প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০১৪

প্রবন্ধ - অমিতাভ প্রামাণিক

সাহিত্যসম্রাট ও তাঁর বঙ্গদর্শন – রবির আলোকে
অমিতাভ প্রামাণিক



বাংলাভাষায় সাহিত্যপত্রিকাগুলির বর্তমান অবস্থা একটু দূর থেকে অবলোকন করলে বেশ কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। সাহিত্য তো জীবনেরই জলছবি। বাংলার সাম্প্রতিক সামাজিক অবক্ষয় অনেকটাই রাজনৈতিক দলাদলিপ্রসূত, সাহিত্যপত্রিকাগুলিও তার ঊর্ধে উঠতে পারেনি। ফলে অধিকাংশ পত্রিকাই এখন কোনো দলীয় রাজনৈতিক মুখপত্রের বেশি কিছু নয়। সমস্যা আরো গভীর হয়, যখন শাক দিয়ে এই মাছ ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়। তা পাঠককূলকে বিভ্রান্ত করে, যা এখন অহরহ ঘটে চলেছে। এর কুফল সাধারণতঃ হয় সুদূরপ্রসারী।

কী হচ্ছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি, হয়ত এর ফল সম্যক উপলব্ধি করতে পারছি না। এ সময় প্রয়োজন হয় ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা, তার থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো।

বাংলাভাষায় প্রথম সার্থক সাহিত্যপত্রিকা বঙ্গদর্শন, সম্পাদক ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমের হাত ধরেই বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের আসরে নতুন মর্যাদায় স্থাপিত হয়। বঙ্কিমের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ শীর্ষক প্রবন্ধে, নিজের আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’তে এবং জীবদ্দশায় অনেকবার বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিম ও বঙ্গদর্শনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ, বিভিন্ন প্রবন্ধে তা প্রকাশিত। বঙ্কিম-রবীন্দ্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কিছু টুকরো-টাকরা – বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের চোখে – তুলে ধরাই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।

বয়সে তেইশ বছরের বড় বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী যখন প্রকাশিত হয়, রবীন্দ্রনাথ তখন নেহাৎই চার বছরের বালক। পরবর্তী চার বছরে কপালকুন্ডলা আর মৃণালিনী নামে আরও দুটি উপন্যাস লেখেন বঙ্কিম। তিনটে উপন্যাসই বাঙালি পাঠকসমাজে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল।

কর্মসূত্রে এরপর বহরমপুরে বদলি হন বঙ্কিম। সেখানে তখন তারকাদের ছড়াছড়ি। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রামগতি ন্যায়রত্ন, রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, অক্ষয়চন্দ্র সরকার প্রমুখ তাবড় নামজাদা সাহিত্যিকরা তখন পূর্ণ মহিমায়। এদের সান্নিধ্যে এসে বঙ্কিম বাংলায় একটা নতুন সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের তাগিদ অনুভব করেন। ১২৭৯ সালের প্রথম মাস থেকেই তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাহিত্যের মাসিক পত্রিকা, বঙ্গদর্শন। বাংলা সাহিত্যে তা এক নবজাগরণের সূচনা করে প্রকৃত অর্থেই।

বঙ্গদর্শন প্রকাশের কারণ হিসাবে পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় তিনি লেখেন – সুশিক্ষিত বাঙ্গালীরা বাঙ্গালা রচনায় বিমুখ বলিয়া সুশিক্ষিত বাঙ্গালীরা বাঙ্গালা পাঠে বিমুখ। সুশিক্ষিত বাঙ্গালীরা বাঙ্গালা পাঠে বিমুখ বলিয়া সুশিক্ষিত বাঙ্গালীরা বাঙ্গালা রচনায় বিমুখ। আমরা এই পত্রকে সুশিক্ষিত বাঙ্গালীর পাঠোপযোগী করিতে যত্ন করিব। ... এই আমাদিগের প্রথম উদ্দেশ্য।

সাহিত্যসম্রাটের এই প্রথম উদ্দেশ্য পাঠকসমাজে কেমন গৃহীত হয়েছিল, তার উল্লেখ আছে রবীন্দ্রনাথের আত্মকথা ‘জীবনস্মৃতি’তে – অবশেষে বঙ্কিমের বঙ্গদর্শন আসিয়া বাঙালির হৃদয় লুঠ করিয়া লইল। একে তো তাহার জন্য মাসান্তের প্রতীক্ষা করিয়া থাকিতাম, তাহার পরে বড়োদলের পড়ার শেষের জন্য অপেক্ষা করা আরও বেশি দুঃসহ হইত। বিষবৃক্ষ, চন্দ্রশেখর এখন যে-খুশি সেই অনায়াসে একেবারে একগ্রাসে পড়িয়া ফেলিতে পারে কিন্তু আমরা যেমন করিয়া মাসের পর মাস কামনা করিয়া, অপেক্ষা করিয়া, অল্পকালের পড়াকে সুদীর্ঘকালের অবকাশের দ্বারা মনের মধ্যে অনুরণিত করিয়া, তৃপ্তির সঙ্গে অতৃপ্তি, ভোগের সঙ্গে কৌতূহলকে অনেকদিন ধরিয়া গাঁথিয়া গাঁথিয়া পড়িতে পাইয়াছি, তেমন করিয়া পড়িবার সুযোগ আর কেহ পাইবে না।

বাংলা ভাষার গতিপ্রকৃতি বদলে গেল লহমায়। বঙ্গদর্শনের আগে কী ছিল আর বঙ্গদর্শন প্রকাশ পাবার পর কী হল, তার বিশ্লেষণে ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ শীর্ষক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন - পূর্বে কী ছিল এবং পরে কী পাইলাম তাহা দুই কালের সন্ধিস্থলে দাঁড়াইয়া আমরা এক মুহূর্তেই অনুভব করিতে পারিলাম। কোথায় গেল সেই অন্ধকার, সেই একাকার, সেই সুপ্তি, কোথায় গেল সেই বিজয়-বসন্ত, সেই গোলেবকাগুলি, সেইসব বালক-ভুলানো কথা – কোথা হইতে আসিল এত আলোক, এত আশা, এত সংগীত, এত বৈচিত্র্য। বঙ্গদর্শন যেন তখন আষাঢ়ের প্রথম বর্ষার মতো সমাগতো রাজবদুন্নত-ধ্বনিঃ। এবং মুষলধারে ভাববর্ষণে বঙ্গসাহিত্যের পূর্ববাহিনী পশ্চিমবাহিনী সমস্ত নদী-নির্ঝরিণী অকস্মাৎ পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হইয়া যৌবনের আনন্দবেগে ধাবিত হইতে লাগিল। কত কাব্য নাটক উপন্যাস কত প্রবন্ধ কত সমালোচনা কত মাসিকপত্র কত সংবাদপত্র বঙ্গভূমিকে জাগ্রত প্রভাতকলরবে মুখরিত করিয়া তুলিল। বঙ্গভাষা সহসা বাল্যকাল হইতে যৌবনে উপনীত হইল।

বঙ্গভাষার বাল্যকাল ব্যাপারটাও রবীন্দ্রনাথ ব্যাখ্যা করেছেন অতি সুন্দরভাবে। বঙ্কিম-যুগ শুরু হওয়ার আগে বাংলাভাষার বিন্দুমাত্র গৌরব ছিল না। সংস্কৃত পন্ডিতেরা বাংলাকে গ্রাম্য আর ইংরেজরা বর্বর বলে ভাবত। বাংলাভাষায় কিছু সে সাহিত্য রচনা সম্ভব, লিখে যে কোন কীর্তি অর্জন করা যায়, তা তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না। বাংলাভাষায় লেখা বই মানে ছিল দয়া করে বাড়ির বৌ আর বাচ্চাদের জন্যে সরল পাঠ্যপুস্তক, তা না ছিল সরল, না পাঠ্য। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় - সেই-সকল পুস্তকের সরলতা ও পাঠযোগ্যতা সম্বন্ধে যাঁহাদের জানিবার ইচ্ছা আছে তাঁহারা রেভারেণ্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়-রচিত পূর্বতন এন্ট্রেন্স-পাঠ্য বাংলা গ্রন্থে দন্তস্ফুট করিবার চেষ্টা করিয়া দেখিবেন। অসম্মানিত বঙ্গভাষাও তখন অত্যন্ত দীন মলিন ভাবে কালযাপন করিত। তাহার মধ্যে যে কতটা সৌন্দর্য কতটা মহিমা প্রচ্ছন্ন ছিল তাহা তাহার দারিদ্র্য ভেদ করিয়া স্ফূর্তি পাইত না। যেখানে মাতৃভাষার এত অবহেলা সেখানে মানবজীবনের শুষ্কতা শূন্যতা দৈন্য কেহই দূর করিতে পারে না।

এমন সময়ে তখনকার শিক্ষিতশ্রেষ্ঠ বঙ্কিমচন্দ্র আপনার সমস্ত শিক্ষা সমস্ত অনুরাগ সমস্ত প্রতিভা উপহার লইয়া সেই সংকুচিতা বঙ্গভাষার চরণে সমর্পণ করিলেন; তখনকার কালে কী যে অসামান্য কাজ করিলেন তাহা তাঁহারই প্রসাদে আজিকার দিনে আমরা সম্পূর্ণ অনুমান করিতে পারি না।

জীবনের শেষপ্রান্তে উপনীত হয়ে এক ছাত্রসম্ভাষণে রবীন্দ্রনাথের বঙ্কিমশ্রদ্ধা ও সেইসঙ্গে বঙ্গদর্শনের ভূমিকা সম্বন্ধে তাঁর মনোভাব প্রকাশ পায় এই ভাষায় - যেমন কাব্যসোহিত্যে মধুসূদন তেমনি আধুনিক বাংলা গদ্যসাহিত্যের পথমুক্তির আদিতে আছেন বঙ্কিমচন্দ্র। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বপ্রথম ছাত্রদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন বরণীয় ব্যক্তি। ... তাঁর চিত্ত অনুপ্রাণিত হয়েছিল প্রধানভাবে ইংরেজি শিক্ষায়। ... যেমন দূর গিরিশিখরের জলপ্রপাত যখন শৈলবক্ষ ছেড়ে প্রবাহিত হয় জনস্থানের মধ্য দিয়ে তখন দুইতীরবর্তী ক্ষেত্রগুলিকে ফলবান্‌ ক'রে তোলে তাদের নিজেরই ভূমি-উদ্ভিন্ন ফলশস্যে, তেমনি নূতন শিক্ষাকে বঙ্কিমচন্দ্র ফলবান্‌ ক'রে তুলেছেন নিজেরই ভাষাপ্রকৃতির স্বকীয় দানের দ্বারা। তার আাগে বাংলাভাষায় গদ্যপ্রবন্ধ ছিল ইস্কুলে পোড়োদের উপদেশের বাহন। ... কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজি শিক্ষার পরিণত শক্তিতেই রূপ দিতে প্রবৃত্ত হলেন বাংলাভাষায় বঙ্গদর্শন মাসিক পত্রে। বস্তুত নবযুগপ্রবর্তক প্রতিভাবানের সাধনায় ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম বাংলাদেশেই য়ুরোপীয় সংস্কৃতির ফসল ভাবী কালের প্রত্যাশা নিয়ে দেখা দিয়েছিল, বিদেশ থেকে আনীত পণ্য আকারে নয়, স্বদেশের ভূমিতে উৎপন্ন শস্যসম্পদের মতো।

প্রসঙ্গতঃ বঙ্কিম মাত্র চারবছর পত্রিকাটা টানতে পেরেছিলেন। ১২৮২ সালে বন্ধ হয়ে যাবার পর মেজোভাই সঞ্জীবচন্দ্র সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে বছর পাঁচেক অনিয়মিতভাবে প্রকাশ করেছিলেন বঙ্গদর্শন। তার পর শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায় এর প্রকাশ হয় গোটা চারেক সংখ্যা। ১২৯০ সালে তাও বন্ধ হয়ে যাবার দীর্ঘ আঠারো বছর পর আবার নব পর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করে বঙ্গদর্শন, সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বঙ্গদর্শন প্রথম প্রকাশের সময় রবি বারো বছরের কিশোর, সদ্য কবিতা লিখতে ও দাদাদের আনুকূল্যে এদিক ওদিক ছাপাতে শুরু করেছেন। মেঘনাদবধ কাব্য পড়া হয়ে গেছে, কুমারসম্ভব-অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌ পড়ছেন, পড়ছেন ম্যাকবেথ। সে সময় পত্রপত্রিকায় সমস্ত লেখা লেখকের নাম দিয়ে ছাপা হত না। বঙ্গদর্শনে ‘এক চতুর্দশ বর্ষীয় বালকের রচিত’ ‘ভারতভূমি’ বা পরের বছর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দ্বাদশবর্ষীয় বালকের রচিত’ ‘অভিলাষ’ কবিতাদুটির প্রথম বা দ্বিতীয়টি রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত কবিতা বলে অনুমান। অবশ্য যখন বঙ্গদর্শনে ‘এক চতুর্দশ বর্ষীয় বালকের রচিত’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়, অনেকের মতে বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের ঘনিষ্টতার ফলস্বরূপ, তখন রবির বয়স বারো।

বঙ্কিমের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয় চতুর্দশ বর্ষের কিছু পরে, সেই সময়ের কলকাতার সমস্ত কলেজ-দ্বারা আয়োজিত রি-ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে, ১২৮২ সালের সরস্বতী পূজার দিন। রবীন্দ্রনাথ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র ছিলেন, উক্ত সময়ের পরবর্তীকাল পর্যন্ত তাঁর কলেজের বেতন চুকিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও কলেজে অনুপস্থিতির কারণে তিনি তখন প্রাক্তন ছাত্র! অবশ্য পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে প্রাক্তন ছাত্রদের ভূমিকাই বেশি। তিনি সেই অনুষ্ঠানে জ্যোতিদাদার সরোজিনী নাটক থেকে কয়েকটি তেজোদ্দীপ্ত কবিতা পাঠ করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল তাঁর নিজের লেখা – জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা! দ্বিগুণ দ্বিগুণ। প্রথম দর্শন ও সেই প্রসঙ্গে বঙ্কিমের চরিত্রের শিষ্টতা ও পরিশীলতার উদাহরণ দিতে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্র প্রবন্ধে সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এই রকম - বঙ্কিমের প্রতিভায় বল এবং সৌকুমার্যের একটি সুন্দর সংমিশ্রণ ছিল। নারীজাতির প্রতি যথার্থ বীরপুরুষের মনে যেরূপ একটি সসম্ভ্রম সম্মানের ভাব থাকে তেমনি সুরুচি এবং শীলতার প্রতি বঙ্কিমের বলিষ্ঠবুদ্ধির একটি বীরোচিত প্রীতিপূর্ণ শ্রদ্ধা ছিল। বঙ্কিমের রচনা তাহার সাক্ষ্য। বর্তমান লেখক যেদিন প্রথম বঙ্কিমকে দেখিয়াছিল, সেদিন একটি ঘটনা ঘটে যাহাতে বঙ্কিমের এই স্বাভাবিক সুরুচিপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

সেদিন লেখকের আত্মীয় পূজ্যপাদ শ্রীযুক্ত শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর মহোদয়ের নিমন্ত্রণে তাঁহাদের মরকতকুঞ্জে কলেজ-রিয়্যুনিয়ন নামক মিলনসভা বসিয়াছিল। ...সেখানে আমার অপরিচিত বহুতর যশস্বী লোকের সমাগম হইয়াছিল। সেই বুধমণ্ডলীর মধ্যে একটি ঋজু দীর্ঘকায় উজ্জ্বলকৌতুকপ্রফুল্লমুখ গুম্ফধারী প্রৌঢ় পুরুষ চাপকানপরিহিত বক্ষের উপর দুই হস্ত আবদ্ধ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন। দেখিবামাত্রই যেন তাঁহাকে সকলের হইতে স্বতন্ত্র এবং আত্মসমাহিত বলিয়া বোধ হইল। আর সকলে জনতার অংশ, কেবল তিনি যেন একাকী একজন। সেদিন আর-কাহারো পরিচয় জানিবার জন্য আমার কোনোরূপ প্রয়াস জন্মে নাই, কিন্তু তাঁহাকে দেখিয়া তৎক্ষণাৎ আমি এবং আমার একটি আত্মীয় সঙ্গী একসঙ্গেই কৌতূহলী হইয়া উঠিলাম। সন্ধান লইয়া জানিলাম তিনিই আমাদের বহুদিনের অভিলষিতদর্শন লোকবিশ্রুত বঙ্কিমবাবু। মনে আছে, প্রথম দর্শনেই তাঁহার মুখশ্রীতে প্রতিভার প্রখরতা এবং বলিষ্ঠতা এবং সর্বলোক হইতে তাঁহার একটি সুদূর স্বাতন্ত্র্যভাব আমার মনে অঙ্কিত হইয়া গিয়াছিল। ... প্রথম দর্শনে সেই-যে তাঁহার মুখে উদ্যত খড়ে্‌গর ন্যায় একটি উজ্জ্বল সুতীক্ষ্ণ প্রবলতা দেখিতে পাইয়াছিলাম, তাহা আজ পর্যন্ত বিস্মৃত হই নাই।

সেই উৎসব উপলক্ষে একটি ঘরে একজন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত দেশানুরাগমূলক স্বরচিত সংস্কৃত শ্লোক পাঠ এবং তাহার ব্যাখ্যা করিতেছিলেন। বঙ্কিম এক প্রান্তে দাঁড়াইয়া শুনিতেছিলেন। পণ্ডিতমহাশয় সহসা একটি শ্লোকে পতিত ভারতসন্তানকে লক্ষ্য করিয়া একটা অত্যন্ত সেকেলে পণ্ডিতি রসিকতা প্রয়োগ করিলেন, সে রস কিঞ্চিৎ বীভৎস হইয়া উঠিল। বঙ্কিম তৎক্ষণাৎ একান্ত সংকুচিত হইয়া দক্ষিণ-করতলে মুখের নিম্নার্ধ ঢাকিয়া পার্শ্ববর্তী দ্বার দিয়া দ্রুতবেগে অন্য ঘরে পলায়ন করিলেন।

বঙ্কিমের সেই সসংকোচ পলায়নদৃশ্যটি অদ্যাবধি আমার মনে মুদ্রাঙ্কিত হইয়া আছে।

শিষ্টতা ও রুচিশীলতা সমাজের মান্যগণ্য মানুষের কাছে তো বটেই, সাহিত্যিকেরও এক অবশ্যম্ভাবী গুণ হওয়া উচিত, কেননা সাহিত্যিকের পাঠক-পাঠিকাগণ তাঁদের জীবন-যাপন ও সাহিত্যকর্মের মধ্যে অনেক সময়েই প্রভেদ করেন না। রবীন্দ্রনাথ আজীবন এই ধারা মেনে চলেছেন, বহু সময় অকারণ আক্রমণের লক্ষ্যস্থল হয়েও তাঁর স্থৈর্য ও সংযমের বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় হয়নি। বস্তুত বাংলাসাহিত্যে রুচিশীলতা আমদানির ক্রেডিটও তিনি বঙ্কিমকেই দিয়েছেন - ঈশ্বর গুপ্ত যখন সাহিত্যগুরু ছিলেন বঙ্কিম তখন তাঁহার শিষ্যশ্রেণীর মধ্যে গণ্য ছিলেন। সে সময়কার সাহিত্য অন্য যে-কোনো প্রকার শিক্ষা দিতে সমর্থ হউক ঠিক সুরুচি শিক্ষার উপযোগী ছিল না। সে সময়কার অসংযত বাকযুদ্ধ এবং আন্দোলনের মধ্যে দীক্ষিত ও বর্ধিত হইয়া ইতরতার প্রতি বিদ্বেষ, সুরুচির প্রতি শ্রদ্ধা এবং শ্লীলতা সম্বন্ধে অক্ষুণ্ন বেদনাবোধ রক্ষা করা কী যে আশ্চর্য ব্যাপার তাহা সকলেই বুঝিতে পারিবেন। দীনবন্ধুও বঙ্কিমের সমসাময়িক এবং তাঁহার বান্ধব ছিলেন, কিন্তু তাঁহার লেখায় অন্য ক্ষমতা প্রকাশ হইলেও তাহাতে বঙ্কিমের প্রতিভার এই ব্রাহ্মণোচিত শুচিতা দেখা যায় না। তাঁহার রচনা হইতে ঈশ্বর গুপ্তের সময়ের ছাপ কালক্রমে ধৌত হইতে পারে নাই।

