ধারাবাহিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারাবাহিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০১৪

ধারাবাহিক - সৌমিত্র চক্রবর্তী

বহুগামীতায় থাক হে ঈশ্বর – ছয়
সৌমিত্র চক্রবর্তী



কৃষ্ণচূড়ার ডাল একে একে হাসতে শুরু করেছে। খাঁটি লাল রঙ ছেনে নিবিড় মনোযোগে সে এখন ব্যাস্ত তার ভালোবাসার ফুলগুলো তৈরী করতে। প্রিয় ফুল খেলিবারই দিন যে অদ্য। সে না ফুটলে পৃথিবীর তাবৎ প্রেমিকযুগল যে অথৈ জলে পড়বে। ওদিকে পলাশ তৈরী তার ভালোলাগা-ভালোবাসার সম্ভার নিয়ে। দেখতে দেখতে আরো একটা রঙিন বসন্ত এসেই গেল। চারপাশের মানুষেরই তৈরী করা দুঃখ, অন্যায়, অভাব অতিক্রম করে যায় এই মাত্র কয়েকটা দিন। এ সময় সখী রঙ লাগানোর মনে।

কাঁধের ঝুলিটা সামলে নিয়ে থমকে দাঁড়ায় লোকটা। হাত বোলায় তার উস্কোখুস্কো চুলে। দুমড়ে যাওয়া আধময়লা জামা প্যান্ট, মুখের কতদিনের না কামানো দাড়ি, হাত পায়ের শাসনহীন নখ তার যাযাবরবৃত্তিকে প্রকট করেছে। ঠিকমতো বলতে গেলে উচ্চৈস্বরে ঘোষণা করে চলেছে। এই ট্রেডমার্ক তার ইচ্ছাকৃত নির্মাণ নয়। কিছু আলস্যে, কিছু মনের ভুলে, আর কিছুবা অভিমানে। ঠোঁটের কোনায় স্নিগ্ধ হাসির একচিলতে রেখা ফুটে ওঠে তার। বাসন্তিক এই সময় প্রেমের। আর প্রেম তার জীবনে ঘুরেফিরে এসেছে বারবার। কখনো নীরবে, কখনো সশব্দে রীতিমতো জানান দিয়েই। বারবার সামুদ্রিক টাইফুনের মতো আছড়ে পড়েছে তার ওপর, ছিন্নভিন্ন করে দিতে চেয়েছে তার বৈরাগ্য সত্বাকে। কিন্তু তার শতাব্দীপ্রাচীন কচ্ছপের খোলার মতো মনকে ভেদ করতে পারেনি কেউই। কেন জানিনা তার মনে হতো ওই সমস্ত প্রেমের উচ্চন্ডতায় ভালোবাসার চেয়ে দৈহিক সম্ভোগের ইচ্ছে কিম্বা তার আর্থিক স্তম্ভের প্রতি ভালোবাসাই বেশি ছিল। বারবার, তার বন্ধ দরজায় প্রেম কড়া নেড়ে ফিরে গেছে। লোকটার মনে এতটুকুও আঁচড় কাটতে পারেনি কেউই, শুধু একজন ছাড়া।

চমকে শক্ত মাটির ওপরে আছড়ে পড়ে লোকটা। তার মনের সারাগায়ে লেগে যায় ধূলো। দুহাত দিয়ে ঝাড়তে গিয়ে নজরে পড়ে আকাশের আশ্চর্য ঔজ্জ্বল্য। চারপাশ এতো ঝলমল করছে। “ভালোবাসি ভালোবাসি, এই সুরে কাছে দূরে জলেস্থলে বাজায় বাঁশি”। গলার কাছে হঠাৎ শক্ত কি একটা যেন অকারণেই দলা পাকিয়ে ওঠে। কয়েকদিন আগেই পড়েছিলো এক কবি বলেছেন – “ সব নন্দনতত্বই থাকে যোনির নিচে”। সত্যিই কি তাই? সত্যিই কি সব ভালোবাসা-প্রেম উত্তরিত হয় জননেন্দ্রিয়র কেন্দ্রে? তাহলে আকাশ হাসে কেন? হাওয়া সিরসিরে ছোঁয়া দিয়ে উতল করে কেন? আপন আনন্দে একলা মাঝি গলা ছেড়ে উদাত্ত গানে কেন নিজেকে মজিয়ে দেয়? সবই কি কামগন্ধসর্বস্ব? কে জানে এর উত্তর? কে জানে? দৈহিক মিলন যে কত আনন্দের হয়, কত নিবিড় প্রেমের জন্ম দিতে পারে তা সে নিজে জানে। আসলে এই রূপকথার রাজ্যের চাবির খোঁজ সবাই পায়না। শুধুমাত্র বীর্যস্খলনেই তাদের আনন্দ। আর তাই পরস্পরের সঙ্গে দেখা হলে একে অন্যকে বলে ভালো থাকবেন। কিন্তু ভালো থাকেনা কেউই। ভালো থাকতে জানেনা কেউ।কেউ ভালো নেই মনের অসম্পূর্ণতায়।
ভালো থাকো বললেই
ভালো থাকা যায়?
যত সব স্বপ্নবাজ ইচ্ছেসকল
ভালো নেই বিষন্ন সন্ধ্যের
টুকরো আকুলতায়।

