দীর্ঘ কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দীর্ঘ কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২ মার্চ, ২০১৪

দীর্ঘ কবিতা - আশরাফুল কবীর



ভৌতিক পরগাছা সময়ের কিছু স্ন্যাপশট



এক.

রোদ্দুর হারিয়ে গেলেই ঝাপটা দেয় আঁধার
চেপে বসে শান-বাঁধানো ঘাটে;
নিক্বণ তোলে পাড়া বেড়াতে বের হয়
কিছু যাযাবর প্রহেলিকা।

এক লহমায়-
অবারিত বন্দরে ভেড়ে কতো কতো জাহাজ
তীক্ষ্ণ ঠোঁটের বৈঠকী আওয়াজে ভেসে আসে;
আগামেমননের পদধ্বণি!

দেশলাই জ্বেলে আহবান জানায় এক দৌবারিক
কালের খোলা-দরোজার প্রতিশ্রুতিতে।

দেবী-বোধন কিছুটা প্রলম্বিত বলে
অপ্রাপ্তির সম্মেলন ঘন হতে থাকে
আশ্বিনের শেষবেলায়।


দুই.

আশ্বিনের রাতগুলো দীপ জ্বেলে আসে
আশ্বিনের রাতগুলো সরব হয়ে আসে, অথচ
এই ভর-আশ্বিনেই গেলবার ভরাডুবি হয়েছিল
ধানী জমির বাগিচা।

খড়ের নতুন কাঠামো সন্ধানে
কল্লোল তুলেছিল ভরত, অযোধ্যা অভিমুখে।

ভীষনরকম ডাগর চোখের চাহনিতে
ঘাড় উঁচিয়েছিল গোলাঘরের অতন্দ্র হুতুম
চোখে ছিল কতিপয় অবিশ্বাস!

অবিশ্বাসের ইকারুস! ছিঁড়েফুড়ে
ডানা মেলতে চেয়েছিল;
এক আঁজলা বিশ্বাসের সিক্ততায়।

হাড়িকাঠ জ্বলে চলে..
নতুন মেমোরিয়াম সন্ধানে
প্রস্থান করে অশরীরীরা।

তল্লাটে তল্লাটে অমাবস্যা ঘেঁটে চলে
ডাকাবুকো এক শেঁয়াল
কাঁটা-জঙল ঘেঁষে ঘোরাফেরা করে
হরিরামপুরের বাসন্তি প্রতীক্ষায়।


তিন.

ইতিহাস টেনে ক্লান্ত হয় ভরদুপুর।
ফিরতে চায় তিরিশ ক্রোশ দূরের
সাজানো উপত্যকায়।

যে ঘাটে জমা আছে কিছু কথা
টেনে ধরা গুটিকয়েক পেঁচানো লতা;
সে ঘাটে কাঁসার-বাসনে ভেসে ওঠে
দীপ্ত এক আ-ধোওয়া মুখ!

ভোরের ইসকাপন ছুড়ে দেয় সেঁওতিরা
হাতছানি দিয়ে ডাকে একগাছি শাঁখ।

বাউণ্ডুলে মাঝি পাড়ি দিয়ে আসে
সাত-সমুদ্দুরের নিকোনো, গহীণ এক নদ।


চার.

শকুন্তলা ভুলেছে শরবন!

তাই সওয়ারী ফিরে চলে তার চেনা-পথ ধরে
ভুলপথে হেঁকে চলা তেজী সোহরাব আজ
আত্ম-পরিচয়ে বিভোর হয়ে যায়; আথালিপাথালি
ঝড় উঠাতে চায় শৈশবের কাঞ্চনজঙ্ঘায়!

হাসে গুলফাম!
হেসে হেসেই স্বাগত জানায় মাছরাঙা-রঙ
গ্রহণকালে বৈষ্ণবী জীবন উপচে ওঠে;
ক্ষ্যাপাটে-বৃষের জারক রসে।


পাঁচ.

মিলনোৎসবের ফ্যাস্টিভাল!

শীর্ণ নদীতেও বান বইয়ে দেয়
লুক্রেসির চিৎকার!
খোশ মেজাজে চৌকাঠ উতরায়;
অনুভূতিহীন এক-চোখা সাইক্লপস।

ভ্রান্তির সদনে কেঁপে কেঁপে ওঠে
বাতিঅলা আকাশ; আঁধার-সলতে উসকে দিয়ে
পৌছে যায় নির্ভাবনার অঙ্গরাজ্যে।

নিশ্চল সময় তেতে থাকে
তাতে শারদীয় সুখ বিলীন হয়ে যায়।


ছয়.

সেঁওতিরা ঝরে যায়; গুন টেনে
প্রস্থানের প্রস্তুতি নেয় আরো কিছু;
কিছু ফুল নির্বাক তাকায় অরোরা অপেক্ষায়।

খালি ইস্টিশন এক!
শূণ্য কামরায় চিৎকার করে ঝিমোয়;
কিছু রং-জ্বলা বাঁশি!

জারুলের প্যারামিটার ঘিরে রাখে
মাস্টার-বাড়ি স্টেশন;
নবকুমার, আর কতদূর শিষ-কুড়োনো?
সময় গড়িয়ে বেলা যে প্রায় গেঁরুয়া-বসন!


সাত.

সিলেবাসের গলি-ঘুপচিতে আটকে পড়ে
ডোরা-কাটা শরীর; নিয়ম কানুনের
অবসন্নতায় ভোগে এক কৃষ্ণ-দাঁড়কাক।

চি-হি-হি স্বরে পিঁছু হটেছিল যে পেগাসাস
পৌষের চেয়ারে গা এলায়, তবুও কেন
নিসঙ্গতায় ভোগে মৌসুমী সকাল?

পূজোর-অর্ঘ্যে মন্ত্র আওড়াবে বলে, পুরোহিত
শূণ্য বেদীতে কেবলি হুটোপুটি খায়!


আট.

জলে ডুব দেয় পানকৌড়ি
মিশে যায় স্বাস্থ্যবান মাছেদের সাথে।

চা পানের ছলে টংঘরে জমে যায়
কিছু ধূমায়িত চিত্র, অজানাই থেকে যায়
ভিঞ্চির নাম; যে গড়েছিল
মোনালিসা এক।

বেয়ারারা ছুটে চলে সারারাত, নির্ঘুম
নতুন বউ কাঁধে তোলার অভিপ্রায়!


নয়.

আগুন জিইয়ে রাখে মনের চারকোল।
বর্ষণে ভিজে, শীতের ওশে কেমন নিভু নিভু;
একফালি প্রাণ!
শাঙনের কোলে কে খোঁজে এলিয়টগুচ্ছ
পড়ো-জমিনের গান?

যদিও তীর্থ যাত্রার প্রস্তুতি বেশ জোড়েশোরে, তবে
এ শহরে এখন ভর করেছে চিরস্থায়ী রাত
ঊষার আলোয় কদাচিৎ পালকি চড়ে সূর্যের দলবল;
শাদা-রশ্মিদের আজ বড়ো দু:সময়!

ঝটিকা আলোয় চষে বেড়ায় অসুরের দল
পৃথিবী এখনো খোঁজ করে চলে
এক নতুন অবতার!


দশ.

কখনো কখনো হাত বাড়ায় হরিরামপুর
মেঠো-পথ, সৌরভ ছড়ানো আকন্দের দল;
জোৎস্না-অবসরে ছড়িয়ে দেয় লাল-দীঘিটার স্বপ্ন।

ছায়ায় বসে হেসেই চলে বামুন-সময়
ঘুমন্ত এ অভিমন্যু-চরাচর!
শেষ ট্রেন ছুটে চলে রাশ ছিড়ে
পেরিয়ে কত নাম না জানা বন্দর!

তবুও ঘিরে রাখে কিছু চন্দ্রবিন্দু-উপাখ্যান
ভৌতিক পরগাছা-সময়ের উঠোনে।


মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

দীর্ঘ কবিতা - মর্তুজা হাসান সৈকত

ডিসেম্বরের চিঠি
মর্তুজা হাসান সৈকত


প্রিয়তা,অবশেষে লিখছি তোমায়, অবশেষে, কেননা না
লিখার ইচ্ছেটাও কম ছিলোনা একেবারে ! লিখছি
তবুও, ইন্টার ভার্সিটির স্বপ্নরঙিন
জীবন পেরিয়ে এলে, আসা অনাকাঙ্ক্ষিত সেই ব্যাধিটার পর ! এ
সময়টার ভেতরে কত জীবন ঝরে গেলো জীবনের এই নন্দন কানন থেকে কিংবা কত জীবনের আবির্ভাব
ঘটলো তোমার আমার চারপাশেতাঁর কোনো হিসেবইনেই আমার কাছে ! হিসেব পাবেনা অজস্র নির্ঘুম
রাত্রিগুলোর অনির্বাচিত প্লাবনেরও । আজ আমার প্রস্থানের এই মধ্যরাতে মাটির বুকে জন্ম নেয়া
ঘাসফুলগুলো অবিরাম ভিজছে শিশির ফোঁটায় আর জানালার পাশে বসে তোমাকেলিখছিবিদায়ের এই চিঠি।

আজ এই সন্ধিক্ষণে, প্রস্থানের এই
মধ্যরাতে আমার, স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে ভেসে উঠছে দিনগুলো আমাদের,
আমাদের দিনগুলি সেই, ভেসে উঠছে
রিলের মত সিনেমার ! মনে পড়ছে এই শহর কেবলই,
ইট-কাঠ-সিমেন্টেও বড় মমতা জমে যায়,
আহা ! মনে পড়ছে বছর ছয়েক আগের সেই ডিসেম্বর, স্মৃতিময়
এই স্টেশান।মনে
পড়ছে আমার সেইপদার্পণ, সেবার বরিশাল ছেড়ে আসা ।সে রাতে বরিশাল
ছেড়ে আসা নাইটকোচেটা একেবারে শেষরাতে পৌঁছেছিলো তুমিময় এ স্টেশানে এসে । পৌঁছেছিলো
ভোর ছুঁই ছুঁই রাতে। তখনো শিশির ঝরছে, ঝরছে টুপটাপ স্বরে ! সে রাতেমিরপুর ১০ এ
ফেরার রিক্সা
কিংবা সিএনজি না পেয়ে, ভোর
অপেক্ষায় তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম শিশির ঝরে ঝরে ভিজিয়ে দিচ্ছিলো
কীভাবে পিচঢাল রাস্তা, ভিজিয়ে দেয় কিভাবে স্টেশানেথরে থরে দাঁড়িয়ে
থাকা বাসগুলো । ল্যাম্পপোস্টের
সোডিয়াম আলোর সাথে গাঢ় আঁধারির মেলামেশা দেখে সেই রাতেই ভাবনায় প্রথম এসেছিলো-, এই বুঝি
জীবনেরই ধ্রুবচিত্র ।সেই শেষরাত গড়িয়ে
এলো এরপরএই মধ্যরাতে,
আমার তোমার খানিকটা সময় পেরিয়ে !

