেতন সকল পাঠকের মধ্যে হয়ত থাকে না , তারা খাবি খেলে পক্ষান্তরে কবিতারই ক্ষতি-বৈ লাভ নেই । কবিকে আরো কিছুটা পাঠকের সঙ্গে একাত্মা হতে হবে বলেই আমার ব্যক্তিগত অভিমত ।
দ্বিতীয়ত , কিছু কবিতায় অনিচ্ছাকৃত কিছু একই ধরনের শব্দ প্রয়োগ কবির মনোযোগ আকর্ষণের দাবী রাখে বলেই আমার বিশ্বাস