বৃহস্পতিবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

সাক্ষাৎকার - মুজিব ইরম


আমি তো কবিবংশের লোক, হাজার-কোটি বছর আগেও আমি ছিলাম, এখনও আছি, হাজার-কোটি বছর পরেও থাকবো।
                                      মুজিব ইরমএর সাথে কথোপকথন


বইমেলা চলছে। সবচে' বেশি সংখ্যক বই এই সময়ই প্রকাশ পায়। লেখকরাও অপেক্ষায় থাকে এই মুহুর্তটির জন্য। সবাই চায় তাঁর বইটি রিলিজ হয়েই যেন পাঠকের হাতে হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট থাকে। নতুন বই প্রকাশ হয়েছে এমন কয়েকজন লেখকের সাথে আমরা কথা বলতে চেয়েছি। কথা বলেছি কবি মুজিব ইরমএর সাথে। প্রশ্ন করেছেন  পাভেল আল ইমরান।






মুজিব ইরম: কবিবংশ ১টি সহজিয়া কবিতার বই

[মুজিব ইরম-এর জন্ম মৌলভীবাজার জেলার নালিহুরী গ্রামে, পারিবারিক সূত্র মতে ১৯৬৯, সনদ  পত্রে ১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাসাহিত্যে স্নাতক সম্মান সহ এমএ। নব্বই দশকের আলোচিত এবং সনাক্তযোগ্য কবি। মূলত লিটলম্যাগের প্রথা বিরোধী লেখক। পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তার ১০টি কাব্যগ্রন্থ : মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান ১৯৯৬, ইরমকথা ১৯৯৯, ইরমকথার পরের কথা ২০০১, ইতা আমি লিখে রাখি ২০০৫, উত্তরবিরহচরিত ২০০৬, সাং নালিহুরী ২০০৭, শ্রী ২০০৮, আদিপুস্তক ২০১০, লালবই ২০১১, নির্ণয় জানি ২০১২ এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে শিশুসাহিত্য : এক যে ছিলো শীত অন্যান্য গপ ১৯৯৯ উপন্যাস/আউটবই: বারকি ২০০৩, মায়াপির ২০০৪, বাগিচাবাজার ২০০৫ সম্প্রতি ধ্রুবপদ থেকে বেরিয়েছে মুজিব ইরম প্রণীত কবিতাসংগ্রহ: ইরমসংহিতা ২০১৩, এবং বাংলা একাডেমী থেকে নির্বাচিত কবিতার বই: ভাইবে মুজিব ইরম বলে ২০১৩

পুরস্কার: মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান-এর জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী তরুণ লেখক প্রকল্প পুরস্কার ১৯৯৬ বাংলা কবিতায় সার্বিক অবদানের জন্য পেয়েছেন সংহতি সাহিত্য পদক ২০০৯]

পাভেল: আপনার নতুন কবিতার বই বেরুচ্ছে শুনলাম। খুব খুশির খবর। অভিনন্দন!

মুজিব ইরম:আপনাকেও অভিনন্দন এই অধমকে উসকে দেওয়ার জন্য। প্রতিবারই যখন বই বের হওয়ার প্রস্তুতি চলে, মনে হয় এই বুঝি ১ম বই বের হচ্ছে, বড়ই বই-আনন্দে থাকি। কিন্তু বই প্রকাশের এই শিহরণ মিইয়ে যায় বই প্রকাশের পরপরই। বড়ই নিরানন্দ হই, মনে হয় কিচ্ছু হলো না! ১ম বইটা আবার লিখতে হবে। তবে এখনও আনন্দেই আছি, বই-আনন্দে, কীর্তনানন্দে, যেহেতু ১১তম ১ম বই প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছে। এই বইমেলায় ধ্রুবপদ প্রকাশনী, রুমী মার্কেট, ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে আমার নতুন কবিতার বই কবিবংশ। প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু৷

পাভেল: গ্রন্থের নাম 'কবিবংশ'! এরকম নামকরণ কেন করলেন? এর পেছনের কথা কি কিছু বলবেন?

মুজিব ইরম: কবিতা নামক এক কুহকের ভিতর দৌড়াতে দৌড়াতে সেই যে হঠাৎ ২০০৭ সালের কোনো এক মধ্যরাতে মনে হয়েছিলো, পৃথিবীতে আর কোনো ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নেই, আর কোনো পরিচয় নেই, আমি তো কবিবংশের লোক, হাজার-কোটি বছর আগেও আমি ছিলাম, এখনও আছি, হাজার-কোটি বছর পরেও থাকবো। সেই থেকে রক্ত সম্পর্ক, ধর্ম সম্পর্ক, ভৌগোলিক সম্পর্ক ত্যাগ করে হয়ে উঠি এক অলৌকিক বংশের লোক, কবিবংশের লোক।

সেই মধ্যরাতে এক ঘোরের ভিতর লিখতে শুরু করি কবিবংশটানা ১০/১২ পৃষ্ঠা লেখার পর কয়েক দিনের পর হঠাৎই ঘোর কেটে যায়, মনে হয় শেষ, আর কিছু বলার নেই দীর্ঘ কবিতাটির কয়েকটি রূপ লিটলম্যাগে ছাপা হয়। পরে এর চূড়ান্ত রূপ আদিপুস্তক গ্রন্থে গ্রন্থিতও হয়। তারপরও পয়ারের চোরা স্রোতে হারিয়ে যাওয়া সেই রাতগুলো আমাকে বড়ো আউলা করে করে রাখেকিছুতেই রেহাই দেয় না। আর রেহাই দেয় না বলেই ৭/৮ বছর ধরে লিখতে থাকি এই অলৌকিক ঘোর, কবিবংশের ঘোর।   

পাভেল: কতোটি কবিতা আছে আপনার এই বইয়ে?

