সম্পাদকীয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সম্পাদকীয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০১৪

সম্পাদকীয় - ৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা

সম্পাদকীয়



বসন্ত এসেছে । চারদিকে বসন্তের গান, পত্রিকার পাতায় পলাশফুলের ছবি সেই কথাই জানাতে চাইছে । শহরে বসন্ত এসেছে কেবল ক্যালেন্ডারে; যদিও গ্রাম, মফঃস্বলে আজও কোকিল ডাকে, কচিমুখের দল মেতে ওঠে ন্যাড়াপোড়া, রং- খেলায় । মেগাপলিশের বাসিন্দারা দোলের দিন মাংসভাত, ভদকা বা বিয়ার খেয়ে লো ভলিউমে রবীন্দ্রসংগীত চালিয়ে পালন করেন বসন্তোৎসব । সাদা পোশাক, অরগ্যানিক আবীর ~ মুখোশ পরায় আন্তরিকতায়, ঠিক যেভাবে দেখনদারীত্বে ঢেকে গেছে সৎ সাহিত্য ।

অন্যএকটা কথা বলি - অন্তর্জালে সাহিত্য নিয়ে যারা সবথেকে উৎসাহী তারাই নাকি ছাপার জন্য ব্যয় করেছে সবথেকে বেশী কাগজ । কি অদ্ভুত বৈপরীত্য ! তবু অস্বীকার করার উপায় নেই এই মাধ্যমকে । দূর দূরান্তে হাতের কাছে বাংলা পত্র- পত্রিকা না পাওয়া মানুষ মাউসের ক্লিকে‌ বা মুঠোফোনের সাহায্যে মুহূর্তে ঢুকে পড়ছেন বাংলা সাহিত্যের অন্তরমহলে - এ এক অভাবনীয় ব্যাপার ।

থাক এসব। বেশী কথা কাজের নয় । ক্ষেপচুরিয়াসের নতুন ব্লগ্‌জিন আপনাদের জন্য প্রস্তুত। সময় করে পড়ে ফেলুন এবারের সংখ্যা । ইচ্ছে হলে মতামত দিন, নইলে নীরবেই পড়ে নিন । কেমন হয়েছে সেটা বলে দেবে সময় । তবে চেষ্টাটা সৎ ছিল এটাই বলার ।

ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষ থেকে সব্বাইকে দোলউৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখি । রং খেলুন, খেলা হলে ধুয়েও ফেলুন ।

অবশ্য মনের রং কি আর ধোয়া যায় !


ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে ~ মিলন চট্টোপাধ্যায়

রবিবার, ২ মার্চ, ২০১৪

সম্পাদকীয় - ৪র্থ বর্ষ ১ম সংখ্যা



সম্পাদকীয়




খাতায়-কলমে এখন ‘মৃদুল মধুর বংশী বাজা’র সময়। যদিও আমাদের চারপাশে সারাবছরই পাতাঝরার মরশুম ,তবু তার মধ্যে থেকেই একটু আবীর আর একটু কোকিলের ক্যানভাস জানান দেয়,সে এসেছে। ভোরের শীত আর ছাড়তে না-চাওয়া স্বপ্ন তাকে ধরে রাখে,সন্ধেবেলা ছাদে দাঁড়ালে বোঝা যায় - ‘দক্ষিণ দিক’ বলে একটা কিছু আছে। এমন অদ্ভূত সময়ে কবিতার ছোঁয়া পেলে আড়াইফুট বাই দশ ইঞ্চি আকাশটাও নীল হয়ে ওঠে,যেন প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে আয়নায় একবার দেখে নিচ্ছে নিজেকে। কারো জানলা রোদ ঝলমলে তো কারো জানলা মেঘমুখর। তবু,খোলা থাকেই। নইলে চাদরমুড়ি দুর্গ একসময় অন্ধকূপে বদলে যাবে!


আমাদের বেঁচে থাকার বড্ডো প্রয়োজন। আরো বেশি প্রয়োজন তাদের জন্য,যারা কোনো এক সকালে কালো-কালো খবরের পাশেই দেখতে পাবে হাসিমুখ বাংলাভাষা ঠাকুরমার ঝুলি থেকে উঠে আসছে জিয়নকাঠি হাতে। এবং হেডলাইন হবে – ‘বসন্ত’। সেই আনন্দেই সাড়ে-সাতটার রোদে নিয়ে এলাম সবাইকে। সূর্য উঠে গেছে, ফুল তোলাও শেষ, বাজারের থলি নিয়ে বেরিয়ে পড়ার আগে বারান্দার মেঝেটা আরেকটু নতুন করে দেখার সুযোগই দিলাম না হয়! ভালো থাকবেন।


- তন্ময় ভট্টাচার্য

বৃহস্পতিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

সম্পাদকীয় - ৩য় বর্ষ ১১তম সংখ্যা

সম্পাদকীয়



যাদের স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথের
‘বাঁশিওয়ালার’ চেয়েও সুন্দর
একটি কবিতা রচনা করার,
সেই সব শহীদ ভাইয়েরা আমার
যেখানে তোমরা প্রাণ দিয়েছ
সেখানে হাজার বছর পরেও
সেই মাটি থেকে তোমাদের রক্তাক্ত চিহ্ন
মুছে দিতে পারবে না সভ্যতার কোনো পদক্ষেপ।
('আজ আমি এখানে কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি...')
-এভাবেই কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী ১৭ পৃষ্ঠার দীর্ঘ একটি কবিতা লিখেছিলেন ৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির নির্মম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ওইদিন রাতেই, যা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ইতিহাস হয়ে আছে।
এমন পাগল আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনো। ভাষার জন্য পাগল। কথার জন্য পাগল। নিজ সত্তার জন্য পাগল। একটা নোংরামির মত করে , কিছুটা বুদ্ধি হীনতার মত , খামখেয়ালীর বশে ছোটলোক পাকিস্তানি গোষ্টি বাংলায় কথা বলতে বাঁধা দিয়েছিল ডানপিঠে বাঙালি জাতিকে। সে কি আর হয় ! দুরন্ত সুনামীকে কোন বাঁধ ঠেকাতে পারে ! পারেনি সে দিন। তাজা রক্তের বিনিময়ে বাংলায় কথা বলা!
বাংলার মানুষ এই দিনটিকে এতই শ্রদ্ধা করে যে , ২১ ফেব্রুয়ারী প্রাতে খালি পায়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। প্রভাত ফেরি করে শহীদ মিনারে ফুল দেয়। আজ এই দিনটি একটি উত্সবে পরিনত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মূলত সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, সফিউল প্রমূখ দামাল ছেলেদের আবেগকে সম্মান জানানোর জন্যই এই আয়োজন।
কিন্তু ,বেদনার বিষয় হচ্ছে , বাংলাদেশ ছাড়া অন্যকোথায়ও এই সংস্কৃতিটা ধারণ করতে দেখা যায়না। বাংলাদেশের পথে প্রভাত ফেরিতে নেমে পড়া তরুণ-তরুনীদের মনে কতটুকু পুলক জাগে ,তা ভালবাসা দিবসে নাইটক্লাবে নাচা ছেলেমেয়েরা কখনই বুঝতে পারবেনা।
তা যাগগে, আমাদের বাংলা ভাষাভাষীরা-ইবা বাংলাকে কতটুকু ধরে রাখছি। কলকাতার লোকজন হিন্দিতে কথা বলতেই গর্ব বোধ করে। বাংলাদেশিরাও কখনো হিন্দী ,কখনো ইংরেজি মিশিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষা ব্যবহারে নিজেকে স্মার্ট হিসেবে জাহির করছে। অমৃতসম বাংলা ভাষা পুরান সুতি কাপড় হয়ে যাচ্ছে বাঙালিদের কাছে। সৃজন সেন তাঁর কবিতায় তাই লিখেছেন -
সেবার লন্ডনে
এক জাপানি শিল্পপতিকে
বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে
তার মাতৃভাষা জাপানিতে
অন্যদের সঙ্গে যখন অনর্গল কথা বলতে দেখেছিলাম
তখন আমার বুকের ভেতরে
কেমন যেন একটা কষ্ট হচ্ছিল,
ইংরাজিতে কথা বলতে না পারার জন্য
ওই মানুষটির ভেতরে কোনও লজ্জা ছিল না,
বরং মাতৃভাষায় কথা বলতে পারার অহমিকায়
মানুষটিকে যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখেছিলাম,

(--মাতৃভূমির জন্য-সৃজন সেন)
যাইহোক , ধন্যবাদ আমার শ্রদ্ধ্যেয় সাহিত্যিক ভাইদের ,যাঁদের অসামান্য সাহিত্য সৃষ্টির জন্য ফেব্রুয়ারী সংখ্যায় এই ভাষার উপস্থিতি ছিল বেশ জোরালো। ফেব্রুয়ারী আমার কাছে বেহেস্তের জানালা মনে হয় যা খুলে দিতেই পৃথিবী সাজতে শুরু করে। বসন্ত - ভালবাসা দিবস ,সবই এই ফেব্রুয়ারিতে। এই ঋতুতে যেন সবার মন হালকা হয়ে উঠে পায়রার পালকের ন্যায়। রবীন্দ্রনাথ তাইতো গেয়েছেন -

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।
তব অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে।
আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,
আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো,
এই সংগীতমুখরিত গগনে
তব গন্ধ করঙ্গিয়া তুলিয়ো।
তরুণ তরুনীরা অভিসারে মিলে এই ঋতুতে। নানান কবি নানা ঢঙে রচনা করেছেন বসন্তকে। আমাদের এই সংখ্যায়ও লেখকরা লিখেছেন বসন্তের কথা। লিখেছেন বইমেলার কথা।

বাংলার মাঠে বইমেলা আজ আর নিছক মেলা নয়, আমেজ,উদযাপন আর উত্তেজনায় ঈদের খুশির মত। বইমেলা নয় "ঈদুল বইমেলা" এর নতুন নাম। বাংলাদেশে বইমেলা অনেককিছুর দিক ঘুরিয়ে দিতে পারে। রাজনীতিও তার বাইরে নয়।রাজনীতির কথা মনে পড়ল। অনেক দুর্গন্ধ ছড়ানো শেষে দেহের ক্ষতে শুকনো চর্মের প্রলেপ পড়ল। থমথমে পরিস্থিতে উতড়ে ঝর শেষের আকাশের মতই এই মুহুর্তের বাংলাদেশ। শুধু ৭১' এর রাজাকারদের বিচার কার্যকর হলেই হয়। রাজাকারহীন বাংলাদেশ দেখার অনেকদিনের স্বপ্ন। আমি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই।



