ম্যানিফেস্টো লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ম্যানিফেস্টো লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

অত্রি ভট্টাচার্য

  অত্রি ভট্টাচার্য

এই শ্রাবণের বৃষ্টিতে স্পষ্টতঃ একটা বেনিয়মের গন্ধ। গদ্যের সাথে পদ্যের সীমানা ভেঙেচুরে এলোমেলো হয়ে টয়ে একাকার – তার গর্ভগৃহে কোথাও একটা নির্জন আধো অন্ধকার ঘর, গণেশ পাইনের ছবিতে সম্ভ্রান্ত পিদিম জ্বলছে সংকটের। জ্বলনের তিনটি সিল্যুয়েট – সাদা, কালো বা আধা কালো এবং ধূসর। এই শ্রাবণের খোড়ো অর্থনীতি একযোগে তিনটি রংকেই ধরেছে। এক অচেতনের শ্রেণী, যারা এই মায়াবী দূরাবস্থা-য় (পোস্ট ২০১১) যুগপৎ লাভবান ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। কারণ আমলাতন্ত্রের মধু-র সঙ্গে সঙ্গে অসংগঠিত সন্ত্রাসের বিষ-ও ছড়িয়ে পড়ছে মতে-মতান্তরে। এছাড়া রয়েছেন অবচেতন শ্রেণী, যারা শুধুই লাভবান – কারণ সব্জীবাজারের ওঠানামা পারদ অথবা মাঝারী মেয়েদের লুটোপুটি, গ্রুপডি-গ্রুপসি-র অবলুপ্তি, বন্ধ ইনক্রিমেন্ট বা অনিবার্য্য খরার ব্যাকগ্রাউন্ডে গ্রাম্য চিতা ও চিতাবাঘ তাদের স্পর্শ করার পাস পায় না। এদের প্রসঙ্গ থাক। চলে আসি তৃতীয় শ্রেণীতে; তৃতীয় বিশ্বের ভেতর যাদের চতুর্থ বিশ্ব অভিধায় ভূষিত করেছিলেন জনৈক ইতিহাসবিদ, টাইমস অফ ইন্ডিয়া দৈনিকে। এরা সচেতন। না হয়ে উপায় নেই, হলুদ সূর্য্য এদের কাছাশুদ্ধ জ্বালিয়ে তবে মুখ ঢেকেছে। আদিম সংবাদঘোষক যাদের অনাবৃষ্টির ৪২%-র আওতায় দেগে দিলেন, তারাই এরা। বৃষ্টি কম হ’লে আমার বাবার অসুবিধা, আ-গ্রীষ্ম একে-একে উঁকি মারা কারবাঙ্কলেরা বর্ষাসিক্ত হয়েও মরে না, ঠিক যেন মার-খাওয়া ফসলের সুদ ! উপর্যুপরী ফুটতে থাকে, ফাটতে থাকে, ফোটাতে থাকে প্রাণঘাতী সুইসাইডাল হুল! সব ওষুধ ব্যর্থ হবার পর বাবা-র বালিয়াড়ি পিঠে ফিটকিরি ঘষে দিতে দিতে আমার মনে হয় এরাই সেই চাষীরা, মাইনে বন্ধ হওয়া পরিবহণকর্মী, মামলার তলায় আঁটিশুটি দীর্ঘশ্বাস তথা মামলার কাগজের উপর ঝুলন্ত পা-গুলি। কৃষিক্ষেত্রগুলির ফার্টিলিটি নেহাৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে রয়েছে একপাশে!