‘জ্ঞানাঙ্কুর ও প্রতিবিম্ব’ নামে এক পত্রিকায় কিশোর রবির বনফুল নামের কাব্য-উপন্যাস ও প্রলাপ নামে কবিতাগুচ্ছ প্রকাশিত হচ্ছিল নিয়মিতভাবে। মাত্র সাড়ে পনের বছর বয়সে তিনি সেই পত্রিকায় অন্যের লেখা কাব্যপুস্তকের সমালোচনা প্রকাশ করেন, যার নাম ভুবনমোহিনী প্রতিভা, অবসর সরোজিনী ও দুঃখসঙ্গিনী। তিনটি বইয়ের রচয়িতা যথাক্রমে ভুবনমোহিনী দেবী (ছদ্মনামও হতে পারে), রাজকৃষ্ণ রায় ও হরিশ্চন্দ্র নিয়োগী। এই সমালোচনা বঙ্গদর্শনে নিয়মিত প্রকাশিত বঙ্কিমের গ্রন্থ-সমালোচনার ধাঁচে। তখন দু-রকম রীতিতে গ্রন্থ সমালোচনা করা হত – সংক্ষিপ্ত সমালোচনা, অর্থাৎ সমালোচকের বাহুল্যবর্জিত মতামত এবং দীর্ঘ সমালোচনা যাতে বইটার আলোচ্য বিষয়ের বর্ণনার পর সমালোচকের নিজস্ব বিশ্লেষণ দেওয়া হত। এই প্রথম প্রয়াসে তিনি বঙ্কিমের মতই দ্বিতীয় ধারায় মহাকাব্য, খন্ডকাব্য, গীতিকাব্য ইত্যাদির সাধারণ আলোচনা করে পরে তার গভীরে প্রবেশ করেছেন, একজন সাহিত্য উপদেষ্টা যেমন লেখকের আসন থেকে উঁচুতে বসে লেখককে উপদেশ দেন, সেই ভঙ্গিতে। নিজেই পরে লিখেছেন – খুব ঘটা করিয়া লিখিয়াছিলাম ... খন্ডকাব্যেরই বা লক্ষণ কী, গীতিকাব্যেরই বা লক্ষণ কী, তাহা অপূর্ব বিচক্ষণতার সহিত আলোচনা করিয়াছিলাম।

বাংলা ভাষায় সাহিত্য-বিষয়ক যতগুলো পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল সেই সময়, তার আদর্শস্বরূপ ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন। সমকালীন ঠাকুরবাড়ির পত্রিকা তত্ত্ববোধিনী ছিল মূলতঃ ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র, সুতরাং ধর্মীয় ও সামাজিক রচনার স্থান, যদিও এতেও সাহিত্যচর্চা কম হত না। বালক রবির অনেক রচনা এতে ছাপা হয়েছে। বঙ্গদর্শন অনুসরণে পরবর্তীতে প্রকাশ পায় আর্য্যদর্শন, বান্ধব, জ্ঞানাঙ্কুর, প্রতিবিম্ব, ভ্রমর। চারবছর নিয়মিত প্রকাশের পর বঙ্গদর্শন বন্ধ হওয়ার কিছু সময় পর অনিয়মিত অবস্থায় সঞ্জীবচন্দ্রের সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ করলেও তার পূর্বগৌরব ফিরে পায় নি। বাকি পত্রিকাগুলোর হালও একই রকম। প্রতিবিম্ব প্রকাশের কয়েক মাসের মধ্যেই জ্ঞানাঙ্কুরের সঙ্গে মিলে যায়, তাও শেষরক্ষা হয়নি। আর্য্যদর্শন, ভ্রমর – এদের অবস্থাও তথৈবচ।

বঙ্গদর্শনের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে ১২৮৪ সালের শ্রাবণমাসে আত্মপ্রকাশ করে ভারতী, ঠাকুরবাড়ি থেকে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উদ্যোগে ও দ্বিজেন্দ্রনাথের প্রাথমিক সম্পাদনায়। যদিও এই দুজন মূলতঃ ঐ কাজটুকুই করেছিলেন, অর্থাৎ শুরু করা, নামকরণ করা ও সম্পাদক হিসাবে নাম লেখানো। শুরুতে এর মূল কর্ণধার ছিলেন রবীন্দ্রনাথই, লেখা জোগাড় করা থেকে শুরু করে পত্রিকার যাবতীয় কাজ। কিছু কিছু সংখ্যায় তাঁর নিজের লেখা ছিল পত্রিকার অর্ধেকেরও বেশি। ভারতী পত্রিকা চলেছিল প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে, যার মধ্যে কাগজে কলমে রবীন্দ্রনাথ সম্পাদক ছিলেন মাত্র এক বছর। দ্বিজেন্দ্রনাথের পর তাঁর বোন স্বর্ণকুমারী এবং ভাগ্নী সরলা বহুকাল এর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। রবীন্দ্রপ্রতিভা উন্মেষে ভারতী-র গুরুত্ব অপরিসীম।

মাত্র ষোল বছর বয়সে ভারতী-র প্রথম দুটি সংখ্যায় ‘ভিখারিণী’ গল্প দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গদ্যসাহিত্যের সূত্রপাত। এই গল্পটিই বাংলা সাহিত্যে প্রথম ছোটগল্প। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে মূলতঃ কবি বলে পরিচিত করলেও তাঁর কবিতার স্বকীয়তা আসতে সময় লেগেছিল। তাঁর জন্মবর্ষে মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু এই ছাঁদ রবিকে প্রভাবিত করেনি একেবারেই। তিনি বিহারীলালের রচনায় শুরুতে বেশ কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেও গেছেন। বিহারীলাল শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছিলেন - আমার সেই কাব্যগুরুর নিকট আর-একটি ঋণ স্বীকার করিয়া লই। বাল্যকালে "বাল্মীকি-প্রতিভা' নামক একটি গীতিনাট্য রচনা করিয়া "বিদ্বজনসমাগম"- নামক সম্মিলন উপলক্ষে অভিনয় করিয়াছিলাম। বঙ্কিমচন্দ্র এবং অন্যান্য অনেক রসজ্ঞ লোকের নিকট সেই ক্ষুদ্র নাটকটি প্রীতিপদ হইয়াছিল। সেই নাটকের মূল ভাবটি, এমন-কি, স্থানে স্থানে তাহার ভাষা পর্যন্ত বিহারীলালের "সারদামঙ্গলে'র আরম্ভভাগ হইতে গৃহীত। অবশ্য এই আদর্শ নিজস্ব পথ প্রশস্ত করার পক্ষে বিশেষ অনুকূল ছিল না। নতুন বিষয় চয়ন, নতুনভাবে তাদের প্রকাশ ইত্যাদি ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর পথ তাঁকে নিজেই খুঁজে নিতে হয়েছিল। কিন্তু গদ্যের ব্যাপারে, বিশেষ করে কাহিনী চিত্রণে, চরিত্র সৃষ্টিতে অনেকের লেখাই তাঁর গদ্যরচনার দ্রুত পরিণতি প্রদানে সাহায্য করেছিল। বিদ্যাসাগরের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল অকুণ্ঠ, রমেশচন্দ্র দত্তের উপন্যাস বা দীনবন্ধু মিত্রের নাটক তাঁর গদ্যরচনায় সহায়ক হয়েছিল নিঃসন্দেহে, তবে এই তালিকায় অবিসংবাদিতভাবে শীর্ষে ছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র।

রবীন্দ্রনাথের লেখা বাল্মীকি প্রতিভা অভিনীত হয়েছিল বিদ্বজ্জন সভা নামে ঠাকুরবাড়িতে অনুষ্ঠেয় বার্ষিক সভায়, যেখানে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা নিমন্ত্রিত হতেন। রবীন্দ্রনাথের সেই প্রথম মঞ্চে অভিনয়, তখন তাঁর বয়স কুড়ি। লিখেছিলেন – তেতালার ছাদের উপর পাল খাটাইয়া স্টেজ বাঁধিয়া এই বাল্মীকিপ্রতিভার অভিনয় হইল। তাহাতে আমি বাল্মীকই সাজিয়াছিলাম (এবং ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রতিভা সরস্বতী সাজিয়াছিল), রঙ্গমঞ্চে আমার এই প্রথম অবতরণ। দর্শকদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন, তিনি এই গীতিনাট্যের অভিনয় দেখিয়া তৃপ্তিপ্রকাশ করিয়াছিলেন।

ঠাকুরবাড়িতে যাতায়াত ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে প্রতিই বছর এগারোই মাঘ অনুষ্ঠিত হত অপৌত্তলিক ব্রাহ্মদের বার্ষিক মাঘোৎসব। জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারীর মেয়ে সরলা লিখেছেন – একবার একটা ১১ই মাঘের উৎসবে বাড়ির ছেলেমেয়ে গায়নমন্ডলী আমরা গান গাইতে গাইতে হঠাৎ অনুভব করলুম আমাদের পিছনে একটা নাড়াচাড়া সাড়াশব্দ পড়ে গেছে। কে এসেছেন? পিছন ফিরে ভিড়ের ভিতর হঠাৎ একটা চেহারা চোখে পড়ল – দীর্ঘনাসা, তীক্ষ্ণ উজ্জ্বল দৃষ্টি, মুখময় একটা সহাস্য জ্যোতির্ময়তা। জানলুম তিনি বঙ্কিম। যে বঙ্কিম এতদিন তাঁর রচনামূর্তিতে আমাকে পেয়ে বসেছিলেন আজ পেলুম তাঁকে প্রকৃতির তুলিতে হাড়েমাসে রঞ্জনা মূর্তিতে। রবীন্দ্র ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরার লেখনীতেও একই উচ্ছ্বাস – ছোট বেলায় আমি রবিকার সঙ্গে তাঁর সভায় এবং অন্যান্য জায়গায় চলে যেতুম। মনে আছে বঙ্কিমবাবুর বাড়িতেও গিয়েছিলুম। তাঁর তীক্ষ্ণ নাক ও চাপা ঠোঁটের চেহারা এখনও একটু একটু মনে আনতে পারি। তাঁর উপন্যাস তখন টাটকা টাটকা খোলা থেকে সবে নাব্‌ছে, আর মেয়েরা নতুন নতুন বই পড়বার জন্য আঁকুবাঁকু করছে। তিনি জোড়াসাঁকো বাড়ি আসবেন শুনে বর্ণপিসিমা ওঁদের সে কী আগ্রহ! আর খড়খড়ে তুলে উঁকিঝুঁকি মেরে তাঁকে দেখবার সে কী উৎসাহ!

এ থেকে বোঝা যায়, এমনকি সাহিত্যজগতেও সুদর্শন পুরুষদের অতিরিক্ত আবেদন ছিল। অবশ্য এ থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত ছিলেন না উত্তরসূরী রবীন্দ্রনাথও।

এরপর বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমের সাক্ষাতের জন্য আগ্রহী হন। জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন - অনেকবার তাঁহাকে দেখিতে ইচ্ছা হইয়াছে কিন্তু উপলক্ষ ঘটে নাই। অবশেষে একবার, যখন হাওড়ায় তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন তখন সেখানে তাঁহার বাসায় সাহস করিয়া দেখা করিতে গিয়াছিলাম। দেখা হইল, যথাসাধ্য আলাপ করিবারও চেষ্টা করিলাম, কিন্তু ফিরিয়া আসিবার সময়ে মনের মধ্যে যেন একটা লজ্জা লইয়া ফিরিলাম। অর্থাৎ, আমি যে নিতান্তই অর্বাচীন, সেইটে অনুভব করিয়া ভাবিতে লাগিলাম, এমন করিয়া বিনা আহ্বানে তাঁহার কাছে আসিয়া ভালো করি নাই।

এই লেখাতেই রবীন্দ্রনাথের কবি হিসাবে বেড়ে ওঠার দিনগুলোর বর্ণনা অসামান্য - তাহার পরে বয়সে আরো কিছু বড়ো হইয়াছি; সে-সময়কার লেখকদলের মধ্যে সকলের কনিষ্ঠ বলিয়া একটা আসন পাইয়াছি - কিন্তু সে-আসনটা কিরূপ ও কোন্‌খানে পড়িবে তাহা ঠিকমত স্থির হইতেছিল না; ক্রমে ক্রমে যে একটু খ্যাতি পাইতেছিলাম তাহার মধ্যে যথেষ্ট দ্বিধা ও অনেকটা পরিমাণে অবজ্ঞা জড়িত হইয়া ছিল; তখনকার দিনে আমাদের লেখকদের একটা করিয়া বিলাতি ডাকনাম ছিল, কেহ ছিলেন বাংলার বায়রন, কেহ এমার্সন, কেহ আর-কিছু; আমাকে তখন কেহ কেহ শেলি বলিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন - সেটা শেলির পক্ষে অপমান এবং আমার পক্ষে উপহাসস্বরূপ ছিল; তখন আমি কলভাষার কবি বলিয়া উপাধি পাইয়াছি; তখন বিদ্যাও ছিল না, জীবনের অভিজ্ঞতাও ছিল অল্প, তাই গদ্য পদ্য যাহা লিখিতাম তাহার মধ্যে বস্তু যেটুকু ছিল ভাবুকতা ছিল তাহার চেয়ে বেশি, সুতরাং তাহাকে ভালো বলিতে গেলেও জোর দিয়া প্রশংসা করা যাইত না। তখন আমার বেশভূষা ব্যবহারেও সেই অর্ধস্ফুটতার পরিচয় যথেষ্ট ছিল; চুল ছিল বড়ো বড়ো এবং ভাবগতিকেও কবিত্বের একটা তুরীয় রকমের শৌখিনতা প্রকাশ পাইত; অত্যন্তই খাপছাড়া হইয়াছিলাম, বেশ সহজ মানুষের প্রশস্ত প্রচলিত আচার-আচরণের মধ্যে গিয়া পৌঁছিয়া সকলের সঙ্গে সুসংগত হইয়া উঠিতে পারি নাই।

অবশ্য বঙ্কিমের সাক্ষাৎ পাওয়ার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। এ বিষয়ে লিখেছেন - বঙ্কিমবাবু তখন বঙ্গদর্শনের পালা শেষ করিয়া ধর্মালোচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন। প্রচার বাহির হইতেছে। আমিও তখন প্রচার-এ একটি গান ও কোনো বৈষ্ণব-পদ অবলম্বন করিয়া একটি গদ্য-ভাবোচ্ছ্বাস প্রকাশ করিয়াছি।

এই সময়ে কিংবা ইহারই কিছু পূর্ব হইতে আমি বঙ্কিমবাবুর কাছে আবার একবার সাহস করিয়া যাতায়াত করিতে আরম্ভ করিয়াছি, তখন তিনি ভবানীচরণ দত্তর স্ট্রীটে বাস করিতেন। বঙ্কিমবাবুর কাছে যাইতাম বটে কিন্তু বেশিকিছু কথাবার্তা হইত না। আমার তখন শুনিবার বয়স, কথা বলিবার বয়স নহে। ইচ্ছা করিত আলাপ জমিয়া উঠুক, কিন্তু সংকোচে কথা সরিত না। এক-একদিন দেখিতাম সঞ্জীববাবু তাকিয়া অধিকার করিয়া গড়াইতেছেন। তাঁহাকে দেখিলে বড়ো খুশি হইতাম। তিনি আলাপী লোক ছিলেন। গল্প করায় তাঁহার আনন্দ ছিল এবং তাঁহার মুখে গল্প শুনিতেও আনন্দ হইত। যাঁহারা তাঁহার প্রবন্ধ পড়িয়াছেন তাঁহারা নিশ্চয় লক্ষ্য করিয়াছেন যে, সে-লেখাগুলি কথা-কহার অজস্র আনন্দবেগেই লিখিত – ছাপার অক্ষরে আসর জমাইয়া যাওয়া; এই ক্ষমতাটি অতি অল্প লোকেরই আছে, তাহার পরে সেই মুখে বলার ক্ষমতাটিকে লেখার মধ্যেও তেমনি অবাধে প্রকাশ করিবার শক্তি আরো কম লোকের দেখিতে পাওয়া যায়।

১২৮০ সালের পৌষ বঙ্গদর্শন সংখ্যায় বঙ্কিমচন্দ্র এক প্রবন্ধ লেখেন জয়দেব ও বিদ্যাপতির কবিপ্রকৃতির লক্ষণ বিচার করে। তাঁর মত অনুযায়ী জয়দেব ভোগ ও সুখের কবি এবং বিদ্যাপতি দুঃখের কবি। এঁদের দুই ভিন্নশ্রেণীর গীতিকবি আখ্যা দিয়ে তিনি লেখেন – যাহা জয়দেব সম্বন্ধে বলিয়াছি, তাহা ভারতচন্দ্র সম্বন্ধে বর্তে, যাহা বিদ্যাপতি সম্বন্ধে বলিয়াছি, তাহা গোবিন্দদাস-চন্ডীদাস প্রভৃতি বৈষ্ণব কবিদিগের সম্বন্ধে তদ্রূপই বর্তে। এই প্রবন্ধের কিয়দংশ বিদ্যাপতি ও জয়দেব শিরোনামে ১২৮৩ সালে প্রকাশিত তাঁর বিবিধ সমালোচনা গ্রন্থে সঙ্কলিত হয়। কিন্তু ১২৯৪ সালে এই প্রবন্ধটিই যখন বিবিধ প্রবন্ধ প্রথম ভাগ-এ মুদ্রিত হয়, তখন দেখা যায় বঙ্কিম তাঁর পূর্বসিদ্ধান্ত থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন। ডঃ অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য তাঁর বঙ্কিমচন্দ্রের রচনায় রবীন্দ্রের প্রভাব প্রবন্ধে এই ঘটনার কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন কুড়ি বছর বয়সে তরুণ রবির লেখা চন্ডীদাস ও বিদ্যাপতি শীর্ষক প্রবন্ধটিকে। চন্ডীদাসের প্রেমভাবনা ও তৎপ্রসঙ্গে বিদ্যাপতির কাব্যবিচার শুধুমাত্র প্রবীণ বঙ্কিমকেই প্রভাবিত করেনি, আজ পর্যন্ত এদের কাব্যের তুলনা বিশ বছর বয়সী রবির প্রদর্শিত পথেই অগ্রসর হয়েছে।