ক্ষেপচুরিয়ানস্ সম্পাদকমন্ডলীর পক্ষে
পাভেল আল ইমরান

মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৪

সম্পাদকীয় - ৩য় বর্ষ ১০ম সংখ্যা


সম্পাদকীয়




শীত নিয়ে কিছু লিখব ভেবেছিলাম।পাটালি গুড়ের গন্ধ,সতেজ সবুজ সবজি ,লেপের ওম, মিঠে রোদ্দুর এইসব নিয়ে ।কিন্তু মুস্কিল করলো ল্যাপটপে বাজতে থাকা সেই গানের কলিটা -চালচুলো নেই তার ,নেই তার চেনা বা অচেনা ... চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার শহরের সেই পাগলটার মুখ ! এই তীব্র শীতের রাতে যে সারা গায়ে ছাই মেখে ,আগুন জ্বেলে গাছের নিচে ঘুমিয়ে আছে (নাকি জেগে ?) ! মাথার পোকাগুলো নড়ে উঠলো ! এই দুনিয়ায় কত মানুষ আছে যাদের মাথার ওপর ছাদ নেই ? শুধুই আকাশ ! গুগল জানালো ,ইউনাইটেড নেশনের হিউম্যান রাইটস কমিশনের ২০০৫ সালের তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে আশ্রয়হীন মানুষের সংখ্যা ১০০ মিলিয়ন ,মানে ১০০০০০০০০ ! ২০১৪তে কি সংখ্যাটা কমেছে আদৌ ? দি একশন এড ২০০৩ সালে সমীক্ষা করে দেখেছে শুধু ভারতবর্ষেই আশ্রয়হীন মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৮ মিলিয়ন ! CRY ( চাইল্ড রিলিফ এন্ড ইউ ) ২০০৬ সালে হিসেব করে দেখেছে ভারতে ১১ মিলিয়ন শিশু রাস্তায় বাস করে ! যদিও ২০১১ সালের সরকারী তথ্য বলছে ভারতে মাত্র ১৮ লক্ষ মানুষ গৃহহীন !!! আচ্ছা , এইসব তথ্যের কচকচানি থেকে মুখ সরিয়ে আমরা যদি মাত্র একজন মানুষের কথাই ভাবি ! দীর্ঘ শীতের রাতে তার মাথায়,গায়ে ,ছেঁড়া চাদরে তীরের ফলার মতো ধেয়ে আসা একেকটা শিশিরের ফোঁটার কথাই ভাবি ! বন্ধুরা তার দমবন্ধ করা কাশির শব্দ শোনা যায় না কি ?

সেই গল্পটা মনে পড়ল যদিও সত্যি ঘটনাকে গল্প বলা যায় কিনা ঠিক জানি না ! বিদ্যাসাগর একবার তাঁর মায়ের গায়ে সুতির চাদর দেখে একটা ভালো শাল কিনে আনলেন।কিন্তু ভগবতী দেবী সেটি পরলেন না , রেখে দিলেন বাক্সে ! বিদ্যাসাগর একদিন তাই দেখে কারণ জানতে চাওয়ায় ভগবতী দেবী বললেন ,এই গাঁয়ে তাঁর অনেক ছেলে-মেয়ে আছে যাদের এই ঠান্ডায় পরার মত কিছুই নেই ,তিনি সেখানে এই গরম চাদর কিভাবে পরবেন ? বিদ্যাসাগর তারপর প্রত্যেকের জন্যে গরম চাদর এনে দিয়েছিলেন !

লিখতে বসেছিলাম শীতের কথা ,শীতের সুখের কথা ,নিবিড় লেপের ভেতর পাশ ফিরতেই যাদের গালে লাগে সঙ্গিনীর তপ্ত নিঃশ্বাস -তাদের কথা ! কিন্তু জীবনের মতো কথাও কথা রাখে না , অন্যদিকে ঘুরে যায় ! কিন্তু ঘুরে গিয়েও বা কী হয় ? যদি কবিতা হয় কিম্বা একটি সম্পাদকীয় , তাতেই বা কী !! কবিতা কি লেপের ওম হতে পারে ? কারোর মাথার ওপর ছাউনি ? 
কলম তরবারির চেয়ে শক্তিশালী ,সত্যি বিশ্বাস করেন আপনারা ?




ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে - নীলাঞ্জন সাহা 




মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ৩য় বর্ষ ১ম সংখ্যা

সম্পাদকীয়

বিশেষ বাংলাদেশ সংখ্যা



১৯০৫ সালে বড়লাট কার্জনের আদেশে প্রথমবার বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার পর সবচে' প্রকট প্রতিবাদ আসে পশ্চিম বাংলা থেকে। কার্জন জানত -"বাঙ্গালিরা নিজেদের এক মহাজাতি মনে করে এবং এক বাঙ্গালি বাবুকে লাট সাহেবের গদীতে বসাতে চায়। " বৃটিশ আমলা রিজলি স্বীকার করেছেন -"সংযুক্ত বাংলা শক্তিশালী, বিভক্ত বাংলা বিভিন্ন দিকে আকৃষ্ট হবে। " তাদের উদ্দেশ্য ছিল "বৃটিশ রাজত্বের বিরোধী একটি সুসংহত দলকে টুকরো করে দুর্বল করে দেওয়া।" যা তারা করেছেন ভীত আত্মায়। কিন্তু সাহসী ভুখন্ডের বিপ্লবী 'অরবিন্দ ঘোষ'রা ঠিকই ওদের কালো ইচ্ছা রহিত করেছেন। শুধু তাই নয় , পশ্চিম বাংলার সেই রুখে দাড়ানো থেকেই ভারত ছাড়তে ব্রিটিশদের বাধ্য করার শক্তি পরিনতি পেয়েছে। পরাক্রমশালী বঙ্গবাসীর তোপ থেকে বাঁচতেই চালাক ব্রিটিশরা বাংলাকে কলা দেখিয়ে বিভক্ত করে পঙ্গু করে দিয়েছে। সেদিন বঙ্গভঙ্গ রহিতের স্লোগানকে শক্তি যোগাতে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন "আমার সোনার বাংলা "র মত কালোত্তীর্ণ সংগীতের আগুন। হেমচন্দ্রের বানানো বোমা ক্ষুদিরাম বিস্ফোরিত করেছেন ,যা ভারত ইতিহাসের প্রথম।রদ হয়েছে প্রথম বঙ্গভঙ্গ ;কিন্তু ৪৭' এ কেমন একটা নিরবতার মাঝেই যেন আলাদা হয়ে গেলো দুই সহোদর ! বৈষম্য আষ্ঠে-পিষ্ঠে ধরেছিল জমিদারির লোভ আর শাসন করার কালো আনন্দে।মনের ভেতরই যেন পৃথক হওয়ার তাড়না সৃষ্টি হয়েছিল। দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশ হয়ে গেল একা। অগোচরেই পিছে চলে গেল ভাই হারানোর অভাব।

রাজনৈতিক প্যাঁচাল অফ দেই। বাংলা সাহিত্যে তখন সুদিনের সূর্য। ফুটফুটে নবসাহিত্যজাতকের আগমনী কান্নার আওয়াজ রণিত হচ্ছিল বঙ্গ ঘরের কোনা থেকে অনেক দূরতক। 'বন্দ্যোপাধ্যায়' , 'চট্টোপাধ্যায় 'দের নাম জ্বলজ্বল করতো সাহিত্য পাতায়। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বললেন , “তৎকালীন সাহিত্য গুলোতে যত গুলো চরিত্র আছে তাদের নাম পাশাপাশি রেখে পরিসংখ্যান করলেই দেখা যাবে রাম শাম যদু মধুদের সংখ্যা কত আর রহিম করিমের চরিত্রের সংখ্যা কত।" এর বদৌলতে লাভ করছি আমরা পাকিস্তান হিন্দুস্তান। হায় কপাল !

কিন্তু বঙ্গসাহিত্যের মহীরুহরা ঠিকই ছায়া ঢেলেছেন অকুন্ঠভাবে সাম্প্রদায়িকতা ভুলে। নজরুল চষে বেরিয়েছেন দুই বাংলা কোনো সীমানার চিহ্ন দেখেন নি। রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বাংলার গরিব প্রজাদের কষ্টগুলোকে শিল্পের আঁচরে গেঁথেছেন। জীবনানন্দ , বুদ্ধ দেব আর তারপরে সৈয়দ শামসুল হক, মলয় রায় চৌধুরী , সুমীর রায় চৌধুরী , কাজল চক্রবর্তী , হাসান আজিজুল হক, সনত্ কুমার সাহা , রফিকুর রশীদসহ প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিকগণ।

আজকের তরুণ প্রজন্মের চোখ এঁদের পায়ের মুড়ালিতেই রাখতে চাইছেন, আর এই দৃষ্টিকে সর্বদা পাহারা দেওয়া ও একনিষ্ঠ রাখার দ্বায়িত্বটা পালন করে যাচ্ছেন কিছু কাঁশফুল হৃদয়ের মানুষ -কালিমাটির কাজল সেন , আদরের নৌকার অভিক দত্ত , অন্যনিষাদের ফাল্গুনী মুখার্জি , বাক'এর অনুপম মুখোপাধ্যায় , কবিতা পাক্ষিকের মুরারি সিংহ , অনুপ্রাননের সরসিজ আলিম , সৃষ্টির বি ভি রঞ্জন , উত্তরাধিকারের সরকার আমিন , রচয়িতার আরিফুল ইসলাম, দ্রোহের ফয়সল অভি'সহ অনেক সাহিত্য পাগল।

আর এই সখের পাগলামিতে যেন সামনে থেকে স্লোগান টানতেই ভালবাসেন কবিতার পাগলাগারদ ক্ষেপচুরিয়াস। দুই বাংলার সাহিত্যিকদের মিলন উত্সব করার জন্য খেটে যাচ্ছেন ক্ষেপুর কতগুলো ক্ষেপা। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের এই বিশেষ "বাংলাদেশ সংখ্যা "র আয়োজন। দুই বাংলার সাহিত্য পিয়াসীদের এক টেবিলে সাহিত্য পান করার নিমিত্তে। বাংলাদেশের সাহিত্যরূপ তুলে ধরার চেষ্টায় অতিসাম্প্রতিক তরুনদের লেখার প্রাধান্যতা পেয়েছে এ সংখ্যায় । মূলত আজকের কবিতা ও কবিতা ভাবনার চিত্র অংকনে ব্রত হয়েছি।

