মুক্তগদ্য. লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুক্তগদ্য. লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৪

মুক্তগদ্য – অনিন্দ্য সুন্দর রায়



পুতুলখেলা
অনিন্দ্য সুন্দর রায়

 


 ষ্টেশন-রোডে আফসারার বাবার একটা বাচ্চাদের খেলনার দোকান আছে। দুবছর আগে ওর মা পড়ে গিয়ে বাঁ-দিকটা যখন প্যারালাইসড হয়ে যায় বাবা অটোটা বেচে দিতে বাধ্য হয়। চিকিৎসায় অনেক খরচ হয়েছিল। প্রাইভেট স্কুলে ক্লাস-টু অ্যানুয়াল পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তার। বাবা লোন নিয়ে দোকানটা দিয়েছে এই মাস-ছয়েক । খোয়াবি খেলনার দোকানএ তল্লাটে তেমন কোনো খেলনার দোকান নেই। বাজারে একটা আছে বটে একটা কিন্তু তার অনেক দাম। বাবার দোকানে দশটাকা থেকে শুরু হরেকরকম পাওয়া যায়। আফসারা এখন প্রাইমারি স্কুলে যায়। প্রাইমারি স্কুলে মিড-ডে-মিল দেয়। বাবার হিসেব মতো আফসারা পড়াশুনো করে মাসে সাতশ টাকা বাঁচায়, রোজকার করে।
সকালে বাধ্য হয়ে তাকে স্কুলে যেতে হয় বলে সাড়ে তিনটেয় বাড়ি ফিরে সে ছটফট করে দোকানে যাবে বলে। একসাথে এত খেলনা সে কখনো চোখে দেখেনি। বাবা একটা ছোট্ট সাদা-চুলের পুতুল কিনে দিয়েছিল খুব ছোটবেলায়। সেই পুতুলের জামা নেই, চুল উঠে গেছে, একটা চোখের পাতা পড়তে চায় না কিছুতেই। এছাড়া তার ছিল নারকোল খোলা, আইসক্রিমের কাঠি ইত্যাদি, যা দিয়ে সে রান্নাবাটি খেলতো। দোকানে এলে যেদিন যেটা খুশি নিয়ে খেলতে পারে সে। আগে বাবার অবর্তমানে কাষ্টোমারদের দোকানে বসতে বলতো খানিক্ষন। এখন সে জেনে গেছে প্লাস্টিকের ছোট হাতি, বেজি, হরিন এগুলোর দাম দশটাকা। সামনেই রাখা থাকে। র‍্যাকে তোলা রোবটটা, যেটায় ব্যাটারি দিলে নিজে নিজে চলে ওটা দেড়শো। আর লাইনওয়ালা ট্রেনটা আড়াইশো। গায়ে তুলো মাখানো ভাল্লুকগুলো পঞ্চাশ, আশি, একশো, সাইজ অনুযায়ী। এখন সে বেশ কিছু মাল নিজেই দেয়। আর বাদবাকি সময় কিছু একটা নিয়ে খেলে। আফসারার প্রিয় তিনটে পুতুল আছে, একটা ওর বাবা, একটা ওর মা আর একটা ও নিজে। বাবার একটা অটো আছে। মায়ের একটা বাড়ি আর নিজের জন্য একটা ছেলে পুতুল। যেদিন স্কুল থেকে ফিরে সে জানতে পারে তার বয়সি একটা মেয়ে ওই ছেলে পুতুলটা কিনে নিয়ে চলে গেছে সেদিন ও খুব কেঁদেছিলো। বাবা যখন দোকানের সমস্ত খেলনা তাকে দেবে, মায় ব্যাটারী-রোবট দেবে বলেও শান্ত করতে পারেনি তখন বেধড়ক মেরেছিল। আসলে সবাই সবকিছু বোঝেনা। আফসারা দোকানে আসার জন্য এখন আর আটুপাটু করে না। বরং তার বাবা তাকে জোর করে নিয়ে যায় দোকানে সাহায্য হবে বলে। অটো, বাড়ি, মা সব বিক্রি হয়ে গেছে একেএকে। মার খাবার ভয়ে, বাবার অবুঝপনায় কিচ্ছু বলতে পারেনি।
গত শনিবার নিজের পুতুলটা দোকান থেকে বাবা না থাকাকালীন লুকিয়ে ব্যাগে ভরে নিয়ে এসেছে। বাবা যখন দোকান বন্ধ করছিলো, পাশের বিরিয়ানির দোকানের পঞ্চু তাকে চোখ মেরেছে। সেই কথা সে মা-বাবা কাউকে বলেনি। আজ স্কুল থেকে ফেরার পথে পচা-পুকুরের জলে পুতুলটা ফেলে দিয়ে আসবে। এখন তার আর পুতুলখেলার বয়স নেই, সে নিজেকে নিয়ে খেলতে চায়...

বৃহস্পতিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মুক্তগদ্য - জব্বার আল নাঈম

কবিতা নিয়ে গদ্য
জব্বার আল নাঈম



আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: পোড়খাওয়া মানুষের গভীর অন্তর্দৃষ্টির নাম

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সফল ও স্বল্পপ্রজ একজন কথাসাহিত্যিক। তার লেখনীতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উঠে এসেছে সমাজবাস্তবতার সুনিপুণ চিত্রকল্প, ইতিহাস এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞান, পোড়খাওয়া মানুষের গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধে রচনাকে করে তুলেছেন ব্যতিক্রমধর্মী সুষমা। হালের লেখকদের অন্তর্দৃষ্টিতে গভীরভাবে পৌঁছে গেছে কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জীবন ও জীবনবোধ এবং সামাজিক চিন্তাচেতনা। যেখানে সত্যিকার অর্থে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অন্যতম সাহিত্য প্রতিনিধি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭) স্বল্প জীবদ্দশায় উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৭) এবং ‘খোয়াবনামা’ (১৯৯৬)। ছোটগল্প ‘অন্যঘরে অন্যস্বর’ (১৯৭৬), ‘খোঁয়ারি’ (১৯৮২), ‘দুধভাতে উৎপাত’ (১৯৮৫), ‘দোজখের ওম’ (১৯৮৯) এবং জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল (১৯৯৭) অন্যতম। এ ছাড়া বাইশটি প্রবন্ধ নিয়ে প্রবন্ধ সংকলন ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’ এখনো বোধের অবস্থান জানান দেয়।

সাধারণ মানুষকে মুক্তির বন্দনা শোনাতে বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস এবং মরিয়ম ইলিয়াস দম্পতির ঘর উজ্জ্বল করে ১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার গোটিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে অখতারুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে মঞ্জু জন্মলাভ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে অনার্স-মাস্টার্স পাস করেন। পরে জগন্নাথ কলেজে (বিশ্ববিদ্যালয়) প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা ঘটে। এই অসামান্য প্রতিভাবান মানুষটি সারা জীবন যেমন করে বৈরী পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করেছেন। তেমনি করে লড়েছেন ডায়াবেটিস ও জন্ডিসসহ নানাবিধ রোগে। সাহিত্যের এই বরপুত্র ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

কিন্তু তার ‘চিলেকোঠার সেপাই’ যেন অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী উপন্যাস। মহান মুক্তিযুদ্ধ এক দিনে আসে না। অনেক চড়াই-উতরাই আর চাওয়া-পাওয়ার পর ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আসে। যেই সংঘর্ষের আগে ছিল ১৯৬৯ সালের আতঙ্কিত পূর্ব বাংলা। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সেই সময়ের পেক্ষাপটকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলির আঁচড়ে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে লিপিবদ্ধ করেন। গণমানুষের দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে সে পথে হেঁটেছেন ইলিয়াস। তার ‘চিলেকোঠার সেপাই’ সমাজবাস্তবতার আলোকে উজ্জ্বল এবং প্রাসঙ্গিকই মনে হয়। ভয়ঙ্কর সময়ের ভেতর দিয়ে রাজপথে জীবনস্পর্ধী মন্ত্রের মুখে মৃত্যু বিস্ফোরিত হতে থাকে। যখন মুহূর্তে মুহূর্তে কেঁপে ওঠে মানুষের বুক, বাংলার মাটি আর ছোট শহর ঢাকা। কাঁপে কারণে-অকারণে গ্রামগঞ্জ, নিভৃত চার দিক এমনকি দখল করা চরাঞ্চল। ভয়ে শীতল হয় কোটি কোটি প্রাণ। এই বিপদ-বিপর্যয় আসে দুর্বিষহ বুলেটের আঘাত, অভাব ও স্বভাবে। এক দিকে চলে মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির চরম আকাক্সা, অন্য দিকে ক্ষমতাসীনের চর দখলের বাহাদুরি। দিনরাত বিরামহীনভাবে চলতে থাকে মিছিল-মিটিং-গুলিবর্ষণ-কারফিউ ভাঙার স্লোগান; গণ-আন্দোলন, গণ-আদালত, ক্ষোভ আর রাজবিদ্রোহ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মনের চেম্বারে অধিষ্ঠিত হতে থাকে একটাই শব্দ- মুক্তি, মুক্তি এবং মুক্তি। একটা সময় এই মুক্তি শব্দটাকে বুকে ধারণ করে বাঙালি হয়ে ওঠে অটল-অবিচল। মুক্তির স্বাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম হয়। মুক্তি আসে বিভিন্নভাবে শহর, বন্দর ও গ্রামে। নির্লজ্জ জাতির বিরুদ্ধে সর্বশ্রেণীর একাত্মতা ঘোষণা করে ‘দিকে দিকে আগুন জ্বালো’ স্লোগানে স্লোগানে।

‘তোমার রঞ্জু পড়ি রইলো কোন বিদেশ-বিভুঁয়ে, একবার চোখের দেখাটাও দেখতি পাল্লে না গো! কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে ওসমান একটার পর একটা লেবুপাতা ছেঁড়ে আর মায়ের বিলাপ শোনে। ৩টে আঙুলে লেবুপাতা চটকাতে চটকাতে উঠানের দিকে এগিয়ে গেলে কে যেন তাকে দেখে ফেলে, ওরে! রঞ্জুকে এট্টু কাঁধ দেতে দে! লোকটা কে? সেই লোকটাই ফের আফসোস করে, আহা হাজার হলেও বড় ছেলে, জ্যেষ্ঠ সন্তান! কুথায় পড়ে রইলো সে, বাপের মুখি এক ফোঁটা পানি দিতি পাল্লো না! আহারে, বাপ হয়ে ছেলের হাতে একমুঠি মাটি পেলো না গো!’