আজকালকার রাজনীতি আর অর্থনীতি এত হাতে হাতে ধরিধরি এর আগে কখনো দেখা গিয়েছে কি? ওপারের উৎরোল আর এপারের বাঁজা গন্ডগোল নিয়ে এই নন-ফার্টাইল গ্রীষ্ম-বর্ষার পরে প্রাক-পুজোর ঢেউখেলানো বাঙালি যেন কাদায় কোঁচা-দেওয়া ধুতির মতোই ল্যাজেগোবরে, নাজেহাল! আরামবাগের তাজা মুরগির মতো মজা-ও মারছে, রাত হ’লে শুতেও যাচ্ছে ম্যারিনেট হয়ে, অথবা ডিপফ্রিজড হচ্ছে ডগম্যাটিক হাটেবাজারে পেষাই হবার জন্য! এইসব ডিস্টার্বিং চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে শিল্প ও শিল্পস্থাপন যে গভীরভাবে জড়িত তা আমরা গত কয়েক বছরে হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছি, বাজারি পত্রিকা ও একচালা টিভি চ্যানেলগুলির দৌলতে। শিল্প, ভারী অদ্ভুত একটি শব্দ! শিল্পকর্ম মানে হাতের কাজ, ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ কাজ, আর তার আধার হিসেবে গড়ে ওঠা কারখানা! সুতরাং Art থেকে Industry – একটি ইভোলিউশনারী প্রসেস, যদিও বাংলা প্রতিশব্দটি একটুও এগোয়নি, পৈত্রিক কবচের মতো ঝুলে রয়েছে ফি-প্রজন্মের ঘুনসিতে। যদিও, শিল্পী আর শিল্পপতি – বিশেষিত এক্সপার্টাইজ পৃথক হয়েছেন, হতে বাধ্য বলেই হয়েছেন! তবু, অমোঘ অর্থনীতি সমান গতিতে উত্তমর্ণ –অধমর্ণ-এর বৈজ্ঞানিক সম্পর্ককে বাঁধিয়ে রাখে, যথা শিল্পীর গতি শিল্পপতি – উদা. হর্ষ নেওটিয়া এবং অন্যান্য সেরা শিল্প সংগ্রাহক। একজন শিল্পপতির পকেটে এতজন শিল্পী রয়েছেন – কার প্রতি বাঙালীর চির উন্নতশির নত হবে বলুন ধর্মাবতার? কলকাতা লন্ডন হতে পারে, কিন্তু প্যারিস তো আর হতে পারে না ! প্রসঙ্গতঃ, আমাদের সত্যজিতের ছবি দেখবার জন্য সেখানে চার দশক ধ’রে অপেক্ষা করেন পথরেস্তরাঁ-র ওয়েটার! কার গলায় যে মানিকের মালা!

ইন্ডাস্ট্রী নানান সমস্যায় জর্জরিত, আমাদের কথা ভাবার ফুরসৎ কোথায়? বরং শিরোনামটি সার্থকনাম ক’রে তোলবার জন্য আর্ট প্রসঙ্গেই আসি! শিল্পের ফার্টিলিটি তো একান্তই একটি গুণগত দ্যোতক, কিন্তু অশ্লীলতা? ফার্টিলিটি-র সাথে কতটুকু সম্পর্ক রয়েছে তার? নারায়ন সান্যাল “অশ্লীলতার দায়ে” লিখে অনেকটা ভেবে গিয়েছেন আমাদের জন্য। বরং এই প্রসঙ্গে ফিরে যাই সেই প্যারিসে, একজন স্প্যানিশভাষী শিল্পীর বোহেমিয়ান জীবনের আঁতুড়গৃহে।


পাবলো পিকাসো এক নগ্নিকা ড্র ক’রে দেখালেন বন্ধুকে। জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন হয়েছে?” বন্ধু ঘাড় নেড়ে বললেন, নগ্ন নারিদেহ? এর থেকে অশ্লীল কিছু হতে পারে না! তখন পিকাসো নগ্নিকার পায়ে একজোড়া পাম্প শ্যু এঁকে দিলেন। বন্ধু স্বীকার করলেন, এই ছবিটি আগেরটির থেকে অনেক বেশী অশ্লীল। সুতরাং অশ্লীলতার কনসেপ্টটি, এমনকি, স্থান-কালের গন্ডীর মধ্যেও, পরিবর্তনশীল! কিন্তু নগ্ন নারীদেহ-কে ফার্টিলিটি-র প্রতীকরূপে দেখানোর প্র্যাক্টিস তো নতুন নয়, সেই রেনেসাঁর সময় থেকে চলে আসছে। কিন্তু বিতর্ক যে স্থান বা কালকে গ্রাহ্য ক’রে না, সে তো আমরা দেখেছি ফিদা হোসেনের নগ্ন সরস্বতী (চিত্রঃ ২) নিয়ে চরম নোংরামী-র সময়ে। অশীতিপর ভূমিপুত্রকে কি মৃত্যুর পূর্বে ফিরিয়ে নেওয়া যেতো না তার জন্মভূমির মাটিতে? সরকারী মনোভাব-ও কি মৌলবাদের গোপন লালনঘর ছিল? ওয়েল, এক্ষেত্রে দ্বিতীয় গল্পটিতে আসা যাক। সাল-তারিখ স্মরণে আনতে চাই না, কারণ গল্পটি চিরকালীন! দিল্লীর রামলীলা ময়দানে শিল্পমেলায় স্টল সাজাচ্ছেন দুই বাঙালী তরুণ শিল্পী। উপকরণে, অনেক প্রিন্টের মধ্যে রয়েছে সুবিখ্যাত বত্তিচেল্লীর ভেনাস (চিত্রঃ ১)। দুজন আমলা উদ্বোধনের আগের রাত্রে লাস্ট মিনিট তত্ত্বাবধানের কাজে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়লেন পূর্বোক্ত স্টলের সম্মুখে। ভেনাসের প্রিন্টটি দেখামত্র চমকে উঠলেন দুই কর্তা! এ কি? এ তো অশ্লীল! এসব এখানে লাগানো চলবে না, নামিয়ে ফেলুন! এককথায় শিল্পের সুদীর্ঘ ইতিহাসকে ফুৎকারে উড়িয়ে চলে গেলেন তারা! বিকাশ ভট্টাচার্য হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন তার সঙ্গীর দিকে!