আরেকটু সময় অপচয়ের স্পর্ধা করি। একান্নবর্তী ভারত থেকে নতুন বসত গড়া বাংলাদেশ শৈশব ফেরিয়ে যুবকে পরিনত। তাঁর এক হাত ভাঁজ করে নূড়ি পাথর, অন্যটি ছুড়ে মারে দুরে। তাঁর এক কান শুনে সত্য আর অন্যটি মিথ্যা।সত্য-মিথ্যার সংকরে নতুন একটি ব্যাধির নাম অভিধানে যোগ হচ্ছে ,এটা প্রচন্ড গতিতে মহামারীর প্রতিশব্দে বদল পাচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা , ধর্মান্ধতা ,মূর্খতা ,স্বার্থবাদিতা'কে পুজি করে এক ঝাঁক ভেড়ার পাল উঠোনটাকে করে দিচ্ছে নোংরা । কোমরটা সোজা করতে করতেও নুয়ে পড়ছে পিচ্ছিল এই ভয়ানক কালো পথে।স্বাধীনতার চার দশক পরে আমজনতার পরম চাওয়া "যুদ্ধপরাধীর বিচার" চালাচ্ছে সরকার। হিংস্র হয়ে উঠছে ৭১'এর সেই নরপিশাশের দল আবার। বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে হেয় করে সৃষ্টি করছে দুর্যোগ। সামনে বাংলাদেশের আরেকটি যুদ্ধ অপেক্ষমান। আজ আর বঙ্গবন্ধু নেই , কিন্তু আছে ভাই প্রতিম কলকাতা, যে পূর্বেও রোদ্রদুপুরের বটগাছ হয়েছিল। আরেকবার একই মিছিলে থাকি দুজন। বিশেষতঃ সাহিত্যিক সিপাহীরা , একেক করে ছুড়ে মার কলমের বারুদ। বাংলার আকাশ থেকে কুলক্ষী সূর্যগ্রহণ কে তাড়াতে আর কে হতে পারে এত বিশ্বস্ত!




ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে পাভেল আল ইমরান
বিভাগীয় সম্পাদক,সাহিত্য পাতা
মাসিক বিচরণ,মালেশিয়া।

রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ ১২তম সংখ্যা

সম্পাদকীয়


রঙ-বেরং এ সাজল পুতুল ছোট্টো শিশুর হাত ধরে
ভোটরঙ্গে বঙ্গপুতুল মাতল খুনে, ছোট্টো শিশুর হাত পোড়ে...

মানুষগুলো গিরিগিটির মতো খোলোস ছাড়তে ছাড়তে এগিয়ে যায় রঙ থেকে রঙে। বিশেষত, এই বাংলায় এখন যেন মানুষের একমাত্র পরিচয় রঙে। রঙ দিয়ে যায় চেনা। রঙের আমি রঙের তুমি। ভারতীয় না। বাঙালিও না। সে অর্থে রঙিন। শুধু বন্দুকের নলই নয়, রঙও ক্ষমতার উত্স। রঙ বলে দেবে তুমি কোন পথে যাবে। রঙ বলে দেবে তুমি কি স্বপ্ন দেখবে। হীরক রাজার যন্তর-মন্তরে মগজ ধোলাই করে রঙ তোমাকে শিখিয়ে দেবে তোতাবুলি। জপতে থাকবে অন্ধবিশ্বাসীর মতো। আবার হাজার অপরাধ কর না তুমি, রঙ মিলে গেলে ফাঁসি হবে না। যমের দুয়ার থেকে বাঁচিয়ে আনবে। আর, গণতন্ত্রকে রঙ মাখিয়ে শালুতে পুঁটুলি বেঁধে গুমঘরের প্রেতকোণে টাঙিয়ে রাখবে। তাই, তুমি মানুষ না জানোয়ার? তুমি হিন্দু না মুসলমান? তুমি ধনী না দরিদ্র? তুমি শিশু না বৃদ্ধ? তুমি নারী না পুরুষ? এসব কিছুই বড় কথা নয়। বড় কথা তুমি কোন রঙে নিজেকে শিয়াল সাজিয়েছ! বেরং থেকেছ তো, হর্তা-কর্তা-বিধাতার লুকোনো তুলির তীক্ষ্ণ টানে টুকটুকে করে তুলবে তোমার মন, তোমার পরিচ্ছদ। ঘর-গেরস্থালি, ভিটে মাটিতেও সেই তুলির একছোপে আঁকা হয়ে যাবে নিমেষেই ধ্বংসরুপ।

‘তবু দূর আকাশে চাঁদ হাসে,
তবু ফুল ফোটে তার সুবাসে’...

হয়তো একদিন সাত রঙে রংধনু আঁকা হবে বাংলার আকাশে আকাশে। একদিন সত্যি সব রং খেলা যাবে কোনো এক বসন্তদিনে। হয়তো একদিন কোনো রঙ মানুষকে দলতন্ত্রে বাধ্য করবে না আর কোনোদিন। হয়তো কোনো শিশুর হাত পুড়বে না রঙের দাপটে। কোনো ঘর-গেরস্থালি, ভিটে মাটিতে আঁকা হবে না রঙিন নিষ্ঠুরতা, হিংস্রতা, বর্বরতা; বরং, মানুষের প্রতি ঘরে ঘরে রঙেরা এঁকে দেবে রাশি রাশি ভালোবাসা। গাছে গাছে আরো বেশি কিছু ফুল। একদিন নিশ্চয়ই সব রঙ নিজেদের সঁপে দেবে কবিতার পায়ে। কবিতাও যে প্রতিবাদেরই এক অনন্য উচ্চারণ। আর সেইদিন অবশ্যই কবিতারঙে রেঙে উঠবে মহাপৃথিবীর ‘বাতাস জল আকাশ আলো’। আসুন বন্ধুরা! এপার বাংলা, ওপার বাংলা, প্রবাসী বাংলা(লক্ষণার্থে)র সমস্ত বন্ধুরা আসুন আমরা সকলে মিলে সেইদিনের প্রতীক্ষায় বন্দুকের নল নয়, কবিতাকে শক্তিশালী করে তুলি। সকলে ভালো থাকুন! কবিতায় থাকুন! সর্বোপরি কবিতার জয় হোক...

ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে
বাণীব্রত কুণ্ডু ও নাশিদা খান চৌধুরী
 
 

উত্তর সম্পাদকীয় - অরিন্দম চন্দ্র

এ দেশ তোমার আমার
অরিন্দম চন্দ্র


সাহিত্যচর্চায় নিমগ্ন থাকাটা কোন দোষ নয় কিন্তু সমকালকে বাদ দিয়ে কি সত্যিই সাহিত্য হবে??এখানে এ’বিষয়ে যে কোন আকাদেমিক ডিসকাশন চলতেই পারে,কিন্তু আমি বলতে চাই এই যে এ’দেশের সীমারেখা বা তার বাইরে ঘটমান বর্তমানকে কি আমরা অস্বীকার করেই সাহিত্যে তন্নিষ্ট হব----বা পারব??

বিগত দুটি দশক জুড়ে এ দেশে চলছে নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।স্বাধীনতা পরবর্তী চার-পাঁচটি দশক কেমন ছিল তা নিয়ে বিতর্ক হোক,কিন্তু এ লেখার মূল উপজীব্য গত দুই দশক আমাদের এই দেশের মাটি আর দেশের মানুষ।আজ আমরা টিভির পর্দায়,সিনেমায়,খবরের কাগজের পাতায় পাতায় শুধু CONSENT MANUFACTURE হতে দেখি,কিন্তু আমার ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসা ছাত্র,তার বাপ-মা পরিবার তারা কোথায়,তাদের কথা কোথায়?

পাঠক আমাকে পক্ষপাতের দোষে দুষ্ট বলতেই পারেন।কিন্তু কিছু চিন্তা না করবার চেয়ে ভুল চিন্তা করাও ভালো,তাই না?আসুন সাম্প্রতিক কিছু তথ্যের আলোয় দেখি কেমন আছে,আমার আপনার দেশের ম্যাঙ্গো পাবলিক,মানে গরীব মানুষ?
U.N.D.P র সাম্প্রতিকতম WORLD REPORT, 2013 দুই হাত তুলে সাধুবাদ জানিয়েছে এ দেশকে।এ বছর ব্রাজিল,চীন,রাশিয়া আর ভারতের মোট উৎপাদন সম্মিলিতভাবে কানাডা,ফ্রান্স,জার্মানী,ইতালী,ব্রিটেন আর আমেরিকার মোট G.D.P র চেয়ে বেশী হয়েছে—পাঠক,ভুলবেন না—১৫০ বছরে এই প্রথম।

ঐ এক রিপোর্ট বলেছে ভারতের দারিদ্র্য দূরীকরণে সাফল্যের কথা----বিগত দুই দশকে,অর্থাৎ ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ৪৯.৪% থেকে ৩২.৭%।কম হল,প্রিয় পাঠক??

GLOBAL HUNGER INDEX অনুযায়ী গোটা দুনিয়ার ৮৮ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ২০০৯ সালে ৬৫ তম, ২০১০ সালে ৬৭ আর ২০১১ সালেও ৬৭।না না, এখানে নম্বর যত বাড়বে আপনি তত খারাপ,মানে পাকিস্তানের চেয়েও।আজ দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য চালু “মিড-ডে-মিল”—ভাবুন তো একবার,প্রাইমারী ক্লাসে প্রতিদিন প্রতি ছাত্র ৩ টাকা ৪৪ পয়সা আর আপার প্রাইমারীতে দৈনিক ৫ টাকা।আমার আপনার ঘরের বাচ্ছারা নাই বা গেল খিচুড়ী স্কুলে,কিন্তু পাশের বাড়ির দিনু বা মিনু কি পুষ্টি পাবে ঐ টাকায়!প্রতি বছর সামরিক খাতে ব্যয় বাড়বে আর শিশুরা অবহেলিত থাকবে এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি!!!!