মুজিব ইরম: ৪ ফর্মার এই গ্রন্থে ২টি দীর্ঘ কবিতা সহ মোট ৪৯টি কবিতা আছে ছোট ১টি ভূমিকাও এতে যুক্ত হয়েছে। এই ভূমিকা-রচনা আসলে ৪/৫ বছর আগে ছোট কাগজ শুদ্ধস্বর-এর আমন্ত্রণে লিখেছিলাম। এ-পর্বের কিছু কবিতা সহ কাব্যভাবনা রূপে রচনাটি শুদ্ধস্বরে বেরিয়েছিলো। পরে পান্ডুলিপি করতে গিয়ে ভূমিকা রূপে সে হাজির হয়। কবিবংশ উৎসর্গ করেছি আমার প্রিয় ৩ মহাজন কবি, কবিবংশের উজ্জ্বল বাতি-রাধারমণ, হাসন রাজা ও শাহ আব্দুল করিম-কে।

পাভেল: কোন ঘরানার কবিতা নিয়ে সাজিয়েছেন কবিবংশ? কবিবংশ নিয়ে আপনার মতামত কী?

মুজিব ইরম: আমার নিজের কোনো মতামত নেই। কবিতাগুলো মনানন্দে লিখেছি। শুধু বলি, কবিবংশ ১টি সহজিয়া কবিতার বই পাঠকেরাও মনানন্দেই পড়বেন বলে আশা রাখি। কবিবংশের জয় হোক, আপনাদেরও জয় হোক।


মুজিব ইরম বিরচিত
কবিবংশ থেকে
২টি কবিতা

কবিবংশ

আদিপুস্তকোত্তর ১লা কুলজি

লিখিয়াছি কবিবংশ আদি সে-কিতাব, তবুও তো ধরে রাখি অতৃপ্তি অভাব। বংশ বংশ করি বেশ কেটে গেলো কাল, রক্তে জাগে সেই ভাষা যাবনী মিশাল। শ্রীকর নন্দীর বাণী দেশী ভাষা কহে, কবি শেখর এ-বংশে লৌকিক বিছারে। বঙ্গবাণী নাম ধরি আব্দুল হাকিম, ভাষাবংশে আদিগুরু আমি সে তো হীন। কী প্রকারে তার নামে প্রণামিব হায়, আতারে-পাতারে খুঁজি মনে ন জুয়ায়। সেই তো হয়েছে শুরু আমাদের দিন, ভুসুকুপা তস্য গুরু বাঙ্গালী প্রাচীন। আরো এক বংশবাতি সগীরের নামে, বৃন্দাবন দাস নমি চৈতন্য প্রচারে। বড়ুচন্ডী দাস ভনে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মুকুন্দ রামের নামে পরাই চন্দন। রামাই পন্ডিত রচে পাঁচালি সঙ্গীত, প্রভুর চরণে মজে নিজ মত্ত চিত। সেই যে বাঁধিল গীত কানা হরিদত্ত, -মূর্খ রচিবে কী যে ভবেতে প্রমত্ত। বিজয় গুপ্তের নামে বংশবাতি পায়, ইরম মাগিছে দয়া বংশগরিমায়।

পরিশিষ্ট প্রণাম: প্রণামে-সুনামে গড়ি শব্দ-বাক্য-মিথ, পয়ারে-খেয়ালে শুধু গাই বংশগীত। অন্ধকার যুগে বাঁধি গয়েবি কামোদ, পটমঞ্জরীতে সঁপি সেই সুদবোধ। আমি যে বাঁধিবো তাল কুলিন রাগিনী, ভূর্জপত্রে নতজানু দয়া কী মাগিনী! তুমি কন্যা বেঁধো সুর মর্জি যদি হয়, এই বংশে জেগে থাকে চর্যাবিনিশ্চয়।


কবিবংশ

২য় ও সর্বশেষ কুলজি

সেই কবে ভাববশে ভুলিয়াছি ধাম, বিপ্রদাশ পিপিলাই ধরিয়াছি নাম। জয়দেব হয়ে রচি গোবিন্দের গীত, ছিটিয়েছি পুষ্পঢেউ কামের কিরিচ। রচিয়াছি চম্পুকাব্য কোনো এক কালে, বন্দনা করেছি কতো আনে আর বানে। আমিও শ্রীহট্টে জন্মে রাধারূপ ধরি, কবেই ছেড়েছি বাড়ি শব্দ শব্দ জপি। জৈন্তা পাহাড়ে ইরম দেখিয়াছি রূপ, বামেতে বন্ধুবাড়ি ডানেতে অসুখ। তবুও আলোর ডাক তবুও স্বপন, শ্রীহট্টে জন্মিয়া ভ্রমি বিস্তীর্ণ ভুবন। রচিতে প্রেমের শ্লোক তুচ্ছ করি কাম, বলেছি সহস্র বার নারীকে প্রণাম। জমিয়েছি দূরবাসে একজন্ম ঋণ, অকূল পাথারে ভাসি দলহারা মীন। সন্ধ্যাভাষা ভুলি নাই গুহ্য অন্তমিল, আমারও রক্তে ছুটে চর্যার হরিণ।

মোনাজাত: তুমি পুত্র কবিবংশের লোক...ধরিও বংশের খুঁটিজন্মভিটা যেনো আর না থাকে বিরান তোমার তরিকা যেনো সত্য হয় প্রেমদ্বিধাহীন করে যেও বংশের বয়ান...পুত্র তুমি, পিতা তুমি, তুমি বংশের মান- তোমাকে স্বাগত বলি, জানাই সেলাম!