শিল্পকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শিল্পকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১২

শিল্পকলায় নারী চেতনা - অমিত বিশ্বাস

শিল্পকলায় নারী চেতনা - ২

অমিত বিশ্বাস

ভারতের আধুনিক শিল্পকলা ইতিহাসে দুইজন নারী শিল্পীর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে নেওয়া হয় যারা পরবর্তীকালের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। প্রথমজন হলেন সুনয়না দেবী (১৮৭৫) আর দ্বিতীয়জন অমৃতা শেরগিল (১৯১৩)। এনাদের মধ্যে কে সর্বপ্রথম আধুনিকতা বয়ে নিয়ে এসেছেন তা নিয়ে দুটি শিবির বিভক্ত হয়েছে এবং বিস্তর বাকযুদ্ধ চলছে। বড়-ছোট প্রমাণের দায় আমাদের নেই, সম্ভবত কালে'রও নেই। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মেয়ে সুনয়না দেবীর ছবিতে তাঁর আশেপাশের মানুষজন উঠে এসেছে কখনও পৌরাণিক চরিত্রের রূপ ধরে, কখনো বা স্ব-চরিত্রে। ব্যক্তিগত জীবনে সুনয়না দেবী দক্ষ হাতে সংসার সামলানো এবং বাহিরের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। সব্জি-কোটা আর সব্জিওয়ালার সঙ্গে সওদা করার মধ্যবর্তী সময়ে উনি ছবি আকঁতেন। ফলে তাঁর ছবিতে মানুষজনের উপস্থিতি প্রবলতর অথচ মানসিকতা ঘরোয়া হওয়ার দরুন ছবির পশ্চাদপট প্রায় একরঙা অথবা অতিসরল। সুনয়না দেবীর ছবিকে লোকশিল্প ও কালিঘাটের পটের উত্তরসূরি বললে কিছুমাত্র ভুল হবে না। অপরদিকে অমৃতা শেরগিল জন্মসূত্রে শিখ পিতা ও হাংগেরিয়ান সংগীতজ্ঞ মায়ের গুণাবলী পেয়েছিলেন। তাঁর শিল্পশিক্ষা ফ্রান্সে হওয়ার দরুন সমসাময়িক জীবনযাত্রা সমৃদ্ধ ছবিগুলিতে পশ্চাদপটে নৈসর্গিক ব্যাপ্তি লক্ষনীয়। অমৃতা শেরগীলের ন্যুড ছবিগুলিও অসাধারণ। আধুনিক বিশ্বের শিল্পকলার সেরা লক্ষণগুলি তিনি সফলভাবে তাঁর ছবিতে প্রয়োগ করেছিলেন। সেই সঙ্গে মিলেছিল ভারতীয় দর্শনের নিঃশব্দ স্রোত। প্রায় সমসাময়িক দুই নারী দুইভাবে (অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী) রূপের সন্ধান করেছেন, সমালোচকদের ভাষায় 'অভিঘাত সৃষ্টি' করেছেন এবং একইভাবে আধুনিকতার সূচনা করে শিল্পকলাকে সমৃদ্ধ করেছেন। সেই সময় আরও একজনের কথা বিশেষভাবে বলা যায়, তাঁর নাম গৌরি ভঞ্জ। আলপনার নির্যাসকে ক্যানভাসে, ম্যুরালে ছড়িয়ে দেওয়া তাঁর অন্যতম সফল প্রয়াস।