অলংকরণ – কৌশিক বিশ্বাস

শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১২

পীযুষ কান্তি ব্যানার্জী


 
No Escape From Escapism
 

Escapism আদতে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষা যার অর্থ কঠিন বাস্তবকে এড়িয়ে চলার স্বভাব .শাহরুখ খান অভিনীত "My Name Is Khan" ছবিতে যে Autism কে আশ্রয় করে সাম্প্রদায়িক গৌরব প্রচারের চেষ্টা করা ,সেই দিবাস্বপ্ন সম আত্মরতি -Escapismএর জাতভাই কিনা তা মনস্তাত্ত্বিকরা বলবেন ,কিন্তু মনোবিদের পরীক্ষাগার থেকে তাকে সাহিত্য সমালোচনার রনাঙ্গনে টেনে আনেন যথাস্থিতবাদী (Naturalist) এবং বাস্তববাদী সাহিত্য সমালোচকরা কেউ কেউ এই ঘটনাকে শ্লীলতাহানি রূপে বর্ণনা করে এর আংশিক দায় মতান্ধ কমিউনিস্ট দের ঘাড়েও চাপান পূর্বসূরি সারস্বতদের নস্যাৎ না করলে নবোদিত মতাদর্শের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা ঠিক জমে না, তাই প্রথম যুগে রোমান্টিক ও পরবর্তী কালে সুররিয়ালিস্টিক ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ও কোণঠাসা করার জন্যে তাদের সৃষ্টির গায়ে এসকেপিস্ট লিটারেচার এর স্টাম্প মেরে দেওয়া হয়  ইবসেন,বার্নার্ড শ প্রমুখ বাস্তববাদীরা কিংবা গ্ন্কর্ট, জোলা প্রমুখ যথাস্থিতবাদীরা তাদের সৃষ্টিতে মৃত্যুঞ্জয় কিন্তু বিশশতকের প্রথমার্ধে দু দুটি বিশ্বযুদ্ধ, তিরিশের দশকে মন্দা ও আর্থিক সঙ্কট ,বিশেষত ভারতবর্ষে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ ,১৯৪৬ এর দাঙ্গা, দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা , আর্থ সামাজিক অবক্ষয় - একটি অদ্ভুতযুগের পটভূমি রচনা করেছিল সেই কঠিন কঠোর বাস্তব অনেকেই সহ্য করতে পারেননি, তার মধ্যে খুঁজে পাননি কোনো অনুকরণীয় আদর্শ দর্শন
এবং মনস্তাত্ত্বিক ফ্রয়েডের উদ্ভাবনায় চঞ্চল সেইসময় কেউ আশ্রয় নিলেন অভিব্যক্তিবাদে কেউ  ডাটাবাদ পরাবাস্তববাদে কিংবা কেউ অন্যতম মতবাদে