জীবনের বাঁকে চলতে চলতে এরই কোন ফাঁকে যে বসেছিলেহৃদয়ের কার্নিশে এসে তুমি ! বসেছিলে লিচুর
ডালে বসে যেমন চঞ্চলা চড়ুই, তেমনই
ক্ষণেক ; অতঃপর স্বপ্ন-সম্ভাবনার স্পর্শে কীভাবে কীভাবে
যে এঁকে গেলে ভালোবাসা, গেলে যে কখন কীভাবে এঁকে সেতো আমার কাছেই জন্মান্তরের বিস্ময় !
কতকিছু হলো জীবনের
এই খেয়াঘাটে এরপর; হলো দু’জনায় আমাদের ! কতকটা পথএরপর একসাথে
হাঁটতে হাঁটতেতুমিও যেদিন একলা হাঁটতে শিখলে একলা হেঁটেই ছুঁলে বিপরীত মেরু, সেই দিন আমিও
বুঝেছিলাম জীবনগুলো কেনো বয়েযায় মহাদেব সাহার যমুনাধারা, বয়ে যায় কেনো ! রক্ত আর মাংসের
দাহে সেইদিন কতটুকু জ্বলেছিকিংবা কতটুকু জ্বালাতে চেয়েছিলে, সেইসব হিসেবে না গিয়েই আজ রাতে,
এই মধ্যরাতে, আমিআমি চলে যাচ্ছি ।চলে যাচ্ছি কী পেলাম কিংবা কী হারালাম সে হিসেবে না
গিয়েও !

চিঠিটা যখন হাতে পৌঁছবে, দূরত্বের হিসেবে ব্যাবধান তখন তিনশত পঁয়ষট্টি কিলোমিটার । পাঁচ মিনিটের
দূরত্বে থেকেও যে আমরা পৌঁছেছিলামমঙ্গল গ্রহের চেয়েও অধিক কোনো দূরত্বে সে দূরত্বের কাছে
এতো নিতান্তই নগণ্য ! সামান্য একটা টিকিটে দূরত্বের কী রূপই আর আঁকা যায়, কীইবা আর এঁকে যাচ্ছি
বলো ? তবুও এই সন্ধিক্ষণে, সন্ধিক্ষণে এইস্মৃতির জানালায় ফিরে ফিরে আসছেযৌবনের রঙে রাঙানো
ঝলমলে নকশাগুলো, ফিরে ফিরে আসছেআমাকে এক পলক দ্যাখার জন্য তোমারঅন্তহীন অপেক্ষা,
অভিমান, অনুরাগগুলো ।ফিরে ফিরে আসছেআমাদের পাঁচ বছর, ফিরে ফিরে
আসছে ! আজআমি এই
লেকের জলে ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছি সেইসব অভিমান, অনুরাগগুলো, ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছি সেইসব দিনরাত্রি
আমাদের, যাচ্ছি! তোমার আমার এই দূরত্বটুকু অজস্র জীবনেও অতিক্রম হবেনাআর ; হবেনা কোনোদিনই
আমাদের ! দূরত্বের চেয়েও দূরত্বের এই দূরত্বটুকুআক্ষেপের কাঁটা হয়ে নাহয়অনতিক্রম্যই থাকল এক জীবনে!

সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৩

দীর্ঘ কবিতা - সৌমনা দে

জন্ম সৌমনা দে

ও মরে গিয়ে একটা পাখির জীবন পেয়েছে।
আমার জানলার কাছে এসে রোজ -
আমায় একলা পেলে
কিচির-মিচির গল্প করে যায়ে ।
ও এখন আগের থেকেও বেশি খবর রাখে
তোমার- আমার।
পার্লামেন্ট অথবা গোপন বৈঠকের .........
আগের চেয়ে অনেক স্বাধীন যে এখন
নীল আকাশে ডানা মেলে উড়ছে ।
লোকের ঘরে দিব্যি উঁকি দিচ্ছে ।
মানুষ-জন্মের মেকি লাজ যে নেই এখন।


ওকে বলেছিলাম,
এমন উশৃঙ্খল কাজ
কেবল বিপদ বয়ে আনে।
পাখির জীবন পাখির মতই
সরল কাজে-
ওড়া, ঘোরা আর ঘর বোনায়
কাটুক ।
মাঝে-মাঝে আকাশ বেড়িয়ে বাঊল হবার সুযোগ তো রইলই ।


শুনলোনা।
 

একদিন ...... আর আসে না। আসে না।
খবর পেলাম, কোন এক দরদির হাতে নাকি খুন হয়েছে।
সকালের ময়লা তোলার গাড়িতে নাকি
body মর্গে গেছে।


পাখিদের মরণের তদন্ত হয় না...
মানুষ জন্মের সব কথা কি ওর মনে ছিল??
সেই যেবার রাত করে ফেরার পথে
অন্ধকারের বুক চিরে
কয়েকটা মানুষ-জন্তুর উল্লাস,
খাওয়া-খায়ি।
আর তারপর দু'দিন বাদে
গঙ্গার বুকে একটা ঠাণ্ডা শরীর ।
সেবার তো কোন প্রশ্ন ওঠেনি ।
তদন্ত , উঁহু , হয়েনি।
 

আমি চাই
পরেরবার ও পিঁপড়ের জন্ম পাক।
যেন , মরার আগে একটা কামড় দিতে পারে ।
তদন্ত - খুনির প্রতি
শোধ নিজের হুলে ।
 

একটা পিঁপড়ের অপেক্ষায় আছি ।

শুক্রবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

দীর্ঘ কবিতা - রেজওয়ান তানিম

 
কলম যোদ্ধা
রেজওয়ান তানিম

হাহ, আজ আবার হাতে নিয়েছি কলম!
কত দিন পরে ঠিক মনে নেই-
হয়ত বছর তিনেক হবে। বা আরো বেশি
অবশ্য এর কারণ এই নয় যে;
পুরোনো ধাঁচে, পুরোনো সুরে, সেই পুরোনো
বিষাদক্লিষ্ট মন নিয়ে, সেই গানগুলি আবার গাইব ।
যাক সে কথা, আগে বলে নেই, কেন ছেড়েছিলাম কলম আমি
তার কাহিনী।

বছর দু তিন আগেকার কথা।
তখন আমার পঁচিশ কি ছাব্বিশ বছর বয়স।
স্বীকার করছি, সময়ের চেয়ে ছিলাম
অনেক বেশী অপরিণত। নইলে এত মিছিল, মিটিং
দাবি আদায়ে এত মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম দেখেও
আমি ছিলাম নির্বাক, নিশ্চুপ! নিয়মিত ক্লাস নেয়া
সন্ধ্যায় লেখালেখি - কেটে যেত নিরুত্তাপ জীবন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের এত উত্তেজনা, মিছিল করা দেখে
মনে মনে বলতাম, ছেলেমানুষের দল!

ওদিকে আপামর জনতা, রাজনীতিবিদেরা হাতে মেলালেন হাত,
ছাত্রনেতাদের কণ্ঠ হয়ে উঠল অগ্নিঝরা।
বর্ষার ফুসে ওঠা, দুকূল ছাপানো পদ্মার জোয়ারের মত
বাড়ছে আন্দোলন, সবার মত মলয় বাবুরও বাড়ছে দুশ্চিন্তা।
আমায় বললেন তিনি; আনিস সাহেব, দেশের খবর রাখেন?
আমি নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলি, রাখি তো ।
ইয়াহিয়া ক্ষমতা ছাড়বেন, বঙ্গবন্ধু হবেন প্রধানমন্ত্রী ।
কল্পনায় ভাসবেন না, থমথমে মুখে বলেন
মলয় চক্রবর্তী, যুদ্ধ আসন্ন ।

এরপর এলো কালরাত, অন্ধ বিভীষিকা, মারণাস্ত্রের
নগ্ন হুংকার ঢাকার আকাশে বাতাসে।
একাত্তরের পঁচিশ, সে রাতে আমি ঢাকায় ছিলাম না।
পরদিন এসে দেখি, ঢাকার রাস্তায় ছোপ ছোপ
জমাট রক্ত। ইকবাল হল, জগন্নাথ হল এখন ধ্বংসাবশেষ ।
আকাশে ওড়াউড়ি একদল হাড়গিলে শকুনের।
আমি ঘরের পানে পা বাড়াই, দুঃশ্চিন্তার ডালি নিয়ে।
ফিরে দেখি, মেঝেতে লুটানো মা’র কাতরানো, বোনটি ঘরে নেই।
ছোট ভাই’টার হাতে ধরা কোরআন, শক্ত নিথর লাশ তার
দেয়ালে হেলান দেয়া, খোলা চোখে কি বীভৎস ভীতি!
আমি স্তম্ভিত, চেয়ে দেখি-বাবার রক্তে ভেসে গেছে
ঘরের মেঝে। আমি ভুলে গেলাম কাঁদতে, এ কী নিষ্ঠুরতা,
ভাই হয়ে ভাইয়ের রক্তহরণ!

আমার বিবেক আমায় দিল ধিক্কার, তীব্র হুংকারে
বলল আমায়, কাপুরুষ তুমি ।
জেগে ওঠো, শক্ত করো তোমার পেশী গ্রন্থি। ছাড়ো কলম
তোলো অস্ত্র। জানিনা কোথা হতে এলো এত সাহস,
এই সাদাসিধে আমার প্রাণে, নিরস্ত্র আমি
যুদ্ধে নেমে পড়ি। কী দিয়ে যুদ্ধ করেছি,
সে প্রশ্ন একান্তই অবান্তর আজ। কেননা হৃদয় দিয়ে যে যুদ্ধ হয়
তাতে অস্ত্রের দরকার পড়ে না! সামান্য বিস্ফোরক তখন
হয়ে ওঠে ধ্বংসাত্মক, আর্জেস গ্রেনেডকে উড়িয়ে দেয় এক ফুঁৎকারে।
দোলনা রাইফেল তখন হারিয়ে দেয় একে-৪৭ কে।
মনে পড়ে - সেই গাঁয়ের বধূর কথা, যার ঘরে একবেলা
খেয়েছি ক্ষুধার অন্ন। আপনি খাবেন না
জিজ্ঞেস করতেই, হাসি মুখে উত্তর তার-
আপনারে খাওয়াতি পারলাম, এই মোর পুণ্যি।
ফিরবার সময় ফিরবার সময় তার কান্নার ধ্বনি
ভগবান আপনাগো ভালা করুক- এই যে ভালবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ
জাত-পাত, ধর্মের বিভেদ ভোলা বাঙালির এক সুর;
সেই শক্তি মারণাস্ত্রের থেকে শক্তিশালী হাজারগুনে!
সে লিখল, বিজয়ের ঐতিহাসিক মহাকাব্য।

যুদ্ধ শেষ, দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠার দিন হল শেষ।
তথাকথিত বিজয়ে সবাই খুশি। কিন্তু আমার জীবন যুদ্ধ
চলতেই থাকে। সে আমায় গুপ্ত হন্তারকের মত
আঘাত করে নিয়ত, পিছন থেকে। বারবার মনে আসে
তার উপহাস ভরা কথাগুলি, কলমের দাসত্ব করে
কী পেলি? যাও বা পেলি, হারালি তো সর্বস্ব।
সত্যিই তাই-মায়ের পঙ্গুত্ব, বাবা, ভাইয়ের মৃত্যু
বোনের সম্ভ্রমহানি; আমারই ভুলে আমারই অবহেলায়।
অনুতাপে জর্জর আমি ছেড়ে দিলাম চাকরি,
ছাড়লাম লেখালেখি।