GINI INDEX, যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের আর্থ-সামাজিক অসাম্য মাপা হয়,তার বিচারে ভারতের ১০% সবচেয়ে বড়লোক শ্রেণীর আয় সবচেয়ে কম আয়ভূক্ত ১০% মানুষের চেয়ে ৮.৬ গূণ বেশী।O.E.C.D র দেওয়া সাম্প্রতিকতম তথ্যের ভিত্তিতে এই ফারাক বর্তমানে প্রায় ১২ গূণ।

UNICEF এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আপনার আমার প্রিয় দেশের অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা কঙ্গো,তানজানিয়া,বাংলাদেশ এমন কি পাকিস্তানের চেয়েও বেশী।

জলবাহিত রোগে এই পোড়া দেশে প্রতি বছর ১ লক্ষ শিশু মারা যায়।মোট জনগণের মাত্র ৩৪% সরকারী হাসপাতালে যেতে পারে।শূণ্য থেকে ছয় বছরের শিশু কণ্যার সংখ্যা ২০০১ সালে ৯২৭ থেকে ২০১১ সালে ৯১৪ তে নেমেছে(সরকারী জনগণনা ২০১১ দ্রষ্টব্য)।হে পাঠক,আমি ইঙ্গিত দিচ্ছি না কিচ্ছু,আপনি ভেবে নিন...

যে দেশের প্রায় ৫০% মানুষ শৌচাগারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত সে দেশের যোজনা কমিশনের দুটি শৌচাগার তৈরী হল ৩৫ লক্ষ টাকায়,যার মধ্যে ৫ লক্ষ টাকা লেগেছে কে কে সেখানে ঐ কম্মটি করতে পারবেন সেই জন্য কার্ড বানাতে।

প্রিয় পাঠক,এ দেশ তোমার আমার...আর আজ এ দেশ দুই ভাগে বিভক্ত---বড়লোকেদের ইন্ডিয়া আর গরীবমানুষের ভারত।না, এটা কোন নির্বাচনী প্রচারের কথা নয় বন্ধু,আসুন এই ভারতের মানুষের জন্য কিছু ভাবি,কিছু লিখি বা আরও কিছু করি।হ্যাঁ,কিছু দায় আমাদের প্রত্যেককেই আজ নিতে হবে,কিছু ত্যাগ সবাইকেই করতে হবে।ক্ষুধার্ত মানুষ আজ ডাকছে,মানুষ সত্যিই খুব কাঁদছে।আমাদের লেখায় তাদের ভাষা দিতে হবে,প্রয়োজনে পথে নামতে হবে। আমাকে আমার মত থাকতে দাও,বোধ করি আপনিও আর ভাববেন না,ভাবতে পারবেনও না।

সোমবার, ১ জুলাই, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ১১তম সংখ্যা

সম্পাদকীয়



উন্নয়ন ও ভগবান

১৯৮০-৮১ সাল। বাবা-মায়ের হাত ধরে আমরা দুই ভাই গিয়েছিলাম কেদার-বদ্রী।কেদারনাথের পর বদ্রীতে যাওয়ার সময় যোশীমঠ ছাড়িয়ে রাস্তায় ভয়ঙ্কর ধস নামে। তিন দিন অপেক্ষার পর ফিরে আসতে বাধ্য হই।আজ আমার ভাই তার দুই সন্তানকে নিয়ে যখন আবার একই পথে যাবার কথা ভেবেছে তখন আর পথ নেই, বাস্তবিক এই মুহূর্তে উত্তরাখণ্ডে কিছুই অবশিষ্ট নেই । উত্তরাখণ্ড আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে বেশ কিছুদিন সময় নেবে । ধরে নেওয়া যায়, এবারের অনেকেই যারা ফিরে এসেছেন শিশুরা কেউ কেউ বাবাকে বলেছিলেন হয়তো ভগবানের ইচ্ছে ছিল না , কিন্তু পরে আবার যারা যাবেন তারাও যে এই মনুষ্যসৃষ্টি প্রাকৃতিক দুর্ঘটনার কবলে পড়বেন না সেই কথা আজ আর হলফ করে বলা যায় না।

পাঠক মাত্রই বুঝতে পারছেন আমি কোন দিকে ইঙ্গিত করছি। সেদিনের উত্তরপ্রদেশ,অধুনা উত্তরাখণ্ড এখন ১ কোটি মানুষের বাস,আর বছরে ২.৫ কোটি পর্যটক,এত চাপ কি ভগবানও নিতে পারেন?এই প্রসঙ্গে আরো কিছু জ্বলন্ত তথ্য উঠে আসছে।ভারতের ক্রম্পট্রোলার এণ্ড অডিটর জেনেরাল(CAG) গত এপ্রিল মাসেই জানিয়েছিলেন যে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের কোন DISASTER MANAGEMENT PLAN নেই।আজ সে রাজ্যের জেলাওয়াড়ী প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কর্মিসংখ্যার ৪৪% পদ শুন্য।বিগত ২০০৭ সালের অক্টোবর মাসে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের STATE DISASTER MANAGEMENT AUTHORITY তৈরী হয়েছিল,যাতে আজকের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়া যায়...আজ পর্যন্ত তাদের একটাও মিটিং হয় নি!!!কেন্দ্র বা রাজ্য,কোন সরকারই কোন পাহাড়ের জন্যই প্রয়োজনীয় ALL WEATHER PROOF রাস্তা বানাতে পারে নি,স্বাধীনতার ৬৬ বছর পরেও।

এহ বাহ্য!আজ উত্তরাখণ্ড রাজ্যের ১১ টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র,সরকারী,বেসরকারী বা আধা-সরকারী কিম্বা অধুনা প্রচলিত P.P.P(PRIVATE PUBLIC PARTNERSHIP) মডেলের, যেভাবে সুড়ংগ তৈরী করেছে পাহাড়কে ফাটিয়ে,তাতে ভূমিস্তর দুর্বল হতে বাধ্য।অথচ দিল্লী মেট্রো তৈরীর সময় এভাবে ভূতলকে ফাটাতে হয় নি।মজার কথা, এক চিত্র সংলগ্ন রাজ্য হিমাচল প্রদেশেও।গত শীতে শিমলার মত জেলায় এক মাসের মত বিদ্যুৎ ছিল না।বাকি জেলাগুলোর কথা থাক গে।রাজধানী দিল্লীর অবিশ্যি ঐ সময়ে বিদ্যুৎ পেতে কোনও অসুবিধা হয় নি।হিমাচলের (উদবৃত্ত )বিদ্যুৎ তো ছিলো।আজ আমরা মিডিয়ার দৌলতে পর্যটকদের কথাই ভাবি বা দেখি,কিন্তু পাহাড়ী মানুষ-জন,তাদের জন্য ভাবছি কি?আজ কটা লোক মরেছে আর কটা লোক স্রেফ ভ্যানিশ হয়ে গেল সেটা বোধ করি কাল নতুন কোন ইস্যুতে চাপা পড়ে যাবে। কার্যত,হড়পা বানের মত ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ে যে ভাবে পাহাড়ের পর পাহাড় ভেঙ্গে পড়ছে তাতে কিছু ত্রাণ বিলি বা বা উদ্ধারকাজের আড়ালে চলে যাবে মূল প্রশ্ন---এই উন্নয়ন,এত উন্নয়ন-- কার জন্য,কিসের জন্য??

পাঠককে মনে করাতে চাই যে আজ উন্নয়নের প্রশ্নে উত্তরাখণ্ড বা গুরগাঁও একই যায়গায় অবস্থান করছে।অপরিকল্পিত নগরায়ন,যথেচ্ছ সবুজের সংহার আর উন্নয়নের নামে ভূমিপুত্রদের উচ্ছেদ—আপনি আপনার দেশের বা রাজ্যের অন্যত্র একই চিত্র খুঁজে পাবেন,আমি নিশ্চিত।কাল তিস্তা বা তোর্সায় একই বিপদ হবে না, এটাও কেউ বলতে পারে না।ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকায় কুখ্যাত “প্রজেক্ট পোলোনোরয়েস্তে”---RAIN FOREST(যেখানে বড় বড় গাছগুলো বাঁচে ও বাড়ে অত্যন্ত কম প্রাকৃতিক পুষ্টিতে) সাফ করে তৃণভূমি বানাও,ওই ঘাস খাইয়ে আমেরিকার খাবার জন্য ছাগল-ভেড়া চাষ করা হল,আর সেটা করতে গিয়ে দ্রুত ভূমিজ জলস্তর নেমে গেল,কারণ বড় গাছগুলো মাটির অনেক গভীরে শিকড় ঢুকিয়ে জল তুলতে পারতো,যা ঘাস বা গুল্ম পারে না।তাই আজ ঐ অঞ্চলে হাইওয়ের দুইধার মরুভূমি।আপনি আর আমি আজ ঠিক একই ভাবে উত্তরাখণ্ড রাজ্য,বা গোটা হিমালয়ভুক্ত বিভিন্ন রাজ্যের,অথবা বিশ্বায়িত হওয়ার দুর্দম বাসনারত গোটা ভারতবর্ষে উন্নয়নের নামে এই চুষে খাওয়াটা কি ধরতে পারছি?

আজ উত্তরাখণ্ডের বিপদে আমরা বিচলিত হয়ে কেউ চেক কাটছি প্রধানমন্ত্রীর রিলিফ ফাণ্ডে,কেউ টিভি দেখে হা-হুতাশ করছি,কেউ বা এত ভয়ঙ্কর বিপদেও কেদারনাথের মন্দিরটা বেঁচে যাওয়ায় ভগবানের লীলাকেই সাধুবাদ জানাচ্ছি—আমাদের মগজে কার্ফু—ধোঁকার টাটিটার কথা কেউ ভাবছি কি?

ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে অরিন্দম চন্দ্র
১লা জুলাই ২০১৩

শনিবার, ১৫ জুন, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ১০ম সংখ্যা

সম্পাদকীয়


আজ বৃষ্টি আসুক বা না আসুক জানি তুমি আমি দূর শহরের বাসিন্দা। দাঁড়িয়ে আছি কাঁটাতারের বেড়ার মাঝে। যেখানে আমরা আসতে পারি অথবা নাও আসতে পারি। তোমার আমার পরস্পরের প্রতি কারোরই কোনো দাবী খাটবে না আর কোনোদিন। তবু কবিতা ছিল আছে থাকবে। কাঁটাতারের কাঁটায় কাঁটায় ফুটিয়ে তুলবে রসকলি। এখন বৃষ্টিঋতু। বৃষ্টি আসুক বা না আসুক জানি তুমি আর আসবে না কোনোদিন। তবু যে কটাদিন কাটিয়ে গেছ আবিশ্ব বাংলায়, ভিজিয়ে দিয়েছ সম্পর্কের ইতিহাস, জারিত করেছ বিরহ রঙ আগুনে আগুনে। ফাগুনে ফাগুনে। আজ বৃষ্টিঋতু। বৃষ্টি আসুক বা না আসুক জানি তুমি ছিলে, তুমি আছো, থাকবে। ফিরে ফিরে আসবে ষড়্‌ঋতুর সমস্ত রঙ্গ নিয়ে।

বৃষ্টির ঝাটে এলোমেলো মন। সূচিপত্রের পাতাটিও ভিজে গিয়ে ঝুপ মেরে বসে আছে একঘর মনখারাপের ভিতর। বর্ষায় সব বন্ধুদের না পাওয়ায়। খালি খালি লাগছে মনের মধ্যে। ধূ ধূ ফাঁকা মাঠের মতোই আকাশও আজ বিষণ্ণতা ঢেলে দিয়েছে আমাদের অন্তপুরে। জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টিরেখা। তার পিছু ধরে বহু বহুদূর চলে যায় মন ও মানুষ। তবু যখন বৃষ্টি নামে মনে পড়ে যায় বৃষ্টিতে হেঁটে যাওয়া মানুষের কথা।


আর মনে পড়ে, যাঁরা এখন শুধুই বৃষ্টি দেখে। ঘষা কাঁচের আড়াল থেকে দেখে এক জানলা ভেজা আয়ত পুরুষ-প্রকৃতি, দেখে কাকভেজা বারান্দাটার গায়ে লেগে থাকা এলোমেলো আকাশের প্রতিচ্ছবি। যাঁরা ভিজে যাওয়া পাখিটার আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আকণ্ঠ পান করে মন ভরে... অথচ তাঁরাই বৃষ্টিতে হেঁটেছিল কোনো এক বৃষ্টিকালে। এবং যাঁরা বৃষ্টিভিজে হাঁটতে চায় আরো আরো আরো বৃষ্টিপথ। এগিয়ে যেতে চায় পরশমণির আনন্দে। হয়তো একদিন যাঁরা স্থান করে নেবে মেঘ-বৃষ্টি-আকাশের অন্তরাত্মায়। এই সব নিয়েই তো আমাদের সক্কলের “ক্ষেপচুরিয়াস”। যে জানে সেই বৃষ্টিভেজা মানুষগুলোকে আবার ‘মেঘ-বৃষ্টি-আকাশ’এর নীচে দাঁড় করাতে। জানে, বৃষ্টিপথে নবীনদের এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাতে। আর এভাবেই, বৃষ্টি আসুক বা না আসুক “ক্ষেপচুরিয়াস” হেঁটে যাবে অনন্ত বৃষ্টিপথ ধরেই...



“ক্ষেপচুরিয়াস”এর পক্ষে -
ইন্দ্রনীল তেওয়ারী এবং বাণীব্রত কুণ্ডু

বুধবার, ১৫ মে, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ৮ম সংখ্যা

সম্পাদকীয়



ঘষা কাঁচের আড়াল থেকে
 
সময়টা বড় অস্থির এখন। চারদিকে অবিশ্বাস, সন্দেহ আর প্রতিহিংসা’র বাতাবরণ । তারপরেও আমরা সাহিত্য নিয়ে ভাবছি, পড়ছি অথবা নতুন কিছু করার চেষ্টা করছি সেটা অন্তত এটুকু বোঝায় যে বাঙালি আজও ভালোবাসতে জানে, অবসর সময়ে কবিতা,গল্প পড়ে খুঁজে নিতে জানে বাঁচার রসদ । এইঅন্ধকার সময়ে সেটুকুই যা আশার আলো ।

এবারের সংখ্যা - ঘষা কাঁচের আড়াল থেকে ।

এবারে আমাদের সামান্য চেষ্টা থাকবে সাহিত্যের সেই ঘষা কাঁচ সময়’কে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে রেখে এমন কয়েকজন কবি’কে দেখা -আপাতদৃষ্টিতে যাঁরা নেট জগতের তরুণতমদের কাছে ব্যাপক পরিচিত হয়তো নন কিন্তু প্রতিভায় অনন্য । বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এঁদের কবিতা পড়েননি , হয়তো নামও শোনেননি ।

সেই সব প্রায় অনালোচিত কবিদের থেকে কয়েকজনকে নিয়েই এই সংখ্যা । সময় কম হওয়ার কারণে খুব ছোট করেই শুরু করলাম আমরা । পরবর্তীতে ইচ্ছে রইলো আরও বড় আকারে কাজটি করার ।


এই দারুন দহন দিনে আপনাদের জন্য এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে আসুক‘ প্রাণ ভরিয়ে , তৃষা হরিয়ে ‘আসুক বৃষ্টি, আসুক ‘খুশির জোয়ার‘ । কেটে যাক অন্ধকার সময় - জ্ঞানের বিনম্র আলোয় ।

সবাই সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন ভালোবাসায় ।




ক্ষেপচুরিয়াসে'র পক্ষে -
মিলন চট্টোপাধ্যায় ও পৃথা রায়চৌধুরী

বৃহস্পতিবার, ২ মে, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ৭ম সংখ্যা

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ৭ম সংখ্যা



যখনি মরতে সে চায় মরতে যে দাও নির্বিকারে
এই কি তোমার মনের কথা এই কি তোমার স্বাধীনতা
যখনি সে আপনজিতের ফ্যাস্লা নিতে নীরব নিভয় এমন হারে
তুমি তারে কথায় হারাও স্বয়ম্‌জিতের সমব্যথায়
কই সে প্রেমের বাঁধন আগলে রাখে সোহাগসুখে চিরতরে
কই সে বাঁধন এমন হার মেনেছে হারের কাছে মায়ার তোড়ে
তুমি তো পাগল বলেই খালাস হবে এমন পাগল
যে ভোগে সে জানে এই অসুখ শুধুই প্রেমের আগল

অতঃপর ফোন কেটে গেল ! ওপাশের অমানুষিক নিস্তব্ধতা শ্বাস ফেলছে । আমার কানে ছিটকে এসে লাগছে বিদেহী গরমের ফোঁটা । তাচ্ছিল্যের অণুরণন চাপা দিতে গিয়ে অথৈ প্রাবল্যের চিতকার ডুবিয়ে দিতে পারেনি নিজের প্রতি অবজ্ঞা বা উপেক্ষা - মানুষ বড় নিজের জন্য লড়ছে প্রতিটি লড়াইয়ের হেতু নিজেকে টিকিয়ে রাখা...নিজে টিকলে আরেকজনকে ...আরেকজন টিকলে আবার আরেকজন ... কারোর কোনো দায়বদ্ধতা নেই,সব কবিতার মত বাষ্পীয় হয়ে গ্যাছে ধরা-অধরার নাগাল ঊর্ধ্বে !একটা জটিলতা ব্যাখ্যার চেষ্টা চলছে পুরোদমে না পারলেই সমাধান সহজ হয়ে যাচ্ছে অপনয়নে, শুধু প্রথম বন্ধনীর মাঝখানে পড়ে আছে অতএব পাগলামি ধরে নেওয়া হোলো! সহজ সরল সমাধান মাল্টিপলচয়েস লাইফস্টাইলের এটাই সবচে বড় প্রো ...রবীন্দ্রনাথ-রোম্যান্স-গাঁজা-ফ্লার্ট-একাকীত্ব-নারীদের প্রতি সম্মান এগূলো আরো অন্যকিছুর মতোই অপশনাল।বাঙ্গালী বালকেরা বড় হইয়াছে ইহা বুঝাইবার দুটি বড়ো উপায় :


একটি পছন্দমত রঙ নিয়ে খেলা,মাঝে মাঝে সিরিয়াস হয়ে যাওয়া কাউকে মেরে ফেলে বীরত্ব জাহির –তোমার এই আত্মত্যাগ আমরা উমুক জায়গায় কাচিবো তুসুক জায়গায় শুকাইব আদিতে ইতি ! আবার ধুম্রপান করে ধুম্রপান করিবার সার্থকতা ব্যাখ্যাপূর্বক নিজের ক্যাসুয়াল বিউটি রগড়ানো।মিষ্টির প্রতি পিপীলিকা বাহিনীর ন্যাক সামাজিক ভাগ-বাটোয়ারার সিলেবাসে ঢোকানো হচ্ছে জোর করে জোর করে ঢোকালে কি হয় এ অ্যাক চিরন্তন প্রশ্ন... তবে হাঁ টেনসন নেহি লেনে কা সার্কাস মে ঈতনে সারে জীব্জন্তু রংবাহারি ঠোঁট তুলতুলে হ্যাকচাপ্যাটাং আপকো কভি অকেলা মেহ্‌সুস হোনে নহি দেগা হৈ মানো ঈয়া না মানো উই ডোণ্ট হ্যাভ অ্যানি ন্যানো,রবীন্দ্রনাথ হাসিমুখে পায়চারি করছেন পাসপোর্ট হয়ে গ্যাছে এবার বিদেশে যাবেন বিদেশ বিদেশ মানে জানো ?কি নেই !অতঃপর ফোন কেটে গ্যালো রক্তবিহীন বিপ্লব –বিপ্লব আমার দ্যায়োরের নাম ননোদের কাম ! বিপ্‌ বিপ্‌ আসবে না মানে ?বাপ বাপ বলে আসবে,একদিনে না দুদিনে না তিনদিনে বিপ্লবের সৎ বাবা আসবে ... কামিং সুন ভরতকে কেন জড় বলা হবে? না চলবে না ,আরেকটু ঘুমটুসকি লুলে দাও । বিপ্লব আসবে তবুও তো আমরা বড়ো হয়ে যাচ্ছি খুচরো কয়েকটা কেলেঙ্কারির মতো কিছু না ঘটলে এই বয়সে বিনোদন হবে কী করে?




- ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে ঋষি সৌরক

মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ৫ম সংখ্যা

সব চরিত্র কাল্পনিক
এক মসৃণত্বকা নারী চেয়ারে বসে আছেন, সামনে কাপড় ঢাকা টেবিল। সালাঙ্কার নারীর পরনে স্বচ্ছ শাড়ি। গায়ের অলঙ্কার বৈভবেব সাক্ষ্য দেয়। হাতদুটি টেবিলের উপর কাপড়ের ফালির উপর ন্যস্ত, অতি পরিচ্ছন্না। নারীটির ডানপাশে একটি হুলোবিড়াল উপস্থিত, মনে হবে টেবিলের প্রান্তে উঁকি মারছে অথবা টুলের উপর বসে আছে ...সর্বদা সঙ্গী। বামদিকে একটি বকগলা ফুলদানী আর তাতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ফুলগুচ্ছ দৃশমান। কটা কনীনিকা সমৃদ্ধা একমনে তাঁর গলার হার চিবুচ্ছে। পরিচ্ছন্ন কাজ। ছবিটিতে অদ্ভুতভাবে শাড়ির ভিতর দিয়ে শরীরী সম্পদ দৃশ্যমান। গণেশ পাইনের ছবি যারা দেখতে অভ্যস্থ তাদের নিশ্চয় এই ছবি অবাক করেছে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে লেখা চিঠিসূত্রে আমরা জানতে পারি টেম্পারায় আঁকা এই ছবিটির রচনাকাল ১৯৭৯ সালের মাঝামাঝি। একই সূত্রে তিনি লিখেছেন " এখন যেটি আঁকছি তার খসড়া পাঠালাম। খুবই সাদামাটা, হয়তো ছবিটির নাম হবে 'Woman biting her necklace!' হাসছো ?"। সমালোচক এলা দত্ত লিখেছেন 'This painting is a rare instance of a work where he escapes from tragic intersity and indulges in a lighter mood of fun.' ছবিটি নিয়ে গণেশ পাইনের মনে দ্বিধা ছিলো এবং সমালোচক বা রসিকরা এটিকে হালকা মেজাজের ছবি হিসাবে নিয়েছেন। সত্যি কি ছবিটি হালকা মেজাজের !!! দীর্ঘদিনের মনোবেদনা চেপে রাখলে সেটি হাস্যরসে রূপান্তরিত হয়ে বেরিয়ে আসে, একথা যেকোনো ভুক্তভোগী জনই স্বীকার করবেন। ধনীর দুলালী কাম ঘরানী বসে বসে নিরস ঐশ্বর্য চিবুচ্ছে, পাশে কৃত্তিম সৌন্দর্য্য আঁধার ফুল এবং হুলোমুখী স্বামী/পোষ্য দেখে ব্লাক কমেডির অস্তিত্ব সমর্থনে দৃঢ় ধারণা জন্মায়। এক অসাধারণ কুৎসিত ফ্যামিলী ফোটো ফ্রেম, যার পরতে পরতে রয়েছে না পাওয়ার বেদনাকে কৃত্তিম সৌন্দর্য, বৈভব এবং আধুনিকতা দিয়ে ঢাকবার প্রবল চেষ্টা।



শিল্পীর নির্মাণ নিয়ে দর্শক এমন কি অন্য শিল্পীদেরও অল্পবিস্তর কৌতূহল থাকে, আর শিল্পী যদি সদ্যপ্রয়াত গণেশ পাইন হন তাহলে তো আগ্রহ শতগুণ বৃদ্ধি পাবে। আমরা জানি শিল্পী তাঁর ভাবনার নির্যাসকে ক্যানভাসে লিপিবদ্ধ করেন রঙ ও রেখাকে সম্বল করে। নিজের ছবির নির্মান সম্পর্কে বলতে গিয়ে গণেশ পাইন এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন "আধুনিক চিত্রকলার দুটি প্রধান প্রবণতা। এক ছবির গঠন নির্মাণ নিয়ে নতুন ভাবনা। দুই মনে অবচেতন স্তর সম্পর্কে আগ্রহ"। প্রথম প্রবণতাটি শিল্পীদের জন্য তোলা থাক, কারণ শুধু নিরস তত্ত্বকথা এই প্রবন্ধের পক্ষে অপ্রয়োজনীয়। আমাদের আগ্রহ দ্বিতীয় প্রবণতা অর্থাৎ 'মনের অবচেতন স্তরের সম্পর্কে আগ্রহ', কারণ আমরা জানি ওঁনার ছবি মূলত আত্মজৈবনিক। অবচেতন নিয়ে যাদের সামান্য আগ্রহ এবং পড়াশুনা আছে তারা জানেন যে আমাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে শুরু করে বাস্তবিক অপ্রাসঙ্গিক অপ্রয়োজনীয় কাজের মধ্যেও একপ্রকার অবচেতন মন-শৃঙ্খল থাকে। এইসব কাজ স্থির মাথায় বিচার বিশ্লেষণ করলে কোনো ব্যক্তি বিশেষ সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায় যা তারা নিজের অজান্তেই নিজেদের মনের গভীর কুঠুরীতে লুকিয়ে রাখেন। আমরা এখানে দেখার চেষ্টা করব গণেশ পাইনের বিখ্যাত চারটি কাজকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব (হোক না তা লেখকের কষ্টকল্পনা)। লেখার শুরুতে সেই চেষ্টাই আমরা করেছি।



রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী' নাটকের রঞ্জনের মৃত্যু নিয়ে ১৯৬১ সালে জলরঙে একটি ছবি এঁকেছিলেন গণেশ পাইন। ছবিটিতে দেখি রঞ্জনের মৃতদেহ পড়ে আছে মেঝেতে। তাঁর একপাশে সিঁড়ির মুখে এলিয়ে নতমস্তকে নন্দিনী বসে আছে। রঞ্জনের চিবুকটি অস্বাভাবিকভাবে উঁচু হয়ে আছে যেন বলছে মৃত কিন্তু মৃত্যুর কাছে হার মানে নি। নন্দিনীর ঠিক বিপরীতে অপর পাশে রাজবেশে মহাপরাক্রান্ত রাজা দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর ব্রীজম্যান সদৃশ্য পেশীবহুল ডানহাতটি দৃশ্যমান। মাথার বদলে শূণ্যতা বিরাজ করছে। পিছনের ব্যাকগ্রাউন্ড নাটক বর্ণিত যান্ত্রিক সভ্যতার যন্ত্রণাময় উপস্থিতি। শিল্পীর বর্ণনা থেকে তাঁর এই ছবির করণকৌশল সম্পর্কে জানতে পারি। ড্রইং করার পরে সারারাত হলুদগোলা জলে কাগজটিকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন তিনি। ফলে হলদে রঙ কাগজের ফাইবারে ঢুকে যায়। এরপর সাদা রঙ দিয়ে এলোপাথাড়ি টেক্সচার করে নেন যা প্রথম পর্যায় থেকে ছবিতে রয়ে গেছে। এরপর অন্যান্য রঙ দিয়ে ছবিটিকে শেষ করেন তিনি। স্বভাবত মনে খটকা লাগে আপদমস্তক নিরীহ এবং ধীরস্থির শিল্পীর কি প্রয়োজন পড়লো কথিত 'এলোপাথাড়ি' টেক্সচারের যার আর কোনোদিন প্রয়োজন হয় নি শিল্পীর। প্রশ্নটি আপকে ভাবায় কি ?

আর্ট কলেজের শিক্ষা শেষ করে স্কুলশিক্ষকের চাকুরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে ওই কলেজেই একটি উড-ক্রাফসের কোর্স করেছিলেন গণেশ পাইন সালটি ১৯৫৯-৬০। সেই ক্লাসেই পরিচয় হয় সহপাঠিনী ধনীর দুলালী মীরাদেবীর(পোদ্দার) সঙ্গে। বন্ধুত্ব অচিরেই অনুচ্চারিত প্রেমে পরিণত হয় কিন্তু পূর্ণতায় পৌঁছনোর আগেই বিচ্ছেদ ঘটে। বাড়ির মনোনিত পাত্রের সঙ্গে শুভ পরিণয় ঘটে মীরাদেবীর। এই বিচ্ছেদ শিল্পীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে থাকবে, আর সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা এই বিচ্ছেদকে ধংসাত্মক রূপ দেয় নি, টেনে নিয়ে গেছে শৈল্পিক মনন নির্মাণে। সেই নির্মাণ থেকেই গড়ে উঠেছে 'রক্তকরবী' নামক চিত্রকর্মটি। মনের গভীরে থাকা যন্ত্রণা মুক্তি খুঁজেছে এলোপাথাড়ি টেক্সচারে, প্রশমিত করেছেন মনকে,আত্মাকে। আবার শৈল্পিক মনন ওই ক্ষত ঢেকেছে অন্যান্য রঙের নির্মাণ দ্বারা। নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না আলোচনার শুরুর ছবি 'উওম্যান বাইটিং হার নেকলেস' সেই টানাপোড়েনের দ্বিতীয় উপলব্ধি, অনেকটাই প্রশমিত সিন্থেসাইজ রূপে। তাই হয়ত শিল্পীর চেতন মন অবচেতনের গভীরে থাকা বেদনাটিকে মনে করেছিলেন 'আহা বোধহয় খুবই সাদামাটা'।

তৃতীয় ছবিটির নাম 'ইভিল কনভহারসেশান', এটি মিশ্র মাধ্যমে আঁকা, রচনাকাল ১৯৮৫। একটা অপরাধবোধ ধীরে ধীরে পেয়ে বসেছে শিল্পীকে। তাঁর মনে হয়েছিল তিনি পরকীয়ায় মত্ত। ততোদিনে বিখ্যাত হয়েছেন তিনি, সমাজের মানী লোক তিনি, আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে, হুসেন স্বীকার করে নিয়েছেন ভারতের সেরা শিল্পী বলে, গুণমুগ্ধ সংখ্যাতিত। কিন্তু কিছুতেই মীরাদেবীকে মন থেকে মুছতে পারেন নি অর্থাৎ জীবনের দ্বিতীয় প্রেমকে (প্রথম প্রেম অবশ্যই ছবি)। তাই তলে তলে মীরাদেবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো। ততোদিনে মীরাদেবী এক পুত্রের জননী, ভরা সংসার। কিন্তু ঠিক মানাতে পারছেন না। তাদের এই দেখা-সাক্ষাত বা অনুচ্চারিত প্রেমের উপর গড়ে উঠেছিল এই ছবিটি। তাই ছবিটিতে দেখতে পাই রক্তকরবী নন্দিনী যিনি কিছুকাল পরে হয়েছিলেন মসৃণত্বকা, এখানে তাঁর সেই রূপ কিছুটা প্রশমিত স্তিমিত, চেয়ারে বসে আছেন হাঁটুর উপর হাতদুটি রেখে। তাঁর চেয়ারের ডান হাতলে উপবিষ্ট নিশাচর পেঁচা। পশ্চাদপট অন্ধকার, কোথাও কোথাও গাঢ়। গভীর পেঁচা কখনই আমাদের মনে মিঠে বাতাস বয়ে আনে না, যা আনে তা যেন অনেকটাই নষ্ট বা সামাজিক ভাবে অপবিত্র। বিস্তারে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।