এভাবেই শোকাবহ বিলাপের মাধ্যমে গল্পের ভেতরে আমাদেরকে নিয়ে যান আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হতে থাকে আধুনিক ঢাকা শহর। বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির ঘিঞ্জি গলির মধ্যে একটি বাড়ি। সেই লেনে বসবাস করে ওসমান গনি ওরফে রঞ্জু মিয়া। এই রঞ্জু মিয়া ’৬৯-এর অভ্যুত্থান সব দেখে। শোনে। বিপ্লবীদের কাতারে শামিল হয়ে মিছিল করে, মিটিং করে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে কেন যেন তার উপস্থিতি নেই বলে মনে হয় তার কাছে। চার দেয়ালের চিলেকোঠার মাঝে রঞ্জু বারবার নিজেকে আবিষ্কার করে। দেয়াল টপকে সে বের হতে পারে না আত্মমগ্ন প্রেমের কারণে। এই দেয়াল বিচ্ছিন্নতার ও আত্মপ্রেমের। সহনামী প্রতিবেশী রঞ্জুর বোনের প্রতি ওসমান গনি ওরফে রঞ্জু মিয়া বেশ আসক্ত। তার ধ্যানজ্ঞান মেয়েটির যৌবন উপচে পড়া শরীর। মাঝে মাঝে রঞ্জু মিয়া প্রেমের বিষাদ থেকে নিজেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে কক্ষ ত্যাগ করতে চায়। কিন্তু ত্যাগ করাটা যে এত সহজ না। ডানা ঝাপটে তিরতির করে উড়তে চাইলেই কি ওড়া যায়? ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি উত্থাপন হওয়ার পর আসে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। এই গণ-অভ্যুত্থানে সন্ত্রস্ত শাসকদের নতুন করে আরোপ করা সমরিক শাসনের নির্যাতন শুরু হলে বন্ধুরা যখন শোক ও ভয়ে বিহ্বল, ঠিক তখন ওসমানের ডানায় লাগে প্রবল বেগ। আত্মপ্রেমে পরাজিত হয়ে প্রতিবেশী সহনামী কিশোর রঞ্জুকে সে চুম্বনে চুম্বনে রক্তাক্ত করে। এমনকি ঠোঁট থেকে এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে নেয়। তবে তা যৌনতার বশে ছিল না। ঘিঞ্জি গলির ভেতরে অনেকেই রঞ্জুকে বদ্ধপাগল হিসেবে জানে বা চেনে। এই উৎসাহে অনুরাগী বন্ধুরা ব্র্যাকেটবন্দী করে রাখে তার নিজ ঘরে। রঞ্জু চায় না সে নিজেকে বন্দী অবস্থায় দেখতে। সে একজন নার্সিসাস। কিন্তু এখানেই তার ফিনিশিং নেই। গৃহবন্দী থেকে বের হওয়ার জন্য প্রচণ্ড ক্রোধে সে ডানা ঝাপটায়। একসময় রঞ্জুকে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেয়ার জন্য পাঁজাকোলা করে রেলিং ডিঙানোর ভয়ঙ্কর উদ্যোগ নেয়। কারণ হিসেবে রঞ্জুর আত্মকণ্ঠে জানা যায়, ‘খিজিরের কাছে আমি প্রমিজ বাউন্ড, আমি ওকে কথা দিয়েছি।’ কিন্তু এখানেও দেখা যায় তা ছিল রঞ্জুর আত্মপ্রেমে বিসর্জনের অসম প্রস্তুতি।

গৃহবন্দী ওসমান ওরফে রঞ্জু বারবার নিজেকে মুক্তি দিতে চায়। জনবিচ্ছিন্নতার জন্য তা আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এই রহস্যবন্দী থেকে কে দেবে তাকে মুক্তি? এই বন্দিদশা থেকে কে পারে তাকে উদ্ধার করতে? এক নেতায় বিশ্বাসী আলাউদ্দিন!

নাকি ভোটপ্রার্থী আলতাফ? বাম রাজনীতি বিশ্লেষক আনোয়ারের সাথে বেশ কয়েকবার তার হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি হয়েছিল। তাহলে এই বন্দিদশা থেকে কিভাবে ওসমান গনি ওরফে রঞ্জুর মুক্তি মিলবে? খিজিরই তাহলে তার শেষ ভরসা। কিন্তু হাড্ডিসার এই খিজির নিজের বাপের নাম জানে না। তার পরও এই খিজির তাকে চিলেকোঠার দুর্গ থেকে বের হওয়ার জন্য প্ররোচিত করে। যার মা-বউ দু’জনেই মহাজনের ভোগ্য। গণ-অভ্যুত্থানের সক্রিয় সদস্য হওয়ার অপরাধে মধ্যরাতে কারফিউ চাপা রাস্তায় মিলিটারির হাতে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়। কিন্তু খিজিরের আহ্বানে ওসমান গনি প্রচণ্ড শক্তিমত্তা দিয়ে ঘরের তালা ভেঙে সবার অগোচরে কারফিউর দাফট অগ্রাহ্য করে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। মধ্যরাতে দৃশ্য-অদৃশ্য খিজিরের পেছন পেছন ছুটতে থাকে রঞ্জু। একের পর এক পুরান ঢাকার অলিগলি পার হতে থাকে। বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে কখনো কুকুর, কখনো বিড়াল আবার কখনো কখনো কারফিউ সামরিক শাসকের চোখ ফাঁকি দিয়ে সামনে হাঁটছে। কখনো কখনো খিজির বিদ্যুৎ প্রবাহিত তারের ভেতর দিয়ে সেনা ভয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। রঞ্জু খিজিরকে দেখতে না পেয়ে প্রচণ্ড জোরে শব্দ করে ডাকতে থাকে। খিজির হাসতে হাসতে তার উপস্থিতি জানান দেয়। খিজির খুঁজতে চায় জুম্মনকে। জুম্মনকে খোঁজে বের করা তার পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু জলজ্যান্ত শরীর নিয়ে রঞ্জু বাংলাদেশের সব দিকেই তাকাতে পারছে।

উচ্চমার্গীয় আখতারুজ্জামানের পক্ষে এসব ভাষা, শব্দ ও জীবনযাত্রার চিত্রকল্প তুলে সত্যিকার অর্থে বাস্তবতার ছোঁয়া পেয়েছে। সাধারণ জনজীবনকে হৃদয় থেকে অনুধাবন না করলে সত্যিই দুরূহ কাজ। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি লেখক সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন, ‘কি পশ্চিমবঙ্গ কি বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক। ইলিয়াসের পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম।’ সত্যিকার অর্থেই প্রথিতযশা এই অমর কথাশিল্পীকে যে কেউ অতিক্রম করতে গেলে ভাবনার বাড়িতে বারবার যেতে হবে। দীর্ঘ ১৫-২০ বছর ধরে তার অমর শৈল্পিক সাহিত্য উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই এবং খোয়াবনামা’ বাংলা উপন্যাসের মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