তারপর বছর খানেক যেতে না যেতেই দেখি
আবার যুদ্ধের ডাক! একী অনাচার, অবিচার-
বজ্রগর্জনে হুংকার দেয় সরকারি চাটার দল।
কবিরা লেখেন কবিতা - ভাত দে হারামজাদা,
সিরাজ শিকদারেরা হারায় ক্রসফায়ারে।
ছোট্ট শিশুর ক্ষুধার অন্ন জোটে না। গরিবের কম্বল
শোভা পায় চেয়ারম্যানের দামি খাটে। সামান্য খাবার নিয়ে
মা শিশুর কাড়াকাড়ি, মায়েরই ঢিলে মৃত্যু হয়
অভুক্ত সন্তানের। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস চারিদিকে;
আমায় নাড়া দেয়। আমার বিবেক জাগ্রত করে।
সে বলে, আবার এসেছে যুদ্ধ তবে ভিন্নরূপে।
এবারে কোন দৃশ্যমান শত্রু নেই, এবার যুদ্ধে জয় পাওয়া
হয়ত অনেক কঠিন, তবু এগিয়ে যাও লেখনীর যুদ্ধে;
কলম যোদ্ধা তুমি। তুলে ধর অন্যায় যত
তোমার লেখায়।

এই আমার দ্বিতীয়বার কলম ধরবার কাহিনী!
এবারের যুদ্ধেও আমি ঢেলেছি হৃদয়ের সবটুকু। একাত্তরে
অস্ত্র ছিল হৃদয়, তাই সে ছিল বল্লমসম লক্ষ্যভেদী।
আজও সেই আমি নির্ভয়ে নেমেছি অন্যায় দমনে, সত্য উদ্ধারে ।
হয়ত এ যুদ্ধ বিশাল দীর্ঘস্থায়ী, ক্ষয়ক্ষতি সীমাহীন;

তবু চলবে আমার যুদ্ধ। কারণ এ যুদ্ধের জয়েই
লেখা হবে বাঙালির সমৃদ্ধির ইতিহাস। যেমন একাত্তরে

লেখা হয়েছে আমাদের আত্মপরিচয়ের কথা। এবার
আমাদের জিততেই হবে, হেরে গেলে আমরা বিনষ্ট হব;

হারাবে আমাদের জাতিসত্তা। তাই এ যুদ্ধ
আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ।

বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১২

কবিতা - পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত

পাত্রভরা প্রেম
পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত


-১
-


আমার সোনালি প্রেম প্রথমদৃষ্টিতে চমকপ্রদ আল্লাকে পুনরায় গোলাপ
সুপুরুষ কবির কাছে গোপনকথার মধ্যপর্বে প্রেমাতুর এই দুষ্টুমি,
চিঠির ভাঁজে ঘুমিয়ে থাকলো রিনির ঈর্ষা রিনির নৌকো
সাহসীকল্প মেঘের মুদ্রা।আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও কখনো যাবো না।
ক্রমে চিহ্ন দিলাম দেয়ালে টাঙানো হলো ছবি একটার পর একটা
রিনির উনুন, রাত্রির অভিপ্রেত, বেশি বাস্তব প্রতিশ্রুতি আর প্রথম ফটোগ্রাফ।
আল্লার কি শক্তি খুঁজে পেয়েছি খুঁজে পেয়েছি এক মহাদেশ দৌড়ে এলাম
পিয়ানো গোলাপজল দীর্ঘসন্ধ্যা পূর্ণতার অদম্য স্পৃহা
দুই ভিন্ন বয়সের টানাপোড়েন নেই ছবিগুলোর বিশেষ ভঙ্গি লটকে আছে
একটুকরো আমার ছবি আর কিছু নেই রিনির হাতে বৈধ আমি প্রথম শরীর
অপ্রতিরোধ্য আমি সবুজ হৃদয় অসীম সম্ভাবনার কবি
স্রোত মিশে যায় আমার বুকে আল্লা-কসম মুখ লুকিয়ে থাকবো না আর,
রোমাঞ্চ রং চাঁদিনী রাত মন্ত্রমুগ্ধ আবেগ ঘেঁষে পুণ্যশ্লোকের হচ্ছেটা কী
দ্রুতগতির এই যে প্রেম রিনির নিরাময় তো হলো
ও শ্লোক ও শ্লোক ভ্রমণে চলো অসীম উৎসস্থলের দিকে
যাই ঘটুক না এই জীবনে আমার রিনি ক্লেশ জানে না আধ্যাত্মিকে
জাগিয়ে তুলছে কবির দেহ মনের বাষ্প শীতের জীর্ণ তাৎক্ষণিকে
এটা অ্যাবসার্ড এটা অ্যাবসার্ড হচ্ছেটা কি ট্রাফিক পুলিশ অতিপ্রাকৃত

আমার সোনালি প্রেম প্রথমদৃষ্টিতে চমকপ্রদ আল্লাকে পুনরায় গোলাপ


-২-


লেখার প্রসঙ্গ এলে খুনসুটি রস অচেনা সুঘ্রাণ
মেনু কার্ড জুড়ে ঈশপ ঈশপ উট চলে গেছে জাহান্নামে
ক্রমশ নিজের কবিতারা যেন একটি জগৎ সুদূর অতীত
ইচ্ছেমতো বিবৃতি দেবো না বিবরণী নেই বিষণ্নতায়
অলিভ অয়েলে স্থূলকায় চুল খুঁটিনাটি লিখি প্রেমিকা যা চায়
বাগানে বসেছি রিনির বাগান লয়লামজনু সারল্য খাই
খুঁজে না পেলে কি ঈশ্বর দেবে দেয়ালঘড়িতে প্রেমের ম্যাপ
আমার রিনিকে বহুশতাব্দী-ব্যাপ্ত রেখেছি ভালোবাসায়
কথাকার নই নির্যাস রাখি ব্যতিক্রমী শব্দের রং
এখন শৈলী লেখার কফিতে দাও গো উগ্র পেয়ালা্র ওম
মজা দিয়ে লিখি তোমার জাদুতে তাজ্জব কিছু মৃগয়া লাফ

এপিসোডের পর এপিসোড আমি লিখে চলেছি, অহো
আমার রিনির আগুন জানো কি অগ্নিবর্ণ বিবিধ দৃশ্য!
মাখো মাখো প্রেম ফ্ল্যাশব্যাক নেই এই তো সেদিন
গালিব গালিব কাফকা চামচা,প্লেটনিক বলে হয় না কিছুই

খুলে দিলাম নতুন জগৎ এই নাও কল্পস্বর্গ আধুনিক ব্লু
গভীর চোখের কাছে আমি শান্ত আমি ছিন্ন হারিয়ে ফেলেছি মায়াজাল
ও তুলে বিন্যাস দিলো জীবনের অনিবার্য গোপন রূপ তার তৃতীয়-ইমেজ
তুলে দিলো আনন্দজীবন
খারাপ বা ভালো সে সব গুলি মারো


-৩-
মসলিনের বাজার এসেছে ঘুম জড়ানো প্রেম এসেছে স্বর্ণমুদ্রা খোশমেজাজ
আরাম করে নিচ্ছি ঘরে রুমাল উড়াই মকাইবাড়ি পিকোফিনিংস
রিনি রোমের রসিকবিলে অতলান্ত নিঃসঙ্গতা আমার অনুষঙ্গে শিরায়
আরবি ঘোড়া আমিই ছিলাম এক কোটি চার বছ্রর আগে দৃশ্য আছে
অতিপ্রাকৃত জ্যোৎস্নাখন্ড স্তরে স্তরে রূপক ছিলো নিজস্বতায়
লায়লা অতি সরল এবং মজনু লেখে তর্কগুচ্ছ,নিউরোলজি
প্রেমের কলসি উদ্ভ্রান্ত মতো কোন দিকে যায় কোন পাহাড়ে ফুটলো অরেঞ্জ
ভুট্টাক্ষেতের মাথার উপর জীবন আমার জ্যোৎস্না আঁকে অস্ফুট রঙ চার ভঙ্গিমা
হঠাৎ হঠাৎ ডুব মারে লাল-রঙ্এর পাখি রিনি তাদের সুপুষ্ট ফল লম্বা-লাটাই
হায় জানালা প্রেমের বাহুযুগল তুমি গলি-ঘুপচি ক্যান-ওপেনার ফান্টা-সিরাপ
উত্তরণের প্রত্যাশা তাই নতুন স্মারক, রিনি আমার নিবিড়-পাঠ মধ্যে আছে
রিনি আমার আখ্যানে ঢেউ কথক-তোরণ, রেশম-সুতোয় অধুনান্তিক প্রমাণ মেলে


-৪-


আমি বুঝলাম কল্পনার চেয়েও অদ্ভুত প্রেমিকার আভ্যন্তর
অধৈর্যে নিস্তব্ধ থাকলাম ৩প্রহর,ভ্রূ কুঁচকে লিখে ফেললাম
অদম্য ঠোঁট,চুমো খেলাম অনেক তুখোড় শরবতে
রিনি কোথায় রিনি কোথায় পোর্টিকো নেই দরজা খোলা
ভুল রাস্তায় যাচ্ছে না তো! পৃষ্ঠাগুলো ভীষণ খালি
এক ওয়াগান ফুলের পোশাক আকাশপ্রমাণ আয়না নীরব
পাত্রভরা অলংকরণ আনুগত্যে ভাসছে মেঘের কোঁকড়ানো চুল
খুঁটিনাটি ব্রোঞ্জ-সেরামিক,কলমকাটা ছুরির হাতল,
গোপন কিছুই থাকলো না আর তৈরি হলো একটি কোলাজ
গোপনকথার ঝলমলে ঝাড় জ্বলছে নিভছে আমার মুখে
রিনি কোথায় রিনি কোথায় যুদ্ধ থেকে ফিরবে কখন?
ঘোর লাগা ঘুম অভিজ্ঞতা চিরকালীন পদ্যে আছি।
শ্লোকের মন্ত্র হায় বেচারা, ঘুমপাড়ানি গানের মাছি।
স্মারক তবে এই যথার্থ রক্ষণশীল হোক না শয়ন
সুন্দরী সে আত্মমুগ্ধ প্রেমে পড়েছে মিনিয়েচারে
কাব্যবন্দি থাকুক না সে উসকে দিলেন গালিব শ্লোকে
লাজুক নম্র ইচ্ছেমতো ফুলের কুশন কফির ফুর্তি সামলাবে কে!
অন্বেষণের আর কি বাকি রোমান্সভরা কাব্যে আছি।

শনিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১২

কবিতা - পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত

লাফিয়ে উঠলো আকাশ
পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত



মাধুরীলতার কুসুমিত রং আমাকে ক্ল্যাসিক ভালোবাসা দাও
আমি বিদিশার আধুনিকতায় আকাশের নীলে নিখুঁত মিশবো
এক-এক-ঝাঁপটা বৃষ্টি মাখবো মুখের অ্যাপেলে অন্তহীন
উল্কিতে রঙ বাউদিয়া রূপ কার্পেটে মোড়া নতুন পৃথিবী
ফসল তুলবো আকাশের গা্য গুলাব-জামুন চার পেগ হাসি
ফসল তুলবো ভ্যানিলা-আইস লেমন-জুসের সাবেকিয়ানায়
সসপ্যান থেকে সসপ্যানে রং চিনির কিউবে নাট্যরস
তরবারি হাতে যুবক এসেছে মেহগিনি রঙ যুবক এসেছে
শুনতে পেলেন মোহনবাঁশিটি আনন্দরূপ যুবক এসেছে