যতদূর জানি মূলত আত্মজৈবনিক শিল্পী গণেশ পাইন ব্যক্তিগত ঘটনা নিয়ে আরো দুটি ছবি এঁকেছেন যেগুলি এই রচনায় অন্তর্ভূক্ত নয়। একটির নাম 'দ্য ডোর, দ্য উইন্ডো' আবাল্য সঙ্গী দাদা কার্তিক পাইনের অকাল মৃত্যুর অনুভূতি থেকে সৃষ্ট। দ্বিতীয়টি স্নেহময়ী মায়ের জীবনাবসান নিয়ে আঁকা, শিরোনাম 'দ্য উডেন হর্স'। এছাড়া নিজের প্রতিকৃতির বদলে বারংবার এঁকেছেন বাঁদরের মুখ, সে আলোচনা অন্য কোনোদিন।



শিল্পীর আঁকা ছবি সত্যিই কি কোনো অনুভূতি জাগ্রত করে দর্শকের মনে? সত্যিই করে, অন্তত আলোচ্য চতুর্থক্সম ছবিটি তো বটেই। একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিশ্চয় এক্ষেত্রে অতিকথন হয়ে যাবে না। জেলা গ্রন্থাগারে দেশ পত্রিকার একটি সংখ্যা হাতে পড়েছিল নতুন শতাব্দীর শুরুতে (৪ মার্চ ২০০০)। সেখানে একটি ছবি বিশেষভাবে দৃষ্টিগোচর হল। একটি ভেলায় নরকঙ্কাল শুয়ে আছে, সামান্য একটু লজ্জাবস্ত্র দৃশ্যত। তার পাশে এক সালাঙ্কার নারী মাথায় মঙ্গলঘট নিয়ে বসে আছেন। তপ্তলোহিত বর্ণের শাড়ি পড়া নারীটির ডানহাত কঙ্কালটির ডান হাতের উপর আস্থাজ্ঞাপন স্পর্শ করেছে। পশ্চাদপট নীলের পর্দা নদীর সঙ্গে মিশে এক আধাভৌতিক রহস্যময় পরিমন্ডল তৈরি করছে। দূরে কিছুটা সাদা নিষ্পাপ আলো ঝরে পড়ছে। অঙ্কনশৈলী শিল্পীর সাক্ষর বহন করছে। নিচে ছোটো হরফে লেখা আছে 'গণেশ পাইন, বেহুলা, টেম্পারা ১৯৯৯'। ছবিটি চোখে পড়ার পর প্রথম যে কথাটি মনে এসেছিল সেটি হলো গণেশ পাইন বিয়ে করেছেন। বন্ধুদের বললাম, তারা আমার মানসিক সুস্থিরতা সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহে খোঁজখবর নিলো। প্রমাণ করবার উপায় নেই, সত্যিকথা বলতে কি মফস্বল শহরের জেলা গ্রন্থাগারই ছিলো আমাদের ভরসাস্থল ২০০০ সাল নাগাদ, এখনকার মতো তথ্য-প্রযুক্তি সহজলভ্য নয়। সেই সময় গণেশ পাইনের সম্পর্কে ধারণা বলতে মৃণাল ঘোষের লেখা 'গণেশ পাইনের ছবি' (প্রথম সংস্করণ) যা লাইব্রেরীর রেফারেন্স রুমের অন্ধকার আলমারীর বাসিন্দার। সেদিন শিল্পকলার উপর আমার ধারণা আর ওনার বইয়ের ভরসাতেই মনে এসেছিলো ছবি দেখে শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের এই বিশেষ ঘটনাটি। তখনও জানতাম না এই নারী সেই নারী কিনা যিনি বিভিন্ন রূপে পূর্বের আলোচিত তিনটি ছবিটে দৃশ্যত হয়েছেন। কিছুদিন পর মৃণাল ঘোষের অপর একটি বই থেকে জানতে পারলাম আমার ধারণা ঠিকই।



গণেশ পাইন বিবাহ করেছিলেন ১৯৯১ সালে সেপ্টেম্বব মাসে সেই নারী মীরাদেবীকেই। মৃণাল ঘোষকে দেওয়া একটা সাক্ষাতকারে শিল্পী জানিয়েছেন "এটা খুব দুঃখের ব্যাপার, এটা এক অনুচ্চারিত প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপার ছিল। তার মীরা যেহেতু খুব বড় বংশের কন্যা, ওঁর বাবা একজন Successful লোক ছিলেন business world-এ, আমার মতো হতচ্ছাড়া লোকের সঙ্গে তো বিয়ে দেওয়ার কোনো কারণ ছিল না। তাই একটা দুঃখের জীবন কাটিয়েছে ও প্রথম বিয়ের পর। কিন্তু তলায় তলায় ছিল সম্পর্কটা খুবই। তারপর যখন ও divorce করল, সাহসিকতার ব্যাপার, অখন আর বাধাটা রইলো না।" এই বিশেষ ঘটনাটিকে দীর্ঘ আট বছর পর তিনি মূর্ত করলেন ক্যানভাসে, মেশালেন বাঙালির মধ্যযুগের লোকসাহিত্যের মিথকে, মিথ আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একাকার হয়ে জন্ম নিলো বিখ্যাত সৃষ্টি The voyage যারই বাংলা শিরোনাম 'বেহুলা'।




মকবুল ফিদা হুসেন একবার গণেশ পাইন সম্পর্কে বলেছিলেন, “যে কোনো শিল্পকর্ম যখন শিল্পীর ব্যক্তিগত উপলব্ধি মন্থন করে সৃষ্ট হয় তখন তা অমৃতের সমান হয়ে ওঠে। আর তা যদি গণেশ পাইনের মত ভারত সেরা শিল্পী হন তাহলে তো কোনো প্রকার দ্বিমত থাকে না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মিথ, আধুনিক মনন জারিত হয়ে তা সর্বকালীন সেরা সম্ভারে পরিণত হয়। আরো একটি ছবির কথা আলোচনা করার বিশেষভাবে ইচ্ছা ছিলো কিন্তু না প্রাবন্ধিক না পাঠক কেউই এখন প্রস্তুত নন সেটার জন্যে। তাই জন্য আমাদের আরো কিছুকাল অপেক্ষা করতেই হবে। সেই ছবিটি(গান্ধারী) দেখে আমার এক শিল্পী ভাই গৌরব রায় বলে উঠেছিল আরে এটা তো মীরাদেবীর মুখ। আগ্রহী পাঠকদের কাছে একটি ছবির কোলাজ তুলে দিলুম, দেখুন যদি কিছু আবিষ্কার করতে পারেন, আর এই সব নিয়েই এই বিশেষ সংখ্যা যা আমাদের পক্ষ থেকে শিল্পী গণেশ পাইনকে আমাদের মত করে শ্রদ্ধা, তার জীবনকে তুলে ধরার চেষ্টা ।”


এবার শোনা যাক নিজের জীবন সম্পর্কে একবার সদ্যপ্রয়াত চিত্রশিল্পী গণেশ পাইন কী বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, "আমার জীবনে ব্যাপ্তি নেই,বৈচিত্র নেই, ভ্রমণে আমার প্রবল অনীহা, আমার আছে জন্মার্জিত একবোধ, যা প্রাচীন জলে ভেসে আসা কোনো গুল্মের মত; যার শেকড় সঞ্চার আমার মনের গভীর প্রদেশে অবিরাম ঘটে চলেছে। জীবন এবং শিল্প সংক্রান্ত আমার যাবতীয় স্মৃতি স্বপ্ন অভিজ্ঞতা সবই তার সংশ্লেষিত হয়েছে সেই বোধ্যে। সে সংশ্লেষের তাৎপর্য আমি সঠিক বুঝিনা, শুধু তার ক্রিয়া অনুভব করতে পারি"। গণেশ পাইনের প্রয়াণ বাংলা তথা ভারতের নক্ষত্র পতন। বাঙালি চিত্রকলাকে পরম্পরা এবং নিজস্ব মনন মেধা দিয়ে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি তা নবীনদের সমৃদ্ধ এবং উৎসাহিত করবেই। ক্ষেপচুরিয়াসের এই সংখ্যা ওনার উপর আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। এই সংখ্যায় কবি, শিল্পী, সমালোচক এবং মুগ্ধ দর্শকের কলমে তাই উঠে এসেছে গণেশ পাইনের শিল্প ও জীবনের নানাদিক। ওনার আঁকা শিল্পকর্মের কিছু নমুনা রসিকদের জন্য রয়েছে। শিল্পীরা গণেশ পাইনকে কিভাবে দেখেছেন, থাকছে তার কিছু অনুভব। আশা করছি ক্ষেপচুরিয়াসের অন্যান্য সংখ্যার মত এই সংখ্যাও পাঠকমহলে সমাদৃত হবে।

ক্ষেপচুরিয়ানসের পক্ষে অমিত বিশ্বাস

শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা

সম্পাদকীয়


যে কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকে তাঁর বেঁচে থাকার সময়কালেই। নিজের জীবদ্দশার আগে এবং পরে কারোরই পক্ষে জীবিত থাকা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কেউই অনাদি-অনন্ত নই। সুতরাং আমাদের যা কিছু করার তা তো ঐ জীবত্কালেই সমাধা করে যেতে হয়। আর তাই আমরাও আমাদের যে যাঁর মতো করেই কাজ করে থাকি। নিজের পরিচিত গণ্ডীর মধ্যে নিজেকে সুপরিচিত করে তুলতে আমরাও শশব্যস্ত হই। সেকারণে প্রত্যেকেরই বেঁচে থাকার বা বলা ভালো নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার নিজস্ব কিছু কৌশল থেকেই থাকে; যেটা সম্পূর্ণভাবেই তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত। এমনকি নিজের পুরুষটির সঙ্গে বা নিজের স্ত্রীটির সঙ্গেও পরস্পরে বিভিন্ন সদ্‌-অসদুপায় অবলম্বন করেই দাম্পত্য যাপন করেন। তাই শুধু যে সমাজের এক্কেবারে নিচু থেকে উপরতলা পর্যন্ত ধান্দাবাজ, বেকার, সুবিধাখোর, পার্টির নেতাগোছের লোকেরাই কৌশল করে তা কিন্তু নয়।


যাইহোক, বিষয়ের কথায় আসি। এই যে ‘কৌশল’ এরই এক সংকীর্ণ অর্থে ‘রাজনীতি’ শব্দটির ব্যাপক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। যদিও শব্দটির আক্ষরিক অর্থ রাজার নীতি তথা রাষ্ট্রনীতি; তবুও একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় যে শব্দটিকে আমরা আখছার ‘কৌশল’ অর্থেই ব্যবহার করে থাকি। যেমন ধরুন, আমাদের স্কুল-লাইফে এইসব ছিল কিনা মনে পড়ে না, তবে কলেজ থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটির সহপাঠী-পাঠিনীদের মধ্যে আর এখনও কর্মস্থলে কলিগদের মধ্যে আমরা বলেই থাকি ‘জানিস/জানেন তো ও/অমুক না দারুন পলিটিক্সে (রাজনীতিরই ইংরাজি অর্থ) চলে। এমনি এমনি একটা কথাও খরচ করেন না’। আবার কারাও-বা নিজেদের (আমরা) দিকে না দেখে শুধুই অন্যের দিকে তাক করে বলে থাকেন - ‘আরে বলবেন না মশাই, ওদের (ওরা) মধ্যে ভীষণ পলিটিক্স! স্বার্থ ছাড়া এক-পা’ও এগোয় না।’ ইত্যাদি, ইত্যাদি...