ভালো থাকো বললেই
কি করে ভালো থাকা যায়?
দুপুর প্রায় গড়িয়ে গেল। খিদেয় পেটের ভেতরের ভাসমান প্লেটগুলো পরস্পরের সাথে ঠোকাঠুকি শুরু করে দিয়েছে। চারদিকে তাকিয়ে কোনো খাবার সংস্থান দেখার চেষ্টা করে সে। না, এই তেপান্তরের মাঠে দাঁড়িয়ে কোনো খাবারের দোকানের প্রত্যাশা তার নেই। কিন্তু যদি কোথাও... হঠাৎই চোখে পড়ে একরাশ দোদুল কাঁধসমান উচ্চতার সবুজ ফসলের ওপর। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার দৃষ্টি। চিনতে ভুল হয়নি তার। দ্রুত এগিয়ে এসে সবুজ ক্যামোফ্লেজের আড়ালে থাকা সোনালি দানার একটা ফসল ছিঁড়ে নেয় সে। ভুট্টা। আঃ! কতদিন পরে ভুট্টা দেখলো সে। এই একটামাত্র ভুট্টা খাবার জন্যে যে চাষীর অনুমতির কোনো প্রয়োজন হয়না, তা সে জানে। সত্যি বলতে কি এক্ষেত্রে অনুমতি নিতে গেলেই তাকে চাষীর বিস্মিত চোখের মুখোমুখি হতে হবে। এই অকপটতার দেশে খাবার জন্যে একটা ভুট্টা নেওয়াকে চুরি বলেনা। এরা এখনো মুখোশটা পরতে শেখেনি।

তাকে সে বলতো ঝাম্পুলি। কেন বলতো তা লোকটা নিজেও যেমন জানেনা, ঠিক তেমনি যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হতো সেও জানেনা। কিন্তু তার সাড়া দিতে কোনো কসুর ছিলোনা। বলতে কি সে না ডাকলেও সে ঝাঁপিয়ে পড়তো তার মনের জানলায়। কুবো পাখির মতো কুব কুব শব্দ করে তার সব মনোযোগ কেড়ে নিত। থাক আর কাজ করতে হবেনা, খেয়ে নাও এবার...। “নাইবা ডাকো রইবো তোমার দ্বারে/রইবো তোমার ফসল খেতের কাছে/যেথায় তোমার পায়ের চিহ্ন আছে...”। কেন যে চোখের কোনে ঢেউ ধেয়ে আসে... কেন যে লবণাক্ত হ্রদ বাসা বাঁধে তিস্তাপারে!

টাট্টু ঘোড়া টা আবার ছুটতে শুরু করেছে। লাইটইয়ার গতিতে ধেয়ে আসছে তার দূর বিস্তৃত পথের ওপর দিয়ে তারই দিকে। অনুভব করে লোকটা। বাসন্তিক এই বিকেলের ঘন মদিরতা আচ্ছন্ন করে তাকে। একমনে সে পৌঁছে যায় তার ফাল্গুনী হৃদয়ের ধ্যানবিন্দুতে। কোথাও কোনো কষ্ট নেই, দুঃখ নেই, আবিলতা নেই, কৌশলী প্যাঁচের বাহার নেই। আছে শুধু আনন্দ, একরাশ মুক্ত আনন্দ।

ধারাবাহিক - কল্পর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়

চেয়েছি তোমার বাতাস কে ছুঁতে
কল্পর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়





শ্রীরামপুর পাবলিক লাইব্রেরির উল্টো দিকে যে রেললাইন সেটা পেরোলেই রেল কলোনি পুকুরের পাশ দিয়ে যে ইট পাতা গলি সেটা সোজা ঢুকে গেছে হাড়ি পাড়া লেন এর দিকে । একটা একতলা সবুজ রঙের বাড়ি, চার পাশ পলকা নিচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা । ছোট্ট গ্রিলের দরজা খুলে বাঁধানো উঠান ,আর পাঁচিল ঘেঁসে যত্নে লাগানো ফুলগাছ । চন্দ্রমল্লিকা ,গোলাপ , পটুলেখা ও আরো নানা ফুলের গাছ । বাড়ির পিছনেও একটা ছোট বাগান । সেখানে অবশ্য সবজি । লাউ কুমড়ো সিম পেঁপে । বাড়ির সামনে এদিক ওদিক একটা দুটো পুকুর পাতা । শোবার ঘর লাগোয়া লম্বা ফালি বারান্দা থেকে বসে দেখা যায় দুটো একটা ছন্ন ছাড়া হয়ে বেড়ে ওঠা নারকেল গাছ । আর আছে তাল গাছ । বাজ পড়া । পাখিও আছে অজস্র । এখনো কি আছে ? প্রমোটার আর মুঠোফোন কোম্পানিদের তাড়া খেয়ে দলে দলে সমুদ্রের ভিতর হয়তো এত দিনে নেমে গিয়ে শুয়ে আছে তারা, যেমন করে শুভেন্দুর বাবা একদিন মৃত্যুর অজ্ঞানে নেমে গিয়েছিলেন|