পাহাড়চুড়োয় লাফিয়ে উঠলো আকাশ এই ছবি শুধু আমিই দেখেছি
অচেতনের আবডালে দৃষ্টি বিনিময়ের উচাটন
ওখান থেকে মাত্র এক কিলোমিটার স্বপ্ন
সন্ধ্যে নামার আগে সামনের বাগানে আগলে রাখলাম উদ্বেগ
এর পরই সোনালি স্বাধীন ঝড়ো পাখির গান আমি শুনলাম
সূর্যাস্তের জীবন ঘোলাটে আয়নার মতো
এর মধ্যেই আমার খয়েরি নেট-ওয়ার্ক বরোদা থিরুঅনন্তপুরম
স্রেফ যেন প্যারিসের যুবক আমি
সদ্য ফোঁটা ফুল গোলাপি ইউরোপ
আমার ক্যামেরায় ক্লিক-ক্লিক শব্দ হয়না থ্রিডির স্ট্রবেরি
সে ছবি তোলে ক্লিপ-লিপস্টিক,সি-বিচ মোহভঙ্গের কাউন্সেলিং ,ছবি তোলে
অর্থপূর্ণ হাসি, সাদা পায়রা, ছিন্নভিন্ন জোনাকি
এরা আমার চিঠির বাক্স নাট্যশালার গান আইপড,
যেন সে একটি ফুলের দোকান ইচ্ছে মতো নকশা কাটে
যেন সে তরবারি কষ্টিপাথরে লাভমেসিন
হঠাৎ ঢুকে পড়লো ফ্যান্টাসির চোরচুন্নি, ঝাঁপিয়ে পড়লো স্থিতপ্রজ্ঞার আলো,
আমি নীরবতার স্রোত জাপটে ধরি আর তখুনি দেখতে পাই
খাঁচার পাখি ঝুমবরাবর ক্ষিদের জ্বালায় মরে,
লাফিয়ে উঠলো ইমোশনাল আকাশ, আমার নতুন প্রেম
বুকের ওপর গড়ে উঠলো বেখেয়াল টেবল-টেনিস,
অ্যাটলিস্ট সঠিক সমস্যার কথা বলো-
নিজের ফিলিংস


দু’টুকরো অবসাদের রজনী তোমাকেও সুর মেলাতে হবে
নিরিখে নিরিখে জীবন নিরিখে নিরিখে ডার্করুম
ও আমার পাগল প্রত্যাশা, বিষয়ব্যাঞ্জনার স্কুল,
এক অধরা স্বপ্নের পিছে পিছে ঘুরপাক , চিঠিতে অবশ্য এ কথা ছিলো না,
চিঠির দাহ্য ঝলকে ঝলকে মিশে গিয়েছিলো সুপারসনিক,
রিচুয়া্ল, তবু সন্ধেবেলায় একটি চুমুর তোলপাড় যেন হারিয়ে না যায়-
যেন হারিয়ে না যায় মেট্রোস্টেশন, ভিড় ঠেলে ঠেলে টার্মিনাল..
যেন তন্দ্রা-রঙের বাথটাব এলো পাপড়ি জড়ানো অধরা মানুষ
স্বপ্ন ভেঙে না যাবার গান গাইতে গাইতে এলো
রূপকথার চারটে সাদা মায়াপরি


মাধুরীলতার কুসুমিত রং আমাকে ক্ল্যাসিক ভালোবাসা দাও
আমি বিদিশার অঙ্গন ছুঁয়ে আকাশের নীলে নিখুঁত মিশবো
এক-এক-ঝাঁপটা বৃষ্টি মাখবো মুখের অ্যাপেলে ইন্টিরিয়র
উল্কিতে রঙ বাউদিয়া রূপ কার্পেটে মোড়া নতুন পৃথিবী
ফসল তুলবো আকাশের গা্য গুলাব-জামুন চার পেগ হাসি
ফসল তুলবো ভ্যানিলা আইস লেমন জুসের সাবেকিয়ানায়


কীভাবে অতিক্রম করি এই পরিচয়, জীবনের রঙ ।
পৃথিবী উত্তেজনার দশদিক স্কিজোফ্রেনিয়ার সাইকেল ছুটছে আকাশের গায়
জীবনের আরও একটা রঙ এক দিগন্ত ক্লাইম্যাক্স আমি উপরের প্রহরায়
অ্যানিমেশনের পাগল তোমার টুপিতে বাজপাখি
আমি ছড়িয়ে পড়লাম তোমার মিউজিয়ামে
অ্যান্টিক স্রেফ অ্যান্টিক নাকি সম্রাট স্বপ্নের হলিউড না আমি সিনেমার ওয়েস্টকোট
আলো জ্বলে উঠলো, ক্যামেরা প্রস্তুত , বিস্তীর্ণ বিলাস ,
যুবতী মনের আমিই তো সম্রাট বসন্তের প্রিন্স আদ্যন্ত দানাহীন আঙুর


এক পাত্র মদের সামনে এক ইঞ্চি আপেল আর আমার ঈগলচিহ্নিত ঢাল
কৌশলের উপর ষোলো আনা জাদুর রাজনীতি ,নৈশ কফির ছিমছাম স্ক্রিন
আমি বিদিশার আঙুল আমি বিদিশার মেকআপ ব্ল্যাকটপ বিকেলের ফুচকা
রঙে ঢঙে তাকে সাজিয়ে তুললাম ইমাজিন , মেটালিক , মার্বেল-ফিনিশ
ও আমার ইলিউশনের ইলিউশন লুকিয়ে কথা লাগামছাড়া ত্বকের সঙ্গে
ও আমার তুখোর বাতাস ঝকঝকে মার্কেট কর্পোরেট ডিজাইন
কঠিন সাফল্যের আর্ট ,আমি মিশে যাই ঝোলানো রূপকথার আঁচে
নেমে পড়লাম এক গামলা ফলের রসে ,পিয়ানোঅ্যাকর্ডিয়ান বেজে উঠলো
বিদিশা আমার বিদিশা আমার ভারাক্রান্ত প্রেমিকা , চেক-ইন করবে কি আজ


আমার হিসেবের মধ্যেই ছিলো মেলে ধরলাম ফ্রুটজুস
শরীরের কাউন্টারে খুলে দিলাম নতুন রেস্তোরাঁ
গ্যালারির চারপাশে বাগিচায় রেখে আসলাম পাখির ডেকোরেশন
লিলি আমার প্রথম প্রেমিকা গান গাইতো ক্রিসেন্থিমাম
গোলাপি জল ছিটিয়ে বলতো ,’এই আমার প্যারিস এই আমার শ্যাম্পেন’
আমি বিদিশার ঘরোয়া আড্ডায় নতুন সেলিব্রিটি , ও আমাকে ইচ্ছেমতো
হিম-ভোদকার সঙ্গে মিশিয়ে দিলো মোক্ষম স্কিজোফ্রেনিয়া
আমি উত্তেজনার কমপ্লিট বিড়বিড় আমি আধবোজা প্রেশারকুকার
আমি প্রিন্টআউট কবিতার কপি
বার বার ভেঙে যাচ্ছি আমি
সসপ্যান থেকে সসপ্যানে রস চিনির কিউব


এমন কি চাপা গলায় যেন আমি ডিপ্রেসড ,কিছুতেই ইন্টারফেয়ার করিনা
তবু হায় আল্লা, পুরনো ভালোবাসার সেই তো আকাশভাঙা বৃষ্টি
শাল-বাগানের নীচে তোমার নতুন আকুতি বিদিশা নিখুঁত
আমি কথার ঢঙে নতুন সেলিব্রিটি কী বলবো আবেগে আপ্লুত
চিকচিক করছে আমার রোমাঞ্চ ডিসিশন নিতে পারছিনা লিলি না বিদিশা
নাকি সদ্য যুবতীর নামমাত্র প্রেম
আমার ফিটনেস প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় সেখানে
একদিন এক দুপুর-বিতানে দেখা হলো সানন্দার সাথে
ম্যাগাজিনের সব ক’টা কবিতার রাখিপূর্ণিমা চিংড়ির মালাইকারি
আমি আহ্লাদে নতুন বয়ফ্রেন্ড ,জীবনের স্রোত আমাকে মিলিয়ে দাও ইভিনিং-প্যারিস


প্রেমে পড়ুন
এই এক চিলতে জীবনের সঙ্গে
এই এক প্যারিস বান্ধব
এই এক নতুন ময়েশ্চারাইজার ওয়াটারমেলন
এই তো আপনারই গার্ডেন ফ্লাওয়ার
প্রেমে পড়ুন

১০
আমি ফিরে যাই কল্পনার কাছে
আমি ফিরে যাই স্বপ্নার লিভ-টুগেদারে
আমি আমার দাম্পত্য রেখে আসি চল্লিশ বছর আগের অ্যাবসোলিউট
ফ্রিডমের কাছে ,আমি কী গালিব নই গজলের গ্ল্যামার নই আমি পাখি
ইউনিক বিন্দাস আমার কবিতা

১১
তোমাদের সামনে আমি তুলে রাখলাম আমার এই বাহানাগুলো
বাহানা অথবা এ আমার অ্যাকটিংও হতে পারে
আমি এক্কেবারে না-পসন্দ কথাগুলো কিছুতেই বলতে পারিনা
ও আমার সানন্দা একদিন আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলো এখন নিজেই আউট
ও আমার রজনী,প্রেশ্যা্স,আমার কবিতায় হাসিখুশি টিপস, এখন রুপোর কয়েন
প্রচুর ভালবাসার অত্যাচারে আমি আর নিজেকে চিনতে পারছি না
আমি দু’হাজার মাইল রণপা নিয়েছি চার হাজার মাইল ব্যাক-স্ট্রোক
আমি কী গালিব নই আমি গজলের গ্ল্যামার নই ,আমি পাখি ইউনিক বিন্দাস..


কবিতা - সৈকত ঘোষ


7megapixel রাত
সৈকত ঘোষ


রাত পৌনে বারোটা :
আমার ব্যালকুনির বাইরে তাকালে
যা যা দেখা যায়
ইনসেটে ছোটো ছোটো কয়েকটা চিত্র তুলে দিলাম ...

সামনের ফ্লাটে ইশিতা , ঘর প্রায় অন্ধকার
পর্দার ফাঁক দিয়ে নাইট ল্যাম্প এর লাল আলো
গোপন গোপন খেলা খেলছে ...
বুকের তলায় নরম কোলবালিশ | হাতের আঙ্গুল
সদ্য কেনা গ্যালাক্সি ছুঁয়ে অচেনা শব্দশরীরে হাত বোলায় |
পিঠের কাছ থেকে উঁকিমারা অন্তর্বাস
আমাকে আর একটু সাহসী হয়ে ওঠার আবেদন জানায় ...
অনন্য অঙ্গের বিশেষ কোনো পরিবর্তন
না এলেও চোখের সামনে পরিচলন স্রোত বেশ উপভোগ্য |

রাত বারোটা পঁয়ত্রিশ :

স্ট্রিট লাইট এর নিচে একদল কুকুর
যাতা বাওয়াল করছে |
অনেকক্ষণ ধরে ওদেরকে দেখছিলাম কিন্তু
এখনো কনফিউসড...
কে যে কার কি বলা খুব মুশকিল |
তবে একটা কথা ওদেরকে দেখে বুঝলাম
বস ফান্ডা ভারি সিম্পল, পেলে লেগে যা

বাকিটা অপ্রযোজনীয় বিজ্ঞাপন |

রাত একটা দশ :
উত্তরের ফ্লাট ইচ্ছেডানার 2nd ফ্লোর
কাঁচের জানালা অর্ধেক খোলা ...
মনে হচ্ছে ভাজানোই ছিল। অবাধ্য হাওয়া একপশলা
দুষ্টু অনুভুতি নিয়ে ভেতরে ঢোকার সময়
একটু ফাঁক করে দিয়েছে
রাতের আলেয়া, আর নীল কুয়াশায় হাবুডুবু খেতে খেতে
দোমড়ানো মোচড়ানো শরীরের মধ্যে শরীর
তিরতিরে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে গভীর সুখ

আমার 30x জুমে ধরা পরে
তোমার 2nd হ্যান্ড যৌনতা ...