তাহলেই বুঝুন। যখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির হাঁড়িটি থেকে শুরু করে দেশ-মহাদেশের তাবড় তাবড় হাঁড়িগুলো ভরা হাটে ভাঙলে ভিতরে ঐ তথাকথিত ‘পলিটিক্সের পাঁশ’ ছাড়া দু-মুঠো স্বস্তির অন্নই পাওয়া দুষ্কর তখন সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্পকলার ক্ষেত্রই বা কি করে ধৃতরাষ্ট্র হবে! আর যেহেতু, কোনো সৃষ্টিই কখনো সমকালকে এড়িয়ে অসম্ভব (যদিও সমকালকে নিয়েই লিখতেই হবে এমনটাও নয়) তাই রাজনীতির বহির্ভূত কেউ নেই কিছু নেই। কাব্যসংসারে এই রাজনীতির প্রাদুর্ভাব ঘটে দুভাবে। প্রথমত, কবি-লেখকগোষ্ঠীর মধ্যে আর দ্বিতীয়ত, সাহিত্যের মধ্যে; কবিতার মধ্যে। তাই 'দেশ-কাল-পাত্র'র উপেক্ষা করে সাহিত্যে রাজনীতির গোছানো ঘরকন্না কিভাবে ছিল-আছে-থাকবে তা দেখে নিই 'ক্ষেপচুরিয়াস'এর পাতায় পাতায়...


ক্ষেপচুরিয়াস'এর পক্ষে
বাণীব্রত কুণ্ডু

শনিবার, ২ মার্চ, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় বর্ষ, ৩য় সংখ্যা



সম্পাদকীয়




কবিতায় কবি বলেছেন ' ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়'... কিন্তু উগ্রপন্থার শিকার হয়ে গলা টিপে ধরে সব ভাষা, তা এই সংখ্যাটি করতে গিয়ে টের পেলাম ... আন্দোলন, প্রতিবাদ,ধিক্কার... তরুন সূর্যের অস্তমিত করুণ রাগ সব ছিঁড়ে খাচ্ছে বুকের পাঁজর ... তখন সাহিত্য চর্চার বিলাসী স্বপ্ন কাদায় পড়ে লুটিয়ে একাকার ... লেখা চাইতে গিয়েই শুনছি ... " ভাটার দুনিয়ায় ভাষার জোয়ার কোথায় পাবো ?" শাহবাগের রক্তের দাম দেওয়ার ধৃষ্টতা আমরা করিনি। শুধু কোন স্লোগানে না গিয়ে, মেলাতে চাইলাম... দুই সাঁকো ' সাহিত্য - রাজনীতি'... কিন্তু দুইয়ের তুমুল বিস্ফোরণ ... তবু কিছু চাঁড়া পোঁতার আন্তরিক প্রয়াস, পাঠক বলুক কি হলো!


মৌলবাদী আগ্রাসনে যখন বাংলাদেশের পাশাপাশি কলকাতা তথা সমগ্র বাঙালি ফুঁসছে, তখন ঘরে বসে সম্পাদকীয় লেখা খুব জটিল। কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ কত কিছু জানাতে হয় । চামড়া ছিঁড়ে খাচ্ছে যখন কুমীর, তখন আর কিই বা বলি ? এখন শুধু শপথ নেওয়া আর দেয়াল ভাঙবার পালা... যদিও সেই হাতুড়ি খোঁজার কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি ।



ধর্ম শব্দের আক্ষরিক অর্থ- যা ধারণ করে। কিন্তু ধর্ম গ্রাস করছে এখন, রাজনীতি ,সমাজনীতি তথা মূল ধর্মনীতি । যার ফলাফল হল 'শাহাবাগ' ঘটনা । আজ ৪২ বছর পর ও যে একই ভাবে অপ শক্তি একই ভাবে কার্যকর তা প্রমাণিত । কিন্তু রাজাকার রা কোন ব্যাতিক্রমি মুখ নয়। বরং বেশ কিছুদিন ধরে চলে আসা এক মূর্খ স্তাবক মুখের মিছিল। শাহাবাগ প্রজন্মের দায়িত্ব ও শপথ তাই অনেকখানি। ... যারা ব্যাবসা আর ধর্ম করেন একসাথে এবং রাজনীতিকে নিয়ে আসেন গদি দখলের লড়াইয়ে , এখনো আমাদের বিশ্বাস সেই অন্ধকার দূর হবেই। যদিও কালাপাথর সরানোর কাজস্টাম খুব কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।

ভালো থাকার চেয়ে ভালো রাখা ও বাংলাকে একটু আব্রু দেওয়া বড় প্রয়োজন ।ক্ষ্যাপামি এবার প্রবল ভাবে হোক জীবনে ও রাষ্ট্রে ফুল ফোটাতে । এই নিন হাত পাতলাম - সবাই হাতে হাত মেলান ...

"আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালোবাসি"




ক্ষেপচুরিয়াস সম্পাদক মণ্ডলীর পক্ষ্য থেকে -
ঊষসী ভট্টাচার্য

শুক্রবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ২য় সংখ্যা ২য় বর্ষ


সম্পাদকীয়





মাস ফেব্রুয়ারি , এই মাসেই পাশ্চাত্যমতে ভ্যালেন্টাইন'স্‌ ডে এবং বাঙ্গালীদের অন্যতম সেরা একটি উৎসব - সরস্বতী পূজা । যে পূজা একাধারে বাগদেবীর আরাধনা এবং কৈশোরের প্রেমের উন্মেষকাল ।

এমন সময়ে যখন সবাই এই দুই বিষয়ে সাহিত্যপত্র করছেন তখন আমরা বেছে নিলাম --' শঙ্খ ঘোষ ' !

কেন ?

বাংলাদেশের চাঁদপুরে এমন এক ফেব্রুয়ারি মাসেই জন্মেছিলেন এক প্রবাদপ্রতীম কবি, বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ - চিত্তপ্রিয় ঘোষ, যাঁকে আমরা কবি শঙ্খ ঘোষ নামেই সমধিক চিনি । সরস্বতীর সাথে যাঁর নিগুঢ় যোগাযোগ । বীণাপাণি'র বরপুত্র এই কবিকে সম্মান জানানোর জন্য তাই এই মাস বেছে নেওয়া ।

যাদবপুর, দিল্লি ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক এই অসামান্য মানুষটি তাঁর লেখনীকে অমরত্বের দিকে উন্নীত করেছেন দিনেদিনে । শুধু কবিতাই নয়, প্রবন্ধ, অনূদিত নাটক কি লেখেননি তিনি ।

কবিতাকে ব্যবহার করেছেন অমোঘ তরবারির মত ।প্রতিটা শব্দের অনন্য ব্যবহার তাঁর লেখায় এনে দেয় এক অপার রহস্যময়তা ।

শঙ্খ ঘোষ সেই বিরল কবিদের একজন যিনি তাঁর লেখনীকে ব্যবহার করেন এক অনিবার্যতায়। আপাত শান্ত , আদ্যন্ত ভদ্রলোক এই কবির কলমে ভরা থাকে প্রতিবাদের বারুদ।


বলাইবাহুল্য -- আমাদের মধ্যে যারা সাহিত্যচর্চা করেন কিংবা মুগ্ধ পাঠক তাদের কাছে খুব গর্বের মানুষ কবি শঙ্খ ঘোষ। তাই তাঁকে স্মরণ করে আমরা গুটি কয়েক মুক্তগদ্য, আলোচনা আর কিছু কবিতা দিয়ে সাজিয়েছি এই সংখ্যা।



এমন মানুষকে নিয়ে এই সংখ্যা করার সুযোগ পেয়ে আমরা গর্বিত।



তিনি দীর্ঘজীবী হন, আমরা অবগাহন করতে থাকি ক্রমাগত শব্দধারায়। অনেকটা আবেগ দিয়ে করা এই সংখ্যা সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে আদৃত হবে এই কামনা রইলো সকলেই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর শিল্পে থাকুন।




ক্ষেপচুরিয়াসে'র পক্ষে -
মিলন চট্টোপাধ্যায় ও পৃথা রায়চৌধুরী

মঙ্গলবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৩

সম্পাদকীয় - ১৩তম সংখ্যা ১ম বর্ষ





সম্পাদকীয় 



দাবানলের সামনে দাঁড়িয়ে বুক যখন উত্তাপ পোহায়, তখন শীতল আলিঙ্গনে
সাহিত্য আমাদের জীবনে বন্ধুত্বের পেলব ছোঁয়া দেয়। আমাদের ক্ষেপচুরিয়াস একটি সাহিত্য সংগঠন। কবি, গদ্যকার, পাঠক, সাহিত্যিক সমালোচক সকলকে এক মঞ্চে দাঁড় করিয়ে সার্বিক মেলবন্ধন – এই আমাদের লক্ষ্য ।


জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মূলত সাহিত্য পার্বণের সময়। লিটিল ম্যাগাজিন, বইমেলা সবেতেই নতুন লেখার গন্ধ। আমাদের এবারের সংখ্যাটিও প্রতি বারের মতো সাহিত্যের প্রাণ সহযোগেই সাজানো হলো। নতুন বছরের দ্বিতীয় সংখ্যা আমাদের সাহিত্য প্রেমী পাঠকদের সহযোগিতায় পূর্ণ হয়ে উঠুক, এই কামনা করি।


ক্ষেপচুরিয়াসের পক্ষে ঊষসী ভট্টাচার্য