আমার একসময়ের সর্বক্ষণের কবিতা সহচর ও বন্ধু শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় -এর ২০০০ সালে প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থীকা "রুটির শিস ও আশ্চর্য চিরাগ " এর পাঠ প্রতিক্রিয়াটুকু বোঝাতেই এই ধান ভানতে শিবের গীত ।কেননা কবি শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় এর কবিতার পরতে পরতে উঠে এসেছে এই একশো মিটার বিস্তৃত হাড়ি পাড়া লেনের বস্তু পৃথিবী ও মধ্যবিত্ত দমকল কর্মী বাবা ও একসময়ে নিশ্চয় খুব ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন এমন একজন মা এর কথা । কিন্তু শুভেন্দু সেটা কি ভাবে লিখেছে সেটা স্তব্ধ হয়ে দেখার । একদম প্রবেশক কবিতাটির কথাই ধরা যাক - "আমার অগ্নিনির্বাপক পিতা, মা সসাগরা এইমাত্র / হেঁসেলে গেলেন আর তাওয়ার ওপর শিস দিয়ে উঠলো রুটি " অগ্নি নির্বাপক পিতার সাথে মিলিয়ে মা শব্দের পর সসাগরা বিশেসনটি বসিয়ে ও তৈরী করে নিল ব্যান্জনা । মধ্যবিত্ত পরিবারের আমাদের সবাইকার বাবা অগ্নি নির্বাপক আর মা সসাগরা নয় কি ? এই ভাবেই বার বার উঠে এসেছে ইস্ট পাকিস্তান থেকে শুধু মাত্র প্রাণ টুকু নিয়ে পালিয়ে আসা অমৃত্তু কমিউনিসম এর আদর্শ নিয়ে বেঁচে থাকা একজন বাবার কথা । "খুব রাতে আমার বাবার আত্মা নেমে যায় বাগানের দিকে ,আমরা গোটা পরিবার তখন ঘুমে বিভোর । অসুস্থ চন্দ্রমল্লিকাটির দিকে তিনি তাকিয়ে থাকেন আর সন্ধান করেন অদ্ভুত দর্শন পোকাটির ,দেখি তার সানাই বাদকের মত ফোলা গাল ,হাঁটু অব্দি হাফ প্যান্ট ...." ( বেশী রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি )

আমাদের গোটা নয় -এর দশক জুড়ে ছিল অনিস্চয়তা । বিশ্ব রাজনৈতিক ,আর্থ সামাজিক ,এবং বলাই বাহুল্য এখনকার দিনের ছেলে মেয়েদের মত সামনে প্রচুর কেরিয়ার তৈরী করার সুযোগ ছিল না । এখনকার দিনের মত ব্যঙ্গের ছাতার মত চারিদিকে গজিয়ে ওঠা সেলফ ফাইনানস ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ , ফার্মাসি কলেজ আর ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট ছিল না , আর না ছিল তখন আমাদের বাবা -মা দের র পয়সা । এখন সুযোগ বাড়ার ফলে মেরিট না থাকলেও চলে ,শুধু মাত্র বাবা -মা র অর্থের জোরে ছেলে -মেয়েরা কেরিয়ার বৈতরণী উতরে যায় । উচ্চমাধ্যমিক এ সাতশোর উপর পাওয়া মেধাবী শুভেন্দু তখন পদার্থ বিদ্যার সাম্মানিক। তবু শুভেন্দু কবিতা লিখতে চায়নি । যত দূর মনে পড়ে বখা চোখরার দলে মিশে গিয়ে তাস খেলত খুব আর কবি সোমনাথ মুখোপাধ্যায় এর মেয়েকে দেখতে পাওয়ার লোভে লোভে কবিতা টুকত, বড় প্রধান কবিদের এড়িয়ে, পুরনো দেশ ঘেঁটে ঘেঁটে ও বার করত অখ্যাত সব কবিদের লেখা ।হুবহু টুকে নিজের বলে নিয়ে যেত সোমেনাথ দা র বাড়ি ।সেটাই ছিল ওর পাসপোর্ট, সোমনাথদার বাড়ি ঢুকতে পারার, আর সেই সুযোগে উদ্ভিন্নযৌবনা সহেলি কে দেখতে পাওয়ার সুযোগ। কোনো দিন যদি কবি কন্যার আচড়ে ফেলে দেওয়া চুলের কুন্ডলী বা ব্যবহৃত ন্যাপকিন কুড়িয়ে পাওয়া যেত, ও সেদিন ডবল খুশি, - ও লিখেছে " সে ছিল ছলাকলার অন্তর্বর্তী ঋতু /সে হেতু বাগান পথ ঘন লাল রং /চুলের কুন্ডলী আমি পেয়েছি কুড়িয়ে /এই তুক মন্ত্র পাশে ঘুমিয়ে পড়েছ "(অশরীরী) একেবারে হুবহু টুকে লেখা থেকে অক্ষরবৃত্তের এমন নিখুঁত দুলুনি, মিথ আর ফ্যাক্ট এর অনায়াস মিশেল ,তা শুধু সম্ভভ হয়ে ছিল শুভেন্দুর জেদের কারণে । একদম খাঁটি কবিদের মতই ও একদম শুরু থেকে জানত ,যে ও পারে ঘুরিয়ে দিতে আখ্যানের শেষ অংশটুকু । কেননা সে ধরে সমস্ত ছন্দ ,ধরে কনিষ্ঠায় গিরি গোবর্ধন ।