একুশ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের সন্ধ্যাসঙ্গীত কাব্যগ্রন্থ। সেই বছর প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র দত্তের জ্যেষ্ঠা কন্যা কমলার সঙ্গে ভূতত্ত্ববিদ প্রমথনাথ বসুর বিবাহে নিমন্ত্রিত রবীন্দ্রনাথ পাত্রীপক্ষের বিডন স্ট্রীটের বাড়িতে উপস্থিত হতেই কঠোর বিস্ময়ের সম্মুখীন হন। এ প্রসঙ্গে জীবনস্মৃতির বর্ণনা - সন্ধ্যাসংগীতের জন্ম হইলে পর সূতিকাগৃহে উচ্চস্বরে শাঁখ বাজে নাই বটে কিন্তু তাই বলিয়া কেহ যে তাহাকে আদর করিয়া লয় নাই, তাহা নহে। ... রমেশ দত্ত মহাশয়ের জ্যেষ্ঠা কন্যার বিবাহসভার দ্বারের কাছে বঙ্কিমবাবু দাঁড়াইয়া ছিলেন; রমেশবাবু বঙ্কিমবাবুর গলায় মালা পরাইতে উদ্যত হইয়াছেন এমন সময়ে আমি সেখানে উপস্থিত হইলাম। বঙ্কিমবাবু তাড়াতাড়ি সে মালা আমার গলায় দিয়া বলিলেন,"এ মালা ইঁহারই প্রাপ্য - রমেশ,তুমি সন্ধ্যাসংগীত পড়িয়াছ?" তিনি বলিলেন,"না"। তখন বঙ্কিমবাবু সন্ধ্যাসংগীতের কোনো কবিতা সম্বন্ধে যে-মত ব্যক্ত করিলেন তাহাতে আমি পুরস্কৃত হইয়াছিলাম। অন্যত্র এই ঘটনা সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন – একদিন আমার প্রথম বয়সে কোনো নিমন্ত্রণসভায় তিনি নিজকণ্ঠ হইতে আমাকে পুষ্পমাল্য পরাইয়াছিলেন, সেই আমার জীবনের সাহিত্যচর্চার প্রথম গৌরবের দিন।

অনুজ সাহিত্যিককে এইভাবে বরণ করে নেওয়া বঙ্কিমচরিত্রের এক উজ্জ্বল দিক।

একইভাবে অগ্রজ, সমসাময়িক এবং অনুজ – সকলের প্রতি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন রবীন্দ্রচরিত্রেরও এক অসামান্য বৈশিষ্ট্য। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি তাঁর প্রভূত শ্রদ্ধা ছিল তো বটেই, যদিও সাহিত্যের অঙ্গনে তাঁদের মতপার্থক্য যে একেবারে হয়নি, তা নয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন - আমি তখন আমার কোণ ছাড়িয়া আসিয়া পড়িতেছিলাম, আমার তখনকার এই আন্দোলনকালের লেখাগুলিতে তাহার পরিচয় আছে। তাহার কতক বা ব্যঙ্গকাব্যে, কতক বা কৌতুকনাট্যে, কতক বা তখনকার সঞ্জীবনী কাগজে পত্রআকারে বাহির হইয়াছিল। ভাবাবেশের কুহক কাটাইয়া তখন মল্লভূমিতে আসিয়া তাল ঠুকিতে আরম্ভ করিয়াছি।

সেই লড়ায়ের উত্তেজনার মধ্যে বঙ্কিমবাবুর সঙ্গেও আমার একটা বিরোধের সৃষ্টি হইয়াছিল। তখনকার ভারতী ও প্রচার-এ তাহার ইতিহাস রহিয়াছে। ... এই বিরোধের অবসানে বঙ্কিমবাবু আমাকে যে একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন আমার দুর্ভাগ্যক্রমে তাহা হারাইয়া গিয়াছে। যদি থাকিত তবে পাঠকেরা দেখিতে পাইতেন, বঙ্কিমবাবু কেমন সম্পূর্ণ ক্ষমার সহিত এই বিরোধের কাঁটাটুকু উৎপাটন করিয়া ফেলিয়াছিলেন।

এই বিতর্কের সূত্রপাত বঙ্কিমচন্দ্রের এক প্রবন্ধের উত্তরে ভারতী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ একটি পুরাতন কথা, বিষয়বস্তু হিন্দু-ব্রাহ্ম বৈষম্য। এর উত্তরে বঙ্কিমচন্দ্র লেখেন আর একটি প্রবন্ধ, "আদি ব্রাহ্মসমাজ ও নব হিন্দু সম্প্রদায়'। সেখানে তিনি লেখেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর বক্তব্য ভুল বুঝে অকারণ সমালোচনা করেছেন। চাপান-উতোর চলতেই থাকে। রবীন্দ্রনাথ লেখেন - বঙ্কিমবাবু বলেন, "রবীন্দ্রবাবু "সত্য" এবং "মিথ্যা" এই দুইটি শব্দ ইংরাজি অর্থে ব্যবহার করিয়াছেন। সেই অর্থেই আমার ব্যবহৃত "সত্য" "মিথ্যা" বুঝিয়াছেন। তাঁহার কাছে সত্য Truth মিথ্যা Falsehood। আমি সত্য মিথ্যা শব্দ ব্যবহারকালে ইংরেজির অনুবাদ করি নাই..."সত্য" "মিথ্যা" প্রাচীনকাল হইতে যে অর্থে ভারতবর্ষে ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে, আমি সেই অর্থে ব্যবহার করিয়াছি। সে দেশী অর্থে, সত্য Truth, আর তাহা ছাড়া আরও কিছু। প্রতিজ্ঞা রক্ষা, আপনার কথা রক্ষা, ইহাও সত্য।'

বঙ্কিমবাবু যে অর্থে মনে করিয়া সত্য মিথ্যা শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন তাহা এখন বুঝিলাম। কিন্তু প্রচারের প্রথম সংখ্যার হিন্দুধর্ম শীর্ষক প্রবন্ধে যে কথাগুলি ব্যবহার করিয়াছেন তাহাতে এই অর্থ বুঝিবার কোনো সম্ভাবনা নাই, আমার সামান্য বুদ্ধিতে এইরূপ মনে হয়। তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহা উদ্‌ধৃত করি। "যদি মিথ্যা কহেন, তবে মহাভারতীয় কৃষ্ণোক্তি স্মরণপূর্বক যেখানে লোকহিতার্থে মিথ্যা নিতান্ত প্রয়োজনীয় অর্থাৎ যেখানে মিথ্যাই সত্য হয়, সেইখানেই মিথ্যা কথা কহিয়া থাকেন।'

প্রথমে দেখিতে হইবে সংস্কৃতে সত্য মিথ্যার অর্থ কী। একটা প্রয়োগ না দেখিলে ইহা স্পষ্ট হইবে না। মনুতে আছে - সত্যং ব্রুয়াৎ, প্রিয়ং ব্রুয়াৎ ন ব্রুয়াৎ সত্যমপ্রিয়ম্‌। প্রিয়ঞ্চ নানৃতং ব্রুয়াৎ, এষ ধর্মঃ সনাতনঃ। অর্থাৎ - সত্য বলিবে, প্রিয় বলিবে, কিন্তু অপ্রিয় সত্য বলিবে না, প্রিয় মিথ্যাও বলিবে না, ইহাই সনাতন ধর্ম। এখানে সত্য বলিতে কেবলমাত্র সত্য কথাই বুঝাইতেছে, তৎসঙ্গে প্রতিজ্ঞা রক্ষা বুঝাইতেছে না। যদি প্রতিজ্ঞারক্ষা বুঝাইত তবে প্রিয় ও অপ্রিয় শব্দের সার্থকতা থাকিত না। স্পষ্টই দেখা যাইতেছে, এখানে মনু সত্য শব্দে Truth ছাড়া "আরও কিছু'-কে ধরেন নাই ... সত্য শব্দের মূল ধাতু ধরিয়াই দেখি আর ব্যবহার ধরিয়াই দেখি - দেখা যায়, সত্য অর্থে সাধারণত Truth বুঝায় ও কেবল স্থলবিশেষে প্রতিজ্ঞা বুঝায়। অতএব যেখানে সত্যের সংকীর্ণ ও বিশেষ অর্থের আবশ্যক সেখানে বিশেষ ব্যাখ্যারও আবশ্যক।

দ্বিতীয়ত - সত্য বলিতে প্রতিজ্ঞা রক্ষা বুঝায় না। সত্য পালন বা সত্য রক্ষা বলিতে প্রতিজ্ঞারক্ষা বুঝায় - কেবলমাত্র সত্য শব্দে বুঝায় না।

তৃতীয়ত – বঙ্কিমবাবু ‘সত্য' শব্দের উল্লেখ করেন নাই, তিনি ‘মিথ্যা' শব্দই ব্যবহার করিয়াছেন। সত্য শব্দে সংস্কৃতে স্থলবিশেষে প্রতিজ্ঞা বুঝায় বটে - কিন্তু মিথ্যা শব্দে তদ্‌বিপরীত অর্থ সংস্কৃত ভাষায় বোধ করি প্রচলিত নাই - আমার এইরূপ বিশ্বাস।

বঙ্কিমচন্দ্র ক্ষোভের সঙ্গে আরও লিখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমালোচনায় তাঁকে বিস্তর গালিগালাজ করেছেন। সেই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন - ... শুনিয়া আমি নিতান্ত বিস্মিত হইলাম। ... তাঁহাকে গালি দিবার কথা আমার মনেও আসিতে পারে না। তিনি আমার গুরুজন তুল্য, তিনি আমা অপেক্ষা কিসে না বড়ো! আমি তাঁহাকে ভক্তি করি, আর কেই বা না করে। তাঁহার প্রথম সন্তান দুর্গেশনন্দিনী বোধ করি আমা অপেক্ষা বয়োজ্যেষ্ঠা। আমার যে এতদূর আত্মবিস্মৃতি ঘটিয়াছিল যে তাঁহাকে অমান্য করিয়াছি কেবলমাত্র অমান্য নহে তাঁহাকে গালি দিয়াছি তাহা সম্ভব নহে। ক্ষুব্ধ-হৃদয়ে অনেক কথা বলিয়াছি, কিন্তু গালিগালাজ হইতে অনেক দূরে আছি। মেছোহাটার তো কথাই নাই আঁষ্‌টে গন্ধটুকু পর্যন্ত নাই। ... হৃদয় হইতে উৎসারিত না হইলে সে কথা আমার মুখ দিয়া বাহির হইত না, যিনি বিশ্বাস করেন করুন, না করেন নাই করুন।

বঙ্কিমবাবুর প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ভক্তি আছে তিনি তাহা জানেন। যদি তরুণ বয়সের চপলতাবশত বিচলিত হইয়া তাঁহাকে কোনো অন্যায় কথা বলিয়া থাকি তবে তিনি তাঁহার বয়সের ও প্রতিভার উদারতাগুণে সে সমস্ত মার্জনা করিয়া এখনও আমাকে তাঁহার স্নেহের পাত্র বলিয়া মনে রাখিবেন। আমার সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি সরলভাবে যে-সকল কথা বলিয়াছি, আমাকে ভুল বুঝিয়া তাহার অন্য ভাব গ্রহণ না করেন।

এই তর্কের নিরপেক্ষ বিচার করেছেন রবীন্দ্র-ভাগিনেয়ী সরলা। ‘জীবনের ঝরাপাতা’ গ্রন্থে লিখেছেন – রবীন্দ্রনাথের প্রতিপাদ্য এই যে, মিথ্যা কোন অবস্থাতেই কথনীয় নয়। এ বিষয়ে ধর্মশাস্ত্রকারকৃত ব্যতিক্রম বিধিগুলি তিনি সমর্থন করেন না, বঙ্কিম করেন – এই প্রভেদ। রবীন্দ্রনাথের দুই অগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এ বিষয়ে শাস্ত্রকারদের ও বঙ্কিমের পক্ষাবলম্বী হলেন, তাঁরা বক্তৃতাসভায় যোগদান করলেন না। কিন্তু ছোটরা তাঁর হীরো-ওয়ারশীপার হল।

... রবীন্দ্রের বক্তৃতা তৎকালীন ভারতীতে বেরিয়েছিল (সে সময় স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন এর সম্পাদিকা), বিশ্বভারতী থেকে রবীন্দ্র রচনা সংগ্রহে সেইটি নিশ্চয় সন্নিবিষ্ট হয়ে থাকবে। কিন্তু বঙ্কিমকে বাঙালীর মনে চিরজাগরূক রাখবার কোন প্রতিষ্ঠান নেই। তাঁর যে শুধু ঔপন্যাসিক প্রতিভা ছিল না, সংস্কারের ও ভাবের গতানুগতিকতায় বাহিত না হয়ে বুদ্ধির প্রখর বিচারশীলতায় তিনি যে কত বড় আধুনিক, রবীন্দ্রের গুরু ও মার্গদর্শী তিনিই যে, সে কথা এই পুরুষের বাঙালীরা জানেনা। সত্য সম্বন্ধে রবীন্দ্রের আনকম্প্রোমাইজিং আপোষশূন্য মনোভাবের অভিব্যক্তিতে সেদিন আমরা বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা মুগ্ধ হলুম। সত্যভক্তি আমাদের মনে ক্ষোদিত করে দেওয়া হল। শিশুদের পক্ষে এইটেই দরকার।

... বড় হয়ে যখন বিচার বুদ্ধি খানিকটা উদ্বুদ্ধ হল, তখন বঙ্কিমকে পড়ে দেখে অনুভব করলুম, বঙ্কিমের প্রতি সুবিচার করিনি আমরা, সেদিন মাতুল-ভক্তিতে অযথা বঙ্কিম-মতদ্বেষী হয়ে পড়েছিলুম।

রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তাঁর অবস্থান থেকে কখনোই সরে আসেন নি। অকৃত্রিম সত্যপ্রিয়তা রবীন্দ্র-চরিত্রের এক উজ্জ্বল বৈশিষ্ট, এর সূক্ষ্ম স্বরূপ বোঝা সহজ নয়। ‘ভালো-মন্দ যাহাই আসুক, সত্যেরে লও সহজে’ তিনি শুধু লিখেই যাননি, জীবনের বিভিন্ন ঘটনায় তার নিদর্শন রেখেছেন, সে সত্য অপ্রিয় হলেও। তাঁর প্রতি অযথা আক্রমণে তিনি বিচলিত হননি – সজনীকান্ত-দ্বিজেন্দ্রলালের অত্যাচার সহ্য করেছেন। ক্ষুব্ধ হয়েছেন নিশ্চয়ই, কিন্তু প্রতিশোধ নিতে চরিত্রহননে উদ্যত হননি একবারও। বস্তুত ব্যক্তিকে নয়, বক্তব্যের বিরোধিতাই তাঁর বহু প্রবন্ধের উপজীব্য। আর প্রিয়জনের মৃত্যু অপেক্ষা অপ্রিয়তর সত্য মানবজীবনে কী আছে? সারা জীবন সেই সত্যের সম্মুখীন হয়েছেন অসম্ভব দৃঢ়তায়, কোত্থেকে সেই শক্তি পেতেন তা এখনও রহস্যই রয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের সত্যভাবনা এক পৃথক আলোচনার বস্তু, এর জন্য তাঁকে তাঁর সমকালীন ‘সত্যবাদী যুধিষ্ঠির’ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মত ‘আমার জীবনই আমার বাণী’ বা ‘মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ’ জাতীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হয় নি।

বাদ-প্রতিবাদের বৎসরাধিক কাল পরে রবীন্দ্রনাথ আবার একই বিষয়ে দামু ও চামু, বানরের শ্রেষ্ঠত্ব, হেঁয়ালি নাট্য ইত্যাদি প্রবন্ধ রচনা করেন ও সত্য শীর্ষক একটি বক্তৃতা দেন। প্রবন্ধগুলি তাঁর সমালোচনা গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। আগের সমালোচনাটিও ব্যাপকভাবে পুনর্মুদ্রিত হয় বালক, সঞ্জীবনী, তত্ত্ববোধিনী ও তত্ত্বকৌমুদী পত্রিকায়।

বঙ্কিমের ‘কৃষ্ণচরিত্রে’র সমালোচনা করে রবীন্দ্রনাথ পরেও লিখেছিলেন - বঙ্কিম এই গ্রন্থে অনাবশ্যক যে-সকল কলহের অবতারণা করিয়াছেন আমাদের নিকট তাহা অত্যন্ত পীড়াজনক বোধ হইয়াছে। কারণ, যে আদর্শ হৃদয়ে স্থির রাখিয়া বঙ্কিম এই গ্রন্থখানি রচনা করিয়াছেন, সেই আদর্শের দ্বারাই সমস্ত ভাষা এবং ভাব অনুপ্রাণিত হইয়া উঠিলে তবেই সে আদর্শের মর্যাদা রক্ষা হয়। বঙ্কিম যদি তুচ্ছ বিরোধ এবং অনুদার সমালোচনার অবতারণাপূর্বক চাঞ্চল্য প্রকাশ করেন তবে সেই চাঞ্চল্য তাঁহার আদর্শের নিত্য নির্বিকারতা দূর করিয়া ফেলে। অনেক ঝগড়া আছে যাহা সাপ্তাহিক পত্রের বাদপ্রতিবাদেই শোভা পায়, যাহা কোনো চিরস্মরণীয় চিরস্থায়ী গ্রন্থে স্থান পাইবার একেবারে অযোগ্য।

রবীন্দ্রনাথের মতে বঙ্কিমচন্দ্র ‘পাশ্চাত্য মুর্খ' অর্থাৎ ইওরোপীয় পণ্ডিতগণের ওপর অজস্র অবজ্ঞা বর্ষণ করেছেন, যা তাঁর মতে গর্হিত এবং কৃষ্ণচরিত্রের মত গ্রন্থে অশোভন। বঙ্কিম যাঁকে মানবশ্রেষ্ঠ বলিয়া জ্ঞান করেন, সেই কৃষ্ণ একাধারে ক্ষমা ও শৌর্যের আধার, যিনি সকারণে অস্ত্র ধারণ করতেও অনেক সময়েই বিরত হয়েছেন, তাঁরই চরিত্র-প্রতিষ্ঠা-স্থলে মতভেদ-উপলক্ষে চপলতা প্রকাশ করা আদর্শের অবমাননা। শ্রীকৃষ্ণের ক্ষমাগুণের বর্ণনায় অকারণে ইওরোপীয়দের ওপর খোঁচা দেওয়ায় বইটার মূল উদ্দেশ্যটা পর্যন্ত নষ্ট হয়েছে। কেননা কৃষ্ণচরিত্রের মত বই কেবল আধুনিক হিন্দুদের জন্য না লিখে সর্বকালের সর্বজাতির জন্যই লেখা হওয়া উচিত।

বঙ্কিম লিখেছেন - হিন্দু পুরাণেতিহাসে এমন কথা থাকিতে আমরা কিনা, মেমসাহেবদের লেখা নবেল পড়িয়া দিন কাটাই, না-হয় সভা করিয়া পাঁচ জনে জুটিয়া পাখির মতো কিচিরমিচির করি। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন - ক্ষণে ক্ষণে লেখকের এরূপ ধৈর্যচ্যুতি "কৃষ্ণচরিত্রে'র ন্যায় গ্রন্থে অতিশয় অযোগ্য হইয়াছে। গ্রন্থের ভাষায় ভাবে ও ভঙ্গিতে সর্বত্রই একটি গাম্ভীর্য, সৌন্দর্য ও ঔদার্য রক্ষা না করাতে বর্ণনীয় আদর্শচরিত্রের উজ্জ্বলতা নষ্ট হইয়াছে। ...বঙ্কিম সামান্য উপলক্ষমাত্রেই য়ুরোপীয়দের সহিত, পাঠকদের সহিত এবং ভাগ্যহীন ভিন্নমতাবলম্বীদের সহিত কলহ করিয়াছেন। ... বঙ্কিম নানা স্থলেই স্বীকার করিয়াছেন যে, মানুষের আদর্শ যেমন কার্যকারী এমন দেবতার আদর্শ নহে। কারণ, সর্বশক্তিমানের অনুকরণে আমাদের সহজেই উৎসাহ না হইতে পারে। যারা মানুষে সাধন করিয়াছে তাহা আমরাও সাধন করিতে পারি এই বিশ্বাস এবং আশা অপেক্ষাকৃত সুলভ এবং স্বাভাবিক। অতএব কৃষ্ণকে দেবতা প্রমাণ করিতে গিয়া বঙ্কিম তাঁহার মানব-আদর্শের মূল্য হ্রাস করিয়া দিতেছেন। কারণ, ঈশ্বরের পক্ষে সকলই যখন অনায়াসে সম্ভব তখন কৃষ্ণচরিত্রে বিশেষরূপে বিস্ময় অনুভব করিবার কোনো কারণ দেখা যায় না। বঙ্কিম এই গ্রন্থের অনেক স্থলেই যে-সকল সামাজিক তর্ক উত্থাপন করিয়াছেন তাহাতে গ্রন্থের বিষয়টি বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে মাত্র, আর কোনো ফল হয় নাই।