মুক্তগদ্য - ফয়সল অভি

আমার তোমার
ফয়সল অভি


পাঠকের কাছে বই হলো টিউবয়েল চেপে হাত জড়িয়ে চাঁদের তালুতে জল খাবার মতো । আমার তোমার প্রশ্নের শুরু বেঁধে রাখা প্রাণ যখন আটক হলো সীমানায়,এই ভাবে অনুপ্রবেশ আসলো, ঠায় নিলো অন্ধকার পালানো সমস্ত আলোর বিশ্বাসঘাতক,খুন হলো না কারণ সেই পরিস্থিতির অনুভূতি মানবিক,পালানো গুলো ডুবন্ত মানুষের কাছে শুধু আশ্রয়,ঠায় ধরতে ধরতে কাঁধে ভর করলো পাহারা আর কলিজায় যে ঈশ্বর সংঘাতে আত্মা,এতো বন্ধন জড়ানো সম্পর্ক মুক্তির বিরুদ্ধে বেশ্যাপাড়া আর ঘর,আপনজনের মিছিল মানুষের ভেতর গুহা । এই আদিম আকাশ, পুরো পৃথিবীর শূন্যতা জুড়ে মানুষ মানুষ,পিঁপড়ে । এখনও পিঁপড়ের কামড় শুকতারা এই শরীরে মাখা,রোদে পোড়া জলে ভেজা কাদায় শ্যামল দৃষ্টিতে কিছু কথা থাকে,যে হারিকেন বধূর কথা জানে না সেই আলোর নোলক রিকশার নগর সোডিয়াম,আমি তুমি রঙ ঝুলে থাকে ঐ প্রান্তরের নিস্তব্ধ নির্জনে,এই ক্ষরণ চিৎকারে,ঋতুতে,শরীরে শরীরে বিষণ্ন রাত্রি নিয়ে বিছানায় বালিশে চাদরের মতো শংকা,ঐ নির্লিপ্ত ঘুম জাগা গুটি গুটি জোনাকির সবুজে লাফ নেই বলে নির্মিলিত বিস্তার আঁকা যায় না তার মানচিত্র,শূন্য দেয়ালে তাকিয়ে তাকিয়ে বোবা ঐ ডানা থাকলেই মাতাল এই ঘোড়া দৌড় মনে মনে ভাবছে,একা নিঃসঙ্গ মৃত্যু পর জীবন ফিরে পাখিতে, পাখনায়,বৃক্ষের দাঁড়ানো সন্ধ্যার দীঘল চুল উড়ানো চকচকে সময়,ভাগ হয়ে যাওয়া সেই কালের রঙে কখনও এপাশে আবার কখনও ওপাশে । তুমি ঘুমিয়ে পড়লে শিকার আস্তানা ছাড়ে, ফিরে যাওয়া ঠিকানা পর্যন্ত প্রবল বর্ষণে ধুয়ে যায় পুরনো দিন,আসা যাওয়া ক্ষয়ের জামা পড়া শোক নিয়ে সভ্যতা তুমি ভীষণ পরিপাটি কাঁচে ঘেরা সুস্বাদু কাঁকড়া,সমাজ তুমি জালে আটক উপজীব্য মাছ,পরিবার পশুর মতো মায়া আর হিংস্র,প্রার্থনা তুমি গেইট খোলা মধ্যরাত্রি পাথরে ক্যালেন্ডার,প্রণয় তুমি গোসলে উল্লসিত পায়ের তালুতে ভোর,চাইলেই হয় শিহরণ, বেঁচে থাকা মানুষের প্রমাণ

মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৩

মুক্তগদ্য - সৈয়দ শাখাওয়াৎ

তুমি একটা আড়াল খুঁজছসৈয়দ শাখাওয়াৎ



জানি, তুমি একটা আড়াল খুঁজছো, একটা পুঁথিপাঠ সন্ধ্যাবেলায় অল্প আলোর ভেতর কারো দিকে গোপনে চেয়ে দ্যাখা আড়ালের মতো। আড়ালটা মুক্তোর মতো চিকচিক চিকচিক করতে করতে ক্যামন যেন একটা দুঃখ তৈরী করবে, দূর থেকে দূরে ল্যাম্পপোস্ট থেকে ছিড়ে ছিড়ে আসা আলোর মতো...তা তুমি যেভাবে দ্যাখতে চাও-আলোটা তোমার মুখের উপর একটা আবছায়া তৈরী করবে, একটা বাড়তি সৌন্দর্য। এরকম মায়া মায়া আলোর ভেতর তুমি সারাটা দিন থাকতে চাও, সে আমি জানি। সেদিন বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, একটা পুরো আকাশ ভেঙে জল ভাঙার শব্দ তুমি একা একা শুনেছ, একটা ঝুপঅলা গাছের নিচে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। এটা এক ধরণের স্বার্থপরতা, তাই না ? কেন তুমি এতটা স্বার্থপর হবে বলো? ধর, এরকম বারবার তুমি একটা আড়ালের ভেতর থেকে বের হয়ে একটা নতুন আড়ালে ঢুকে যাবার তীব্র বাসনায় নতুন আড়ালে ঢুকে যাবার তীব্র বাসনায় তুমি আর কত আড়াল হবে। প্রকৃতঅর্থে নিজের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা ছায়ার সাথে কি আর আড়াল আড়াল খেলা যায়?

এইযে দলে দলে মানুষ হেঁটে যায় একেকটা বিদ্রোহের আগুন বুকে নিয়ে, তাদের মুখগুলো দ্যাখো, ওখানে শেষ বিকেলের রোদ এসে উঁকিঝুঁকি দ্যায়। একটা বাড়তি ক্ষোভ ওদের চোখে মুখে খেলা করে। তোমার সিনেমা শরীর থেকে রোদ ঝরে না কখনো। শুধূ ল্যাম্পপোস্ট আলোর বাড়তি সৌন্দর্য ছাড়া। এমনটা ভাবা কী খুব যৌক্তিক নয়? সন্ধ্যেবেলা ছাড়া যে তোমার ঘুম ভাঙে না! তুমি জানো না, এই বিকলাঙ্গ সময়ের ভীড় ঠেলে যেকজন মানুষ উঠে দাঁড়ায় বিপুল সাহসে তাদের হাতের উপর হাত রাখা কতটা সহজ! কতটা সহজ একটা রুটি চায়ে ভিজিয়ে খেতে না খেতেই একটা সিগারেট হাতে পুরোটা রোদ ঢুকে যায় মুখের ভেতর।কেননা একবুক আগুন না জ্বলে উঠলে এরকম আগুনখেকো বুক হয় নারে!তুমি একটা আড়াল খোঁজো। বিছানা বালিশ ঠেলে ঠেলে তুমি একটা বৃহন্নলা প্রেম খোঁজো।

তুমি কি জানো এই আড়ালে আবডালে কতগুলো মৃত্যু কথা বলে? অজস্র ঘুমের ভেতর আলো যা সঞ্চিত উজাড় করে করে একটা রক্তঝরা দিন আসে। ওখানে শুধু হুইসেল বেজে বেজে ওঠে-লংমার্চ!লংমার্চ! একটা দেয়াল ঘড়ি ছিটকে পড়লে অনেকগুলো কাঁচ টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তুমি একটা আড়াল খুঁজছো, ভাঙা কাঁচে মুখ দেখলে বুঝতে পারতে মানুষ আসলে কতবড় একটা মুখোশ! রাগ করলে, চলে যাচ্ছো? এসব কথার কোনোটাই যে তোমাকে বলা হয়নি....বড় স্বার্থপর মনে হয় তোমাকে। তোমার এনক্রিপ্টেড চেহারায় এর কোনো ছাপই পড়ে না । আমি জানি, একটা নম্বরের জন্য বারবার ডিজিট ফেল করছো তুমি। স্মার্টফোনে ঘা দিয়ে এখন তুমি চলে যাবে ;জানি। আরো জানি তোমার আড়ালটুকু ইদানিং হারিয়ে যায়...শত সহস্র তোমার মতো সবাই -ই চলে যায়! আর এদিকে লুট হয়ে যাচ্ছে শস্যের ক্ষেত, ফলবতী রোদের আঙুল, বেদনাবহুল ধারাপাতে। পুড়ে যায় দূর্বাদল, বনের চিরল বুক কেটে কেটে উবে যায় নদী-আর তুমি একটা আড়াল খুঁজছো!

মঙ্গলবার, ১ অক্টোবর, ২০১৩

মুক্তগদ্য - সৈয়দ শাখাওয়াৎ

মুক্তগদ্য
সৈয়দ শাখাওয়াৎ



তুমি একটা আড়াল খুঁজছ



জানি, তুমি একটা আড়াল খুঁজছো, একটা পুঁথিপাঠ সন্ধ্যাবেলায় অল্প আলোর ভেতর কারো দিকে গোপনে চেয়ে দ্যাখা আড়ালের মতো। আড়ালটা মুক্তোর মতো চিকচিক চিকচিক করতে করতে ক্যামন যেন একটা দুঃখ তৈরী করবে, দূর থেকে দূরে ল্যাম্পপোস্ট থেকে ছিড়ে ছিড়ে আসা আলোর মতো...তা তুমি যেভাবে দ্যাখতে চাও-আলোটা তোমার মুখের উপর একটা আবছায়া তৈরী করবে, একটা বাড়তি সৌন্দর্য। এরকম মায়া মায়া আলোর ভেতর তুমি সারাটা দিন থাকতে চাও, সে আমি জানি। সেদিন বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, একটা পুরো আকাশ ভেঙে জল ভাঙার শব্দ তুমি একা একা শুনেছ, একটা ঝুপঅলা গাছের নিচে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। এটা এক ধরণের স্বার্থপরতা, তাই না ? কেন তুমি এতটা স্বার্থপর হবে বলো? ধর, এরকম বারবার তুমি একটা আড়ালের ভেতর থেকে বের হয়ে একটা নতুন আড়ালে ঢুকে যাবার তীব্র বাসনায় নতুন আড়ালে ঢুকে যাবার তীব্র বাসনায় তুমি আর কত আড়াল হবে। প্রকৃতঅর্থে নিজের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা ছায়ার সাথে কি আর আড়াল আড়াল খেলা যায়?