সহেলি বুঝতে পারে নি শুভেন্দুকে । মেয়েরা নিরাপত্তা চায় । তাই একদিন প্রজাপতি আঁকা বিবাহঋতু মাড়িয়ে আমরা সদলবলে গিয়েছিলাম সোমনাথদা-র বাড়ি ,তখন সহেলির ভুরু আঁকা হচ্ছে ,নতুন করে কেউ চিবুক তুলে ধরে ঘন পল্লব দিচ্ছে চোখে , ঘৃণার ঘিন ঘিনে লাল রং দিয়ে আঁকা হচ্ছে ঠোঁট ... আমাদের মধ্যে শুভেন্দু ছিল একদম নিরুত্তাপ । পেট পুরে খেয়ে সেদিন রাতে ও একটানা লিখে যায় গুচ্ছ কবিতা ,যা পরে বিজল্পতে ছাপা হয় । তখনও charles bukowski পড়িনি ,তখনও জানতাম না ,তিনি কত আগেই লিখে রেখে গিয়েছেন- I ”I loved you like a man loves a woman he never touches, only writes to, keeps little photographs of. I would have loved you more if I had sat in a small room rolling a cigarette and listened to you piss in the bathroom, but that didn’t’ happen. Your letters got sadder your lovers betrayed you, kid, I wrote back, all lovers betray”. কিন্তু আমার মনে হয়েছিল সহেলির একটা ফোটোগ্রাফ অন্তত শুভর কাছে থাকা দরকার | সেই প্রথম বন্ধুর জন্য ,সোমনাথদার বাড়ি থেকে সদ্য বিবাহিতার মধুচন্দ্রিমার অ্যালবাম থেকে খুলে নিয়েছিলাম একটা ছবি ,সহেলি পাহাড়ে ঝরনার ধারে তার পুরুষের সাথে । শুভ আবার কিছু কবিতা লেখে ,একটা নমুনা এখানে পেশ করতে ইচ্ছে করছে - সন্তর্পনে উঠেছি একদা পাহাড়ি ছায়ার উপত্যকায় / চেয়েছি তোমার বাতাস কে ছুঁতে বৃষ্টির মত ইষৎ ক্লিষ্ট / ভেসেছে বাতাসে পতনের কাল ধুলোয় অম্লে লতানে পুস্প /ঘিরে আছে পথ ভাঙ্গা নুড়ি আর পাতার শব্দ ( সন্তর্পনে উঠেছি একদা )

প্রেম ছাড়া আর একটি বড় উপজীব্য শুভেন্দুর কবিতায় যা আছে তা হলো ক্ষুধা । অসামান্য উপমা আর মেটাফোরে বার বার ধরেছে তাকে কবিতায় । "যেমন পিপড়ের শ্রম নিয়ে তোমাকে চিনতে শিখি মহান খাবার এক " ( তোমাকে চিনতে শিখি ) টিউসন করে সংসার ঠেলে নিয়ে যাওয়া " /নগরীর উপাচার শিক্ষাদান শেষে /আমি ভীরু ভিক্ষুপুত্র তুলে ধরি শির /বগলে ধরেছি চেপে তালপত্র পুঁথি /ক্ষুধা ভিন্ন অন্য কোনো শব্দ নেই তাতে " ( সংসার সোনালী কিছু )

কিন্তু এসব আমি কি লিখছি ? বন্ধুর কবিতা বই-এর আলোচনা করতে বসে , এই সব স্মৃতি -বিস্মৃতি র চেয়ে যা আরো বেশি তা তো ওর লেখা কবিতা ,যার প্রচ্ছদ স্বয়ং কবি সোমনাথ মুখোপাধ্যায় ,মানে আমাদের সোমনাথদা করে দিয়েছিলেন ।বইটার ছাপা কপি শুভ কবে খবরের কাগজওলাকে বেচে দিয়েছিল ,আমার কাছে ই-কপি পাওয়া যায় ,লাগলে চেয়ে নেবেন ।

রবিবার, ২ মার্চ, ২০১৪

ধারাবাহিক – রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

অবভাস



চতুর্থ অধ্যায়

৪।
ফকিরের কানা চোখে / রাতফুল ফোটে / চাতকেরা উড়ে উড়ে / চাঁদমারি লোটে

তার ছোট্ট ঘরের দেওয়ালগুলো কখনও মনে পড়ে, মনে পড়ে নুয়ে আসা জানলাগুলো আর ভুঁয়ে এসে পড়া ছাদটার কথা। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল।

আরও কী সব মনে পড়ে যেন।

মনে পড়ে ঘুরন্ত স্কার্টের নিচে অনেকটা টানা শাদা মোজা, আর ঠিক তেমনই শাদা জুতো।
মনে পড়ে এক এককে এক কখনই হয় না।
বরং, এখানে একটা মায়া আছে। মায়া তার মা। মাটি থেকে ওঠে। অনেক দূর পর্যন্ত যায়। কিন্তু, শূন্যে মেলায় না। আবার মাটিতেই নেমে আসে।
এখানে একটা স্কুল হবে। প্রাথমিক স্কুল। যেমনটা সে পড়েছিল। কুড়ি-কুসুম-পরাগ-কেশর-কিশলয়। ঠাকুরদালান। তবে জলচৌকি আর মাদুর সারি দিয়ে নয়, গোল করে পাতা হবে।
ঠাকুর থাকবে না। থাকবে রাধাকৃষ্ণচূড়াগাছ। বৃক্ষপুজো হবে। বসন্ত সমাগমের দিনে।