১২৯৮ সালে প্রকাশিত হয় হিতবাদী পত্রিকা। সেখানে সম্পাদক কী কেমনভাবে লিখতে হবে এই জাতীয় ফরমায়েসি লেখা চাইলে রবীন্দ্রনাথ বিরক্ত হয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন সাধনা। তাঁর সাহিত্যসাধনায় এই সাধনা পর্ব (১২৯৮-১৩০২) এক স্বর্ণযুগ। সম্পাদনা ও সাহিত্যচর্চায় রবীন্দ্রনাথের সাধনা-র যুগ অনেকের মতে বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন যুগের (১২৭৯-১২৮২) সঙ্গে তুলনীয়।

হিন্দুধর্মের গোঁড়ামি ও ব্রাহ্ম-উদারতা সেই সময়ের সমাজ ও সাহিত্যের অন্যতম চর্চার বিষয়। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে হিন্দু-ব্রাহ্ম বলতেন। বঙ্কিমের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা থাকলেও তাঁর শিষ্যকূল ও আর্য-ধ্বজাধারী নব্য হিন্দুসমাজের পৃষ্ঠপোষক চন্দ্রনাথ বসু, কৃষ্ণপ্রসন্ন সেন, শশধর তর্কচূড়ামণি প্রভূতদের উদ্দেশ্যে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছিলেন –

কোথা গেল সেই প্রভাতের গান, কোথা গেল সেই আশা?
আজিকে বন্ধু তোমাদের মুখে এ কেমনতর ভাষা?
তোমরা আনিয়া প্রাণের প্রবাহ ভেঙেছ মাটির আল
তোমরা আবার আনিছ বঙ্গে উজান স্রোতের কাল।

১২৯৮ সালে উড়িষ্যায় বেড়াতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ কটক ও পুরীতে দুই বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। কটকের ডিস্ট্রিক্ট জজ কবিবন্ধু বিহারীলাল গুপ্তের বাড়িতে উঠেছিলেন তিনি। দেশে তখন জুরিপ্রথা ও তাতে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্বের ওপর ইংরেজের বিধিনিষেধের ওপর প্রবল আন্দোলন হচ্ছে। সেই বাড়িতে ডিনারে আমন্ত্রিত ওখানকার র‍্যাভেনশ’ কলেজের অধ্যক্ষ হলোয়ার্ড তাদের সামনেই বলেন, এ দেশের মরাল স্ট্যান্ডার্ড লো, এখানকার লোকেদের লাইফের স্যাক্রেডনেস সম্বন্ধে যথেষ্ট বিশ্বাস নেই, এরা জুরি হবার যোগ্য নয়। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে চিঠিতে লেখেন - আমার যে কী রকম করছিল সে তোকে কী বলব ... একজন বাঙালির নিমন্ত্রণে এসে বাঙালির মধ্যে বসে যারা এ রকম করে বলতে কুণ্ঠিত হয় না তারা আমাদের কী চক্ষে দেখে! ... তোমাদের উচ্ছিষ্ট তোমাদের আদরের টুকরোর জন্যে আমার তিলমাত্র প্রত্যাশা নেই, আমি তাকে পদাঘাত করি। ... যারা ফিটফাট কাপড় পরে ডগকার্ট হাঁকায় আর আমাদের নিগার বলে, তারা যতই সভ্য ও উন্নত হোক, আমি যদি কখনো তাদের সংশ্রবের জন্যে লালায়িত হই, তবে আমার মাথায় যেন জুতো পড়ে।

কিছুদিন পর পুরীতে বিহারীবাবুর অনুরোধে সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ওয়ালসের বাড়িতে গেলে চাপরাশি তাঁকে ফিরিয়ে দিয়ে পরদিন আসতে বলে। বিরক্ত ও অপমানিত হয়ে ফিরে এলেও পরদিন বন্ধুর সম্মানে সেখানে যান তিনি। কিন্তু মনে মনে ইংরেজ শাসনের ও ভারতীয়দের ওপর তাদের লাঞ্ছনার প্রতিবাদ মনের মধ্যে জেগে ওঠে প্রবলভাবে।

এর দেড় বছর পরে তিনি লেখেন পর পর প্রবন্ধ – অপমানের প্রতিকার, রাজা ও প্রজা, ইংরেজ ও ভারতবাসী। লেখেন ব্যঙ্গরচনা পয়সার লাঞ্ছনা। ভারতে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার পর ১৮৬১ সালে যে ভারত কাউন্সিল অ্যাক্ট চালু হয়েছিল, ১৮৯২ সালে তা সংশোধিত হয়, কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিকদের দাবিদাওয়া পূরণের বদলে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারানীতি চালু করা হল। সরকারী চাকরিতে ভারতীয়দের প্রবেশের দরজা প্রায় বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ হল। দুই দেশের মুদ্রার বিনিময় এমন করা হল যে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের তাতে প্রভূত ক্ষতির সম্ভাবনা। এর বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’ প্রবন্ধটি। কলকাতায় এক সভায় ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের সভাপতিত্বে তা পাঠ করার আগে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বাড়ি গিয়ে প্রবন্ধটি পড়ে শুনিয়ে তাঁর সম্মতি নিয়ে আসেন। বারো বছর আগে বিডন স্ট্রীটে রমেশচন্দ্র দত্তের বাড়িতে বঙ্কিমের জন্য প্রস্তুত মালা তিনি পরিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের গলায়। বিডন স্ট্রীটের এই সভাতেই দুই দিকপালের শেষ সাক্ষাৎ ঘটল।

বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস রাজসিংহ রচিত হয়েছিল ১৩০০ সালে, বহুমূত্র রোগে তিনি তখন খুবই পীড়িত। চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ বইটির সমালোচনা করুক। সেই মর্মে শ্রীশচন্দ্রের হাত দিয়ে বইটি পাঠিয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ নতুন আঙ্গিকে বইটির সমালোচনা প্রকাশ করেন ভারতীতে, সমালোচনাও যে সাহিত্য হতে পারে, তার এক অপরূপ নিদর্শন ছিল সেটি। অত্যুৎকৃষ্ট এই সমালোচনা প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যু হয়, তিনি সম্ভবত সেটি দেখে যেতে পারেন নি।

বঙ্কিমপ্রসঙ্গ ফিরে ফিরে এসেছে রবীন্দ্রনাথের লেখায়। জীবনসায়াহ্নে সাহিত্যের রূপ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি প্রকাশ করেছেন সাহিত্যের অগ্রগতির পিছনে সাহিত্যিকদের অবদানের ভূমিকার গুরুত্ব ও সেই প্রসঙ্গে বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমের অবদান। বিষবৃক্ষ, চন্দ্রশেখর, আনন্দমঠ ইত্যাদি যুগান্তকারী উপন্যাসের চরিত্রসৃষ্টি প্রসঙ্গে লিখেছেন - তিনি গল্পসাহিত্যের এক নতুন রূপ নিয়ে দেখা দিলেন। ... তাঁর পূর্বেকার গল্পসাহিত্যের ছিল মুখোশ-পরা রূপ, তিনি সেই মুখোশ ঘুচিয়ে দিয়ে গল্পের একটি সজীব মুখশ্রীর অবতারণা করলেন। হোমার, বর্জিল, মিল্‌টন প্রভৃতি পাশ্চাত্য কবিদের কাছ থেকে মাইকেল তাঁর সাধনার পথে উৎসাহ পেয়েছিলেন; বঙ্কিমচন্দ্রও কথাসাহিত্যের রূপের আদর্শ পাশ্চাত্য লেখকদের কাছ থেকে নিয়েছেন। কিন্তু, এঁরা অনুকরণ করেছিলেন বললে জিনিসটাকে সংকীর্ণ করে বলা হয়। সাহিত্যের কোনো-একটি প্রাণবান রূপে মুগ্ধ হয়ে সেই রূপটিকে তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন; সেই রূপটিকে নিজের ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করবার সাধনায় তাঁরা সৃষ্টিকর্তার আনন্দ পেয়েছিলেন, সেই আনন্দে তাঁরা বন্ধন ছিন্ন করেছেন, বাধা অতিক্রম করেছেন। এক দিক থেকে এটা অনুকরণ, আর-এক দিক থেকে এটা আত্মীকরণ। ... বঙ্কিম এমন একটি সাহিত্যরূপে আনন্দ পেয়েছিলেন, এবং সেই রূপকে আপন ভাষায় গ্রহণ করলেন, যার মধ্যে সর্বজনীন আনন্দের সত্য ছিল। বাংলাভাষায় কথাসাহিত্যের এই রূপের প্রবর্তনে বঙ্কিমচন্দ্র অগ্রণী। রূপের এই প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে তারই পূজা চালালেন তিনি বাংলাসাহিত্যে। তার কারণ, তিনি এই রূপের রসে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ নয় যে, গল্পের কোনো একটি থিওরি প্রচার করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। "বিষবৃক্ষ' নামের দ্বারাই মনে হতে পারে যে, ঐ গল্প লেখার আনুষঙ্গিকভাবে একটা সামাজিক মতলব তাঁর মাথায় এসেছিল। কুন্দনন্দিনী সূর্যমুখীকে নিয়ে যে-একটা উৎপাতের সৃষ্টি হয়েছিল সেটা গৃহধর্মের পক্ষে ভালো নয়, এই অতি জীর্ণ কথাটাকে প্রমাণ করবার উদ্দেশ্য রচনাকালে সত্যই যে তাঁর মনে ছিল, এ আমি বিশ্বাস করি নে - ওটা হঠাৎ পুনশ্চনিবেদন; বস্তুত তিনি রূপমুগ্ধ রূপদ্রষ্টা রূপশ্রষ্টা রূপেই বিষবৃক্ষ লিখেছিলেন।

নবযুগের কোনো সাহিত্যনায়ক যদি এসে থাকেন তাঁকে জিজ্ঞাসা করব, সাহিত্যে তিনি কোন্‌ নবরূপের অবতারণা করেছেন। …

বঙ্কিমের উপন্যাসে চন্দ্রশেখরের অসামান্য পাণ্ডিত্য; সেইটি অপর্যাপ্তভাবে প্রমাণ করবার জন্যে বঙ্কিম তার মুখে ষড়্‌দর্শনের আস্ত আস্ত তর্ক বসিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু, পাঠক বলত, আমি পাণ্ডিত্যের নিশ্চিত প্রমাণ চাই নে, আমি চন্দ্রশেখরের সমগ্র ব্যক্তিরূপটি স্পষ্ট করে দেখতে চাই। সেই রূপটি প্রকাশ পেয়ে ওঠে ভাষায় ভঙ্গিতে আভাসে, ঘটনাবলীর নিপুণ নির্বাচনে, বলা এবং না-বলার অপরূপ ছন্দে। সেইখানেই বঙ্কিম হলেন কারিগর, সেইখানে চন্দ্রশেখর-চরিত্রের বিষয়গত উপাদান নিয়ে রূপস্রষ্টার ইন্দ্রজাল আপন সৃষ্টির কাজ করে। আনন্দমঠে সত্যানন্দ ভবানন্দ প্রভৃতি সন্ন্যাসীরা সাহিত্যে দেশাত্মবোধের নবযুগ অবতারণ করেছেন কি না তা নিয়ে সাহিত্যের তরফে আমরা প্রশ্ন করব না; আমাদের প্রশ্ন এই যে, তাঁদের নিয়ে সাহিত্যে নিঃসংশয় সুপ্রত্যক্ষ কোনো একটি চারিত্ররূপ জাগ্রত করা হল কি না। পূর্বযুগের সাহিত্যেই হোক, নবযুগের সাহিত্যেই হোক, চিরকালের প্রশ্নটি হচ্ছে এই যে : হে গুণী, কোন্‌ অপূর্ব রূপটি তুমি সকল কালের জন্যে সৃষ্টি করলে।

এক কালজয়ী পুরুষশ্রেষ্ঠের এ এক অনুপম শ্রদ্ধার্ঘ তাঁর অগ্রজ আর এক কালজয়ী পুরুষশ্রেষ্ঠ-র প্রতি।

সাহিত্যবিষয়ে আপাত-অপ্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে এই আলোচনার ইতি টানতে চাই আপাতত। রবীন্দ্রনাথ কিছুকাল সঙ্গীতশিক্ষা করেছিলেন সেই সময়ের নামী শিক্ষক যদুভট্টের কাছে। মোগল সাম্রাজ্যের অন্তিমলগ্নে রাজদরবারের শিল্পীরা দু-মুঠো অন্নসংস্থানের জন্য দিল্লী ছেড়ে ভারতের নানা জায়গায় ছড়িয়ে যান, যদুভট্ট তাদের ঘরানারই উত্তরসূরী। তানসেন-বংশীয় ধ্রুপদ-গায়ক বাহাদুর খাঁ আশ্রয় নিয়েছিলেন বিষ্ণুপুর রাজসভায়। তাঁর এক শিষ্য রামশঙ্করের শিষ্য যদুভট্ট, তাঁর জন্ম বিষ্ণুপুরেই। ত্রিপুরার রাজদরবারে তিনি অনেককাল ধ্রুপদ গাইতেন। বঙ্কিমচন্দ্রও যদুভট্টের কাছে কিছুদিন গান শিখেছিলেন। সেসময় তিনি কিছুকাল বঙ্কিমচন্দ্রের বাসস্থান নৈহাটির কাঁটালপাড়ায় তাঁর বোনের বাড়িতে ছিলেন। যদুভট্টই প্রথম মল্লার রাগে বঙ্কিমের বন্দেমাতরম্‌ গানে সুর দিয়ে তাঁকে শুনিয়েছিলেন ১২৮৮ সালে চুঁচুড়ায় বঙ্কিমের এক সম্বর্ধনা সভায়। এ আর রহমানের হাতে কিছু-মতে-উজ্জীবিত, কিছু-মতে-ধর্ষিত হওয়ার আগে বহু নামী সঙ্গীতজ্ঞ বন্দেমাতরম্‌-এ সুর দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁদের অন্যতম। ১২৯২ সালে ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রতিভা ঠাকুরবাড়ি প্রকাশিত ‘বালক’ পত্রিকার ‘গান অভ্যাস’ অংশে রবীন্দ্রনাথের দেশ-কাওয়ালির সুরে এর প্রথম স্তবকটির স্বরলিপি প্রকাশ করেন। ন্যাশন্যাল সং-এর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই গানটি রবীন্দ্রনাথ প্রথম গেয়েছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের দ্বাদশ বার্ষিক সম্মেলনে, বঙ্গভঙ্গের আগে এর গ্রামাফোন রেকর্ডও বের করেন তিনি। ছোটমামার স্নেহধন্যা সরলা লিখেছেন – বন্দেমাতরম্‌-এর প্রথম দুটি পদে সুর দিয়েছিলেন নিজে। তখনকার দিনে শুধু সেই দুটি পদই গাওয়া হত। একদিন আমার উপর ভার দিলেন – বাকী কথাগুলোতে তুই সুর বসা। তাই ত্রিংশকোটিকণ্ঠ কলকলনিনাদকরালে থেকে শেষ পর্যন্ত কথায় প্রথমাংশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আমি সুর দিলুম। তিনি শুনে খুশী হলেন। সমস্ত গানটা তখন থেকে চালু হল। সরলার এই স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছিল ১৩০০ সালের ভারতী পত্রিকার কার্তিক সংখ্যায়।

ভারতের ন্যাশন্যাল অ্যান্থেম ও ন্যাশন্যাল সং – দুটিরই রচয়িতা ও সুরকার বঙ্গসন্তান। বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণে এই দুই দিকপাল বঙ্গসন্তানের সাহিত্য সৃষ্টি এক অমর অধ্যায় হয়ে আছে। অথচ কী লজ্জাকর পরিস্থিতি আজ, ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলা এখন এক হাস্যকর স্থানে। জনচেতনার উন্মেষে সাহিত্য ও সাহিত্যপত্রিকাগুলির ভূমিকা আজ কুরুচিকর অন্তর্কলহে গুরুত্ব হারিয়েছে।

মুখের সামনে আয়না ধরলে এই জটাজাল থেকে বেরোনোর যে রাস্তা বাঙালী দেখতে পেত, তার নাম বঙ্গদর্শন!



রবিবার, ২ মার্চ, ২০১৪

প্রবন্ধ – ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



এই সমাজ ও নারী – যুগে যুগে



আমার উদ্যোগে এক তরুণ বাংলায় টাইপ করা শুরু করেছে, মাঝে মাঝে ফোনে জিজ্ঞাসা করে নিজে না পারলে । কদিন আগে ফোনটা কানে দিতেই তরুণটির কন্ঠ ‘ ‘জেঠু, রেপ করবো কি করে’ ? ‘কার সঙ্গে কি কথা বলছিস ?’ বলে ধমক লাগালাম । ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তরুণটি বললো ‘না গো জেঠু, কার্তিক বর্মণ কথাটা টাইপ করত পারছি না তাই জিজ্ঞাসা করছি । বুঝলাম । হালকা রসিকতা করে কথাটা বললাম বটে কিন্তু ‘ধর্ষণ’ শব্দটা এখন জলভাতের চেয়েও সহজ উচ্চারণ।  সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে এখন পাঁচ ছয় বছরের শিশুও অবলীলায় শব্দটা বলতে শিখে গেছে । অর্থটাও শিখেছে নিশ্চয় !

‘ধৃষ’ শব্দ থেকে আসা শব্দটির আভিধানিক অর্থ নারীর ওপর উৎপীড়ন, বলাৎকার ইত্যাদি । কিন্তু বাংলা ভাষী সংবাদ মাধ্যমগুলোর শব্দটির ইংরাজী আভিধানিক অর্থই বেশি পছন্দ । মনে হয়, তাদের কাছে বলাৎকার বা পাশবিক অত্যাচার কথা দুটো নেহাতই নিরামিষ ! তো এই শব্দটি ইদানিং মুড়িমুড়কির মত হয়ে যাওয়ার পেছেনেও রয়েছে নারী সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ।

সংবাদ মাধ্যমে একটা কথা খুব শোনা যায় । এসব ঘটনা আগেও ছিল। তখন জানা যেতো না, এখন মিডিয়া হাইপের জন্য জানতে পারছি । সমাজের বেশ উঁচু যায়গা থেকেও বলতে শুনছি সংবাদ মাধ্যম একটু বাড়িয়ে বলছে ইত্যাদি । অর্থাৎ বিষয়টাকে বা সমাজের অসুখটাকে একটু হালকা চালে দেখা । এসব ‘চিরকালই হয়’ বলে নারী পীড়নের বিষয়টাকে হালকা করে দেওয়া প্রচ্ছন্ন অনুমোদনেরই নামান্তর । চোখ অন্ধ থাকলে কবেই বা প্রলয় বন্ধ থাকে !