এইযে দলে দলে মানুষ হেঁটে যায় একেকটা বিদ্রোহের আগুন বুকে নিয়ে, তাদের মুখগুলো দ্যাখো, ওখানে শেষ বিকেলের রোদ এসে উঁকিঝুঁকি দ্যায়। একটা বাড়তি ক্ষোভ ওদের চোখে মুখে খেলা করে। তোমার সিনেমা শরীর থেকে রোদ ঝরে না কখনো। শুধূ ল্যাম্পপোস্ট আলোর বাড়তি সৌন্দর্য ছাড়া। এমনটা ভাবা কী খুব যৌক্তিক নয়? সন্ধ্যেবেলা ছাড়া যে তোমার ঘুম ভাঙে না! তুমি জানো না, এই বিকলাঙ্গ সময়ের ভীড় ঠেলে যেকজন মানুষ উঠে দাঁড়ায় বিপুল সাহসে তাদের হাতের উপর হাত রাখা কতটা সহজ! কতটা সহজ একটা রুটি চায়ে ভিজিয়ে খেতে না খেতেই একটা সিগারেট হাতে পুরোটা রোদ ঢুকে যায় মুখের ভেতর।কেননা একবুক আগুন না জ্বলে উঠলে এরকম আগুনখেকো বুক হয় নারে!তুমি একটা আড়াল খোঁজো। বিছানা বালিশ ঠেলে ঠেলে তুমি একটা বৃহন্নলা প্রেম খোঁজো।

তুমি কি জানো এই আড়ালে আবডালে কতগুলো মৃত্যু কথা বলে? অজস্র ঘুমের ভেতর আলো যা সঞ্চিত উজাড় করে করে একটা রক্তঝরা দিন আসে। ওখানে শুধু হুইসেল বেজে বেজে ওঠে-লংমার্চ!লংমার্চ! একটা দেয়াল ঘড়ি ছিটকে পড়লে অনেকগুলো কাঁচ টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তুমি একটা আড়াল খুঁজছো, ভাঙা কাঁচে মুখ দেখলে বুঝতে পারতে মানুষ আসলে কতবড় একটা মুখোশ! রাগ করলে, চলে যাচ্ছো? এসব কথার কোনোটাই যে তোমাকে বলা হয়নি....বড় স্বার্থপর মনে হয় তোমাকে। তোমার এনক্রিপ্টেড চেহারায় এর কোনো ছাপই পড়ে না । আমি জানি, একটা নম্বরের জন্য বারবার ডিজিট ফেল করছো তুমি। স্মার্টফোনে ঘা দিয়ে এখন তুমি চলে যাবে ;জানি। আরো জানি তোমার আড়ালটুকু ইদানিং হারিয়ে যায়...শত সহস্র তোমার মতো সবাই -ই চলে যায়! আর এদিকে লুট হয়ে যাচ্ছে শস্যের ক্ষেত, ফলবতী রোদের আঙুল, বেদনাবহুল ধারাপাতে। পুড়ে যায় দূর্বাদল, বনের চিরল বুক কেটে কেটে উবে যায় নদী-আর তুমি একটা আড়াল খুঁজছো!

মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

মুক্তগদ্য - রাজীব দত্ত

খাঁচার ভেতর অচিন পাখি
রাজীব দত্ত



পাখিরা মাটিতেও থাকে, আকাশেও থাকে। আর আমি পাখিদের দিকে সাবানে চোখ ধুয়ে নিয়ে আকাশে পাখি গুনি। সাবানে চোখ ধুয়ে নিয়ে মাটিতে পাখি গুনি। পাখিরা আড়াল থেকে আমাকে দেখে। আর আমি পাখিদৃষ্টিতে একটু একটু করে ভেঙে পড়ি। আমার ভেতরে থেকে সরিসৃপ বেরিয়ে এসে মাটিতে হেঁটে হেঁটে পক্ষীবিষ্টা খায়। কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘুমায়। এইভাবে যে দৃশ্য সৃষ্টি হয়, পৃথিবীতে তা হামেশাই ঘটে। তাই যারা আমার দিকে দ্বিতীয়বার তাকায় তারা নিতান্তই গাড়ল।

সকালে কুণ্ডলি ভেঙে গেলে আমি ফুলতোলা জাম পড়ে নিই। জামায় বেগুনী ফুলের পাশে নীল পাতা। আমি চোখে সুন্দরবন দেখি। আরো সুন্দর লাগার জন্য গায়ে আতর মাখি। চোখে সুর্মা। আর তখনই দেখি, যে ঘরের বসার রুমের দেয়ালে হরিণের চামড়া, তার শোবার ঘরেই ময়ুরের পালকের হাতপাখা। আমি পাকা সেগুন কাঠের চেয়ারে বসে সেই পাখার বাতাস খাই। সঙ্গে বেলের শরবত। এতে সুন্দরবন সকাল সার্থক হই। আমি আর চিড়িয়াখানায় যাই না। পাঁচ টাকার চিনাবাদাম ভাজা কিনে রাস্তায় ছুঁড়ে দিই। এতে যে পাঁচটা কাক আসে তাদের চিনতে পারি না। কিন্তু বুঝতে পারি, আমার টারজান দেখা হয়নি অনেকদিন। এইবার মিরপুর যাবার আগে দেখে নিবো।

শুনছি, চিড়িয়াখানার পাশেই বোটানিক্যাল গার্ডেন। গার্ডেন মানে বাগান। বাগানে ফুল লতাপাতা থাকে। ফুল সুন্দর এবং লতাপাতায় ভিটামিন প্রচুর। খাওয়া দরকার। খাওয়ার আগে দেখা। দেখার পর সোজা গোবিন্দতে। ওইখানে ভালো নিরামিষ পাক হয়। নিরামিষের পর সুরভী জর্দা দিয়ে পান। পান মানে ধুমপান না। মহেশখালীর পান। যেইটা গাছে ধরে। ভাবছি মংকে বলে একবার মহেশখালীতে পানের বরজ দেখে আসবো। বরজ দেখেই পান খাওয়া ভালো। বরকত হয়।

এইভাবে বিকেল পড়ে আসলে, কাঠাল গাছ দেখার পর মনে হয়। এইখানেই চড়ুইপাখি থাকে। আমিও দাঁড়িয়ে থাকি। চড়ুঁইপাখি দেখি। মনে হচ্ছে এই গাছটা সন্ধ্যাবেলায় অন্তত কাঠাল গাছ না। পাখি গাছ। চড়ুইপাখি গাছ। আমি নিরামিষের ঢেঁকুর তুলতে তুলতে কাঁচা সুপুরি দেয়া জর্দার পান চিবাতে চিবাতে চড়ুই পাখি দেখছি। আমার গায়ে সবুজ জামা। জামায় বেগুনী ফুলের পাশে নীল নীল পাতা। আমার কুণ্ডলী ভেঙ্গে গেছে। লেজ নড়ছে। আমার মনে পড়ছে চোখে সকালে সুর্মা পড়েছিলাম। গায়ে আতর। তারপর এখন পাখি দেখছি।

পাখিরা বাদাম খায় ভালো। ভাবছি, টাকা দিয়ে বড়সড়ো একটা বাদাম বাগানও কিনবো। সামান্য তেলে ভেজে বিকেলে রাস্তায় বেরুবো আর ছিটিয়ে দিয়ে পাখি গুণবো। আর লাইফবয় দিয়ে ধোয়া কুলি করে আসা মুখে গান করবো- খাঁচার ভেতর অচিন পাখি...

আমার ভালো লাগবে।

মুক্তগদ্য - ফয়সল অভি

গোরস্থান
ফয়সল অভি


গুড় দিয়ে মুড়ি খাওয়ার মধ্যে স্বাদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার হাহাকারকে বোঝানো হলো ভালোর সংজ্ঞা । এই ক্ষুধার মানসিকতা এড়িয়ে চলার যাত্রা মাঠ, ঘাট হজম করে নেওয়ার ইচ্ছা থেকে । এইসব বিষয়ের ইতিহাস সম্মুখে রাখা সুদীর্ঘ কালের মোয়া, যাকে কামড়ে কামড়ে শব্দ আসক্তির ফলে বন্ধ চোখে পর্বত ধরে পাথর দৌড়ে কল্পনার স্বাধীনতা বেশ ভোগ করি, উপলব্ধি শব্দের পেছনে আদিমতা দাঁড় করিয়ে তৈরী হয় প্রতিপক্ষ, বোঝাপড়ার আগে অগ্রিম সিদ্ধান্ত আমাদের জানাতে না চাওয়ার ভান পৃথিবীতে আস্ফালন । যার আগুনে হাত পোড়ার পর ফ্যান্টাসির শিখায় বেলা ধরে রঙ মাখামাখি শুধু মাত্র খোদাই কৃত মার্বেল, দূর থেকে অস্পষ্ট বলে কাছে আসতে হয়, এর নাম দেওয়া হয়েছে মিলন । এভাবে মৃত কুকুরে বেল্ট জুড়ে অবাঞ্চিত ছত্রাক তাই গোলা জলের মানবিক নাম শোক । একই ভাবে ডাল দিয়ে ভাত খাওয়ার ভেতর যে জটিলতা তাকে রীতিমতো উপহাস করা হচ্ছে সরলতায়, যেমন ঈদ কার্ডের বর্ণিল বাণী বিনিময়ের আড়ালে আর্কাইভ স্বভাব পুড়িয়ে খাওয়া থেকে, মাখানোর কৌশল জানলো যেদিন থেকে জীবন সংক্ষিপ্ত । কিন্তু, হঠাৎ এই দেশের মধ্যবিত্ত পিতা মাতার যৌনতা থেকে বিতারিত হয়ে সভ্যতার রাত গুলো সাজুগুজু ভৌতিক, অন্ধকারে বেড়ালের পথ খোঁজ চোখের মণিকে অগ্নিকুণ্ড ভেবে ভেবে সচেতন ভয় আর, দুঃসাহস ও জয়ের সীমানা আঁকা নায়ক আর নায়িকা সম্পূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । এতো কিছু পরও, পৃথিবীর একমাত্র অনিবার্য একরোখা শুধু গোরস্থান

রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৩

মুক্তগদ্য - রঙ্গীত মিত্র

বিনায়ক দা এবং এই সময়
রঙ্গীত মিত্র



“একটি অসাধারণ গদ্য লিখতে বলল জুবিন”

ঋতুরা পালাচ্ছে ঐ দেখো
ঐ দেখো তারা আমার মোবাইলের স্ক্রিন।
আমি রোজভাবি প্লেবয় হবো
হতে পারিনা।
রোজ ভাবি কারুর উপকার করবো।
পারি না।
এইভাবে যেতে যেতে দেখি একটা ইওয়ান বাস ডাকছে আমাকে
আরে আমি তো অনেকেই দেখলাম
আমি দেখেছি অন্ধকারকে
কিন্তু কাল থেকে মন খারাপ
আমি ঠিক বড় হয়ে যাব।দেখবেন আমি ঠিক বড় হয়ে যাব...

পর্ব-১

লিখতে বল্লেই হলো! আমি তো আমার ওই “অসাধারণ” লেখা লিখতে পারিনা।জুবিন শুনবে না।আসলে আজ এমনিই ফোন করা।দেশে বেরোনো বিনায়কদার কবিতা নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা।কি অসাধারণ লেখা...প্রতিটা লাইন-ই আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলো...এইযে সময়কে দেখার একটা চোখ...বিনায়কদাই পারে।বিনায়কদার লেখায় বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে...যা আগে বাংলা কবিতায় আমি দেখিনি। শুধু কবিতা কেন? গান, গদ্য , নাটক, প্রবন্ধ সব-ই লিখেছেন বিনায়কদা।কি ভার্সেটাইল মানুষ। এছাড়াও দেবতুল্য মানুষ...সৎ,হেল্পফুল...সবেতেই ১০০তে ১০০ ; আমি অন্ততঃ বিনায়কদার ভিতরে কোনো খারাপ কিছু দেখিনি। এবং এই সময় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত মানুষ তিনি।অথচ কখনো প্রকাশই করেন না।বরং কিভাবে মানুষের পাশে থেকে লড়াই করা যায়...সেটাই দেখান।আমার সব ভালোকিছুই বিনায়কদার জন্যে হয়েছে। বিনায়কদার বাড়ি গেছি অনেকবার।অনেকবার-ই খুব বিরক্ত করেছি।বিনায়কদা আমাকে শিখিয়েছেন,একলা নয় সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।সবার ভালো করতে হবে। আজ জুবিনের সাথে বিনায়কদার লেখা নিয়ে , বিনায়কদাকে নিয়ে অনেক কথা হলো।

দেবায়ূধ,কুবলয়দা,সোহম,জুবিন,অরন্যদা,প্রশান্ত,সৌভিকদা,দেবাদৃতা,আমি এবং আরো অনেকে তাই জন্যে বিনায়কদাকে এতো ভালোবাসি। ওইরকম পবিত্র এবং খাঁটি মানুষ পাওয়া খুব কঠিন।বিনায়কদাকে সেলাম জানাই।


পর্ব-২

গড়িয়াহাটের রাস্তায় হাঁটলে অনেক সুন্দরীদের দেখা যায়।তারা নিজেরা যতটা সুন্দরী নয় তার থেকে এক্সপোজ করে। শরীরটাই নাকি সব।আমার প্রজন্ম সেটাই বোঝে।তাদের কাছে দামি ওয়াইন আর পেট্রোল একই।তারা আবিস্কার করতে চায় না। বরং একই জিনিস ফলো করে।ইদানীং কেউ কেউ নিজেকে আলাদা প্রমান করে।বলে তারা বিপ্লবী।কিন্তু ভিতরে তাদের কিছুই নেই।নিম্নমধ্যমেধা। মেয়েদের বিভিন্ন রং-এর জিন্সের মতো আমাদের যাপন। এইভাবতে ভাবতে লেকমার্কেটে দাঁড়িয়ে আছি। শরীর বার করা মেয়েদের বার-ভীর করা দুপুর আজ।আজ তাদের বয়ফ্রেন্ড বদল।হাত নেড়ে ট্যাক্সী ডাকাটাও তাদের কাছে ফল পেড়ে নেওয়ার মত । সেইরকম একটি মেয়ে অনেকক্ষণ ধরে ফোন করছিলো।হঠাত দেখলাম একটি গাড়ি এলো।গাড়ি তাকে তুলে নিয়ে হু হু করে চলে গেলো।এ প্রসঙ্গে বলে রাখি আজকাল ট্যাক্সির পিছনে তো চোখ ফ্যালা যায়-ই না। দামি গাড়ি জামা কাপড়—গ্ল্যামার হোটেলের দরজার ফুটোদিয়ে সব ইন্টার নেট করে দেয়।তবে একেই বলে বেঁচে থাকা।আধা-প্রস্টিটিউসান কি? আসলে যৌনতাও একটা চাপিয়ে দেওয়া।এদের কাছে সব কিছুই নিয়ম।কোথাও রহস্য নেই। বদলের বদলে কেবল পিছনে চলে যেতে যেতে জামাকাপড় ছোটো হতে থাকে।যদিও আমি ওয়েস্ট্র্যানাইজেশানকে সমর্থন করি।কিন্তু কপিপেস্টকে নয়।যার ভিতরে কিছুই নেই সে শুধু কেন বড় বড় কথা বলে যাবে?মামদোবাজি নাকি? নারীস্বাধীনতাকে আমিও সমর্থন করি।আমার-ও ভালো লাগে একটি মেয়ে পুরুষের থেকে এগিয়ে আছে...কিন্তু সে যদি কিছুই বোঝে না...শুধু শরীরটাই সব তার...মাথায় তার কিছু নেই...তার সাথে কি কথা বলবো? আমরা শুধু তাই কপিই করে যাচ্ছি...এটাই জীবন...


পর্ব-৩

বৃষ্টির এলো।আস্তে আস্তে।পৃথিবীটা যেন ইউনিসেক্স টয়লেটের মতো। একটি মেয়েকে দেখলাম ছাতা আছে অথচ ভিজছে।তার শরীর...স্তন...জিন্সের কোমর...ভাঁজ উঠে আসছে কাগজের উপর...যেরকম ফুল ফুটে ওঠে...যেরকম সিগারেটের প্রথম ধোঁয়া...যেরকম ভদকার ফ্লেবার...যেরকম প্রথম প্রেম...সব কিছুর ভালোর ভিতর থেকে সে অপরূপা হয়ে বৃষ্টীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে আমার হৃদয়...আমাদের গোলপার্কের মোড়...তবে এখনো সব কিছু সহজ ও অনেক হয়ে গিয়ে বড় ভুল হয়েছে।কারণ আমি দেখলাম একটি মেয়ে বাইকের পিছনে বসে বৃষ্টীতে ভিজছে।তার শরীরের সব অংশ...সার্ট...মাইক্রো-মিনিস্কার্ট থেকে বেরিয়ে আসছে...যেরকম টিউব থেকে মাজন বেরিয়ে আসে...আমার চশমায় তার ছাপ...আমাকে যৌনঋণী করে দিয়ে সে চলে যাচ্চে...কিন্তু আমাকে আর বসে থাকলে হবে না।ক্যাফেলায় যেতে হবে।সুতপা এখন ঘুমছে।সৌভিকদা,দিপ,কৌস্তব,কিঙ্কিনিরা বসে আছে...আমি লেকেরা রাস্তায় দেখেছে এক মধ্যতিরিশের মহিলা বিয়ার খেয়ে বিয়ারের ক্যান ফেলে রেখে যাচ্ছে...আমি দেখেছি একটি মেয়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ছেলেদের...তার শরীরে টোমাটোর মতো সূর্য লেগে...তার শরীরের আমাজন...নদীর গতিপথে দাঁড়িয়ে বলছি আমি ভিতরটাকে আরো প্রসারিত করো কমরেড...দ্রুত দ্রুত দৌড়াতে গেলে আরো আন্তর্জাতিক হতে হবে।আরো অ্যাডভান্সড হতে হবে।নিজেদের আপডেট করতে হবে। সব কিছুই তো জীবনের অঙ্গ।কিন্তু আগে হিউম্যানফিলিংসগুলোকে জাগ্রত করো...নিজেকে কোথাও আটকে রেখোনা।কাউকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে যাও...এনজয় ইয়োর লাইফ বস...