নারী শিল্পীদের শিল্পজীবনে দুটি প্রধান সমস্যা কমবেশি সবাইকে ভুগতে হয়। গৌরী ভঞ্জ অথবা সুনয়না দেবীও তার থেকে রেহাই পান নি। প্রথমটিকে বলা হয় 'মোনালিসা স্মাইল' , অপরটি হলো 'শিল্পী আত্মীয় জাতীয় সমস্যা'। ব্যবহারিক দিক থেকে দেখতে আলপনা, কাঁথা অথবা রুমাল ,শৃঙ্গারের (সাজসজ্জা) প্রয়োজনে মেয়েরা শিশুকাল থেকেই শিল্পকর্মে পারদর্শিনী। বলা যায় ব্যবহারিক প্রয়োগে শিল্প মজ্জাগত। একটু বড় হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিভাবকদের মত এদেশের বড়রা চান তাদের মেয়ে নাচে, গানে অথবা শিল্পকলায় পারদর্শিনী হোক। উদ্দেশ্য ভালোপাত্রে কন্যাদান। এনারা স্বযত্নে এড়িয়ে যান ভাস্কর্য অথবা ছাপচিত্র বিভাগকে। আহা যদি স্কিন খারাপ হয়ে যায়!!! এই শেখার কোনো মানে থাকে না যেমন থাকে না শিল্পকলায় পাঠ নিতে আসা সেই শিক্ষার্থীর যে পরবর্তীকালে শিল্পীর বউ-কাম-সেক্রেটারী হয়ে ওঠে। ফলে তাদের সহজাত প্রতিভা যা পালিশে তীক্ষ্ণ হওয়ার কথা ছিল তা ক্রমশ ভোঁতা হতে হতে একেবারে মিশে যায়। বিষয়টি নিয়ে নিজেদের সেরা ঘোষনা করা দেশ আমেরিকাতে যে চলচ্চিত্র সৃষ্টি হয়েছিল তার নাম 'মোনালিসা স্মাইল'। দ্বিতীয় প্রধান সমস্যাটি হলো শিল্পী-আত্মীয় হওয়ার সুবাদে নারীর শিল্পকর্মকে অনুগ্রহের চোখে দেখা। গৌরী ভঞ্জের সম্পর্কে লেখার শুরুতে চলে আসে পিতা শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নাম, পৃথকভাবে তাঁর শিল্পসত্তার বিচার করা হয় না। সুনয়না দেবীর ক্ষেত্রে বড়দাদা অবন-গগনের নাম আসে... বিচার করা হয় ওনারা কতটা প্রভাবিত এই সব মহান শিল্পীদের দ্বারা। শ্যামলী খাস্তগীরের মুখে শোনা একটি ঘটনার উল্লেখ করি এখানে। একসময় সোমনাথ হোর মহাশয় ভীষণ খাপ্পা হয়েছিলেন ভুঁইফোঁড় শিল্পরসিক-কাম-সংগ্রাহকদের উপর। রেবা হোর তাঁর শিল্পকর্মে অর্থাৎ ছবিতে ও টেরাকোটাতে একধরণের নির্যাসিত অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় সেই কাজে তিনি সমাজচেতনা আর আত্মচেতনার এক সুদৃঢ মেলবন্ধন ঘটান। স্বামী সোমনাথ হোরের সঙ্গে তিনি একই বাড়িতে শিল্পকর্মে নিমগ্ন থাকতেন, স্বাভাবিক ভাবে পরস্পরের আলাপ-আলোচনা এবং আদান-প্রদান ঘটতো। সেই সব ভুঁইফোঁড় সংগ্রাহকরা বাজারদর হিসাবে শুধুমাত্র সোমনাথবাবুর কাজ দেখতেন। উনি তাদের মনে করিয়ে দিলেও তারা গুরুত্ব দিয়ে রেবা হোরের কাজ দেখতে উৎসাহবোধ করতেন না, কারণ অবশ্যই বাজার। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে উনি কাজ দেখানোই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আবার প্রখ্যাত ভাস্কর প্রদোষ দাশগুপ্ত ছাপা হরফে জানিয়েছেন ওনার স্ত্রী কমলা দাসগুপ্তের ভাস্কর্য 'আহামরি' কিছু নয় যদিও তারা শিল্পচর্চাকে ঘিরে পরস্পরের কাছে এসেছিলেন। একইভাবে ঘরে-বাহিরে যুদ্ধ করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন আমিনা আহমেদ কর (ওয়াইফ অব চিন্তামনি কর!!!)। যার শিল্পকর্ম সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে "বাংলায় প্রথম মহিলা-শিল্পী যিনি সম্পূর্ণ বিমূর্ততাতে না গিয়েও আখ্যান-নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ চিত্র রচনা করতে পেরেছিলেন"। 


(ক্রমশঃ)

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১২

গৌরব রায়

যা দেখি

 
কোনো একসময়ে, কোনো একস্থানে এক নতুন শিল্পী এক প্রাজ্ঞ শিল্পীকে তার সদ্য শেষ করা একটি ছবি দেখাতে নিয়ে যান। উদ্দেশ্য সেই শিল্পীর মতামত নিয়ে আরো একটু সম্পৃক্ত (সমৃদ্ধ) হওয়া। সৌম্যকান্তি প্রাজ্ঞ নূতনকে প্রশ্ন করলেন 'কি আঁকছ?' নূতন সোৎসাহে বললেন 'যা দেখি - তাই আঁকছি।' প্রাজ্ঞের পাল্টা প্রশ্ন 'যা দেখ - তাই আঁক কি ?'