হ্যাঁ, নিশ্চিত ভাবেই নারীর ওপর বলাৎকারের ঘটনা আগেও হ’ত । পঞ্চাশ বছর আগে কেন? আমাদের সমাজ গঠনের শুরু থেকেই তো ছিল ক্ষমতায় বলীয়ান পুরুষের নারীকে তার দখলে আনার । তারপর কয়েক হাজার বছরে হয়তো আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে অনেক প্রসাধনী বদল হয়েছে কিন্তু নারী সম্পর্কে সমাজের মনভাব শিকড় সহ উৎপাটন হয় নি।

আমি বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্যকর্ম চর্যাপদ’র একটি পদের উদ্ধৃতি দিই । কবি ভুসুকু পাদ’ বর্ণনা দিচ্ছেন –
“ বাজনার পাড়ি পউয়া খালে বাহিউ ।
অদঅ দঙ্গালে দেশ লুড়িউ ।।
আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী
ণিঅ ঘরিণী চন্ডালেঁ লেলী ।।

[ অর্থাৎ, বাজরা নৌকার পাড়ি, পদ্মার খালে বাওয়া ।
দয়াহীন দাঙ্গাবাজে দেশ লুট করে ।
আজ ভুসুকু বাঙালি হয়ে গেল ।
নিজ গৃহিণীকে চন্ডালে নিয়ে গেল”।
আরো একহাজার বছর পেছনে আসি । প্রায় দুশ বছর আগের, ৯ই জুলাই ১৮২৫ সালের ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ উদ্ধৃত করি । (দুশ বছর আগেকার বাংলা গদ্য ভাষাতেই হুবহু দেওয়া হ’ল) সংবাদটি এইরকম –

“বলাৎকার – শুনা গেল যে মোং মীরজাপুরনিবাসি কোন কায়স্থের এক পরম সুন্দরি যুবতী স্ত্রী সমীপবর্তিনী পুষ্করিনীরমধ্যে গাত্রধৌতার্থ গমন করিয়াছিল ইতিমধ্যে ঐ কামিনীকে একাকিনী পাইয়া অত্রস্থ বর্ধিষ্ণু সীতারাম ঘোষের পুত্র বাবু পীতাম্বর ঘোষ কএক জন লোক সমভিব্যাহারে আসিয়া বলে অবলার অম্বর ধরিয়া অন্তঃপুরে লইয়া স্বাভিলাষ পূর্ণ করিয়া পরিত্যাগ করাতে কামিনী রাগিণী হইয়া অতিদ্রুত গমনে পটলডাঙ্গা থানায় গমন করিয়া সমুদায় বিবরণ নিবেদন করাতে পরদিবস প্রাতে জমাদার সকলের জবানবন্দি লিখিয়া এক্ষণে পুলিশে প্রেরণ করিয়াছে” ।

(‘সংবাদ পত্রে সেকালের কথা’/প্রথম খন্ড – ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়)

এ তো দুশো বছর আগেকার কথা । নারী নিপীড়নে সমাজের তেমন কোন হেলদোল থাকতো না । কারণ নারী নিপীড়নের নানান বন্দোবস্ত তখনকার সমাজই অনুমোদন করতো । কুলিন হওয়ার গৌরবে বহু বিবাহ, একাধিক উপ-পত্নী রাখা, বেশ্যালয় গমন তখনকার বাঙ্গালির আভিজাত্য বলেই মান্য হ’ত । দুশ’ বছর আগে মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনে নৈতিকতার বালাই ছিলনা । পরের একশ’ বছরে বাঙ্গালির সমাজ প্রভূত এগিয়েছে, শিক্ষার প্রসার হয়েছে, নারী সচেতনতা বেড়েছে চোখে পড়ার মতো । বিশ শতকের গোড়াতেই নারীর প্রতিবাদী কন্ঠ শুনতে পায়েছি । ধর্মই যে নারীকে বেঁধে রেখেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তার যাবতীয় অবমাননার ঢাল হিসাবে, সে কথাও উচ্চারিত হতে শুরু করেছে । ১৯২১শে হিন্দু নারীদের মধ্যে প্রথম প্রতিবাদী কন্ঠ শোনা গেল জ্যোতির্ময়ী দেবীর লেখায় “... নারী হন্তা, দুর্বলের প্রতি অত্যাচারী, পূণ্যের নামে,ধর্মের নামে উৎপীড়ক যে ধর্ম সে ধর্ম পবিত্র নয়” । তারপর সমাজ অনেক এগিয়েছে, কিন্তু নারীদের প্রতি সমাজের মনোভঙ্গির কিছুমাত্র বদল হয়নি । ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথচলায় কত পরিবর্তন হয়ে গেছে – হয়ে চলেছে নিয়ত । আমাদের সমাজ ও পরিবারের কাঠামোয় কত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে, পরিবারের বন্ধন শিথিল হয়েছে, আমাদের মূল্যবোধগুলির কত রূপান্তর ঘটে গিয়েছে, কিন্তু নারীর প্রতি সমাজের মনোভাবের বিষয়টি সেই এক সনাতনী বিশ্বাসের অচলায়তনে বন্দি । নারী পুরুষের আশ্রিতা, পুরুষের ভোগ্যা সামগ্রী, লিঙ্গ-বৈষম্যের কারণে সে যেন এক আলাদা প্রজাতি । পিতৃপ্রধান যৌথ পরিবার ভেঙে এখন অণু পরিবার, কিন্তু সেখানেও আধুনিক সমাজ কতটুকু স্বাধীনতা দিতে সম্মত নারীকে ? স্ত্রী তার পুরুষ স্বামীর আশ্রিতা – এ ভিন্ন অন্যকিছুই পুরুষ ভাবে না । সমাজ তাকে অন্য কিছু ভাবতে শেখায় না । নারী নিজেও এই ভাবনার অচলায়তনে বন্দি, ধর্মের বাঁধন তাকে অন্য কিছু ভাবতে দেয় না ।

উনিশ শতকের চেয়ে অনেক পরিবর্তন হয়েহে সত্য । উনিশ শতকে যখন অনভিজাত নারী অন্দর মহল থেকে বাইরে বেরিয়েছিলেন কাজের সন্ধানে, সমাজের চোখে তারা ছিল কুল কলঙ্কিনী । যাদের শ্রমশক্তির ওপর দাড়িয়েছিল সেকালের হিন্দু সমাজ তারা হয়ে গিয়েছিলেন গণিকালয়ের মালিকদের শিকার আর নতুন গজিয়ে ওঠা বড়লোকদের গৃহ পরিচারিকা। এ যুগে শিক্ষিত মহিলারা অনেক উচ্চ ও প্রশাসনিক দায়িত্বে কিংবা ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে সাফল্যের শিখরে উঠছেন সত্য, কিন্তু প্রান্তিক নারীসমাজ, কৃষক রমণী, খণি শ্রমিক, আয়া, পরিচারিকারা নারীত্বের সম্মান থেকে বঞ্চিতই থেকে যান ।

১৯৪০এ পূর্ব পশ্চিম মিলিয়ে বাংলার লোকসংখ্যা ছিল ৫কোটির মতো । ১৯৮১এ বঙ্গীয় লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে পেশ করা নথিতে নারী নিগ্রহের ১১১৯টি মোকদ্দমার কথা বলা হয়েছিল আর সত্তর বছর পরে সেই সংখ্যাটা চারগুণেরও বেশি হয়ে গেছে । কিছু সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, বেশির ভাগই হয় নি । হয়তো সেসব ঘটনা আমাদের শহুরে চৈতন্যকে তেমন নাড়া দেয়নি । তবে এখনকার মত এমন বীভৎসতা দেখা যেতো না । রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ পরিবারকে বলাৎকারের টার্গেট করা বা সেইসব ঘটনাকে পরোক্ষ অনুমোদন দেওয়ার মত বিকৃতি হাল আমলের ব্যাপার ।

শুকনো পরিসংখ্যান কিছুই জানায় না । ‘আম আদমি’র সেইসব পরিসংখ্যান জানার উৎসাহ থাকারও কথা নয় । তবু সমাজের উঁচু যায়গা থেকে যখন হামেশাই শোনা যায় ‘এসব চিরকালই ছিল, তখন খবর হ’ত না, এখন হচ্ছে’ তখন এইসব কথাকে দুর্বৃত্তদের প্রতি আশ্বাসবাণী মনে হয় । আর নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়তেই থাকে । ১৯১১য় পশ্চিম বাংলায় বলাৎকারের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছিল ২৩১৭টি আর ২০১৩তে সেই সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২০৪৬এ । আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সংখ্যায় মেয়েরা তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করছেন এটা দেখে আহ্লাদিত হচ্ছেন, এ নাকি প্রগতির লক্ষণ ! আর আমরা ক্রুদ্ধ হতেও ভুলে গিয়েছি। সমাজের সর্বগ্রাসী পচন দেখে সয়ে যাওয়া আমাদের আর ক্রোধ জাগে না ।

আমরা শিক্ষিত মানুষেরা মনে করি ধর্ষণ ব্যতিক্রমী ঘটনা । বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছেই একজন নারী নিজে থেকেই শিখে যায় ধর্ষণের মানে, আর সেই সময় থেকেই এক অদ্ভুত ভীতি থাকে তার বাকি জীবনের সর্বক্ষণের সঙ্গী । পরিসংখ্যান জানাচ্ছে এখন নাকি প্রতি ৩০ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিতা হচ্ছেন । আর বিচার ও শাস্তি দানের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার কথা না বলে নির্যাতিতা মেয়েটির পোষাক উত্তেজক ছিল কি না, রাত্রে সে একা একা বেরিয়েছিল কেন ? এইসব অদ্ভুত প্রশ্নের সামনেই মেয়েটিকে দাঁড় করিয়ে দিই আমরা, ধর্ষণের দায় মেয়েটির ঘাড়েই চাপিয়ে দিই । ক্বচ্চিৎ ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের মত কেউ কেউ চরম শাস্তি পেয়ে যান কিন্তু অধিকাংশ অপরাধীই জটিল ও বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়ায় পার পেয়ে যান । কারা জড়িত থাকে এইসব ঘটনায় ? একথায় সবাই । অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক, পুলিশ কর্মী,বৃদ্ধ পুরোহিত, ধর্মগুরু, চিকিৎসক, নির্যাতিতার নিকট-আত্মিয়, শিক্ষক – সকলের লালসার শিকার হয় নারীরা । স্কুলের কিশোরী হেতাল পারেখের ধর্ষণ ও খুন করার অপরাধে ফাঁসি হয়ে যাওয়া ধনঞ্জয় ছিল সেই বহুতলেরই সিকিউরিটি গার্ড । ১৯৯২এর সেপ্টেম্বরে ফুলবাগান থানায় এক ঝুপড়ির মেয়েকে তুলে এনে ধর্ষণ করে শঙ্কর মাইকাপ নামে এক পুলিশ কর্মী । ১৯৯৮এ ১৬বছরের এক কিশোরীকে সুস্থ করে দেবার নাম করে মন্দিরের ভেতরেই ধর্ষণ করে এক ৬৭ বছরের পুরোহিত । কোর্টে নিয়ে যাবার পথে মূক বধির কিশোরীকে ধর্ষণ পুলিশ ভ্যানের ভেতরেই । স্কুল শিক্ষক দ্বারা নাবালিকা ছাত্রীকে ধর্ষণ, নিকট আত্মীয় দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা তো আকচার ঘটছে । কারা বেশি আক্রান্ত হয় ? গৃহবধু আর তার শাশুড়ি মাতা, স্কুল কলেজ ছাত্রী, ইটভাটার শ্রমিক, এমনকি পাঁচ ছয় বছরের অবোধ শিশুও বাদ যায় না । চৈতন্য অসাড় হয়ে যায়, কোন আলোর রেখা দেখা যায় না ।

আসলে সেই আদিযুগ থেকেই আমাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমাদের বিশ্বাসেও গভীর ভাবে গেঁথে দেওয়া গিয়েছে যে ভোগ্যপণ্য ছাড়া নারীর আর কোন পরিচয় নেই । সমাজ গঠন প্রক্রিয়ার শুরুতে যেমন ‘অস্ত্র যার নারীও তার’ কয়েক হাজার বছর পরেও তাই । আর নারী যে পণ্য ছাড়া কিছুই নয় সেই কথাটাই নিপুণ ভাবে আমাদের এবং তরুণ প্রজন্মের মনে গেঁথে দেওয়ার কাজ করে চলেছে বহুজাতিক কোম্পানীগুলির বিজ্ঞাপন । মোটর গাড়ি থেকে আলুভাজা সব বিজ্ঞাপনেই স্বল্পবাস সুন্দরীদের হাস্যময় ছবি ! প্রসাধনী বাজার দখলের পথ খুলে দিতে ক’জন ভারত ললনা বিশ্বসুন্দরী হওয়ায় আমরা ‘দেশের মুখ ঊজ্বল হ’ল’ বলে উল্লাস করেছি আবার তারই প্রভাবে খোলামেলা নারী শরীরের বিজ্ঞাপন হোর্ডিং দেখে ‘অশ্লীলতা দূর হটো’ বলে চিৎকারও করেছি ! কবেই বা বুঝেছি, এতোদিন লালিত সংস্কৃতি আর মূল্যবোধগুলির ধ্বংস সাধনই তাদের ‘পবিত্র লক্ষ্য’ । হ্যামলিনের বাশিওয়ালা যেন ! আমরা ছুটে চলেছি । তো এই হ্যামলিনের বাঁশীওয়ালার সুরে ভেসে যাওয়ার ফলের একটা মাত্র নমুনা পেশ করি । একদম টাটকা বিবরণ । ২৭ফেব্রুয়ারির আনন্দ বাজার পত্রিকায় একটি লেখায় প্রকাশিত হয়েছে । কলকাতার দুই উচ্চবিত্ত পরিবারের নামি স্কুলে পড়া ১২ ও ১৪ বছরের দুই বালিকা গর্ভবতী হয়ে পড়ে । এখন আর গর্ভপাতের উপায় নেই কারণ তাদের পিতা মাতা যখন বিষয়টি জেনেছেন তখন বালিকাদুটি ৮ এবং ৭ মাসের গর্ভবতী । উচ্চবিত্ত দুই পেশাদার ও প্রতিষ্ঠিত পিতাই বালিকাদুটির সন্তান প্রসব করাবেন কোন হোমে কিন্তু পৃথিবীর আলো দেখা সন্তান দুটিকে নিয়ে যাবেন না । গায়ে চিমটি কেটে প্রশ্ন করি পচনের শেষ সীমায় যেতে আর কতটা বাকি !

এ এমন দেশ – যেখানে মুকেশ আম্বানী তাঁর স্ত্রীর পঞ্চাশতম জন্মদিন পালন করতে অতিথিদের অন্য প্রান্ত থেকে তাঁর রাজকীয় প্রাসাদে নিয়ে যান নিজের জেট বিমানে, “আর সেই একই দিনে কচি কচি মেয়েরা রাস্তায় মিছিল বের করে, তাদের ছোট ছোট হাতে প্ল্যাকার্ড তুলে – আমাদের ধর্ষণ করো না । যে ছাত্রীটির স্কুল ব্যাগ পুকুরপাড়ে পড়ে থাকে আর তার ধর্ষিত শরীর পুকুরের জলে ভাসতে থাকে, তারা পৃথিবীর কোন সভ্য কল্পনায় এক দেশের মানুষ হতে পারে না” (দেবেশ রায়ের একটি লেখা থেকে) । আমরা তো ক্রুদ্ধ হতেই ভুলে গেছি । ক্রোধ জাগানোর কোন সংকেতও তো পাওয়া যাচ্ছেনা তেমন !

প্রয়াতা মল্লিকা সেনগুপ্তর একটি কবিতা উদ্ধৃত করে শেষ করি ।
বাবার বন্ধুর সঙ্গে
বাবার বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়েছিল সে
মেয়েটা বোকাই ছিল, নাহলে কিভাবে
নিজেকে ভাবল কুন্তী আর ঢ্যাঙা কালো
উনষাট বছরের লোকটাকে সূর্য ভেবে নিল !
সত্যি ভেবেছিল নাকি মগজ ধোলাই!
ছোটবেলা লোকটাকে কাকু ডেকেছিল
শিশুকাল থেকে ওর মাথায় কুয়াশা
পড়তে পারে না, কিছু ভাবতে পারে না,
অবোধ চোখের ভাষা দৃষ্টিকটু লাগে
উনিশ বয়সী ওর বাড়ন্ত শরীরে ।

রঙ তুলি নিয়ে শুধু হিজিবিজি কাটে
রক্ত ঝরে পড়ে সাদা ক্যানভাস জুড়ে
জাপটে জড়িয়ে ওকে ঘর বন্ধ করে
দিয়েছে লোকটা আঁকা শেখানোর ছলে ।
মরে বেঁচে গেছে তার ছাপোষা গৃহিণী ।

চৈত্র সংক্রান্তির দিন বাচ্চাটা জন্মাল
জানালাউ উঁকি দিল পাড়ার মস্তান –
‘ফোকটে আমিও বাবা হতে চাই, ইট
পেতে রাখলাম’ । ‘ছিঃ ছিঃ’শিউরে উঠল
পাড়ার মাসিমা । ভাই বলল, ‘রান্ডী রে
এত যদি ইচ্ছে কেন রাস্তায় গেলি না’ ।
মেয়েটা গোল্লায় গেল, এ তো স্বতঃসিদ্ধ ।
কিন্তু এতদিন যারা দর্শক ছিলেন,
মেয়েটার পিতৃবন্ধু কবি ও শিল্পীরা,
প্রস্তুত থাকুন, আর দুবছর পরে
ভালো করে কথা শিখে নিষ্পাপ শিশুটি,
ঐ জারজ শিশুটি, প্রশ্ন করবেই –
কোন পরিচয়ে আমি বাঁচব সমাজে ?
ঐ অপরিণত বালিকাদুটি তার ধনী পিতার গৃহে ফিরে যাবে, হয়তো তারা ভুলেও যাবে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের ঘটনা বা দুর্ঘটনাটি । কিন্তু অচিরে সেও তো জানতে চাইবে । উত্তর দেবে কোন সমাজ ?

বৃহস্পতিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

বাংলা ভাষা বিষয়ক - রাখাল রাহা

বাংলা ভাষা বিষয়ক :রাখাল রাহা



'দুখিনী বাংলা বানান' ও সুখী/সুখি বানানবিদ (!)