রাত একটা বিয়াল্লিশ :

সুন্দরী নারী শরীরের মধ্যে এদিক ওদিক
কবিতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে ...
দরকার মতো আঁজলায় একমুঠো রোদও তুলে নিতে পারো বা
ইচ্ছে করলে নিজেকে পোড়াতে পোড়াতে
আকোয়ারিয়ম নীলচে মাছ আর বড়রাস্তার
খাবিখাওয়া কুকুরগুলোর সাথে লিঙ্গ পরিবর্তন ...
কি এতটাই জরুরি?

এসব নিয়ে রিসার্চ করা ভগাদার মাথায়
এই এক অদ্ভুত ব্যামো
মাঝ রাতে বিরবির করতে করতে ব্যালকুনি ময় পায়চারী করেন...

জ্বলতে থাকে একটার পর একটা সিগারেট |

রাত একটা পঞ্চাশ :
ধুসর নষ্টতায় রাত, রাতকেই চেটে পুটে খায়
মৈথুন সুখ, স্বপ্নে লাল নীল ইথার সুন্দরী
রিক্সা স্টান্ডের পাশে একদল মাতাল বা পাশের
ফ্লাটের রানা ...
রাত মানেই নীলের নেশায়
শরীর শরীর খেলা |

রাত দুটো :
উপরের ফ্লাটের সরকার দা সরকারী চাকুরে
নাক ডেকে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন...
পাশের বাড়ির রাজীব রাতের আদর শেষে
বৌএর পাশেই শুয়ে
তবে হ্যাঁ ওর স্বপ্নে এখন অফিস এর নতুম মেয়ে সুইটি..

রিনা বৌদির মুখটা আজ ভার
ঘুমের মধ্যেও ভাবছেন প্ল্যান
কাল শাশুড়িকে কিভাবে জব্দ করা যায়...

রাত দুটো দশ :

একটা মেয়ে,
বালিশে মুখ ঢেকে কান্না লুকায়
কার কাছ থেকে জানিনা
সারা শরীরে পরম যত্নে চাঁদ, সূর্য, তারা আঁকা ...

উড়ুর নীচে গড়িয়ে পরা রক্ত
হ্যাঁ রক্তই তো

নিজের স্বাভাবিক নিয়মে নারীত্ব গড়িয়ে যায়
চাদরে বালিশে লেপ্টে আছে পুরুষ প্রকৃতি।

বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১২

রঙ্গীত মিত্রের কবিতা

আট ঘন্টার কাজ

১।
এইবার আমি বলে দেবো।এইবার আমি যত ভুল
এইবার বাছাই শুরু হয়ে গেলে
বড় বড় বাড়ির স্তন ধরে ঝুলে আসবো ।
যেভাবে একটি মেয়ের হাত ধরে চুমু খাচ্ছিলেন আপনি
আমি সেই রকম হিংসুটে পুরুষ ;
অনন্ত আপনার সব নারীদের কাছে না হলেও

আয়ুর্বেদ আমি গোপনে শিখে নিয়েছি।

২।
মাঝ রাতের রাস্তা
আমার আন্দাজ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
পাগলামি আড়ি করে যায়।
মেশিনের শব্দে ঘুম ভাঙে,
গাড়ির শব্দকে প্রেতাত্মা ভাবে কুকুরেরা।
সাদা রঙ লাগা ছবি, লিপিতে আবদ্ধ হয়।

৩।
অনুভব ফিরে পাওয়ার জিরো আওয়ার চাই,
নিজেকে মাপার স্বর্গ চাই।
পাহারাদারেরা আওয়াজ করছে।
অনিশ্চয়তা কেড়ে নিচ্ছে গুরুত্ব,
কে যেন আড়ালে থেকে করছে এগুলো ।
তাও ফাঁকা রাস্তা, নারীহীন নেশারু।
তবু আকৃতিহীন এটা কি?
নিজে কে না বুঝতে দেওয়া?

৪।
পায়ের নীচটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।বমি পাচ্ছে।শরীর ও বেশ খারাপ।মাথা ধরে আছে।ঘুম পাচ্ছে খুব।কিন্তু আমাকে কেউ বিশ্বাস করছে না।দুর্বল হয়ে যাচ্ছি সিদ্ধান্তের দিকে

৫।
ভালো কি মন্দ আমি নিজেই জানি না।তবে বন্ধুদের আলাদা আলাদা ভাবে হেঁটে যেতে দেখেছি।

৬।
নতুন কিছু একটা করার সুযোগের স্টেশানে ট্রেনহীন বসে থাকা

৭।
অপমান বার বার ফিরে ফিরে আসে

৮।
নিয়মের কাছে যেতে না ইচ্ছে করলেও যেতে তো হয়!

৯।
খুব ক্লান্ত লাগছে।মন খারাপ।কিন্তু যা জানতাম তা কি ভুল?

১০।
যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমশো বড় হচ্ছে ।আমাদের ইমোসানগুলো বেলুনের মত।বিক্রির খেলা চলছে।যোগ্যতা একটা প্রশ্নচিহ্ন বিশেষ।পুড়তে দেখেছি নিজস্বতাকে।আর @আন্তর্জাতিকতা ??

১১।
মেয়েরা লাইন দিয়ে খাবার কিনছে।আমাদের খ ই খ ই আনন্দ।জ্যামেটম সিমেট্রি ইত্যাদি...

বৃহস্পতিবার, ১ নভেম্বর, ২০১২

পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত

কৃষিবউ
পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত

কথাক্ষুধা ক্রমশ বাড়ল ...

শীত শেষ, গ্রীষ্মের বিকেল, বাতানুকুল এই চতুষ্কোণ গৃহে
মাখনের মতো নরম বিছানায় ভাতঘুম অপরিহার্য ছিল ।
ঘুমের রূপসি-পরিরা ঝিলমিল এই বাঙলোয় এসে ফিরে গেছে ।
নিভৃতে ঝিলের জলে নৌকো ভাসাবে তাই
দিবা স্বপ্নের মধ্যেও ভেসে এসেছিল কতো মাছ,রূপোলি রঙের সব মাছ...
স্লিপিং-সিকনেস দিয়ে আমাকে মেঘ ও কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের ওপাড়ে
নিয়ে যেতে চায় ঘুমের রূপসী পরিরা ,আমি তছনছ করি এই দিবা ঘুম ।
আরাম চেয়ারে বসে অবিশ্বাস্য আরবরজনী আমার হালফ্যাশনের কফিশপ যেন!
কিছু আগে নোলক পরা নাকে কৃষিবউ আইস্ক্রিমের বাটি রেখে গেছে ফ্যটলেস
হাল্কা টেবিলে ।বই-কাননের ঘ্রাণ শেষ করে আমি আজ
কথা সাগরের জলে সাঁতার কাটবো।

রংচঙে খেলনার মতো অনন্ত সুখের এই বাড়ি আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো নিরন্তর,
ইয়োলো দোপাট্টা এলো হাতে চা কাচের বাটিতে, যেন চোখের পলকে
মৎস্যকুমারী এক নেমে এলো ওই চাঁদ থেকে।
ওর গা থেকে ভেসে আসছে চমৎকার সুগন্ধ ,ঘুম জড়ানো গলায় ফিসফিস করে বললো-
‘প্যারিসের বিকেল,বুঝেছো হে পুণ্যশ্লোক, গন্ধের সৌকর্যে বসে আছি,একবার ,শুধু
একবার,স্ফূর্তিতে গায়ে মাখো,এই গন্ধবিলাস আপেলের ফলন্ত বাগিচা হবে তুমি।‘
মনে হলো ফুরফুরে বাতাস বইছে তার চোখে মুখে।
আমি তার গান শুনলাম হাওয়ায় এলোমেলো চুল রান্নার মেনু শুনলাম
আর ট্যুর-প্লান শুনতে শুনতে মনে হলো পাহাড় ডাকছে,
আর আমি শুনতে পেলাম যেন, কৃষিবউ গাইছে...
‘তাদের গাছে গায় যে রবিন পাখি তাহার গানে নাচে আমার বুক’-

কিছুপরে ঘুঙুর-পর্দায় শব্দ মেলে কৃষিবউ চলে গেলো ভিতরের ঘরে ।

নরম গালিচা বুঝি পারস্যের ! বেলজিয়াম থেকে আনা ঝাড়বাতি! বুঝি বিছানার
ঘ্রাণেও জেগে আছে প্যারিসের বিকেল ।
মৃদু আলো আসছে জানালার কাচ বেয়ে
আর এই একবারই ওকে আমি মনে মনে আনারকলি বলে কেন ডাকলাম ।
দেয়ালে দেয়ালে কতো ছবি, অবকাশ একাকীত্বের সাথী এরা,
উজ্জ্বল কুশনে পিঠ রেখে উপভোগ করি ।
আমি তার সাথে চাষবাস নিয়ে কথা বলি, সে বলে মণিকাঞ্চন কথা
উষ্ণ-উৎসাহ তার ক্রমশ এগুচ্ছিলো ভোগবাদে , সে দ্রুত মাইক্রোভেন খুলে
বের করে নিতে চায় চিকেন কাবাব বিরিয়ানি পোলাও
ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা কোকাকলা
তন্দুরি চুল্লিতে ধান সেদ্ধ,কৃষিবউ ভাবতেও পারে না।
মুহূর্তে প্যাটিস কেক পুডিং পকোড়া ফিস-রোল
কৃষিবউ দেখালেন সব, অলৌকিক ক্ষমতা তার
কতো মাছ ,রূপলি রঙের মাছ অ্যাকুরিয়ামে, মৎস্য কুমারীর মতো...
আহা তুমি কতো জানো কৃষিবউ –
গাজরের হালুয়া তুমি দিলে রূপোর বাটিতে
কি মিষ্টি, কি মোহনীয় তার স্বাদ গন্ধ
মোহ দিয়ে বুঝি তৈরি করেছো ! কৃষিবউ ।
কথা শুনতে শুনতে ফেস্টিভ-টিপট থেকে কৃষিবউ ঢাললেন ব্ল্যাককফি
বাদাম কুঁচির সাথে দারুণ কিশমিশ
খৈ খৈ হালকা ভুট্টার সাদা বিস্কুট।

খেতে খেতে ওয়াকিটকিতে বললেন কথা কৃষকের সাথে।
ধান-কাটা নিয়ে কথা ,বুঝি অভিমতো দিলেন স্বামীকে...
সোনালী জড়িপাড় শিফন দুপাট্টা হাসলো চোখে মুখে
কৃষিবউ শুনবেন কথা তাই গালে হাত দিয়ে ডিভানে ডোবালেন
কাঁধ থেকে পা...
আমিও শোনালাম আমার গ্রামের কথা , তিস্তার পাকদন্ডী বেয়ে আমাদের গ্রাম
চুপটি করে বসে আছে কাঠের ডাকবাংলো আর ভাসমান
কুয়াশায় উধাও পানিসাজ গাছের জঙ্গল
আমি শোনালাম গৃহস্থ জীবন ,রাখলের বাঁশি,গরম দুধের ফেনা,
মাখন কুমড়োর খোলে ঝুলন্ত-কুলুঙ্গি
লাউ মাচানের লতাগৃহ, লেপাপোছা উঠোনের পাশে হাঁস-মুরগির ঠোঁট
খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে সব দানা
গমের ভুট্টার আর ভাতের...
শুনেই চিৎকার কৃষিবউ, কি বললে-
হাঁস-মুরগি বাড়ির উঠোনে? লাউমাচা?
তবে কি আমার পিতামহ পাতকুঁয়া থেকে নালা কেটে
জল নিয়ে যেতো ধান ক্ষেতে?
তবে কি আমার পিতৃকুল লাঙল কাঁধের থেকে ফেলে
গরুর গাড়িতে যেতো বুধ হাঁটে?
হায় হায় , তবে কি আমার পিসি ঢেঁকি ও ঘানির যাঁতাকলে
তিলে তিলে দিয়েছেন প্রাণ?
চোখে তার জল ভেসে এলো ,
থমথমে অদৃশ্য কোথাও কেউ এখন
অম্লানবদনে আব্বাসের গান গাইছে
‘আল্লা মেঘ দে পানি দে রে তুই আল্লা...’