সিস্টেমের বাইরে গিয়ে অন্য কিছু করে দেখানোর সিস্টেম হয়ে যাওয়া না হয়ে যাওয়া একদম নিজের ব্যাপার...একবার সেই দিকে প্রকৃতির মতো তাকিয়ে দেখো

সে অপ্সরীর মত তাকিয়ে আছে...


শুক্রবার, ৩১ মে, ২০১৩

মুক্তগদ্য - মিলন চট্টোপাধ্যায়


হিম্‌-রাতের পাঁচালী
মিলন চট্টোপাধ্যায়



রাস্তাটা কেমন ধোঁয়া মেখে আছে । ঠাণ্ডা একটা নীল্‌চে কম্বলের মত ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার আবরণ অদ্ভুত শূন্যতা সৃষ্টি করছে চারপাশে ।

বাড়ির সামনের গলিটায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছে পিছন থেকে কাঁধে হাত দিয়ে এই বুঝি কেউ বলবে - ' কীরে কেমন আছিস ? '

এই রাতে শুনশান রাস্তায় হাঁটলে ফেলে আসা ছেলেবেলা মনে পড়ে । আগে ছোটোরা মিলে বিকেলেই শুকনো পাতা, কাঠ জোগাড় করে বারান্দায় রেখে দিতাম , না বারান্দা বললে ঠিক বোঝানো যাবে না, আমরা রক্‌ বলতাম । তারপর রাতে পড়া শেষ হলে খেয়েদেয়ে এসে গোল হয়ে বসে আগুন ধরাতাম, আর পাড়ার বয়স্করা ভূতের গপ্পো শোনাত ।

কৈশোরে গানের লড়াই খেলতাম বা মেমোরি গেম । নানা অদ্ভুত খেলা বানাতাম । সব হারিয়ে যায় । যৌবনের দিন খুব কষ্টের , প্রথমে বেকার, তারপর একটা কাজের জন্য হন্যে হয়ে চেষ্টা , এরমধ্যেই প্রেম । যদিও সেই প্রেম আসলে স্বার্থ চিনে নেয় দ্রুত । ভুল ভেঙে গেলে হতাশা, তারপর নির্বিকারত্ব । তারপর আবার খোঁজ, অবশেষে খুঁজে পাওয়া ।

আজ হঠাৎ মনে পড়ছে সব , আর ইচ্ছে করছে তার সাথে বসে থাকতে, তার হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে, কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ রবি ঠাকুরের গান শুনতে । খুব ইচ্ছে করছে , খুব । আর কে না জানে ইচ্ছে আসলে কারো বারণ শোনে না ।

গল্পসমগ্র - তন্ময় রায়

গল্পসমগ্র
তন্ময় রায়



( “ভালো খাবার... ভালোবাসা ওষুধ... ভালো ওষুধ... ভালো ভালোবাসা...” – বিশু)


হাওয়া দিচ্ছে মানে ভালো গান :

১.

ভালোবাসারও বিশু শব্দ প্রিয়। অভ্যাসে বিশু সবসময় পরম। চোখ থেকে গীতা ঝরুক বা গ্রহণদারু, তার কিছুই আটকায় না – সোজা জিভ ছুরে মারে!

শীত করার কথা ছিল কিনা জানতে, বিশু ডাক্তার ঘুরে আসে।

ডাক্তারকে সে তার জিভ দেখাতে পারেনি।

বিশু এবং ছাদ দুটোকেই খালি করার কাজ শুরু হল বলে...

২.

প্রত্যেক ঘরের নিজস্ব গন্ধ আছে। বিশুর ঘরের গন্ধটাও বিশু।

বড়ো বাক্য লেখা আমার ধাত নয়, মাঝেমাঝে বিশুকে ধার করতে গিয়ে জানতে পারি, ও শিস ভালোবাসে – শিস দিয়ে ফিরলে গলিটা বুকপকেট ছুঁয়ে থাকে, শিসটা ঘর হয়ে যায়

৩.

নিজের দিনে জীবনের দিন খেতে বসলে বেদম কাশি ওঠে, কিন্তু বিশু কোনোদিন লাল হয়ে ওঠে না। এটা চিন্তার বিষয়। বিশ্বাসের ছবিরা দেওয়ালে আঁটে না এবং সেই ছবিতে বিশু কোনোদিন মালা চড়াতে যায়নি। দেখাগুলোর যত মধু মাথায় সাজানো, সেখানে জ্বর আসে। আর আজ মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে। এটাও চিন্তার বিষয় কিনা ভাবতে ভাবতে বিড়ি ধরায় ।

সোমবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৩

মুক্তগদ্য - উজান



সিলেবাসে নেই
উজান
এবং তারপর যখন আমার ঘুম ভাঙ্গল......অথবা ভিতরে ভিতরে যখন আমি ঘুমচ্ছিলাম না...সেরকম একটা  সকালে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে উঠে বেরিয়ে গেলাম জানলা খুলে। 
সেদিন যে বেরিয়ে গিয়েছিলাম তারই কামড়ে আমাকে আর বাধা যাছে না ভালো মেয়েদের মতো । আমার বইয়ের ভাঁজ খুললে মা, তুমি যদি ঠিক করে দ্যাখো দেখবে যা তুমি খুঁজছ পুড়িয়ে দেবে বলে তা কবেই পুড়ে খাক । মিঠিমিঠি প্রেমপত্তর,কুয়াশা কুয়াশা কবিতা, ভিনিভিনি শরীর আর সামলাতে না পারা greedy algorithm পুড়ছিল সব...পুড়ে যাচ্ছে এখনও। ওদিকে তাকিও না মা......যদি তুমিও পুড়ে যাও...
আমার নবম শ্রেণিতে আমি শাড়ি পরতুম না...তবে বেনিমাধবের মতো মেঘবালিকা আমি ছুমু খাওয়ার নিয়ম জানিনা বলে হেসেছিল খুব। আমাকে ডাক্তার বানাতে চাওয়া আমার ইংরিজি স্যার আমার সিলেবাসখানি বুঝতেন  বলে খাতার পিছনে কবিতার মতো কাটাকুটি পড়ে বকেননি কক্ষনও। স্যার তুমি আমার ‘যদিদং হৃদয়ং...তদিদং হৃদয়ং’ সিলেবাস জানো? স্যার জানো আমি নদীর মতো মেয়েটিকে খুব ভালোবাসি ।ও বলে আমি ওর প্রেমিক ।
নিয়ম করে আমার তেমন ঘুম পায়না । নিয়ম করে আমার তেমন ঘাম ঝরে না । নিয়ম করে আমার তেমন কবিতা লেখা হয়না । নিয়ম করে প্রেম পায়না । নিয়ম করে ধর্ম মানা হয়না । নিয়ম করে জামা পরা  হয়না । নিয়ম করে মিছিলে হাঁটা হয়না । নিয়ম করে যুদ্ধ করা হয়না নিয়ম করে অনিয়ম করাও হয়না তেমন।
পাপ্পুদাদা বলতো ‘out of track
মা আমার জমান কবিতার বই পুড়িয়ে দেবে বলেছিল...সিলেবাসে নেই।
আমি সকালে ঘুম থেকে উঠি । আমি রাতে যদিও ঘুমোই না । আমি সময় সময় মতো ঘুমতে যাই । যদিও তেমন জাগিনা। আমি নিয়ম করে বর্ম চাপাই বুকে ...আমই তার তলায় আমর ধর্ম লিখে রাখি রোজ।
আমর সিলেবাসের কাগজটায় ন্যাপথলিন দিয়ে রাখি। আমি কোন ডায়েরি লিখিনা । আমি একটি রাগি মোবাইল নম্বরে... আমি একটি অভিমানী মোবাইল নম্বরে মেসেজ করে লিখে রাখি সব। সে বলেছে সে সব উত্তর লিখে রাখে তার ডায়েরিতে।
আমার অনিয়মগুলো বোঝা গেলনা বলে পাখিটি উড়ে গেল তার বরফের দেশে । এসব সিলেবাস লিখে শিখে রাখলনা। আমার অনিয়মগুলো বোঝা গেলনা বলে পাখি বলেছে আর সে ফিরে আসবেনা কখনও । আর সে আমাকে আদর  করবেনা প্রেমিকার মতো...। আর সে তার নতুন প্রেমিককে কষ্ট দেবেনা কখনও। আমর নিয়ম করে ভালবাসা হল না তাকে। ভালোবাসা অনিয়ম ছাড়া চলেছিল কবে?
আমার গায়ে জমে থাকে ‘তুম হি সোচো জরা...কিউ না রোকে তুমহে...’
আমার মাথায় জমে থাকে ‘ম্যায় তো লেট আউ...’
আমার সমস্ত উচিত ভাসিয়ে নন্দিনী আসেনি এখনও

পাপ্পুদাদা বলতো ‘out of track
মা আমার জমানো কবিতার বই পুড়িয়ে দেবে বলেছিল...সিলেবাসে নেই।

বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১২

শিলালিপিতে খোদাই করে যাবো তরুণদের কবিতা - অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

শিলালিপিতে খোদাই করে যাবো তরুণদের কবিতা
অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়


কাল যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায় আজ আমি কী করব ?
কাল যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে আজ আমি কী করব , এটা ভাবতে ভাবতেই ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে যেতে পারে । এত কিছু করার আছে , এত কিছু করতে বাকি , কোনটা করব কোনটা না করব সেটার জন্য চব্বিশ ঘন্টা বোধহয় যথেষ্ট নয় । তবু ভেতরের কিছু সুপ্ত ইচ্ছে পিপীলিকার ডানা গজায় মরিবার তরের মতো “কল্পনা আজ চলছে উড়ে হালকা হাওয়ায় পাল মেলে/ পাঁপরি ওজন চলছে তাতে সেই হাওয়াতে পাল পেলে” । যদি সত্যি তাই হয়, অর্থাৎ “ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা” যখন আমি তাহলে শ্রীজাত, বিনায়ক আর অংশুমানকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের তরুণ কবিদের জন্য মহাকালের পাশে রেখে যাবো তাঁদের সৃষ্টি । পৃথিবী যদি সত্যি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে পাঠক তবলে আদৌ তো কেউ থাকবে না, আমরা যাদের নিয়ে নান্দনিকতায় মগ্ন থাকি সেই এক একটা টুকরো ইমেজারি চলে যাবে উদভ্রান্ততার ঈশ্বর গহ্বরে । থাকবে না এই কাগুজে লিপি, বৈদ্যুতিক লিপি । কিন্তু হয়তো বা অজন্তা ইলোরা রেখে যাবে তার সামান্য ধ্বংসাবশেষ । আর তার জন্যই আমি বেঁচে থাকা বাংলাভাষীদের শেষ মুহূর্তে জানিয়ে যাবো আমাদের পরবর্তী তরুণ কবিদের সৃষ্টির মাহাত্ম । আমার স্বপ্ন আমি, শ্রীজাত, বিনায়ক আর অংশুমান মিলে একটা ব্লগ করব শেষ দিনে তাতে বাংলা ভাষার সমস্ত তরুণদের প্রচুর কবিতা সংকলিত করে শেষ দিনেও অন্তত চল্লিশ হাজার পাঠককে তাদের কবিতা পড়াবো । তারপর যতখানি পারব সবাই মিলে সেই কবিতাগুলোকে খদাই করে রেখে যাবো শিলালিপির মতো কোনো গুহার ভেতরে যাতে ধ্বংসের পর আবার যদি কোনো সভ্য মানুষের উৎপত্তি হয় আর তারা যদি বাংলাভাষাটা বুঝতে পারে তাহলে তাঁদের জন্য থাকবে আমাদের চারজনের তৈরী এই তরুণ কবিদের পাথুরে শিলালিপির সংকলন । হতেও তো পারে, এটাই হয়ে উঠবে তাঁদের কাছে কবিতা কী তা জানার একমাত্র উপায় । হতে পারে কয়েক হাজার বছর পরে যখন মঙ্গলগ্রহের কোনো প্রান কিউরেটরের ধ্বংসাবশেষ দেখে পৃথিবীর সন্ধান করতে এলো , বা স্পিলবার্গের কোনও ভিনগ্রহের প্রাণী এসে যদি বাংলা বুঝতে পারে তাহলে তারা দেখতে পারবে এই সময় ভাষার এক অনুপম আঙ্গিক । সেই হবে আমার শ্রেষ্ঠ চাওয়া ।


ইচ্ছে যখন শেষ মুহূর্তেরই তখন ইচ্ছেকে দমিয়ে রাখতে নেই । জানি স্রষ্ঠার এই ভয়ানক ধ্বংসলীলার চেয়ে সন্ত্রাস আর কিছু নেই , তবুও যারা ধ্বংসের আগে এই সুন্দর পৃথিবীকে ধ্বংসের পথ দেখিয়েছিলেন তাঁদের অন্তত মরার আগে কিছু দিয়ে যেতে চাই , বুঝিয়ে দিতে চাই ধ্বংসের চেয়ে জীবনের মূল্য কতখানি ছিল । যদি সেই চব্বিশঘন্টায় তাঁদের কাছে পৌঁছনোর কোনও অতিপ্রাকৃতিক শক্তি পেয়ে যাই, তাহলে অবশ্যই আমি শেষ চব্বিশ ঘন্টায় যেতে যাই পৃথিবীর সমস্ত সন্ত্রাসবাদী ব্যক্তিদের বা গোষ্ঠীদের কাছে আর উপহার দিতে চাই ‘লেভ তলস্টয়’ এর বই – ‘রেজারেকশন’ । আর ধ্বংসের আগে আমাদের এই সোনার বাংলার অন্তত ৫০ জন কিশোরকিশোরীকে উপহার দিতে চাই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সমগ্র কিশোর সাহিত্য’ । আর যদি আমার একেবারে ব্যক্তিগত ইচ্ছের কথা বলতে হয় তাহলে আমার একান্ত ইচ্ছে বাইরের সেই ধ্বংসের উষ্ণ হাওয়া বইবার আগে, সমুদ্রের জল আমাদের চারপাশকে ঘিরে ঘোরার আগে আমার প্রথম প্রেমিকার সঙ্গে শেষ মুহূর্তের অন্তিম অবস্থান একটা ফাঁকা সিনেমা হলের মধ্যে টাইটানিক এর সেই দৃশ্যে যেখানে রোজ আর জ্যাক সমুদ্রে ভাসছে । ঠিক সেই সময়েই যেন পৃথিবী ধ্বংস হয়, আর সিনেমাটাও যেন ফ্রিজ হয় সেখানেই , এর থেকে পরম পাওয়া আর কী হতে পারে ... 41°46' N, 50° 14' W এর সেই অন্তিম সলিল সমাধি ।

বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১২

মৌ মধুবন্তী - শিশু ও অবিচার বিক্রি হয় না

শিশু ও অবিচার বিক্রি হয় না
মৌ মধুবন্তী


বয়েস মাত্র ৮ এবং ৯। ব্যস্ততম উন্নত দেশের সর্ববৃহৎ আলোকোজ্জ্বল নগরী নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের উল্টো দিকেই রমারমা ব্যবসা। খদ্দের-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনটে কচিলতা মুখ। নির্ভীক উচ্চারণ, একজন নিলে ২০ ডলার ৩ জন নিলে ১০ ডলার কম। আমরা তিনজনই বান্ধবি। টেক অল থ্রি অফ আস।

এই প্রেজেন্টেশান শেষ করে ঘরে ফিরে নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে রেখেছি সারা রাত। কোনটা শিশুশ্রম?

একি শিশুশ্রম নাকি আর কিছু? সময়ের বিবর্তন কি এইভাবে টোল বসায় জীবন নগরের উপর? কি গ্রাম, কি শহর, কি উন্নত দেশ আর অনুন্নত দেশ চিত্রের ভেদ ন্যুনতম।

আজকের উন্নত বিশ্বে প্রায় ৮০ ভাগ ছাত্রছাত্রী ছাত্রাবস্থায় কাজ শুরু করে। বয়েস একেক প্রভিন্সে একেক রকম হলেও ন্যুনতম বয়েস ১৪ থেকে ১৬ বছর। এরা প্রতি ঘণ্টায় পায় বড়োদের যা মিনিমাম বেতন তার চেয়ে অন্তত এক ডলার কম। তবে অনেকেই বেআইনিভাবে ও কাজ করে যাদের বয়েস উল্লেখ করতে গেলে আত্মা কেপে ওঠে। ৮ বছর থেকেই শুরু করে দুর্বার কঠিন সংগ্রাম। দুইরকম জীবনের গন্ধে এদের শ্বাস রোধ হয়ে আসে। এক নিম্ন বেতন। আরেক বেআইনিভাবে কাজের অভিজ্ঞতা । ক্রমশই আইনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে এদেরকে। কারন এরা বিচার পায়না প্রকৃত অর্থে কার ও কাছেই। না ঘরে, না কাজের জায়গায়। এদের মৃত্যুতে কেউ শোক গাথা গায় না। কেন এদের জীবনের শুরু হয় এমন অন্ধকারে?