ঢাকার একটি দৈনিকের সাহিত্য-সাময়িকীতে গোলাম মুরশিদের বানান-বিষয়ক একটি লেখা 'দুখিনী বাংলা বানান' পাঠ করে প্রথমে দুটি বিষয়ের কথা মনে হলো/হল। কিছুদিন আগে ঢাকা শহরে একটি প্রতিষ্ঠানের বড় বড় কিছু বিলবোর্ড দেখা গিয়েছিল, যেখানে 'গাড়ী ভরে বাড়ী যান' এমন একটি বাক্য ছিল। এটি বিজ্ঞাপন আকারেও অর্ধপৃষ্ঠা-সিকিপৃষ্ঠা জুড়ে কিছু দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। কিন্তু 'গাড়ী-বাড়ী'র বিকল্প বানানের বিধান সেই ১৯৩৬ সালে দেওয়া! তার হীরক-জয়ন্তী পার করেও মানুষ (পণ্ডিত নন) আজও ওখানেই রয়ে গেল কেমন করে? আরেকটি হচ্ছে, গত ১০ বছর ধরে কিছু সরকারী/সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর/শ্রেণির প্রথম দিকের রোলনম্বরধারী শিক্ষার্থীদের, অর্থাৎ ভালো ছাত্রদের, বর্ণমালা লিখতে দিয়ে আমি কিছু তথ্য পেয়েছি। তার একটি হচ্ছে অনেকেই বর্ণ হিসাবে 'ক্ষ' লিখেছে যা তাদের বাবাদের পাঠ্যপুস্তকেও, অন্তত সরকারী/সরকারি পাঠ্যপুস্তকে, ছিল না। অন্যদিকে ২০০২ সালে অন্তঃস্থ-ব বর্ণমালায় সংযুক্ত হলেও দেখা গেছে প্রায় কোনো শিক্ষার্থীই বর্ণটি লেখেনি।

এগুলোর সমাজ-ভাষাতাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে নিশ্চয়। এই তাৎপর্য অনুসন্ধান করা বানানবিদদের (!) কাজ নয়। লেখাটি যিনি লিখেছেন তিনি বানানবিদ (!) নন, সত্যনিষ্ঠ গবেষক বলে তাঁর পরিচিতি। বাংলা বানান নিয়ে সাম্প্রতিক নিরীক্ষার কিছু প্রকৃতি তিনি উপলব্ধি করেছেন। লেখাটিতে তিনি বাংলা বানান নির্ধারণের ইতিহাসের আদিকাল হয়ে ইংরেজী/ইংরেজি বানান সংস্কারের বিভিন্ন প্রচেষ্টা উল্লেখ করেছেন, এবং পরিশেষে 'শ্রেণী'কে 'শ্রেণি'করণ ও 'চীন'কে 'চিন'করণ করার দৃষ্টান্ত্ তুলে ধরে একরকম হাহাকারই করেছেন।

লেখক ১৯৩৬ সালের বানান-বিষয়ক সুপারিশকে 'গোঁজামিল' বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তৎপরবর্তী পর্যায়ের বানান-সংস্কার প্রক্রিয়াগুলোর ইতিহাস জেনে, রবীন্দ্রনাথের সর্বপ্লাবী প্রভাবের কথা স্বীকার করে নিয়েও, নিশ্চিতভাবে বলা যায় - এগুলোর মধ্যে ১৯৩৬ সালের সুপারিশমালাই সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক ও যৌক্তিক পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাই বাংলাদেশের শিক্ষিত সাধারণ মানুষ, পাঠক ও শিক্ষার্থীরা ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত্ মোটামুটি এটা অনুসরণ করেই পড়ে-লিখে-বুঝে আসছিল। এরপর এখানে যা হয়েছে তা 'সরকারি হস্তক্ষেপ', এবং যেটা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, 'সরকারি আদেশের ফলে যা হতে পারে, তা হলো : বানানবিভ্রাট।' এবং সেটাই ঘটেছে।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে এটা শুরু হয়েছিল ১৯৮৮ সালে তৎকালীন সামরিক-শাসক প্রবর্তিত সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচী/কর্মসূচি বাস্তবায়ন কৌশলের সাথে বাংলা লিপি-স্পষ্টীকরণ ও বানান-সহজকরণের ফর্মুলা জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে। তখন বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যায়ন গ্রহণের জন্য পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ৩ দিনের একটি কর্মশিবিরের আয়োজন করে। এর কৌশলী শিরোনাম ছিল 'সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার পটভূমিতে পাঠ্যপুস্তকে বাংলা বানানের সমতাবিধান-বিষয়ক জাতীয় কর্মশিবির'। ৩ দিনের সেই কর্মশিবিরে গৃহীত সিদ্ধান্ত্ ছিল বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতা-উত্তরকালে গৃহীত সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত্।

প্রকৃতপক্ষে 'সমতাবিধান'-এর নামে যা করা হয়েছিল তা হচ্ছে 'পাঠ্যপুস্তক' এবং 'পাঠ্যপুস্তক নয়' এমন বিভাজন টেনে ব্যাপক লিপি-সংস্কার এবং কিছু বানান-সংস্কার। কারচিহ্ন ও যুক্তবর্ণ মিলিয়ে ৪২টির মতো টাইপ তাঁরা পরিবর্তন করেছিল। সেই ৪২টি টাইপ ব্যবহৃত হয় এমন শব্দসংখ্যা বাংলায় কয়েক হাজার। সুতরাং তখন থেকে এই সহস্রাধিক শব্দের পাঠ্যবইয়ে ব্যবহৃত রূপ আর পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগতে ব্যবহৃত রূপ আলাদা। শুধু তা-ই নয়, ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০৫ পর্যন্ত্ বোর্ডের সিদ্ধান্ত্ ছিল উক্ত টাইপগুলোর আদি রূপ - যেটা শিক্ষার্থীরা পথে-ঘাটে, পত্র-পত্রিকায়, অপাঠ্য বইয়ে, টেলিভিশনে পড়ে-দেখে সেটা - তাঁরা শেখাবেন না। কিন্তু ২০০৫ সালে এসে তাঁরা স্পষ্ট রূপটাকে চালু রেখেই আদি রূপটিও শিক্ষার্থীদের শেখানোর বিধান দিলেন। তাই আগে শিক্ষার্থীরা যুক্তবর্ণের অস্পষ্ট একটা রূপ শিখত, এখন তারা স্পষ্ট-অস্পষ্ট দুটোই শিখছে। স্পষ্ট শিখছে পাঠ্যবই পড়ার জন্য, আর অস্পষ্ট শিখছে 'অপাঠ্য' বই পড়ার জন্য।

লিপির পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বিকল্প বর্জন করে যেসব বানান গ্রহণ করেছিলেন তার কিছু দৃষ্টান্ত্ এরকম : খ্রিস্টান, পোস্টঅফিস, পেশি, শেফালি, আমদানি, গ্রিক, জানুয়ারি, লাইব্রেরি, নানি, বাঙালি, সোনালি ইত্যাদি। কিন্তু 'বহুলপ্রচলিত' বলে তাঁরা হাত দেননি শ্রেণী, পল্লী, রানী, একাডেমী, নবী, বীমা, লীগ, স্পীকার, শহীদ ইত্যাদি বানানে। তবে ২০০৫ সালে এসে তাঁরা বললেন, খিস্ট ও খ্রিস্টান শেখানো ভুল হয়েছে, কারণ খিষ্ট ও খ্রিষ্টান বাংলায় 'আত্তীকৃত' হয়ে গেছে!

অন্যদিকে বাংলা একাডেমী/একাডেমি ১৯৯২ সালে তাঁদের প্রণীত বানানবিধিতে বহুল প্রচলনের ছাড় দিলেন না। তাঁরা করলেন শ্রেণি, পল্লি, রানি, নবি, বিমা, লিগ, স্পিকার, শহিদ ইত্যাদি; একাডেমী-কে বাইরে রাখলেন। ২০০৫ সালেও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বহুল প্রচলনের বিধি অপরিবর্তিত রাখলেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের শিক্ষাবিভাগ একাডেমী/একাডেমির বানানকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করায় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড পিছিয়ে গেছে। তাই তাঁরা 'বহুল প্রচলনের' বিধি বাতিল করে একাডেমীর/একাডেমির 'শ্রেণি' ইত্যাদি বানান চালু করেছে পাঠ্যপুস্তকে।

এই যে ডামাডোল তাতে বানানবিদদের কারো পক্ষেই এখন বলা সম্ভব নয় তাঁরা কখন, কোনটা, কার জন্য, কেন করেছিলেন। বোর্ড ও একাডেমী দুটোরই বানানবিধি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন এমন একজন অধ্যাপকের সাথে কথা বলে এটা নিশ্চিত হয়েছিলাম। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ এর থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি এ বিষয়ে দুবছর গবেষক হিসাবে কাজ করেছিলেন; লিখে, চিঠি লিখে, বক্তৃতা দিয়ে নিজের মত ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু এখন বানানবিদেরা অনেকটা শীত-গ্রীষ্ম বুঝে কাজ করেন। তাঁরা পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে গিয়ে বোর্ডের চাহিদামতো করেন, বাংলা একাডেমী/একাডেমিতে গিয়ে একাডেমী/একাডেমির মতো করেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনে গিয়ে ফাউন্ডেশনের মতো করেন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে মাদ্রাসা বোর্ডের মতো করেন, পত্র-পত্রিকা বা অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাদের মতো করেন, এবং নিজের বইয়ে নিজের মতো করেন!

তারই সর্বশেষ ধারাবাহিকতায় এসেছে প্রথম আলো ভাষারীতি। এটা শুধুই 'হাউজ স্টাইল' নয়, তার চেয়ে 'একটু বেশি/বেশী'। কারণ তাঁরাও বানান বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত্ গ্রহণ করেছে যা বাংলা একাডেমী/একাডেমি থেকে পৃথক। যেমন একাডেমীর বানান ঈগল, একাডেমী, ক্ষেত, ঘণ্ট, চাষী, ঠাণ্ডা, দেশী, নিশ্বাস, বন্দি (আটক অর্থে), মূলা, ইত্যাদি ভাষারীতির বানানে হয়েছে ইগল, একাডেমি, খেত, ঘন্ট, চাষি, ঠান্ডা, দেশি, নিঃশ্বাস, বন্দী (আটক অর্থে), মুলা, ইত্যাদি।

বাংলা বানান ও লিপি-সংস্কারের এই যে প্রক্রিয়া এর প্রভাব বিষয়ে গোলাম মুরশিদ এক প্রজন্মের সাহিত্য থেকে আরেক প্রজন্মের পাঠকের বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ কিছু ক্ষতিকর দিক চিহ্নিত করেছেন। ভয়ঙ্কর/ভয়ংকর সত্য হচ্ছে - এখন অধিকাংশ মানুষ ভাবে, একটা কিছু লিখলেই হয়। কিন্তু তারও চেয়ে ভয়ঙ্কর/ভয়ংকর ক্ষতি যেটা হয়েছে আমাদের জাতীয়তার দ্বন্দ্ব, স্বাধীনতা ঘোষণার দ্বন্দ্ব, সমতল-পাহাড়ের দ্বন্দ্ব, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর দ্বন্দ্ব, সামরিক-বেসামরিক দ্বন্দ্ব, এনজিও-জিও দ্বন্দ্ব ইত্যাদির পক্ষ-বিপক্ষ উভয়ের মধ্যেই প্রবেশ করেছে ই-কার ঈ-কার, উ-কার ঊ-কার, বর্গীয় জ অন্তঃস্থ য, দন্ত্য ন মূর্ধন্য ণ, দন্ত্য স মূর্ধন্য ষ, ২১-২১শে ইত্যাদির দ্বন্দ্ব। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যেন মনে হয় ই-কার, উ-কার, বর্গীয় জ, দন্ত্য ন, দন্ত্য স, ২১, ১৬, ২৬ এগুলো প্রগতিশীল - অনেকখানি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের; আর ঈ-কার, ঊ-কার, অন্তঃস্থ য, মূর্ধন্য ণ, মূর্ধন্য ষ, ২১শে, ১৬ই, ২৬শে এগুলো প্রতিক্রিয়াশীল - রাজাকার-টাজাকার হবে! কি/কী বিশাল সামাজিক সময় ও শক্তি আমরা ব্যয় করে চলেছি কিছুই না করার কাজে!

বাংলা ভাষা বিষয়ক - বীরেন মুখার্জী

বাংলা ভাষা বিষয়ক : বীরেন মুখার্জী



কবিতা ও গানে বাঙালির ভাষা আন্দোলন

একটি জাতির স্বকীয়তা প্রমাণ করে তার ভাষা। ভাষিক সংস্কৃতির সমৃদ্ধিই ভাষাগোষ্ঠীর একমাত্র পরিচয়বাহী। রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা ক্ষমতালোভীদের কূটচক্রান্তে এই ভাষা কিংবা ভাষিক জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ ও আন্দোলনই হয়ে থাকে সচেতন ভাষাগোষ্ঠীর স্বাধীন সত্তাকে জাগ্রত রাখার একমাত্র পথ। ভারত উপমহাদেশ জুড়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং তৎপরবর্তী সময় ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হলে তৎকালিন পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব-পাকিস্তানের সাথে জুড়ে যায়। একমাত্র ধর্মের মিল ছাড়া একদেশভুক্ত দু’দেশের তেমন কোন মিল ছিলো না। না ভাষিক, না সাংস্কৃতিক। এমনই সন্ধিক্ষণে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের ওপর বিভিন্ন গণবিরোধী নীতি চাপিয়ে দেয় ক্ষমতাসীন পশ্চিম পাকিস্তান। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো রাষ্ট্রভাষা ঊর্দু করার নীলনকশা। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় এক ভাষণে আবারো রাষ্ট্রভাষা ঊর্দু করার ঘোষণা দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রথমে ওই নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেন। বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক, সচেতন জনগণ ওই নীতিকে প্রত্যাখ্যান করে ছাত্রদের হাতকে শক্তিশালী করতে তাদের সমর্থন দেন। রুখে দেয়ার ঘোষণা দেন বাংলা ভাষা নস্যাতের সকল ষড়যন্ত্র। ফলে অমানুষিক নিপীড়নের খড়গহস্ত নেমে আসে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ওপর। শুরু হয় বাঙালি দমন ও নিধন প্রক্রিয়া। ভাষা রক্ষার দাবিতে সক্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেয়া ভাষিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল নিয়ে আসে ঢাকার রাজপথে। তারা প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। পুলিশ গুলি চালায় মিছিলে। নিহত হন তিনজন। পরদিন আবারো মিছিল। ২১ ফেব্র“য়ারির ওই মিছিলে গিয়ে পাকবাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান রফিক, শফিক. বরকত, জব্বার, সালামসহ অনেক ছাত্র। ২৬ ফেব্র“য়ারি রাতে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ। শাসকরা সঙ্গে সঙ্গেই ওই স্তম্ভ গুড়িয়ে দেয়। ক্রমে ক্রমে এ আগুন সম্প্রসারিত হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ভাষিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান দেশের প্রগতিশীল কবি সাহিত্যিকগণ। লিখিত হতে থাকে একের পর এক প্রতিবাদী, স্মৃতিবাহী কবিতা। রচিত হতে থাকে অসংখ্য গান।

তবে ভাষা আন্দোলন শুরুর আগেও অবরুদ্ধ ভাষা নিয়ে কবি আবদুল হাকিম রচিত ‘যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’ মাতৃভাষা আগ্রাসনের ওপর লিখিত একটি সার্থক কবিতা। আন্দোলন চলাকালে ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বসে ভাষা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে কলম ধরলেন মাহবুবুল আলম চৌধুরী। তিনি লিখলেনÑ ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি।’ মাহবুবুল আলম চৌধুরী লিখিত এই দীর্ঘ কবিতাটি একুশে ফেব্র“য়ারিতে ভাষার জন্য আত্মত্যাগকারী শহীদদের স্মরণে প্রথম এবং ভাষিক আগ্রাসনের ওপর লিখিত দ্বিতীয় কবিতা হিসেবে ধরা হয়।

‘যে শিশু আর কোনোদিন তার পিতার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ পাবে না

যে গৃহবধূ আর কোনোদিন তার স্বামীর প্রতীক্ষায় আঁচলে প্রদীপ ঢেকে দুয়ারে আর দাঁড়িয়ে থাকবে না

যে জননী খোকা এেেসছে বলে উদ্দাম আনন্দে সন্তানকে আর জড়িয়ে ধরতে পারবে না

যে তরুণ মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে বার বার একটি প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে চেষ্টা করেছিল

তাদের সবার নামে আমি শাস্তি দাবী করতে এসেছি।’

(কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি/ মাহবুবুল আলম চৌধুরী)

এরপর আন্দোলনকালীন সময়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ রচিত ‘ইটের মিনার ভেঙেছে, ভাঙুক/ একটি মিনার গড়েছি আমরা টারকোটি কারিগর/ বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায়।’ কবিতাটিকে দ্বিতীয় এবং ২৬ ফেব্র“য়ারি শহীদ মিনার ভাঙার দিনে লুতফুর রহমান জুলফিকার রচিত ৬৩ পঙ্ক্তির দীর্ঘ কবিতাকে তৃতীয় কবিতা হিসেবে ধরা হয়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, তৎকালীন আর্য সভ্যতায় বসবাস করেও আর্য ভাষার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেন মহামতি গৌতম বুদ্ধ। তিনি অহিংসনীতি অনুসরণ করে স্থানীয় মুখের ভাষা ‘পালি’তে ‘ত্রিপিটক’ রচনা করে বিদ্রোহের জবাব দেন। ভাষিক বিদ্রোহের এ ধারা আমাদের বাংলা ভাষা রক্ষার ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে বলেও অনেক ঐতিহাসিকগণ মনে করেন। তবে সত্য এই যে, সংস্কৃতিগত মিল না থাকায় হাজার মাইলেরও বেশি ব্যবধানের একই রাষ্ট্রভুক্ত দু’বঙ্গের মানুষের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিলো। কারণ দু’বঙ্গে ছিলো দু’টি পৃথক জাতির বাস, পৃথক ভাষা। পূর্ববঙ্গে বসবাসকারীরা স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। আর এ ভাষা ছিলো বাংলা ভাষা। সংখ্যাগরিষ্ঠের এই বাংলা ভাষা, যার রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। প্রায় দু’শ বছর শাসনের পর ইংরেজরা যখন এ উপমহাদেশ থেকে বিতাড়িত হন তখন অলীক এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা পূর্ববঙ্গের ওপর যে ভাষিক নিপীড়ন শুরু করেছিলেন তা থেকে মুক্তি পাওয়া ছিলো বাংলা ভাষাভাষীদের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। পরবর্তীতে বাংলাভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। যে মৌল ভিত্তির ওপর আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দাঁড়িয়ে আছে তা আমাদের প্রাণের ভাষা, বাংলা ভাষা। দেশব্যাপী ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে কাব্যযোদ্ধারাও লিখতে থাকেন তাদের অমর পঙ্ক্তিমালাÑ

‘ফাগুন এলেই পাখি ডাকে

থেকে থেকেই ডাকে

তাকে তোমরা কোকিল বলবে? বলো।

আমি যে তার নাম রেখেছি আশা

নাম দিয়েছি ভাষা, কতো নামেই ‘তাকে’ ডাকি

মেটে না পিপাসা।

(আসাদ চৌধুরী)

বস্তুত ইংরেজ শাসনামল থেকেই বাঙালি জাতি পরাধীনতার জিঞ্জিরে বন্দি হয়ে পড়ে। বাঙালির আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা পরনির্ভরশীলতার ফাঁদে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় গোটা উপমহাদেশ জুড়ে ‘ব্রিটিশ খেদাও’ আন্দোলন তীব্রতর হয়। এদেশ থেকে ইংরেজ বিতাড়নের পর বলতে গেলে মানচিত্রে পেন্সিলের রেখা টেনে ভারত ভাগ হয়। তখন সে অলীক রাষ্ট্রে পূর্ববঙ্গ নামের বাংলাদেশকে একটি পরমুখাপেক্ষী অঞ্চলে পরিণত করা হয়। সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয় গণতন্ত্রের মূলভিত্তিকে। উপরন্তু বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা ও সংস্কৃতি। ফলে ঐতিহাসিক ২১ ফেব্র“য়ারি বাঙালির মানসলোকে সবল, স্বতঃস্ফূর্ততা ও সত্য নিয়ে সামনে দাঁড়ায়। আর এই ভাষিক আন্দোলনে গণমানুষকে উজ্জীবিত করাÑ সাহসী করার শুদ্ধ উচ্চারণ এভাবেই উঠে আসে কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতেÑ

‘ওরা আমার মুখের কথা

কাইরা নিতে চায়।

ওরা, কথায় কথায় শিকল পরায়

আমার হাতে পায় ॥’

(আবদুল লতিফ)

দেশব্যাপী ছাত্র-শিক্ষক-জনতাকে ভাষিক আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে লিখিত হতে থাকে গান। গান একটি শ্র“তি মাধ্যম। গান দিয়ে অতি সহজে মানুষের মননের কোষে ঝংকার তোলা যায়Ñ চেতনা জাগানো সম্ভব হয়। যে কারণে বাঙালির ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন নিয়েও রচিত হয়েছে অনেক গান। গানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে বাঙালি জাতির মুক্তির বারতা। যশোরের কবি শামসুদ্দিন আহমদ রচিত ‘ভুলব না ভুলব না, ভুলব না আর একুশে ফেব্র“য়ারি ভুলব না’ গানটি ভাষার জন্য আত্মদানকারী শহীদদের ওপর প্রথম রচিত গান। তবে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত গানটিই বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলেহারা শত মায়ের অশ্র“-গড়া এ ফেব্র“য়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্র“য়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি ॥’

(আবদুল গাফফার চৌধুরী)

মাতৃভাষা আর রাষ্ট্রভাষার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। অঞ্চলভেদে মাতৃভাষার পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রভাষার পরিবর্তন হয় না। আর্ন্তজাতিক ভাষা হিসাবে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব থাকলেও আমাদের দেশে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার ক্ষেত্রে কতটুকু গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হয়েছে সেটুকুুই আজ আমাদের বাঙালি জাতির সামনে এসে হাজির হয়েছে।

পরিশেষে এটুকু বলা বাহুল্য হবে না যে, বাঙালি জাতি হিসাবে আমাদের পরিচয়ের সার-সত্য অনিবার্যভাবেই একুশে নিহিত। মায়ের মুখের ভাষা রক্ষার্থে অকাতরে জীবন বিসর্জন দেয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল, যার একমাত্র দাবিদার বাঙালি জাতি। যে কারণে বাংলা ভাষা আজ সর্বজনীন ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৯৯ সাল থেকে ইউনেস্কোর কল্যাণে বিশ্বব্যাপী ২১ ফেব্র“য়ারি পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে। বাংলাদেশ আমাদের জন্মের অহঙ্কার। বাংলাভাষা আমাদের বেঁচে থাকার অলঙ্কার। জাতির ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষায় রচিত কবিতা ও গানে আত্মমুক্তির যে ঋদ্ধ উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছিলো, বুদ্ধিবৃত্তিক যে ধারা সম্প্রসারিত হয়েছিলো কাব্যচেতনার তা এখনো বহমান। বাঙালির ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের নাম যেমন স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে তেমনি আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষাও জাগরুক থাকবে চিরকাল।



বীরেন মুখার্জী

কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও সাংবাদিক
সম্পাদক : দৃষ্টি (শিল্প-সাহিত্যের ছোটকাগজ)
সহ-সম্পাদক,সম্পাদকীয় বিভাগ
দৈনিক যায়যায়দিন, তেজগাঁও, ঢাকা।

প্রবন্ধ - শর্মিষ্ঠা ঘোষ

বাংলা ভাষা আন্দোলন
শর্মিষ্ঠা ঘোষ



‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি ?’