আমি আসলে এলিগ্যান্ট আর গর্জাস এই দুইয়ের মধ্যেই বসেছিলাম ,
আমার ভাবনার মধ্যে কখন যে কৃষিবউ এসে দাঁড়ালেন !
সিফন জর্জেটে তার মুগ্ধতা বুঝি এই মাত্র বিউটিপার্লার থেকে এলো
ভাসমান কুয়াশার মতো মুহূর্তে উধাও হলো তার বিষন্নতা
আড়চোখে সে আমাকে একবার দেখলো
মূল্যবান পাথরে সাজানো তার খোঁপা, জমকালো মণিমুক্তার, মাছরাঙা
পাখি হয়ে সোঁ করে নিয়ে এলো চমৎকার ভেল্ভেটে জড়ানো অ্যালবাম।
কতো দৃশ্য ভেনিস স্কটল্যান্ড প্যাগোডার ছড়াছড়ি কৃষিবউ বললেন ,যা কিছু
চিরকালীন হওয়া দরকার ।ছিমছাম নিখুঁত।
আমি চুপি চুপি হাত বাড়ালাম যেই, কৃষিবউ রূপসী নক্ষত্র হয়ে উড়ে গেলো টিউলিপে।
তোমায় শোনাবো কতো কথা, এই যে আমার ছবি দেখো পুণ্যশ্লোক ,
সুইমিং কস্টিউমে আমি যেন মাছ খোলা অ্যাক্যুরিয়ামে ,আর এই দেখো আরবি-হর্স কৃষকের
সাদা ঘোড়া ইস্তানবুল থেকে আনা আমাদের এই হেভি জুয়েলারি।
আমি দেখলাম ,সাদা ঘোড়ায় চেপে ছুটে যাচ্ছে তার স্বামী ।
হঠাৎ অন্যমনস্ক আমি হাল্কা ভেসে যাচ্ছি প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে মাইক্রোওভেনে...

ঝিম ভেঙে দেখি ,লাজে রাঙা কনে বউ দাঁড়িয়ে রয়েছে আমার পাশটিতে
ওর গা থেকে ভেসে আসছে চমৎকার সুগন্ধ,’ প্যারিসের বিকেল,বুঝেছো হে পুণ্যশ্লোক ।
গন্ধের সৌকর্যে বসে আছি, একবার শুধু একবার স্ফূর্তিতে গায়ে মাখো এই গন্ধবিলাস,
আপেলের ফলন্ত বাগিচা হবে তুমি।“

ভালো লাগলো তার কথা সাজসজ্জা অন্দরমহলো,ফুটেছে রুচির পরিচয়
অল্প দূরে সংগীত ভবনের ডাক এলো ,আমি উঠে দাঁড়ালাম ,কৃষিবউ
ডালা খুলে শোনালো কতো গান সুমনের বাবা সায়গল আর মেহেদি হাসান
সব শেষে এলো জলতরঙ্গের মতো মিষ্টি গলার গান ,কৃষিবউ বললো ,এই আমি ,
গাইলাম রেকর্ডে।আমি অভিভূত,কৃষকের বউ ,এতো আধুনিক সুরম্য সুন্দর!

আমি তাকে শোনালাম ডলফিন লেক আর সামসিং ভ্রমণের কথা
হ্যান্ডগ্লাইডারে উড়ে যাওয়া যুবতী পরিদের কথা ,উড়ন্ত যুবকের কথা
ভাসতে ভাসতে তারা তারা গান গায়, খেলা করে, ভাসতে ভাসতে তারা
চলে যায় পাহাড়ের কুয়াশায় ।

কৃষিবউ, আয়নার ভিতরে তার প্রতিচ্ছায়া
ওষ্ঠ রঞ্জন শেষে মৃদু হেসে বললো আমাকে
তুমি বন্ধু আমার,আমি কৃষিবউ কৃষকের বউ
আমার স্বামীর দু’টো ট্র্যাকটর নিজে চাষ করে
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে শিখেছে
ও জানে ভালো বীজধানে সাফল্য এসেছে আমাদের ঘরে
সার আর জলসেচে রূপান্তর আছে চমৎকার-
কতো টমাটোর লাল ক্ষেত গাজর বেগুন ।
মূল্যবান পাথরে তার খোপা জমকালো মণিমুক্তার
আনন্দে ছলকে উঠলো
আয়নার ভিতরে তার ছবি মৎস্য কুমারীর মতো ভসোমান,স্বর্গের পরি
চোখের পলকে নেমে এলো ঝলমলে ওই চাঁদ থেকে।

আমি ভালোবাসি তার কথা গন্ধ-গুণপনা, সে বড়ো নিষ্পাপ,
শুধুমাত্র মোহ তাকে দূরবর্তী নক্ষত্রের কাছে নিয়ে যেতে চায়...
কৃষিবউ হেসে বললেন, চা খাবে,নাকি দক্ষিণের ব্ল্যাককফি।
আমি চা কফি দুই ভালোবাসি ।
আমি ওর নাম জানি তবু ডাকি কৃষিবউ বলে
ডাকি,কেননা এমন লিরিকস আমি আর কোথায় পাবো!

কৃষিবউ কতো গর্ব তোমার, তুমি কৃষকের বউ
তোমার স্বামীর ঘোড়াগাড়ি, ফলের বাগান।
নিজে কথা বলেনা কখনো, শুধু ছুটে যায়...

আমি সাধারণ ফ্যাকাল্টি, কবিতাও লিখি মাঝে মাঝে
আর কৃষিবউ কথাসাগরের নৌকো হয়ে
আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় তার স্বচ্ছল সংসার জলে
আমি মিষ্টি জলের মাছ, গাঢ় লোনা জলে অতি কষ্টে পান করি ব্ল্যাককফি,
আর কেন কষ্ট পাই ভিতরে ভিতরে , কৃষিবউ?
তোমার ঔজ্জ্বল্যে আমি কি ঈর্ষান্বিত?
তবে উচ্চকিত এই ভেবে, আমিও কৃষক হবো,
আমিও ট্রাক্টর নেবো দিগন্তের মাঠে...
এবার উৎসবে আমার নন্দিনীও যাবে কালিঝোরা-লাটপাঞ্চোর
কৃষিবউ বলো, তোমার অলক্ষ্যে যদি স্বপ্ন দেখি,শুধু স্বপ্ন, শুধু স্বপ্নের ঢেউ
ডালা খুললাম ফ্রিজটির
ঠান্ডা শীত শীত বরফের ক্রিম
বুঝি নাকে চোখে মুখে কেউ লেপটে থেবড়ে দিয়েছে
যেমনটি কমেডি সিরিয়ালে দেখি ।

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১২

পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত

সামনের দিকে শিশি বোতল আছড়ে পড়ছে



সামনের দিকে শিশি বোতল আছড়ে পড়লো ধ্বংসকালীন মাথার বালিশ
ছুঁড়ে মারলাম হেডলাইটের হাংরি স্কুটার উষ্ণ আবেগ
আড়াল থেকে তুলকালাম শাপশাপান্ত হেয়ার স্টাইল
ফুটে উঠলো রোবো সিটির অষ্টাদশী মুখের ওপর
যুগে যুগে ইন্দ্রপ্রস্থ সেই ঘরানার ছায়ামূর্তি
মোহময়ীর বেডরুমে ঝাঁপ মুখ লুকোল ছবির নেটিভ
দোকান থেকে আলোর নদী প্রেমের নদী ভ্যাটিকানে
কনসার্ট নেই বাউল গানের প্রাইভেসি নেই বেডরুমে তার মেদ ঝরাতে
লেজার এলো মুখের কালো ছোপ হটাতে লোমের পালক মনস্তাত্ত্বিক
দেয়াল জুড়ে ফুলের সাজি বুকের ব্যথা পুরোনো প্রেম বেশ রোমাঞ্চ
আমার টাকা আসতে পারে কুম্ভ রাশি রান্না ঘরে
বাঁশির পুলক প্রেম দিয়েছি রাসায়নিক স্বর্ণচাঁপা
আমার ছবি তুলছ তুমি স্বপ্ন দেখি বিলাসিতার
নতুন ট্রিপে আর যাবনা
সুইচ অন করলে কেন সূর্য ওঠার স্বপ্ন দেখি
জানলাগুলো বাতাস খুলে দিচ্ছে বুঝি ও ডানা তুই মুক্তি দিবি
মাথার উপর চাঁদের বিউটি লাইট মেকআপ
মেঝের রঙে সিট্রোনেলা গন্ধ ছড়ায় লেমনগ্রাস
কাজের কাজ হয় না কিছু প্রেমকাহিনি পার্কে পার্কে নেমে পড়ল গড়িয়াহাট
টুক করে প্রেম টোকা মারল আঁচড়ে কামড়ে উত্তেজনায়
শিশি বোতল আছড়ে পড়লো কঠিন শরীর খুলে ফেললো জাঁতাকলের অনন্তকাল

দূরে যাও মেঘ প্রিয় সমাচার
পাতালে জটিল জমাট আধার
আমি খুলে খাই অতিসাধারণ
খয়েরি আকাশ উপন্যাসে
রূপারোপ দাও মধ্যবিন্দু
উপশম নেই চেয়ে বসে থাকি
মরশুমি মেঘ সীমানা ছাড়িয়ে
তাঁত বুনে যায় শত শত বুটি
মুখোমুখি সব অস্থিরতার
সারি সারি গাছে নেমে আসে চাঁদ
জীবন ছড়িয়ে পড়লো আকাশে
বিষাদ বদলে নিয়েছি আমোদ
সাদা ঘোড়াগুলো আমার কবিতা
চুম্বন খুলে দিয়েছি অনেক
উড়ে যেতে চাই শেষ কুয়াশায়