অনিশ্চয়তা, অভাব ও অন্ধত্বই শিশুদেরকে অবেলায় কাজে যেতে বাধ্য করেছে। জানা নেই সেই সব বাবা মায়ের যে শিশুর বেড়ে উঠতে একটা নির্দিষ্ট বয়েস সীমা লাগে। চারিদিকে হাহাকার। সবাইকেই কাজে নামতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশান নেমে আসে পৃথিবীর বুকে, ঘরের কাজগুলো চলে গেছে ফ্যাক্টিরিতে। বাবা মা বোঝেনি যে একদিন যে শিশু ঘরের আঙ্গিনায় ফলমুল লাগাতে সাহায্য করত, আজকে তাকে ও কারাখানায় কত কঠিন পরিশ্রম করতে হচ্ছে। শুরুটা ঘরের চাহিদা মেটাতে এমনই বলা যায়। তারপর ক্রমশঃ ক্যাপিটালিস্ট সমাজ সুযোগ নিতে থাকে এই শিশুদের শ্রমের উপর। গতর ছোট, হাত ছোট, উৎপাদন কম( আসলেই কি কম ছিল?) তাই বেতন ও কম।

“Injustice doesn’t sell”- এই সব শিশুশ্রম নিয়ে বিশ্বে জাগরূক কিছু লোক কাজে মেতেছে। এতে বড়োদের পেটে ভাত জুটাবার আরেকটা উপায় বেরিয়েছে। কিন্তু শিশুদের অবস্থার কতটা উন্নতি হয়েছে তা কেবল সময়ের কাছে প্রশ্ন রেখে থমকে যাচ্ছে বিবেক।

বিশ্বের যাবতীয় শিশুকে দেখবার সময় একসাথে কারোই হবে না, হয় না। সম্ভব না। যেদিন আমি ডান্ডার্ণ ক্যাসেল, হ্যামিল্টন, অন্টারিওতে ঘুরে ঘুরে দেখছি আর ইতিহাস শুনছি, সেই ১৮৩০ সালের তৈরি ক্যাসেলের উন্নত সভ্য ডিসরুমে ঢুকে বাহারি সব ডিসের নমুনা দেখছি। তখন জানতে পেলাম সেই সময়ে ১০ বছর বয়েসের একটি মেয়ে মাসে মাত্র ১ ডলার বেতনে সারাদিন ঐ ব্যাসম্যান্টের কক্ষে ডিস ধোয়ার কাজে রত থাকতো। কোন ডিস ভাঙলে এক বেলা খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হতো। সেই কক্ষেই তার জীবনের এক বৃহৎ অংশ কেটে গেছে, বাবা মা আত্মীয় প্রিয়জনহীন। তার কেউ ছিল না। তবে কি সে না খেয়ে মরে যেত? কাজ তো কেউ দেবেই। সেদিন কি তার কাছে কোন উপায় ছিল? তার উপর মেয়ে বাচ্চা। নিরাপত্তা কোথায়? ধর্ষিত হতে মেয়ে হলেই তো হয়। বয়েস লাগে না। একটা গুহার দিকে ইঁদুরটা হা করে থাকে ।শুধু সুযোগটা এলেই হয়। ভালো কথা, একটা পরিচয় ও ইতিহাস এখানে সংযুক্ত আছে। স্যার এলান নেপিয়ার ম্যাকনাব, তৎকালীন রেলের একজন ম্যাগনেট ছিলেন। আর ছিলেন পেশায় ল’ইয়ার। পরবর্তিতে তিনি ইউনাইটেড কানাডা (১৮৫৪-১৮৫৬) এর প্রথম প্রিমিয়ার ছিলেন। তার পরিবার সহ তিনি উপরের কক্ষে আয়েশে বসবাস করতেন আর মাটির নীচের ব্যাসম্যান্টের কক্ষে থাকত চাকর-বাকর যারা তার বিলাসী জীবনের রসদ যোগান দিয়ে জীবিকা অর্জন করত। ইউনাটেড কানাডায় এই ছিল ইউনিটি।

ছোট একটি ঘটনার বহুল হৃদয় বিদারক কাহিনীটা বলি। যে কাহিনী পত্রিকায় আসেনি। কিন্তু আমার কাজের ক্ষেত্র থেকে আমি জানতে পারি। ২২ বছর বয়েসের একটি বিবাহিতা মহিলা তার একমাত্র মেয়ে যার বয়েস তখন ৫ বছর, কোন এক উপায়ে এসে হাজর হয়েছে কানাডায়। স্বামী ব্যবস্থা করেই পাঠিয়েছে, একদিন সেও কানাডায় আসবে এই আশা নিয়ে। কাজের অনুমতি নেই বলে যে কোন কাজেই যেতে বাধ্য এই মা। কিন্তু মেয়েকে কোথায় রাখবে? কাজ নিয়েছে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির বাসায়। ঘর দোর পরিষ্কার থেকে শুরু করে রান্নায় সাহায্য করা সবই তার কাজ। দু’জনের থাকার জায়গা হয়েছে বেশ। আনন্দে মন ভরে উঠেছে। যে পরিচিত লোক তাকে কাজ দিয়েছে, সে কোন চুক্তিতে কাজ দিয়েছে সে তো জানতো না? মাসের শেষে যে কয় টাকা বেতন পেত সব তার হাতে যেত। বাসার বাসিন্দা মাত্র চারজন। স্বামী স্ত্রী আর দুই ছেলেমেয়ে। কথা হলো নেয়েটি তাদের বাচ্চাদের সাথেই স্কুলে যাবে। যায়। ভাষার যে দেয়াল ছিল তা ক্রমশ সরতে থাকে। মেয়ে মাকে দু একটা করে ইংরেজি শেখায়। একদিন মেয়ে দেখে ফেলে মালিকের কাছ থেকে সেই আংকেল টাকা নিচ্ছে এবং যেহেতু সে ইংরেজি বোঝে তার বুঝতে বাকী রইলো না যে তার মায়ের ও তার কাজের পয়সা তাদের ঠকিয়ে আংকেল নিয়ে যায়। আংকেল ও বুঝতে পেরেছে মেয়ে জেনে গেছে। সেই সন্ধ্যায় আংকেল অনেক কৌশল করে মেয়েকে কিছু কাপড় কিনে দেবে বলে পাশের শপিং মলে নিয়ে গেল। মায়ের আপত্তি করার কিছু নেই। এই লোক প্রথন দিন থেকেই তাকে সাহায্য করছে। সেই যে মেয়ে গেল আর কোনদিন মা জানতে পারেনি তার মেয়ে কোথায় কেমন আছে। সেদিন থেকে আংকেল কে আর কোঠাও খুঁজে পাওয়া যায় নাই। সেই মায়ের করুণ আর্তি আমি বর্ণনা করতে অক্ষম । আজকাল এই ধরনের ঘটনা থেকে ছেলে বাচ্চারাও রেহাই পাচ্ছে না।

আজকের বিশ্বের দিকে তাকালে যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তার একটা ছোট্ট চিত্র তুলে ধরছি, গড়ে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়েসের শিশুরা প্রতি ৬ জনে একজন কাজে নিয়োজিত। এই বয়েসের শিশুদের শতকরা ১৬ ভাগ কাজে রত- এ হোলও ডেভেলপিং দেশের চিত্র। তার চেয়েও নিম্মানের দেশগুলোতে শতকরা ৩০ ভাগ শিশুরা শিশুশ্রমে নিয়োজিত। সারা বিশ্বে ১২৬ মিলিয়ন শিশু কাজ করে খুবই হ্যাজাডাস পরিবেশে। প্রায়শ তারা মারধরের, গালাগাল থেকে শুরু করে যৌন নির্যাতনের পর্যন্ত শিকার ।প্রায় ১।২ মিলিয়ন শিশু ( বালক ও বালিকা) প্রতিবছর পাচারের শিকার হয়। অতপর এদের ঠাই হয় কখনো কখনো কৃষি কাজে,খনিতে , কারাখানায়, অস্ত্র কারাখানা সহ কমার্শিয়াল যৌন বিক্রি কারাখানায়। যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি কি করে নিউ ইয়র্কের উজ্জ্বল আলোর চারিদকে তাদেরকে দিয়ে ব্যবসা করানো হয়। এই ট্রাফিকিং এর শিকার হয় বিশেষ করে মেয়েরা, সর্বনিম্ন ১৮ মাস থেকে উর্ধে ৭৯ বছর পর্যন্ত। নিরাপত্তা কোথায় মেয়েদের জন্য? নো সেফ হোম। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী শিশু শিশুশ্রমের সাথে জড়িত সাব-সাহারা, আফ্রিকাতে।

এর সাথে অবশ্যই জড়িত আছে দেশে আর্থসামাজিক অবস্থা এবং শ্রেণিভেদ। এই শ্রেণিভেদের শিকার হয় গরীব শ্রেণি ও মধ্যবিত্ত সমাজ। এখানে এসে প্রশ্নের মুখোমুখি হই। জম্নেই যে শিশু দুধ পায়না খেতে তাকে কে পাঠালও দুনিয়াতে? যদি সে ঈশ্বর, তবে ঈহস্বরের ঘরে কেন তার জায়গা হয় নাই? কোন দোষে তাকে বিনা আহারের ব্যবস্থায় এই পৃথিবীর ধ্বংসযজ্ঞে নেমে আস্তে বাধ্য করেছে? কেন তার জন্য বাসস্থান তৈরি হবার আগেই সে এসে পড়েছে জন্মলাভের টিকেট কেটে এই ধরায় অধরা হয়ে থাকতে? কে তুমি ঈশ্বর। তোমার কাছে জিজ্ঞাসা বিচার কি কিনলে পাওয়া যায়? কে তবে বিক্রি করে? তুমি? তোমার অনুচর সাগরেদ? আমি এর বিচার চাই। কোথায় তোমার দোকান বলো, আমি কিনে নেব আমার অসহায় শিশুদেরকে এই অসহায় পৃথিবীর আবর্জনা থেকে। শিশুদের জন্য গড়ে তোলও এক মুক্ত পৃথিবী ভেদাভেদ হীন একটি মঞ্চ শিশু মঞ্চ।

টরন্টো, কানাডা