১৯৫৪ সালের ৭ মে মুসলিম লীগের সমর্থনে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি।পূর্ব পাকিস্তান ছাড়াও ভারতের আসম রাজ্যে বাংলা ভাষাকে সমমর্যাদা দেয়ার লক্ষ্যে আন্দোলন হয়েছিল। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য দাবি জানালে পুলিশের গুলিতে ১১ বাঙালি শহীদ হন। পরবর্তীতে আসামের বাংলাভাষী লোকসংখ্যা বেশি রয়েছে এমন ৩টি জেলাতে বাংলাকে আধা-সরকারি ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে উর্দু ভাষাটি কিছু সংখ্যক মুসলিম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ধর্মীয় নেতা স্যার খাজা সলিমুল্লাহ, স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নবাব ওয়াকার-উল-মুলক মৌলভি ‎‎ এবং মৌলভী আবদুল হক প্রমুখদের চেষ্টায় ভারতীয় মুসলমানদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কায় উন্নীত হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশশাসিত অঞ্চলগুলো ১৯৪৭ এবং ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করে চারটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়:ভারত, বার্মা , সিংহল এবং পাকিস্তান ,যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা আজকের বাংলাদেশ ।

পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ তখন ৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যাবিশিষ্ট নবগঠিত পাকিস্তানের নাগরিকে পরিণত হয়। যেহেতু পাকিস্তান সরকার, প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা
ছিল ১৯৪৭ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে একটি ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশসহ প্রচারমাধ্যম ও বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র উর্দু ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়। ১৯৪৮ এ পাকিস্তান গণপরিষদে ইংরেজী ও উর্দ্দুর পাশাপাশি সদস্যদের বাংলায় বক্তৃতা প্রদান এবং সরকারি কাজে বাংলণা ভাষা ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। বাংলাকে অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে ধীরেন্দ্রনাথ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবি তোলেন। এছাড়াও সরকারি কাগজে বাংলা ভাষা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান তিনি। পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর এ প্রস্তাবকে স্বাগতঃ জানান।পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এ প্রস্তাবটিকে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে"।খাজা নাজিমুদ্দিনএই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন যে, "পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হোক"। অনেক বিতর্কের পর সংশোধনীটি ভোটে বাতিল হয়ে যায়।

২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ছাত্র-বুদ্ধিজীবিদের এক সমাবেশ ঘটে। ঐ সভায় দ্বিতীয়বারের মত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং শামসুল আলম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। এ পরিষদে অন্যান্য সংগঠনের দুই জন করে প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সেখান থেকে ছাত্ররা ১১ মার্চ ধর্মঘট আহ্বান করে এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তাঁর সাহসী ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানায়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্ররা বের হয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট পালিত হয়। সকালে ছাত্রদের একটি দল রমনা পোস্ট অফিসে গেলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। ছাত্রদের আরও একটি দল রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সচিবালয়ের সামনে নবাব আবদুল গণি রোডে পিকেটিংয়ে অংশ নেয়। ফলে বিভিন্ন স্থানে তাদেরকে পুলিশের লাঠিচার্জের সম্মুখীন হতে
হয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা খাদ্যমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজল ও শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদকে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। এ বিক্ষোভ দমনের জন্য সরকার সেনাবাহিনী তলব করে। পূর্ব পাকিস্তানের জেনারের অফিসার কম্যান্ডিং ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান (পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি) মেজর পীরজাদার অধীনে একদল পদাতিক সৈন্য নিয়োগ করেন এবং স্বয়ং গণপরিষদে গিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনকে বাবুর্চিখানার মধ্য দিয়ে বের করে আনেন। বিকেলে এর প্রতিবাদে সভা অনুষ্ঠিত হলে পুলিশ সভা পণ্ড করে দেয় এবং শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, রওশন আলম, রফিকুল আলম, আব্দুল লতিফ তালুকদার, শাহ্ মোঃ নাসিরুদ্দীন, নুরুল ইসলাম প্রমুখ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। ১১ তারিখের এ ঘটনার পর ১২ থেকে ১৫ মার্চ ধর্মঘট পালন করা হয়। আন্দোলনের তীব্রতার মুখে ১৫ মার্চ খাজা নাজিমুদ্দিন সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। আলোচনাসাপেক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে ৮টি বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে সরকারের এ নমনীয় আচরণের প্রধান কারণ ছিল ১৯ মার্চ জিন্নাহ্‌'র ঢাকা আগমন। তাঁর আসার পূর্বে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত করার জন্য নাজিমুদ্দিন চুক্তিতে রাজি হয়েছিলেন। চুক্তিতে আন্দোলনের সময় গ্রেফতারকৃত বন্দিদের মুক্তি, পুলিশের অত্যাচারের নিরপেক্ষ তদন্ত, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম ও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া,সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ইত্যাদি বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবিটি তখন পর্যন্ত মেনে নেয়া হয়নি।

ভারত বিভাগের পর এটাই ছিল জিন্নার প্রথম পূর্ব পাকিস্তান সফর। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক গণ-সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ও সেখানে তাঁর ভাষণে তিনি ভাষা আন্দোলনকে পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ
সৃষ্টির ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি ঘোষণা করেন - "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়", "জনগণের মধ্যে যারা ষড়যন্ত্রকারী রয়েছে, তারা পাকিস্তানের শত্রু এবং তাদের কখনোই ক্ষমা করা হবে না"। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে গিয়েও তিনি একই ধরণের বক্তব্য রাখেন। তিনি উল্লেখ করেন এ আন্দোলন সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর বহিঃপ্রকাশ এবং কিছু লোক এর মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইছে। ১৮ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তিনি এক ছাত্রসভায় ভাষণ দেন। ঐ সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের তরফ থেকে প্রদত্ত মানপত্রে বাংলা ভাষার দাবি পুনরায় উত্থাপন করা হয়, কিন্তু তিনি কোনোরূপ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। এর পর, পূর্ব বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে ভাষা সমস্যার ব্যাপারে একটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানতে মাওলানা আকরাম খানের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি গঠনকরা হয়, ১৯৫০ সালের ৬ ডিসেম্বর তারিখের মধ্যে কমিটি তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে; তবে এটি ১৯৫৮ সালের আগে প্রকাশ করা হয়নি। এখানে ভাষা সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে তারা বাংলাকে আরবি অক্ষরের মাধ্যমে লেখার সুপারিশ করেছিলেন।

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানের এক জনসভায় দীর্ঘ ভাষণ দেন। তিনি মূলত জিন্নাহ্'র কথারই পুনরুক্তি করে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত তাঁর ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন যে কোনো জাতি দু'টি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারেনি।

বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মৌলিক অধিকার রক্ষাকল্পে বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট এ আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণ দাবীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫২সালে এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে । কিন্তু এর বীজ বপিত হয়েছিল বহু আগে, প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।

নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। সেদিন ছাত্রসহ নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে তারা তাদের মিছিল নিয়ে বর্ধমান হাউসের দিকে অগ্রসর হয়। পরদিন ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে অনুষ্ঠিত সভায় মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল, সমাবেশ ও মিছিলের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে।পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে সমবেত হয়। সমাবেশ থেকে আরবি লিপিতে বাংলা লেখার প্রস্তাবের প্রতিবাদ এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের দাবি জানানো হয়। ছাত্ররা তাদের সমাবেশ শেষে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে।

২০ ফেব্রুয়ারি সরকার স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় এক মাসের জন্য সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিভিন্ন হলে সভা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) এর ছাত্রদের উদ্যোগে শহরের
অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে। ২৯ ফেব্রুয়ারি তারিখেও ধর্মঘট ঘোষিত হয় এবং ঐদিন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ দিবস ও ধর্মঘট পালন করা হয়। সরকারের প্ররোচনায় পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ করে । মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হন রফিক, সালাম, বরকত-সহ আরও অনেকে। শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদের শুরু করা আন্দোলন সাথে সাথে জনমানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়। রেডিও শিল্পীরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে শিল্পী ধর্মঘট আহ্বান করে এবং রেডিও স্টেশন পূর্বে ধারণকৃত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে থাকে।

ঐসময় গণপরিষদে অধিবেশন শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। পুলিশের গুলির খবর জানতে পেরে মাওলানা তর্কবাগিশসহ বিরোধী দলীয় বেশ কয়েকজন অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ান। গণপরিষদে মনোরঞ্জন ধর,
বসন্তকুমার দাস, শামসুদ্দিন আহমেদ এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত-সহ ছোট ছয়জন সদস্য মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে হাসপাতালে আহত ছাত্রদের দেখতে যাবার জন্যে অনুরোধ করেন এবং শোক প্রদর্শনের লক্ষ্যে অধিবেশন স্থগিত করার কথা বলেন। নুরুল আমিন অন্যান্য নেতাদের অনুরোধ রাখেননি এবং অধিবেশনে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।

ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখে সারা দেশ হয়ে উঠে মিছিল ও বিক্ষোভে উত্তাল। জনগণ ১৪৪ ধারা অমান্য করার পাশাপাশি শোক পালন করতে থাকে। বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থল ত্যাগ করে ছাত্রদের মিছিলে যোগ দেয়। সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শহরের নাগরিক সমাজ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাস পরিদর্শন করেন। পরে তাদের অংশগ্রহণে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বিশাল মিছিলে অংশগ্রহণ করে। বেলা ১১টার দিকে ৩০ হাজার লোকের একটি মিছিল কার্জন হলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। প্রথমে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে এবং একপর্যায়ে তাদের উপর গুলিবর্ষণ করে। ঐ ঘটনায় সরকারি হিসেবে ৪ জনের মৃত্যু হয়। নবাবপুর রোডের বিশাল জানাজার মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণ করে। এই গুলিবর্ষণে শহীদ হন ঢাকা হাইকোর্টের কর্মচারী শফিউর রহমান, ওয়াহিদুল্লাহ এবং আবদুল আউয়াল, অহিদুল্লাহ নামে নয় বছরের এক বালক । ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর সরকার আন্দোলনের বিপক্ষে জোরালো অপপ্রচার চালাতে থাকে। তারা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে যে, কমিউনিস্ট ও পাকিস্তানবিরোধীদের প্ররোচনায় ছাত্ররা পুলিশকে আক্রমণ করেছিল । পাশাপাশি ব্যাপক হারে সাধারণ জনগণ ও ছাত্র গ্রেফতার অব্যাহত রাখে।

৮ এপ্রিল সরকার তদন্ত শুরু করে। কিন্তু এর প্রতিবেদনে মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রদের উপর গুলি করার কোনো উল্লেখযোগ্য কারণ দেখাতে পারেনি। সরকারের প্রতিশ্রুত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ প্রত্যাখান করে। ১৪ এপ্রিল গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হলে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এ সমস্যা নিরসনের পক্ষে অনেক সদস্য মত প্রকাশ করলেও মুসলিম লীগের সদস্যরা এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করেন। এ বিষয়ের বিপক্ষে তারা ভোট দিলে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়।

কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় কর্মপরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণেশহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মজিবুর রহমানও দিবসটি পালনে সম্মত হন। ১৯৫৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা শান্তিপূর্ণভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের উদ্দেশ্যে প্রশাসনের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ভাষা আন্দোলনের এক বছর পূর্তিতে সারা দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় শহীদ দিবস পালিত হয়। অধিকাংশ অফিস, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষ প্রভাতফেরীতে যোগ দেন। হাজার হাজার মানুষ শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আসে এবং মিছিল করে প্রাঙ্গন ত্যাগ করে। সহিংসতা রোধের জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়। প্রায় লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে আরমানিটোলায় বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে এক-দফা দাবি জানানো হয়, ভাষার দাবির পাশাপাশি মাওলানা ভাসানীসহ রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি উত্থাপন করা হয়। রেলওয়ের কর্মচারীরা ছাত্রদের দাবির সাথে একমত হয়ে ধর্মঘট পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাসের ছাত্ররা শহীদদের
প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পাকিস্তানের  অর্থমন্ত্রী ফজলুর রহমান বলেন যে, বাংলাকে যারা রাষ্ট্রভাষা করতে চায় তারা দেশদ্রোহী। তাঁর এ বক্তব্যে জনগণ হতাশ হয়ে তাঁকে কালো ব্যাজ দেখায়।

১৯৫৪ সালে ভাষা সংক্রান্ত বিষয়ের অচলাবস্থা নিরসনের উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগের সংসদীয় কমিটির একটি সভা করাচীতে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া এবং সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বাংলা ভাষাকে উর্দু ভাষার সমমর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রভাষা করে হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের ছয়টি ভাষাকে একই মর্যাদা দেয়ার দাবি তোলে সেখানকার প্রতিনিধিত্বকারীরা। গণপরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট এবার অধিকাংশ আসনে জয়লাভ করে; যেখানে মুসলিম লীগের আসনসংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে বাংলা একাডেমী গঠন করে। এ প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, গবেষণা এবং মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবে বলে গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়। ১৯৫৫ সালের ৬ জুন তারিখে যুক্তফ্রন্ট পুণর্গঠন করা হয়; যদিও আওয়ামী লীগ মন্ত্রীপরিষদে যোগ দেয়নি।

১৯৫৬ সালে প্রথমবারের মতো সরকারের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়। শহীদ মিনার নতুনভাবে তৈরি করার লক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত ভাষা আন্দোলনের শহীদদের
স্মরণে পাকিস্তানের গণপরিষদে কার্যক্রম পাঁচ মিনিট বন্ধ রাখা হয়।

বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে বাংলা ভাষা আন্দোলন তাৎপর্যপূর্ণ । বাঙালির মধ্যে বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপলক্ষ্য উদযাপন ও ভাষার উন্নয়নের কাজ করার মানসিকতা তৈরিতে এ আন্দোলনের যথেষ্ট ভূমিকা আছে। বাংলাদেশে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘মাতৃভাষা দিবস’ বা ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে, এবং একই সাথে একটি রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসটি আরো নানাভাবে উদযাপিত হয় যার মধ্যে আছে, মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদযাপন , ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের ত্যাগের সম্মানে এ মাসেই ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় বেসামরিক পদক ‘একুশে পদক’ । ১৯৫৬ সালের পর সরকারি ভাষার বিতর্ক সম্পন্ন হয়, কিন্তু আইয়ুব খানের সামরিক শাসন পাকিস্তানের পাঞ্জাবি ও পশতুনদের দেনাগুলো বাঙালিদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে বাঙালিদের এ বৈষম্যের ফলে চাপা ক্ষোভের জন্ম নিতে থাকে। আঞ্চলিক স্বার্থসংরক্ষণকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের সমর্থন নিরঙ্কুশভাবে বাড়তে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আরো বড় অধিকার আদায় ও গণতন্ত্রের দাবিতে ছয় দফা আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলনই পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আকার ধারণ করে।

বুধবার, ১ জানুয়ারি, ২০১৪

প্রবন্ধ – সুমন গুণ

শহিদদিবসের কবিতা
সুমন গুণ



বাংলা কবিতায় মণিভূষণ ভট্টাচার্যের একটি সম্ভ্রান্ত অবস্থান আছে। আমাদের ভাষায় যাঁরা শুধু স্বাভাবিকভাবে কবিতা লিখে নিজের কণ্ঠস্বর মুদ্রিত করতে পেরেছেন, গল্প-উপন্যাস নয়, কবিসম্মেলন নয়, রাইটার্স নয়, টেলিভিশন নয়, টরন্টো নয়, এমনকি সেভাবে গদ্যও নয়, শুধু কবিতা লিখে যা বলার বলে যেতে পেরেছেন, মণিভূষণ ভট্টাচার্য সেই গুটিকয় বিস্ময়ের একজন।

আমি যখন সবে লেখালেখি শুরু করছি, আশির শেষ আর নব্বইয়ের শুরুর দিকটায়, তখন মণিভূষণের আসল বইগুলো সব বেরিয়ে গেছে। বেরিয়ে গেছে ‘গান্ধিনগরে রাত্রি’র মতো দাপুটে কিন্তু মসৃণ, শাণিত আর তীব্র, প্রবল অথচ সংহত একটি বই। যত দিন যাচ্ছে, বইটির আঁচ তত বেশি করে টের পাচ্ছি আমরা। সময়ের নানা ক্ষত আর ক্ষতি নিয়ে লেখা কবিতা তো আমরা খুব কম পড়িনি বাংলায়, কিন্তু সত্তর দশকের বাংলার দহন আর বিপন্নতাকে যে-দক্ষতায় ধরেছেন মণিভূষণ ভট্টাচার্য তাঁর কবিতায়, তার মন্দ্রতার সঙ্গে তুলনীয় লেখা আমি অন্তত খুব বেশি পড়িনি। ‘গান্ধিনগরে একরাত্রি’র মতো সেই মিতবাক কবিতাটির কথা মনে করুন! কবিতাটির নামের মধ্যেই বিপুল ধিক্কার আর ব্যঙ্গ ঐতিহাসিক ব্যঞ্জনাসহ গনগন করছে। আর কবিতাটি তো হয়ে উঠেছে সেই সময়ের একটি অবধারিত প্রচ্ছদ। এত ছোটো কবিতায় যে কী করে এত বড়ো একটা প্রসঙ্গকে ছুঁয়ে দিলেন তিনি! মাত্র চারজনের একলাইন করে মন্তব্য দিয়ে একটা উদ্দাম আন্দোলন সম্পর্কে গোটা সমাজের চাহনি একনজরে দেখিয়ে দিলেন তিনি :
অধ্যাপক বলেছিল , দ্যাট্‌স্‌ র-ঙ্‌, আইন কেন তুলে নেবে হাতে?
মাস্টারের কাশি ওঠে কোথায় বিপ্লব, শুধু মরে গেল অসংখ্য হাভাতে!
উকিল সতর্ক হয়, ‘বিস্কুট নিইনি, শুধু চায়ের দামটা রাখো লিখে’।
চটকলের ছকুমিঞা ‘এবার প্যাঁদাবো শালা হারামি ও. সি-কে’
আমার মোটেই কবিতার লাইন মনে থাকে না, কিন্তু আশ্চর্য, এই চারটি লাইন আমি পুরো স্মৃতি থেকে লিখলাম। লিখতে পারলাম, তার কারণ তখন এইসব উচ্চারণ বারবার পড়তাম। তখনো সোভিয়েত-পূর্ব ইওরোপ ভাঙেনি, আদর্শ বলে একটা শব্দ তখন খুব আক্রমণ করত আমাদের, বামপন্থা নামে একটা ধারণা আমাদের সবসময় আগলে রাখত। মণিভূষণ তাই টানত আমাদের। না চাইতেই কণ্ঠস্থ হয়ে যেত এইসব লাইন:
খরায় উজাড় গ্রাম--- প্লাটফর্মে পড়ে থাকে হাজারে হাজারে
না খেয়ে মানুষ মরে---‘অপুষ্টিজনিত মৃত্যু’ লেখা হয় আনন্দবাজারে