মানিক, শৈলজানন্দ,সমরেশ বসু,প্রেমেন্দ্র মিত্র,সমর সেন,সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দিনেশ দাস প্রমুখ প্রতিভাশালী নব্য সাহিত্যিকরা রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দকেও পলায়নবাদী আখ্যা দিতে পিছপা হননি ঠিক তার পরবর্তীকালে এদের অনুগামীদের প্রবেশের ফলে বাংলা সাহিত্যের আঙ্গিনা কুস্তির আখড়ার রূপ নেয়.সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার নামে বিকৃতি, অবক্ষয়, অশ্লীলতার কর্দ মতাই কালো হয়ে যায় তত্কালীন সাহিত্যসৃষ্টিঅথচ আজ সেই তথাকথিত এসকেপিস্টরাই আমাদের নয়নের মণি ,সাধনার ধন, প্রতি মুহূর্তের মানসসঙ্গী আর সাহিত্যের নামে রাজনৈতিক প্রচার, "শ্রেয় কে হেয়" করার জন্যে অবিরাম বিষোদ্গার , সাহিত্যের নামে যত অসাহিত্যিকতা -বিস্মৃতির খাদ্য হয়ে গেছে  

রোমান্টিক,সুররিয়ালিস্টিক,বা মিস্টিক দের বিরুদ্ধে এই নতুন প্রজন্মের মূলতঃ অভিযোগ ছিল এই যে পুরাতন ধারার সাহিত্যের সাথে নাকি সামাজিক জীবন ও চিত্ত সম্পর্কহীন , বাস্তবের মাটি ছেড়ে কল্পনার গজদন্ত মিনারে আশ্রয় নিয়েছেন ,তাই জগত ও জীবনের সাথে এদের সাহিত্য সৃষ্টির যোগসূত্র নেই !
কিন্তু বিচারকদের এটা খেয়াল ছিল না যে তারা কবির সামাজিক কর্তব্যের বিচার করতে বসেছেন, কাব্যের নয়ভবিষ্যতের শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্ন দেখা, তার জন্যে জীবন দিয়ে দেওয়া ,তাদের মতে পরম কর্তব্য .. কিন্তু তা কি সাহিত্যিক নাকি সামাজিক কর্তব্য ?

কল্পনা, প্রেম, স্বপ্নচারিতা, প্রকৃতিচেতনা ইত্যাদি কবিতার মূল উপাদান, তাকে তার মধ্যে আশ্রয় নিতেই হবে ! বাস্তবের নকল করা তার কাজ নয়, তাই স্বভাবোক্তিকে অলঙ্কারশাস্ত্রে অলঙ্কার বলে ধরাই হয়না
আসলে সকল সাহিত্যিকই কমবেশি পলায়নবাদী (ভোগবাদী নয়, অনেকে আবার পলায়নবাদ ও ভোগবাদ কে গুলিয়ে ফেলেন )

এটাও শ্বাশ্বত সত্য যে লৌকিক মন ও জীবন থেকে দূরবর্তী হয়ে গেলে সাহিত্য দুর্বল হতে বাধ্য, কারণ সাহিত্যের প্রধান উপাদানের মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের জীবন ,লৌকিক আনন্দ, বেদনা, বিত্ত ও সামাজিকতা মহাভারত থেকে গ্রিক ট্রাজেডি, শেক্সপিয়রের নাটক থেকে টলস্তয়ের উপন্যাস -রসোত্তীর্ণ সাহিত্য - হয়তো সেজন্যেই ভ্রম হয় যে সাহিত্যিকের কাজ শুধু বাস্তব চিত্রণই..

পলায়নবাদী সমাজের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পালান না , এত সুবিশাল উপকরণ দিয়ে সাহিত্য সৃষ্টিতে তিনি অপারগ বলেই পালান.একে সাহিত্যিক চাতুর্য বলে ধরে নেওয়ায় শ্রেয়

আধুনিক সাহিত্যের বাজার যারা জগৎ ও জীবনের কুশ্রীতা ,নগ্নতা ,কদর্যতা আর তার সাথে ভোগবাদের মিশ্রণে মাতিয়ে রেখেছেন ,নারী মনের রহস্য কে উপজীব্য না করে তার মাংসল ভাঁজকেই কবিতার বিষয়বস্তু করেছেন , তাঁরাও কি এসকেপিস্ট নন?