ভূটান পাহাড় থেকে তখন রোদ পিছলে নামবে। কাঞ্চনজঙ্ঘার একফালি সেই রোদ ঠেলে শুভ্রসমুজ্জবল উঁকি দেবে। আর চা-বাগানের ওপর একটি কুঁড়ি দুটি পাতা চোখ মেলবে।
কল্পদৃশ্যে এই সবও মনে পড়ে। তার অবদমন। সে বলত তার প্রিয় ছাত্রদের।

তখন যা সে পেতে চাইছে তা হল তার নোটবুক। কত আঁকিবুঁকি করা ছিল। তখন যা সে লিখতঃ

১) জেলা – জলপাইগুড়ি, মৌজা – বারদিঘী, খতিয়ান নং – ১৭৮, জে এল নং – ১৩,
থানা – মাটিয়ালি, দাগ নং – ৩১২, জমির মোট পরিমাণ – ০.৩৩, জমির শ্রেণী – ডাঙা
২) দাগের মোট পরিমাণ – ৪.৩২ একর, দাগের মধ্যে অত্র স্বত্বের অংশ – ০.০৭৬৩
দাগের মধ্যে অত্র স্বত্বের জমির অংশের পরিমাণ – ০.৩৩ একর

সেই মুহূর্তে বাস্তুকরণের জন্য তার যা যা প্রয়োজনঃ

১) দলিল জেরক্স
২) খতিয়ান জেরক্স
৩) খাজনার রসিদ জেরক্স
৪) পঞ্চায়েত খাজনার রসিদ (?)
৫) প্রধান এন ও সি
৬) প্ল্যান, প্রোজেক্ট রিপোর্ট, আনুমানিক খরচ

তাকে একটা ১৯৯ টাকার ডি সি আর কাটতে হবে।

একটা স্কুল হবে, আর একটা লিটিল ম্যগাজিন লাইব্রেরি।

ধারাবাহিক – সৌমিত্র চক্রবর্তী

বহুগামীতায় থাক হে ঈশ্বর – পাঁচ



“কোথা মধুবংশীগলি
শরাবের দোকান খালি
যতই চাবে ততই পাবে
পয়সা লাগে না”।


কি অপরিমেয় অভাবের অন্ধকার শুঁড়িপথে হাঁটতে হাঁটতে ইতিহাসে এক একটা মাইলস্টোন খোদাই করেছিলেন ওই লোকপুরুষ! এ কি শুধুই এক নেশাসক্তের সংলাপ?

হাঁটতে হাঁটতেই মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায় সে। কাদাগোলা বর্ণহীন চরিত্রের মধ্যে কোনো বৈচিত্রই খুঁজে পাওয়া যায় না বছরের এই সময়ে। গভীর ডিপ্রেশনে ভুগতে ভুগতে নিজের পরিচয়ও যেন হারিয়ে ফেলেছে আজকের আকাশ। কয়েকদিন ধরেই মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। ঠিক ঐ আকাশের মতই, শীতঘুম ভেঙে আড়মোড়া ভাঙতে না ভাঙতেই রোদ ঝলমলে দিন সপাটে এক হ্যাঁচকা টানে নিম্নচাপের থলির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। তারপর থেকেই চারপাশ শুধুই তেঁতো ওষুধের বিষন্নতায় মোড়া।

ন্যাংটো একটা ছেলে দৌড়ে বেড়াচ্ছে মাঠের প্রান্ত জুড়ে। তার দিনমজুর বাবা হয়তো ব্যাস্ত পেটের গাঢ়পুরানের আদিম জোগাড়ে। আজকের বহিরপৃথিবীর স্পেসজেট গতিতে ছুটে চলার কোনো আঁচ পড়েনা এদের মন্থর জীবনে। সারি সারি তাল গাছের আড়ালে থাকা এক পুকুরের উঁচু পাড় বেয়ে নেমে আসছে গ্রাম্য তরুণী বউ। সদ্য কাচা কাপড়ের স্তুপ সামলাতে সামলাতে অন্তর্বাস শূন্য বুক ফিকফিক হাসে শস্তার ছাপা শাড়ীর আলুথালু আড়ালে। হাঁটতে হাঁটতেও সেদিকে অমোঘ দৃষ্টির তীর ছোঁড়ে লোকটা। ঠোঁটের কোনে জেগে ওঠে ধনুকছাপ হাসি। কয়েকদিন আগের বৃন্তখেলার ইতিকথা মনে পড়ে গেছে তার।

এই মনখারাপের শেকড় কিছুতেই খুঁজে পায়না সে। কেন হয়? কখন হয়? কিভাবে হয়? কোন অতল তলে গুনগুন গুঞ্জনের মত মৌমাছির দল ক্রমাগত উড়ে বেড়ায়। অকারণ ভুল বোঝাবুঝির মায়াবী বৃত্ত মুহূর্তের মধ্যে মেঘে মুড়ে ফেলে একটানা ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে পেছল করে তোলে সুগম রাস্তা। লোকটা পিছলে যেতে থাকে, দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরার ব্যস্ত চেষ্টায় ক্ষয়ে যেতে থাকে দশ আঙুলের নখ। নখের গভীরে ঢুকে যেতে থাকে কাদা-মাটি-ছোট ছোট কাঁকুরে জঞ্জাল। নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে নেমে যেতে থাকে অন্ধকার তলদেশ দেখতে না পাওয়া খাদের একেবারে নীচে। সেই নিকষ সময়ে সব কিছুই অসহ্য লাগে। কোনো সম্পর্কই বাঁধা থাকেনা নিখাদ স্থায়ী কাছির গাঁঠবন্ধনে। নিজের অস্তিত্বও তখন বাড়তি মনে হয়। এক একসময় আত্মহত্যার প্রবল ইচ্ছেয় তলিয়ে যেতে থাকে লোকটা।