মধ্য-রাতের বাতাস
মৃদু শব্দ তুলে বলে চলেছে
কেন তোমার স্বপ্ন দেখা শেষ হয় না
চাঁদ আর ফেরেশতা
তারারা আর নীল আকাশ
রূপালি চাঁদের পাশে সর্বশক্তিমান
বেহেশত আর কাকে বলে
ঘরে যা কিছু বিচ্ছেদের কারণ
সে সব তুচ্ছ
অমৃতের পরিবর্তে ওগো রাত
আমাকে এক পিপে মদ দেবে


গরমাগরম কত্তা-গিন্নি
ম্যারেজ সারর্টিফিকেট নেই
লিভটুগেদার লিভটুগেদার
কপিরাইট থাকছেনা আর
কি করব এখন স্থগিতাদেশ দিচ্ছেনা বর
বউ মানেনা ক্ষতিপূরণ
কেউ জানেনা
হচ্ছেটা কি এই সিনেমায়
কেবল দেখ বাসনপত্র টুকরো টুকরো
বাড়াবাড়ির কম্পজিশন মেঘ জমলো বসার ঘরে
ছোট ছোট অভিমানের স্নায়ু যুদ্ধ পাটকিলে চাঁদ
বলতে পারো জ্যোতিপুঞ্জ নিভছে তুলির রঙ শুকিয়ে যাচ্ছে দেখো

আলো-বাতাস খেলবে কেমন করে দৈরথ চলছে যে
ইমেলে ম্যাগাজিনের পাতায় এক দুর্দান্ত ট্রাভেল এজেন্ট
স্ট্রবেরির ছন্দে দারুণ এফেক্ট দিতে লাগলেন
অন্তহীন মুক্তির গন্ধ তাকে নিয়ে চললো
একটি মন্দ্রিত পানশালায়

আমি চলে যাবো
আমি আর থাকব না
ভাঙচুর আর প্রবোধ বাক্যের মন্দিত স্নানে
আমি আর থাকব না

শরীরের কোথাও প্রসন্নতার ভাষা নেই
টুক করে খসে পড়ল অলিভঅয়েল
বিজ্ঞাপনের পাতায় পাতায় জেগে উঠলো ময়েশ্চারাইজার
হেলদি স্কিনের টনিক লাগবে লেবুর রসে আপেলগুড়ো
লাগবে ঘুমের আরামপাচক
ইলিউশনের স্বচ্ছ্ব ডানা
জাগিয়ে তুলবে কল্পনা-স্ট্রোক ডিজাইনারের সুয্যিমামা
স্নানের টাবে চম্পাকলি গাইবে গানের প্রথম কলি

ক্লাইমেক্স বদলে যাচ্ছে
বিগড়ে যাচ্ছে রিঙমাস্টার
নিঝুমরাতের শিউলিমাখা প্রেমের পদ্য
হারিয়ে যাচ্ছে পাতলা ঠোঁটের ব্রাউন লেয়ার
খুঁতখুঁতুনি আসছে যেন বয়ঃসন্ধি শিথিল শরীর
ব্রা আনতা একটু জটিল শুকনো নিপিল
আশানুরুপ ধনতেরাসে জুটছেনা খই
বিধিনিষেধ মানছিনা আর ক্লায়েন্ট আছে ইনফিনিটি
ভবিষ্যতের আর কি বাকি একমুঠো চাঁদ শুকনো নিপল
হজম করে কিউব উধাও ফস্টিনস্টির নয়া জার্নি হলো

অপার্থিব যা কিছু ফেরেস্তার জন্য ।
নানা রঙের বাসনায় চুল আঁচড়ালাম
পূর্নিমার ওমে মদ্যপান করছেন
দূরে দেখা যায় কবরখানার রূপসী ফুলের স্তবক

চাঁদ অনেকটা গোল হয়েছে
সম্পূর্ণ গোল না হওয়া পর্যন্ত আমার মুক্তি নেই
এক টুকরো নদী দরগার ঠিক পাশেই তার মতই
অস্থির অন্বেষ্ণণ আমার কবিতার চরণে চরণে

এই অলৌকিক আলোর কথা
আমি কিছুতেই গোপন করতে পারবো না
বিবির গাল বেয়ে যা নেমে এসেছিল আমার কবিতায়

চিত্রনাট্যের প্রেক্ষিত আর যাই হোক
ইনসমনিয়ার গান আমি গাইবোই
সাজিয়ে ফেলবো দম্পতি ফ্ল্যাট বাতি আবহ নস্টালজিকে
সাজিয়ে ফেলবো স্বপ্নপূরণ ট্যাবলয়েড হুঁশ ফেরাতে
তাকিয়ে থাকো তলিয়ে যাবার হু হু বাতাস দেখবে রাতে
পরীর মতো পদ্মপাতা লিপলাইনার পাতলা ঠোঁটে

অলংকরণ –কৌশিক বিশ্বাস

সোমবার, ১ অক্টোবর, ২০১২

ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত

দীর্ঘ কবিতা 


পশ্চিমবঙ্গের কবি ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত কিছুদিন হল লিখতে শুরু করেছেন । ইতোমধ্যেই বেশ কিছু নামী পত্র পত্রিকায় লিখেছেন । ক্ষেপচুরিয়াসের শুভাকাঙ্ক্ষী এই কবি স্বভাবে বিনয়ী , রাজ্য সরকারি কর্মচারী ।

মৎস্য কন্যা

১। ভেলায় ভাসছি

মিলিয়ে যায় দ্বীপ, বনরাজি সবুজ;
বাঁধন আলগা করছে প্রবল ঢেউ,
কাঠে কাঠে ঘষটানি-
মহাসাগরিক ওঠাপড়া তালে তালে;
মাস্তুল ভেঙে পালের কাপড় ভাসছে দূরে -
সর্বাঙ্গে ক্ষত দগদগে ঘা-
বড় একা অসহায় সমুদ্র ভ্রমণ,
বারে বারে ঘুরে ফিরে আসে সী গাল,
প্রচণ্ড কর্কশ শব্দে।

২। কতদিন এই ভাবে ভাসা,

তৃষ্ণা বড় তৃষ্ণা, ক্ষুধা-
মিঠে জল ভরপেট আহার,
চোখ বুজলে দেখি নারকেল সারি-
ফেলে আসা একান্ত আপন নিজস্ব দ্বীপ,
আগুনে ঝলসানো পশু।

৩। বালিয়াড়িতে পাথুরে গুহায়
সমুদ্র ড্রাগনের দীর্ঘশ্বাস ফিকে শোনায়,
আকাশে অপার্থিব সবুজ বন্য আলোর ছটা-
ঢেউয়ের তালে শুনি সমুদ্র অতলে উৎসারিত সঙ্গীত,
তুমি গভীরে জলকন্যা রত্ন সিংহাসনে কোঁকড়ানো সোনালী চুল
এক হাতে স্বর্ণ মুকুর, অন্য হাতে মুক্তোর চিরুনি,
সমুদ্র শুশুকেরা ঘিরেছে তোমায়,
দেখছে রূপ খোলা চোখে।
মৎস্যকন্যা!

৪। ভাসছি একা,ভাঙ্গা ভেলা।
জানি না কোথায় নিয়ে যাবে সমুদ্র ঢেউ,
এই আমার ঘরবাড়ি,
সাগরের নাম দিয়েছি স্বপ্নভঙ্গ
একা একা রাত ভাসা
তীরে ঘরবাড়ি সারি সারি
ঘুমোয় নাগরিক পৃথিবী,
আমি এভাবেও জীবিত
আশ্চর্য শুনছি নিজের হৃদয় স্পন্দন।


৫। কেশরাশি সোনালী জলপ্রপাত কন্যা সিংহাসনে,

শুশুকেরা বিদায় নেয়,ঘুম ভেঙে উঠেছে ড্রাগন-
ধীরে ধীরে প্রসারিত হয় সর্পিল শরীর,
স্থির লাল দুটো চোখ রুবীর মত জ্বলে,
হিস হিস শব্দে চেরা জিভ ছুঁতে চায় তোমাকে,
মৃত্যুকে জয় করেছে যে শয়তান
সেও মরতে চায় তোমার প্রেমে,
আমি ভাসি জলে মৃতপ্রায়,
অথচ স্মৃতিতে কল্পনায় আমার জীয়ন কাঠি
ললনা মৎস্যকন্যা-এ এক বৈপরীত্য!
কাঁচ স্বচ্ছ প্রবাহিত জলে মৃগনাভি বিকশিত,
ফুটেছ সমুদ্র ফুল সুগন্ধি;
কোন এক চন্দ্র রাতে সাগরের অতলে
যদি নামে মেঘ সিঁড়ি,
আরোহণের মুহূর্তে বাজালে বাঁশি
চোখ মেলে দেখব উত্তরণ-
তাই এভাবে এখনো বেঁচে আছি।

একা সমুদ্রে ভেসে চলা,
জনারণ্যেও এভাবেই মানুষ ভাসে
একা পথ চলে,সঙ্গে হাঁটে ছায়া
এক ছন্দে চলা – কেউ বলে জীবন সঙ্গীত
সঙ্গত করে শুধু হৃদয় স্পন্দন।

৬। একদা গোধূলি দেখেছি আমি
নরম হাওয়ায় দোলে ঘাসবন,
একে একে থামে দিনের শব্দ;
কাঁধের জোয়াল নামিয়ে
পশুর সারি ফেরে ঘরে;
পাহাড় সারির গায়ে আবাসভূমি দোলে,
আকাশ কালো ঝোড়ো হাওয়ার তালে।

বন্য রাত, বন্য রাত তোমার সাথে
প্রবাহিত আমি এখন নিরুদ্দেশে,
এদিকে মনের মধ্যে জলকন্যা।

৭। কি যায় আসে বল
যদি ক্ষীণ সুতোর প্রান্তে জীবন মরণ
হাতছানি দেয় পালাক্রমে,
একাকী একটি জীবন কি অর্থ তার?
কোন কবির উপজীব্য হয় না কখনো
অর্থহীন জনৈকের বেঁচে থাকা, ভেসে থাকা,
কবরে লেখা হয় না মৃত্যুকালীন বিশেষণ,
হারিয়ে যাচ্ছি, যাবোই না হয়,
ক্ষতি কি,
গভীর গোপনে রয়েছ মৎস্য কন্যা,
অর্ধেক নারী আর বাকি কল্পনা।

৮।
শৈশবে শুনেছি উপাখ্যান
মীন কন্যার পথ শেষ হয় সমুদ্রতীরে,
জলের ভেতর অচেনা পৃথিবী,
নিঃশ্বাসে বিষ বাষ্প ড্রাগন, অমিত শক্তিধর
আঁধারের সন্তান, ভয়াবহ করাত সদৃশ দাঁত;
সে পার ভাঙা ঢেউ, তার নেই নির্দিষ্ট আকার -
মীন কন্যা বন্দিনী রাজকুমারী, বয়েস ফেলেনি ছাপ,
লয়হীন, ক্ষয়হীন, চিরযৌবনা মৎস্যকন্যা।
যুগযুগান্তর দয়িতের অপেক্ষায় কেটে যায়-
পাতাল কারাগার ভেঙে উদ্ধার করবে বীর,
এক পা রেকাবে অন্য পা মাটিতে
প্রবল বেগে ছুঁড়বে শব্দভেদী বান,
এফোঁড় ওফোঁড় ড্রাগন শরীর!
সমুদ্র অতল থেকে উঠে এসে প্রসারিত শালপ্রাংশু মহাভুজে
আত্ম সমর্পণ তোমার দেখব দু’চোখ ভরে।

৯। জলকন্যা, মনে রাজপুত্র তোমার প্রেম,
ভালবাসার জন্য সবকিছু ছাড়া যায়,
জলের বাইরে অন্য জীবন হাতছানি-
বিসর্জন দেবে তুমি
সাটিন কোমল পাখনা লেজ!
মানুষের রূপ ধরবে, গড়ে উঠবে ধীরে
অপুষ্ট নরম পঙ্গু দু’টি পা!