রিয়ালিটি নয়, রিয়ালিজমের মুখোস পরা সস্তাসেন্টিমেন্টালিজ্ম-এর প্রদর্শনে এদের কবিতার পরতে-পরতে মল মূত্র , বীর্য , রজ্স্রাবের ছড়াছড়ি .. কিন্তু জীবন কি শুধু তাই ?
 
স্বাভাবিক সৌন্দর্য ,মান,অভিমান,বলে কিছুর অস্তিত্বই কি নেই ? বিপ্লবের রণধ্বনির মাঝে প্রেমের ফুল ফোঁটা কি কষ্ট কল্পনা ?

আসলে সমস্যাটা তা নয়এরা সৌন্দর্য-ভীরু, সত্য শিব সুন্দরের বিশালতায় ভয় পেয়ে এরা আশ্রয় নেই বিকৃতির বিবরে

জগৎ সংসারের অমৃত ও গরল যে একসাথে মিলেমিশে আছে , সেই বিস্ময় সেই বন্দনা কোথায়? নাকি সেই বিস্ময় থেকে বঞ্চিত হয়েই কুশ্রীর জয়গান !

সর্বোপরি বলবো যে ,সব কথার সারকথা একটাই - সারস্বত সাধনা - পথ যাইহোক না কেন।
"
কামনা অনলে প্রেম শতদল ফোটে"
মিথ্যে জনপ্রিয়তার লোভে যারা সেই সুন্দরকে ছেড়ে পাঁক ঘেঁটে মরে, তাদের মতো নির্বোধ কে ?
 
অলংকরণ – কৌশিক বিশ্বাস

শুক্রবার, ২ মার্চ, ২০১২

অনুপম চট্টোপাধ্যায়

ম্যানিফেস্টো - আধুনিক শিল্পকলাকে কিভাবে দেখবো?