কিংবা

কাল যে বিপ্লবী ছিল আজ সে-ই মন্ত্রী হয়, মন্ত্রীত্ব খোয়ালে হয় বহুরূপী নেতা
কাল যে ঘাতক ছিল আজ সে-ই প্রকল্প-প্রণেতা

একই কবিতায় :
ছোটো ভাই মাঝরাতে মাঝে মাঝে আসে, খেয়ে যায়--
চটকলের লোকজন গভীর উদ্বেগ নিয়ে জেনে নেয় ভাইয়ের খবর,
কেবল বেড়ার ফাঁকে হঠাৎ বুটের শব্দে মায়ের বুকের রক্ত হিম
ধুপকাঠি তৈরি করে আমাদের পাড়ার মহিম
অথবা, স্বাধীনতা দিবসের উত্তোলিত পতাকার দিকে তাকিয়ে নিরন্ন ভারতবাসীর ‘এতখানি রঙিন কাপড়’ নষ্ট হয়ে গেল বলে সেই অসহনীয় খেদোক্তি ।

ব্যঙ্গ আর কৌতুকের পরিবহন ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়ে অসাধ্য সাধন করেছেন মণিভূষণ বহু কবিতায়। রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত অসততার বিরুদ্ধে, ভন্ডামির বিরুদ্ধে, নস্টামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্রোধ অনেক সময় সরাসরি উচ্চারিত না হয়ে ব্যঙ্গ বা ধারালো কৌতুকের আশ্রয় নিয়েছে। এর ফলে তার ধার বেড়ে গেছে আরও। আর যখন সেই ক্রোধ সরাসরি উচ্ছ্রিত হয়েছে, তার উত্তাপ হয়েছে অলঙ্ঘ্য। ক্রোধ কত পবিত্র হতে পারে, বাংলা কবিতায় সুকান্ত আর মণিভূষণ ভট্টাচার্য তা বারবার চিনিয়ে দিয়েছেন। ‘দক্ষিণ সমুদ্রের গান’ বইয়ের ‘দধীচি’ কবিতায় জনৈক সরকারি আমলার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যেভাবে গর্জে উঠেছিলেন এক আমূল বিপ্লবী, তা পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয় :
কলম ছুঁড়ে দিয়ে ফর্‌ম্‌টা ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো ক’রে সেক্রেটারির
মুখে উড়িয়ে দিয়ে চিৎকার ক’রে উঠলেন ---
‘স্কাউন্ড্রেল্‌স্‌, আমাকে এভাবে ইন্‌সালট করার মানে কী?
আমি প্রাক্তন বিপ্লবী নই , এখনো বিপ্লবী’
এই কবিতাটিতে নাটকীয়তার যে-গড়ন রয়েছে, মণিভূষণের কবিতার সেটা একটা প্রখর বৈশিষ্ট্য। তাঁর তরুণ বয়সের অনেক বন্ধুই ছিলেন আদ্যোপান্ত নাটকের লোক, এটা আমি বিশেষ সূত্রে জানি। আর ষাট-সত্তর দশকে বিপ্লবী নাটকের সঙ্গে একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল বিবেকী শিল্পীদের। নাটক আর কবিতার সখ্য তাই স্বাভাবিক ছিল তখন। মণিভূষণের কবিতাকে এই নাটকীয়তা আরো পরাক্রান্ত করেছে। ‘কোনো কবিসম্মেলনে’ নামে পুরো নাটকীয় ভঙ্গিতে লেখা একটা দীর্ঘ কবিতা আছে মণিভূষণের, গোটা কবিতাটি একটুও টোল না খেয়ে বিস্ময়করভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। নাটকীয়তার দমকে মাঝে মাঝেই তৈরি হয়েছে এক-একটা বাঁক। প্রতিটি বাঁকের আঘাতে পাঠক নতুন করে সচকিত হয়ে ওঠেন। এটা ঠিক দুটো-তিনটে লাইন তুলে বোঝানো যাবে না, গোটা কবিতাটি এক নিরবচ্ছিন্ন দমকে লেখা। তবু একটা অংশ তুলছি, যেখানে এই নাটকীয়তার সর্বোচ্চ বৈচিত্র্য টের পাওয়া যাবে :
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ঔরসজাত লাবণ্যের ঘনঘটা আপনাদের চামড়ায় –
মার্কিনী মাধুর্যে বিগলিত হাড়ে-বজ্জাত ঠগচাচা এবং ঠগচাচির দল,
না হলে আপনাদের চোখের সামনে আসানসোল মেদিনীপুর দমদম প্রেসিডেন্সিতে
কেবল রক্তের দাগ, অকাতর তরুণ রক্তে কেন ভেসে যায় জেলের উঠোন---
বিশ্বাস করুন, আমি আপনাদের পটাতে চাইছি না, কোনো রকম
বিবেকের ফুসলানির মধ্যে আপনাদের মতো সরেস মালদের টানতে
চাইছিনা আমি--- কারণ ইতিহাস আপনাদের জন্য ভয়াবহ অ্যাপ্রোচ পেপার
তৈরি করেছে, সুতরাং সমস্ত লাম্পট্য বাঁটোয়ারা করে নেওয়া যাক –-
(হিস্‌সার জন্য নিজেদের মধ্যে লড়িস না গুরু, মেজোবাবু প্যাঁদাবে)।
এই নাটকীয়তার গমকে লেখা আর একটি স্মরণীয় কবিতা ‘ডানকানের মৃত্যু’। এখানেও বলার ভঙ্গির ভাঁজ পালটে পালটে এগিয়ে গেছে কবিতাটি। রূপকের অনায়াস আর তির্যক ব্যবহারে মণিভূষণের দক্ষতার সেরা নজির এই কবিতা। পেশল, রুক্ষ আর নৈর্বক্তিক ধরনটি গোটা কবিতায় সফলভাবে রক্ষা করেছেন তিনি। ‘কোনো কবিসম্মেলনে’র চেয়েও অনেক সংহতভাবে। এই কবিতাটিও এত অবিচ্ছিন্ন আর টানটান যে কোনো একটা অংশ তুলে এর জোর বোঝানো অসম্ভব। তবু কয়েকটা লাইন তুলে এই ধরনের লেখায় মণিভূষণের তুখোর দাপট টের পাওয়া যেতে পারে :
খিদেয় নেতিয়ে-পড়া কনিষ্ঠ কঙ্কালগুলো দলা পাকিয়ে
ঘুমিয়ে পড়েছে। বিরক্ত বয়স্করা ঝিমুচ্ছে। মধ্যরাত্রির এই পচনশীল
নৈঃশব্দ্যের দিকে, নিবন্ত উনুনের পাশে গরমমশলার সুদূর গন্ধের মধ্যে
হে অন্ধ অধিরাজ, আপনাকে বসিয়ে রাখবো; মনে রাখবেন, পরিবেশনের
ভার আপনাদের উপর; জানি, অসমবন্টনে আপনার কতো শ্রান্তি! তবু,
মেটের টুকরোগুলো বাচ্চারাই যেন পায়।
গন্ধের ‘সুদূর’ বিশেষণটির বহুতল সম্ভাবনা খেয়াল না করে পার পাওয়া যাবে না। শেষ লাইনটিতে এসে কথার গমক যেভাবে হঠাৎ বেঁকে গেল, তাও আমাদের মুহূর্তে সচকিত করে তোলে।

আসলে, প্রত্যক্ষভাবে সমাজপ্রবণ যে ধারা আছে বাংলা কবিতার,ভেবে দেখেছি, তার কিছু সাধারণ লক্ষণ আছে। ব্যঙ্গ বা কৌতুকের বহুগামী ঝোঁক, নানা সূত্রে ব্যবহৃত বাক্য বা মন্তব্যের প্ররোচনাময় উদ্ধৃতি, একধরণের উদ্দেশ্যমূলক নাটকীয়তা সহ আরো কয়েকটি প্রবণতা এই ধারার কবিতায় সহজেই নজরে পড়বে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় থেকে শঙ্খ ঘোষ, জয়দেব বসু পর্যন্ত সবার কথা মনে করলেই এই কথার মানে ধরা যাবে। উচ্চারণে ঘন ও স্তরবহুল নাটকীয়তার দীর্ঘ বিন্যাস মণিভূষণের মতো জয়দেবেরও বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘ কবিতার উদারতায় ইচ্ছেমতো ভাঁজ ও বক্রতা রচনা করা যায়। কথার চুড়ো বেঁধে আবার খুলে মেলে দেবার আহ্লাদ টের পাওয়া যায়।

মণিভূষণের ‘একটি শ্লোগানের জন্ম’ কবিতাটি পড়তে পড়তে আমার শঙ্খ ঘোষের ‘স্লোগান’ আর জয়দেব বসুর "মায়াকোভস্কির শেষ সাতদিন" কবিতাদুটির কথা মনে পড়ে যায়। মণিভূষণ লিখেছিলেন :
যখন পড়ি, ‘কমরেড কানু সান্যালকে জেল ভেঙে ছিনিয়ে আনুন’ ---
তখন ভাবি এরা অন্যের উপর দায়িত্ব দিয়ে
চলে গেলেন কেন? কিংবা আলকাতরা এবং ব্রাশের নৈশসংঘর্ষে
যখন দেয়ালে ফুটে ওঠে, ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’ তখন
ক্ষমতার আগে ‘রাজনৈতিক’ শব্দটা নেই বলে আমি আঁতকে উঠি এবং
খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ি...
এর পাশাপাশি শঙ্খ ঘোষের ‘শ্লোগান’ কবিতাটি মনে করুন :
এমনিভাবে থাকতে গেলে শেষ নেই শঙ্কার
মারের জবাব মার

বুকের ভিতর অন্ধকারে চমকে ওঠে হাড়
মারের জবাব মার

বাপের চোখে ঘুম ছিল না ঘুম ছিল না মার
মারের জবাব মার

কিন্তু তারও ভিতরে দাও ছন্দের ঝংকার
মারের জবাব মার
লক্ষণীয়, দুটি দেয়াললিখন প্রসঙ্গেই কবির সপ্রশ্ন অস্বস্তি রয়েছে। শঙ্খ ঘোষের কবিতাটিতে এই অস্বস্তি রূপ নিয়েছে সব্যঙ্গ অথচ নিঃশব্দ প্রত্যাখ্যানের। শ্রেণি-ঘৃণার দুটি স্লোগানই (‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’, ‘মারের জবাব মার’) একসময় বাংলাপ্লাবিত ছিল। এই প্লাবন এবং তার জোয়ারে ভেসে-যাওয়া সময়ের নানা চিহ্ন ‘স্লোগান’ কবিতাতেও ধরা পড়েছে। সেন্ট্রাল জেল কিংবা কার্জন পার্কে ঝরে যাওয়া সোনার ছেলেদের স্মৃতিকণা ঝলক দেয় ‘বুকের ভিতর অন্ধকারে চমকে ওঠে হাড়’-এর কথায়। স্মৃতির লালন আর নির্মম মৃত্যুকে একই সঙ্গে ধরে রেখেছে ‘হাড়’ শব্দটি। আর তারপরেই ‘মারের জবাব মার’ অসহায় বৈপরীত্যে চলকে ওঠে।
জয়দেবের ভাষ্য ছিল এইরকম :

'কে জানে কতদিন আমি বাস করছি
বিছানাভর্তি ছারপোকার সঙ্গে,আর
স্বপ্নে দেখছি হতাশাব্যাঞ্জক,ভীতিপ্রদ কয়েকটা শব্দ;
দেখছি - 'পার্টিলাইন' কথাটা কেটে দিয়ে লেখা হচ্ছে
'জমায়েত' আর 'মহামিছিল'।
'গণতন্ত্র' কেটে দিয়ে 'প্যানেল এবং পাল্টা প্যানেল',
'যোগ্যতা' কেটে দিয়ে - 'কালেকশান',
আর,'বিপ্লব' শব্দটা কতদিন দেখিনা...কতদিন?'
শব্দের এই বিপন্ন সংশোধনের সান্নিধ্য লক্ষ করার মতো।

‘গান্ধীনগরে রাত্রি’ বইয়ের খরতায় যে-মসৃণতা ছিল, ‘মানুষের অধিকার’ বা ‘দক্ষিণ সমুদ্রের গান’-এ তা ঈষৎ কমে এলেও কোনো কোনো কবিতায় তা আরো দ্রুত আর সাবলীল হয়ে ওঠে। ‘মানুষের অধিকার’-এর ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যকে খোলা চিঠি’ পড়লে তা বোঝা যায়। বোঝা যায় ‘দক্ষিণ সমুদ্রের গান’-এর ‘ফেরা’, ‘দধীচি’ কবিতাগুলি পড়লে। এই দাপুটে সাবলীলতার শীর্ষ ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যকে খোলা চিঠি’ পড়লে টের পাওয়া যায়। পণ্যপ্রবণ এই সময়কে আমাদের ভাষার অনেক ক্ষমতাবান কবি তাঁদের মতো করে কবিতায় বিদ্ধ করেছেন। তাঁদের নিজস্ব স্বর ও ব্যঞ্জনায় সেই সব উচ্চারণ আলাদা হয়ে উঠেছে। নিওন আলোয় আমাদের যা কিছু ব্যক্তিগত সব পণ্য হয়ে ওঠে , আমাদের মুখ ঢেকে যায় নির্মম বিজ্ঞাপনে, একথা তো আজ প্রবাদের মতো উচ্চারণ করি আমরা। মণিভূষণও লেখেন একই তথ্য, তাঁর স্বাধীন আর ভরাট ভঙ্গীতে :
এই কোটি কোটি পিছু-মোড়া-হাত-পা-বাঁধা ক্রীতদাসের বাজারে
সব কিছুই পণ্য---
এই মৌসুমী অঞ্চলে ফুল ও ফল,
ঐ বাতাসা হাতে ছুটন্ত শিশুটির চিবুকের তিল,
এই জবরদস্তি জীবনের সমস্ত লবঙ্গ ও এলাচ
ঐ রোদে পোড়া ফুটপাতে ডান হাতের আঙুলকাটা আসন্নপ্রসবা
ভিখিরি মেয়েটির চিত্রকল্প,
নিঃস্বের ন্যাকড়া কিংবা পণ্ডিতের মগজ,
এমনকী তোমার জন্মদিনও
পণ্য।
মৌসুমী ফুল, শিশুটির চিবুকের তিল, জীবনের গোপন সুগন্ধের কথা বলেই মণিভূষণ থামতে পারেন না। তাঁর মনে পড়ে যায় ভিখিরি মেয়ের কথা, আসন্নপ্রসবা কথাটি মণিভূষণ অকারণে লেখেননি। সময়ের যে-সুডৌল ভবিষ্যতের দিকে তাঁর নজর, তার ইশারা দিতে তিনি সবসময় তৎপর। এটা একটা আলাদা আলোচনার বিষয় হতে পারে যে কীভাবে মণিভূষণ সমতাময় আসন্ন সমাজের দিকে শব্দের তর্জনী তুলে ধরেন। সদ্যোজাত, লাল ডাকবাক্স, বাঁ হাত, সিন্ধুসারসের গান, বড়ো শহর, দক্ষিণ সমুদ্র, সন্ন্যাসী এবং এইরকম অনেক শব্দ মণিভূষণের কবিতায় একটি নির্দিষ্ট তাৎপর্যে লেখা হয়।

কিন্তু, আমার মনে হয়, ‘দক্ষিণ সমুদ্রের গান’-এর পরের বইগুলোতে মণিভূষণের এই তেজ, এই তারুণ্য আস্তে আস্তে শমিত হয়ে আসে। এটা তো ঠিকই যে একজন কবি সারাজীবন একই গমকে কথা বলেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, ভাবনাবদলের টানে, সচেতনতার হেরফেরে নানা বাঁকবদল ঘটে যায় লেখায়, এক পর্বের কবিতার সঙ্গে অন্য পর্যায়ের রচনার তফাৎ লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। এটা কখনো কখনো, কোনো কোনো কবির বেলায় সচেতন উদ্যোগের পরিণাম হতে পারে, কিন্তু মণিভূষণের লেখা ঠিক সেরকম কোনো উদ্যত চেষ্টার টানে পালটে গেল বলে আমার মনে হয়না। যে-কোনো কারণেই হোক, ক্রমশ, ‘প্রাচ্যের সন্ন্যাসী’ বইটি থেকেই মণিভূষণ তাঁর মোক্ষম ভঙ্গিটিকে নাছোড়ভাবে ধরে থাকলেও সেই আঁচ আর ভেতর থেকে জাগ্রত রাখতে পারলেন না। কথা এক রইল, ধরনটিও অক্ষত, শুধু শব্দ দিয়ে সেই কাজ আর করানো গেল না যা তিনি অবলীলায় করেছেন এতদিন। আর সেইজন্যেই, দেখা গেল, ব্যঙ্গ আর কৌতুকের পরিবহনও উধাও হয়ে গেল তাঁর রচনা থেকে। শব্দবিন্যাসের সক্ষম দাপট তিনি তারপরেও রক্ষা করেছেন, ভাষার কুশলী মোচড় তাঁর প্রতিটি কবিতাকেই অটুট রাখে। তারপরেও তিনি লিখেছেন এমন মহার্ঘ সব লাইন :
বড় এক গ্লাস চায়ে দু চুমুকে তৃপ্তি পায়
গুলজার একুশ শতক,
ক্রমশ তলানিটুকু শেষ করে
গিয়ারে বাঁ হাত রেখে
ডানহাতে ধরে স্টিয়ারিং,
সামনে হাজার মাইল অসহিষ্ণু দিন আর রাত্রি পড়ে আছে
চলন্ত প্রবাসে।
এখানেও বাঁ আর ডান হাতের শোচনীয় সহাবস্থান কত স্বাভাবিকভাবে সামনে আনা হল। লক্ষণীয় দিন আর রাত্রির উচ্চারিত ব্যবধানটুকুও। মণিভূষণের কবিতায় দিন আর রাতের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণভাবে আলাদা। দিন হয়ত ঘটমান বর্তমানের স্মারক, কিন্তু রাত রহস্যময় জটিলতা আর সম্ভাবনার সমাধানহীন অন্ধকারে ঢাকা।

কিন্তু এই ঘরানার কবিতার শীর্ষ তো আমরা ছুঁয়ে এসেছি ‘গান্ধিনগরে রাত্রি’ পর্বেই। তার পরের কবিতাগুলো সেই অনতিক্রমণীয় ধরনেরই সম্প্রসারণ। আমি এখনো অপেক্ষায় আছি, মণিভূষণ আবার আমাদের সেই মৌসুমী উত্তাপে ধীরে ধীরে পেকে-ওঠা লঙ্কার মতো লাল কবিতার আগ্নেয় ভূখণ্ডের দিকে নিয়ে যাবেন।