সাদাকালো ছোট ছোট কাঁকড়ার দল ইতিউতি চরে বেড়াচ্ছে। যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। কাঁধের ঝুলিটা একপাশে সামলে উবু হয়ে বসে পড়ে সে সেই মাঝমাঠের ধূসর প্রান্তরে। দূরে সরষে বুনেছে চাষী। উজ্জ্বল হলুদ আর সবুজের অদ্ভুত মায়া ছেয়ে রেখেছে প্রান্তিক পৃথিবীর বর্ণহীনতা। টুকটুক চরে বেড়ানো কাঁকড়ার ঝুন্ড দেখতে দেখতে, তাদের সন্ধানী দাঁড়া নিয়ে সন্দিগ্ধ চলাফেরা দেখতে দেখতে কখন যেন সেও ছোট্ট ওই জগতের মাঝে ঢুকে পড়ে। পাশ দিয়ে বুকে হেঁটে চলে যায় এক মাঝারি জলঢোঁড়া সাপ। তারও গায়ের রঙ সাদাকালো। অবাক হয়ে ভাবে লোকটা এই ছোট্ট জগতটার কি আর অন্য রঙ নেই? কয়েকটা গুগলি মন্থরগতিতে চলার রেকর্ড গড়ে এগিয়ে চলেছে ভিজে একটা রেখা পেছনে ফেলে রেখে।

পেছনে জলের রেখা ফেলে সেও হেঁটে এসেছে এতদিন। সেই কোন শিশুকাল থেকেই দুপায়ের চাকায় গড়িয়ে চলেছে সে। মাঝে কত মুখের কোলাজ, কিছু মনে পড়ে আর বাকিসব স্মৃতি রেখে দিয়েছে সযত্নে তার অন্ধ কুঠরীর লকারে। সে সব কখনো বা ঝলক দেয় স্বপ্নসম্ভবতায়। আপনমনে হেসে ওঠে সে। আজ মনখারাপীর লক্ষ্মণগন্ডী ডিঙিয়ে এসেছে সে। শীত থেকে গরমে ঢোকার আগে শেষ ঠান্ডার কামড় বসানোর কাল যেমন মাত্র কিছু সময়ের অপেক্ষা। তারপরেই রোদ ঝলমল না ঠান্ডা না গরমের প্রেমবিহ্বল বাসন্তিক ভালোলাগা। কিন্তু উচ্ছ্বল এই উজ্জ্বলতার দিন যে তার জীবনে একেবারেই স্থায়ী হয়না, তাও সে জানে। প্রতিটি বাঁকে ওঁত পেতে বসে থাকে ঘোর কালো। কখন যে সেই রাহুর বিকটদর্শন মুখ তাকে গ্রাস করবে তা সে জানেনা। সে হাঁটে, হেঁটে যায় হাঁটতে হবে বলেই। জন্ম থেকেই এই তার কাজ, এই পথই তার ভালোবাসা, তার ঘর বাড়ী, তার জীবনদর্শন জেনে এসেছে সে। সে হাঁটে পেছনে পড়ে থাকে সূক্ষ জলের আচরব্যাপ্ত দাগ।

পকেট হাতড়ে বিড়ি বার করতে গিয়ে দেখে ছোট্ট পাউচে রবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা কিছুটা টলটলে সাদা আগুন কখন মনের ভুলে রয়ে গেছে। গত সন্ধের অবশেষ। কাল সেই মোহিনী হাত একমুখ হেসে বাড়িয়ে দিয়েছিল এটা। তার ভুক্তাবশেষ স্বামী আগেই রান আউট হয়ে একপাশে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল । সেই অমোঘ রাতে মোহিনীর উজ্জ্বল কেউটে শরীরের আগুন নেভানোর কোনো ক্ষমতাই ছিল না সেই নেশাড়ু আইনগত প্রভুর। একচুমুক খেয়ে বাকিটা সযত্নে রবার ব্যান্ডে বেঁধে পকেটে রেখে দিয়েছিল লোকটা। তারপরেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কালদিঘীতে সাঁতার কাটতে। শঙ্খলাগায় কোনো আলাদা উজ্জীবনের দরকার তার হয়না। কতরাত্রি পর্যন্ত উথাল পাতাল সমুদ্রমন্থন চলেছে তা তারা কেউই জানেনা। একসময় ঘুম নেমে এসেছিল আপন স্বভাবে। সকালে উঠে চলে আসার সময়ও সেই তথাকথিত প্রভু অচেতন গ্যাঁজলায়। আর মোহিনী চেপে ধরেছিল দুহাত। আস্তে আস্তে সে বাঁধন ছাড়িয়ে নেমে এসেছিল সে নিজের একান্ত চেনা রাস্তায়। রবারের বাঁধন খুলে বাকি আগুন গলায় ঢেলে নেয় সে।