দর্শকের প্রায়শঃ একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন আমাদের দিকে "মডার্ন আর্ট-ফার্ট খুবই দুর্বোধ্য, আমরা বাপু এসবের কিছুই বুঝি না" আমরা যারা ছবি আঁকিয়ে বা মূর্তি গড়িয়ে বলে গর্ববোধ করি তারা প্রথমেই থতমত খাই, ভাবি তাহলে আমরা যা কিছু আঁকছি বা গড়ছি তার কি কিছুই হচ্ছে না? কিন্তু একথা তো সত্য নয়, কারণ ভুক্তভোগী  শিল্পী মাত্রেই জানেন যে একটি শিল্পকর্ম শেষ করার পিছনে কত রক্তজল-করা পরিশ্রম থাকেতাহলে কি শিল্পী যত পরিশ্রম করেন তার শিল্পটিকে পূর্ণরূপ দিতে সেই তুলনায় দর্শকেরা কি রস উপলব্ধিতে সামান্য পরিশ্রমে নারাজ?
না; তাও না, তাহলে ...
আসলে কোন সাহিত্যকর্মের রস উপলব্ধির জন্য যেমন সেই ভাষাটি জানা প্রয়োজন তেমনি শিল্পকলার প্রকৃতি রস উপলব্ধির জন্য তার ভাষাটিও জানা জরুরিএই ভাষাটিই শিল্পী ও  দর্শকের মধ্যে সেতুর কাজ করেশিল্প সমালোচকেরা অনেক সময় এই সেতুর কাজটি করে দেন, তবে সেটি হয়ে ওঠে অনেকটা পুরোহিতের মাধ্যমে ভগবানকে ডাকার মতো ব্যাপার
প্রাগৈতিহাসিক আদিম মানুষ যেদিন গুঁড়ো রঙের সঙ্গে পশু চর্বি মিশিয়ে পাথরের দেওয়ালে শিকারের ছবি এঁকেছিল, সেইদিনই শুরু চিত্রকলার জয়যাত্রাএই ঘটনাটির মধ্যেই আছে চিত্রশিল্পের মূল তত্ত্বপাথর গুঁড়ো করে চর্বি মিশিয়ে রঙ তৈরি করার মধ্যে আছে যেমন তার প্রকরণ (technique) রপ্ত তেমনি বিষয়বস্তু নির্বাচনের মধ্যে পাওয়া যায় তার মনস্তত্ত্ব, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটবিশ্বের প্রায় সব দেশের গুহাচিত্রে পাওয়া যায় শিকারের ছবিএকটি বড় পশুকে সবাই মিলে আক্রমণ করার দৃশ্য, পশুশক্তিকে জয় করবার কামনার প্রতিচ্ছবি
পরবর্তীকালে মানুষ যখন সমাজ গড়ল তখন প্রাকৃতিক শক্তিকে জয় করবার অথবা
তাকে সন্তুষ্ট রাখবার জন্য সৃষ্টি করেছিল ওই শক্তির প্রতিরূপ ঈশ্বরকে ততদিনে মানুষের মেধারও উন্নতি ঘটেছিল, মানুষ চাইছিল নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যকে কিভাবে আরও সুন্দর করা যায়।  রূপদানে এগিয়ে এলেন শিল্পী এরপর সভ্যতা ধীরে ধীরে শহরকেন্দ্রিক হতে লাগলো এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে চিত্রশিল্পও দুভাগে ভাগ হয়ে গেলএকটি রূপ হ'ল লৌকিক বিশুদ্ধ রূপ, যাকে আমরা বলি ফোক (folk) আর্টমানুষের সহজাত চাওয়া পাওয়ার প্রায় অবিকৃত রূপ যার আদিম গন্ধ এখনও উপলব্ধি করা যায়অপর রূপটি হ'ল ধ্রুপদী, যাকে আমরা বলি ক্লাসিক (classic) আর্ট; সেটির সর্বশেষ পরিমার্জিত রূপ হল আধুনিক শিল্পকলা (modern art)প্রসঙ্গত জানাই ভাস্কর্য নিয়ে পৃথক প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে এই রচনাকে একমুখী করবার স্বার্থে
বিশ্বের সব দেশের বা জাতির চিত্রকলার ইতিহাসে দেখা যায় প্রাচীন যুগে আঁকা হতো দেবতাদের ছবি (অনেক দেশে রাজাদেরই দেবতা বলে মানা হতো, যেমন মিশর, জাপান)অথবা আঁকা হয়েছে এমন মানুষের জীবনগাথা যিনি দেবত্ব লাভ করেছেন (বুদ্ধ, যীশু)মধ্যযুগে আঁকা হল রাজা,পুরোহিত এবং রাজপুরুষদের ছবিএকদিকে যেমন রইলো মানুষের দেবত্ব লাভের ছবি, অপরদিকে কিন্তু পাল্লা ভারি করলো রাজতন্ত্রঅর্থাৎ দেবতা, পুরোহিত এবং রাজাকে খুশি রাখলেই সমাজ ও শিল্পীর মঙ্গল, তখনকার আর্থসামাজিক মনস্তত্ত্বের প্রতিরূপ
মানসিক দিক দিয়ে যেদিন চিত্রশিল্পীরা সম্পূর্ণতা অর্জন করলেন এবং ঘোষণা করলেন যে তারা শুধুমাত্র নিজেদের স্বতন্ত্র চিন্তাকেই রূপ দেবেন, সেইদিনই সূচনা হল চিত্রশিল্পের আধুনিক রূপশুরু হল নিত্যনতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা, উঠে আসলো জীবনের ভালোবাসা, যন্ত্রণা, জটিলতা, অন্ধকার দিক, মনস্তত্ত্ব, যৌনতা আরও কতকিছুআধুনিক চিত্রশালাগুলি ভরে উঠল কানায় কানায়দরকার পড়লো চিত্রশিল্পকে নতুন দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ
আধুনিক ছবি বিশ্লেষণের জন্য আমরা প্রথমে জানবো এই টেকনিক্যাল দিকটি অর্থাৎ মাধ্যমের (medium) আবেদন এবং ছবির কম্পোজিশনতারপরই আমরা প্রবেশ করবো শিল্পীর চিন্তার অন্দরমহলে এবং সেই সঙ্গে জানবো এর নান্দনিক রূপকে
সচারচর চিত্রশিল্পীরা যেসব মাধ্যম ব্যবহার করেন সেগুলি হল জলরং, তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক, টেম্পোরা, ওয়াস, প্যাস্টেল, গুয়াশ(পোস্টার কালার), ছাপাই ছবি, কালিকলম, এবং মিশ্র মাধ্যমেযে মাধ্যমটি ব্যবহার করলে ঈপ্সিত রূপটি পাওয়া যারে, শিল্পী কাজের সময় সেই মাধ্যমটিকেই অগ্রাধিকার দেনআবার মাধ্যম নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে শিল্পীর মানসিক চরিত্রও ফুটে ওঠে( এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে শিল্পীর চিন্তার অন্দরমহল প্রসঙ্গে)এবার দেখা যাক এই মাধ্যমগুলি কিভাবে শিল্পী ব্যবহার করেনজলরঙকে শিল্পী দুভাবে ব্যবহার করেনযেমন - স্বচ্ছ, জোরালো রঙ এবং এথার প্রাধান্যযুক্ত ছবির জন্য প্রয়োজন চৈনিক জলরং, আবার রঙের আভা দেখানোর জন্যও এটিকে ব্যবহার করা হয়অপরদিকে ঝকঝকে দুপুরের আবেদন আনতে গেলে ব্রিটিশ জলরং অনবদ্য গাম্ভীর্যময় বিষয়, ভারীত্ব, জমকালো বিষয়ের প্রকাশ ঘটে তেলরঙের
মাধ্যমেফটো-রিয়ালিস্টিক কাজের ক্ষেত্রে এই মাধ্যমটি অতুলনীয়তেলরঙ শুকোতে দেরি করে তাই অনেকেই অ্যাক্রিলিক মাধ্যমটি ব্যবহার করেনএর সুবিধা হল এটি দ্রুত শুকিয়ে যায়ক্যানভাসে অমসৃণ টেক্সচার দেখানোর জন্য বর্তমানে অ্যাক্রিলিক সবথেকে জনপ্রিয় মাধ্যমএটিও অপর সুবিধা হল এটিকে জলরঙের মতোও ব্যবহার করা সম্ভবছন্দময় ত্রিমাত্রিক গতিশীল ছবির জন্য প্যাস্টেলের ব্যবহার সুপরিচিতজমকালো এবং ছবিতে স্বর্গীয় মাত্রা বৃদ্ধি করে ওয়াসছবির নান্দনিক আবেদন বাড়ানোয় এর অবদান প্রশ্নাতীত আবার খুব অল্প সময়ে ছবি করা সম্ভব ওয়াসেসবচেয়ে শ্রমসাধ্য মাধ্যম হিসাবে টেম্পোরার নাম করা যায়তেলরঙ আবিষ্কারের আগে এটি ছিল চিত্রশিল্পের ইতিহাসে প্রধান মাধ্যমএর রঙের আবেদন এককথায় অনবদ্য রেখার টানাপোড়েনের মাধ্যমে বিষয়বস্তুর বক্তব্য প্রকাশের জন্য কালি-কলমের জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছেপ্রাথমিক স্কেচ আর চটজলদি সাদাকালো ছবি করার জন্য চারকোল মাধ্যমটি ব্যবহার করা হয়আধুনিক বহু শিল্পী তাদের ভাব প্রকাশ করতে উপরোক্ত একাধিক মাধ্যম যখন একসঙ্গে ব্যবহার করেন তখন তাকে বলা হয় মিক্সড মিডিয়া বা মিশ্র মাধ্যমএকসাথে অনেকগুলো original print পাওয়া সম্ভব ছাপাই ছবিতেকমপিউটারকে ভৃত্য বানিয়ে
মাল্টিমিডিয়ায় যে সব কাজ এখন তরুণ শিল্পীরা করছেন সেটির এখনও নামকরণ করা সম্ভব না হলেও শিল্প হিসাবে উৎকৃষ্ট
কম্পোজিশানকে আমরা তুলনা করি বাড়ি তৈরির সঙ্গেনক্সা, ইট, বালি, রড, সিমেন্ট, পাথর, রং ইত্যাদির সাহায্যে যেমন আলাদা ডিজাইনের বাড়ি তৈরি সম্ভব তেমনি রং, রেখা, ছন্দ, ব্যালেন্স, স্পেস-ডিভিশন ইত্যাদির সাহায্যে আলাদা আলাদা নান্দনিক মাত্রায় ছবি তৈরি করেন শিল্পীছবি যেহেতু দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয় তাই দর্শকরা প্রাথমিক পর্যায়ে শুধুমাত্র রং ও রেখার মাধ্যমেই ছবিকে জানবেনঅপর বিষয়গুলি ছবি ভালোলাগা বৃদ্ধির সঙ্গে জানা বাঞ্ছনীয়... ততদিন ওগুলি শিল্পীদের জন্য তোলা থাক।