সত্যিই তো যা দেখি, আঁকার সময় তার সঙ্গে আর যোগ হয় বোধ। যা সাধারণ দৃশ্যকে করে তোলে অসাধারণ; রসোত্তীর্ণ। আর এই দেখা আর বোঝার মধ্যে দিয়ে দিক নির্দেশিত হয় আধুনিক থেকে উত্তর আধুনিকের দিকে।

একথা সর্বজন স্বীকৃত যে সকলের বোধ সমান নয়। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে সকলের বেড়ে ওঠার পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে তার মানসিক গড়ন সমান হয় না। অর্থাৎ বোধের নিরিখে বদলে যায় প্রকাশের ভাষা। একে অন্যের থেকে ভিন্নতর হয়ে ওঠেন। আর আমাদের দৃশ্যশিল্পের জগৎ ভরে যায় নানান রকমফেরের বিচিত্রতায়।

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমাদের বলতেই হবে আমাদের কাছে তথ্যের যোগান প্রচুর। বই,ইন্টারনেট অথবা অন্যান্য মিডিয়া সেই সব তথ্যের যোগানদার। প্রাচীন তথ্যের খুঁটিনাটি থেকে আধুনিকতম আবিষ্কারে হাল হকিকত, সবই ধর্তব্যের মধ্যে বলা যেতে পারে সমস্ত তথ্যই একই surface এ বর্তমান। এটিই আধুনিক আর উত্তর আধুনিকের ফারাক গড়ে দেয়।

শুধুই আগের 'গৎ' থেকে ধারণা তুলে নিয়ে তার পরিবর্তন পরিমার্জনের মাধ্যমে নতুন মাত্রা যোগ করা নয়; মূলগত তথ্যগুলিকে একসঙ্গে রেখে visually তার একটি সনির্বন্ধ প্রতিবেদন। প্রযুক্তির প্রয়োগে কখনো হয়তো তা আর Touchable and Tangible থাকছে না যেমন video art এ হয়ে থাকে।

আবার অনেক সময় পরিবেশ পরিস্থিতির দৃষ্ট ক্যানভাসে দ্বিমাত্রিক illustration এর মাধ্যমে একরকম ভিসুয়াল illusion তৈরীর চেষ্টার পরিবর্তে বিভিন্ন উপাদান, আলো, রঙ, শব্দের মাধ্যমে স্পেস দর্শকের মধ্যে একটি সম্পর্ক নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে 'installation' এর মাধ্যমে।

শহস্রাধিক বছরের প্রাচীন দ্বিমাত্রিক ছবির ধারা বা কেবল অনিন্দ্যসুন্দর একটি ভাস্কর্য কোনো ক্ষেত্রে হয়তো একবিংশ শতাব্দীর মানুষের 'surplus necessity পুরোটা মেটাতে পারছে না। তাই ক্ষেত্রবিশেষ দুই বা ততোধিক মাধ্যমের যুগলবন্দী দেখা যাচ্ছে। সিরামিক বা প্রিন্ট আর্টের মতো কুলীন নয় এমন মাধ্যমকেও মূলধর্মী শিল্পের আর্ক লাইটের আলোয় আনা হয়েছে। খুঁজে দেখা হচ্ছে authentic মাধ্যমের প্রয়োগের নতুন নতুন সম্ভবনা।

নতুনকে খুঁজে পাওয়া না গেলে তার কেবল পুরাতনের চর্বিত চর্বন করলে তাতে শিল্পের পতি যাবে রুদ্ধ হয়ে। আর থেকে যাওয়া মাবেই নিন্দুকেরা বুক বাজিয়ে বলবে 'art is dead'

মানব সংস্কৃতির এরকম একটি স্তম্ভের গায়ে এরকম বোর্ড লাগানো থাকাটা সুস্থ জনের কাছে একেবারেই কাম্য নয়। আর দর্শক যেখানে কোনো কালেই শিল্পকলার বাইরে নয় সেখানে শিল্পী, দর্শক আর স্পেসের সম্বন্ধ আরো একটু মধুর করে তোলাই যায়।