যদি কন্যা দেখ হীরে ফেলে ভুল তুলেছ কাঁচের টুকরো জীবন জুয়ায়,
তখন তো অর্থহীন সেই বেঁচে থাকা,
হতাশায় ক্লান্তিতে খুঁজবে নাকি মৃত্যুর দিশা?
অথচ আমাকে দেখ - সমুদ্রে ভাসছি-
ক্ষত বিক্ষত অঙ্গ, শত ফালি বস্ত্রাদি,
ভাঙা মাস্তুল, ছেঁড়া পাল----
তবু বেঁচে আছি
কারণ মনের মধ্যে তুমি
আর এভাবেও বেঁচে থাকা যায়।

১০।
তোমার কৌতূহল আর ভালবাসায় মৃত্যু হলাহল,
সন্ধে নামলে ক্রমশ তুমি সর্বত্র-
মোহনায়, উৎসমুখে পর্বতের কূটে, লোকালয়ে
সর্বত্র ছলাত ছল জল কেটে আনাগোনা
মনি খচিত চিরুনি দোলে অবিন্যস্ত চুলে,
সেই অদ্ভুত একটানা সুর লুলাবি মাতাল মাঝি মাল্লা নাবিক
ঝাঁপিয়ে পড়ে তোমাকে ছুঁতে।
সন্ধ্যালোকে মৃদু বাতাসে নদীজলে কুলহীন অগন্তব্যে ভাসতে ভাসতে হাতড়ে বেড়ানো আশ্রয় চূড়ো অথবা খড়কুটো যতক্ষণ না উত্তাল ঢেউ
ডুবিয়ে দেয় শেষ আর্তনাদ,
শুনেছি এ উপাখ্যান
মীন বালিকার হাতছানির পরিণতি;
অথচ ভাসছি আমি একই ভাবে
কতদিন কত যুগ, এখনো জীবিত-
এ ভালবাসা নয়, তার বেশি অথবা অন্য কিছু।

১১। কন্যা আমি নিয়ত বদলে যাই
এই দরিয়া সময় হীন,
তুমিও অবয়বহীন,
তোমাকে খুঁজেছি জানাতে স্বতোৎসারিত অন্তর্কথন
জীবন মৃত্যু সূক্ষ্ম সুতোর দোলায় এ সময়ে
মিথ্যে ভাষণ প্রশ্নাতীত,
সময় সব বাধা দূর করে দেয়
অজস্র খণ্ডে ভেঙ্গে যাচ্ছি কন্যা,
আমি কি একই আছি না জলে ভাসে
আমার নকল দেহ!
তবু বেঁচে থাকি,
সমুদ্রে সাঁতারে তোমাকে খুঁজি না,
অজান্তে তোমার আলিঙ্গনে নিমজ্জিত
মৃত নাবিকের শোভাযাত্রায়
আমাকে পাবে না,
যদিও জানি হয়ত এভাবেই হব শেষ
ভোরের বাতাসে সমুদ্র সুবাসে
ভাসবে আমার অবশেষ।

১২। একান্ত অবহেলায় যেদিন হব শেষ,
সেদিন কোন পতাকার অর্ধ নমন হবে না,
কোন বেহালায় অন্তিম সুর বাজবে না,
এমন কি সামুদ্রিক ঘোড়ার দলও
আমার ভেলার আশে পাশে মিছিল করে
ভাসবে না,
তুমিও কি এক হতাশা আমার মত-
একদিকে সামুদ্রিক ড্রাগন
তোমার চোখের পাতায় ঢালছে কালি,
অন্যদিকে উন্মাদ নাবিকবর্গের আত্মহনন
তোমাকে ঘিরে অথচ জনশ্রুতিতে
তুমি সুন্দরী নারী আপ্লুত প্রেমে
বর্জন করেছ পাখনা লেজ,
অশক্ত অপূর্ণ দু’টি পায়ে হাঁটছ সাগর বেলায়
প্রেমিকের আবির্ভাব লগ্নের শবরী প্রতীক্ষা-
অথচ এ প্রেমও পূর্ণতা পাবে না তোমার-
উপাখ্যান তাই বলে।

১৩। তুমি বন্যার কন্যা সবুজ আভা সোনালী চুলে
খোলা চুল, অবিন্যস্ত কেশরাজি,
অঙ্গে ফুল সাজ,
অপেক্ষায় আছ পাল তোলা সমুদ্র তরীর নাবিকের,
অসহায় আত্মসমর্পণের অথবা নির্বাসিত রাজপুত্র
তোমাকে উদ্ধার করবে- কিসের অপেক্ষা তোমার,
ক্রমাগত ভেসে আসে ড্রাগনের নিশ্বাস!
এও জানি তোমার উপাখ্যান কখনই ম্লান নয়
শতাব্দী পেরিয়ে যায় আরোপিত নতুন মাত্রায়
বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমা
সমৃদ্ধ হয় কবির কল্পনায়,
চন্দ্রাহত নাবিকের বিভ্রমে,
সমুদ্র তুরঙ্গম, শুশুক, প্রবালের দল
আনমনা হয়
দিক ভ্রষ্ট চোরা স্রোত উপসাগরের অতলে
প্রবল বিক্রমে বাজে সাবধানী ঘণ্টা,
আবেগের দোলায় দুলতে থাকে ভাসমান
সমুদ্র গাছ লতাপাতা,
আকাশে প্রবল বিক্রমে জলধারা ছুঁড়ে দেয় অতিকায় তিমি,
আমি ভাসমান শুনি আওয়াজ-
হয়ত আমার মত আরও কেউ শোনে তোমার আগমনী,
সমুদ্রতীরে তাই মানুষের আনাগোনা।





ঋষি সৌরক




দীর্ঘ কবিতা 
 
কবি পরিচিতি : ঋষি সৌরক
ঋষি সৌরক -সম্পূর্ণ ভেজেটেরিয়ান -বানানে সুনিপুণ সাহিত্যপ্রেমী এবং সুস্থ মস্তিষ্কের পুরুষতান্ত্রিক কবি,নিয়মিত কবিতা লেখেন (দিনে মিনিমাম ৬টা করে) - খুব তাড়াতাড়ি বিখ্যাত হয়ে যেতে চান !
প্রচুর টাকা কামাতে পছন্দ করেন এবং দামী দামী রঙ বেরঙ্গের ওষুধ খাওয়ার হ্যাবিট আছে ...


ফেলিওর একটি প্যাশন ! প্রিয় কবি ওয়ান অ্যাণ্ড অনলি রবীন্দ্রনাথ,তাকে উতসর্গ করেই কবি জীবনের সুসমাপ্তি কবিতা 'রবীন্দ্রনাথ কে চিনুন' অপ্রকাশিত সো ফার। 'সুইসাইড' এবং 'ভুত' শব্দদিকে বিপুল ভয় পান ।

একমাত্র ভালোবাসা : স্ট্যাটিস্টিক্স-বেস গিটার-মা ও উল্কা (যাদের জন্য এই মরে যাওয়া পল্ দো পল্)


রঙ
ঋষি সৌরক


#
দরজার ছোটো ফাঁক দিয়ে বদলানো
দেখি হাজার আলোর ঘেরাটোপে ভাঙ্গা
আদল খা্বার তর বাতাসে উংলিচারী ঢেকুর
নতুন চির পুরোনো চির নতুন

চি রো

#
ঘুমানোর সময় বিছনায় রঙ লেগে যায়
এই যে তামাম মাল্টি মুখী আলোলিতো
রসায়ন - কসমোপলিটান ত্বকে র পিক্সেলে

ওরা চতুর ওরা ধোকাবাজ
মাইক্রো ছিদ্রান্বেষী

আদল ভাঙ্গা আলো
রক্তকে নিজের দলে
টেনে নিচ্ছে
ঠেলে দিচ্ছে

শারীরিক গর্তের দিকে

#
আলো নিবে গেলে

আলো নিবে গেলে কামার্ত চিকার গুলো কামার্ত হাহাকার
ভিড় গুলো মহাজিরো জিরো পাওয়ার ঢেউ ধোয়া
ক্রমাগত ক্রমাগত হুড়মুড়িয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরমুখী বাতাসে
অভিনয়ের সাতকাহন ট্রিপে কন্ট্রাস্ট ঝরে পড়ছে

রি ই ন্‌রিন্‌ রি ই ন্‌রিন্‌

অভাগী নলের সেক্সুয়াল আর্জ
সাদা-কালোয় প্রো কো ট্‌

ভিরানা  

#
ফ্রেম উল্টে গেলো

গ্র্যাভিটি উল্টে গেলো

ফ্রেমে কেউ নেই

(থাকলে শব্দ হোতো)

#
এবার একটা সকাল
নী্লমতো সকাল নীলমতো রোদ
পেঁজা তুলো মেঘ
ফুলেল
মিষ্টি
.
নিরাপদ -
হবে নাই বা কেনো

সকাল তো

#
এবার একটা রাত ...

ত্থাক্‌ !

#
আগ্রহ বাড়লো,
টুকরো টুকরো ট্রিক্‌স্‌
টুকরো টুকরো অভিঘাত

রাত
আরো রাত নামছে

হাওয়া দিলো মাত্র

#
সেই হাওয়া থেকে
বিশুদ্ধতা কমে গেলো !

কার্বোনিল
উত্তপ্ত
হাওয়া

মানে কেউ আছে
এখানে
নিশ্চিত কেউ ...


#
একটা তারা

#
ভিজছে ।

#
হাল্কা লাগছে

সুস্থতার লক্ষণ ...

ভয় করছে না,
কেউ তো নেই

ভ্রম ভ্রম 

#
একা লাগছে

#
নরপিশাচের মত ক্ষিদে পাচ্ছে
মৃত ঘোড়ার এক্কাগাড়ি
শববাহী চিঁহি

রঙ্গিন বাতাস
ঘোরালো ভোর্টেক্স
চাটছে
লেবিয়া মেজোরা

সম্পূর্ণ মাংসাশী স্বপ্নের
সমোচ্চশীল ধাপ আবল্লি
ভাসিয়ে দিচ্ছে উন্মাদ পাপের মিথ

আলোর সুনামি আলোর সুনামি
শেষ নিশ্বাস
চিটে গিয়েছে ওয়েবি রং এর মাকড়সায়

#
একটা বি শ শ ঋ গন্ধো

আলোর গন্ধ

আলোর বিশ্রী গন্ধ

আলো গা
গোলালো

#
একটা তারা

তারা

ভিজছে ...

#
মনে আছে ?

ফ্রেম ওলটানো ছিলো

আবার ওলটালে

এবার একটা কিছু ফুটে উঠছে
বাতাসের শিরায়
গাঢ

বে এ এ শ গাঢ

একটা শিরা

একটাই শিরা

কেটে ফেলা শিরা

রকমারি আলো মিছরির মতো

সাদাকালো শিরা সাদাকালো বিদ্ধ

#

শেষ মিণিটের আল্গাছায়া ঢুলুঢুলু ঢলে এসেছে ফ্রেমে -

ঠক্‌ !

আন্ধেরা লা-জবাব