আজ পর্যন্ত কেউই তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। কেউ না। বাঁধনের রাশ যতই শক্ত হয়ে চেপে বসার চেষ্টা করুক না কেন তার মননে, তার পরিব্যাপ্ত কর্তব্যের ওপর, কখন যেন আশ্চর্য রূপকথার জাদুতে নিজেই সে গ্রন্থি খসে পড়েছে আলগা হয়ে। কূপমন্ডুক হয়ে বাঁচা তার ললাটলিপিতেই নেই। এই ব্রহ্মান্ডব্যাপী নতুন সর্বদা ডাকে তাকে, টিকতে দেয় না এক পল কোথাও। পায়ের নীচের সরষে ক্রমাগত চিমটি কাটে, সুড়সুড়ি দেয়। খোলা আকাশের নীচে এনে ছেড়ে দেয় তাকে। তাড়িয়ে বেড়ায় । কিশোরবেলার এই বাসন্তিক সময়ে রুক্ষ ধূ ধূ প্রান্তরে ছোটো ছোট বুনো কুলের ঝোপ আর পলাশের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের গলির মধ্যে লাগামছাড়া উল্লাসে ভেসে যেতে যেতে মনে হত, এই বুঝি জীবনের শ্রেষ্ঠ মানে। স্কুলের লাইব্রেরী থেকে অজানা জগতের গল্পের বই পাওয়ার দিন মনে হত এই বুঝি আনন্দের ফুটন্ত অধ্যায়। প্রান্তিক প্রবাস থেকে গ্রামের ইলেকট্রিকহীন বাড়ীতে বাৎসরিক ফেরার দিন মনে হত সব উচ্ছ্বাস ওঁত পেতে বসে আছে সেই গ্রামীণ স্টেশনের দোরগোড়ায়। কিন্তু সময় কোনো উল্লাসকেই স্থায়ী হতে দেয়নি। একের পর এক চেনা মুখ কেড়ে নিয়ে বদলে দিয়েছে নতুন মুখ, নতুন বিতর্কের পরিচ্ছেদ।

তীক্ষ্ম হুইসলের শব্দে চটকা ভেঙে উঠে দাঁড়ায় লোকটা। দুরন্ত গতিতে একটা ট্রেন মাঠের লোমশ বুক চিরে ছুটে যাচ্ছে। এখনো এই বয়সেও ট্রেনের বাঁশির আওয়াজ তাকে উতলা করে তোলে। মনে হয় অনেকটা পথ পেরোনো বাকী। কত কিছুই এখনো অধরা রয়ে গেল। কিন্তু ছোটোবেলার সেই ট্রেনবাঁশি মনে হয় বদলে অনেক যান্ত্রিক হয়ে গেছে। বিষন্ন হাসির হলদে রেখা মুহূর্তে খেলে যায় লোকটার ঠোঁটে। একটা সদ্য জন্মানো বাছুর ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়চ্ছে, আর তাকে ধরার ইচ্ছেয় অনর্গল কথার ফুলঝুরি ছিটিয়ে পেছনে দৌড়নোর ব্যর্থ চেষ্টায় এক মধ্যবয়সীনি। টিন আর খড়ের ছাউনি দেওয়া দিনমজুর গ্রামের সকাল শুরু হয়ে গেছে দৃপ্তগতিতে। মধ্যবয়সী চাষা বাবুর বাড়ী থেকে বলদ তাড়িয়ে এনে জুড়তে শুরু করেছে দাসত্বের গাড়ীতে। খোলা উঠানের মাঝে খোঁড়া গর্তকে উনান বানিয়ে তার ওপরে তোবড়ানো এলুমিনিয়ামের ডেকচিতে ভাত বসিয়েছে এক উলুঝুলু আট নয়ের খড়ি ওঠা কিশোরী। বাবা মা দুজনেই কাজে গেছে। ছোট ছোট ভাই বোন আর রান্নার দায়িত্ব তার। স্কুল কি জিনিস সে জানেনা এখনো। ছোট্ট এক ছাউনির তলে একমনে চপ আর আলুরি ভেজে চলেছে গ্রাম্য দোকানী তার কখনো না মাজা কালিতে ভর্তি অন্ধকার কড়াইয়ে।

অন্ধকার এই মানুষগুলোর জীবনসঙ্গী। এই অন্ধকূপের মধ্যে থাকতে থাকতে কি শীত, কি গ্রীষ্ম, কি বর্ষা কোনো তারতম্যই করতে পারেনা এরা। জন্ম থেকেই এদের পশুত্বপ্রাপ্তি। শহুরে মাপকাঠিতে এদের মনন মাপা দুঃসাধ্য। তবু ক্ষমতার লোভে প্রতি বছর সেই চেষ্টাই করে যায় কিছু লোক, আর এরা বোঝার কোনো ইচ্ছে না রেখেই তাদের দিকে ছুঁড়ে দেয় ভিক্ষের দান। পরিমিত আনন্দের দিনের মধ্যে এই লোকগুলোর একদিন ভোটউৎসব। খিদে আর রমন ছাড়া অন্য কোনো ইচ্ছেই জাগেনা এদের। আচ্ছা এটাই কি সেই নরক? এই ঘন রোদ্দুরের মাঝেও হঠাৎই যেন শীত করে ওঠে লোকটার। কোথায় যেন একপাল বুনো ঘোড়া ছুটে চলেছে। ধূ ধূ খোলা মাঠের ওই প্রান্ত থেকে যেন ভেসে আসছে সেই ছোট্টবেলার বরিশালী স্টীমারের ভোঁ। সামনে গজিয়ে ওঠে সেই চুনারগড় কেল্লায় দেখা মস্ত হাঁ করা বিশাল কুয়ো। আচমকা যেন পিছলে গড়িয়ে পড়তে থাকে সে। দৌড়তে শুরু করে লোকটা দিগ্বিদিক ভুলে। পেছনে তাড়া করেছে ভয়, ছুটে আসছে বুনো ঘোড়ার নিষ্ঠুর কর্কশ ক্ষুরের আওয়াজ।

বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

ধারাবাহিক উপন্যাস – রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়


অবভাস
রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়



পূর্বে প্রকাশিত এই লেখাটির পর হইতে ...



তৃতীয় অধ্যায়




৩।

ডিস্পিরিন ডিস্পিরিন... যাকে আমি ভালো লাগা বলি...
                     
                
                  

                                        


                                                         সা



                                                                                      
                                                                                 

পাতার পর পাতা জুড়ে যা সে লিখেছে। যা তার উপেক্ষা উপহাস এখন তাকেই চেপে বসছে।
একটা দেওয়ালে প্যারিস করার পর বহুদিন রং না করলে যা তার ওপর চেপে বসে।

যতদিন না ক্রেয়নগুলো নিয়ে সে আবার গড়িয়ে দেবে জলচৌকির নিচে আর তারা মোমদানা হয়ে সারাঘর জ্বলবে নিভবে। সে মনে করতে থাকবে তার প্রিয় বন্ধু চলে যাওয়ার আগে ঠিক কী লিখে গিয়েছিল, this world is not meant for me anymore…


                                                                              
                                                              



                                                          



                                সা



                  

          

এবং, এই শুরুর শুরুতে ফিরতে সে অনেকটা সময় নিয়ে নেবে যার সঙ্গে অনন্তের যোগ বা বিয়োগ, গুণ বা ভাগের কোন সম্পর্ক নেই।

এখনও মাস্তুল আঁকা আছে, মাস্তুল ঘেঁষে খুব নিমগাছ
বাপের মরা গন্ধে বুড়ো নিম কিছু বিষফল দিল, পাতা
কোনও চিন্তাই ছিল না তবে চিন্তার নৈরাজ্য নিয়ে এত মাথাব্যথা
                                               ডিস্পিরিন...ডিস্পিরিন
যাকে আমি ভালো লাগা বলি

সত্যি সত্যি বাপ তার চলে গেল। জল-জঙ্গল যখন মনে হচ্ছিল এসকেইপ রুট হতে পারে, মুখ্য ধর্ষক বিচারবন্দী,  কীভাবে যেন জেলেই আত্মহত্যা করতে পারে, পাতার ভাঁজে পেন্সিলটা খোকা হতে হতে একদিন উধাও হয়ে যেতে পারে –- এত হতে পারার মধ্যে তার বাপে চলে যাওয়াটাও একটা হতে পারা হয়ে উঠল।
শরীরটা তাপ আর মায়া ছেড়ে চলে গেল। যে তাপ আর মায়া সে জীবদ্দশায় প্রথম টের পেয়েছিল ওই চওড়া পাঞ্জায় ধরা তার টুকটুকে লাল পাদুটো যা নিয়ে তার চিরকাল আদিখ্যেতা ছিল। নিন্দুকরা অবশ্য বলল বাপের মৃত্যু নিয়ে সে খানিকটা তাইই করল বটে।
শুধু নোটবুকে লেখা হল না, পিণ্ডদানের জন্য ঠিক কতটা চাল লাগে! মুখাগ্নি তিন সন্তান করল, সে শুধু ধরেছিল সেই প্রান্তটা যার অন্য প্রান্তে কোন আগুন ছিল না। পুত্র-প্রপৌত্র নিয়ে সব হাত এক হলে অস্থিভস্ম ভেসে গেল জলে। তার হাতে তখনও ঘিয়ের গন্ধ লেগে ছিল। তার চোখে ডায়াবেটিক ডিজেনেরেশান শুরু হলে তিলবাটা সামান্য লঙ্কা দিয়ে ভাত মেখে খেতে বলল কবিরাজ। তখনও সে ঘিয়ের গন্ধটা পেত। তার মনে হত জীবিত মৃতের এই একটিই মাত্র উচ্চারণ।

আর সেই জলা-জঙ্গল। টিলার ওপর থেকে বাঁকা ভ্রূ চাঁদ নামছে। ময়ূরেরা কমর বাঁধছে আকাশ একটু ফর্সা হলেই দলে দলে নামবে। নেমে ভরিয়ে দেবে কুর্তির সেই তীর যার গায়ে টিলাটা গড়িয়ে এসেছে। হাতি এসে ফেলে দিয়েছে তিনটে নিশানদিহি খুঁট। একটা বাঘ নয়, বাঘারুরও নাকি দেখা মিলেছে। গভীর রাতের। গরু-ছাগলে নাকি ভয় পেয়ে একত্রে কেঁদে-ককিয়ে উঠেছে।